প্রথম অধ্যায়
আশ্বিনের শেষ দিকের সন্ধ্যাগুলো ঢাকা শহরে খানিকটা দ্বিধা নিয়ে নেমে আসে। দিনটাকে পুরোপুরি বিদায় জানাতে যেন আকাশের মন সায় দেয় না। পশ্চিমের দালানগুলোর মাথায় তখনো এক চিলতে কমলা আভা লেগে থাকে, অথচ পূর্ব দিকে ততক্ষণে নেমে আসে নীলচে ছায়া। আর সেই দুই রঙের মাঝখানে মিরপুরের পুরোনো গলিগুলো ভরে ওঠে রিকশার টুংটাং, ফুচকাওয়ালার হাঁকডাক আর মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা মাগরিবের আজানের দীর্ঘ, মায়াময় সুরে। এমনই এক সন্ধ্যায় মেইন রোডের পাশের হলদেটে পাঁচতলা বাড়িটার চারতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে রওশন আরা বারবার গলির মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। এই রাস্তা ধরে রোজ তাঁর একমাত্র মেয়ে অহনা কলেজ থেকে ফেরে।
বারান্দাটা ছোট, কিন্তু বেশ যত্নে সাজানো। গ্রিলের গা বেয়ে উঠে গেছে মানিপ্ল্যান্টের লতা, টবে দুটো বেলি আর একটা হাসনাহেনা, যেটা অহনার বাবা আনোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার মাস ছয়েক আগে এক নার্সারি থেকে শখ করে কিনে এনেছিলেন। গাছটায় এখন রাত নামলেই ফুল ফোটে, গন্ধে সারা ফ্ল্যাট ভরে যায়। অথচ যে মানুষটা ফুলের আশায় গাছটা এনেছিলেন, তিনি একটা কুঁড়িও ফুটতে দেখে যেতে পারেননি। বারান্দার কোণে তাঁর বেতের চেয়ারটা এখনো পাতা আছে, কেউ তাতে বসে না। প্রতি শুক্রবার রওশন আরা নিজের হাতে চেয়ারটা মুছে রাখেন যেন ওই মানুষটা যেকোনো দিন অফিস থেকে ফিরে চায়ের কাপ হাতে সেখানে এসে বসবেন, খবরের কাগজ মেলে ধরে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে বলবেন, “দেশের অবস্থা দেখেছ, রওশন? পেঁয়াজের দাম আবার আকাশে উঠেছে। নাহ! আর সুদিন বোধহয় আসবে না।”
দুই বছর হয়ে গেল মানুষটা নেই। মানুষের জীবনে দুই বছর খুব বেশি সময় নয়, আবার খুব কমও নয়। এই সময়ের মধ্যে শোকের তীব্রতা খানিকটা ভোঁতা হয়ে আসে, কিন্তু শূন্যতার আকারটা ঠিকই রয়ে যায়। প্রাত্যহিক জীবনে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও মানুষের এগিয়ে যেতে হয় কারণ সময় কারোর জন্য, কোনো শোকের জন্য থেমে থাকে না। শোকের সেই সর্বগ্রাসী শুন্যতা শুধু ঘরের ভেতর এক অদৃশ্য আসবাবের মতো থেকে যায় যার সাথে চলতে ফিরতে বারবার ধাক্কা লাগে। আর সেই শোক জানান দেয়, 'এই তো আমি আছি, সবসময়ই তোমার কাছেই থাকব।'
গলির মুখে একটা রিকশা এসে থামতেই রওশন আরার মুখে স্বস্তির ছায়া পড়ল। অহনা এক হাতে কাপড়ের ব্যাগভর্তি খাতা ও কাঁধে বাবার দেওয়া পুরোনো চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে নামছে। ভাড়া মিটিয়ে সে বুড়ো রিকশাওয়ালার সাথে কী একটা কথা বলল, আর লোকটা দাঁতহীন মুখে হাসতে হাসতে মাথা নাড়ল। মেয়েটার এই এক স্বভাব, দুনিয়ার যেকোনো মানুষের সাথে দুই মিনিটে তার আলাপ জমে যায়। পাড়ার দারোয়ান, সবজিওয়ালা, কলেজের পিয়ন, মোড়ের চায়ের দোকানের ছোকরা, সবাই “অহনা আপা”কে চেনে, আর যারা চেনে, মিশুকে স্বভাবের জন্য তাকে ভালো না বেসে পারে না। রওশন আরা আর দাঁড়ালেন না, তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে গিয়ে চুলায় চায়ের পানি চড়িয়ে দিলেন।
অহনা যখন হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলো, ততক্ষণে কেটলিতে শোঁ শোঁ শব্দ উঠেছে, আর ডাইনিং টেবিলে প্লেটে সাজানো হয়েছে মুড়ি, চানাচুর আর দুপুরে ভাজা পেঁয়াজুর অবশিষ্ট কয়েকটা টুকরো।
ছাব্বিশ বছরের অহনা মিরপুরের একটা কলেজে বোটানি পড়ায়। তার গায়ের রং ঘন শ্যামলা, শ্রাবণের দুপুরে মেঘ জমে এলে আকাশ যেমন গাঢ় অথচ শান্ত, শীতল ও কোমল একটা রং ধরে, অনেকটা সেরকম। কিন্তু তার সেই শ্যামলা মুখের দিকে একবার তাকালে চোখ সরিয়ে নেওয়া কঠিন। ছলকপটতার ছায়াহীন চোখ দুটো ভীষণ স্পষ্ট, স্বচ্ছ ও সারল্যে ভরপুর। সেই চোখে কোনো হিসাবনিকাশ নেই, আছে পৃথিবীর প্রতি বিশ্বাস ও ভরসা। তার মতে, পৃথিবীর সব মানুষই আসলে ভালো, শুধু কেউ কেউ সেটা ভুলে গেছে। মানুষ এখনো মানুষ বলেই পৃথিবী এখনো সুন্দর, এই বিশ্বাস অহনার এত তীব্র যে তার আশেপাশের সকলেই সেই বিশ্বাসে ভরসা রাখতে বাধ্য হয়।
এই পাড়ার মুরুব্বি রাবেয়া খালা, ঘটকালি করা যার শখের কাজ, তিনি প্রায়ই রওশন আরার কাছে এসে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, “মেয়েটার মুখখানা মাশাল্লাহ একেবারে আসমানের চাঁদের মতো। খালি রংটা যদি আরেকটু...” বাকিটা তিনি বলেন না, বলার দরকারও হয় না। এই অসমাপ্ত বাক্যটা অহনা ছোটবেলা থেকে এত শুনেছে যে এখন আর গায়ে লাগে না, অথবা লাগে, কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দেয় না।
“আজ এত দেরি হলো যে?” চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে দিতে রওশন আরা জিজ্ঞেস করলেন।
অহনা চেয়ারে বসেই একটা পেঁয়াজু তুলে নিল, “মিটিং ছিল, মা। প্রিন্সিপাল স্যার একবার কথা শুরু করলে থামার নাম নেন না, তুমি তো জানোই। আধা ঘণ্টার মিটিং দুই ঘণ্টায় গিয়ে ঠেকল। তার উপর শেষে ঘোষণা দিলেন, সামনের মাসে অনার্সের ছেলেমেয়েদের নিয়ে খাগড়াছড়িতে স্টাডি ট্যুর হবে।”
“পাহাড়ে?” রওশন আরার কপালে ভাঁজ পড়ল। চিন্তিত মুখে বললেন, “এই বর্ষার শেষে কেউ পাহাড়ে যায়? ক্যালেন্ডারে বর্ষা প্রায় শেষ হলেই কি! ঝড়-বৃষ্টি কি আর দিন-তারিখ মেনে হয়? খবরে দেখিস না, প্রতি বছর কোথাও না কোথাও পাহাড় ধসে পড়ছে? শুকনো মৌসুমে যাওয়াই তো ভালো।”
“বোটানির ছাত্রছাত্রীরা শুকনো মৌসুমে ন্যাড়া পাহাড় দেখতে যাবে, মা? গাছপালা চিনতে-জানতে যাবে, তাই এখন না গেলে পরে আর সুবিধাজনক হবেও না। অনেক গাছ আছে মা যেগুলো সমস্ত শুকনো মৌসুম ঘুমন্ত অবস্থায় থাকে। মানে ওদের শেকড় মাটির নিচে থাকলেও উপরে কিছু থাকে না। আগামী বসন্তের অপেক্ষায় থাকতে হবে ওদের দেখার জন্য। যাবই যেহেতু যতটা বেশি সম্ভব ছেলেমেয়েরা শিখতে, দেখতে ও জানতে পারে সেই চেষ্টাই করব।” অহনা হাসল। একটু থেমে শান্ত মুখে বলল, “আর আমি এখনো ঠিক করিনি যাব কিনা। স্যার তিনজন শিক্ষকের নাম চেয়েছেন, দেখা যাক কার কপালে কী আছে। তোমাকে একা ফেলে যেতেও ইচ্ছে হয় না, মা।”
মেয়ের হাসিতে রওশন আরার মুখও খানিকটা নরম হলো, কিন্তু চোখের কোণের দুশ্চিন্তার রেখাটা মিলিয়ে গেল না।
চলবে ইনশাআল্লাহ---