#আরেকটি_বার
#সারপ্রাইজ_পর্ব [অন্তিম পর্বের পর থেকে]
#শিরোনাম_জীবন_যেখানে_যেমন
#Esrat_Ety
[ ১ম অংশ ]
শায়মী ক'ট'ম'ট দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে আছে শর্মীর দিকে। শর্মীও তাই। দু'জনেই দু'জনকে দৃষ্টি দিয়ে দমিয়ে ফেলতে চাইছে। অথচ কেউই দমছে না। রাওনাফ মাঝখানে দাঁড়িয়ে দুই মেয়ের কান্ড দেখছে,সে শুধু চুপচাপ দেখছেই,কিছুই বলছে না কাউকে। কারন বলেও কোনো লাভ হয় না।
"বোনুকে ছাড়!"
তেতে উঠে বলে শায়মী। শর্মী রাহাকে বুকের সাথে মিশিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাল্টা জবাব দেয়,"না।"
_তুই সন্ধ্যা থেকে রেখেছিস। আচ্ছা তোর পড়াশোনা নেই? সামনে ফাইনাল।
_তোমারও ফাইনাল!
_আমি কোচিং থেকেই এলাম। তুই বাড়িতে ছিলিস। পুরোটা সময় ওকে রেখেছিস। এখন আমার কাছে দে।
গম্ভীর কণ্ঠে বলে থাবা বসাতে যায় শায়মী,শর্মী পিছিয়ে যায়। এগারো মাস বয়সী ছোট্টো রাহা বোনের কোলে তার বুকের সাথে মিশে মুখ থেকে শুধু "তা তা তা পাপাপা" শব্দ বের করছে। তার বোঝার সাধ্যি নেই তাকে নিয়ে কি হচ্ছে রওশান মঞ্জিলের লিভিং রুমে।
দুই বোনের টানাটানি দেখে রাওনাফ চুপচাপ কিচেনে চলে যায়। উর্বী কিচেনেই ছিলো। নীল রঙের একটা মনিপুরী শাড়ি জরিয়েছে সে তার অঙ্গে, আঁচলটাকে গুছিয়ে কোমরে গুজেছে। চুলের খোঁপা আলগা হয়ে খুলে পরতে চাইছে। সে অনুসন্ধানী দৃষ্টি মেলে এদিক ওদিক কিছু একটা খুঁজছে।
রাওনাফের উপস্থিতি তখনও টের পায়নি সে। রাওনাফ কয়েক পলকেই উর্বীকে আগাগোড়া পর্যবেক্ষন করে ইন্ডাকশনে কফির পানি বসায়।
উর্বী চকিতে ফিরে চায়। দুকদম এগিয়ে গিয়ে বলে,"আমি করে দিচ্ছি!"
উর্বীর কথার জবাবে রাওনাফ একটা অমায়িক হাসি ফিরিয়ে দেয়। পর পর বলে,"থ্যাংক ইউ! পারবো!"
উর্বী মানুষটাকে দেখে। সারাটাদিন কতটা খেটে আসে মানুষ টা,অথচ বাড়িতে ফিরলেই চোখ মুখ থেকে ক্লান্তি সরিয়ে সবাইকে ফিরিয়ে দেয় আন্তরিকতা।
উর্বী কফির ক্যান রাওনাফের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,"ফিরলেন কখন?"
_মাত্রই! ফ্রেশ হয়ে নিচে এলাম!
_আজ মায়ের সাথে কথা হলো। কেমন অসুস্থ লাগছিলো কথা শুনে।
_হ্যা। হাটুর ব্যথার ওষুধ নেয়নি পর পর দু বেলা।
রাওনাফ ফুটন্ত গরম পানি নামিয়ে নিয়ে উর্বীকে বলে,"তুমি খাবে কফি!"
উর্বী মাথা নেড়ে বলে,"না।"
নিজের বানানো কফি খেয়ে রাওনাফ মুখ বিকৃত করে,বলে ওঠে,"সবকিছু সবাইকে দিয়ে হয়না বুঝলে। এই হাত শুধু সার্জি'ক্যাল নাইফ দিয়ে মানবদেহের চামরা কাটার জন্য...."
_থামবেন আপনি!
রাওনাফকে কথাটা সম্পূর্ণ করতে না দিয়ে উর্বী কান চেপে ধরে। তারপর বলে,"ঐ হাতের অনেক মহিমা। ঐ হাত সবকিছু শুদ্ধ করে,আগলে রাখে সবকিছু,যত্নে।"
রাওনাফ হাসে। উর্বীর কপালের রেখা মিলিয়ে যায় মানুষটার সেই হাসি দেখে। কিছুক্ষণ দেখে অস্ফুট স্বরে বলে,"আমার বাচ্চাদের হ্যান্ডসাম পাপা!"
রাওনাফ কফির মগ রেখে উর্বীর দিকে এগিয়ে আসে। দূরত্ব কমাতেই উর্বী টের পায় তার কোমরে রাওনাফের উষ্ণ হাত, পেঁচিয়ে ধরেছে তার কোমর। দূরত্ব সবটুকু ঘুচে যায়, উর্বীর হাত দু'টো রাওনাফের বুকে ঠেকিয়ে রাখে। রাওনাফ মাথাটা কিছুটা ঝুঁকিয়ে উর্বীর কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে,"এবার দেখো। তোমার বাচ্চাদের চুয়াল্লিশ বছরের বুড়ো পাপা!"
উর্বী হেসে ফেলে। তারপর বলে,"আমার বাচ্চাদের চুয়াল্লিশ বছরের বুড়ো ড্যাশিং হ্যান্ডসাম পাপা।"
রাওনাফ হেসে উর্বীকে ছাড়ে। হাতে তুলে নেয় কফির মগ। উর্বী ব্যস্ত হয়ে পরে তার কাজে। কফি শেষ করে রাওনাফ বলে,"সব গুছিয়ে নিয়েছে মেয়েরা?"
_হু। নিয়েছে। বিকেলেই। শুনুন না,মা হজ্ব করে ফিরলেই কিন্তু আমরা আরেকটা ট্যুর দেবো।
রাওনাফ মুখে কিছু বললো না, শুধু ঘা'ড় কাত করলো। পর পর বলে ওঠে,"নাবিল কিছু জানিয়েছে?"
_আমি শায়মীকে পাঠিয়েছিলাম। বললো যাবে না। আপনি একটু শেষ বারের মতো গিয়ে দেখুন না! ওকে ছাড়া কি আমাদের ভালো লাগবে বলুন!
_ও ফিরেছে?
_না এখনও। গিয়ে দেখুন। আমি খাবার গরম করে আসছি!
★
পাঁচ মিনিটের জন্য শর্মী সদয় হয়েছিলো। রাহাকে শায়মীর কোলে দিয়েছিলো। কিন্তু পাঁচ মিনিট অতিবাহিত হতেই পুনরায় রাহার দখলদারিত্ব ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছে শর্মী। ফের দুবোন টানাটানি শুরু করে দিয়ে ছোট্টো,নরম, তুলতুলে,বাবা-মায়ের রূপ, সৌন্দর্য একসাথে পাওয়া পুতুলের মতো দেখতে রাহাকে নিয়ে।
রাহা কোনো শব্দ করছে না। কিন্তু তার মুখভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে এবার সে কেঁ'দে ফেলবে, সে শায়মীর কুর্তীর গলার কাছের ফিতা ধরে রেখেছে। অতটুকু শরীরে এতো ঝাঁকি নেওয়া যায়? অতটুকু মন কি এতো আদর নিতে পারে? বিরক্তিতে ঠোঁট উল্টে ফেলে,চোখ ছলো ছলো,মাঝারি সাইজের টমেটোর মতো গাল দুটো লাল লাল টমেটো হয়ে গিয়েছে।
টানাটানির একপর্যায়ে অসাবধানতাবশত শায়মীর হাত ফসকে রাহা পরে নিতে গেলে বিকট শব্দে দুই বোন চিৎকার দিয়ে ওঠে। রাওনাফ পায়ের গতি বাড়িয়ে ছুটে আসে কিচেন থেকে।
মুহূর্ত কে'টে যায়। শর্মী আতঙ্কে মুখ ঢেকে রেখেছে,তার শরীরটা একটু একটু করে কাঁপছে, কাঁপছে শায়মীও,চোখ তার ঝাপসা হয়ে এলো প্রায়। বুকে হাত চেপে ধরে সে নাবিলের দিকে তাকায়।
রাহাকে আগলে নিয়ে নাবিল রাহার মাথাটাকে বুকের সাথে চে'পে ধরে শায়মীর দিকে অগ্নিদৃষ্টি দেয়।
শায়মী ভাইয়ের চাহনি দেখে থিতিয়ে যায়,পর পর সে টের পায় তার কান গরম হয়ে উঠেছে।
নাবিলের দানবের মতো একটা হাতের পাঁচটা আঙুল তার কানে সপাটে এক চ'ড় কষিয়েছে কয়েক মুহূর্ত আগে।
শর্মী দ্বিতীয় দফায় চিৎকার দিয়ে নিজের কান চেপে ধরে। সে শতভাগ নিশ্চিত নাবিলের পরের নিশানা তার কান। তার কান ফাটাবে নাবিল।
শায়মীর কান ঝিমঝিম করছে। রাওনাফ এসে দাঁড়ায়। সে একে একে তার চার ছানার মুখের দিকে তাকায়। রাহা পাপাকে দেখে,"পাপাপাপাপাপা" করছে, শর্মী কান চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে,শায়মী নাবিলের দিকে তাকিয়ে আছে আর নাবিল শায়মীর দিকে। পরপর বোনের ওপর চেঁ'চি'য়ে ওঠে সে,"আহাম্মক কোথাকার। যদি ফের দেখি ওকে তোরা কোলে নিয়েছিস তাহলে কানের পর্দা পুরোপুরি ফাটিয়ে দেবো। আহাম্মকের দল। পরে গেলে কি হতো? স্টুপিড দু'টো!"
দশ বারো ধরনের ইংলিশ গালাগাল পর পর শুনিয়ে নাবিল রাহাকে কোলে নিয়ে স্থান ত্যাগ করে।
শর্মী কান থেকে হাত সরিয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয়, বিড়বিড় করে বলে,"থ্যাংকস আল্লাহ! আমার কান রক্ষা করেছো!"
শায়মী ক'ট'ম'ট করে বোনের দিকে তাকায়। তারপর সপাটে এক চ'ড় বসিয়ে দেয় শর্মীর কানে।
রাওনাফ হতভম্ব হয়ে দেখতে থাকে তার মেয়েদের। শর্মীর ঠোঁট কাঁপছে,সে ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকে রাখে। শায়মী ঘুরে তার পাপার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"ঐ নাবিল আমার থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের বড় পাপা। কিন্তু ও সবসময় বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করে। ওকে কেন তুমি কিছু বলো না! দেখো আমার কান দেখো! কি অবস্থা করেছে!"
রাওনাফ মেয়ের কাছে এগিয়ে আসে মেয়েকে কিছু বোঝাতে যাবে তাই কিন্তু শায়মী পাত্তা না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠে নাবিলকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে,"খুব তো আহ্লাদ দেখাতে ছাড়িস না,কিন্তু বোনুর ডায়াপার চেঞ্জ করতে কেনো আমাকে ডাকিস? তখন তোর ভালোবাসা কই যায়?"
নাবিলের ঘরের চাপানো দরজার ওপাশ থেকে পাল্টা জবাব আসে,"আর বলবো না। এরপর থেকে আমিই চেঞ্জ করবো। যা ভাগ!"
শায়মী গটগট করে দোতলার উঠে যায়। শর্মী পাপার দিকে একপলক তাকিয়ে ধীরপায়ে হেঁটে দোতলায় ওঠে।
রাওনাফ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, পরপর আনমনেই হেসে ফেলে। জীবন সত্যিই ভীষণ সুন্দর,যদি জীবনে এমন চমৎকার কিছু ফুল থাকে!
উর্বী শাড়ির আঁচলে হাত মুছতে মুছতে লিভিং রুমে এসে দাঁড়ায়। আশেপাশে তাকিয়ে রাওনাফকে বলে,"ওমা! এক্ষুনি না এখান থেকে চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেলাম।"
রাওনাফ হেসে বলে,"হু। একটা বিরাট বড় ঘূর্ণিঝড় বয়ে গিয়েছে এখানে। এখন পরিবেশ শান্ত।"
★★★
রাহা হামাগুড়ি দিতে শিখেছে চারমাস হলো,তার কাজই হলো কোথাও ছেড়ে দিলে হামাগুড়ি দেওয়া। কিন্তু তাকে কেউ কোল থেকেই নামাতে চায়না। একমাস হলো রাহা একা একাই কোনো কিছু ধরে দাঁড়াতে পারে,তবে হাঁটতে এখনও শেখেনি। স্বাস্থ্য কিছুটা ভারী হওয়ায় সাপোর্ট থেকে হাত সরিয়ে দিলেই দুম করে বসে পরে।
নাবিল কখনোই বোনকে কোলে নিয়ে চেপে ধরে রেখে বিরক্ত করে না শর্মী শায়মীর মতো। তার কাজ হচ্ছে রাহাকে বিছানার ওপর ছেড়ে দিয়ে পাশে বসে তার কান্ডকারখানা দেখা।
সারাদিনে বাড়িতে ছিলো না নাবিল। সবে মাত্র এলো বাড়িতে। বোনকে বিছানায় বসিয়ে বলতে থাকে,"দু মিনিট লাগবে আমার শার্ট পাল্টাতে, দুমিনিট এখানে চুপ করে বসে "দাদাদাদাদা" করবি। যদি বেডের কিনারায় গিয়েছিস তো তোরও কান ফাটাবো চ'ড় মে'রে।"
রাহা কিছু না বুঝে দাদানের দিকে তাকিয়ে হাসে। তার দু'টো কি তিনটে দাঁত উঠেছে। যা তার কিউটনেস দশগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে । নাবিলের মন প্রশান্তিতে ভরে যায় বোনের ঐ হাসি দেখলে। তার মতে পৃথিবীতে এর থেকে সুন্দর কিছু সে দেখেনি।
বোনকে বিছানায় রেখে সে উঠে দাঁড়ায়, পরক্ষনেই ঘুরে বোনের দিকে তাকায়। একে বিশ্বাস নেই,দেখা যাবে বিছানা থেকে পরে গিয়েছে। নাবিল ফোন টা উঠিয়ে ওয়াইফাই কানেক্ট করে ইউটিউব থেকে কোকোমেলনের "বেবি শার্ক" গানটা ছে'ড়ে রাহার সামনে রাখে ফোনটা। রাহা এই গানটা ভীষণ পছন্দ করে, মিউজিকের তালে তালে শরীর দোলায়। নাবিল খেয়াল করেছে।
রাহা ফোন দেখছে তার টানাটানা চোখদুটো বড় বড় করে। হাত বাড়িয়ে আবার স্ক্রিনের শার্ক টাকে ধরতে চাইছে।
নাবিল নিজের পোশাক পাল্টে ওয়াশ রুমের দরজা খোলা রেখেই মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে বেরিয়ে এসে তোয়ালে খুঁজতে থাকে। আপাতত একটা ট্রাউজার পরে আছে সে,গা খালি।
সে হাত মুখ মুছে নিতে ব্যস্ত থাকায় খেয়ালও করলো না তার আদরের বোন তার ফোনের সাথে কি করছে।
রাহা এলোপাথাড়ি ফোনের স্ক্রিন টাচ করছে। তার হাতের ছোঁয়া লেগে নাবিলের মেসেঞ্জার ওপেন হয়। এবং খুবই কাকতালীয়ভাবে নাবিলের চ্যাটলিস্টের প্রথম ব্যক্তির কাছে ভিডিও কল চলে যায়।
রাহা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ফোনের দিকে। ফাবিয়া কলটা রিসিভ করে অবাক হয়ে যায়। নাবিলের ফোনটা যে পয়েন্টে রাখা সেই পয়েন্ট থেকে ফ্রন্ট ক্যামেরাতে শুধু রাহার নাকের উপরিভাগ দেখা যাচ্ছে, ফাবিয়া কয়েক সেকেন্ড রাহার টানাটানা চোখ,চুলের ঝুঁটি দেখে আদুরে গলায় বলে ওঠে,"হেই! হু আর ইউ কিউটি!"
নাবিল বুঝতে পারে অঘটন একটা ঘটেছে। সে ছুটে গিয়ে রাহার সামনে থেকে ফোনটা উঠিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই হতভম্ব হয়ে যায়।
ফাবিয়া আর নাবিল একে অপরের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। নাবিলকে ওভাবে খালি গায়ে দেখে ফাবিয়া তার চোখ নামিয়ে নেয়। নাবিলের সেদিকে খেয়াল নেই। সে তোতলাতে তোতলাতে বলে ওঠে,"রাহা...রা রা রাহা!"
ফাবিয়া চোখ তুলে তাকায় না। শুধু নিচুস্বরে বলে,"আমি ভেবেছি তুমি। বাই দ্য ওয়ে সি ইজ ঠু মাচ কিউট। ছবিটে এতোটা ফুটে ওঠে না।"
নাবিল তখনও খেয়াল করেনি সে খালি গায়ে। সে ফাবিয়ার দিকে তাকিয়ে লাজুক হাসি হাসে। পরমুহূর্তেই স্ক্রিনে নিজেকে দেখে চোখ কপালে তুলে "ওহহ শীট!!!" বলে ফোনটাকে বিছানায় ছুড়ে ফেলে।
ফাবিয়া ওপাশ থেকে বলতে থাকে,"হোয়াট হ্যাপেন্ড! নাবিল।"
নাবিল তড়িৎবেগে একটা টি-শার্ট চাপিয়ে নিয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,"আজ মানসম্মানের ফালুদা করেই ছাড়লি!"
ওপাশে ফাবিয়া শুনতে পায় নাবিলের কথা,সে হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে।
টিশার্ট পরে নাবিল ফোনটা হাতে তুলে পুনরায় তোতলাতে তোতলাতে বলে,"ফাবিয়া আ আ আ'ম সরি! আমি আসলে বুঝে পারিনি আ'ম সরি"
_ওকে ওকে। ইটস ওকে। নেভার মাইন্ড!
নাবিলের চোখে মুখে ছেয়ে আছে অস্বস্তি। ফাবিয়া অস্বস্তি কাটাতে বলে,"রাহাকে দেখাও। ভালো করে।"
নাবিল মাথা নে'ড়ে বোনকে উল্টে পাল্টে দেখাতে থাকে। বোনের কটা দাঁত উঠেছে সব ফাবিয়াকে গুনে গুনে দেখায়। ওপাশ থেকে ফাবিয়া এক একটা প্রশংসাসূচক শব্দ বের করে বিপরীতে।
নাবিল ফোনটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। ফাবিয়া বলে ওঠে,"ও এত্তো কিউট আল্লাহ। অবশ্য হবে নাই বা কেনো। আংকেল মাশাআল্লাহ,আন্টি কিউট, দাদী কিউট, শর্মী কিউট, শায়মী কিউট আর তুমি...!"
থেমে যায় ফাবিয়া। লজ্জায় লাল লাল হয়ে গিয়েছে তার গাল দু'টো। ঠিক একই অবস্থা নাবিলের। কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না সে। ফাবিয়া দম নিয়ে বলে,"তোমরা সবাই কিউট। তাই রাহাও কিউট।"
নাবিলের খুব মন চাইলো বলতে ফাবিয়াও ভীষণ সুন্দর,কিন্তু পারলো না,আটকে গেলো,কিছু একটা আটকে দিলো তাকে, বরাবর যেটা আটকায়,যার কারণে বন্ধুত্ব থেকে সম্পর্ক অন্যদিকে ঘোরানো হয়ে ওঠেনি নাবিলের।
"নাবিল!"
পাপার ডাক শুনে নাবিল হকচকিয়ে ওঠে। ব্যস্ত হয়ে ফাবিয়াকে বলে,"পাপা এসেছে! আই উইল টেক্সট ইউ লেটার।"
রাওনাফ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকেই নাবিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর বলে,"ব্লাশ করছো কেনো এভাবে!"
নাবিল আমতা আমতা করে বলে ওঠে,"গরমে।"
_ওহ।
একশব্দে বলে রাওনাফ নাবিলের বিছানায় বসে রাহাকে কোলে তুলে নেয়। সারাদিন পরে পাপার কোল পেয়ে রাহা আকরে ধরে পাপাকে।
নাবিল বলে,"কিছু বলবে!"
রাহার ঝুটি ঠিক করে দিতে দিতে রাওনাফ বলে,"ব্যাগ গুছিয়ে নাও। কাল তুমি আমাদের সাথে যাচ্ছো।"
নাবিল নিশ্চুপ। রাওনাফ বলে,"জেদ করো না।"
নাবিল বলে ওঠে,"ইচ্ছে করছে না পাপা। তোমরা যাও না!"
_তোমার আন্টির জন্য যাচ্ছো না? ইয়াং জেন্টেলম্যান! আমি তো জানি আমার ছেলে বড় হয়েছে!
_তেমনটা নয় পাপা। ওনাকে নিয়ে আমার সমস্যা নেই। আমি শুধু। আমি শুধু! পাপা তোমার মনে পরে ছোটোবেলায় তুমি আমাদের নিয়ে গিয়েছিলে,তখন আমাদের সাথে মাম্মা ছিলো। সেই একই যায়গায় আমরা সবাই আবার যাচ্ছি। ওখানে গেলে মাম্মাকে ভীষণ ভাবে মিস করবো ব্যস! পাপা আই থিংক তুমি আমাকে বুঝবে!
রাওনাফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে,নাবিলও চুপ। শুধু রাহা "পাপাপাপাপাপা" করছে।
কিছুটা সময় নিয়ে রাওনাফ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"তোমার মাম্মাকে আমি, শর্মী, শায়মীও খুব মিস করবো নাবিল।"
রাওনাফ কথাটা বলে কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে বলে,"উর্বী কিন্তু তোমার কাছে বরাবর আন্টির জায়গাটাই চেয়ে এসেছে বাবা। ও আমাকে সবসময় বলে ওর খুব ইচ্ছে শর্মী ওকে মা ডাকুক কিন্তু ও এই কথাটা শর্মীকে কখনও বলেনি,ইনফ্যাক্ট তোমার দাদু শর্মীকে জোর করলেও ও বিরোধীতা করে। কারন ও চায় তোমরা সবাই তোমাদের মতো করে ওকে গ্রহণ করো। কিছু একটা ডাকো,শুধু ডাকটাতে যেন অধিকার মিশে থাকে। তুমি একটা অধিকার দিয়েই দেখো। নাবিলের মনে অনেক যায়গা আমার জানামতে।"
নাবিল নিশ্চুপ। রাওনাফ বলতে থাকে,"উর্বী পাঠিয়েছে আমাকে। যদি যাও তবে উর্বী ধরে নেবে তুমি তাকে কিছু একটা অধিকার দিয়েছো। আর যদি না যাও সেক্ষেত্রে ইটস ওকে বেটা। টেইক ইয়র টাইম!"
কথা শেষ করে রাওনাফ রাহাকে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। নাবিল বোনের হাত টেনে ধরে। রাওনাফ ঘুরে তাকায়। নাবিল এগিয়ে গিয়ে রাহাকে গুডনাইট পাপ্পি দেয়। তারপর অভ্যাসমতো বোনের হাত নিয়ে নিজের গালে বুলায়।
রাওনাফ ছেলে মেয়ের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে। রক্তের সম্পর্কে সৎ বলে কিছুই হয়না। যার উদাহরণ তার সেদিনের পুঁচকে নাবিল আর তার প্রানপ্রিয় বোন রাহামনি।
★★★
সন্তর্পনে ঘুমন্ত রাহাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে উর্বীর দিকে তাকায় রাওনাফ। উর্বী ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে চুলে চিরুনি বসিয়ে গুনগুন করে গান গাইছে, হাতে পায়ে লোশন মাখছে।
রাওনাফ বিছানায় বসে উর্বীর কান্ডকারখানা দেখছে। মস্তিস্কে তার জট লেগেছে কিছুক্ষণ আগে, সেগুলো ছাড়াতে ব্যস্ত রাওনাফ করীম। উর্বীর দিকে ঝুঁকে যাওয়াটাকে মৃত শিমালার প্রতি অসম্মান কিংবা শিমালার স্মৃতিকে অসম্মান করার গ্লানি নিয়ে উর্বীর সাথে সংসার করাটা স্রেফ সমঝোতা, এই স্নায়ুযুদ্ধে বরাবর রাওনাফ ক্ষতবিক্ষত হলেও শেষে চোখ মেলে যখন ঐ রমনীকে দেখে তখন রাওনাফ একটা জিনিসই দেখতে পায়। সে ভালো আছে।
শিমালার মতো জীবন সঙ্গী, বাচ্চারা কিংবা উর্বীর মতো জীবনসঙ্গী,বাচ্চারা সবটাই তার ভালো থাকার কারণ। কাকে অসম্মান করলো,কার সাথে সমঝোতা করলো এতো যুক্তিতর্কে রাওনাফ জড়াতে চায়না। সে একটু ভালো থাকতে চায়,যতটা ভালো থাকলে অন্যদের ভালো রাখা যায়।
উর্বী মাথা ঘুরিয়ে রাওনাফের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, বিনিময়ে রাওনাফ নির্মল হাসি ফিরিয়ে দেয়। অথচ ঐ রমনী টেরও পায়নি রাওনাফের মস্তিস্কে এই মাত্র একটা যুদ্ধ শেষ হয়ে জয়ী হয়েছে রাওনাফ, ভীষণ ক্লান্ত তার স্নায়ু! নামাজ আদায় করতে হবে।
উর্বী উঠে মেয়ের পাশে গিয়ে শুয়ে পরে। রাতে উর্বী সুতি কাপড়ের নাইটি পরে শোয়,এতে রাতে মেয়েকে বারবার উঠে দুধ পান করাতে সুবিধা হয়।
ঘুমের চোটে বারবার হাই তুলছে সে। রাওনাফ মা-মেয়ের গায়ে চাদর টেনে দিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে ওযু সেরে নামাজে দাড়ায়।
রাত তখন সাড়ে বারোটার বেশি। মোনাজাত শেষ করে জায়নামাজ যথাস্থানে রেখে রাওনাফ বিছানার কাছে যায়।
ঘুমন্ত উর্বী আর রাহাকে দেখে নিজের অজান্তেই সে মনে মনে বলে ওঠে,"মাশাআল্লাহ।"
মা মেয়ে দুজনই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। উর্বীকে মাঝখানে রেখে রাওনাফ উর্বীর পাশে শুয়ে পরে। একটু কাছে ঘেঁষতেই ঘুমের মধ্যে উর্বী রাওনাফকে আকরে ধরে। উর্বীর ভারী নিঃশ্বাস আছরে পরছে তার গায়ে, আন্দোলিত হচ্ছে তার রোমকূপ। হাত দিয়ে উর্বীর এলোমেলো হয়ে যাওয়া চুল সরিয়ে দিয়ে রাওনাফ তাকিয়ে থাকে তার মুখের দিকে,মনে মনে বলে ওঠে,"জীবন যেখানে যেমন,জীবন সুন্দর। আলহামদুলিল্লাহ।"
চলমান......
[ ২য় অংশ পোস্ট করা হয়েছে। লিংক কমেন্ট বক্সে পেয়ে যাবেন।]#আরেকটি_বার
#সারপ্রাইজ_পর্ব [ অন্তিম পর্বের পর থেকে]
#শিরোনাম_জীবন_যেখানে_যেমন
#Esrat_Ety
[২য় অংশ]
অন্যসময়ে শর্মীকে বো*মা মেরেও ভোর চারটার সময়ে ঘুম থেকে তুলতে পারতো না কেউ কিন্তু আজ ট্যুরে যাওয়ার উত্তেজনায় তার মস্তিস্ক এতোটাই উদ্বেলিত ছিলো যে সারারাত এক ফোঁটাও ঘুম আসেনি চোখে। বালিশে মাথা রেখে সারারাত ছ'ট'ফ'ট করেছে কখন চারটা বাজবে।
ঘড়ির কাঁটা চারটার ঘরে পৌঁছাতেই শর্মী ধরফরিয়ে উঠে বসে। শায়মী তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তাকে একপ্রকার ধাক্কা মেরে ডাকতে থাকে। শায়মী ঘুরে ওপাশ ফিরে শুয়ে পরে। শর্মী তখন চেঁ'চি'য়ে ওঠে,"প্লেন চলে গেলো আপু আমাদের রেখে!"
★★★
"রাহার লাল জুতো নিয়েছো?"
_হু।
_গরম কাপড়?
উর্বী ব্যাগ চেক করছিলো,মাথা তুলে রাওনাফের দিকে তাকিয়ে বলে,"গরম ঠান্ডা নরমাল সব কাপড় নিয়েছি। এখন আপনি আমাকে কনফিউজ করবেন না শর্মীর পাপা। আমি সব গুলিয়ে ফেলছি।"
রাওনাফ হেসে রাহাকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। রাহামনি তার দাদান আপ্পিদের মতো অলস নয়,সে রোজ তার পাপার সাথে ফজরের ওয়াক্তে জেগে যায়। রাহা আসার পর থেকে উর্বীর ফজরের নামাজের পরে আর ঘুমিয়ে থাকা হয়না।
উর্বী তাড়াহুড়ো লাগিয়ে সব চেক করে নিয়ে আলমারি থেকে রাওনাফের একটা হোয়াইট শার্ট বের করে। সে এটাও ব্যাগে ভরে নেয়। হোয়াইট শার্টে মানুষটাকে ভীষণ মানায়। সাদা মানুষ,সাদা রঙে।
রাওনাফ রাহাকে নিয়ে ঘরময় পায়চারী করছিলো,উর্বী বলে,"আচ্ছা আব্দুল ভাইযে ছুটিতে,আমরা গাড়ি নিয়ে যাবো কিভাবে এয়ারপোর্ট?"
_উবার বুক করেছি।
"ওওও।"
উর্বী উঠে দাঁড়ায়। রাওনাফ বলে,"তাড়াহুড়ো করছো কেন এতো? ধীরে সুস্থে!"
_করবো না? সবার জন্য কিছু একটা তৈরি করতে হবে যে। খেয়ে না সবাই বেরোবে!
_এয়ারপোর্টে খেয়ে নেবে সবাই। তুমি মেয়ে দুটোকে তাড়া দাও গিয়ে,যাও।
উর্বী ঘুরে দাঁড়ায়। রাওনাফের দিকে তাকিয়ে বলে,"আর নাবিল!"
রাওনাফ সেকথার জবাব না দিয়ে বলে,"ওদের দুবোনের ব্যাগ চেক করো। যাও।"
★★★
শর্মী আর শায়মী দু'জনে আজ ম্যাচিং ড্রেস পরেছে। লাল কালোর সংমিশ্রণে ফ্লোরার প্রিন্টের গাউনে রাওনাফ করীমের সুন্দরী কিশোরী কন্যা দুটিকে অপূর্ব লাগছে।
শর্মী নিজেকে আয়নায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে, ঠোঁটে কোন লিপস্টিক টা দেবে সে সেটা নিয়ে কনফিউজড।
"এটা তুই কি নিয়েছিস শর্মী!"
শায়মীর ডাকে শর্মী ঘুরে তাকায়। শায়মী শর্মীর ব্যাগ থেকে একটা ক্রপ টপ বের করে অবাক হয়ে বলে।
শর্মী বলে,"ওটা আমি স্কার্টের সাথে পরে ফটোশুট করবো বীচে,পাপার থেকে পারমিশন নিয়েছি।"
_পাপা পারমিশন দিলো?
_দিলো তো,আন্টিও দিলো।
_নাবিল দিলো?
শর্মীর মুখটা মলিন হয়ে যায় সাথে সাথে। শায়মী বলতে থাকে,"পাপা কিছু না বললেও নাবিল তোর কান ফাটাবে। এসব বাদ দে।"
_কিন্তু ভাইয়া তো যাচ্ছে না।
_না গেলেও বা,ছবি দেখে ফেলবে না?
শর্মীর মনটা খারাপ হয়ে যায়,পর পর বলে,"কিন্তু ফাবিয়া আপু তো সবসময় এসব পরে। তখন তো ভাইয়া কিছু বলতে পারে না। উল্টো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকে।"
শায়মী মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,"ফাবিয়া আপুকে বলবে তার ভাই। তোকে যেমন তোর ভাই বলে। এখন আমার মাথা খাস না, ভালোয় ভালোয় বলছি এসব ড্রেস নিস না, পরে নাবিল ক্ষে'পলে তার হাত থেকে আমি বাঁচাতে পারবো না তোকে বলে দিলাম। আর আয়নার সামনে থেকে সর,আমি সাজবো।"
★★★
সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে আবারও রীতিমতো দুবোন রাহাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে। রাহাকে একটা বেবি পিংক কালারের বার্বি ড্রেস পরানো হয়েছে,পায়ে বেবি পিংক কালারের জুতো। তাকে বরাবরের মতো কিউটের ডিব্বা লাগছে।
দুবোন গতকালের চ'ড়ের কথা ভুলে আবারও ধস্তাধস্তি করছে রাহাকে নিয়ে।
রাওনাফ এবার রীতিমতো বিরক্ত। সে ওপর থেকে সবার ব্যাগ নামাতে নামাতে বলে,"এবার থামবে দুজন?"
পাপার ধ'ম'ক যেনো তাদের গায়েই লাগেনি। তারা ব্যস্ত তাদের কলিজার টুকরো বোনের দখলদারিত্ব পেতে।
উর্বী আমীরুনকে সব বুঝিয়ে দিচ্ছে। তার পরনে গোলাপী সাদার সংমিশ্রণে একটা কাঞ্চিপুরম শাড়ি। রাওনাফ অফ হোয়াইট শার্ট আর ধূসর রঙের ফরমাল স্যুট পরেছে।
সবকিছু গুছিয়ে সবাই লিভিং রুমের মাঝখানটায় এসে দাঁড়ায়। উর্বী আমীরুনের হাতে চাবি দিয়ে নাবিলের ঘরের দিকে তাকায়। নাবিলের ঘরের বাতি জ্বলছে, উর্বীর মনটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে যায়, ছেলেটাকে এতো করে রিকোয়েস্ট করলো সবাইকে দিয়ে,ছেলেটার মনটা একটুও নরম হলো না!
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উর্বী দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখের কোণে পানি জমেছে। হঠাৎ কাঁধের ওপর রাওনাফ হাত রাখতেই উর্বী চকিতে ঘুরে তাকায়। রাওনাফ নিচু স্বরে বলে,"চলো। গাড়ি এসে গিয়েছে।"
মাইক্রোবাসের পেছনের সাড়ির সিটে শর্মী আর শায়মী রাহাকে নিয়ে বসেছে। ব্যাগ গুলো ডিকিতে রেখে রাওনাফ উঠে মাইক্রোবাসে মাঝের সাড়ির সিটে উর্বীর পাশে বসে। ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে না দেখে শর্মী রাওনাফকে বলে,"কি হলো পাপা। আমরা তো সবাই এসে গিয়েছি।"
রাওনাফ হেঁসে বলে,"একজন বাকি আছে। ওদিকে তাকাও।"
শর্মী শায়মী উর্বী মাথা ঘুরিয়ে গাড়ির জানালা দিয়ে তাকায়। নাবিল লম্বা লম্বা পা ফেলে কাঁধে ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে আসছে। তার পরনে সাদা টি-শার্টের ওপরে নেভি-ব্লু শার্ট,ব্ল্যাক জিন্স এবং ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট কেজুয়াল স্কিকারস। চুল গুলো সেট করা। সানগ্লাস টা গলার কাছে ঝুলিয়ে রেখেছে।
শর্মী শায়মী অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। উর্বী তো একবার রাওনাফের দিকে তাকায়, একবার নাবিলের দিকে। রাওনাফ হাসি হাসি মুখ করে বলে,"ছেলেটা মারাত্মক সুদর্শন হচ্ছে তাই না?"
উর্বী অজান্তেই মাথা নাড়ে। নাবিল গাড়ির কাছে এসে হাপাচ্ছে । একপ্রকার ছুটতে ছুটতে এসেছে সে। জানালার ভেতরে সরাসরি রাওনাফের দিকে তাকিয়ে বলে,"গাড়িতে যায়গা হবে?"
রাওনাফ হেসে মাথা নাড়ায়। নাবিল বলে,"আমাকে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত নিয়ে যাও পাপা। তোমাদের পরের ফ্লাইটে আমি আসবো।"
_তার দরকার নেই বেটা।
নাবিল অবাক হয়ে বলে,"দরকার নেই মানে?"
_মানে তোমার জন্যও টিকিট বুক করেছি আমি। আমি জানতাম তুমি আসবে।
নাবিল পাপার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে পেছনের সাড়ির সিটে শর্মীর পাশে বসে পরে। উঠেই সে শর্মীর কোল থেকে রাহাকে ছিনিয়ে নিয়ে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়।
রাওনাফ আর উর্বী দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে, উর্বীর আনন্দ উর্বী প্রকাশ করতে পারছে না। সে শুধু রাওনাফের হাতের ওপর একটা হাত রেখে দেয়। রাওনাফ ম্লান হেসে ড্রাইভারকে গাড়ি স্টার্ট করতে বলে।
রাহা তার দাদানকে পেয়েই আহ্লাদে গদগদ হয়ে যায়। হাত দিয়ে নাবিলের মুখ,গাল স্লাইড করে যাচ্ছে।
নাবিল তার বোনকে চু'মু দিয়ে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,"এটা শুধু তোর আর আমার ট্রিপ বোনু। আর কাউকে আমরা আমাদের আনন্দের ভাগীদার করবো না। ঠিকাছে?"
★★★
কক্সবাজার পৌঁছেই আবারও উবার বুক করে খান পরিবার চলে যায় তাদের হোটেলে। এখানের নামি একটা পাঁচতারা হোটেলে মোট তিনটি কামরা বুক করা হয়েছে রাওনাফ করীম খানের নামে। সবাই মিলে ঠিক করে হোটেলে গিয়ে সবাই পোশাক পাল্টেই সমুদ্র স্নান করতে বেরোবে। এর আগে কিছু নাস্তা খেয়ে নেয় সবাই।
শর্মী শায়মী ভীষণ এক্সাইটেড হয়ে আছে সি-ফুড খাওয়ার জন্য। বিশেষ করে অক্টোপাস,এর আগে তারা ক্র্যাব,লবস্টার খেলেও এটা কখনো টেস্ট করেনি।
তিনশো চার,তিনশো পাঁচ,তিনশো ছয়।
পাশাপাশি তিনটা কামরা খান পরিবারের দখলে। তিনশো চারে শর্মী শায়মী, তিনশো পাঁচে রাওনাফ উর্বী, তিনশো ছয়ে নাবিল।
আপাতত নাবিলের সাথে রাহা আছে। কামরায় ঢুকেই নাবিল বোনের খসখসে বার্বি ড্রেস টা খুলে বোনকে বিছানায় হুটোপুটি করতে ছেড়ে দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে ঐ ড্রেসটা পরে থাকায় রাহার অসহ্য লাগছিলো। নাবিল তা বুঝতে পেরেছে। শুধুমাত্র ডায়াপার পরে রাহা নরম বিছানায় হামাগুড়ি দিচ্ছে। কখনও কখনও উঠে দাঁড়ায়, দুমিনিট দাঁড়িয়ে থেকে এক পা দু পা দিতেই ধপ করে পরে যায়।
নাবিল বোনকে কিছুক্ষণ দেখে,নিজে চেঞ্জ করে একটা টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে নেয়।
দরজায় তখন ঠকঠক আওয়াজ হয়। উর্বী দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। নাবিল দরজা খুলেই বলে,"কিছু বলবেন?"
_হ্যা,রাহার জামাটা...
_খুলে দিয়েছি, ওসব আর কখনও পরাবেন না ওকে, কয়েক ঘন্টায় গায়ে লাল লাল ছোপ ছোপ দাগ হয়েছে।
উর্বী লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে। তার হাতে একটা সুতির ফ্লোরার প্রিন্টের ফ্রক।
নাবিল দৃষ্টি ঘুরিয়ে উর্বীর হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,"দিন। আমি পরিয়ে দেবো।"
★★★
কিছুটা সময় বিশ্রাম নিয়ে সবাই সৈকতে যাবে বলে রওনা হয়। সবার পরনে মানানসই পোশাক। সমুদ্র স্নান করবে বলে সবাই ইনফরমাল বেশভূষায় বের হয়েছে, শর্মী শায়মী জিন্স আর লং শার্ট, রাওনাফ আকাশী রঙের পোলো শার্ট এবং ট্রাউজার, উর্বী একটা বেগুনি রঙের সুতি শাড়ি পরেছে।
রাহাকে নিয়ে নাবিল এখনও বের হয়নি কামরা থেকে। রাওনাফ গিয়ে দরজায় নক করতেই ওপাশ থেকে নাবিল বলে,"তোমরা যাও পাপা,আমি রাহা আর ক্যামেরা নিয়ে আসছি।"
এই হোটেলের নিজস্ব বীচ রয়েছে। নির্দিষ্ট এরিয়ায় সীমারেখা দেওয়া। খুব একটা ভিড় নেই, লোকজনই বলতে গেলে হাতে গোনা কয়েকজন। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত।
শায়মী আর শর্মী পাপাকে অনেক রিকোয়েস্ট করেছে তারা পাবলিক বীচে যেতে চায়। রাওনাফ রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে সবাই এখানেই নেমে পরে।
মেয়েরা আনন্দ করছে। রাওনাফ একটা কিটকট চেয়ারে বসে সেদিকে তাকিয়ে আছে। তার হাতে উর্বীর ব্যাগ,তাতে রাহার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র,পানির বোতল এবং সবার মোবাইল ফোন।
উর্বী একটু পা ভিজিয়েই ঘুরে রাওনাফের দিকে তাকায়। রাওনাফকে বসে থাকতে দেখে সে ধীরপায়ে হেঁটে তার কাছে এসে,পাশে বসে। রাওনাফ উর্বীর দিকে তাকিয়ে আন্তরিক হাসি হেসে স্বভাব মতো উর্বীর চুল কানে গুঁজে দেয়। উর্বী বলে,"সমুদ্রে নামবেন না?"
_তোমরা আনন্দ করো। আমি বরং দেখি!
উর্বী বলে,"দেখলেই হয়ে যাবে?"
রাওনাফ হাসে। বলে ওঠে,"নাবিল রাহাকে নিয়ে এখনও এলো না, দাঁড়াও একটা কল দিই।"
উর্বী বাঁধা দেয়,বলে,"ঘুমাচ্ছে বোধ হয়। ঘুমাক।"
_আজকের প্ল্যান কি তোমার? মেয়েদের নিয়ে কি কি প্ল্যান করে এলে একটু শুনি তো।
উর্বী হেসে বলে,"আজ জার্নি করে সবাই ক্লান্ত খুব। আজ শুধু সমুদ্র স্নান,বিকেলে সী ফুড খাওয়া আর সন্ধ্যার সূর্যাস্ত দেখা হবে। প্ল্যান তো কালকে থেকে শুরু হবে।"
রাওনাফ হেসে কিছু একটা বলতে যাবে তখনই উর্বী চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,বলে,"দেখুন না শর্মীর পাপা!"
রাওনাফ অবাক হয়ে ঘা'ড় ঘোরাতেই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে কয়েক মূহুর্ত। তারপর উঁচু গলায় শর্মী শায়মীকে ডাকে। শর্মী শায়মী পাপার ডাক শুনে এদিকে তাকাতেই থ'ম'কে যায়। তারপর একটা বিকট চিৎকার দিয়ে ছুটে আসে।
নাবিল হাসি হাসি মুখ করে সবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার এক হাতে ক্যামেরা,অন্যহাতে রাহাকে পেঁচিয়ে ধরেছে কোলে। রাহাকে সে ডিজনি প্রিন্সেস মোয়ানার কস্টিউম পরিয়ে এনেছে।
উর্বী আর রাওনাফ হা করে রাহার দিকে তাকিয়ে আছে। শর্মী আর শায়মী ছুটতে ছুটতে এসে হুমরি খেয়ে নাবিলের গায়ের ওপর পরে রাহাকে নিয়ে নেয়।
দু'জনে চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে,"মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ!"
শায়মী উত্তেজনা দমিয়ে রেখে বলে,"কখন করলি? কখন নিলি কস্টিউম টা।"
_নিয়েছিলাম অনলাইন থেকে, এক মাস পরে ওর বার্থ ডে তে পরিয়ে ফটোশশুট করবো বলে প্ল্যান ছিলো বাট যখন সমুদ্রেই এসেছি তখন ভাবলাম এখানেই প্রি-বার্থডে ফটোশুট করি।
তিন ভাইবোন রাহাকে নিয়ে আহ্লাদে মেতে উঠেছে। ক্যামেরা নিয়ে রাহাকে বীচে রেখে বিভিন্ন কায়দায় ফটোশুট করছে।
রাওনাফ আর উর্বী একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসছে।
প্রথম দফায় ছবি তুলে নাবিল বোনকে নিয়ে পা ভেজাতে নামে। তার পরিকল্পনা এখন রাহার চুল ভিজিয়ে দ্বিতীয় দফায় ভেজা চুলের মোয়ানাকে ক্যামেরাবন্দী করবে।
রাওনাফ ডেকে বলে,"বোনকে ঐ পানিতে ভিজিও না বাবা। মিনারেল ওয়াটার আছে। এখানে আসো।"
_কিচ্ছু হবে না পাপা। আমি আছি।
নাবিল চেঁ'চি'য়ে বলে।
"আমি আছি।"
বাক্যটা শুনে উর্বী একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মুগ্ধ নয়নে সে তাকিয়ে আছে রাওনাফ করীমের চমৎকার চার সন্তানের দিকে।
রাওনাফ পাশে তাকিয়ে দেখে উর্বীকে।
হঠাৎ করেই উর্বীর চোখ মুখের ভঙ্গি অন্যরকম হয়ে যায়। রাওনাফ কিছু বলতে যাবে তার আগেই উর্বী ছুটে হোটেলে চলে যায়। রাওনাফ মাথা ঘুরিয়ে নিজের বাচ্চাদের একপলক দেখে নিজেও হোটেলে যায়।
দীর্ঘসময় পরে উর্বী ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে দেখে রাওনাফ বিছানায় শুয়ে আছে। সে উর্বীর দিকে তাকিয়ে উঠে বসে বলে,"আর ইউ ওকে! ওভাবে ছুটে এসেছো কেনো!"
উর্বী উচ্ছসিত কন্ঠে বলে,"আই গট মাই পি'রি'য়ড!"
উর্বীর খুশি দেখে রাওনাফ হতভম্ব এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের হতবাক হয়ে যায়। এটা কোনো আনন্দের বিষয় একটা নারীর কাছে তা রাওনাফের জানা ছিলো না!
সে নিজের হতভম্ব ভাব কাটিয়ে বলে,"হ্যা তো নাচার কি হলো! তুমি সম্ভবত ট্যুরে আসার আনন্দে পাগল হয়ে গিয়েছো।"
উর্বী একপ্রকার নেচে উঠে বলে,"মোটেও না। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি।"
_কেন?
রাওনাফ হতভম্ব হয়েই বলে।
উর্বী লজ্জা পেয়ে যায়, নিচু স্বরে বলে,"গত কয়েকদিন ধরে....আই, আই থট আই ওয়াজ প্রেগনেন্ট শর্মীর পাপা!"
রাওনাফ উর্বীর কাঁচুমাচু মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। উর্বী গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলতে থাকে,"ভয়ে আপনাকে বলতে পারছিলাম না। আজ একটু স্বস্তি পেলাম।"
রাওনাফ ভীষণ অবাক এবং কৌতুহলী হয়ে উর্বীর মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,"ভয় পাওয়ার কি হলো! প্রেগনেন্ট হলেও বা! আমি কি তোমাকে বকা দিতাম?"
উর্বী ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"তা না। তবে রাহা কত ছোট আর ওরা অলরেডি চার ভাইবোন। তাই ব্যাপারটা কেমন হয়ে যায়। আমার আর দরকার নেই বেবির!"
রাওনাফ হেসে ফেলে। কিছুক্ষণ হেসে বলে,"ব্যাপারটা কেমন হয়ে যায়?"
_লোকে হাসবে!
_কেন হাসবে?
_এতোগুলো বেবি! আপনি একজন সচেতন মানুষ!
_তারা খাওয়াবে?
ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে রাওনাফ।
উর্বী মুখ তুলে রাওনাফের দিকে তাকায়। রাওনাফ বলতে থাকে,"তারা পালবে আমার বাচ্চাদের?"
উর্বী অস্বস্তি নিয়ে বলে,"ঠিক তা নয়।"
রাওনাফ গম্ভীর হয়ে বলে,"আমরা চাইলে আরো দু'টো বাচ্চা নেবো। রাহাকে নিয়ে ওদের তিন ভাইবোনের মধ্যে যু'দ্ধ লেগে যায়। আরো দুজন এলে বড় তিনজনের মাঝে ছোটো তিনজনকে ভাগ করে দেওয়া যাবে।"
উর্বী বোকার মতো রাওনাফের দিকে তাকিয়ে আছে। রাওনাফ চোখে মুখে কিছুক্ষণ গাম্ভীর্য বজায় রেখে হেসে ফেলে। তারপর বলে ওঠে,"খাও,দাও, সুস্থ থাকো। আর বেবির প্রয়োজন নেই আমার। ঘাবড়ানোর কিছু হয়নি। মজা করেছি। তবে উর্বী "লোক হাসবে" এই কথাটা আমার সামনে বলবে না। বাচ্চা নেবো কি নেবো না এটা একান্তই আমাদের দুজনের সিদ্ধান্ত,আমাদের দুজনের একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়। আমাদের লাইফ নিয়ে লোকের লেনাদেনা নেই। লোক কি বলছে,লোক এটা বলেছে,লোক ওটা বলবে এটা কখনো বলবে না। আমাদের আর বাচ্চার দরকার নেই তাই নিচ্ছিনা,লোক হাসবে বলে নিচ্ছি না এমন টা নয়। মনে থাকবে?"
উর্বী ঘা'ড় কাত করে। রাওনাফ বলে,"এই যা, আলোচনা খুবই সিরিয়াস হয়ে গেলো। যাই হোক। আমি আর বেবি নেবো না উর্বী, তার প্রধান দু'টো কারন,এক, তুমি ফিজিক্যালি ফিট নও। আর দুই, বাংলাদেশ সরকার আমার ডাক্তারি লাইসেন্স ক্যান্সেল করবে।"
রাওনাফের শেষের কথাটায় উর্বী মুখে শাড়ির আঁচল চে'পে হেসে ওঠে। রাওনাফ দেখতে থাকে উর্বীর সে হাসি। অতঃপর অস্ফুট স্বরে বলে,"এই হাসি দেখে মন ভরে যায়,তাই লোকের হাসাহাসি গায়ে লাগে না আর এখন,লোক হাসুক, বত্রিশ টা দাঁত বের করে হাসুক,হাসতে হাসতে ম'রে যাক!"
★★★
কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে উর্বী রাওনাফের সাথে আবারও বীচে ফিরে যায়।
নাবিল,শায়মী,শর্মী রাহাকে নিয়ে বীচে ছোটাছুটি করছিলো। দাদান,আপিদের কোলে রাহা হুটোপুটি করছে।
উর্বী আর রাওনাফ একটা নিড়িবিলি স্থান দেখে পাশাপাশি বসে পরে।
নাবিল রাহাকে কোলে করে তীরে ওঠে, একপাশে হাত পা ছড়িয়ে বসে বোনকেও ছেড়ে দেয়। রাহা ভেজা বালিতে হামাগুড়ি দিচ্ছে।
নাবিল তাকিয়ে দেখতে থাকে বোনকে। বোন দুহাতে বালি খামছে ধরছে। নাবিল বলে,"আয় আমরা ক্যাসল বানাই।"
বলেই নাবিল আধভেজা বালি খামছে খামছে জরো করতে থাকে,বোন তার কোলের কাছে। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে একটা প্রাসাদের মতো বানায়।
শর্মী শায়মী ক্লান্ত হয়ে রাওনাফ উর্বীর কাছে গিয়ে ধপ করে বসে পরে তাদের মতো,হাত পা ছড়িয়ে। দু'জনেই হাপাচ্ছে। উর্বী ব্যগ থেকে এনার্জি ড্রিংকস বের করে দু'জনকে দেয়।
দু বোন তাদের আন্টির দিকে তাকিয়ে অমায়িক একটা হাসি দিয়ে বোতল দু'টো নিয়ে নেয়।
বোতল খালি করে আবারও ছুটে যায় সমুদ্রের দিকে। উর্বী মুগ্ধ নয়নে সেদিকে তাকিয়ে আছে।
নাবিল বোনকে নিয়ে চমৎকার একটা ক্যাসল বানিয়ে ফেলেছে। রাহা সেখানে থাবা বসাতে গেলেই নাবিল তার বোনের ছোটো ছোটো হাত দুটো ধরে ফেলে। আদরের সহিত ধ'ম'ক দিয়ে বলে,"বোকা এটা আমাদের ক্যাসল। এখানে আমরা থাকবো। কে কে থাকবে জানতে চাস?"
রাহা জানতে চায় সম্ভবত,নয়তো মুখ থেকে "তাতাতাতা" বের করবে কেন?
নাবিল হেসে বলতে থাকে,"পাপা থাকবে, শর্মী আর শায়মী থাকবে, আর থাকবো তুই আর আমি।"
এটুকু বলে নাবিল থামে, তারপর বোনকে কোলে তুলে বলতে থাকে,"মন খারাপ করলি? মন খারাপ করিস না। তোর মাকেও রাখবো আমাদের ক্যাসলে। কারন সে খুব ভালো রান্না করে। আর......... মোটামুটি ভালো আন্টিও। তাই তাকে রাখা যায়।"
শেষের কথাটা বলে নাবিল হাসে বোনের দিকে তাকিয়ে। রাহাও হাসে তার দাদানের দিকে তাকিয়ে,তার তিন চারখানা দাত বের করে।
নাবিলের হঠাৎ ফোন বেজে ওঠে। পকেট থেকে ফোনটা বের করেই দেখে ফাবিয়ার নাম্বার। সে মুখ হাসি হাসি করে রাহার দিকে তাকিয়ে বলে,"ভালো কথা মনে পরেছে, এই ক্যাসলে আরো একজন থাকবে। নাম ফাবিয়া, তবে সে অনেক পরে আসবে বুঝলি? অনেক পরে আসবে।"
রাহা বুঝেছে,সে বলতে থাকে,"দাদাদাদাদাদা।"
★★★
ধীরে ধীরে রাওনাফ উর্বীর হাতের ওপরে একটা হাত রাখে। তাকিয়ে আছে উর্বীর মুখের দিকে। উর্বী স্বামীর দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলে,"কি দেখছেন?"
রাওনাফ একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলে,"দেখছিনা, অনুভব করছি।"
_কি?
_আমার জীবনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের দু'টো চমৎকার কক্সবাজার ট্যুর দুজন ভিন্ন,চমৎকার সঙ্গীনির সাথে কেটেছে। জীবন আমাকে সবসময় জিতিয়ে দিয়েছে। তোমাদের দুজনকেই ধন্যবাদ আমার জীবনে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এমন আশ্চর্য সুন্দর সময় এনে দেওয়ার জন্য। আমি কৃতজ্ঞ তোমাদের দুজনের প্রতি।
উর্বী ফিচেল হাসে। স্বামীর কথার জবাব না দিয়ে সমুদ্রের দিকে দৃষ্টি রাখে, এবং ধীরে ধীরে মাথাটা স্বামীর কাঁধে ঠেকিয়ে দেয়।
হঠাৎ করেই নাবিলের চেঁচামেচিতে দু'জনের ঘোর কাটে। নাবিল চেঁ'চি'য়ে শায়মীকে ডাকছে,"এই শায়মী! রাহা প্যান্ট নষ্ট করে ফেলেছে! এদিকে আয়! হেল্প কর!"
শায়মী আর শর্মী ঝিনুক কুড়াচ্ছিলো। নাবিলের ডাকে শায়মী তেতে ওঠে, চেঁচিয়ে জবাব দেয়,"তো? কাল রাতেই তো বড় গলায় বললি এখন থেকে নিজেই পারবি ওকে সামলাতে! এখন আমাকে ডাকছিস কেন!"
নাবিল বলে ওঠে,"আচ্ছা আচ্ছা ঠিকাছে! লাগবে না তোর হেল্প! আমিই চেঞ্জ করছি ওর প্যান্ট!"
উর্বী আর রাওনাফ হাসে, হাসতে থাকে শর্মী শায়মী।
নাবিল বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,"কাঁদে না! দাদান আছে!"
~~~~~সমাপ্ত~~~~~