🌸 অদ্ভুত মায়া 🌸
লেখিকা: তৌশানি রায় তনু
পার্ট – ০১
সকাল ৯টা।
হালকা শীতের আমেজ চারদিকে। জানালার পর্দা ভেদ করে সকালের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে ঘরের মেঝেতে। বাইরে পাখির কিচিরমিচির শব্দে চারপাশ মুখরিত। অথচ এসবের কোনো কিছুতেই কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই রাহির।
কম্বলের নিচে আরাম করে ঘুমিয়ে আছে সে। দেখে মনে হচ্ছে, পৃথিবীর সমস্ত চিন্তা ভুলে ঘুমানোর দায়িত্ব যেন একাই নিয়েছে মেয়েটা!
এমন সময় ঘরে প্রবেশ করলেন রাহির মা।
রাহির মা: রাহি...! এই রাহি...! আর কত ঘুমাবি? সকাল ৯টা বেজে গেছে। এরপর কলেজে যেতে দেরি হবে, আর তখন পুরো বাড়ি মাথায় তুলবি!
রাহি: (ঘুম ঘুম কণ্ঠে) উমমম... মা, আর একটু ঘুমাতে দাও না প্লিজ! মাত্র পাঁচ মিনিট...
রাহির মা: পাঁচ মিনিটের কথা তো সেই আধা ঘণ্টা ধরে শুনছি। একবার চোখ খুলে দেখ তো, কয়টা বাজে!
রাহি: হুমমম... আচ্ছা, বলো কয়টা বাজে?
রাহির মা: ৯টার উপরে বাজে। এবারও যদি না উঠিস, তাহলে কলেজে দেরি করে যাওয়ার জন্য নিজেই দায়ী থাকবি।
কথাটা শুনে রাহি ধড়মড় করে উঠে বসলো।
রাহি: কিহহহহহহহ! ৯টার উপরে বাজে! মা, তুমি আমাকে আর একটু আগে ডাকতে পারো না?
রাহির মা: (কোমরে হাত দিয়ে) বাহ্! আমি তোকে আধা ঘণ্টা ধরে ডাকছি, আর এখন দোষ আমার!
রাহি: আচ্ছা আচ্ছা, হয়েছে। তুমি নিচে গিয়ে ব্রেকফাস্ট রেডি করো। আমি একদম দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে নিচে আসছি।
রাহির মা: তোর এই দশ মিনিটের হিসাব আমার বেশ ভালো করেই জানা আছে!
কথাটা বলেই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আর রাহি? সে তো ততক্ষণে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমের দিকে দৌড় দিয়েছে।
---
এবার রাহির পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।
রাহি মিস্টার আদিদেব ও মিসেস রাইয়ের একমাত্র মেয়ে। তাদের দুই সন্তান—বড় ছেলে রাহুল এবং ছোট মেয়ে রাহি।
রাহুল বিবাহিত। তার স্ত্রীর নাম পৃথা। তাদের এক বছরের ছোট্ট একটি মেয়ে আছে, নাম মিষ্টি।
রাহি বর্তমানে কলেজের ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। ভীষণ চঞ্চল, দুষ্টু আর হাসিখুশি স্বভাবের মেয়ে সে। নিজের পরিবারকে খুব ভালোবাসে।
অন্যদিকে রাহুল একটু দায়িত্বশীল স্বভাবের হলেও বোনকে খুনসুটি করতে একটুও ছাড়ে না।
---
নিচে, ডাইনিং রুম।
পৃথা রান্নাঘরে ব্যস্ত। একদিকে শ্বশুরবাড়ির সবার জন্য নাশতা তৈরি করছে, অন্যদিকে ছোট্ট মিষ্টির খাবারও তৈরি করতে হচ্ছে তাকে।
পৃথা: মা... এই যে, রাহির ব্রেকফাস্ট রেডি করে দিয়েছি। আপনি একটু টেবিলে দিয়ে আসবেন? আমি মিষ্টির খাবারটা রেডি করছি।
মিসেস রাই: আচ্ছা মা, তুই কাজ কর। আমি দিয়ে দিচ্ছি।
ঠিক তখনই মেয়েকে কোলে নিয়ে নিচে নেমে এলো রাহুল।
রাহুল: পৃথা...! আমার ব্রেকফাস্ট রেডি? সকাল ৯টা ২০ বাজে। এভাবে দেরি হলে তো অফিসে পৌঁছাতে দেরি হয়ে যাবে!
মিসেস রাই: হ্যাঁ রে রাহুল, পৃথার কি আরো দশটা হাত আছে নাকি? একা হাতে এত কিছু সামলাতে হচ্ছে, একটু সময় তো লাগবেই!
রাহুল: আরে মা, আমি কি কিছু বলেছি নাকি?
পৃথা: এই যে, তোমার ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেওয়া আছে। আর মা, আপনি একটু মিষ্টিকে খাইয়ে দেবেন? আমি বাকি রান্নাগুলো শেষ করে আসছি।
মিসেস রাই: হ্যাঁ মা, তুই চিন্তা করিস না।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে প্রায় দৌড়ে নিচে নেমে এলো রাহি।
চুলগুলো কোনোমতে আঁচড়ানো, এক হাতে ব্যাগ আর অন্য হাতে ফোন।
রাহি: বৌদিইইই! আমার ব্রেকফাস্ট কই?
পৃথা: (হেসে) টেবিলে আছে, আগে গিয়ে বসে খেয়ে নেও। শুধু চিৎকার করলেই তো আর খাবার মুখে চলে আসবে না!
রাহি: (মুখ বাঁকিয়ে) উফফ বৌদি! তোমরা সবাই মিলে আমাকে শুধু বকো!
রাহুল: এই যে মহারানী! আপনার কলেজ কয়টায়?
রাহি: (খেতে খেতে) দশটায়।
রাহুল: বাহ্! এখন বাজে প্রায় সাড়ে নয়টা। আর ম্যাডাম এখনো নাশতা করছেন!
রাহি: দাদা, তুমি কি আমার দাদা নাকি আমার কলেজের প্রিন্সিপাল? সকাল সকাল এত লেকচার দিচ্ছ কেন?
রাহুল: (হেসে) বেশি কথা না বলে খা। যা, তোকে আর তোর তনুকে আমি কলেজে ড্রপ করে দেব।
রাহি: (খুশি হয়ে) সত্যি দাদা?
রাহুল: হ্যাঁ বাবা, সত্যি। এবার তাড়াতাড়ি খা।
রাহি: ইসস! আমার দাদাটা না পৃথিবীর সেরা দাদা !
রাহুল: হ্যাঁ, হ্যাঁ। কাজের সময়ই শুধু পৃথিবীর সেরা দাদা মনে হয়!
সবাই হেসে উঠল।
---
অন্যদিকে, সেনগুপ্ত বাড়ি।
সকাল ১০টা।
সেনগুপ্ত বাড়ির দোতলার একটি সুন্দর সাজানো ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে একজন সুদর্শন যুবক।
পরনে ফরমাল শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি, চুলগুলো সুন্দর করে সেট করা। মুখে গম্ভীর ভাব, চোখেমুখে ব্যক্তিত্বের ছাপ।
সে আর কেউ নয়, এই গল্পের নায়ক—অভ্র সেনগুপ্ত।
হঠাৎ ঘর থেকে তার গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এলো।
অভ্র: মাম্মাআআ...! আমার ব্রেকফাস্ট রেডি হয়েছে? অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে!
অভ্রর মা: (নিচ থেকে) তোর ব্রেকফাস্ট টেবিলে দিয়ে রেখেছি। তুই নিচে আয়!
অভ্র: ওকে, আসছি!
কিছুক্ষণ পর ফোন হাতে নিয়ে নিচে নেমে এলো অভ্র।
ডাইনিং টেবিলে বসে নাশতা করতে করতে মায়ের দিকে তাকাল সে।
অভ্রর মা: বাবু, একটা কথা ছিল।
অভ্র: বলো মাম্মা।
অভ্রর মা: সামনের সপ্তাহে তোর আদি মামার বিয়ে। আমরা সবাই যাব। তুইও আমাদের সঙ্গে যাবি তো?
অভ্র: (নাশতা করতে করতে) মাম্মা, অফিসে অনেক কাজ আছে। তুমি, বুনু আর পাপা চলে যাও। আমার মনে হয় যাওয়া হবে না।
অভ্রর মা: সবসময় শুধু অফিস আর কাজ! পরিবার বলেও তো কিছু আছে। কতদিন পর সবাই একসঙ্গে হবো, আর তুই যাবি না?
অভ্র: আরে মাম্মা, এমনভাবে বলছ কেন? কাজের একটু চাপ আছে।
এতক্ষণ চুপ করে থাকা অভ্রর বাবা এবার কথা বললেন।
অভ্রর বাবা: কয়েকটা দিনেরই তো ব্যাপার। কয়েকদিন অফিস বন্ধ রাখলে খুব বেশি কিছু হবে না। আর প্রয়োজন হলে ওখানে গিয়েও ল্যাপটপে নিজের কাজ করতে পারবি।
অভ্র: (একটু ভেবে) আচ্ছা, ঠিক আছে। ভেবে দেখব।
অভ্রর মা: শুধু ভেবে দেখলে হবে না কিন্তু। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে।
অভ্র: আচ্ছা বাবা, দেখা যাবে। এখন আসছি। বাই মাম্মা, বাই পাপা!
কথাটা বলেই ব্যাগ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল অভ্র।
---
এবার অভ্রর পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া যাক।
অভ্র সেনগুপ্ত মিস্টার অনিরুদ্ধ সেনগুপ্ত ও মিসেস সৃষ্টির একমাত্র ছেলে। সেনগুপ্ত পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী সে।
তাদের একটি মেয়েও আছে, নাম স্নেহা সেনগুপ্ত। স্নেহা বর্তমানে কলেজের ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ে।
অভ্র নিজের বাবার প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির দায়িত্ব সামলায়। অল্প বয়সেই নিজের যোগ্যতায় ব্যবসার অনেক দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে সে।
গম্ভীর, রাগী আর ভীষণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অভ্রকে সবাই একটু সমীহ করেই চলে। তবে তার আরেকটি পরিচয় আছে—সে একজন বাইক রাইডার। বাইকের প্রতি তার ভালোবাসা একটু বেশিই।
কাজ আর বাইক—এই দুটো নিয়েই তার বেশিরভাগ সময় কেটে যায়।