“ডাকাত, ডাকাত, বাঁচাওওওওও, বাঁচাওও”
“নগরে ডাকাত পড়েছে সবাই পালাও পালাও”
রাত তখন প্রায় মধ্যগগনে। সাহাবাদ রাজ্য নিস্তব্ধ ঘুমে আচ্ছন্ন। নগর প্রাচীরের বাইরে প্রহরীরা অলস চোখে টহল দিচ্ছিল। ভেতরে মানুষজন নিশ্চিন্তে স্বপ্ন দেখছিল নতুন দিনের। রাতের বুকেই লুকিয়ে ছিল অশনি সংকেত। দূর থেকে শোনা গেল হায় রে রে রে রে ধ্বনি। অসংখ্য অশ্বখুড়ের শব্দ। যেন মাটির নিচে কোথাও বজ্র গড়িয়ে যাচ্ছে। শব্দটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল।
“ধুপ, ধুপ, ধুপ”
অসংখ্য ঘোড়ার খুরের আঘাতে কেঁপে উঠল শুকনো পথ। প্রহরীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অন্ধকার চিরে বেরিয়ে এলো একদল অশ্বারোহী।
পঁচিশ-ত্রিশটি ঘোড়া। সবগুলোর পিঠে সশস্ত্র মানুষ। মুখ কাপড়ে ঢাকা। হাতে তলোয়ার, বর্শা আর মশাল।
“ডাকাত! ডাকাত!”
এক প্রহরীর আতঙ্কিত চিৎকার রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
দলনেতা ঘোড়া ছুটিয়ে নগরে ঢুকেই গর্জে উঠল,
“যা পাও লুটে নাও! কেউ বাধা দিলে প্রাণ নাও!”
মুহূর্তেই শুরু হলো তাণ্ডব। মশালের আগুন ছুঁড়ে দেওয়া হলো কয়েকটি দোকানে। শুকনো কাঠ আর খড়ে তৈরি ছাউনি দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মানুষ।
কেউ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে দৌড়াচ্ছে। কেউ প্রাণভিক্ষা চাইছে। কেউ বা অন্ধকার গলিতে লুকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ডাকাতদের নির্মমতা থামল না। স্বর্ণালঙ্কার, রৌপ্য মুদ্রা, মূল্যবান কাপড় যা পেল সব লুট করতে লাগল তারা।
একদল ডাকাত কয়েকটি বাড়িতে ঢুকে যুবতী মেয়েদের টেনে বের করে আনতে শুরু করল।
কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠল রাতের বাতাস।
“আমাকে ছেড়ে দিন!”
“মা...! মা...!”
চিৎকার করছিল তারা। কিন্তু করুণা দেখানোর জন্য আসেনি কেউ। একে একে ছয়জন তরুণীকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নিল ডাকাতরা। সাহাবাদের মানুষ অসহায় চোখে শুধু দেখল। রাজপ্রাসাদ থেকে সৈন্য আসতে এখনও সময় লাগবে। এই কয়েক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যাবে।
ঠিক তখনই শোঁওওওও! করে অন্ধকার চিরে উড়ে এলো একটি তীর। তীরটি সোজা গিয়ে বিদ্ধ হলো এক ডাকাতের কাঁধে।
“আআআআহ!”
ব্যথায় ঘোড়া থেকে পড়ে গেল সে। সবাই চমকে উঠল। আরেকটি তীর এসে লাগলো আরেকজনের বুকে। তারপর আরও, একের পর এক তীর উড়ে আসছে তাদের দিকে। মনে হলো যেন রাতের অন্ধকারই তীর ছুঁড়ছে। ডাকাতরা চারদিকে তাকাতে লাগল।
“কে?কোথায় লুকিয়ে আছে? ক্ষমতা থাকলে সামনে আয় কাপুরুষ। লুকিয়ে আক্রমণ করিস”
দলনেতার গর্জন শোনা গেল। তখনই নগরের উত্তর দিকের পথ থেকে ভেসে এলো ধুপ ধাপ ঘোড়ার খুরের শব্দ। একটি কালো ঘোড়া।
রাতের মতোই কৃষ্ণবর্ণ। তার পিঠে বসে আছে এক নারী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো যুদ্ধবস্ত্রে আবৃত। মুখের নিচের অংশ ঢাকা কালো কাপড়ে।
শুধু দুটি চোখ দেখা যাচ্ছে। তীক্ষ্ণ, শীতল,ভয়ংকর আঁখি যুগল” পিঠে ঝুলছে তূণীর। হাতে বাঁকানো ধনুক। ঘোড়া ছুটিয়েই সে একের পর এক তীর ছুড়ে যেতে লাগল।
প্রতিটি তীর যেন নিজের লক্ষ্য খুঁজে নিচ্ছিল।
কয়েক মুহূর্তেই ডাকাতদলের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ল।
“ওই মেয়েটাকে ধরো!”
চিৎকার করল দলনেতা। চারজন অশ্বারোহী একসঙ্গে তার দিকে ধেয়ে এলো। নারী যোদ্ধা বাকা হাসলো কাপড়ের আড়ালেই। কালো ঘোড়াটিকে ঘুরিয়ে সে বজ্রগতিতে এগিয়ে গেল।
এক হাতে লাগাম, অন্য হাতে ধনুক। আরেকটি তীর ছুটল। সামনের অশ্বারোহী মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। দ্বিতীয়জনের হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। আরেকজন ঘোড়া নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের দেয়ালে ধাক্কা খেল। নগরের মানুষ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। তাদের মনে হচ্ছিল এ কোনো সাধারণ নারী নয়, সাক্ষাৎ যুদ্ধের দেবী। রাত্রির অন্ধকারে অবতীর্ণ কোনো রণদেবী।
সংঘর্ষ চলতে লাগল আরও কিছুক্ষণ। ডাকাতরা বুঝতে পারল, আজকের শিকার তাদের জন্য সহজ হবে না। তাদের অনেকেই আহত। কয়েকজন ঘোড়া হারিয়েছে। দলনেতা দাঁত চেপে চারপাশ দেখল। তারপর গর্জে উঠল,
“পিছু হটো!”
ধীরে ধীরে ডাকাতদল নগর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে শুরু করল। নারী যোদ্ধা তাদের পিছু নিল। আরও কয়েকটি তীর ছুটল। দুজন ডাকাত মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তবু শেষ পর্যন্ত সব রক্ষা করা সম্ভব হলো না। অন্ধকার পথ ধরে পালিয়ে যাওয়া ডাকাতদের সঙ্গে রয়ে গেল তিনজন তরুণী।
তাদের কান্না ভেসে আসে
“বাঁচান...! “আমাদের বাঁচান...!”
নারীটি ঘোড়া ছুটিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ধাওয়া করল। কিন্তু সামনে অপেক্ষা করছিল ঘন জঙ্গল।
ডাকাতদল অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেল।
ধীরে ধীরে থেমে গেল খুরের শব্দ। নীরব হয়ে গেল চারদিক। কালো ঘোড়ার পিঠে বসে নারী কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল। তার চোখ দূরের অন্ধকারে নিবদ্ধ। মুষ্টিবদ্ধ হাত কাঁপছিল ক্রোধে। তিনজনকে বাঁচাতে পারেনি সে। আবারও তারা সাহাবাদ থেকে নারী অপহরণ করল। এভাবে কতকাল চলনে এদের অত্যাচার?
রাতের বাতাসে তার কালো চাদর উড়ছে। তার চোখ দুটি যেন প্রতিজ্ঞায় জ্বলে উঠল। যারা আজ এই রাজ্যে রক্ত আর অশ্রুর দাগ রেখে গেছে তাদের শেষ আশ্রয় পর্যন্ত খুঁজে বের করবে সে।
যে করেই হোক। সাধারণ ডাকাত দের এত সাহস হবে না যে রাজ্যে লুটপাট করে নারীও তুলে নিয়ে যাবে। এদের পিছন থেকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে অন্য কোনো রাজ্যের নামি-দামি ব্যাক্তিবর্গ রা। সাহাবাদ এ নারীর রাজত্ব চলে এখন। ভেবেছে এই রাজ্য ধূলিসাৎ করার মোক্ষম সুযোগ। কিন্তু তারা জানে না সুনেহেরা জাহ্নবীর তিনটি আগুনের গোলা আছে।
ডাকাতদল জঙ্গলের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। তখনও হাল ছাড়েনি কালো ঘোড়ার আরোহী। তার চোখে জ্বলছিল ব্যর্থতার আগুন। তিনজন তরুণীকে হারানোর বেদনা। কিন্তু ঠিক তখনই তার কানে ভেসে এলো ক্ষীণ কান্নার শব্দ।
শিশুর কান্না।
নারীটি ঘোড়ার লাগাম টেনে ঘুরিয়ে দিল।
দেখল, মূল দল থেকে একটু পেছনে দুজন ডাকাত আলাদা পথে ছুটে যাচ্ছে। তাদের ঘোড়ার সামনে বাঁধা রয়েছে দুটি ছোট্ট শিশু। বয়স সাত কিংবা আট বছরের বেশি নয়। দুজনই মেয়ে।
ভয়ে দুজনই কাঁদছে। তার চোখ সংকুচিত হয়ে এলো।
সীমান্ত অঞ্চলে সক্রিয় কিছু দস্যুদল শিশুদের অপহরণ করে দূরদেশে পাচার করে দেয়। তাদের ভাগ্যে কী ঘটে, তা কেউ জানে না।বএক মুহূর্ত দেরি করল না সে। তূণীর থেকে একসঙ্গে দুটি তীর বের করে ধনুক টানল। দুটি তীর বজ্রবেগে ছুটে গেল। প্রথম তীর বিদ্ধ হলো এক ডাকাতের কাঁধে। দ্বিতীয় তীর অন্যজনের হাতে। যন্ত্রণায় তারা ঘোড়া থেকে ছিটকে পড়ল। শিশু দুটিও মাটিতে গড়িয়ে পড়ে গেল। সে মুহূর্তের মধ্যে ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের কাছে পৌঁছে গেল।
একজনকে বাম হাতে তুলে নিল। অন্যজনকে ডান হাতে। তার কালো ঘোড়াটি যেন বাতাসের বেগে ছুটতে ছুটতে আবার সাহাবাদের দিকে ফিরতে লাগল।
নগর চত্বরে তখন হাজারো মানুষের ভিড়। আগুনের অনেকটাই নেভানো হয়েছে। আহতদের সেবা করা হচ্ছে। মায়েরা হারিয়ে যাওয়া কন্যাদের জন্য বুক চাপড়ে কাঁদছে। হঠাৎ দূর থেকে আবার শোনা গেল ঘোড়ার খুরের শব্দ। সবাই আতঙ্কিত হয়ে তাকালো। আবার বুঝি ডাকাত দল ফিরে আসছে? অন্ধকার পথ পেরিয়ে কালো ঘোড়াটি নগর চত্বরে এসে থামল। আরোহী ধীরে ধীরে নিচে নামল। তার দুই বাহুতে জড়িয়ে আছে দুটি শিশু।
শিশু দুটিকে তাদের পরিবারের হাতে তুলে দিতেই কান্নায় ভেঙে পড়ল তারা। মা-বাবারা সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরল। চত্বরজুড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। আজ আরও বড় অনর্থ হয়ে যেত। যদি এই নারী সময় মত না আসতো। ডাকাত দল আরও যুবতীদের নিয়ে যেত, আরও শিশুও নিয়ে যেত।
সবার চোখ স্থির হয়ে আছে সেই রহস্যময় নারী যোদ্ধার ওপর। কে সে? কোন রাজ্যের সৈনিক?
কোনো অভিজাত পরিবারের কন্যা? নাকি সত্যিই কোনো দেবীর দূত? কৌতূহলের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। সবাই কৃতজ্ঞতা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
মেয়েটা ঘামে ভিজে একাকার। হাত বাড়িয়ে মুখের কালো আবরণ খুলে ফেলল। সাথে সাথে পুরো চত্বর স্তব্ধ হয়ে গেল। একজন দুজন এর পর শত শত মানুষ একসঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। দুই হাত জোড় করে মাথা নত করল তারা। তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং সম্রাজ্ঞী-কন্যা শাখা নেওয়াজ।
চত্বরজুড়ে একসঙ্গে ধ্বনিত হলো,
“সম্রাজ্ঞী-কন্যার জয় হোক!”
“শাখা নেওয়াজের জয় হোক!”
যুদ্ধের উত্তেজনায় এলোমেলো হয়ে যাওয়া কেশরাশি কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে। তার চুল ছিল গভীর রাত্রির মতো কালো, অথচ তার মুখশ্রী যেন ভোরের প্রথম আলোর মতো উজ্জ্বল। চোখদুটি ছিল দীর্ঘ ও তীক্ষ্ণ, যেন শিকারি বাজপাখির দৃষ্টি। সেই চোখে একসঙ্গে বাস করে প্রজ্ঞা, সাহস এবং অদম্য সংকল্প। তার গাত্রবর্ণ দীপ্তিময়, যেন শ্বেত চন্দনের ওপর চাঁদের আলো পড়েছে। সুদৃঢ় চোয়াল আর দৃঢ় ভঙ্গিমা তাকে কোমলতার চেয়ে বেশি মহিমাময় করে তুলেছে। তার সৌন্দর্য ছিল ধারালো তরবারির মতো। যার দিকে তাকালে মানুষ মুগ্ধ হয়, আবার সম্মানেও মাথা নত করে।
কপালের ডান পাশে একটি ক্ষীণ পুরোনো দাগ শৈশবের এক যুদ্ধ প্রশিক্ষণের স্মৃতি। সেই দাগটুকুও যেন তার সৌন্দর্যকে আরও অনন্য করে তুলেছে।
কিন্তু শাখা নেওয়াজের দৃষ্টি দূরের অন্ধকারে। যেদিকে পালিয়ে গেছে ডাকাতরা। যেদিকে হারিয়ে গেছে তিনজন নিরপরাধ তরুণী। তার মুঠি শক্ত হয়ে উঠল। দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“তারা যত দূরেই পালাক, তাদের খুঁজে বের করবই আমি। সাহাবাদের কোনো কন্যাকে কেউ অপহরণ করে নিয়ে যাবে আর শাস্তি পাবে না, এমন দিন এখনও আসেনি।”
পাথরের বিশাল ফটক পেরিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল কালো ঘোড়াটি। রাত আরও গভীর হয়েছে।
পাহাড়ের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা সাহাবাদের রাজপ্রাসাদ যেন মেঘের ভেতর ভাসমান কোনো প্রাচীন দুর্গ। উঁচু উঁচু প্রাচীর, অগ্নিশিখার আলোয় জ্বলজ্বল করা প্রহরী টাওয়ার আর অসংখ্য খিলানওয়ালা স্তম্ভ, সব মিলিয়ে রাজমহলটিকে মনে হচ্ছিল অজেয় কোনো সাম্রাজ্যের হৃদয়।
ঘোড়া থেকে নেমে পড়ল শাখা। পোশাকে এখনও লেগে আছে ধুলো। হাতে চামড়ার দস্তানা। কোমরে ঝুলছে তলোয়ার। মুখে চোখে ক্লান্তি। তার চেয়েও বেশি অপরাধবোধ।বমহলের ভেতর প্রবেশ করতেই দূরের করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নারী ছুটে এলেন। নীলচে পোশাকে মোড়া। মাথায় মুক্তাখচিত ওড়না। এটাই সুনেহেরা জাহ্নবী। যৌবনের অতি সুন্দরী রমনী আজও সৌন্দর্য বয়ে বেড়াচ্ছে। বয়স তাকে ছুতে পারে না। শাখাকে দেখামাত্রই তিনি ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
“কোথায় গেছিলি তুই? ইয়া আল্লাহ আমি পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম চিন্তায়। হ্যা রে তোরা কি আমায় দুদন্ড শান্তি দিবি না?”
কঠোর যোদ্ধার মুখোশ মুহূর্তেই ভেঙে গেল। শাখাও জড়িয়ে ধরল তাকে। তারপর নিচু স্বরে বলল
“আমি ব্যর্থ হয়েছি, মনি মা...”
সুনেহেরা ধীরে ধীরে তার মুখের দিকে তাকালেন।
“কি বলছিস তুই?”
শাখার চোখ নিচু হয়ে গেল।
“নগরে ডাকাত পড়েছিলো। তিনজন মেয়েকে নিয়ে গেছে ওরা। আমি চেষ্টা করেছি, শেষ পর্যন্ত ধাওয়া করেছি, কিন্তু তাদের ফিরিয়ে আনতে পারিনি। শুধু দুজন শিশুকে আনতে পেরেছি”
শাখার চোখ চিকচিক করে উঠল। যে মেয়ে শত সৈন্যের সামনে নির্ভীক থাকতে পারে, সেই মেয়েটিই এখন নিজের ব্যর্থতায় ভেঙে পড়েছে। সুনেহেরা তার গাল স্পর্শ করলেন।
“সব যুদ্ধ জেতা যায় না, মা। তুই নিজের সবটুকু দিয়ে তাদের বাচাতে চেয়েছিস, সৃষ্টিকর্তা দেখেছে”
শাখা কিছু বলতে গেলে সুনেহেরা মাথা নাড়লেন।
“না আর কাদবি না, আজ তুই অগণিত প্রাণ বাঁচিয়েছিস। দুটো শিশুকে ফিরিয়ে এনেছিস। পুরো নগরকে রক্ষা করেছিস নিজের জীবন বিপন্ন করে।”
তিনি মৃদু হেসে বললেন
“আল্লাহ মানুষকে সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।”
শাখা কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনি ধাম করে মহলের প্রধান দরজাটি হঠাৎ জোরে খুলে গেল।
দুজনেই চমকে তাকাল। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি তরুণী। মাথা থেকে পা পর্যন্ত ধুলোয় ঢাকা। সোনালি চুলগুলো এলোমেলো কোমড় ছুয়ে নেমেছে। মুখে আঁচড়ের দাগ। হাতে ধরা রক্তমাখা তলোয়ার। তার সবুজাভ চোখদুটি জ্বলছে অদ্ভুত আগুনে। মনে হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে উঠে আসা কোনো পরী দাঁড়িয়ে আছে সেখানে।
অথবা রক্তে ভেজা কোনো পুতুল। এত সুন্দর মুখশ্রী যে চোখ ফেরানো যায় না। উপস্থিতি এত ভয়ংকর যে তাকিয়ে থাকতেও সাহস লাগে।
শাখা বিস্ময়ে বলে উঠল,
“সারা!”
সুনেহেরাও অবাক হয়ে উঠলেন।
“এই অবস্থায় তুই কোথায় ছিলি? এই মেয়েরা রাত বিরেত কোথায় বেড়িয়ে যায়?”
সাহারা ভেতরে এগিয়ে এলো। তার জুতোর নিচে পাথরের মেঝেতে রক্তের ছোট ছোট দাগ পড়তে লাগল। কিন্তু তার ঠোঁটে ফুটে উঠল দুষ্টু এক হাসি।
“আমাকে না বলে ডাকাত ধরতে বের হওয়ার শাস্তি পেয়ে গেছো বুঝি?”
শাখা ভ্রু কুঁচকাল।
“মজা করছিস?”
সাহারা কাঁধ ঝাঁকাল। তারপর তলোয়ারটা মেঝেতে ঠুকল। টং! করে শব্দটি পুরো হলঘরে প্রতিধ্বনিত হলো।
“যে তিনজন মেয়ের জন্য এত চিন্তা করছো...”
ঠোঁটের কোণে বিজয়ীর হাসি ফুটিয়ে বলল
“তাদের দুজনকে আমি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে এসেছি।”
কথাটা শুনে শাখা চরম অবাক হলো। সুনেহেরাও যেন বিশ্বাস করতে পারল না।
“কি বললি?”
সাহারা এবার হেসে উঠল।
“ডাকাতদের মূল দল জঙ্গলের পশ্চিম পথ দিয়ে পালাচ্ছিল। আমি তাদের পিছু নিয়েছিলাম। ডাকাতের ভাগ্যও খারাপ ছিল আর আমার তলোয়ারটা ও খুব ক্ষুধার্ত ছিল।”
তলোয়ার থেকে টপ করে একফোঁটা রক্ত মেঝেতে পড়ল। শাখার বিস্মিত চোখের দিকে তাকিয়ে সাহারা বলল,
“চারজনকে মেরেছি। দুজনকে আহত করেছি। বাকিরা পালিয়েছে।”
“আর মেয়েগুলো?”
“দুজনকে বাচিয়েছি। একজন কে ছিড়ে খেয়েছে জানোয়ার গুলো।”
শাখা এতক্ষণ যত ভাড় তার বুক চেপে ধরে ছিল, সেটি হঠাৎ মিলিয়ে গেল। দ্রুত এগিয়ে এসে সাহারাকে জড়িয়ে ধরতে নিলে সাহারা সরে গেল।
“ছোঁস না আমায়, রক্ত লাগবে গায়ে”
শাখা বারণ মানলো না। জাপটে ধরলো বোনকে
“তুই পেরেছিস সারা, তুই…”
“আমি না, আমরা পেরেছি।”
সুনেহেরা তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
একজন অগ্নিশিখার মতো তেজস্বী। আরেকজন ঝড়ের মতো দুর্বার। সাহাবাদের ভবিষ্যৎ যেন দাঁড়িয়ে আছে তাদের মাঝখানে। সুনেহেরা আবেগ নিয়ন্ত্রন করতে পটু। মুহূর্তেই ঢেকে ফেলল অশ্রুকণা
“হয়েছে হয়েছে, যে যার ঘরে যাও। রাজ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অসংখ্য সেনা, প্রহরী রয়েছে। রাত বিরেত না বলে কয়ে যেন আর ছুটতে না দেখি কাওকে। মনে থাকবে?”
দুজনেই আসামীর ন্যায় মাথা ঝাঁকাল। চলে গেল যে যার ঘরে। ওরা যেতেই সুনেহেরা হাফ ছেড়ে বাচলো যেন।
***
পরদিন ভোর।
সাহাবাদ দুর্গের উপর হালকা কুয়াশার চাদর মেলে আছে। পাহাড়ের চূড়া ছুঁয়ে সূর্যের প্রথম সোনালি আলো নেমে আসছে রাজপ্রাসাদের ধূসর পাথরের দেয়ালে। রাজমহলের পূর্ব প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে আছে শাখা। গত রাতের ঘটনার পর তার চোখে ঘুম আসেনি। এটা সাধারণ কোনো ডাকাতির ঘটনা নয়। এর পেছনে আরও বড় কিছু আছে।
ঠিক তখনই প্রহরীদের একজন দ্রুত এগিয়ে এলো। তার হাতে রৌপ্য মুদ্রাঙ্কিত একটি চিঠি।
বুকের কাছে হাত রেখে মাথা নত করল সে।
“সম্রাজ্ঞী-কন্যা, আমিরাবাদ থেকে বার্তা এসেছে।”
শাখা ভ্রু তুলল।
“আমিরাবাদ? তা আমায় দিচ্ছ কেন? মনি মা কে দাও গিয়ে”
“উনি জরুরি সভায় বসেছেন।”
প্রহরী চিঠিটি এগিয়ে দিল। মোটা সাদা কাগজ।
গাঢ় সবুজ মোমের সিলমোহর। তার ওপর খোদাই করা রয়েছে আমিরাবাদ সাম্রাজ্যের রাজচিহ্ন দুটি মুখোমুখি সিংহ এবং একটি অর্ধচন্দ্র।
শাখা সিল ভাঙল। তার চোখ দ্রুত পঙ্ক্তিগুলোর উপর বুলিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর তার ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। ঠিক তখনই জান্নাত এবং সাহারা প্রাঙ্গণে এসে উপস্থিত হলো।
সাহারা এখনও আগের রাতের যুদ্ধের কিছু ক্ষত নিয়ে হাঁটছে। দূর থেকেই বলল,
“চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কেউ প্রেমপত্র পাঠিয়েছে।”
শাখা বিরক্ত চোখে তাকাল।
“একদিন তোকে সত্যিই কারাগারে পাঠাব।”
“তাতে কি? খাবার ভালো হলে আমার আপত্তি নেই।”
জান্নাত বরাবরই শান্ত। ওদের খুনসুটিতে মৃদু হেসে বলল
“চিঠিতে কী লেখা আছে?”
শাখা কাগজটা ভাঁজ করল। তারপর শান্ত স্বরে বলল
“আমিরাবাদের সম্রাটের পক্ষ থেকে বার্তা।”
সাহারা ভ্রু কুঁচকাল।
“সমস্যা?”
“না।”
“তাহলে?”
“তারা গত রাতের ডাকাতি সম্পর্কে খবর পেয়েছে। তদন্তের জন্য প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে।”
জান্নাত মাথা নাড়লেন।
“এটা তো স্বাভাবিক। সাহাবাদ সহ আরও পাঁচটি রাজ্য আমিরাবাদ এর অন্তর্ভুক্ত।”
সাহারা বলল,
“সে না হয় বুঝলাম। কিন্তু কে আসছে?”
শাখা এবার চিঠির শেষ অংশটা পড়ল। তার কণ্ঠে এক ধরনের গাম্ভীর্য নেমে এলো।
“আমিরাবাদের যুবরাজ...”
সাহারা সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“যুবরাজ?”
“হুম, মেহরাব ওয়াসেম।”
আমিরাবাদের সম্রাটপুত্র মেহরাব ওয়াসেম নামটি পুরো উপমহাদেশেই পরিচিত। যুদ্ধবিদ্যা, কূটনীতি এবং প্রখর বুদ্ধিমত্তার জন্য বহুবার তার নাম শোনা গেছে। তার সবচেয়ে বড় গুণ হচ্ছে শিকার করা। দুর্ধর্ষ শিকারী। শাখা আবার পড়তে শুরু করল,
“যুবরাজ মেহরাব ওয়াসেম তার মাতুলের সঙ্গে আগামীকাল সকালে সাহাবাদে উপস্থিত হবেন। ডাকাতি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং রাতেই আমিরাবাদে প্রত্যাবর্তন করবেন।”
জান্নাত চিন্তিত গলায় বললেন,
“তার মাতুল?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে সে…..”
শাখা মাথা নাড়ল।
“মায়ের দিক থেকে রাজপরিবারের আত্মীয়।”
সাহারা হঠাৎ হেসে উঠল।
“তাহলে তো বেশ মজা হবে।”
“কিসের মজা?”
“যুবরাজ আসছে।”
জান্নাত চোখ সরু করল।
“তাতে তোর কি? একদম ওনার সামনে যাবি না বলে দিলাম।”
“আচ্ছা আচ্ছা, যাব না। ধুর তোমাদের যা চিন্তাভাবনা। আমি ভাবছি তার থেকে জঙ্গলের দখলদারী টা পোক্ত করবো। যাতে হুটহাট শিকারী ঢোকা আটকাতে পারি”
জান্নাত আর শাখা ফিক করে হেসে ফেলল। সাহারা ঘাবড়ে গেল ওদের হাসিতে।
“ওমা হাসছো কেন?”
জান্নাত হাসতে হাসতেই বলল
“শাখা শুনলি? যে নিজেই দুর্ধর্ষ শিকারী, পৃথিবীর বিভিন্ন দুর্গম সব জায়গায় শিকারে যান, তার কাছ থেকে নাকি শিকার বন্ধের ইখতিয়ার আদায় করবে”
সাহারার মুখটা ছোট হয়ে গেল। মেহরাব নামটা সে আগে বহুবার শুনেছে। কিন্তু কখনো দেখা হয়নি। তার ভালো ভালো কাজের সুনাম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশজুড়ে বিস্তৃত। সেসব শুনে মনে মনে কত শ্রদ্ধা আর সম্মান ই না পুষেছে সাহারা। সেই লোকটা এভাবে পশু পাখি হত্যা করে বেড়ায়? মনে মনে আওড়ালো
“তারমানে যতটা ভালো ভেবেছিলাম ততটাও নয়। হুহহ”
চলে গেল সেখান থেকে গটগট করে।
*****
রাজকীয় পাঠাগারের মাঝখানে রাখা বিশাল টেবিলটার একটা চেয়ারে বসে খুব মনোযোগ দিয়ে কিছু একটা পড়ছে মেহরাব। ধূসর চোখ জোড়া খুব নিখুঁত ভাবে দেখছে প্রতিটা অক্ষর। পরণে ব্রিটিশ দের মখমলি গেঞ্জি। যতবার বিলেত যায় এগুলো নিয়ে আসে সে। তাদের পোষাক মেহরাব এর বড় পছন্দ। সব সময় পাঞ্জাবি পায়জামা পরে থাকতে ভালো লাগে না তার। বিদেশি পায়জামা যাকে ট্রাউজার বলে। ছাই রঙা ট্রাউজার আর কালো ছোট হাতার গেঞ্জি পরে বই পড়ছে বসে বসে। চুল গুলো অল্প এলোমেলো। উন্মুক্ত পেশি বাহু ফুলে ফুলে আছে। নিয়মিত ব্যায়াম দ্বারা তৈরি এই উঁচুনিচু বলিষ্ঠ দেহ নজড় কাড়ার মত। তার পড়ার ধ্যান ভাঙলো কিছু পড়ে যাওয়ার বিকৃত আওয়াজে। মেজাজ তুঙ্গে চড়ে যায় সাথে সাথে। কতবার করে হুশিয়ারি দিয়েছে দাসি দের। পাঠাগার এর আশে পাশে আওয়াজ করতে নেই।
বই টা ধাম করে বন্ধ করে দিয়ে উঠে দাড়ায়। আজ যেই হোক তার খবর আছে। যেতে যেতেই ধাক্কা খায় জাহিদার সাথে। যতটুকু না লেগেছে তার চাইতে বেশি ইচ্ছে করে হুড়মুড় করে মেহরাব এর গায়ে এসে পড়ে। মেহরাব তার বাহু ধরে শক্তিশালী টানে সরিয়ে ফেলে নিজের থেকে। গম্ভীর ভাড়ি গলায় বলে
“কি করছো টা কি জাহিদা? সমস্যা কি তোমার? এখানে কি?”
“আ…আসলে মেহরাব, আপনার জন্য শরবত নিয়ে এসেছিলাম।”
তার মুখে নিজের নামটা শুনে মেজাজ আরও চড়ে গেল মেহরাব এর
“এই এই? ভাসুর হই তোমার। তেমার থেকে বয়সেও দ্বিগুণ, ভাইজান ডাকো।”
জাহিদা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সেখানে লাফ দিয়ে এসে পড়লো মেহরাব এর সমবয়সী মামা আলীরাজ। ওর এমন হুটকরে আসায় হকচকিয়ে উঠলো দুজনেই। মেহরাব এর কাঁধ চাপড়ে বলল
“তুই এখানে কি করছিস বে? এই ঢেপসির মুখির সাথে?”
জাহিদা হা হয়ে গেল এর কথায়। মেহরাব বিরক্তি নিয়ে বলল
“ঠিক করে কথা বল। তোর ভাগনে বউ ও”
আলী নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল
“ওমা তাইইইইই? আমি তো জানতাম ই না। একটু প্রণাম করবো মা?”
বলেই জাহিদার পা ধরতে ঝুঁকতে নিলেই জাহিদা লাফিয়ে উঠলো। দ্রুত চলে হেল সেখান থেকে। মেহরান চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে আলীর দিকে
“ওভাবে তাকাস না বাপ, ভয় পাই তো”
“কি বলতে এসেছো?”
“হাহহ তোর বাপ পাঠালো। আগামীকাল সাহাবাদ এ যেতে হবে। গতকাল ডাকাত হামলা হয়েছিল সেখানে। তাই…”
আলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই বলল
“মন চাইলে তুমি যাও। আমি যেতে টেতে পারবো না। ওখানে নারী সম্রাজ্ঞী। আমি কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করি”
“অ্যাহহহহহ। এমন করছে যেন জীবনে বিয়ে করবে না। বলি বউ নিয়ে যে এক বিছানায় শুতে হবে। তারপর আরও….”
আলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহরাব একটা বই ছুড়ে মারলো।
“মুখে লাগাম টান। মামা হোস আমার”
“ধুররর, তোকে ভাগনে ভাবে কে রে? তুই আমার বন্ধু, আমিও তোর বন্ধু। তাছাড়া এমনি এমনি যেতে বলছি না তো। সেদিন জঙ্গল থেকে আমাদের যে গোপনে আক্রমণ করেছিলো। খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, সে সাহাবাদ এর ই শাহজাদি।”
মেহরাব চকিতে তাকালো। এক মূহুর্তের জন্য সে দেখেছিলো সেই দৃশ্য টা। সোনালী চুল গুলো উড়িয়ে তীব্র বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে যাওয়া সেই নারী। মনের মধ্যে উদয় হয়েছিলো এক অবাস্তব ধারণা। হয়তো পরী সত্যিই আছে পৃথিবীতে। মানুষ তো লাগছিলো না। আলী মুখের সামনে তুড়ি মারতেই ভ্রম ভাঙলো। আলীর সন্দিহান দৃষ্টি দেখে মৃদু গলা খাঁকারী দিল
“ঠিকাছে, বাবা যেটা বলে সেটাই হবে। কখন রওনা হচ্ছো?”
আলী দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে
“কি ব্যাপার ভাগ্নে? এত আগ্রহ?”