পর্ব ১৬ — বিশ্বাসঘাতকের মুখোশ, নওশিনের জন্মের ভয়ংকর সত্য!
রাত তখন প্রায় বারোটা পেরিয়ে গেছে।
পুরোনো কবরস্থানে জিহাদ তার বাবার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে বসে আছে। চারদিকে অন্ধকার। নওশিন, ইমু আর ওভি ভয়ে একে অপরের দিকে তাকাচ্ছে।
জিহাদ: বাবা! চোখ খুলুন। প্লিজ, আমাকে একা রেখে যাবেন না!
নওশিন দ্রুত জিহাদের পাশে বসে বলল,
নওশিন: জিহাদ, নিজেকে সামলাও। উনাকে হাসপাতালে নিতে হবে।
ওভি: আমি গাড়ির ব্যবস্থা করছি। তোমরা উনাকে নিয়ে চলো।
ইমু: কিন্তু যে গুলি করেছে, সে এখনো আশেপাশে থাকতে পারে!
জিহাদ রাগী চোখে চারদিকে তাকিয়ে বলল,
জিহাদ: যে-ই হোক, তাকে আমি ছাড়ব না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই জিহাদের বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল।
---
অন্যদিকে, হাসপাতালে।
ডাক্তার বেরিয়ে আসতেই জিহাদ ছুটে গেল।
জিহাদ: ডাক্তার, আমার বাবা কেমন আছেন?
ডাক্তার: গুলি কাঁধে লেগেছে। আপাতত বিপদমুক্ত, তবে জ্ঞান ফিরতে সময় লাগবে।
জিহাদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
নওশিন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
নওশিন: দেখলে? উনি ভালো হয়ে যাবেন।
জিহাদ নওশিনের হাত ধরে বলল,
জিহাদ: তুমি পাশে না থাকলে হয়তো আমি এতক্ষণে ভেঙে পড়তাম।
নওশিন মৃদু হেসে বলল,
নওশিন: পাগল! তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না।
দূরে দাঁড়িয়ে ইমু আর ওভি তাদের দেখছিল।
ইমু: দেখো, এত বিপদের মধ্যেও দুজনের ভালোবাসা কমেনি।
ওভি: ভালোবাসা সত্যি হলে হাজার বিপদেও মানুষ একে অপরকে ছাড়ে না।
ইমু: আর তুমি? তুমি কি কাউকে এভাবে ভালোবাসতে পারবে?
ওভি কিছুক্ষণ ইমুর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
ওভি: পারব। কিন্তু ভয় হয়, যাকে ভালোবাসব, তাকে হারিয়ে ফেলব না তো?
ইমু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকাল।
---
রাত ১টা ৩০ মিনিট।
হঠাৎ জিহাদের বাবার কেবিন থেকে শব্দ এলো।
সবাই দ্রুত ভেতরে ঢুকল।
জিহাদের বাবা চোখ খুলেছেন।
জিহাদ: বাবা!
জিহাদের বাবা দুর্বল কণ্ঠে বললেন,
জিহাদের বাবা: জিহাদ... আমার কথা মন দিয়ে শোন।
জিহাদ: বলুন বাবা।
জিহাদের বাবা: তোমাদের চারজনের মধ্যে একজনের কাছে এমন একটা সত্য লুকানো আছে, যেটা জানলে তোমরা কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারবে না।
ওভি: কে সেই বিশ্বাসঘাতক?
জিহাদের বাবা: সে তোমাদের খুব কাছের মানুষ। তার নাম...
ঠিক তখনই মনিটরের শব্দ বেড়ে গেল। ডাক্তার এসে সবাইকে বাইরে যেতে বললেন।
কথাটা আর শেষ হলো না।
---
অন্যদিকে, আরমানের কেবিনে।
সেই রহস্যময় নারী এখনো আরমানের সামনে দাঁড়িয়ে।
আরমান: তুমি নওশিনের জীবনে আর কোনো সমস্যা তৈরি করবে না।
নারী: এত বছর ধরে যে সত্যিটা লুকিয়ে রেখেছ, সেটা কি কখনো প্রকাশ করতে পারবে?
আরমান: আমি আমার মেয়েকে হারাতে চাই না।
নারী: তোমার মেয়ে?
সে অট্টহাসি দিয়ে বলল,
নারী: নওশিন তোমার মেয়ে নয়, আরমান!
আরমানের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।
আরমান: চুপ করো! ও আমারই মেয়ে।
নারী: তাহলে এই কাগজটা কী বলে?
সে কাগজটি আরমানের হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল।
আরমান কাঁপা হাতে কাগজটি খুললেন।
সেখানে লেখা—
'নওশিনের জন্মের রাতে হাসপাতালের রেকর্ড পরিবর্তন করা হয়েছিল। শিশুটির প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।'
আরমান চোখ বন্ধ করে ফেললেন।
---
রাত ২টা।
নওশিন বাবার কেবিনে ঢুকল।
নওশিন: বাবা, তোমার শরীর কেমন আছে?
আরমান তাড়াতাড়ি কাগজটি বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেললেন।
আরমান: ভালো আছি মা। তুই কেমন আছিস?
নওশিন: আমি ভালো আছি। কিন্তু বাবা, তুমি কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
আরমান চমকে উঠলেন।
আরমান: হঠাৎ এমন কথা বলছিস কেন?
নওশিন: জানি না। মনে হচ্ছে সবাই আমাকে নিয়ে কিছু একটা লুকাচ্ছে।
আরমান মেয়ের হাত ধরে বললেন,
আরমান: মা, একটা কথা মনে রাখিস। পৃথিবীর সবাই তোকে ছেড়ে গেলেও আমি তোকে কখনো ছেড়ে যাব না।
নওশিন বাবাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল।
---
অন্যদিকে, হাসপাতালের ছাদে।
ওভি একা দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।
ওভি: আমি বলেছি, আর কোনো ক্ষতি করা যাবে না!
অপর পাশ থেকে একজন বলল,
অজানা কণ্ঠ: তুমি যদি আমাদের কথা না শোনো, তাহলে তোমার আসল পরিচয় সবাইকে জানিয়ে দেব।
ওভি: যা ইচ্ছা করো। আমি আর এসবের মধ্যে নেই।
ফোন কেটে গেল।
ঠিক তখন পেছন থেকে ইমুর কণ্ঠ ভেসে এল।
ইমু: কার সঙ্গে কথা বলছিলে?
ওভি চমকে পেছনে তাকাল।
ওভি: তুমি এখানে?
ইমু: হ্যাঁ। কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর দাও। তুমি কি আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছ?
ওভি চুপ করে রইল।
ইমু: অভি, প্লিজ! আমাকে সত্যিটা বলো।
ওভি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
ওভি: আমি যদি বলি, আমার জন্মের সঙ্গে নওশিনের জন্মের একটা ভয়ংকর সম্পর্ক আছে, তাহলে তুমি বিশ্বাস করবে?
ইমু অবাক হয়ে গেল।
ইমু: কী বলছ তুমি?
ওভি: সময় হলে সব বলব। শুধু একটা কথা মনে রেখো, আমি কখনো নওশিনের ক্ষতি চাইনি।
---
ভোর ৪টা।
জিহাদের ফোনে একটি ছবি এলো।
ছবিতে সেই রহস্যময় নারী, আরমান এবং জিহাদের বাবা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।
ছবির নিচে লেখা—
'তোমার বাবাকে যারা গুলি করেছে, তাদের একজন তোমার নিজের পরিবারের মানুষ।'
জিহাদ ছবিটি নওশিনকে দেখাল।
নওশিন ছবির নারীটিকে দেখে চমকে উঠল।
নওশিন: এই মহিলা!
জিহাদ: তুমি চেনো?
নওশিন: এই মহিলাকে আমি ছোটবেলায় আমাদের বাসায় দেখেছি। বাবা বলেছিলেন, উনি আমাদের আত্মীয়।
জিহাদ: তোমার বাবা এই মহিলাকে চেনেন?
নওশিন: শুধু চেনেন না, মনে হয় উনি বাবার অতীতের সঙ্গে জড়িত।
ঠিক তখনই হাসপাতালের রিসেপশন থেকে ফোন এলো।
রিসেপশনের লোকটি বলল,
— স্যার, একজন মহিলা আপনার জন্য একটা খাম রেখে গেছেন।
জিহাদ খামটি হাতে নিল।
ভেতরে একটি পুরোনো জন্মসনদ এবং একটি ছোট্ট চিঠি।
চিঠিতে লেখা—
'নওশিন, তুমি যাকে বাবা বলে ডাকো, তিনি তোমার জন্মদাতা নন। তোমার আসল বাবা এখনো বেঁচে আছেন। আর তিনি তোমার খুব কাছেই আছেন।'
নওশিনের হাত থেকে কাগজটি পড়ে গেল।
জিহাদ তাকে ধরে ফেলল।
নওশিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,
— জিহাদ, তাহলে আমি কার মেয়ে?
জিহাদ তাকে বুকে জড়িয়ে বলল,
— আমি জানি না, নওশিন। তবে সত্যিটা না জানা পর্যন্ত তোমার হাত ছাড়ব না।
ঠিক তখন জিহাদের বাবার কেবিন থেকে একজন নার্স দৌড়ে বেরিয়ে এল।
নার্স: স্যার! রোগী নেই!
জিহাদ: কী!
সবাই ছুটে কেবিনে গেল।
বিছানা খালি।
জানালার পাশে পড়ে আছে একটি রক্তমাখা হাতের ছাপ।
আর দেয়ালে লাল কালিতে লেখা—
'সত্যিটা জানতে চাইলে আজ রাত বারোটায় একা চলে এসো। এবার তোমার নিজের জন্মের রহস্য জানতে পারবে, নওশিন!'
নওশিন ভয়ে জিহাদের হাত শক্ত করে ধরল।
কিন্তু কেউ জানত না, তাদের পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ সবকিছু শুনছিল।
সে ধীরে ধীরে ফোন বের করে বলল,
— বস, নওশিন সব জানতে চলেছে।
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
— তাহলে এবার আর অপেক্ষা নয়। মেয়েটাকে আমার সামনে নিয়ে এসো।
ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি নাম...
'নওশিনের আসল বাবা!'
চলবে... 🖤
পর্ব ১৭-তে:
১. নওশিনের আসল বাবা কে?
২. জিহাদের বাবাকে কে অপহরণ করল?
৩. ওভির জন্মের রহস্য কী?
৪. চার বন্ধুর মধ্যে বিশ্বাসঘাতক কে?
৫. ইমু কি ওভির অতীতের সত্য জানতে পারবে?