লেখিকা: আরফা আইরিশা
### শেষ বিকেলের গল্প
### পর্ব ১: ছয় পাগল আর এক রহস্যময় বাড়ি
সকাল ৮টা।
ঢাকার একটি সুন্দর বাড়ির ডাইনিং রুমে বসে নাশতা করছিল রাফি। তার সামনে এক প্লেট পরোটা, ডিমভাজি আর এক কাপ চা।
কিন্তু সমস্যা হলো, সে একা নাশতা করতে পারছে না।
কারণ তার ফোনে একের পর এক কল আসছে।
রাফি বিরক্ত হয়ে ফোন রিসিভ করল।
— কী হয়েছে?
ওপাশ থেকে নীলের চিৎকার।
— কোথায় তুই?
— বাড়িতে।
— এতক্ষণ ধরে বাড়িতে কী করিস?
— ভাত খাই।
— এখন ভাত খাস কেন?
— তাহলে কি পাতিলের মধ্যে ভাজির মতো শুয়ে থাকব?
নীল কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
— তোর সঙ্গে কথা বলাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
রাফি হেসে ফোন কেটে দিল।
ঠিক তখনই তার মা এসে বললেন,
— রাফি, তুই আবার কার সঙ্গে ঝগড়া করছিস?
— মা, বন্ধুর সঙ্গে।
— তোদের বন্ধুত্ব দেখে তো আমার মনে হয় শত্রুতাও এত গভীর হয় না!
রাফি পরোটায় কামড় দিয়ে বলল,
— মা, বন্ধুত্ব মানেই তো ভালোবাসার সঙ্গে একটু অপমান ফ্রি!
সকাল ৯টা।
শহরের একটি ক্যাফের সামনে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচজন।
নীল, অর্ণব, তন্ময়, মেঘলা আর পিউ।
আরেকজনের জন্য তারা অপেক্ষা করছে—রাফি।
মেঘলা বিরক্ত হয়ে বলল,
— ছেলেটা কি হেঁটে আসছে, নাকি রাস্তার প্রতিটা গাছের সঙ্গে পরিচয় করতে করতে আসছে?
অর্ণব বলল,
— ওকে নিয়ে এত চিন্তা করিস না। রাফি সময়মতো আসবে।
পিউ অবাক হয়ে তাকাল।
— তুই কীভাবে জানিস?
— কারণ ও সময়মতো আসবে না, এটা আমি আগেই জানি।
ঠিক তখনই দূর থেকে রাফিকে দেখা গেল।
সে দৌড়ে এসে বলল,
— সরি সরি! একটু দেরি হয়ে গেছে।
নীল হাতঘড়ি দেখিয়ে বলল,
— একটু?
— হ্যাঁ।
— এক ঘণ্টা দেরি!
রাফি গম্ভীর মুখে বলল,
— সময় আপেক্ষিক বিষয়।
তন্ময় মাথা নেড়ে বলল,
— আইনস্টাইন বেঁচে থাকলে তোকে দেখে আবার মারা যেতেন।
সবাই হেসে উঠল।
ছয় বন্ধু একসঙ্গে হলে এমনই হয়। তাদের মধ্যে একজনের কথা আরেকজন শেষ করতে পারে না। সারাক্ষণ হাসি, ঠাট্টা আর খুনসুটি চলতেই থাকে।
এই ছয়জন হলো—
* রাফি — দলের সবচেয়ে বড় দুষ্টু।
* নীল — সবকিছুতে যুক্তি খোঁজে, কিন্তু নিজেই সবচেয়ে বেশি বোকামি করে।
* অর্ণব — শান্ত থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবার সঙ্গে যোগ দেয়।
* তন্ময় — নিজেকে দলের সবচেয়ে বুদ্ধিমান মনে করে।
* মেঘলা — সাহসী, স্পষ্টভাষী
6\. পিউ — দলের সবচেয়ে মিষ্টি মেয়ে, তবে রাগলে কাউকে ছাড়ে না।
আর তাদের সঙ্গে প্রায়ই থাকে একজন বড় ভাই—আরমান ভাই। তিনি নীলের বড় ভাই। বয়স ২৮। পেশায় ব্যবসায়ী, কিন্তু এই ছয় বন্ধুর কাছে তিনি বড় ভাইয়ের চেয়ে বেশি একজন বিপদের সঙ্গী!
সকাল ১০টা।
ক্যাফেতে বসে সবাই কফি খাচ্ছিল।
রাফি মেনু কার্ড হাতে নিয়ে বলল,
— আজকে সবাই আমার খরচে খাবে।
সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল।
নীল অবিশ্বাসের সুরে বলল,
— তোর কাছে টাকা আছে?
— অবশ্যই।
তন্ময় বলল,
— গতকাল তো আমার কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা ধার নিয়েছিলি!
রাফি গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
— সেটা ছিল অর্থনৈতিক গবেষণা।
মেঘলা হেসে বলল,
— কীসের গবেষণা?
— বন্ধুরা টাকা ধার দিলে ফেরত চায় কি না, সেটা পরীক্ষা করছিলাম।
পিউ মাথায় হাত দিয়ে বলল,
— আল্লাহ! এমন বন্ধু আমাদের কপালে জুটল কেন?
অর্ণব শান্তভাবে কফিতে চুমুক দিল।
— ওকে বাদ দে। আজকের পরিকল্পনাটা বল।
নীল ফোন বের করে বলল,
— আরমান ভাই আমাদের জন্য একটা চমৎকার জায়গা ঠিক করেছেন। শহরের বাইরে একটা পুরোনো বাড়ি। চারদিকে বাগান, বড় পুকুর, অনেক গাছ। আমরা আজ বিকেলে সেখানে যাব।
রাফি খুশিতে হাততালি দিল।
— বাহ! তাহলে আজকে বেড়ানো, খাওয়া আর ঘুম!
মেঘলা বলল,
— শুধু তুই ঘুমাবি। আমরা ঘুরব।
রাফি মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— আমাকে ছাড়া তোদের জীবন অন্ধকার।
তন্ময় সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— তুই থাকলে জীবন অন্ধকার না, বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে!
আবারও হাসির রোল পড়ে গেল।
দুপুর ২টা।
আরমান ভাইয়ের গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামল।
তিনি গাড়ি থেকে নেমে ছয়জনকে দেখে মাথা নাড়লেন।
— তোমাদের নিয়ে বের হওয়ার আগে আমার একটা উইল করে রাখা উচিত ছিল।
রাফি দৌড়ে এসে বলল,
— ভাইয়া, এত ভালোবাসেন আমাদের?
আরমান বললেন,
— ভালোবাসি বলেই এখনো গাড়িতে উঠতে দিচ্ছি। নইলে তোদের সবাইকে বাসায় রেখে চলে যেতাম।
নীল বলল,
— ভাইয়া, রাফি কিন্তু আজ নিজের খরচে সবাইকে খাওয়াবে।
আরমান ভ্রু তুলে রাফির দিকে তাকালেন।
— সত্যি?
রাফি একটু ইতস্তত করে বলল,
— জি ভাইয়া। তবে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে।
— কী?
— আমার মানিব্যাগটা বাসায় রেখে এসেছি।
আরমান হেসে বললেন,
— বুঝেছি। তোর মানিব্যাগেরও আজ ছুটি!
সবাই গাড়িতে উঠে পড়ল।
গাড়ির পেছনের সিটে বসে পিউ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। অর্ণব তার পাশে বসে বলল,
— কী দেখছ?
— রাস্তা।
— রাস্তার মধ্যে বিশেষ কিছু আছে?
পিউ হেসে বলল,
— তোমার মতো বিরক্তিকর মানুষ দেখার চেয়ে রাস্তা দেখা ভালো।
অর্ণব একটু হেসে জানালার বাইরে তাকাল।
— তাহলে আজ রাস্তার সঙ্গেই গল্প করো।
পিউ এবার লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
সামনের সিট থেকে রাফি সব দেখে ফেলল।
সে ফিসফিস করে নীলকে বলল,
— এই গাড়িতে প্রেমের বাতাস বইছে।
নীল বলল,
— জানালা বন্ধ কর। নইলে আমাদেরও প্রেম ধরে যাবে!
বিকেল ৪টা।
গাড়ি এসে থামল একটি বিশাল পুরোনো বাড়ির সামনে।
বাড়িটি দেখতে বেশ সুন্দর। চারদিকে বড় বড় গাছ, সামনে ফুলের বাগান, পাশে একটি পুরোনো পুকুর। বাড়ির দেয়ালে সময়ের ছাপ থাকলেও এর সৌন্দর্য একটুও কমেনি।
ছয়জন গাড়ি থেকে নামল।
মেঘলা অবাক হয়ে বলল,
— ওয়াও! জায়গাটা তো অসাধারণ!
পিউ বলল,
— মনে হচ্ছে কোনো সিনেমার বাড়ি।
রাফি দুই হাত কোমরে রেখে বলল,
— এই বাড়িতে আমি থাকব।
নীল বলল,
— বাড়ির মালিককে জিজ্ঞেস করেছিস?
— না। কিন্তু আমার মন বলছে বাড়িটা আমাকে পছন্দ করেছে।
আরমান ভাই হেসে বললেন,
— আগে বাড়ির ভেতরে ঢোক। তারপর বাড়ি তোকে পছন্দ করে কি না দেখা যাবে।
বাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
বড় বড় ঘর, কাঠের সিঁড়ি, পুরোনো ছবি আর সুন্দর আসবাবপত্র।
তন্ময় একটি দেয়ালের ছবি দেখে বলল,
— এই ছবির মানুষটাকে দেখেছিস? একদম আমার মতো দেখতে!
রাফি ছবির দিকে তাকিয়ে বলল,
— হ্যাঁ। পার্থক্য শুধু এই যে, উনি মানুষ আর তুই একটা চলন্ত বিপদ।
তন্ময় তার দিকে কুশন ছুড়ে মারল।
সন্ধ্যা ৬টা।
সবাই বাড়ির পেছনের বাগানে বসে গল্প করছিল।
হঠাৎ পিউ একটি পুরোনো কাঠের বাক্স দেখতে পেল।
— এই যে! এখানে একটা বাক্স আছে!
মেঘলা এগিয়ে এসে বলল,
— কোথায় পেলি?
— ওই গাছটার নিচে।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে গেল।
— দাঁড়া দাঁড়া! গুপ্তধন হলে কিন্তু আমার অর্ধেক চাই।
নীল বলল,
— তুই আগে বাক্সটা খুলতে দে। গুপ্তধন না হয়ে পুরোনো জুতা বের হলে তোর অর্ধেক জুতা দেব।
সবাই মিলে বাক্সটি খুলল।
ভেতরে ছিল একটি পুরোনো চাবি, হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ এবং একটি ছোট্ট ছবি।
কাগজে লেখা—
"যে এই বাড়ির ছয়টি জানালা খুলতে পারবে, সে জানতে পারবে শেষ বিকেলের আসল গল্প।"
সবাই চুপ হয়ে গেল।
রাফি প্রথমে নীরবতা ভাঙল।
— ছয়টা জানালা? আমাদের ছয়জনের জন্য ছয়টা জানালা? বাহ! বাড়িওয়ালা আমাদের সংখ্যা জানে!
মেঘলা বলল,
— এটা কি কোনো ধাঁধা?
তন্ময় কাগজটি হাতে নিয়ে পরীক্ষা করতে লাগল।
— আমার ধারণা, এখানে কোনো গোপন রহস্য আছে।
নীল বলল,
— তোর ধারণা বাদ দে। গতবার তুই ফ্রিজের ভেতরে মোবাইল খুঁজেছিলি!
— সেটা একটা দুর্ঘটনা ছিল!
আরমান ভাই কাগজটি হাতে নিয়ে ভালো করে দেখলেন।
কাগজের নিচে ছোট করে একটি তারিখ লেখা ছিল।
১৯৯৮ সালের ১৭ই অক্টোবর।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।
নীল জিজ্ঞেস করল,
— ভাইয়া, কী হয়েছে?
আরমান কাগজটি ভাঁজ করে বললেন,
— এই বাড়িটা সম্পর্কে একটা কথা জানি। বহু বছর আগে এখানে একটি পরিবার থাকত। তাদের পরিবারের ছয়জন তরুণ-তরুণী প্রায় প্রতিদিন এই বাড়িতে আড্ডা দিত। একদিন তারা হঠাৎ উধাও হয়ে যায়।
পিউ অবাক হয়ে বলল,
— সবাই একসঙ্গে?
— হ্যাঁ। এরপর থেকে বাড়িটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল।
রাফি গম্ভীর মুখ করে বলল,
— তাহলে আমরা আজই ফিরে যাব।
সবাই তার দিকে তাকাল।
সে আবার বলল,
— কারণ আমি ভূত-টুত বিশ্বাস করি না, কিন্তু ভূত যদি আমাকে বিশ্বাস করে ফেলে তাহলে সমস্যা!
হাসতে হাসতে সবাই প্রায় বসে পড়ল।
আরমান ভাই মাথা নেড়ে বললেন,
— তোরা ছয়জন একটা রহস্য পেলেই এমন করিস, যেন পৃথিবীর শেষ দিন এসে গেছে!
নীল বলল,
— ভাইয়া, তাহলে আমরা রহস্যটা সমাধান করব?
আরমান কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
— চেষ্টা করতে পারিস। তবে সাবধানে। বাড়ির পুরোনো জিনিসপত্র নষ্ট করবি না।
ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একটা শব্দ হলো।
ঠক!
সবাই একসঙ্গে ঘুরে তাকাল।
দোতলার একটি জানালা নিজে থেকেই খুলে গেল।
পিউ ধীরে ধীরে বলল,
— জানালাটা... নিজে নিজে খুলল কীভাবে?
রাফি নীলের হাত চেপে ধরল।
নীল বলল,
— এই! আমার হাত ছাড়!
— তুই আমার বন্ধু না?
— বন্ধু, কিন্তু তোর হাত ধরে মরতে রাজি না!
অর্ণব আর মেঘলা হাসি চেপে রাখতে পারল না।
আরমান ভাই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— মনে হচ্ছে, আমাদের জন্য বাড়িতে কেউ অপেক্ষা করছে।
রাফি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— ভাইয়া, সে যদি চা খেতে চায়, আমি বানিয়ে দেব। কিন্তু সামনে আসতে বলবেন না!
সবাই আবার হেসে উঠল।
কিন্তু কেউ খেয়াল করল না, দোতলার জানালার পাশে রাখা একটি পুরোনো ছবির পেছনে লেখা আছে—
"ছয়জন আবার একসঙ্গে ফিরবে। তাদের সঙ্গে থাকবে সেই মানুষটি, যে সত্য জানে।"
আর ছবির নিচে লেখা একটি নাম—
আরমান।
চলবে...!!