আচ্ছা! আমার ভুল হয়েছে। 😭 তুমি তো আগেই বলেছ, উপন্যাসের প্রতিটি পর্ব ৯০০+ শব্দের হতে হবে।
এবার প্রথম পর্বটা বড় করে, সুন্দর সংলাপ, কমেডি, রহস্য, আবেগ এবং বিস্তারিত দৃশ্যসহ লিখে দিচ্ছি।
লেখিকা: আরফা আইরিশা
### অদৃশ্য মায়াজাল
### পর্ব ১: অন্ধকারের প্রথম ডাক
রাত ১১টা ৪৫ মিনিট।
ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো ধীরে ধীরে নীরব হয়ে আসছে। উঁচু উঁচু ভবনের জানালায় জ্বলছে কিছু আলো। কোথাও মানুষের ব্যস্ততা, কোথাও নিস্তব্ধতা। কিন্তু শহরের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বাড়িটির ভেতরে যেন অন্যরকম এক পরিবেশ।
বাড়িটির নাম মাহমুদ ভিলা।
বাড়ির দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আটাশ বছর বয়সী এক যুবক। পরনে কালো শার্ট, চোখে গম্ভীর দৃষ্টি। তার নাম আদ্রিয়ান মাহমুদ।
শহরের পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সে। মানুষের কাছে তার পরিচয় একজন প্রভাবশালী নেতা হিসেবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য অনেকেই তাকে সম্মান করে। তবে তার জীবনের এমন কিছু অধ্যায় আছে, যেগুলো সম্পর্কে বাইরের কেউ জানে না।
হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে তানভীরের নাম ভেসে উঠল।
আদ্রিয়ান ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে তানভীরের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ শোনা গেল।
— স্যার, একটা সমস্যা হয়েছে।
— বলো।
— পুরোনো ফাইলটা আবার সামনে এসেছে।
আদ্রিয়ানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
— কোন ফাইল?
— মাহির চৌধুরীর ফাইল।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
আদ্রিয়ান ধীর কণ্ঠে বলল,
— ফাইলটা তো এত বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
— জি স্যার। কিন্তু আজ সকালে কেউ একজন সেটার কিছু কাগজ আমাদের অফিসে পাঠিয়েছে।
— কে পাঠিয়েছে?
— সেটা এখনো জানা যায়নি।
আদ্রিয়ান সামনের অন্ধকার রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
— কাগজগুলো আমার কাছে নিয়ে এসো। আর কে পাঠিয়েছে, সেটা খুঁজে বের করো।
— ঠিক আছে, স্যার।
ফোন কেটে গেল।
আদ্রিয়ান নিজের মনে বলল,
— কিছু মানুষ অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পারে না। কারণ অতীতই একদিন তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এল।
— ভাইয়া!
আদ্রিয়ান ফিরে তাকাল।
তার ছোট ভাই রায়ান দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে এক কাপ কফি।
— কী হয়েছে? আবার দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করছ?
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— তুই এখনো ঘুমাসনি?
— না। তোমার মতো গম্ভীর মানুষের বাড়িতে থাকলে ঘুমও পালিয়ে যায়।
— রায়ান!
— আচ্ছা আচ্ছা, যাচ্ছি। তবে একটা কথা, তোমার মুখে হাসি আনতে পারলে আমি নিজেকে দেশের সেরা বিনোদনমন্ত্রী ঘোষণা করব।
আদ্রিয়ান এবার আর কথা বলল না।
রায়ান নিজের মনে বলল,
— এই বাড়িতে আমার প্রতিভার কোনো মূল্য নেই!
সকাল ৮টা।
রহমান বাড়ির রান্নাঘরে বেশ ব্যস্ততা চলছে।
ইশরাত নওশিন টেবিলে বসে নাশতা খাচ্ছে। তার ছোট বোন নীলা পাশে বসে মোবাইল দেখছে।
নওশিন বলল,
— নীলা, তোর পরীক্ষা কবে?
নীলা মোবাইল থেকে চোখ না তুলেই বলল,
— আপু, সকালে সকালে পড়াশোনার কথা বলো না। আমার সুন্দর মনটা নষ্ট হয়ে যায়।
— তোর সুন্দর মনটা কোথায়?
— বুকের ভেতরে।
— সেখানে তো ফুসফুস থাকে।
নীলা মুখ তুলে তাকাল।
— আপু, তুমি কি আমাকে অপমান করার জন্যই বড় হয়েছ?
নওশিন হেসে ফেলল।
তাদের বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আবদুল রহমান পত্রিকা পড়ছিলেন।
তিনি বললেন,
— তোমরা দুজন সকালে ঝগড়া না করলে আমার পত্রিকা পড়াই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
নীলা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— বাবা, আপু আমাকে বিরক্ত করছে।
— তুই আগে মোবাইলটা নামা।
— বাবা! তুমি আমার পক্ষেও নেই?
— আমি শান্তির পক্ষে আছি।
নওশিন হাসতে হাসতে নাশতা শেষ করল।
আজ তার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান রয়েছে। এলাকার কিছু মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরার জন্য তারা একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
নওশিন দীর্ঘদিন ধরে এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করা তার স্বভাব।
দুপুর ১২টা।
অনুষ্ঠানস্থলে বেশ কিছু মানুষ উপস্থিত হয়েছে। নওশিন কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীর সঙ্গে কথা বলছিল।
হঠাৎ কয়েকজন লোক এসে অনুষ্ঠান বন্ধ করার নির্দেশ দিল।
একজন বলল,
— এই অনুষ্ঠান আর চলবে না।
নওশিন অবাক হয়ে বলল,
— কেন?
— আমাদের ওপর থেকে নির্দেশ এসেছে।
— কার নির্দেশ?
— সেটা তোমার জানার দরকার নেই।
নওশিন শান্তভাবে বলল,
— মানুষের সমস্যার কথা তুলে ধরতে আমরা এখানে এসেছি। এখানে কোনো অন্যায় হচ্ছে না। তাহলে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে কেন?
লোকটি বিরক্ত হয়ে বলল,
— বেশি কথা বলো না।
নওশিন এবার দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— অন্যায়ের সামনে চুপ থাকাকে ভদ্রতা বলে না।
ঠিক তখনই পেছনে কয়েকটি গাড়ি এসে থামল।
গাড়ি থেকে নামল আদ্রিয়ান মাহমুদ।
তার সঙ্গে তানভীরও রয়েছে।
আদ্রিয়ান পরিস্থিতি দেখে জিজ্ঞেস করল,
— এখানে কী হচ্ছে?
লোকগুলো তাকে দেখে চুপ হয়ে গেল।
নওশিন সামনে এগিয়ে এল।
— আপনার দলের কিছু লোক মানুষের কথা বলতে দিচ্ছে না।
আদ্রিয়ান তার দিকে তাকাল।
— আপনার অভিযোগ কী?
— অভিযোগ খুব সাধারণ। আপনার দলের পরিচয় ব্যবহার করে তারা এলাকার মানুষের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে টাকা দাবি করছে। আজকের অনুষ্ঠান বন্ধ করতে এসেছে। আপনি যদি সত্যিই মানুষের পাশে থাকেন, তাহলে বিষয়টা তদন্ত করুন।
তানভীর নওশিনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল, মেয়েটার সাহস আছে!
আদ্রিয়ান কর্মীদের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তানভীর, বিষয়টা তদন্ত করবে। অভিযোগ সত্যি হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
— জি, স্যার।
নওশিন কিছুটা অবাক হলো।
সে ভেবেছিল আদ্রিয়ান হয়তো তার সঙ্গে তর্ক করবে। কিন্তু লোকটি বরং অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিল।
আদ্রিয়ান এবার জিজ্ঞেস করল,
— আপনার নাম কী?
— ইশরাত নওশিন।
— পুরো নাম?
— ইশরাত নওশিন রহমান।
নামটি শুনে আদ্রিয়ান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
— রহমান?
নওশিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
— জি। কোনো সমস্যা?
— না।
কিন্তু আদ্রিয়ানের চোখে তখন স্পষ্ট বিস্ময়।
বিকেল ৫টা।
মাহমুদ ভিলায় ফিরে আদ্রিয়ান নিজের ঘরে ঢুকল।
তানভীর ইতিমধ্যে একটি পুরোনো ফাইল নিয়ে অপেক্ষা করছিল।
— স্যার, এই নিন।
আদ্রিয়ান ফাইলটি খুলল।
ভেতরে কয়েকটি পুরোনো ছবি, কিছু কাগজ এবং একটি চিঠি রয়েছে।
একটি ছবিতে তার বাবা, মাহির চৌধুরী এবং একজন অপরিচিত নারী দাঁড়িয়ে আছেন।
ছবিটি হাতে নিয়ে আদ্রিয়ান স্থির হয়ে গেল।
নারীটিকে সে আগে কোথাও দেখেছে।
তানভীর বলল,
— স্যার, ছবির পেছনে কিছু লেখা আছে।
আদ্রিয়ান ছবিটি উল্টে দেখল।
সেখানে লেখা—
"যেদিন সত্য প্রকাশ পাবে, সেদিন দুটি পরিবারের সম্পর্ক চিরদিনের জন্য বদলে যাবে।"
আদ্রিয়ান জিজ্ঞেস করল,
— এই নারী কে?
তানভীর মাথা নাড়ল।
— এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।
আদ্রিয়ান আবার ছবিটির দিকে তাকাল।
হঠাৎ তার মনে পড়ল, দুপুরে দেখা মেয়েটির পদবি রহমান।
ছবির নারীর নামের পাশে লেখা ছিল—
মেহের রহমান।
আদ্রিয়ান ধীরে ধীরে চেয়ারে হেলান দিল।
— তানভীর, রহমান পরিবারের ব্যাপারে খোঁজ নাও।
— কেন স্যার?
— কারণ আমার মনে হচ্ছে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া একটা গল্প আবার শুরু হয়েছে।
রাত ১০টা।
নওশিন নিজের ঘরে বসে ছিল। হঠাৎ ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
"তোমার পরিবারের অতীত সম্পর্কে তুমি কতটুকু জানো?"
নওশিন উত্তর দিল,
"আপনি কে?"
কিছুক্ষণ পর আবার মেসেজ এল।
"তোমার মায়ের মৃত্যুর পেছনে যে সত্য লুকিয়ে আছে, সেটা জানার সাহস আছে?"
নওশিনের হাত থেমে গেল।
তার মা মারা গেছেন বহু বছর আগে। পরিবারের কেউ কখনো মায়ের মৃত্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে চায় না।
সে দ্রুত লিখল,
"আমার মায়ের ব্যাপারে আপনি কী জানেন?"
উত্তর এল,
"আদ্রিয়ান মাহমুদের কাছ থেকে দূরে থাকবে।"
নওশিন অবাক হয়ে গেল।
আদ্রিয়ান মাহমুদ?
এই মানুষটির সঙ্গে তার মায়ের কী সম্পর্ক?
ঠিক তখনই জানালার বাইরে একটি গাড়ির শব্দ শোনা গেল।
নওশিন পর্দা সরিয়ে তাকাল।
রাস্তার ওপারে একটি কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
গাড়ির ভেতরে কেউ একজন বসে আছে। মুখ দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর গাড়িটি ধীরে ধীরে চলে গেল।
নওশিনের মনে অজানা প্রশ্ন জমতে লাগল।
অন্যদিকে মাহমুদ ভিলায় আদ্রিয়ানও একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ পেল।
"যাকে খুঁজছ, সে তোমার সামনেই এসেছে। এবার দেখো, তুমি তাকে বাঁচাবে নাকি নিজের অতীতকে?"
আদ্রিয়ান মেসেজটি পড়ে ফোন নামিয়ে রাখল।
ঠিক তখনই দরজায় শব্দ হলো।
রায়ান মাথা ঢুকিয়ে বলল,
— ভাইয়া, ভেতরে আসতে পারি?
— কী হয়েছে?
— কিছু না। ভাবলাম তুমি একা একা গম্ভীর হয়ে বসে আছ। একটু বিরক্ত করে যাই।
আদ্রিয়ান বিরক্ত হয়ে তাকাল।
— তোর কি কোনো কাজ নেই?
— আছে। কিন্তু তোমাকে বিরক্ত করার কাজটা আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আদ্রিয়ান এবার হালকা হেসে ফেলল।
রায়ান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ওহ! ইতিহাস তৈরি হলো! আমার ভাই হাসছে!
— বের হয়ে যা।
— হাসিটা ধরে রাখো ভাইয়া। মুখে ভালো লাগে!
রায়ান চলে গেল।
আদ্রিয়ান আবার ফোনের দিকে তাকাল।
তারপর পুরোনো ছবিটি হাতে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— মেহের রহমান... তোমার মেয়ের জীবনে কী অপেক্ষা করছে?
অন্যদিকে নওশিনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
সে জানত না, তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন এক রহস্য, যার সূত্র লুকিয়ে আছে বহু বছর আগের একটি ঘটনার মধ্যে।
আর সেই রহস্যের দরজা খুলতে যাচ্ছে এমন একজন মানুষ, যার কাছ থেকে দূরে থাকতে তাকে সতর্ক করা হয়েছে।
কিন্তু কেন?
মেহের রহমান কে?
মাহির চৌধুরী কেন এত বছর পর ফিরে এসেছে?
আর আদ্রিয়ানই বা নওশিনকে দেখে এতটা অস্থির হয়ে পড়ল কেন?
উত্তরগুলো এখনো অন্ধকারে ঢাকা।
চলবে...!!