"না...!"
চিৎকার করে উঠে বসল সাহারা। হাঁপাচ্ছে মেয়েটা। বুকটা এত জোরে ওঠানামা করছে যেন দৌড়ে এসেছে অনেক দূর থেকে। সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে। কিছুক্ষণের জন্য মাথাটা আওলা ঝাওলা হয়ে এলো। চারদিকে তাকাল।
পরিচিত কাঠের আলমারি,জানালার পাশে রাখা প্রদীপ,নিজের পালঙ্ক, নিজের কক্ষ। এসব দেখে সাহারা বিস্ফারিত চোখে চারদিকে তাকিয়ে রইল।
“আআআ…আমি, আমি এখানে?"
তারপরই চোখ পড়ল কোণের বালুঘড়িটার দিকে।
বালুর অর্ধেকেরও বেশি নিচে নেমে গেছে। এখনো গভীর মধ্যরাত্রি। কিন্তু সে তো…সে তো মহলের পেছনের দেয়াল টপকে বেরিয়েছিল। জ্যোৎস্নায় ভেজা পথ ধরে উত্তরের সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদ পর্যন্ত গিয়েছিল। নিজের চোখে দেখেছিল মরিচা ধরা বিশাল লোহার ফটক। ভেতরে ঢুকেছিলও।
হঠাৎই সাহারার চোখ বড় হয়ে গেল। ইস্পাতের বর্মে আবৃত এক দীর্ঘদেহী মানব। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট অবয়ব দেখেছিল। পুরুষটার উপস্থিতি ছিল ভয়ংকর দৃঢ়। সাহারার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল।
"না। আমি তো দেখেছিলাম সেই লোকটা, ওই ওই যে ওখানে…বাশি, বাশি বাজাচ্ছিল”
সে দু'হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল।
"তাহলে সব কোথায় গেল? কোথায় গেল সেই প্রাসাদ? কোথায় গেল সেই বর্মপরিহিত মানুষটা। এখানে এলাম কীভাবে আমি?”
কোনো উত্তর নেই। ভয় ধীরে ধীরে বুকের ভেতর চেপে বসল। আর এক মুহূর্তও কক্ষে থাকতে পারল না সাহারা। খালি পায়ে ছুটে বেরিয়ে গেল অলিন্দে।
"মণি মা...! মণি মা...!"
নিস্তব্ধ প্রাসাদে তার কাঁপা কণ্ঠ প্রতিধ্বনিত হলো।
দরজায় ব্যাকুল কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল সুনেহেরার। তাড়াতাড়ি দরজা খুলতেই সাহারা ঝাঁপিয়ে পড়ল তার বুকে। মেয়েটার পুরো শরীর কাঁপছে। শ্বাস-প্রশ্বাস এলোমেলো ভাবে নিচ্ছে।
সুনেহেরা বিস্মিত হয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলল
"কী হয়েছে মা?"
সাহারা কাঁপা গলায় বলতে লাগল,
"ম...মণি মা... আমি... আমি উত্তরের প্রাসাদে গিয়েছিলাম..."
সুনেহেরা একটুও বাধা দিলেন না। শুধু শান্তভাবে শুনতে লাগল। সাহারা এলোমেলোভাবে বলতে লাগল কীভাবে দেয়াল টপকে বেরিয়েছিল। উত্তরের জঙ্গলে পৌছেছিলোও। আর তারপর সেই বর্মপরিহিত মানুষটিকে দেখেছিল। সবটা এক নিঃশ্বাসে বলে শেষ করল সে।
"মণি মা। আআআ…আমি মিথ্যে বলছি না। আমি সত্যিই গিয়েছিলাম..."
সে ভেবেছিল এবার নিশ্চয়ই বকুনি খেতে হবে।
কিন্তু না, সুনেহেরা কিছুই বলল না। মৃদু হাসলেন শুধু। তারপর সাহারার দুই গাল নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে আলতো চুমু খেলেন।
বুকের সঙ্গে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কোমল স্বরে বললেন,
"আমার সাহসী মেয়েটা আজ একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছে।"
সাহারা মাথা নাড়ল।
"না না না মনি মা। বিশ্বাস করো। ওটা স্বপ্ন ছিল না।"
সুনেহেরা তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল
“স্বপ্ন কখনো কখনো এতটাই সত্যি মনে হয় যে মানুষ পার্থক্য করতে পারে না।"
“কিন্তু আমি..."
“সোনা মা আমার।”
স্নেহভরা কণ্ঠে থামিয়ে দিল সাহারা কে।
"দেখো, তুমি তো এখন নিজের কক্ষ থেকেই উঠে এসেছ। কোথাও যাওনি। ভয় পেয়ো না। আমি আছি।"
সাহারা ধীরে ধীরে শান্ত হতে লাগল। তবুও বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি কাজ করছে। সুনেহেরা তার হাত ধরে বলল
"এবার নিজের ঘরে যাও। ভালো করে ঘুমাও। সকালে সব ঠিক হয়ে যাবে।"
সাহারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাথা নাড়ল। বারবার পেছনে তাকাতে তাকাতে নিজের কক্ষে ফিরে গেল। রাত আরও গভীর হলো। প্রাসাদ নীরব।
সাহারার শরীর কাঁপতে শুরু করল। প্রথমে হালকা হলেও ধীরে ধীরে পুরো শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো। কপাল জ্বরে পুড়ে উঠেছে। অচেতন ঘুমের মাঝেও সে অস্পষ্ট স্বরে বিড়বিড় করতে লাগল
“আ…আপনি, আপনি কে? কোথ থেকে এসেঋেন?”
ভোরের আলো সাহাবাদ প্রাসাদের উঠোন ভরিয়ে দিল। প্রতিদিনের মতো আজও সবার আগে ঘুম ভাঙল জান্নাতের। নামাজ শেষে হেঁশেলে গিয়ে সকালের নাশতার তদারকি করল। দাসীদের প্রয়োজনীয় সব বুঝিয়ে দিয়ে সে সোজা সাহারার কক্ষের দিকে রওনা হলো। দরজায় মৃদু টোকা দিল।
"সারা? সারা। ওঠ। সকাল হয়ে গেছে।"
ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না। জান্নাত ভ্রু কুঁচকে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। পালঙ্কে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে সাহারা। কাছে গিয়ে কপালে হাত রাখতেই আঁতকে উঠল সে।
"ইয়া আল্লাহ!"
শরীর যেন আগুনের মতো জ্বলছে। সাহারার ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। সুন্দর গোলাপি মুখখানা অস্বাভাবিক লাল হয়ে আছে। ঘুমের মাঝেই কপাল কুঁচকে কী যেন বিড়বিড় করছে।
জান্নাত আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে চিৎকার করে ডাকলো
“মণি মা! মণি মা!"
---
সারা রাত সুনেহেরার চোখে ঘুম ছিল না। বিছানায় শুয়েও বারবার মনে পড়ছিল সেই বহু বছর আগের স্মৃতি। বর্ম পরিহিত এক পাষাণ পুরুষ।
কঠিন মুখের আড়ালে তাকে পাগলের মত ভালেবাসা এক প্রেমিক পুরুষ। সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দিলেও কিছু স্মৃতি যেন কখনো বুড়ো হয় না। রাতভর এপাশ-ওপাশ করে অবশেষে ভোরের দিকে একটু চোখ লেগেছিল তার। ঠিক তখনই জান্নাতের উৎকণ্ঠিত ডাক কানে এলো।
"মণি মা!"
চোখ খুলেই বুঝলেন কিছু একটা হয়েছে। ধরফর করে উঠে বাইরে আসতেই জান্নাত জানালো সাহারার কথা। তাড়াতাড়ি করে মুখে পানি ছিটিয়ে ওড়না ঠিক করে সাহারার কক্ষের দিকে ছুটলেন।
সুনেহেরাকে দেখেই সাহারা আধখোলা চোখে তাকাল। পরক্ষণেই ঠোঁট উল্টে শিশুর মতো কেঁদে উঠল।
"ম...মণি মা..."
সুনেহেরা এক লহমায় তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন।
"আমি এসেছি মা। এইতো আমি আছি। কিচ্ছু হবে না আমার লক্ষীর”
জ্বরে কাঁপতে কাঁপতে সাহারা তার আঁচল শক্ত করে ধরে রইল।
"আমাকে ছেড়ে যেও না..."
সুনেহেরার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটার গাল দুটো জ্বরে টকটকে লাল হয়ে আছে। চোখের কোণে জমে আছে অশ্রু। জান্নাত ভেজা কাপড় এনে কপালে রেখে দিল। কিছুক্ষণ পরই রাজ-হেকিম এসে উপস্থিত হলেন। নাড়ি পরীক্ষা করলেন। কপাল ছুঁয়ে দেখলেন। কয়েকটি প্রশ্ন করেও সাহারার কাছ থেকে স্পষ্ট উত্তর পেলেন না। ওষুধের ছোট্ট একটি থলি এগিয়ে দিয়ে বললেন,
"উচ্চ জ্বর। নিয়ম করে ওষুধ খাওয়াবেন। শরীর ঠান্ডা রাখতে হবে। বিশ্রামই এখন সবচেয়ে জরুরি।"
এই বলে তিনি বিদায় নিলেন। সুনেহেরা সাহারার মাথায় হাত বুলিয়ে বসে রইল।
জান্নাত নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এলো। অতিথিশালার কক্ষটি আজ গুছিয়ে ফেলতে হবে।
গতকাল আমিরাবাদের যুবরাজ ও তার মামা এখানেই ছিলেন। জান্নাত পরিষ্কার নতুন চাদর হাতে নিয়ে কক্ষে ঢুকল। জানালার পর্দা সরিয়ে আলো ঢুকিয়ে দিল। তারপর পুরোনো চাদরটা ভাঁজ করার জন্য বিছানার দিকে এগোতেই তার চোখে পড়ল বালিশের পাশে সূর্যের আলোয় চকচক করছে ছোট্ট একটি বস্তু। সে অবাক হয়ে সেটি হাতে তুলে নিল।বএকটি অপূর্ব লকেট।
সূক্ষ্ম কারুকাজে তৈরি। মাঝখানে বসানো উজ্জ্বল সবুজ রঙের একটি পাথর। আলো পড়তেই পাথরটি অদ্ভুত দীপ্তিতে ঝলমল করে উঠল। জান্নাত বিস্ময়ে ফিসফিস করে বলল,
"এটা কার? এখানে এল কীভাবে?"
তার মনে পড়ে গেল এই কক্ষেই তো গতকাল আমিরাবাদের যুবরাজ মেহরাব এবং তার মামা অবস্থান করেছিলেন। তাহলে লকেটটি কি তাদের কারও? নাকি অন্য কারও অজান্তে এখানে পড়ে থাকা কোনো রহস্যের শুরু? লকেটটি হাতের মুঠোয় নিয়ে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইল জান্নাত। তবে লকেট টা দেখে খুব দামি মনে হচ্ছে। জান্নাত আলগোছে তা ওড়নার কোণায় গিট দিয়ে রাখলো।
***
আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদ বড় ব্যস্ত। পাশের রাজ্য থেকে রাজকীয় নিমন্ত্রণ এসেছে। তাদের যুবরাজের বিজয়োৎসব উপলক্ষে আশপাশের সকল মিত্র রাজ্যের সম্রাট ও রাজপরিবারকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। সম্রাট হারুন ওয়াসেম, আয়েশা বেগম, যুবরাজ মেহরাব, আলীরাজসহ রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যরা সেদিকেই রওনা হলেন।
প্রত্যেকের পরনে রাজকীয় পোশাক। সম্রাটের গায়ে গাঢ় সবুজ জোব্বা, সোনালি জরির কাজ করা আলখাল্লা। মেহরাব কে আরও ভয়ংকর সুদর্শন লাগছে। কালো রঙের দামি আরবি জোব্বার ওপর সূক্ষ্ম সোনালি নকশা। প্রশস্ত বুকের ওপর ঝুলছে রাজবংশের প্রতীকখচিত স্বর্ণালংকার। কোমরে বাঁধা রত্নখচিত তরবারি।
মাথায় কালো পাগড়ি, যার মাঝখানে বসানো পান্নার পাথর সকালের আলোয় ঝিকমিক করছে।
তার দীর্ঘদেহ, প্রশস্ত কাঁধ, পেশিবহুল বাহু আর সোজা হয়ে হাঁটার ভঙ্গিতে জন্মগত রাজকীয় ব্যক্তিত্ব স্পষ্ট ফুটে উঠছে। আলী পাশে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল
"তোর দিকে মেয়েরা তাকালে তুই কিন্ত বামে ইশারা করবি”
মেহরাব নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল
“ কেন?”
“কারণ তোর বাম দিকে আমি দাড়িয়ে থাকবো”
ওর রসিকতার শেষ নেই। কবে যে একটু বুঝদার হবে
“চুপ করে ওঠো।"
দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে তারা পৌঁছাল সেই রাজ্যে। দূর থেকেই চোখে পড়ল বিশাল সাদা পাথরের প্রাসাদ, উঁচু গম্বুজ, নীল কাঁচের জানালা, সোনালি মিনার। ফোয়ারার পানিতে সূর্যের আলো রংধনুর মতো ঝিলমিল করছে। প্রবেশদ্বারের দুই পাশে সারিবদ্ধ সৈনিক দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল।
অতিথিদের ওপর গোলাপজল ছিটিয়ে দেওয়া হলো। রুপার থালায় খেজুর, বাদাম, পেস্তা, মধু ও নানা রকম মধ্যপ্রাচ্যের মিষ্টি পরিবেশন করা হচ্ছে। বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে আগর আর উদের সুগন্ধ। সঙ্গীতজ্ঞরা বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন। অতিথিদের জন্য পৃথক পৃথক বিশ্রামকক্ষের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সত্যিই তাদের আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি নেই।
কিছুক্ষণ পর মেহরাব একা বেরিয়ে এলো প্রাসাদের বাগানে। অবশ্য একা বলতে আলীও পিছু নিয়েছে। এটা মুক্তোর মালা হয়ে ওর গলদয় ঝুলে থাকে। চারদিকে নানা রঙের গোলাপ, কামিনি, গন্ধরাজ আর জুঁই ফুলে সাজানো বিশাল আঙিনা। মার্বেলের পথের দু'পাশে খেজুরগাছের সারি। মাঝখানে নীল পানির ফোয়ারা। মেহরাব ধীর পায়ে চারপাশ দেখছে। আলী ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে বলল,
"ভাগনে, এই রাজ্যে একটা বিয়ে করে ফেল। এমন বাগানে রোজ হাঁটবি।"
মেহরাব বরাবরের মত বিরক্ত হলো।
"তুমি তোমার বিয়ে নিয়ে ভাবো।"
“হাহহ, এই পোড়া কপালে আবার বিয়ে রে। তোর শাশুড়ী ডা দিস বাপ। আর কি করবি”
ঠিক তখনই অপর পাশের অলিন্দ থেকে কয়েকজন দাসীকে নিয়ে এগিয়ে এলেন সেই রাজ্যের শাহজাদী ‘রজনী’। পরনে আকাশি রঙের রাজকীয় পোশাক। মাথায় হিজাব বাধা।অপরূপ সুন্দরী। মসৃণ গায়ের রং, বড় বড় চোখ, সুঠাম গড়ন যে কাউকে প্রথম দেখায় মুগ্ধ করার মতো সৌন্দর্য তার। দৃষ্টি আটকে গেল যুবরাজ মেহরাব এর দিকে। এত সুদর্শন রাজপুত্র?
ঘন কালো পাপড়িতে ঘেরা সেই শিকারির মতো দৃষ্টি, সোজা নাক, পরিপাটি দাড়ি আর মুখজুড়ে এক অদ্ভুত কঠোর ব্যক্তিত্ব। মনে হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্র থেকেই হেঁটে আসছে। রজনী অজান্তেই ঘোরের মধ্যে ঢুকে গেল। তার চোখ মেহরাবের মুখ থেকে একবারও সরল না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে মানুষটিকে। যেন প্রতিটি রেখা মনে গেঁথে নিতে চাইছে। আলী অনেক আগেই বিষয়টা বুঝলেও মেহরাব কে জানালো না । কিন্তু মেহরাব এর শিকারী চোখ ফাঁকি দিতে পারলো না রজনীর নজর।
জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা পশুর উপস্থিতিও যার চোখ এড়ায় না, তার চোখ এড়িয়ে মানুষের দৃষ্টি যাবে কী করে? সরাসরি রজনীর দিকে তাকাল সে।
সম্পূর্ণ ভদ্র, সংযত কণ্ঠে মেহরাব বলল,
"কিছু বলবেন?"
রজনী চমকে উঠল। মেহরাব শান্তভাবেই কথাটা শেষ করল
"অনেকক্ষণ ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। মনে হলো হয়তো কিছু বলার ছিল।"
প্রশ্নটা শুনে রজনী বেশ অস্বস্তি তে পড়ে গেল। দাসীরাও মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। আর একটু আলীরাজ মনে মনে বলল,
"হায় আল্লাহ! এবার শুরু হলো নতুন বিপদ!”
মেহরাব হর বাহু নিজের বাহু দিয়ে আকড়ে ধরে বগল দাবা করে নিয়ে গেল প্রাসাদের বাগানের অন্য প্রান্তে। যুবরাজ ও যোগ দিলো। রাজকীয় আপ্যায়নের পর অতিথিদের নিয়ে প্রাসাদের বাগান ও সংলগ্ন অংশ ঘুরে দেখাচ্ছিলেন সেই রাজ্যের যুবরাজ।
মেহরাব ও আলীরাজ তার সঙ্গেই হাঁটছিল। তবে আরেকটি বিষয় আলীরাজের চোখ এড়াল না।
যেদিকেই তারা যাচ্ছে, কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে শাহজাদী রজনীও সেদিকেই যাচ্ছে। আলী বিরক্ত হয়ে ফিসফিস করে বলল,
"মেহু, দেখেছিস?"
"কী?"
"তোর একটা লেজ গজিয়েছে।"
মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"মামা?”
আলী ঠোঁট চেপে হেসে রজনীর দিকে চোখের ইশারা করল।
"ওই যে, শাহজাদী সাহেবা। আমরা যেখানে যাই, উনিও সেখানেই।"
মেহরাব পিছন ফিরতে গেলেই আলী হাত দিয়ে চোখ ঢেকে দিলো
“ওদিকে তাকাস না বাপ। এক ঢেপসি মুখীর মামা শশুড় হয়ে জনসমাগমে মুখ দেখাতে পারি না। এ তো চামচিক্কি। তুই ওদিকে চল, চল”
চোখ ধরেই টেনে নিয়ে যাচ্ছে মেহরাব কে। রজনী এই দামড়া ছেলেদের এমন উদ্ভট কর্ম দেখে অবাক হলো। এরা কি বাচ্চা আছে? এমন করঋে কেন?”
হাঁটতে হাঁটতে তারা প্রাসাদের উত্তর প্রান্তে এসে দাঁড়াল। মেহরাব মানুষজন দেখে কিছু বলতেও পারছে না আলীকে। মহলে নিয়ে আচ্ছা করে ধোবে। দূরে পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে বিস্তৃত এক গভীর অরণ্য দেখা যাচ্ছে। ঘন বৃক্ষরাজি এতটাই নিবিড় যে মনে হচ্ছে দিনের আলোও ঠিকমতো ভেতরে ঢুকতে পারে না। মেহরাবের চোখ চকচক করে উঠল। সে আগ্রহভরে জিজ্ঞেস করল,
"ওটা কোন জঙ্গল?"
যুবরাজ হেসে বললেন,
"ওটা আমাদের পাটনা অরণ্য।"
"শিকার হয় সেখানে?"
"হরিণের অভাব নেই। বুনো মহিষও আছে।"
মেহরাবের চোখে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল।
"বাহহ তাহলে তো দারুণ হয়!"
যুবরাজ এবার একটু গম্ভীর হলেন।
"তবে একটা সমস্যা আছে। ওখানে ভয়ংকর সব বাঘের বিচরণ। কয়েকজন শিকারি আর সৈনিককে হারিয়েছি। এখন সাধারণ কেউ আর ওদিকে যায় না।"
মেহরাবের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল। ঠিক এমন জায়গাই তো তার পছন্দ। যেখানে বিপদ আছে। শিকারির রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করে।
সে দূরের অরণ্যের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এমন জঙ্গলেই তো সত্যিকারের শিকারের আনন্দ।"
আলী সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করল,
“আনন্দ তোর, জান যাবে আমার!"
যুবরাজ ভড়কে যায়। মেহরাব হাসতে হাসতেই বলল,
"খুব শিগগিরই আবার আসব। মামাকে নিয়ে।"
আলী মুখ হাঁ করে তাকাল।
"আমাকে জিজ্ঞেস করলি?"
"না।"
আলী যুবরাজের দিকে তাকিয়ে বলল
“দেখেছেন? আমার কোনো মূল্যই নেই।"
এতক্ষণ নীরব থাকা রজনী ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। ভদ্রভাবে বলল,
"যুবরাজ, আপনি যখন শিকারে আসবেন... তখন আমাদের প্রাসাদেই থাকবেন। এখান থেকে অরণ্য খুব কাছে। শিকারও নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারবেন।"
মেহরাব সৌজন্যবশত মাথা নত করল।
"আপনার আতিথেয়তার জন্য কৃতজ্ঞ। সুযোগ হলে অবশ্যই আসব।"
রজনীর মুখে মৃদু হাসি ফুটল। ঠিক তখনই আলী হঠাৎ থেমে মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলল।
"এই... তোর গলায় লকেটটা কোথায়?"
মেহরাব অবাক হয়ে নিজের গলায় হাত দিল। মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সত্যিই সবুজ পান্না বসানো রূপার লকেটটি নেই। আলী বলল
“অত দামি রত্ন তুই কোথায় ফেললি বাপ?”
মেহরাব কিছুক্ষণ ভেবে শান্ত স্বরে বলল,
"হয়তো কোথাও পড়ে গেছে। যাক বাদ দাও।”
আলী বিরক্ত হয়ে মাথায় হাত দিল।
"ওটা কিন্তু তোর খুব প্রিয় ছিল!"
মেহরাব হালকা হাসল।
"যদি ভাগ্যে থাকে, ফিরে আসবে।"
মুচকি হাসে যুবরাজ, মন জানে সত্যিটা। লকেটটা হারায়নি। সে নিজেই ইচ্ছে করে সাহাবাদ প্রাসাদের অতিথিশালায় রেখে এসেছে।
কেন? কারণ একটা অজুহাত দরকার ছিল। আবার একবার সাহাবাদ যাওয়ার। আবার একবার সেই শান্ত মুখটাকে দেখার। বাগানের এক কোণে ফুটে থাকা রক্তলাল গোলাপের ঝোপের সামনে এসে থামল মেহরাব। আস্তে করে একটি গোলাপ ছিঁড়ে হাতে নিল। ফুলটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজান্তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো কালো ওড়নায় মোড়া এক মায়াবী মুখ। নিচু করা লাজুক দৃষ্টি। শান্ত স্বভাব। ইশশশশ কি মিষ্টি, কি লক্ষী। মিষ্টি পরিবেশন করার সেই মুহূর্ত। জীবনে মিষ্টি ছুয়ে না দেখা মেহরাব ও চার, চারটে কাঁচাগোল্লা খেয়ে নিয়েছে। মেহরাব মৃদু স্বরে বলল,
“জান্নাত? জান্নাতের মতই সুন্দর"
*****
ধরণীর বুকে রাত নেমেছে। আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে অগণিত তারার মেলা। অর্ধচন্দ্রের ফিকে আলোয় সাহাবাদ নগর আজও ঈগল চক্ষুর ন্যায় তীক্ষ্ম লাগছে। প্রহরীরা নগরের প্রতিটি ফটকে দ্বিগুণ পাহারা দিচ্ছে। তবু শাখার মন কু গাইছে।
নিজ কক্ষে বসে কালো পোশাক পরে নিল। কোমরে চামড়ার বেল্ট শক্ত করে বাঁধল। তার মধ্যে গুঁজে দিল ছোট ছুরি। পিঠে ঝুলিয়ে নিল তূণীর। কোমরে ঝুলল তার প্রিয় তরবারি। তারপর লম্বা কালো ওড়নায় মাথা-মুখ এমনভাবে ঢেকে নিল যে শুধু দু'টি তীক্ষ্ণ চোখ দৃশ্যমান রইল।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে একবার দেখে নিল। এভাবে দেখলে কেউ বুঝবেও না সে সাহাবাদের রাজকন্যা। দরজা খুলে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল। অস্তাবল থেকে নিজের প্রিয় কালো ঘোড়াটিকে নিয়ে প্রাসাদের পেছনের পথ ধরে নগরের দিকে রওনা দিল।
নগরের অলিগলি অস্বাভাবিক শান্ত। দোকানপাট অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কেবল কয়েকটি দোকানে দু-একজন পথিক বসে আছে। শাখা ধীর গতিতে একের পর এক গলি পেরিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। প্রতিটি মোড়ে থেমে চারপাশ দেখছে। কোনো সন্দেহজনক লোক চোখে পড়লেই কিছুক্ষণ অনুসরণ করছে।
কিন্তু কোথাও কিছু নেই। তিন দিন ধরে ডাকাতদের কোনো আক্রমণ হয়নি। এই বিষয়টাই তাকে আরও অস্থির করে তুলছে। ঝড়ের আগে প্রকৃতি যেমন শান্ত হয়ে যায়, ঠিক সেরকম। নগর ছেড়ে এবার ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে দিল কাটাগিরির জঙ্গলের দিকে।
জঙ্গলের প্রবেশপথে এসে ঘোড়া থামাল শাখা।
চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো পাতার মর্মর শব্দ। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বৃক্ষগুলো যেন নীরব প্রহরীর মতো তাকিয়ে আছে। শাখা লাগাম শক্ত করে ধরে চারপাশে নজর রাখতে লাগল।
সময় ধীরে ধীরে গড়িয়ে যাচ্ছে। আরও অনেকটা সময় কেটে গেল। তবুও কেউ এল না। শাখা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হয়তো আজও আসবে না। সে ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে প্রাসাদের দিকে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।
ঠিক তখনই দূর থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত শব্দ। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ। শাখা মুহূর্তেই সোজা হয়ে বসল। কান খাড়া করল। শব্দটা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। সে দ্রুত ঘোড়াটিকে রাস্তার পাশের বিশাল শিমুলগাছের আড়ালে নিয়ে এল।
নিজেও আড়াল হলো। এবার পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে। ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে আসছে একদল অশ্বারোহী। শাখা গাছের আড়াল থেকে সতর্ক দৃষ্টিতে সামনে তাকাল। চাঁদের ফিকে আলোয় ধীরে ধীরে ভেসে উঠল কালো পোশাক পরা একের পর এক অশ্বারোহীর অবয়ব। প্রায় দশ-বারোজন সশস্ত্র অশ্বারোহী। প্রত্যেকের মুখ ঢাকা। কোমরে ঝুলছে ধারালো অস্ত্র। তাদের ঘোড়ার গতি দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে কোনো সাধারণ পথিক নয়। কোথাও যাওয়ার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়েই ছুটে চলেছে তারা।
শাখা নিঃশব্দে তরবারির হাতলে হাত রাখল। তার তীক্ষ্ণ চোখ এবার স্থির হয়ে রইল সেই রহস্যময় অশ্বারোহী দলের ওপর। আচমকা তার গলায় আটকা পড়লো ধারালো এক বাঁকানো তলোয়ার। আতঙ্কিত হয়ে সামনে তাকাতেই চোখাচোখি ধূসর চোখের ধারালো দৃষ্টির সাথে।