ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

পর্ব 1

লেখক: অপ্সরা জাহিদ

এসেছি তোকে নিয়ে ফিরবো বলে

লেখিকা: Apshora Jahid

প্রথম পর্ব: গোপালগঞ্জের এক সকাল

গোপালগঞ্জ শহরের এক অভিজাত এলাকায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বাড়ি—চৌধুরী ভিলা। বাড়িটির সৌন্দর্য চোখে পড়ার মতো। বিশাল প্রবেশদ্বার, চারপাশে সবুজ গাছপালা, রঙিন ফুলের বাগান আর বাড়ির সামনে সাজানো সুন্দর একটি ফোয়ারা। বাড়ির প্রতিটি কোণে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট। এই বাড়িতে বসবাস করে চৌধুরী পরিবার।

পরিবারের একমাত্র মেয়ে অপ্সরা জাহিদ। নামের মতোই তার উপস্থিতিতে রয়েছে আলাদা এক মায়া। সে ভীষণ চঞ্চল, জেদি, স্পষ্টভাষী এবং প্রচণ্ড রাগী। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু ঘটলে সহজে মেনে নিতে পারে না। তবে পরিবারের মানুষগুলোর কাছে সে ভীষণ আদরের। তার হাসিতে বাড়ির পরিবেশ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে, আবার রাগ করলে সবাইকে বেশ সাবধানে থাকতে হয়।

সকাল আটটা।

— ধ্রুব ভাইয়া! ধ্রুব ভাইয়া!

সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নামতে নামতে চিৎকার করল অপ্সরা। তার হাতে ফোন নেই, মুখে বিরক্তির ছাপ।

ড্রয়িংরুমে বসে পত্রিকা পড়ছিল ধ্রুব। অপ্সরার আওয়াজ শুনে সে পত্রিকা নামিয়ে তাকাল।

— কী হয়েছে? সকাল সকাল পুরো বাড়ি মাথায় তুলছ কেন?

— আমার ফোন কোথায় রেখেছ?

— তোমার ফোন আমি কোথায় রাখব?

— তুমি ছাড়া আর কে আমার জিনিস সরাবে?

ধ্রুব হেসে বলল,

— নিজের জিনিস নিজে ঠিকমতো রাখতে পারো না, আবার দোষ দাও আমাকে!

অপ্সরা রাগী চোখে তাকাল।

— একদম কথা বলবে না আমার সঙ্গে!

ঠিক তখনই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল আনিশা। হাতে নাশতার ট্রে। সে ধ্রুবের স্ত্রী এবং অপ্সরার বড় ভাবি। শান্ত, নম্র ও কোমল স্বভাবের আনিশা এই পরিবারের সবার সঙ্গে খুব সহজেই মিশে গেছে।

— কী হয়েছে তোমাদের? সকাল থেকেই ঝগড়া শুরু?

অপ্সরা সঙ্গে সঙ্গে আনিশার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

— ভাবি, তোমার স্বামী আমাকে একদম শান্তিতে থাকতে দেয় না।

ধ্রুব হেসে বলল,

— বিয়ের পর বুঝলাম, আমার সংসারে আরেকজনেরও অধিকার আছে। সে হলো তোমার এই ননদ!

আনিশা হেসে ফেলল।

— আচ্ছা, দুজনেই চুপ করো। আগে নাশতা করো।

অপ্সরা মুখ গম্ভীর করে চেয়ারে বসে পড়ল। আনিশা তার প্লেটে খাবার তুলে দিল। অপ্সরা ভাবির দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। রাগ যতই থাকুক, আনিশার সঙ্গে বেশিক্ষণ অভিমান করে থাকতে পারে না সে।

অন্যদিকে, গোপালগঞ্জ শহরের আরেকটি এলাকায় একটি সুন্দর ফ্ল্যাটে থাকে আনিশার পরিবার। আনিশার বাবা-মা, ছোট বোন আরশি এবং আরশির ছোট বোন আলাইনা। তিন বোনের মধ্যে আনিশা সবার বড়। বিয়ের পর সে ধ্রুবের সঙ্গে চৌধুরী ভিলায় থাকে, তবে ছোট বোনদের সঙ্গে তার যোগাযোগ সবসময়ই রয়েছে।

আরশি শান্ত ও ভদ্র স্বভাবের মেয়ে। সে খুব বেশি কথা বলে না, কিন্তু পরিবারের কারও মন খারাপ থাকলে সবার আগে বুঝতে পারে। অন্যদিকে আলাইনা একটু দুষ্টু, চঞ্চল এবং হাসিখুশি। দুই বোনের মধ্যে খুনসুটি লেগেই থাকে।

সকালে আলাইনা নিজের ঘরে বই খুঁজছিল।

— আরশি আপু! আমার বাংলা বইটা কোথায়?

আরশি বিছানায় বসে বই পড়ছিল। সে চোখ না তুলেই বলল,

— নিজের বই নিজে কোথায় রেখেছ, সেটা নিজেই খুঁজে বের করো।

— তুমি তো সব জানো। বললেই পারো!

— সব জানলে তোমার পড়াশোনাও কি আমাকে করতে হবে?

আলাইনা মুখ বাঁকিয়ে বলল,

— তোমরা বড় বোনেরা খুব স্বার্থপর!

আরশি এবার হেসে ফেলল।

ঠিক তখনই আনিশার ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপ্সরার নাম দেখে সে ফোন ধরল।

— হ্যালো, ভাবি!

— বলো, অপ্সরা।

— আজ তোমাদের বাসায় আসব। আরশি আর আলাইনার সঙ্গে দেখা করব। ওদের জন্য কিছু নিয়ে আসব। কী খেতে ভালোবাসে বলো?

আনিশা মৃদু হেসে বলল,

— ওদের পছন্দের কথা ওরাই তোমাকে বলবে। তুমি এলেই ওরা অনেক খুশি হয়।

ফোনের ওপাশ থেকে অপ্সরা বলল,

— তাহলে আজ কিন্তু কেউ আমাকে বিরক্ত করবে না। আমি শুধু গল্প করতে যাব!

আনিশা হেসে উত্তর দিল,

— তোমাকে বিরক্ত করার সাহস কার আছে?

ফোন রেখে আনিশা ছোট বোনদের দিকে তাকাল।

— অপ্সরা আজ আসবে।

আলাইনা আনন্দে বলে উঠল,

— সত্যি আপু? তাহলে আমি ওর জন্য অপেক্ষা করব!

এদিকে, গোপালগঞ্জ থেকে অনেক দূরে বিদেশের এক বাড়িতে ব্যস্ত সময় কাটছে থিয়াগো ও সিরো মেসির। তারা দুই ভাই। তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে বাংলাদেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে আসার আনন্দ দুজনের চোখেমুখে স্পষ্ট।

থিয়াগো নিজের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে সিরোকে বলল,

— সবকিছু নেওয়া হয়েছে তো?

সিরো নিজের পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বলল,

— আমার সব প্রস্তুতি শেষ। তোরই শুধু দেরি হচ্ছে।

— আমি দেরি করছি না। সবকিছু ঠিকঠাক নিচ্ছি।

— তুই সবসময়ই এমন। একটা কাজ করতে গেলেও দশবার ভাবিস!

দুই ভাইয়ের কথায় পাশের ঘর থেকে তাদের মা হেসে উঠলেন।

— তোমরা দুজন আবার শুরু করেছ? দেশে গিয়ে যেন এমন ঝগড়া না করো।

থিয়াগো হেসে বলল,

— মা, সিরোকে সামলানো কিন্তু সহজ নয়।

সিরো সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

— নিজেকে খুব ভালো ছেলে ভাবিস, তাই না?

তাদের বাবা দরজার কাছে এসে বললেন,

— অনেক হয়েছে। এবার দুজনেই প্রস্তুত হও। আমাদের যাত্রার সময় হয়ে আসছে।

দুই ভাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসল। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে নতুন এক সফর, নতুন কিছু অভিজ্ঞতা।

অন্যদিকে, মিয়াদ নিজের ঘরে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার জীবনে কিছু অনুভূতি রয়েছে, যেগুলো সে কাউকে বলতে পারেনি। আনিশা ও অপ্সরা—দুজনের প্রতিই তার মনে আলাদা টান। কিন্তু সে নিজেও বুঝতে পারে না, এই অনুভূতির শেষ কোথায়। কখনো আনিশার শান্ত স্বভাব তাকে মুগ্ধ করে, আবার কখনো অপ্সরার চঞ্চলতা তার মনোযোগ কেড়ে নেয়।

ফোন হাতে নিয়ে সে অনেকক্ষণ বসে রইল। কাউকে ফোন করবে কি না, তা ভেবে শেষ পর্যন্ত ফোনটি পাশে রেখে দিল।

দুপুরের খাবারের পর চৌধুরী ভিলায় আবার ব্যস্ততা শুরু হলো। ধ্রুব অফিসের কিছু কাজ শেষ করে অপ্সরাকে ডাকল।

— অপ্সরা, তৈরি হয়ে নাও। আজ আনিশাদের বাসায় যাব।

অপ্সরা তখন নিজের ঘরে বসে ফোন দেখছিল।

— তুমি যাও। আমি যাব না।

— কেন?

— এমনিই। আমার যেতে ইচ্ছা করছে না।

ধ্রুব দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

— তোমার ভাবি তোমার জন্য অপেক্ষা করবে। আরশি, আলাইনাও তোমার সঙ্গে দেখা করতে চায়।

অপ্সরা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফোনটা বিছানায় রেখে উঠে দাঁড়াল।

— আচ্ছা, যাব। তবে ফেরার পথে আমার পছন্দের খাবার কিনে দিতে হবে।

ধ্রুব হেসে বলল,

— তোমার আবদারের শেষ নেই!

— আগে কথা দাও।

— ঠিক আছে, কথা দিলাম।

অপ্সরা আলমারি খুলে পোশাক বেছে নিতে লাগল। অন্যদিকে ধ্রুব গাড়ি বের করার জন্য নিচে চলে গেল।

বিকেলের দিকে গোপালগঞ্জ শহরের রাস্তায় গাড়ি চলতে শুরু করল। জানালার পাশে বসে অপ্সরা বাইরে তাকিয়ে ছিল। পরিচিত শহর, পরিচিত রাস্তা, পরিচিত মানুষ—সবকিছুই তার কাছে আপন। সে জানত না, এই শহরের বুকেই কত মানুষের জীবনের গল্প একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

কিছু মানুষ আসবে, কিছু সম্পর্ক বদলে যাবে, আবার কিছু অনুভূতি নতুন করে জন্ম নেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে অপ্সরার ভাবনায় শুধু একটাই বিষয়—ভাবির বাসায় গিয়ে আরশি ও আলাইনার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করা।

গাড়িটি ধীরে ধীরে তাদের গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল।

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন