ঢাকার অভিজাত এলাকায় বিশাল এক বাড়ি। বাড়িটির নাম চৌধুরী ভিলা। তিনতলা বাড়িটির সামনে বিশাল বাগান, একপাশে গাড়ি রাখার জায়গা, পেছনে খোলা উঠান।
এই বাড়িতে বসবাস করেন চৌধুরী পরিবারের তিন প্রজন্ম।এই বাড়ির প্রধান হাকিম চৌধুরী। স্ত্রী আমেনা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে এক মেয়ে
বড় ছেলে মাহমুদ চৌধুরী। স্ত্রী শায়লা বেগম। তাঁদের দুই সন্তান—নিলয় ও নুহা।
ছোট ছেলে কামাল চৌধুরী। স্ত্রী নাসরিন বেগম। তাঁদের দুই সন্তান—রাফি ও মেহের। সবাই একই বাড়িতে থাকে।
একমাএ মেয়ে শারমিন চৌধুরী। বিয়ে হয়েছে সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার দুইটি ছেলে ও একটি মেয়ে আছে।
এই পরিবারের বড় নাতি নিলয় চৌধুরী। বয়স ছাব্বিশ। ছয় ফুটের কাছাকাছি উচ্চতা, প্রশস্ত কাধ আর সুঠাম দেহের অধিকারী, গাশের রং উজ্জল শ্যামলা। পরিবারের ব্যবসার একটি বড় অংশ তার দায়িত্বে। ছোটবেলা থেকেই বেশ গম্ভীর স্বভাবের। অল্পতেই রেগে যায়।
নুহা চৌধুরী, বয়স সতেরো। কলেজে পরে। ভীষন চঞ্চল একটা মেয়ে। লম্বা চুল ওচোখ দুটো টানা টানা, হাসলে গালে টুল পরে। বাড়ির সবার আদরের মেয়ে।
রাফি চৌধুরী, বয়স প্রায় চব্বিশ, পাঁচ ফুট এগারো ইঞ্চি।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স এ পরে। পড়াশোনায় মেধাবী
মেহের চৌধুরী, বয়স সতেরো, নুহার সাথে একই কলেজে পড়ে
।
চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং রুমে সবাই একে একে নাশতা করতে বসেছে। দাদা পত্রিকা পড়ছেন। আমেনা বেগম নুহাকে ডেকে তার প্লেটে পরোটা তুলে দিচ্ছেন। মেহের আর নুহা নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।
এমন সময় সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল নিলয়।
পরনে কালো শার্ট, ধূসর প্যান্ট। হাতে ঘড়ি, চোখেমুখে গম্ভীর ভাব।
আমেনা বেগম, তাকে দেখেই বললেন,
— এই যে আমার বড় নাতি এসেছে! আয় বাবা, নাশতা কর।
নিলয় দাদির পাশে বসে বলল,
— তুমি খেয়েছ দাদি?
— হ্যাঁ রে, তুই খা।
রাফি পাশ থেকে বলল,
— ভাইয়া, আজ অফিসে যাচ্ছ?
নিলয় বলল,
— হ্যাঁ।
রাফি হেসে বলল,
— আমাকে সঙ্গে নিয়ে যেও।
নিলয় একবার তাকাল।
— তোর তো অফিসে বসারই যোগ্যতা হয়নি এখনো।
সবাই হেসে উঠল।
নুহা বলল, ভাইয়া আমাকে আর মেহের কে আজকে কলেজে ড্রপ করে দিবে, বাবা সকালে তাড়াতাড়ি অফিসে চলে গেছে।
নিলয় বলল, আচ্ছা, খেয়ে তাড়াতাড়ি আয় আমি বাইরে অপেক্ষা করছি।
এই কঠিন স্বভাবের ছেলেটিরও পরিবারের প্রতি আলাদা একটা টান আছে।
অন্যদিকে শহরের আরেক প্রান্তে রহমান পরিবার। বাবা আবদুল করিম, মা রেহানা বেগম এবং তাঁদের দুই সন্তান—নাদিয়া ও নাবিল।
নাদিয়া পরিবারের বড় মেয়ে। বয়স আঠারো। অর্নাস প্রথম বর্ষে । ভীষণ চঞ্চল, জেদি এবং স্পষ্টভাষী। তার সঙ্গে তর্কে জেতা বেশ কঠিন।
নাবিল রহমান, বয়স চৌদ্দ, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে।
শান্তশিষ্ট ছেলে।
সকালবেলা নিজের ঘরে বসে বান্ধবী তানিয়ার সঙ্গে ফোনে কথা বলছিল।
— নাদিয়া , আজ ভার্সিটি আসবি তো?
— আসব। কিন্তু তুই আবার দেরি করিস না।
— আমি কখন দেরি করি?
— প্রতিদিন
নাদিয়া হেসে বলল,
— আচ্ছা, আজ সময়মতো আসব।
ঠিক তখন নাবিল ঘরে ঢুকে বলল,
— আপু, আম্মু ডাকছে।
— একটু দাঁড়া।
নাবিল তার টেবিল থেকে চকলেট নিয়ে পালাতে গেল।
নাদিয়া পেছন ফিরে তাকিয়ে চিৎকার করল,
— এই! আমার চকলেট নিলি কেন?
"
নিলয়, নুহা আর মেহেরকে কলেজে ড্রপ করে দিয়ে অফিসে এসেছে।
সকাল ১০টা। রহমান গ্রুপের প্রধান কার্যালয়। অফিসের সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত। বিশাল কাচঘেরা কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফাইল দেখছিলেন নিলয় চৌধুরী
কিছুক্ষণ পর দরজায় নক করার শব্দ হলো।
— মে আই কাম ইন, স্যার?
— ইয়েস, কাম ইন।
ম্যানেজার হাতে কয়েকটি ফাইল নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলেন।
— স্যার, গত মাসের ব্যবসায়িক হিসাবগুলো প্রস্তুত করা হয়েছে।
— ফাইলগুলো টেবিলে রাখুন।
— জি, স্যার।
নিলয় ফাইলগুলো খুলে দেখতে শুরু করলেন।
— এই প্রজেক্টের কাজ এখনো শেষ হয়নি কেন?
— স্যার, কিছু সমস্যার কারণে কাজটি একটু পিছিয়ে গেছে।
— আমি অজুহাত শুনতে চাই না। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া উচিত ছিল।
— দুঃখিত, স্যার। দ্রুত কাজ শেষ করার ব্যবস্থা করছি।
— আগামীকালের মধ্যে আমাকে সম্পূর্ণ রিপোর্ট চাই।
— জি, স্যার।
— আর নতুন ক্লায়েন্টের সঙ্গে মিটিংয়ের সময় নির্ধারণ করেছেন?
— জি স্যার, আগামীকাল সকাল এগারোটায়।
— ঠিক আছে। মিটিংয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখবেন।
— অবশ্যই, স্যার।
— ওকে, ইউ মে লিভ নাউ।
ম্যানেজার বেরিয়ে গেলে নিলয় আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিলেন।
" নাদিয়া আজ ক্লাসের সময়ের আগে চলে এসেছে। দুর থেকে দেখতে পেল তার বন্ধুরা তানিয়া, বৃষ্টি, নাবা আর নাইম সবাই একসাথে বটতলায় আড্ডা দিচ্ছে। নাদিয়া সেদিকে এগিয়ে গেল।
নাদিয়া কে দেখতে পেয়ে বৃষ্টি বলল,
--- কীরে তুই আজকে এত তাড়াতাড়ি এলি কী করে
--- কী করব বল আমার ভাগ্য আজকে খারাপ ছিল তাই রাস্তায় জ্যাম পাইনি।
নাদিয়ার কথা শুনে সবাই উচ্চসরে হেসে উঠল।
নাইম বলল,
--- জানিস আজকে নতুন লেকচারার আসবে
নাদিয়া উওরে বলল,
--- কই আমরা ত জানিনা। তুই জানলি কী করে
---আরে আমাদের সিনিয়র রায়হান ভাইয়া আছে না তার থেকে জেনেছি।
--- ওহ
এভাবে কিছুক্ষণ আড্ডা দেওয়ার পর ক্লাসের বেল বেজে উঠল। সবাই ক্লাসে গিয়ে নিজ নিজ সিটে বসল।
ক্লাসরুমে তখন শিক্ষার্থীদের হইচই আর হাসাহাসি চলছিল। হঠাৎ দরজার সামনে একজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ধীরে ধীরে সবার কণ্ঠ থেমে গেল।
লম্বা গড়নের এক সুদর্শন পুরুষ। পরনে কালো শার্ট, ধূসর প্যান্ট। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, হাতে একটি ঘড়ি। মুখজুড়ে গম্ভীর ভাব, চোখেমুখে এক ধরনের কঠোর ব্যক্তিত্ব। তাঁকে দেখে সহজেই বোঝা যায়, মানুষটি খুব একটা কথা বলতে পছন্দ করেন না।
তিনি ধীর পায়ে ক্লাসের ভেতরে প্রবেশ করে শিক্ষকের চেয়ারে বসলেন। টেবিলের ওপর বইটি রেখে একবার পুরো ক্লাসের দিকে তাকালেন।
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— গুড মর্নিং।
সবাই একসঙ্গে উত্তর দিল,
— গুড মর্নিং, স্যার।
— আমি তোমাদের নতুন শিক্ষক। আমার নাম আরিয়ান শিকদার । আজ থেকে এই শ্রেণির দায়িত্ব আমার ওপর। আশা করি, ক্লাসে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা কিংবা বিশৃঙ্খলা পছন্দ করার মতো ভুল তোমরা কেউ করবে না।
কথাগুলো বলেই তিনি কিছুক্ষণ থামলেন। তারপর আবার বললেন,
— আমি খুব বেশি কথা বলতে পছন্দ করি না। পড়াশোনার সময় পড়াশোনা হবে, আর নিয়মের বাইরে কিছু হলে তার জবাবও দিতে হবে।
তিনি টেবিলের ওপর রাখা কলমটি হাতে নিয়ে বললেন,
— এবার পরিচয় পর্ব শুরু করা যাক। একে একে সবাই নিজের নাম বলবে। নাম, পরিচয় এবং ভবিষ্যতে কে কী হতে চাও, সংক্ষেপে জানাবে। শুরু করো প্রথম বেঞ্চ থেকে।
তাঁর গম্ভীর কণ্ঠে পুরো ক্লাস যেন মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল।
প্রথম বেঞ্চ থেকে একটি ছেলে উঠে দাঁড়াল।
— স্যার, আমার নাম রাফি আহমেদ।
আরিয়ান রহমান একবার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— বসো।
এরপর একে একে সবাই নিজেদের পরিচয় দিতে লাগল। কেউ নিজের পরিচয় দিচ্ছে, কেউ আবার ভয়ে খুব নিচু স্বরে কথা বলছে।
এবার শেষ বেঞ্চের দিকে চোখ পড়তেই তিনি বললেন,
— ওই শেষ বেঞ্চে যে মেয়েটি বসে আছো, দাঁড়াও।
মেয়েটি একটু অপ্রস্তুত হয়ে উঠে দাঁড়াল।
— তোমার নাম কী?
— জি স্যার ...
---তোমার নাম কী?
---আমার নাম বৃষ্টি।
— এত আস্তে কথা বলছ কেন? স্পষ্ট করে কথা বলো।
— জি স্যার, বৃষ্টি
তিনি কয়েক মুহূর্ত মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— পড়াশোনায় কেমন?
— জি, ভালো স্যার।
— দেখা যাবে। আপাতত বসো।
--- বৃষ্টি চুপচাপ বসে পড়ল।
সবাইয়ের পরিচয় শেষ হলে আরিয়ান বোর্ডের সামনে গিয়ে নিজের নাম লিখলেন।
— আজ থেকে তোমাদের সঙ্গে আমার সময়টা কেমন কাটবে, সেটা অনেকটাই নির্ভর করবে তোমাদের আচরণের ওপর। আমি পড়াশোনার ব্যাপারে কোনো অবহেলা সহ্য করি না। আশা করি, কথাটা সবাই বুঝতে পেরেছ।
পুরো ক্লাস একসঙ্গে উত্তর দিল,
— জি, স্যার।
তিনি বই খুলে বললেন,
— তাহলে আজকের পাঠ শুরু করা যাক।
ক্লাসরুম আবারও নীরব হয়ে গেল।
প্রথম অধ্যায় সমাপ্ত।