### তোর আসক্ত আমি
লেখিকা: নুসরাত জাহান রাফা
পর্ব সংখ্যা: ৪৫
### তোমাকে ঘিরে সন্ধ্যাটা ❤️
খান বাড়ির বসার ঘরটা আজ বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। চারদিকে ফুলের সাজ, হালকা আলোর ঝলকানি আর পরিবারের সবার হাসি-আনন্দে বাড়িটা যেন উৎসবের রূপ নিয়েছে।
মায়া শাহজাদের ছোট বোনের সঙ্গে তার ঘরে বসে গল্প করছিল। ছোট বোন একের পর এক প্রশ্ন করেই যাচ্ছে।
“আপু, আপনি কি সত্যিই বই পড়তে খুব ভালোবাসেন?”
মায়া হেসে বলল, “হ্যাঁ। অবসর পেলেই বই পড়ি।”
“তাহলে আমার জন্যও একটা গল্পের বই নিয়ে আসবেন?”
“অবশ্যই। তবে একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“বইটা পড়ে শেষ করতে হবে।”
ছোট বোন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “কথা দিলাম!”
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শাহজাদ তাদের কথোপকথন শুনছিল। হঠাৎ সে বলল, “তোমার জন্য বই আনতে হলে আমাকে আগে জানতে হবে তুমি কোন ধরনের গল্প পছন্দ করো।”
ছোট বোন মুখ বাঁকিয়ে বলল, “ভাইয়া, আপনি আবার মাঝখানে কথা বলছেন কেন?”
মায়া হেসে ফেলল।
শাহজাদ বলল, “আমি তো শুধু সাহায্য করতে এসেছি।”
“আপনার সাহায্য লাগবে না। আপনি যান!”
শাহজাদ মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখলেন? নিজের বাড়িতেই আমার কোনো মূল্য নেই।”
মায়া মৃদু হেসে উত্তর দিল, “আপনি নিশ্চয়ই কিছু একটা করেছেন।”
“আপনিও ওর দলে চলে গেলেন?”
“আমি নিরপেক্ষ।”
শাহজাদ হেসে বলল, “ঠিক আছে, নিরপেক্ষ মানুষ। নিচে আসবেন কিন্তু। মা আপনাকে খুঁজছেন।”
মায়া মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
কিছুক্ষণ পর সবাই একসঙ্গে বসার ঘরে এল। রেহানা বেগম মায়াকে কাছে বসিয়ে নানা কথা জিজ্ঞেস করলেন। মায়ার মা-ও তার সঙ্গে গল্পে যোগ দিলেন।
“মায়া, তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?” রেহানা বেগম জানতে চাইলেন।
মায়া সুন্দর করে উত্তর দিল। এরপর শাহজাদের ছোট বোনও তাদের পাশে এসে বসল।
সবাই মিলে গল্প করতে করতে সন্ধ্যা কেটে যাচ্ছিল।
একসময় খাবার পরিবেশন করা হলো। শাহজাদ দেখল, মায়া নিজের পছন্দের খাবারটা নিতে ভুলে গেছে। সে নিজে থেকে খাবারটা মায়ার সামনে এগিয়ে দিল।
“এটা তো আপনার পছন্দ, তাই না?”
মায়া অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনার মনে আছে?”
“আপনার পছন্দের ছোট ছোট বিষয়গুলো মনে রাখার চেষ্টা করি।”
মায়া নিচু স্বরে বলল, “ধন্যবাদ।”
শাহজাদ মৃদু হেসে বলল, “শুধু ধন্যবাদ দিলে হবে?”
“তাহলে কী দিতে হবে?”
“একটু হাসি।”
মায়া হেসে ফেলল।
শাহজাদ বলল, “এই তো! এবার ঠিক আছে।”
খাবার শেষে সবাই যখন গল্পে ব্যস্ত, তখন শাহজাদের ছোট বোন মায়াকে নিয়ে বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগানে গেল। সেখানে কয়েকটি ফুলের গাছ আর সুন্দর করে সাজানো বসার জায়গা রয়েছে।
শাহজাদও কিছুক্ষণ পর সেখানে এল।
“এখানে কী হচ্ছে?” সে জিজ্ঞেস করল।
ছোট বোন বলল, “আপু আমার সঙ্গে গল্প করছে। আপনি আবার বিরক্ত করতে এসেছেন?”
“তাহলে আমি চলে যাই?”
মায়া হেসে বলল, “না, থাকুন।”
শাহজাদ একটু অবাক হয়ে তাকাল। তারপর মুচকি হেসে পাশে দাঁড়াল।
ছোট বোন হঠাৎ বলল, “আপু, ভাইয়া কিন্তু আপনার কথা অনেক বলে!”
মায়া লজ্জা পেয়ে বলল, “তাই নাকি?”
শাহজাদ দ্রুত বলল, “তুই এবার ভেতরে যা।”
“কেন? সত্যি কথা বলছি বলে?”
মায়া হাসি আটকাতে পারল না।
ছোট বোন চলে গেলে বাগানে কিছুক্ষণের জন্য নীরবতা নেমে এল।
শাহজাদ বলল, “আপনার ভালো লাগছে?”
মায়া চারদিকে তাকিয়ে বলল, “খুব। আপনার বাড়িটা বেশ সুন্দর।”
“বাড়ির চেয়ে আজকের সন্ধ্যাটা বেশি সুন্দর লাগছে।”
মায়া বুঝেও না বোঝার ভান করল।
“কেন?”
“কারণ আপনি এসেছেন।”
মায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আপনি সব সময় এমন কথা বলেন কেন?”
“আপনার সামনে সত্যি কথাগুলো একটু বেশি বলতে ইচ্ছে করে।”
“আপনি জানেন, এসব কথা শুনলে আমি কী বলব বুঝতে পারি না?”
শাহজাদ হেসে বলল, “তাহলে কিছু বলতে হবে না। আপনার হাসিটাই যথেষ্ট।”
মায়া এবার একটু সাহস করে বলল, “আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমারও ভালো লাগে।”
শাহজাদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
“সত্যি?”
“না, মিথ্যা বললাম!”
“তাহলে তো আমাকে আবার বিশ্বাস করানোর দায়িত্ব নিতে হবে।”
মায়া হেসে বলল, “আপনি খুব দুষ্টু।”
শাহজাদ বলল, “আপনার কাছেই একটু দুষ্টুমি করি।”
এরপর দুজন বাগানের বেঞ্চে বসে পড়ল। দূরে পরিবারের সবার গল্পের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। শাহজাদ মায়াকে তার কাজের কিছু মজার ঘটনা বলল। মায়াও নীলার সঙ্গে ঘটে যাওয়া একটি হাসির ঘটনা শোনাল।
কথা বলতে বলতে মায়া বলল, “একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“অবশ্যই।”
“আপনি যখন খুব ব্যস্ত থাকেন, তখন কি আমার কথা মনে পড়ে?”
শাহজাদ একটু হেসে বলল, “পড়ে। তবে কাজের মাঝখানে সব সময় ফোন করতে পারি না। তাই সুযোগ পেলেই আপনার খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করি।”
মায়া বলল, “আমি শুধু চাই, আপনি আমাকে আপনার ব্যস্ততার কথাটা জানিয়ে রাখবেন।”
“আমি চেষ্টা করব। আর আপনিও কোনো কিছু খারাপ লাগলে চুপ করে থাকবেন না।”
“ঠিক আছে।”
শাহজাদ বলল, “আমাদের মধ্যে যেন কোনো অভিমান জমে না থাকে।”
মায়া মাথা নেড়ে বলল, “আমিও সেটাই চাই।”
কিছুক্ষণ পর রেহানা বেগম এসে ডাকলেন, “তোমরা এখানে বসে আছ? সবাই ভেতরে তোমাদের খুঁজছে।”
দুজন উঠে দাঁড়াল।
মায়া ভেতরে যাওয়ার আগে শাহজাদ আস্তে করে বলল, “আজকের সন্ধ্যাটা মনে থাকবে।”
মায়া মুচকি হেসে বলল, “আমারও।”
রাত একটু গভীর হলে মায়ারা বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিল। ছোট বোন মায়াকে জড়িয়ে ধরে বলল, “আপু, আবার আসবেন কিন্তু!”
মায়া বলল, “অবশ্যই আসব।”
শাহজাদ গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিল। গাড়িতে ওঠার আগে মায়া বলল, “আজকের আয়োজনটা খুব সুন্দর ছিল। সবাইকে ধন্যবাদ জানাবেন।”
শাহজাদ বলল, “আপনি এসেছেন বলেই আমার কাছে সুন্দর হয়েছে।”
মায়া লজ্জা পেয়ে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ি চলে যাওয়ার পরও শাহজাদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
রাতে মায়ার ফোনে মেসেজ এল।
শাহজাদ: বাসায় পৌঁছেছেন?
মায়া: জি, পৌঁছেছি।
শাহজাদ: আজ আপনাকে খুব সুন্দর লাগছিল।
মায়া: আবার শুরু হলো!
শাহজাদ: সত্যি বলছি। আর আপনার হাসিটা আজও আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে।
মায়া: ধন্যবাদ। আজ আপনিও ভালো ছিলেন।
শাহজাদ: শুধু ভালো?
মায়া: একটু বেশি ভালো।
শাহজাদ: এই কথাটা আবার শুনতে ইচ্ছে করছে।
মায়া: কাল শুনবেন। আজ ঘুমান।
শাহজাদ: আচ্ছা। শুভরাত্রি, মায়া।
মায়া: শুভরাত্রি। ভালো থাকবেন।
শাহজাদ ফোনটা পাশে রেখে মুচকি হাসল। আর মায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে ভাবল, কিছু মানুষ জীবনে আসার পর সাধারণ দিনগুলোও যেন বিশেষ হয়ে ওঠে।
তাদের সম্পর্ক এখনো ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। সামনে আরও অনেক কথা, অনেক অভিমান, অনেক হাসি আর একসঙ্গে কাটানোর মতো অসংখ্য মুহূর্ত অপেক্ষা করছে।
কিন্তু শাহজাদ এবার মনে মনে একটি সিদ্ধান্ত নিল—মায়ার সঙ্গে তার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে খুব শিগগিরই মায়ের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলবে।
চলবে... ❤️