নিঃশব্দের সংসার
পর্ব ২
দিনগুলো যেন একই বৃত্তে ঘুরছে। জাহিদকে নানা ভাবে নিজের অবস্থান বুঝিয়েও লাভ নেই। সবকিছুর পর তার একটাই কথা, মায়ের বিষয়ে কিছু শোনা সম্ভব না। জাহিদ যখন এসএসসি দিচ্ছে তখন বাবা এক্সিডেন্টে মারা যান। জাহিদের বড়ো বোন জেসমিন তখন অনার্সে পড়ে। কিছুদিন পরই মামাদের ঠিক করা পাত্রের সাথে বোনের বিয়ে হয়ে যায়। জাহিদের বাবা গরীব ছিলেন না। বাড়িটা জাহিদের দাদার করা। চারতলা বাড়ি পৈতৃক সূত্রে জাহিদের বাবার হয়। বাবার মৃত্যুর পর আর্থিক চাপে পড়তে হয়নি ঠিক। কিন্তু একাকী মায়ের সম্পূর্ণ দুনিয়া জুড়ে জাহিদই ছিল। জেসমিনও একমাত্র ভাইকে আদর আর কর্তৃত্বে রেখে অভ্যস্ত। জাহিদ যখন সাহিমার কথা বাসায় জানায় তখন সামিহাকে দেখে ওনাদের পছন্দ হয়েছিল, দেখতে সুন্দর, পুতুল পুতুল ডাক্তার মেয়ে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা, মা শিক্ষক। ভালো পরিবার। একমাত্র ছেলের বৌ হিসেবে সাজিয়ে গুছিয়ে মানুষের সামনে দেখানোর মতো যোগ্য। তখন কারও মনে আসেনি এই পুতুল পুতুল মেয়েটা শোপিস হয়ে ঘরের শোভা বাড়াতে আর ওনাদের কর্তৃত্ব মেনে নিতে আগ্রহী নাও হতে পারে। শুধু অর্থের যোগান থাকাই কেউ জীবনের জন্য যথেষ্ট নাও ভাবতে পারে। তার আরও অনেক চাহিদা থাকতে পারে। শাশুড়ি, ননদের সাথে লড়াই করে নিজের জায়গা বানানোটা সামিহার জন্য আরও কঠিন হয়ে গিয়েছে জাহিদের নিঃশব্দে ওনাদের সাপোর্ট করে যাওয়ায়। ননদ অন্য সংসারের মানুষ হয়েও নিঃশব্দে এখানে কর্তৃত্ব করে যায়। শাশুড়ির কর্তৃত্ব হয় প্রকাশ্যে। আর জাহিদের ভূমিকা হয় চুপ থাকা। সামিহার দিনগুলো তাই একই বৃত্তে আবর্ত। সকালে ছোটখাটো মনোমালিন্যের পর ডিউটেতে বের হওয়া, দুপুরে ফিরে শাশুড়ির মুখ ভার দেখা, রাতে জাহিদের নীরব বিচারসভা।
জাহিদের সাথে এখন আর তর্ক করে না। সে শুধু চুপচাপ পরিস্থিতি ম্যানেজ করতে যেতে চায়। আর সেই ম্যানেজ করাটাই ধীরে ধীরে সামিহার মনের ক্ষত বড়ো করছে।
আজ কোর্সের অফলাইন ক্লাস নেই। দুপুরে সামিহা অনলাইন ক্লাস করছিল। পরের সপ্তাহে ওদের গ্রুপ প্রেজেন্টেশন। ক্যামেরা অফ রেখে মন দিয়ে টিচারের কথা শুনছিল। এমন সময় রান্নাঘর থেকে আয়েশা খানমের ডাক—
"সামিহা! এই সামিহা!"
প্রথমবার শুনেও সামিহা ওঠেনি। ভাবল মরিয়ম আছে। দ্বিতীয়বার ডাকটা আরও তীক্ষ্ণ।
"কানেও যায় না এখন? ঘরে বসে কী করো সারাদিন আল্লাহ মালুম!"
সামিহা বিরক্ত মুখে উঠে আসে।
"জি আম্মু?"
"ফ্রিজে গরুর মাংসটা উঠিয়ে রাখতে বলেছিলাম।"
"আমি ক্লাসে ছিলাম আম্মু। মরিয়মকেই বললেই তো হতো।"
"তোমার তো সবসময় ক্লাস। সংসারও তো আছে নাকি? যেদিন ডিউটি থাকে সেদিন সারাদিন বাইরে। ডিউটি না থাকলে ল্যাপটপে। এই তো চলে।"
সামিহা আর কিছু না বলে মাংস গুছিয়ে রাখে। ল্যাপটপে টিচার তার নাম ধরে ডেকেও সাড়া পায় না। প্রেজেন্টেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটা ও মিস করে।
রাতে জাহিদকে বলছিল ঘটনাটা। খুব বেশি অভিযোগ না, শুধু কষ্টের জায়গা থেকে
"একটু বুঝে ডাকলেই পারতেন। আমি তো নাটক সিনেমা দেখছিলাম না। কাজেই ছিলাম।"
জাহিদ ফোন স্ক্রল করতে করতেই বলে,
"আম্মু ইচ্ছে করে করেনি। তুমি সবকিছু এত পারসোনালি নাও কেন? আম্মু কী বোঝে যে ল্যাপটপেও ক্লাস হয় এখন। বললেই হতো আম্মুকে। সবকিছু জটিল করে না দেখে সহজ করে দেখলেই হয়।"
"কারণ আমার জিনিসগুলো বারবার নষ্ট হচ্ছে। তাই সহজ থাকতে পারি না।"
"তোমারও তো ছাড় দেওয়া উচিত। সংসারে একটু এদিক সেদিক হবেই। বিশেষ করে যখন আসলেই সময় দাও না। বাসায় যখন থাকো তখন বাসায় সময় দিবা, এই আশা করা তো অপরাধ না।"
সামিহা আর কথা বাড়ায় না। এই বাসায় তার ক্ষতিগুলো কারও চোখেই ক্ষত না। সবার কাছেই অতিরঞ্জন। তাছাড়া সামিহার তর্কে জড়াতেও ইচ্ছে করছে না। শরীর ভালো লাগছে না কয়দিন ধরে। পিরিয়ড মিস হয়েছে। খবরটা ভালো না খারাপ বুঝতে পারছে না। বাচ্চার আগমনে সব আরও কঠিন হবে না তো?
***
খরব জানতে পেরে জাহিদ খুব খুশি হয়। আয়েশা খানমও যেন অনেকদিন পর সত্যিকার অর্থে সামিহার কোনো খবরে খুশি হলেন। আত্মীয়স্বজনকে ফোন দিয়ে বলতে লাগলেন,
"আলহামদুলিল্লাহ, এবার ঘর ভরবে।"
শুধু সামিহার ভেতরেই অদ্ভুত এক ভয় কাজ করছিল। কারণ ঠিক সেই সময়টাতেই ওর কোর্সের ফাইনাল ব্লক শুরু হওয়ার কথা। শরীর খারাপ করছিল খুব। বমি, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা। তবু ল্যাপটপ খুলে বসত। কিন্তু আয়েশা খানম প্রায়ই বলতেন
"এই অবস্থায় এত স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা ঠিক না। এখন থেকে নিজের যত্ন নাও। বাচ্চা হলে এসব কোর্স করেই বা কী হবে?"
ধীরে ধীরে কথাগুলো উপদেশের চেয়ে চাপ হয়ে উঠতে লাগল। একদিন সন্ধ্যায় সামিহা বিছানায় আধশোয়া হয়ে ক্লাস করছিল। হঠাৎ আয়েশা খানম রুমে এসে ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে বললেন,
"এখনও এসব বন্ধ করনি?"
সামিহা ক্লান্ত গলায় বলল,
"আম্মু, আর কয়েকটা মাস।"
"মা হওয়া এত সহজ না। আমরা তো এসব করি নাই। সংসার সামলেছি, বাচ্চা সামলেছি। এখনকার মেয়েদের এত ডিগ্রি লাগে কেন বুঝি না।"
সামিহা চুপ করে ছিল। কারণ সে জানত, এই কথার উত্তর দিলে তা অসম্মান হিসেবেই ধরা হবে।
কিন্তু সেদিন রাতে জাহিদও একই কথা বলল।
"শোনো, আমার মনে হয় এখন কোর্সটা বন্ধ রাখা উচিত।"
সামিহা অনেকক্ষণ স্থির তাকিয়ে ছিল ওর দিকে।
"তুমিও?"
"প্রেগন্যান্সিটা গুরুত্বপূর্ণ না?"
"কোর্স কি গুরুত্বপূর্ণ না?"
"দুটো একসাথে সবসময় হয় না।"
"হয় না, নাকি তোমরা হতে দাও না?"
জাহিদ বিরক্ত হয়ে বলেছিল,
"আবার তোমরা শুরু করো না। সবকিছুতে আম্মুকে টানার কী আছে?"
সামিহার চোখে কষ্ট, কিন্তু মুখে হাসি,
"মজার ব্যাপার কী জানো? তোমার আম্মু সরাসরি কিছু বলেন, তাই উনাকে বুঝি। কিন্তু তুমি সবসময় শান্তির কথা বলে আসলে তার পক্ষটাই নাও। এত নিঃশব্দে নাও যে প্রমাণও করা যায় না।"
"আমি শুধু চাই না তোমার চাপ হোক।"
"না জাহিদ। তুমি শুধু চাও তোমার জীবন সহজ হোক।"
কথাটা বলার পর ঘরে খুব বড়ো নীরবতা নেমে আসে। জাহিদ পাশ থেকে উঠে বসার ঘরে চলে যায়। তার এক সপ্তাহ পর সামিহা কোর্স থেকে ড্রপ নেয়। কাউকে কিছু না জানায় না আর। সেদিন বাড়ি ফেরার পথে পুরোটা পথ কেঁদেছিল।
মনে হচ্ছিল জীবনের খুব প্রিয় একটা দরজা নিজেই বন্ধ করে দিল। সামিহার শুধু মনে হচ্ছিল
তার ভেতরে যেন ধীরে ধীরে কেউ মারা যাচ্ছে।
(চলবে)