ফন্ট সাইজ:
থিম:
জায়া ও পতি

পর্ব 37

লেখক: ইসরাত ইতি

#জায়া_ও_পতি
#সারপ্রাইজ_পর্ব-১

[ টাইটেল : চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে,নিয়ো না নিয়ো না সরায়ে ]

শামির চৌধুরী বিগত দশ মিনিট যাবত গলার কাছে টাই নিয়ে টানাটানি করছে। ওর ভাবটা এমন,যেন ও টাইয়ের নট বাঁধায় ভীষণ অপটু। আসলে তা নয়। ওর কপালের ঘন কালো ভ্রু যুগল কুঁচকে আছে, মুখভঙ্গি এমন,যেন কোনো ইম্পর্ট্যান্ট মিটিংয়ে যেতে দেরী হয়ে যাচ্ছে। টাই না বেঁধে এখন একটু শ্বাস নিলেও লস। এই ব্যস্ততা আসলে ওর অযুহাত। ওর ঠিক পেছনেই সুতি শাড়ির আঁচল মাথায় তুলে কাঁদো কাঁদো মুখের ব্যক্তিটিকে পাত্তা না দেওয়ার অযুহাত।‌

শামির খুব ভালো করে বিয়ের এই কয়মাসে উপলব্ধি করেছে, ও পুরুষ হিসেবে প্রচন্ড কট্টর হলেও ওর সর্বোচ্চ দূর্বল জায়গা ঐ শেয়ানা মেয়েটির চোখের পানি এটা ঐ মেয়েটি ধরতে পেরেছে। তাই প্রতিটি পদে পদে সুযোগ বুঝে এসে শামিরের সামনে পানি ফেলে চোখের। এটা ওর অস্ত্র। এমন করে চোখের পানি ফেলে এ যাবত কাল পর্যন্ত শেয়ানা মেয়েটি শামিরকে নরম বানিয়ে যা যা হাসিল করেছে তা হলো,

১.কলেজে ভর্তি হওয়া।
২.বাইরে টিউশন নিতে যাওয়ার পারমিশন।
৩.পুরুষ টিচারদের কাছে টিউশন নেওয়ার পারমিশন।
৩.বাড়ির গাড়ি ছাড়া একা একা যাতায়াত করার পারমিশন।
৪.বিকেলে পাড়ার মোড়ে গিয়ে ফুচকা খাওয়ার পারমিশন।
৫.একা একা মাঝে মাঝে শপিংয়ে যাওয়ার পারমিশন।

ব্যাস! অনেক হয়েছে। শামির চৌধুরীর নরম দিকটা পেয়ে বসে অনেক সুযোগ কাজে লাগিয়েছে এই মেয়ে। আর এই মেয়ের চোখের পানির ফাঁদে পা দেয়া যাবে না। না মানে না। শামির এখন তাকাবে না ঐ সরল,অবলা অবলা চোখ দুটিতে। তাহলেই ফেঁসে যাবে! অগত্যা এই মেয়েকে পারমিশন দিতে মন চাইবে স্টাডি ট্যুরে যাওয়ার জন্য।

কত বড় দুঃসাহস! কত লম্বা হয়েছে এই মেয়ের ঠ্যাং! বলে কিনা কুয়াকাটা যাবে ট্যুরে কলেজ থেকে! রীতিমত ফাজলামি!
ট্যুরে যাও,বাস ভর্তি বন্ধু বান্ধব নিয়ে ঘষাঘষি করো,সেখানে গিয়ে বেহাংরা মেয়েদের মতো চুল উড়িয়ে সমুদ্র সৈকতে পুরুষ টিচার আর ছেলে বন্ধুদের পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলো! হাক্কাহিক্কি করো! সে আর হতে দিচ্ছে শামির এ জন্মে!
কখনো নয়। এই লাফালাফি করার স্বাধীনতা শামির দেবে না।

দশ মিনিট অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে। টাইয়ের নট নিয়ে আর নাটক করা যাচ্ছিল না। শামির এবার থাবা মেরে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে ফাইলটা তুলে একছুটে বেড়িয়ে যাওয়ার ফন্দি করছিলো। ও চোখও বুজেছে ইতিমধ্যে,ওই ভোলাভালা মুখটা একদমই দেখবে না ও এটাই ওর পণ!
যেই ভাবা সেই কাজ। তবে এক ঝটকায় ফাইল তুলে একটু ঘুরতেই ওকে থামতে হলো। শেয়ানা চতুর মেয়েটা ওর হাত টেনে ধরেছে। শামির থামলেও চোখ ফেরায় না। রাগী গলায় বলে,“ধূর অফিসে তাড়া আছে জান্নাতুল!”

জান্নাত ছটফটিয়ে এগিয়ে এসে শামিরের বুক ঘেঁষে দাঁড়ায়,একদম সম্মুখে ‌। শামির চোখ উঠিয়ে সিলিং ফ্যান দেখছে। চোখ নামানো যাবে না। ঐ মেয়েকে দেখা যাবে না। জান্নাত দুইহাতে শামিরের খসখসে দুই গাল চেপে ধরে বলল,“একটু দেখুন আমাকে!”

_রাতে দেখবো! সরো।

_না। এখুনি দেখতে হবে।

_না। সরো।

জান্নাতের এবার সত্যি সত্যি কান্না পাচ্ছে। এতো নির্দয়? এতো নির্দয় এই লোক? গত সপ্তাহ থেকে জান্নাত কেবল হাত দিয়ে পা ধরা বাকি রেখেছে,লোকটা রাজি হয়নি। ট্যুরের বাস সদররোডে দাঁড়িয়ে আছে ওর অপেক্ষায়। ওদের গ্রুপ থেকে কতগুলো লোক যাবে। এবার বাদ যাবে না একটি শিশুও। অথচ জান্নাত! ও পারবে না?
মুখটা মলিন করে জান্নাত ফুঁপিয়ে ওঠে এইবার। ওর বান্ধবীরা সবসময় কত বাঁকা বাঁকা কথা শোনায়, এগুলো এই লোককে বললে সে রেগে যায়। তবে কথাগুলো কি ভিত্তিহীন? স্টাডি ট্যুরে গেলে মেয়েরা নষ্ট হয়? না তো। কোথায় লেখা এইটা?
শামির হাত ছাড়াতে চাইলে জান্নাত আরো শব্দ করে কাঁদে। ইনিয়ে বিনিয়ে,বায়না আর আবদারের ভঙ্গিতে বলে,“প্লিজ যাই।‌ একটু পারমিশন দিন। ওরা চলে যাবে যে!”

শামির এবার প্রচণ্ড রেগে গেলো। জান্নাতের হাত সরিয়ে দিয়ে ওর দিকে তাকালো। চোখের পানি দেখে নরম হলেও ওর কন্ঠে ভীষণ ঝাঁঝ, ক্ষ্যাপাটে হয়ে বললো,“দিন দিন ছোটো হও? আমার রাগ বোঝো না তুমি? আমার কথা বোঝো না? একটা কথা এতবার করে কেন বলতে হবে আমার? কেন?”

গর্জনের দাপটে পাতলা শরীরটা কাঁপছে। জান্নাত চোখের পানি মুছে গুটিয়ে গেলো। বরাবরের মতো। শামির এই মেয়েটির ওপর আজ ভারি বিরক্ত। আরো দুই কথা শোনানোর অভিপ্রায়ে হাতের ফাইল ফেলে জান্নাতকে চেপে ধরে ধরলো জান্নাতের দুই গাল। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,“একটু লাই দিলেই মাথায় উঠে নৃত্য করতে ইচ্ছে করে তাইনা? বাইরে,বাইরে,বাইরে। সারাক্ষণ শুধু বাইরের গান আর বাইরে পা রাখার ঝোক। মনে সারাদিন উড়ু উড়ু ভাব। আচ্ছা জান্নাতুল তুমি কখনো এভাবে আমার নাম জপো? আমার কাছে আসতে উতলা হও? সারাদিনে তোমার দুনিয়ায় আমি কতক্ষন থাকি বলো তো?”

শামির তার আবেগী তীর তাক করলো জান্নাতের দিকে। জান্নাত নিমেষ হীন চেয়ে আছে কঠিন মুখটার দিকে। অস্ফুটে জবাব দিলো,“সারাক্ষন আপনার সামনে সামনে ঘুরে আপনার নাম জপে দেখিয়ে বুঝি বোঝাতে হবে আপনিই আমার লাইফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? এছাড়া আমি বোঝাতে পারিনি কখনো?”

শামির থমকায়। একটা আবেগী তীর তার দিকেও ছুটে এসেছে জান্নাতের থেকে। সে ইতস্তত করে। চোখ নামিয়ে নেয়।
বোঝাতে পেরেছে তো জান্নাত। শামির কি জানেনা তার বৌ তাকে কতটা ভালোবাসে? চোখে হারায়? জানে তো সে। শুধু বৌয়ের এইসব অহেতুক আবদারে শামিরের রাগ হয় মেয়েটার ওপর, অভিমান হয়। ঐ দিনগুলোর পরে কখনো এসে একটু আবদার করেনি,“আমাকে একটু ঘুরতে নিয়ে যান।” উল্টো এখন বন্ধুদের সাথে ট্যুরে নাচতে যাওয়ার বায়না করছে। রাগবেনা শামির? হিংসায় জ্বলবে না ওর ভেতরটা?

জান্নাত চুপচাপ নিজেকে সরিয়ে নিলো। অভিমানে গুমোট হলো মুখ, ক্ষীণ স্বরে বলে,“আচ্ছা যাবো না!”

এই “আচ্ছাটা” শামিরের মনমতো হয়নি। এতো কেন গুমোর রাখবে একটা মেয়ে? শামির ওকে ট্যুরে যেতে দেয়না শুধুমাত্র একটা কারণে? ঐ তো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা স্টাডি ট্যুরে যাওয়ার পথে বাসে বিদ্যুতায়িত হয়ে পুড়ে মরলো সেদিন, ওসব দেখে শামিরের ভয় লাগে না? শুধু কি শামির স্বৈরাচারী? প্রটেকটিভ নয়?

শামির কেন জানি জান্নাতের ওপর আজ বেশি রাগতে পারলো না,উল্টো রাগ ছাপিয়ে জমাট বাঁধলো অভিমানের এক প্রগাঢ় আস্তরণ। ও এক কাজ করে বসলো, ওয়ালেট থেকে হাজার চারেক টাকা বের করে জান্নাতের মুঠিতে জোর করে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললো,“আচ্ছা যাও। স্বাধীনতা হরণ করার আমি কে তোমার? যেখানে খুশি যাও। তোমাকে পারমিশন দেয়ার প্রয়োজন নেই। তুমি তো প্রাপ্তবয়স্ক। যা খুশি করো। এসবে বাঁধা দিলে আমি তো আবার খারাপ স্বামী। বৌকে ভালোবেসে এই অপবাদ সবসময় ঘাড়ে নিয়ে বয়ে বেড়াতে মন চায়না। তোমার লাইফ,যা খুশি করো।”

জান্নাত চেয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে, মুঠোবন্দী টাকার দিকে। শামির ফাইল নিয়ে কেবিনেট থেকে জুতা বের করে আবার বলে,“বাড়ির গাড়ি রেখে যাচ্ছি। বাসস্ট্যান্ড নামিয়ে দেবে। যাও, আনন্দ করে এসো। তুমি যা বলবে তাই।”

এক মুহুর্তের জন্যও জান্নাতের মুখটা দেখলো না শামির,দেখলো না জান্নাতের মুখ থেকে রক্ত সরেছে। ও হন্তদন্ত হয়ে নিচে নামলো। বাড়িতে আপাতত একটাই গাড়ি। সেই গাড়িটা জান্নাতের জন্য রেখে দিয়ে একটা সিএনজি ধরলো সে। মুখভঙ্গি বড্ড শান্ত ওর। ওর বিশ্বাস ছিল জান্নাত যাবে না। জান্নাত এমন মেয়েটিই নয়। একটু বেশি উচাটন মনের হলেও শামিরের কথা শোনে। তাই পুরো রাস্তাটা শামির নিশ্চিন্ত মুখে বসে রইল।
কিন্তু অফিসে পৌঁছে শামির রিজিয়াকে কল করে যখন জানতে পারলো জান্নাত বেড়িয়ে গিয়েছে। বিশাল বড় একটা বাজ ওর মাথায় পরলো তখন। শামির বাকহারা হয়ে কিছু সময় চেয়ার ঠেশে বসে থাকলো,একদম যেন শ্বাস আটকে আছে। ওর কেন জানি রাগও হচ্ছে না, রাগে উন্মাদ হয়ে সবকিছু ভাঙতেও ইচ্ছে করছে না, শুধু বুকের কোথাও একটা একটু একটু ভার ভার লাগছে।
অফিসে ওর এই কেবিনটা ক্রমশ গুমোট হয়ে ওকে ঠেশে ধরছে। মাকে আস্তে করে বললো,“ঠিক আছে। যাক। আমিই পারমিশন দিয়ে এসেছি। রাখো।”

কল কেটে গলার কাছে টাইয়ের নট আলগা করে বসে থাকে শামির। এসির মধ্যেও ঘামছে সে। ওর নারাজগির থেকে মেয়েটা তার আনন্দকে গুরুত্ব দিলো? বিষয়টা সম্পুর্ন শামিরের মতেই হয়েছে শামির জানে, তবে ওর মেনে নিতে কষ্ট হয়। এই মেয়েটা তো তার সম্পূর্ণ। শামির বন্ধুদের সাথে ট্যুর দেয়না,গেলে সস্ত্রীক যায়। আর এই মেয়ে? ওর বুঝি আলাদা জীবনের খুব লোভ! যেখানে শামিরের ছায়া নেই।

এতো কেন খারাপ লাগছে শামিরের ও বুঝতে পারছেনা। ও কাজে মন দিতে পারছে না। বসে বসে ফাইল গুলোকে এলোমেলো করছে শুধু। না, অনুমতি নিজ ইচ্ছায় যখন দিয়েছে তখন ও মেয়েকে আর বকবে না ট্যুর থেকে ফিরলে। ট্যুর শেষে বাড়িতে ফিরলে আর এক শব্দ খরচ করবে না এই মেয়েকে শাসন করতে। যার কাছে শামিরের খারাপ লাগার দাম নেই,তার কাছে কিসের অভিযোগ?
বৌ তুমি,আদরের জিনিস,মন ভরে আদর খাও,বায়না করো,মিটিয়ে দেবো। তোমার স্বামীর রাগ নিয়ে কোনো কাজ নেই। আসার পরে যদি রাতে সেজেগুজে শামিরের মাথা ঘুরিয়ে তাকে হাত করতে আসো না? শুধু তখন শামির বোঝাবে মনে কষ্ট দিলে কেমন লাগে! শামির আর বুকে টানবে না, রাতে বুকে টেনে ঘুমাবে না। শামিরও একটা আলাদা দুনিয়া বানিয়ে ফেলবে,যেমন করে তুমি বানাতে চলেছো।

মনে মনে বলছে শামির কথাগুলো। বড় অভিমান ওর। ফাইলের স্তুপ যেমন তেমন পরে থাকে। শামির বসে বসে ঝিমায়। এমন সময় পিয়ন লুৎফর এসে বললো,“স্যার ভাবী এসেছে! ভেতরে পাঠাবো?”

ভাবী! শব্দটা কর্ণকুহরে পৌছাতেই শামির বিস্ময় নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মুখ তার হা হয়েছে,চোখ হয়েছে গোল্লা গোল্লা। লুৎফর বাইরে গিয়ে জান্নাতকে ভেতরে পাঠালো। কেবিনের দরজা ঠেলে গুটি গুটি পায়ে মেয়েটা ভেতরে ঢুকলো। একটা মসলিন কটন শাড়ি,ঘোমটা মাথায় তোলা। গলায় সোনার চেইন,হাতে সোনার চুড়ি,শামিরের বৌ।
শান্ত সরল চোখ দু'টো শামিরের চোখে স্থির রেখেই ওর সামনে চেয়ারে বসলো। শামির আরো কিছুক্ষণ অবিশ্বাস্য নজরে চেয়ে থেকে বসে গলা খাঁকারি দিলো,বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেরিয়ে বললো,“গেলেনা?”

জান্নাত মলিন হাসে,বলে,“আমার বাইরের দুনিয়ার প্রতি অত আগ্রহ নেই। কি হয় ওখানে? বান্ধবীরা মিলে একটু মজাই না হয় করতাম! যা সবাই করে তবে আমি করিনি ‌।
সবাই একসাথে ম্যাচিং শাড়ি পরে সৈকতে ছবিই না হয় তুলতাম। যা কখনো আমি করিনি।
মজা করে খেতামই না হয়! ঘুরতামই না হয়। ওসব না হলে কি জীবন শেষ হয়ে যায়? না মোটেই, বরং স্বামী নারাজ হয়ে রাতে মুখ ভার নিয়ে কাছে আসলে আমাদের মতো বৌয়ের বুক পুড়বে। অশান্তিতে রাতে ঘুমাতে পারবো না। কেউ রেগে আমার হাতের মুঠোয় আদর নয় বরং খামচি মেরে টাকা ঢুকিয়ে দিলে আমার গলা শুকিয়ে যায়, বুকে ব্যথা হয়। আমি সংসার করতে এসেছি। আমি তো যুদ্ধ করতে আসিনি যে সবকিছু আমাকে ছিনিয়ে পেতে হবে। কেউ ভালোবেসে না দিলে নাই‌। মরে তো যাবো না! ”

শামিরের অনিমেষ দৃষ্টি দেখছে জান্নাতের মুখটা। এই মেয়ের ভীষণ মন খারাপ, ভীষণ, শামির মন দিয়ে টের পেল তা। শামিরের ওপর রাগ আর অভিমানে ও এখন ছাই চাঁপা বারুদ।
জান্নাত কথাগুলো বলে গালে হাত চেপে শামিরের দিকে তাকিয়ে আছে,সহজ চোখে। এখন ওর মাঝে কোন ভাবলেশ নেই।

শামির অস্বস্তিতে দৃষ্টি নামিয়ে বলে,“কি দেখছো?”

_দেখছি, যাকে রোজ ঘুম থেকে উঠে দেখি। যে বাড়িতে থাকলে সারাক্ষণ লুকিয়ে,আড়ালে অথবা প্রকাশ্যে যার মেজাজী চেহারা দেখি, অফিস থেকে ফিরলে যার ঘেমে নেয়ে একাকার হওয়া মুখটা দেখি। রাতে আমাকে কাছে টেনে যার আহ্লাদিত মুখটা দেখি, এতো করে দেখার পরেও যে আজ অভিযোগ আনলো আমি তাকে দেখি না, এখন সেই ব্যক্তিটিকে দেখি।

শামিরের অস্বস্তি বাড়ছে। মেয়েটি ছোটো হলেও কখনো কখনো শামিরের মাইন্ড ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা রাখে ভারী ভারী কথা বলে। ও বললো,“গেলেই পারতে ট্যুরে। আচ্ছা কি খাবে? কিছু আনাবো? ঠান্ডা? আইসক্রিম আনাবো?”

জান্নাত নাকচ করে,“ওসব বাদ দিন‌। আমি আপনাকে দেখবো, আবার না বলে বসেন দেখাদেখি কম হয়ে যাচ্ছে আপনাকে।”

শামির তাকিয়ে আছে। জান্নাত তাকিয়ে আছে। জান্নাতের গালে হাত। সময় গড়ায়, শামির বলে,“ত্যাড়ামি বন্ধ করে বাড়ি যাও। আমি কিন্তু পারমিশন দিয়ে এসেছিলাম,গেলেই পারতে!”

_হুশ! কথা বলবেন না‌। আমাকে দেখতে দিন। আপনার ভাগে কম পরে যাবে নয়তো।

শামির এবার অস্থির হয়, বিরক্ত হয় হঠাৎ,ধিমি আওয়াজে বলে,“জান্নাতুল!”

জান্নাত চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে শামিরের কোলে চেপে বসে, গলা জড়িয়ে ধরে ভার ভার হয়ে বলে,“হুশ! কথা বলতে নিষেধ করেছি তো। আচ্ছা কাছ থেকে দেখি! এখন হচ্ছে? বোঝা গেছে আপনার বৌয়ের দুনিয়া আপনিই? আমি পাশ? পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি?”

শামির আর পারলো না, আর পারলো না নিজের ধৈর্য্যকে ধরে রাখতে। এই মেয়ে তাকে শেষ করতে এসেছে শামির আরো একদফা বুঝে গেল আজ। এই মেয়ে তার কঠোর সত্তাটার বধ করার জন্য এসেছে। জেতার জন্য এসেছে। যার কাছে সবসময় শামিরের হারতেই হয়।
আদুরে শরীরটাকে শক্ত করে ধরে ঘন শ্বাস ফেললো, বললো,“বাস কি ছেড়ে দিয়েছে?”

_কেন?
জান্নাত অবাক হয়ে জানতে চায়। শামির জবাব না দিয়ে ওর হাত চেপে ধরে উঠে দাঁড়ায়। আরেক হাতে তুলে নেয় ব্লেজার আর জান্নাতের ভ্যানিটি ব্যাগ।

⚫

সদর রোডে দাঁড়িয়ে আছে কুয়াকাটা গামী তিনটা ভিআইপি ট্যুর বাস। বরিশাল সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে একশো বিশ জন উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী সেজেগুজে হৈহৈ করতে করতে একটার পর একটা সিট দখল করে বসছে।
শামির চৌধুরীর বৌ জান্নাতুল ফেরদৌসও বাসে চেপেছে। ওর বান্ধবীর পাশে বসেছে। চোখে মুখে খুশি উপচে পড়ছে মেয়েটার। চকচকে দৃষ্টি জোড়া বাসের জানালার বাইরে দিয়ে বারবার দেখছে অদূরে গাড়ির ভেতরে গম্ভীর মুখে বসে থাকা শামিরের মুখটা। চোখে সানগ্লাস দিয়ে রেখেছে যে।

জান্নাত বাসে বসার পর থেকে খুবই ভদ্র একটি মেয়ে। ওর সহপাঠীরা হাসাহাসিতে ভেঙে পরলেও ও নির্লিপ্ত, বাস ছাড়ার অপেক্ষায়। জান্নাতুলের সাত কপাল লোকটা রাজি হয়েছে। এখন যদি জান্নাতকে দাঁত বের করতে দেখে তবেই হবে। বলবে,“এতো আনন্দিত তো আমার সাথে থাকো না! ও তার মানে তুমি তোমার স্বামীর থেকে ট্যুরকেই বেশি ভালোবাসো?”

বাসটা থামিয়েছে শামির, জান্নাতের ক্লাস টিচারকে কল করে। নিজে উঠে জান্নাতকে ছেলেদের সিট থেকে একদম দূরে জানালার পাশে বসিয়ে দিয়ে তবেই নেমেছে। বাস ছাড়া না অবধি সে যাবে না। জান্নাত এর মাঝে বারবার সেধেছে,“চলেন আমার সাথে। ও একদিন অফিস কামাই করলে কিচ্ছু হবে না। আপনি রিতা আপার সাথে ফোনে কথা বলে নেবেন না হয়।”

সে তো ব্যস্ত মানুষ। তাই গা করেনি। বাসটা আবার চলতে শুরু করেছে ঠিক সকাল দশটা বাজে তখন। মোট তিনটিই বাস। জান্নাতদেররটা সবচে পেছনে। ড্রাইভার বাস ছাড়তেই ছেলেগুলো খালি গলায় গাইতে শুরু করেছে অনিকেত প্রান্তরের গান। জান্নাতের দৃষ্টি তখনো জানালার বাইরে, চিরপরিচিত গম্ভীর মুখটা পুরোটাই চোখের আড়াল হলে তবেই ঘাড় ফেরালো ও। তখন ওর ফোনে কল আসে রিজিয়ার। ঠিকঠাক ভাবে পৌঁছেছে কিনা , জান্নাত যাতে ঠিকঠাক থাকে, এসব কথা বলে কল রাখেন।

ততক্ষণে ওর বান্ধবী নুজাইফা ওকে হাত টেনে ওঠালো,“হয়েছে অনেক হয়েছে। স্বামী আর শ্বশুর বাড়ির ওম থেকে পাঁচ মিনিটের জন্য বের হও। চুল খোল,শাড়ির আঁচল কোমরে গোজ। আমরা নাচবো।”

“গরম লাগে আমার দুপুরে,
শিহরিত তোমার নুপুরে,
ঝাপ দেবো আমি প্রেমের পুকুরে,
কিন্তু ডুববো না।”

গান গুলো পছন্দ করছে ক্লাস টপার মেহরিন। রিমিক্স সব গান। আজ ছাত্র ছাত্রীদের আনন্দের দিন তাই টিচাররা কেউ নাক গলাচ্ছে না এসবে। বরং তারা সব ধরণের লাফালাফি হাসিমুখে উপভোগ করছে। কেউ কেউ মাথা দোলাতে শুরু করেছে গানের তালে।
জান্নাত শুরু শুরুতে বারণ করলেও সকলের চোখে মুখে উত্তেজনা দেখে নিজেকে আটকাতে পারলো না। সবাই যে যার মতো করে হাত পা দোলাচ্ছে‌। কেউ বসে বসেও নাচছে। এখন গান বাজছে কোক স্টুডিয়োর পাসুরি গানটা।

এরপর কারো থামাথামি নেই। এতো আনন্দ জান্নাত ওর গোটা জীবনে করেনি। নাচতে নাচতে পায়ের জুতা খুলে ফেলেছে। ছেলেগুলো অবশ্য খুব ভদ্র,ওরা মেয়েদের এপাশটাতে ভিড়ছে না, টিচাররা মাঝখানে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছে নিজেরা দাঁড়িয়ে। খুবই নিরাপদ আনন্দদায়ক পরিবেশ। খবর পেলো সামনের বাসে প্রিন্সিপাল স্যার নাচছেন আরেকটি ফোক গানে।

ঠিক এমন হৈচৈয়ের মাঝে হঠাৎ একটি ঘটনা ঘটে গেলো। ড্রাইভার ড্রাইভিং রেখে আতঙ্কিত দৃষ্টিতে দেখছিল পাশের গাড়ির লোকটাকে। চোখ থেকে সানগ্লাস সরিয়ে রুদ্রমূর্তিটা ক্ষ্যাপাটে গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছে,“স্টপ দ্য বাস! আই সেইড স্টপ দ্য‌ বাস!”

নাচানাচিতে উন্মত্ত জান্নাত,ওর বান্ধবীরা আর ওর বায়োলজি মিস। “উড়াধুড়া” ডান্সস্টেপ! বাস যে থেমেছে,কেউ খেয়াল করলো না।

শামির ড্রাইভারের হাতে চাবি দিয়ে ঝট করে গাড়ি থেকে নেমে,প্রায় ছুটে এসে বাসে উঠলো। প্রফেসর মতিউর রহমান গোলগোল চোখে চেয়ে আছেন,সিট থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলেন,“কি হয়েছে জনাব? কোনো অসুবিধা? জান্নাতুল ঠিক আছে!”

গানের শব্দে ওসব কথা শামিরের কানে যাচ্ছে না। ও ওর বৌয়ের নাচ দেখছে ঠান্ডা চোখে, রাগে ক্ষোভে বাকহারা হয়ে।

“বন্ধু তুই লোকাল বাস,বন্ধু তুই লোকাল বাস।
আদর কইরা ঘরে তুলোস ঘাড় ধইরা নামাস!”

ফোক সম্রাজ্ঞী মমতাজ গাইছিলেন তখন। শামির এগিয়ে যায়। ওর বৌ তখনো টের পায়নি। বাকিরা অবশ্য থেমেছে, জান্নাতুলের মিস সিটে বসে পরেছে। নুজাইফা এতক্ষণে জান্নাতের বাহুতে বড় সড় একটা খামচি দিতেই হুঁশ ফিরল জান্নাতের। ও বিরক্ত চোখ নিয়ে ঘুরে শামিরকে দেখতেই মাথায় বাজ পরার মতো শব্দ টের পেল। মুখ চোখ থেকে রক্ত সরেছে মেয়েটির। আতঙ্কিত ভঙ্গিতে শাড়ির আঁচল মাথায় তুলেছে তৎক্ষণাৎ, গলা কাঁপছে ওর,“আ-আপনি!”

শামিরের ঠান্ডা মুখ, ঠান্ডা গলা, বললো,“তোমার সাথে যাবো আমি। গাড়ি ড্রাইভারের কাছে দিয়ে এসেছি। বসো আমার পাশে।”

বলেই শামির একটা সিটে বসে জায়গা করে দিল জান্নাতকে। জান্নাত একপলক আশেপাশে তাকালো। ও জানে এই লোক ওকে একা পেলে এতক্ষণে খুনই করে ফেলতো। এই লোকের মুখভঙ্গি তাই বলছে। কথা বাড়ায় না জান্নাত। কারণ এই লোকের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলে এখন এখানে খুবই বাজে একটা সিনক্রিয়েট করবে। হতে পারে জান্নাতকে কোলে নিয়েই নেমে যাবে বাস থেকে।

বাস আবার চলতে শুরু করেছে। জান্নাত পায়ে জুতা পরে নিয়ে শামিরের পাশ ঘেঁষে বসতেই শামির ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। ওর শান্ত দৃষ্টি জান্নাতের চোরের মতো মুখটাতে, কিছুক্ষণ এভাবেই কাটলো সময়। এরপর যখন আবার গান বেজে উঠলো, ও চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,“আমি জানি তো! জানি! আমার তোতাপাখিকে একটু একলা ছেড়ে দিলেই যে সে ডানা ঝাপটাবে এটা আমি জানি। এজন্য অফিস ফেলে রয়ে গিয়েছি। চলো, তোমাকে তোমার মনের সাধ মিটিয়ে ট্যুর থেকে ঘুরিয়ে আনি। যত মজা সব ওখানে গিয়ে করবে, শুধু বাসে বসে নাচানাচি নট এলাউড। ওহহ আল্লাহ এই মেয়ে কি? আমি একটু ঢিল দিলেই সুযোগের সৎ ব্যবহার করে বসে। বিবাহিত মেয়ে হয়ে মমতাজের “লোকাল বাস” নামের চিপ লিরিক্সে নাচে! ওহহ আল্লাহ!”

জান্নাত দৃষ্টি তুলতে পারছে না লজ্জায়। মাঝখানে একবার নিজের সাফাই দিতে মুখ খুলেছিল অবশ্য,“সবাই-ই নাচে। ট্যুর বাস বিনোদনের একটি জায়গা। এতে খারাপ কিছু….!”

এটুকু বলেই জান্নাত থেমে গেল,কারণ ও শামিরের চোখ দেখেছে। জান্নাত অবশ্য মন খারাপ করেও করেনা। লোকটা তার সাথে যাচ্ছে,এটা একটা আনন্দের ব্যাপার তার কাছে। কিন্তু বান্ধবীদের সাথে নাচানাচি করা তো জঘন্য কিছু না। সবাই-ই একটা দিন এমন আনন্দ করে!

“এবার নাচো!”

শামির ঠান্ডা গলায় বলতেই জান্নাত অবাকের সুরে বললো,“এখন কিভাবে নাচবো? হাত ধরে রেখেছেন তো। উঠতে দেন না তো!”

_মনে মনে নাচবে। মনে মনেও অনেক কিছু করা যায়।

বলেই শামির ওর হাতের বাঁধন আরো শক্ত করে চোখ বুজে সিটে গা এলিয়ে দিলো। এবার জান্নাতের মনটা কিছুটা খারাপ হলো। ও কথা না বাড়িয়ে জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখতে লাগলো।

ওরা যখন বাকেরগঞ্জ পৌঁছালো তখন একটা ব্রেক নিতে বাস থামানো হলো। মিলে আছে ভুনা খিচুড়ি আর কোক। বাকেরগঞ্জ মাইলস্টোনের রাস্তার ধারে খোলা মাঠে সবাই খেতে নামলো। ধান কেটে খড় শুকাতে দেয়া। যার যার হাতের প্যাকেট নিয়ে সেখানে গোল গোল হয়ে গ্রুপ বানিয়ে বসলো সবাই খেতে।

ইংরেজি টিচার ননী গোপাল স্যার এই ট্যুরের ব্যবস্থাপক। এসে শামিরের হাতে দুই প্যাকেট ভুনা খিচুড়ি বাড়িয়ে দিতেই শামির লজ্জা পেল ভারি। শিক্ষক লোক আন্তরিকতা দেখাচ্ছে আর সে এভাবে বাসে বসে থাকবে? শামির অত বেয়াদব নয়। সে রগচটা হলেও ব্যক্তিজীবনে খুবই ভদ্র এবং বাধ্য একজন ছাত্র ছিলো।

জান্নাতুলকে বললো,“চলো নেমে খাই।”

জান্নাত স্বামীর পেছন পেছন নামলো মলিন মুখে। অদূরে বসে নুজাইফারা হাসছিলো জান্নাতের দিকে তাকিয়ে। শামির এক কোণে বসে জান্নাতকে চোখের ইশারায় বসায়। এরপর হাত ধুয়ে খিচুড়ির প্যাকেট খুলতে খুলতে বলে,“কি হলো খাও!”

জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ থেকে নিজের রাগ বোঝাতে বললো,“আমি মনে মনে নেচেছি, এবার মনে মনে খাচ্ছি।”

শামির চোখ তুললো। ওর দৃষ্টি একদম স্বাভাবিক, রাগ নেই, মেজাজ নেই তাতে। উল্টো খানিক সময় জান্নাতকে দেখে হঠাৎ করেই এক লোকমা খিচুড়ি তুলে ধরলো জান্নাতের মুখের সামনে। জান্নাত চমকালো, এতক্ষণের রাগ আবার গলে জল হয়ে নামলো লোকটার এই কাজে। যেমন করে সবসময় হয়। লজ্জা পেয়ে আশেপাশে তাকায় জান্নাত। ওর দিকে সবাই আড়চোখে তাকিয়ে আছে। ও মুখটা সরিয়ে নিয়ে অস্ফুটে বললো,“হাত সরান! আমি খাচ্ছি নিজের হাতে।”

শামির ভ্রু কুঁচকে নিলো, জলদগম্ভীর স্বরে বলল,“কেন? আমার হাতে খেলে সবাই মাইন্ড করবে? দাঁড়াও দাঁড়াও দাঁড়াও,তুমি আমার হাতে খেতে চাচ্ছো না কেন? স্বামীর হাতে খেতে অসুবিধা কোথায়? আচ্ছা এখানে ঐ ছেলেগুলো জানে আমি তোমার স্বামী? তোমার ইম্প্রেশন নষ্ট হবে বলে স্বামীর হাতে খেতে চাচ্ছো না নাকি? কই বাড়িতে তো এসে আমি যখন খেতে বসি তখন মুখ বাড়িয়ে দাও খাওয়ার জন্য। এখন কি সমস্যা? ছেলেগুলো এখন বুঝে যাবে তুমি বিবাহিতা তাই?”

জান্নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। ও হতাশ। খুব হতাশ। পারলো না ও, এই লোককে আর মানুষ করতে পারলো না। মৃদু শ্বাস ফেলে শামিরের হাত আলতো করে ধরে খাবারটা মুখে পুরে নেয়। পরপর নিজে হাত ধুয়ে এক লোকমা শামিরের মুখে তুলে দিয়ে বললো,“এখানে সবাই জানে আমি বিবাহিত। কিন্তু আমার স্বামী আমাকে খাইয়ে দেয় এটা জানতো না। এটা সবাই জেনে যাবে, তাই একটু লজ্জা পাচ্ছিলাম। ইম্প্রেশন নষ্ট হবার কিছু নেই।”

শামির মুখটা গম্ভীর করে বললো,“হুম ঠিকাছে তবে।”

খেতে খেতে শামিরের মেজাজ টা ফুরফুরে হলো। আসলে ছেলেমেয়ে গুলোকে এতক্ষণ নিজের শত্রুর চোখে দেখছিলো,তবে এখন বুঝছে প্রতিটি ছেলেমেয়ে খুবই ভদ্র ঘরের। শিষ্টাচারী। শামিরের এই পরিবেশটা এখন দারুণ ঠেকছে। ও খেতে খেতে নিজের কলেজ জীবনের দিনগুলো স্মরণ করলো একদফা।
হঠাৎ জান্নাত গলায় খাবার আটকে কেশে উঠতেই শামিরের ঘোর কাটলো, পানি খাইয়ে স্থির করে টিস্যু দিয়ে মুছিয়ে দিলো মেয়েটার মুখ। জান্নাত আনত নয়নে দেখছে স্বামীর মুখটা। সারা সকালের ঝক্কি কাটিয়ে এখন শুধু মুগ্ধতা খেলা করছে তার ভোলা চোখে। জান্নাত নিমগাছ,নিমগাছরা তাদের মালিকের অল্প একটু যত্নে বারবার এভাবেই ভুলে যায়। শামির যখন টিস্যু পেপার সরিয়ে জান্নাতের চোখে নিজের প্রতি মুগ্ধতা দেখলো, হাট্টাগাট্টা শামির চৌধুরী একটুখানি লজ্জা পেল। কিন্তু মুখটা তার বেজায় কঠিন। না! এখন গদগদ হওয়া যাবে না‌। তাকে কাঠিন্যতা ধরে রাখতে হবে নয়তো এই মেয়ে আস্কারা পেয়ে আবার কোন আবদার করে বসে কে জানে! এই মেয়ের স্বভাব ভালো না, বসতে দিলে সবসময় শুতে চাইবেই! আজব মেয়ে।

ও নিজের মাঝে একটা মেজাজী ভাব আনতে চেয়ে গলা খাঁকারি দিল, গলায় ঝাঁঝ এনে বললো,“কি হচ্ছে এখানে? এইসব জায়গায় আসার জন্য কেউ কান্নাকাটি করে? ধূর! যতসব ফাউল কাজকারবার। তোমার জন্য অগত্যা আমাকে অফিস কামাই করতে হলো। মানুষ হলে না জান্নাতুল, মানুষ হলে না। কি আর করা, আমি তো নিতান্তই বাচ্চা একটি মেয়েকে ঘরে তুলেছিলাম। তার মানুষ হবার দায়ভার তো আর তার বাড়ির লোককে দিতে পারিনা। এই দায়ভার আমার। আমি তোমাকে মানুষ করতে পারলাম না, আফসোস!”

অভিনয় করে কথাগুলো বলে শামির সত্যি সত্যি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। জান্নাত এসব কিছু দেখে,শুনে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। ঠোঁট টিপে হাসতে থাকে।

খাওয়া দাওয়া শেষে ছেলেমেয়েরা সবাই টিচারদের সাথে দাঁড়িয়ে একদফা ছবি তুলছে। ধানখেতের আইলের পাশে দাঁড়িয়েছে সবাই। শামির জান্নাতুলের দিকে তাকিয়ে বললো,“ছবি তুলবে না?”

জান্নাতুল তার হাসি মুখে ফাজলামির সুর টেনে বলে,
_মনে মনে তুলছি।

শামির তাকিয়ে রইল নিশ্চুপ। জান্নাত বললো,“আবার পরে রাগবেন না তো? আপনি তো ক্ষণে ক্ষণে মুড বদলান।”

শামির জবাব না দিয়ে উঠলো,উঠে জান্নাতকে টেনে উঠিয়ে নিয়ে গেলো দলের কাছে,গ্রুপ ফটো তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সকলে। ও জান্নাতকে একপাশে তার মিসের কাছে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দূরে সরে এলো। প্রিন্সিপালকে বললো,“আপনারা সবাই দাঁড়ান। আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।”

⚫
আঠারো কিলোমিটার দীর্ঘ ও তিন কিলোমিটার প্রশস্ত কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় সৈকত। প্রায় সব ঋতুতেই পর্যটক ঠেশে থাকে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি আর বালুকাবেলার অপার সৌন্দর্যে মোহিত হতে।
তবে জান্নাতের জীবনে এটি প্রথম ভ্রমণ। ওর বিস্মিত চোখ দু'টো এই নৈস্বর্গ থেকে সরছে না। ওরা এসে পৌঁছেছে ঠিক দুপুর দুইটার পরে। লাঞ্চ এখনো হয়নি, স্টুডেন্টরা জেদ করেছিল একদফা সমুদ্র স্নান করে তবেই হবে খাওয়া দাওয়া।

জান্নাতদের কলেজ থেকে বুক করা হয়েছে একটা বিশাল বড় রিসোর্ট। শামির ওখানে ওঠেনি,জান্নাতকে ওর বান্ধবীদের সাথে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে সে পাশেই একটা ভিআইপি হোটেলে উঠেছে রুম বুক করে। এখন বৌকে পাহারা দিতে সৈকতে বৌয়ের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কানে ওর অফিসের ফোন,কিছু অফিশিয়াল কথা শেষ করে জান্নাতের দিকে এগিয়ে গেল। এতক্ষণ জান্নাত ওর বান্ধবী আর মিসদের সাথে সমুদ্রস্নান করছিল দেখে দূরে থেকেছে।

জান্নাত ঝিনুক কুড়াচ্ছে। ওসব দেখে শামির সহজ গলায় বলে,“আগে এলেই এসব কুড়িয়ে নিতাম রুহী আর শামার জন্য!”

_আপনি এখানে এসেছেন?

_কতবার! হিসেব নেই! বেশিরভাগ আসতাম স্কুল কলেজ থেকে ট্যুরে!

_ওমা! এতবার এলেন, নষ্ট হলেন না?

জান্নাতের সরাসরি আক্রমণে থতমত খেল শামির। গোল চোখে চেয়ে আছে কথা হারিয়ে। জান্নাত হঠাৎ গা দুলিয়ে হেঁসে ওঠে, কিছুক্ষণ হেসে শামিরের হাত থেকে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ওর হাত টেনে পাশে দাঁড় করিয়ে ফোটোগ্রাফারকে ডাক দিলো। এখানে একজন ফোটোগ্রাফার বুক করেছে ওর বান্ধবী নুজাইফা। জান্নাত নিজের স্বামীর একদম বাহু ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গদগদ কন্ঠে ফোটোগ্রাফারকে বলে,“আমাদের ছবি তুলুন ভাইয়া।”

কয়েকটা ক্লিক হবার পরে জান্নাত শামিরকে বলে,“আমাকে কোলে তুলুন!”

শামির অবাক হয়ে গেল, অস্বস্তি নিয়ে বললো,“এখানে? না না।”

জান্নাত এবার চোখ সরু করে বললো,“কেন? এখানে আমাকে কোলে নিয়ে ছবি তুললে সবাই মাইন্ড করবে? দাঁড়ান দাঁড়ান দাঁড়ান, আপনি আমার সাথে ছবি তুলতে চাচ্ছেন না কেন? বৌকে কোলে নিয়ে ছবি তুলতে অসুবিধা কোথায়? ও আচ্ছা, এখানে এই পর্যটক মেয়েগুলো,যারা আপনাকে ড্যাবড্যাব করে দেখছে, তারা জেনে যাবে আপনি আমার স্বামী তাই? আপনার ইম্প্রেশন নষ্ট হবে বলে আমাকে কোলে নিয়ে ছবি তুলতে চাচ্ছেন না নাকি? কই বাড়িতে তো যখন তখন কোলে তুলে নেন। এখন কি সমস্যা? মেয়েগুলো এখন বুঝে যাবে আপনি বিবাহিত লোক তাই?”

শামির বোকা বোকা মুখে তাকিয়ে আছে, জান্নাত ভীষণ রাগের অভিনয় করেছে খুবই নিখুঁত ভাবে। এখন দাঁত কিড়মিড় করছে মেয়েটা। ছোটো ছোটো শ্বাস ফেলে শামির জান্নাতকে কোলে তুললো, মুখভঙ্গি গম্ভীর দেখে জান্নাত আবার ধমকালো,“কি হলো হাসুন? মুখটা বেজার কেন? বৌকে কোলে নিয়েও হাসি নেই কেন? নাকি এইসব মেয়েদের বোঝাতে চাইছেন আপনি সংসার জীবনে অসুখী,তারা যাতে সহানুভূতির হাত বাড়ায়। এটা নাকি?”

ছোটোমেয়েটার পাগলামিতে দিশেহারা শামির। জোর করে হাসার চেষ্টা করলো। জান্নাত হেঁসে মুখ ঘুরিয়ে ফোটোগ্রাফারকে চেঁচিয়ে বললো,“এভাবে অনেকগুলো ক্লিক করবেন ভাইয়া। তারপর উনি আমাকে নিয়ে দৌড় দেবে ওটা ভিডিও করবেন, ওটা স্লোমো করে আমি রিলস বানাবো।”

শামির ভ্রু কুঁচকে নিলো এই কথা শুনে, জান্নাত তৎক্ষণাৎ ওর চোখে চেয়ে খুব কোমল স্বরে বললো,“কিন্তু কাউকে দেখাবো না। ওগুলো শুধু আমি দেখবো!”

ছবি তোলা হলে শামির জান্নাতকে নিয়ে সত্যি সত্যি বিশ সেকেন্ডের মতো দৌড় দিলো। ও রীতিমতো অবাক নিজের কান্ডে। আবার যখন জান্নাত বললো,“কোন গানটা অ্যাড করবো?”

তখন শামির বললো,“ইস্ক মুরশীদের ঐ গানটা শুনেছো? তেরা মেরা হে পেয়ার আমার! তু চাহে তো কাদমোমে সার রাখ দু । ঐটা!”

বলেই আবার অবাক হলো সে, আজ তার সাথে হচ্ছে টা কি আসলে? এই মেয়ে তাকে নাকে দড়ি দিয়ে খেলছে! ভারী অদ্ভুত!

⚫

বান্ধবীদের সাথে বাংলোতে ঘুরে ঘুরে বেশ কিছুক্ষণ মজা করলো জান্নাত লাঞ্চ সেরে, শামির এই বেলার লাঞ্চ টা প্রিন্সিপালের নিমন্ত্রণে এই বাংলোতে করে হোটেলে গিয়ে শুয়েছে, জান্নাতের হাতে একটা চাবি দিয়ে গিয়েছে রুমের। বলে গিয়েছে,যেতে ইচ্ছে করলে যাতে যায়।

জান্নাত কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে চলে গেল হোটেলে শামিরের খোজ নিতে। গিয়ে চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখলো জনাব বিছানায় শুয়ে অফিসের কারো সাথে কথা বলছে। জান্নাতকে দেখে ভীষণ অবাক শামির। ফোন নামিয়ে বললো,“বাপরে! আমি তোমাকে আশা করিনি। নাচানাচি হয়ে গিয়েছে? বান্ধবীদের সাথে সময় কাটানো হয়ে গিয়েছে বাংলোতে?”

জান্নাত জবাব না দিয়ে রুমের ভারী পর্দা গুলো সরিয়ে দেয়। শামির চুপচাপ শুয়ে গালে হাত দিয়ে দেখছে মেয়েটাকে। একটা নীল রঙের সিল্কের শাড়িতে কি চমৎকার লাগছে গোলগাল পুতুলটাকে। তবে পরক্ষনেই শামিরের মন খারাপ হলো। ওর এতো সুন্দর বৌকে ওর ছেলে বন্ধু গুলো যদি আজ এই রূপে দেখে প্রেমে পরে? শামিরের রাগ হলো ভাবতে ভাবতে। ডাকলো জান্নাতকে,“এদিকে এসো।”

হোটেল রুমের খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে সৈকত দেখছিলো জান্নাত,ঘাড় ফিরিয়ে বললো,“কি জন্য?”

শামির শান্ত গলায় বললো,“তোমাকে আদর করবো।”

চমকালো জান্নাত। পরপর লাল মুখটা নিচু করে নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বললো,“পর্দা টেনে দিয়ে আসবো।”

_না।

বলেই শামির উঠলো,উঠে জান্নাতের সামনে দাঁড়িয়ে ওর কোমর চেপে ধরে হঠাৎ গা দোলাতে দোলাতে বললো,“মনে মনে নাচা যায়না আসলে। এখন নাচো!”

এক হাতে ফোনে “লাভ ননটিটি” গানটা ছেঁড়ে দিয়ে জান্নাতের আঙ্গুলের ভাজে নিজের পাঁচ আঙুল ঢুকিয়ে দুলতে দুলতে বললো,“কি? পা মেলাচ্ছো না কেন? নাকি বন্ধু লোকাল বাসেই নাচতে জানো? ভালোবাসার গানে নাচতে জানো না?”

শামির তর্জনীর ডগায় জান্নাতকে ঘুরাচ্ছে। জান্নাত বিস্ময়ের ঘোর থেকে বেড়িয়ে চিকচিকে দু'চোখ মেলে আপ্লুত গলায় বলছে,“আপনি তখন বললেন আদর….!”

_আমি তোমাকে মনে মনে আদর করছি। ফিজিক্যালি নাচছি!

শামির চওড়া হাসলো বলে। নিমিষেই জান্নাত আছড়ে পরলো ওর বুকে। ভার সামলাতে না পেরে শামির বিছানায় পরলো,তার ওপর জান্নাত। নরম গদি কেঁপে উঠলো। জান্নাত ব্যস্ত হয়ে উঠে শামিরের শক্ত দুইগাল আগলে ধরে দু'টো চুমু খেয়ে খুলে ফেলল শামিরের শার্টের কয়েকটি বোতাম। নগ্ন বুকটায় একবার চুমু খেয়ে জান্নাত মাথা রাখলো ওখানে, শামির হাসতে হাসতে বললো,“ভীষণ দুষ্টু হয়েছো জান্নাতুল,আর অসভ্যও।”

_আপনি ভদ্র হয়েছেন তাই!

জান্নাত আবার চুমু খায় প্রশস্ত বুকের খোলা জায়গাটিতে,আবেগী গলায় বলে,“বিকেলে কিন্তু ঝাউবনের দিকে ঘুরতে যাবার প্ল্যান আছে আমাদের। আগেই পারমিশন দিন। পরে গাইগুই করতে পারবেন না।”

মুচকি হেসে রেশমী চুলে হাত বুলিয়ে শামির চোখ বুজে বড্ড ফুরফুরে মেজাজে বললো,“আচ্ছা যেয়ো!”

_মনে মনে না কিন্তু, সরাসরি যাবো। সশরীরে।

_আচ্ছা সরাসরি সশরীরেই যেয়ো।

বলে শামির জান্নাতকে ফেলল নিচে। ঘাড়ে পিঠে অজস্র চুমু দিতে দিতে বললো,“তবে আমি কিন্তু পিছে পিছে আসবো!”

_সত্যিই অনুমতি দিলেন? আবার ঢপ টপ নয়তো? সত্যিই তবে দিলেন?”

শাড়ির আঁচলটা টান খেলো এবার। জান্নাত প্রশ্নটি করে চোখ বুজিয়ে নিলো। শামির অস্থির শ্বাস ওর ঘাড়ে ফেলে বললো,“শামির চৌধুরী অত আশা দিতে পারেনা জান্নাতুল। তবে যেটুকু দেয় তা মিথ্যা নয় তুমি জানো!”

“সমাপ্ত।”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 37 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন