ফন্ট সাইজ:
থিম:
গ্ৰুপনাশনান্ত

পর্ব 1

লেখক: খুশবু আক্তার মারজাহান

গ্রুপনাশনান্ত
লেখিকা: খুশবু আক্তার
পর্ব ১
রাজধানীর অভিজাত কনভেনশন সেন্টারটি আজ আলোয় ঝলমল করছে। দেশ-বিদেশের নামী-দামি ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী এবং সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষের ভিড়ে পুরো হলরুমটি মুখরিত। চারদিকে সুবাসিত ফুলের গন্ধ, জাঁকজমকপূর্ণ লাইটিং আর মৃদু ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক এক রাজকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। এই ভিআইপি ইভেন্টে আমন্ত্রিত অতিথিরা সবাই নিজেদের দামী পোশাক আর বিত্তবৈভবের প্রদর্শনীতে ব্যস্ত।
এমনই এক জমকালো পরিবেশের মাঝে গ্লাস ওয়ালের একপাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসিমুখে শ্যাম্পেনের গ্লাস হাতে নিয়ে চারপাশে নজর বোলাচ্ছিলেন এসপি পুষ্প। তার পরনে রয়েছে একটি নিখুঁতভাবে কাট করা আইভরি রঙের প্যান্টসুট, যা তার ব্যক্তিত্বের মতো অত্যন্ত মার্জিত এবং কড়া। পিছে চুলগুলো নিখুঁতভাবে খোঁপা করা, কানে ছোট ডায়মন্ডের স্টাড। তার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ এবং গভীর—চারপাশের এই কৃত্রিম চাকচিক্যের ভিড়েও তার নজর যেন প্রতিটা মানুষের মুভমেন্ট খুব সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। একজন দায়িত্বশীল পুলিশ অফিসার হিসেবে যেকোনো ভিআইপি গ্যাদারিংয়েও তার ভেতরে একটা সিকিউরিটি ইন্সটিংক্ট কাজ করে।
হলের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় জটলা পাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রভাবশালী বিজনেস টাইকুন আরিয়ান চৌধুরী ও তার কিছু ঘনিষ্ট বন্ধু। আরিয়ানের পরনে তিন পিসের জেট ব্ল্যাক কাস্টম সুট, বুকের কাছে রত্নখচিত কফলিংক—পুরো চেহারায় এক ধরনের ঠান্ডা আভিজাত্য আর চরম রকমের ডমিনেন্স। কেউ তার দিকে সরাসরি তাকাতে সাহস পায় না। অথচ এই মানুষটার ডার্ক ওয়ার্ল্ডের পরিচয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, সরকারের শীর্ষস্থানীয় অনেক কর্তাব্যক্তিও সম্পূর্ণ অন্ধকার। আন্ডারওয়ার্ল্ডের সবচেয়ে বড় মাফিয়া সিন্ডিকেটের অসংবাদিত সম্রাট এই আরিয়ান চৌধুরী, যাকে সবাই আড়ালে ভয় পায়। কিন্তু আজ এই হাই-প্রোফাইল অনুষ্ঠানে সে পুরোপুরি কর্পোরেট ও ভদ্রবেশী।
পুষ্প গ্লাসটা টেবিলে রেখে হলরুমের অন্যপ্রান্তে থাকা কমিশনার সাহেবের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঠিক তখনই ভিড়ের মধ্যে একটা আকস্মিক ধাক্কা লাগে। অসাবধানতাবশত পাশ দিয়ে যাওয়া এক ওয়েটারের ট্রে থেকে জুসের গ্লাস সরাসরি গিয়ে পড়ে পুষ্পের স্যুটের কাফে।
– ‘আই অ্যাম সো সরি! এক্সকিউজ মি, ম্যাম!’ ওয়েটারটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলে ওঠে।
পুষ্প নিজের জ্যাকেটের হাতার দিকে তাকিয়ে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। মুখে কোনো বিরক্তি না দেখিয়ে তিনি পকেট থেকে টিস্যু বের করে মুছতে মুছতে শান্ত গলায় বললেন,
– ‘ইটস ওকে, একটু সাবধানে চলো।’
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশ থেকেই একটি ঠান্ডা, ভারী এবং গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে এল, যা ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে মনোযোগ কেড়ে নেয়।
– ‘অসাবধানতা অনেক সময় বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, এসপি পুষ্প।’
পুষ্প চমকে মুখ তুলে তাকালেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন আরিয়ান চৌধুরী। লোকটার চেহারায় এমন এক সম্মোহনী ক্ষমতা আর ঠান্ডা তীব্রতা রয়েছে, যা এক পলকে যেকোনো কাউকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। আরিয়ানের ডানহাতে হুইস্কির গ্লাস, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে রহস্যময় হাসি।
পুষ্প ভ্রু কুঁচকে মুহূর্তের জন্য তাকে মেপে নিলেন। এই লোক তার পদবি আর নাম কীভাবে জানল? এই ভিআইপি ক্রাউডে তো সবাই তাকে সাধারণ অতিথি কিংবা উচ্চপদস্থ কেউ বলেই ভাবছে। পুষ্প নিজের প্রফেশনাল এক্সপ্রেশন বজায় রেখে শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন,
– ‘আপনি আমার পরিচয় জানেন দেখছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আপনার পরিচয়টা আমার জানা নেই।’
আরিয়ান গ্লাসে একটা হালকা চুমুক দিয়ে চোখের দৃষ্টি আরও একটু তীক্ষ্ণ করে পুষ্পের ঠিক চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন,
– ‘পরিচয় জানার বয়স বা সময় হয়তো এখনো হয়নি, এসপি সাহেবা। তবে শহরের অপরাধ জগতের ছায়াগুলো যাদের থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে, সেই তালিকায় আপনার নামটা বেশ ওপরের দিকেই আছে। তাই আপনার মতো একজন দক্ষ পুলিশ অফিসারকে চেনাটা আমার পেশাগত অভ্যাসের অংশ বলতে পারেন।’
পুষ্প সামান্য হেসে প্রতিউত্তর করলেন,
– ‘অপরাধীরা আমার নাম জানলে আমি খুশিই হই। তার মানে আমার কাজ ঠিকমতোই এগোচ্ছে। তবে এই জমকালো অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে ক্রিমিনাল লজিক নিয়ে কথা না বলাই ভালো, মিস্টার...?’
– ‘আরিয়ান। আরিয়ান চৌধুরী।’—খুব সাবলীলভাবে নিজের নামটা উচ্চারণ করলেন আরিয়ান। তার চোখের চাউনিতে এমন একটা তীব্র আত্মবিশ্বাস ছিল, যা পুষ্পের মতো একজন সাহসী এসপিকেও এক মুহূর্তের জন্য ভাবিয়ে তুলল।
ঠিক তখনই আরিয়ানের পকেট থেকে ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। স্ক্রিনে তার বিশ্বস্ত ডানহাত ও ছায়াঘেরা বন্ধু মাহিফের মেসেজ—‘বস, যে কনসাইনমেন্টের কথা বলছিলেন, সেটার ক্লিয়ারেন্স নিয়ে একটু ঝামেলা হচ্ছে।’
আরিয়ান এক পলক স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে ফোনটা পকেটে রেখে পুষ্পের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন,
– ‘আজকের রাতটা উপভোগ করুন, এসপি পুষ্প। কারণ এই শহরের ঠান্ডা বাতাস যেকোনো মুহূর্তে বড় কোনো ঝড়ে রূপ নিতে পারে। আর সেই ঝড়ে কার কার মুখোশ খুলে যাবে, সেটাই দেখার বিষয়।’
বলেই আরিয়ান কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে ধীর পদক্ষেপে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। পুষ্প অপলক দৃষ্টিতে লোকটার চলে যাওয়া দেখছিলেন। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত শিহরণ আর অজানা আশঙ্কার ঢেউ খেলে গেল। এই মানুষটা সাধারণ কোনো ব্যবসায়ী নয়—তা পুষ্পের পুলিশিং ইন্টেলিজেন্স খুব ভালোভাবেই টের পাচ্ছে।
কনভেনশন হলের বাইরে রাতের হাওয়াটা বেশ ভারী। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আরিয়ানের বন্ধু মাহিফ এসে ফিসফিস করে বলল,
– ‘বস, ওই পুলিশ অফিসারকে নিয়ে কি কোনো সমস্যা হতে পারে? আপনি নিজে গিয়ে তার সাথে কথা বললেন যে!’
আরিয়ান গাড়ির ডোরের দিকে হাত বাড়িয়ে কোল্ড স্মাইল দিয়ে বললেন,
– ‘সমস্যা? না মাহিফ... খেলা তো সবে শুরু হলো। যে পুলিশ অফিসার বাঘের গুহায় নিজে থেকে পা রাখতে আসে, তার শিকার করার মজাই আলাদা।’
হলের ভেতরে পুষ্প তখনও সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছেন, তার কানে বাজছে আরিয়ানের সেই ভারী গলার প্রতিটি শব্দ। এই পরিচয়টা কেবল একটা সাধারণ দেখা হওয়া নয়, বরং দুটি ভিন্ন মেরুর সংঘর্ষের সূচনা মাত্র—যা আগামী দিনে পুরো শহরকে কাঁপিয়ে দেবে।
আমি নতুন লেখিকা আশা করি আপনাদের থেকে এই উপন্যাসটা অনেক ভালো লাগবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন