ফন্ট সাইজ:
থিম:
লাভ বাই দ্যা ভিলেন

লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬০

লেখক: লিজা মনি

বিয়াল্লিশ তলার সেই বিশাল উচ্চতা থেকে বাইরের শহরটাকে মনে হয় ছোট ছোট আলোকবিন্দুর এক মেলা। নিকের পার্সোনাল কেবিনে এখন পিনপতন নীরবতা। ল্যাপটপের স্ক্রিনে ভেসে থাকা শেষ স্লাইডটা বন্ধ করে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। গত এক ঘণ্টা ধরে চলা ম্যারাথন মিটিংটা এইমাত্র শেষ হলো। কায়াতের আংশিক খোঁজ পাওয়া গিয়েছে।

​ঘরের অন্য প্রান্তের সোফায় বেশ কিছুক্ষণ ধরেই বসে আছে আরিশ আর অধিরাজ। তারা এতক্ষণ চুপচাপ থাকলেও নিকের ল্যাপটপ বন্ধ করার শব্দটা তাদের জন্য সংকেত হিসেবে কাজ করে এই মুহূর্তে।

​নিক চেয়ারে হেলান দিতেই আরিশ খানিকটা গলা ঝেড়ে শব্দ করে উঠে । ​নিক ভ্রু কুঁচকে তাকাল। আরিশের চাউনি আর বসার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে কিছু একটা বলার জন্য ছটফট করছে। পাশে বসে থাকা অধিরাজও আড়চোখে আরিশের দিকে তাকায়।

আরিশ কাউচের ওপর আরাম করে হেলান দিয়ে নিজের দুহাতে বুক বেঁধে নেয়। ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত বাঁকা হাসিটা ঝুলিয়ে রেখেই সে খোঁচা দিয়ে বসল,

” সত্যি এনি প্রেগন্যান্ট?

নিক বিরক্ত গলায় বলে,

” চান্স নেই এমন। প্রেগন্যান্ট হবে না।

” কিন্তু তুই তো চাইতি একটা বাচ্চা হোক।

” চাই না এখন আমি।

” কেনো?

নিক ল্যাপটপ অফ করে বলে,

” ওর জীবন রিস্ক হয় এমন কাজ আমি কোনোদিন এই করব না। বাল-ছাল বাচ্চা দিয়ে কি করব আমি?

আরিশ সিরিয়াস অথচ হেসে বলে,

” তবে এই মুহূর্তে ব্লাশ করছিস কেনো?

নিকের কপাল কুচকে আসে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়,

” আই’ম ব্লাশিং। ডোন্ট টক ননসেন্স, অর আই’ল গেট রিয়্যালি অ্যাংরি।

আরিশ গাঁ কাঁপিয়ে হেসে উঠে। নিক কটমট চোখে তাকিয়ে ধমকে উঠে,

” আজকাল মনে হচ্ছে না তুই কিছুটা ন্যাকা হয়ে উঠেছিস। জেন্ডার চেইঞ্জ করে ফেলেছিস নাকি?

আরিশ থতমত খেয়ে উঠে। নিজেকে ভালোভাবে পরখ করে শান্ত গলায় বলে,

” জেন্ডার চেইঞ্জ করলে বউ কিভাবে রাখব মামা? বউ তো টিকবে না। কিছুক্ষন আগে মাত্র বিয়ে করেছি। এই মুহূর্তে বউ হারাতে চাই না। বাসর করব, বাচ্চা উৎপাদন করব। তকে আমার ছেলের শশুর বানাব। এরপর বাকিসব ভেবে দেখব।

নিক চোয়াল পিষে তাকায়। আরিশ সিরিয়াস গলায় বলে,

” এতবড় উপকার করলাম অন্তত ভালো ভাবে তাকা ভাই।

” কি উপকার করেছিস তুই?

আরিশ অবাক হয়ে বলে,

” মিথ্যা অভিনয় করেছি বলেই তো এনি তকে ফোন করেছে। এত সুন্দরভাবে কাছে ডেকেছে যাওয়ার জন্য। তুই হয়ত এখন চলেও যাবি। যেভাবে ছটফট করছিস যাওয়ার জন্য সেটা দেখেই বুঝা যাচ্ছে। সেটা হিসেব করে ও তো নরমাল হ।

নিক ঠোঁট কামড়ালো নিজের।।তীর্যক ভাবে তাকিয়ে বলে,

” যে আমার সে আমার। পাড়া-প্রতিবেশীদের কান ভাঙ্গানোতে কিছু হয় না। তাই তকে আর কান ভাঙ্গাতে হবে না।

আরিশের ইচ্ছে হলো নিকের মাথাটা ভেঙ্গে ফেলতে। কতবড় হিটলার হলে তাকে এইভাবে অপমান করলো। তর নাম আজ থেকে আমি হিটলার বলে সেইভ করলাম।

” তুই আমাকে পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে তুলনা করলি?

” মিথ্যা বলে আমার বউকে উতলা করেছিস। আমার বউ উতলা হয়েছে বলে আমাকে ফোন দিয়েছে। এখন তার নরম গলা শুনে আমি উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। এখন মিনারে গিয়ে যদি কিছু একটা করে বসি। এতে সে কাঁদবে, জ্ঞান হারিয়ে ফেলবে। কত কিছু হতে যাবে তর এই সামান্য মিথ্যের জন্য। রাস্কেল!

আরিশ আহাম্মকের মত তাকিয়ে আছে। সে হিটলার ডেকে ভুল করে নি। আরিশ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,

” তর মত হিটলার আমি আর একটাও দেখিনি। যার জন্য চুরি করলাম সে বলছে তুই চুর। এইবার যা কিছু হয়ে যাক আমি তর সংসারে হাত ডুকাব না।

” তুই আমার বউয়ের সামনে বসে কথা বলেছিস এইটা এইতো তর সব থেকে বড় অন্যায়। ইচ্ছে তো করছে টর্চার সেলে নিয়ে গেলে হাত -পা বেঁধে উল্টো ঝুঁলিয়ে রাখি।

আরিশ কাঁধ নাড়িয়ে বলে,

” ভাই সে আমার বোনের মত। আন্টির ঘরের আপন বোন সে আমার।

নিক ভ্রুঁ নাচালো। গম্ভীর গলায় বলে,

” নীল কুমারি কে ডেকেছিলো?

আরিশ থেমে যায়। হাঁশ-ফাঁশ করে উঠে তার শরীর। নিজেকে সাধু প্রমান করার চেষ্টা করে বলে,

” সেটা অতীত হয়ে গিয়েছে। ভুল করে বলে ফেলেছিলাম নীল কুমারী। এতে তুই তো শাস্তি কম দিস নি। একটা অন্ধকার রুমে বন্ধী করে রেখেছিস কত দিন ধরে। সব কিছু শোধ হয়ে গিয়েছে।

” শোধ হয়েছে বলেই বেঁচে আছিস। নয়ত তখন চোখটা এই গালিয়ে দিতাম।তকে যাতে আমার বউয়ের আশে-পাশেও যেতে না দেখি। তকে নিয়ে আমার বিশ্বাস নেই। প্রয়োজনে ওকে মা ডাকবি তবুও তার সামনে যাবি না।

আরিশের চোখ -মুখ কুচকে আসে। অধিরাজ অনেক্ষন হাসিটা কন্ট্রোল রেখেছে। এইবার শব্দ করে হেসে উঠে অনেকটা। আরিশের চোখ রাঙ্গানি দেখে হাসিটা বহু কষ্টে থামিয়ে দেয়। আরিশ গলা কেঁশে নিকের হাতের দিকে তাকায়। ইশারা দিয়ে বলে,

” এই ছবির বেবিটা কে? মনে হচ্ছে খুবই বাচ্চা একটা বাচ্চা।

নিক ছবিটাতে দৃষ্টি রাখে। শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ধারালো গলায় বলে,

” আমার রক্ত।

” হুয়াট?

আরিশ অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠে সামান্য। পর মুহূর্তে শান্ত হয়ে বলে,

” পাগল হয়ে গিয়েছিস? তর রক্ত মানে কি নিক? তর কেউ তো বেঁচে নেই। তবে…

আরিশ থমকায়। আচমকা উৎসুক হয়ে উঠে। কাঁপা গলায় বলে,

” ত.. র বোনকে পেয়ে গিয়েছিস? ও কি বেঁচে আছে?

নিক চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস টানে। অদ্ভুত গলায় বলে,

” অনেকটা বড় হয়ে গিয়েছে। সেই ছোট্ট প্রানটা আর ছোট নেই। আমি ওকে ভালোবাসতে চাচ্ছি। কিন্তু কেনো জানি কোনো মায়া কাজ করছে না। অল দিস ফা*কিং ড্রামা অফ ইমোশন্স। আমার হৃদয়টা এতটা বিষাক্ত আর পাথর হয়ে উঠেছে যে নিজের বোনের প্রতি মায়া কাজ করছে না। আসলেই আমি একটা মনস্টার। অনুভুতিহীন জানোয়ার!

অধিরাজ হালকা হেসে বলে,

” ম্যম কি এই আফ্রিকাতে আছে স্যার?

” আছে।

আরিশ উৎসুক গলায় বলে,

” জানালি না কেনো এতদিন? আর কে সেই মেয়ে?

নিক রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে,

” সেটা নিজ চোখে দেখতে পারলেই বুঝবি। এইসব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবি না। উত্তর দিতে রাগ হচ্ছে।

আরিশ আর অধিরাজ থেমে যায়। তারা বুঝতে পারে নিক এই মুহূর্তে এইসব উত্তর দিতে রাজি নয়। অধিরাজ বার বার মাথায় হাত দিচ্ছে। নিক কপাল কুচকে বলে,

” কি বলতে চাইছিস বলে ফেল।

এই কথাটার অপেক্ষা করছিলো সে এতক্ষন। বস তবে তাকে এতক্ষণ খেয়াল করছিলো। সে কিছুটা লাজুক ভাব নিয়ে বলে,

” স্যার একটা কথা বলার ছিলো।

নিক কপাল কুচকায়। ধমকে বলে,

” কথা বলবি ভালো কথা। নতুন বউ বাসর রাতে যেমন লজ্জা পায় তুই এমন লজ্জা পাচ্ছিস কেনো?

রাবিশ ভালোভাবে বল!

নিকের ধমকে অধিরাজ শান্ত হয়ে দাঁড়ায়। তবুও ঘাড়-মুখে হাত বুলিয়ে চট করে বলে,

” বস আমি বিয়ে করব।

নিক আর আরিশ তাকানোর মধ্যই ছিলো। অধিরাজ কথাটা বলা নিজেও ফেঁশে যায়। নিকের তীক্ষ্ণ চাহনিতে হতভম্ভ হয়ে যায়। ভেবেছিলো নিক হয়ত রাগ দেখাবে। কিন্তু তার ধারনা ভুল প্রমান করে দিয়ে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞাসা করে,

” আজ করবি?

অধিরাজের চোখ দুইটা খুশিতে চিকচিক করে উঠে। আনন্দে কথা আটকে আসছে গলায়। নিজেকে সামাল দিয়ে বলে,

” আপনি যদি রাজি হন তবে কাল এই করব বস। চার্চে গিয়ে শুধু হাতে হাত রেখে বিয়েটা করে আসব। কোনো আয়োজন করব না।

নিক টেবিলে হাত রেখে চোয়াল শক্ত করে বলে,

” কেনো করবি না আয়োজন? অবশ্যই আয়োজন হবে। পুরো আফ্রিকা জানবে এই বিয়ের খবর। আজ রাতেই সব আয়োজন শুরু করা হবে।

অধিরাজ মলিন গলায় বলে,

” কিন্তু বস আজ শেষ রাতে তো ইতালির সাথে মিটিং আছে। অনেক মাল সাপ্লাই দিতে হবে।

নিক বসা থেকে উঠে,

” সেটা আমি দেখে নিব। প্রয়োজন মাফিয়া প্যালেসের সবাইকে কাজে লাগাবে। পুরো শহর সাজানো চাই। বিয়ে যখন হচ্ছে তখন তর সৃষ্টিকর্তার সামনে কেনো শুধু? সবাই দেখুক এইটা।

আরিশ নিকের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে ম্লান হাসে। এই হাসিটা মোটেও উপহাসের জন্য ছিলো না। এইটা ছিলো এক অদ্ভুত প্রাপ্তির। সমাজের চোখে যে মানুষটা কেবলই ধ্বংসের প্রতিচ্ছবি

যার নামের পাশে শুধুই রক্ত আর বারুদের গন্ধ লেগে থাকে। তার ভেতরেও যে বরফ গলার মতো একটা নরম কোণ থাকতে পারে তা হয়তো পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষেরই অজানা।

​নিকের গম্ভীর মুখাবয়ব আর পাথুরে চোখের গভীরে আরিশ আজ অন্য কিছু দেখতে পায়। কে বললো গ্যাংস্টার বসের হৃদয়ে মমতা নেই? তারা হয়তো এই নিককে কখনো দেখেনি। তারা চিনেছে শুধু সেই নিষ্ঠুর শাসককে যে নির্দ্বিধায় ট্রিগার টিপতে পারে। তাই নির্লিপ্তভাবে তাকে একজন হৃদয়হী ‘মনস্টার’-এর উপাধি দিয়েছে। ​কিন্তু আরিশ জানে এই মনস্টারেরও একটা জগত আছে। যেখানে সে নিয়ম ভাঙতে পারে যেখানে তার তলোয়ারের চেয়েও তীক্ষ্ণ নজর কোনো এক মায়ার টানে নুয়ে পড়ে। লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এই মানুষটা হয়তো পৃথিবীর কাছে আতঙ্ক। কিন্তু আরিশের কাছে সে এক গভীর রহস্য যা কেবল ভালোবাসার ভাষাতেই পড়া সম্ভব। যারা ভালোবাসবে তারাই গ্যাংস্টার বসকে চিনবে।

কফিশপের এক কোণে নিভৃতে বসে আছে তানভী। তার দৃষ্টি অবাধ্য পাখির মতো বারবার কাঁচের দেয়াল ভেদ করে বাইরের ব্যস্ত জনপথের ওপর আছড়ে পড়ছে। অপেক্ষার প্রতিটি পল এখন তার কাছে সহস্রাব্দের মতো দীর্ঘ ঠেকছে। অধিরাজের আগমনে এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব তানভীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাচ্ছে চরমভাবে। তাকে ফোন করে বলেছে এখানে যাতে এসে বসে থাকে। সে এসে গিয়েছে অথচ তার আসার খবর নেই। তানভীর রাগ হয় প্রচুর। অস্তগামী সূর্যের ম্লান আলোকচ্ছটা কফিশপের কাঁচের বাতায়নে প্রতিফলিত হয়ে তানভীর বিষণ্ণ মুখে এক অদ্ভুত আভা ছড়িয়ে দিচ্ছে। টেবিলের ওপর রাখা কফি কাপটি অনেক আগেই তার উষ্ণতা হারিয়ে। তানভীর দীর্ঘ প্রতীক্ষার উত্তেজনা এখন কেবলই শীতল বিরক্তিতে পর্যবসিত হয়েছে।তানভীর নেত্রযুগল বারবার বাহিরের কোলাহলের মাঝে অধিরাজের খোঁজ করছে। জনস্রোতের প্রতিটি অবয়বকে সে একবার পরখ করে নিচ্ছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সেই পরিচিত মুখচ্ছবিটি অনুপস্থিত। অপেক্ষার প্রহর যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করে তখন মানুষের মন এক প্রকার অবশতায় আক্রান্ত হয়। তানভীর ক্ষেত্রেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। ক্লান্তির এক অদৃশ্য ভার তার স্কন্ধে চেপে বসেছে। মনের কোণে জমে থাকা অনুরাগ এখন অভিমানের মেঘে ঢাকা পড়ছে।অবশেষে ধৈর্যের চরম শিখরে পৌঁছে সে টেবিল থেকে অতিশয় বিরক্তির সাথে আপন মুঠোফোনটি তুলে নেয়। অধিরাজকে ফোন দিতে যাবে তার আগেই কেউ পিছন থেকে এসে জড়িয়ে ধরে। কানে ফিসফিস আওয়াজ করে বলে,

” জান আমার।

ব্যাস তানভীর সমস্ত রাগ কর্পূরের মত হাওয়া হয়ে যায়। সে এই ব্যক্তিটাকে এতটা ভালোবাসে যে সামান্য নরম কন্ঠে খুশিতে আত্নহারা হয়ে যায়। হাজার জনম সে অপেক্ষা করতে পারবে যদি এমন মধুর ডাক শুনা যায়। তানভি অভিমানী গলায় বলে,

” আসার সময় হলো এতক্ষণে?

অধিরাজের চোখে -মুখে খুশির উন্মাদনা। তানভীর গালে অনেকগুলো চুমু একত্রে দিয়ে বলে,

” সরি সোনা। আর অপেক্ষা করতে হবে না তোমাকে।

তানভী কপাল কুচকে বলে,

” মানে?

অধিরাজ আসন গ্রহণ করেই এক অতর্কিত ক্ষিপ্রতায় তানভীর কোমর দৃঢ়ভাবে চেপে ধরে । তার এই বলিষ্ঠ স্পর্শে তানভীর শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে যায়। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এক প্রবল ও অনমনীয় আকর্ষণে অধিরাজ তাকে নিজের উরুর ওপর টেনে বসিয়ে দেয়।

​তানভী হতভম্ভ হয়ে যায়। ​এমন আকস্মিক শারীরিক নৈকট্যে তানভীর সর্বাঙ্গে এক বিদ্যুৎগতির শিহরণ খেলে যায়। তার দেহলতা থরথর করে কেঁপে উঠে । বিস্ময় নিয়ে তাকায় অধিরাজের দিকে। কাঁপা গলায় বলে,

” কি করছো? এইভাবে চেপে ধরেছো কেনো?

অধিরাজ ঘাড়ে নাক ঘষে বলে,

” ভালোবাসতে ইচ্ছে করছে খুব তোমাকে। দুই হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে একদম পিষে ফেলতে ইচ্ছে করছে। এত আদুরে কেনো তুমি জান!

তানভীর গাল রক্তিম হয়ে উঠে। চোখ রাঙ্গিয়ে তাকায় অধিরাজের দিকে। তানভীর সেই ক্রুদ্ধ চাউনিকে উপেক্ষা করেই অধিরাজ এক সম্মোহনী ধৃষ্টতা প্রদর্শন করে দেয়। বাক্য বিনিময়ের প্রথা ভেঙে সে অতি নিবিড়ভাবে তানভীর ওষ্ঠাধরে আপন ঠোঁটের ছোঁয়া দেয়। । সেই উষ্ণ এবং সিক্ত চুম্বন মুহূর্তের মধ্যে তানভীর সমস্ত প্রতিবাদী শব্দকে অবদমিত করে দিল মুহূর্তের মধ্যেই।

অধিরাজ ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়ে দুষ্টু হাসে। তানভী বুকে ঘুষি মেরে বলে,

” দিন দিন নির্লজ্জ হয়ে উঠছো অনেক। আরও কিছু করার আগে ছাড়ো আমাকে। তোমাকে নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই।

অধিরাজ আহ্লাদী গলায় বলে,

” একমাত্র বউ তুমি আমার। তুমি ছাড়া আর কে আছে এই নির্লজ্জতার ভার বহন করার।

তানভী মুখ ঘুরিয়ে অশান্ত গলায় বলে,

” বউ হয় নি এখনও তোমার। যেদিন বৈধভাবে তোমার ঘরে যাব সেদিন আমাকে বউ বলবে তার আগে নয়।

অধিরাজ থুতনি ঠেকায় তানভীর ঘাড়ের মধ্যে। তার দুই হাত দিয়ে তানভীর দুই হাত সুন্দরভাবে আকড়ে ধরে। মায়াভরা কন্ঠে বলে,

” বউ হবে আমার? আমার রানী।

তানভীর ঠোঁট কাঁপছে। যে কোনো সময় কান্না করে দিবে সে। এইভাবে কেউ বললে নিজেকে আটকানো যায় নাকি? ভাঙ্গা গলায় বলে,

” সেই কবে থেকেই তোমার অপেক্ষায় আছি। জনম -জনম এই অপেক্ষা করব। যতদিন তোমার বউ হতে না পারব ততদিন অপেক্ষা করব।

” আর যেদিন হয়ে যাবে?

তানভী হেসে বলে,

” তোমাকে অপেক্ষা করাব।

অধিরাজ মুচকি হেসে প্রেয়সীর গালে আবার ও চুমু খায়। কপাল কুচকে বলে,

” আমাকে বিয়ে করতে তোমার ভয় করবে না?

তানভী অবাক হয়ে বলে,

” ভয় করবে কেনো?

অধিরাজ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

” সামলানোর তো একটা ব্যাপার আছে বেইবি। পারবে তো এই অধৈর্য পুরুষটাকে সামলাতে?

অধিরাজের ইঙ্গিত তানভীর বুঝতে বাকি নেই। কনুই দিয়ে পেটের মধ্যে খুঁচা দিয়ে ধমকে উঠে,

” তোমার ঠোঁট সেলাই করব আমি।

” তবে চুমু খাব কিভাবে একটু পর পর?

” খেতে হবে না তোমাকে চুমু।

” তোমাকে চুমু খেতে না পারলে আমার বেঁচে থাকা বৃথা। আমি বেঁচে আছি শুধুমাত্র চুমু খাব বলে। এখন সার্টিফিকেট নেই বলে কত কিছু করা থেকে নিজেকে বঞ্চিত করে রেখেছি। সব গুলোর শোধ তুলতে হবে একসাথে। চুমু খেতে হবে না এইটা কিভাবে বলতে পারলে?

তানভী মুখ ঘুরিয়ে দেখলো পাগল লোকটাকে। এই যে তাকে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়ে মারছে সেটা কি এই লোক জানে? সপ্তাহ চলে যায় সামান্য খোঁজ নেয় না। এইদিকে সে প্রেমের দহনে – পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে মরে যাচ্ছে। একদিন দেখা করতে আসলে পারে না সব ভালোবাসা একদম ঢেলে দিতে। এমন পাগলকে সারাজীবন সামলাতে হবে ভাবতেই তানভীর হাসি পেলো। সে তো জেনে -বুঝেই এমন উন্মাদকে ভালোবেসেছে। রক্তের মধ্যে বেড়ে উঠা একজন পুরুষের জন্য নিজের সব অনুভুতি দিয়ে রেখেছে।ভালোবাসতে পারছে আর একটু অপেক্ষা করতে পারছে না? একটু অপেক্ষা করলে ক্ষতি কি? সে যে অপেক্ষা করতে করতে প্রেমানলে দগ্ধ হচ্ছে এই খবর কি এই লোক কখনো রেখেছে?

তানভী লজ্জায় হাঁশ-ফাঁশ করে বলে,

” কিসব বলছো রাজ। লজ্জা লাগছে কিন্তু আমার।

অধিরাজ প্রেয়সীর লজ্জামাখা মুখটা দেখতে চাইলো। কিন্তু তানভী জেদ ধরে তাকালো না সেদিকে।।অধিরাজ নিশ্বাস ছেড়ে বলে,

” সব লজ্জা ভেঙ্গে ফেলো বেইবি। কারন এত লজ্জা পেলে আমি সামনে আগানোর সাহস পাব না। এই মুখ দেখেই পুরো রাত কেটে যাবে।

তানভী আরও সিটিয়ে যায়। অধিরাজ শব্দ করে হাসলো। তানভীর দুই হাত আবার ও আকড়ে ধরে বলে,

” তানভী কাল আমাদের বিয়ে। আমি আর তুমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হব।

তানভীর শরীর যেন শূন্য ভাসছে।।থরথর করে কেঁপে উঠে রমণীর শরীর। খুশির পরিমান এত ছিলো যে গলায় কথা আটকে আসছে। ভাঙ্গা গলায় বলে,

” আ… আমাদের বিয়ে রাজ?

অধিরাজ ললাটে চুম্বন এঁকে দিয়ে বলে,

” হুম জান। আজ রাতে আমাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কাল রাতে হবে আমার আর তোমার বিয়ে। আর সব কিছুর দায়িত্ব নিয়েছে বস আর আরিশ স্যার।

তানভী চোখের পানি আটকে রাখতে পারলো না। শব্দ করে কেঁদে উঠে মেয়েটা। এত খুশি সে হজম করতে পারছে না। পিছনে ফিরে শক্ত করে অধিরাজের গলায় জড়িয়ে ধরে। অধিরাজ তানভীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,

” খুশি হয়েছো তুমি?

তানভী কান্নার বেগে হেচকি তুলে ফেলেছে। অধিরাজের বুকে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে,

” আমার জীবনের সব থেকে খুশির সংবাদ এইটা। এইবার ভাবো কতটুকু খুশি আমি। এই খুশির পরিমান আমি করতে পারব না। আই লাভ ইউ রাজ।

অধিরাজ তানভীর মাথাটা তুলে। কান্নার কারনে চোখে -মুখের একদম বেহাল দশা। অধিরাজের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। চোখ রাঙ্গিয়ে বলে,

” কাঁদছো কেনো এইভাবে? বিয়াদব!

তানভী ঠোঁট ফুলিয়ে বলে,

” নিজেকে আটকাতে পারি নি। ধমকাবে না আমাকে একদম। আগে কেনো বলো নি এই কথা?

অধিরাজ শান্ত হয়ে আবার ও তানভীর মাথাটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে বলে,

” আমি নিজেই জেনেছি কিছুক্ষণ আগে। বস বলেছে কালকে তাই আর না করতে পারি নি। অনেক তো হলো আর কত অপেক্ষা করবে? যদি তোমার ধৈর্যের বাঁধ কোনোদিন ভেঙ্গে যায়।

তানভী হেসে বলে,

” এই জনমে কোনোদিন ভাঙবে না। আজীবন অপেক্ষা করতে পারব তোমার জন্য। ভালোবেসে যদি মহাকাব্য রচনা করা যায়, ধ্বংসের শেষ প্রান্তে যাওয়া যায়, মৃত্যুকে গ্রহন করে নেওয়া যায় তবে সামান্য অপেক্ষা করাটা কি বেশি কষ্টকর? তোমার জন্য তো আমি আমিটাকে দিয়ে দিয়েছি।

অধিরাজ আগলে নেয় নিজের ভালোবাসাকে। এই মেয়েটা এমন এমন কথা বলে যে সে নিজেই ঠিক থাকতে পারে না। ও ভেবে পায় না তার মত এমন একজন খুনী -খারাপ লোকের জন্য এই মেয়েটা এত পাগল কেনো? তাদেরকে তো কেউ ভালোবাসে না। তবে সে কেনো এত কাছে টেনে নিলো। তানভী বুকে মাথা রেখেই বলে,

” ভালোবাসা জিনিসটা মারাত্নক অধিরাজ। যাকে ভালোবাসে তার জন্য মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করা যায়। আর যে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহন করতে পারবে না সে তো সত্যিকার অর্থে ভালো এই বাসে না। মেয়েরা সব সহ্য করতে পারে।।কিন্তু তার ব্যক্তিগত পুরুষের পাশে অন্য নারীকে সহ্য করতে পারে না। আমাদের মেহের ও পারি নি অধিরাজ। সেদিন মেহের এমনি-এমনি বাহিরে বের হয় নি। তার টার্গেট ছিলো আত্নহত্যা!

অধিরাজ থমকে যায়। অবাক গলায় বলে,

” আত্নহত্যা মানে?

তানভীর গলা কেঁপে উঠে,

” আজ সকালে আমি মেহেরের রুমে গিয়েছিলাম।।টেবিলের উপরে কয়েকটা চিঠি পায়। চিঠিতে লেখা ছিলো সে মৃত্যুকে গ্রহন করতে যাচ্ছে।।যাতে তাকে শুধু মনে রাখে। কিন্তু তাকে মনে রাখলো না সেই পুরুষটা । যার জন্য এমন পথ বেছে নিতে গিয়েছিলো সে দিব্বি সংসার করছে। অথচ যে নিজের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসলো সে মাটির নিচে একা-অসহায়! শুধুমাত্র একটা চিঠি পড়ার ধৈর্য হয়েছে আমার।।চিঠিটা ছিলো তোমার বসকে নিয়ে। বোকা মেহের হয়ত কোনোদিন জানতে এই পারবে না তার প্রেমিক পুরুষ তাকে মনে রাখে নি।স্বার্থপর!

অধিরাজ নিশ্বাস টেনে বলে,

” তুমি বসকে নিয়ে কিছু বলবে না।

তানভীর রাগ হলো প্রচুর। তবুও নিজেকে সামকে অধিরাজের বুক থেকে উঠে পড়ে। এই মুহূর্তে এই বুকে থাকতে বিরক্ত লাগবে তার। নিজের চুল ঠিক করে বলে,

” তোমার বসকে বাজে কথা বলি নি। শুধুমাত্র হেরে যাওয়া এক পাক্ষিক ভালোবাসার করুন পরিনতি বলছি। এতে যদি তোমার রাগ হয় তবে আমাকে মারতে পারো।

তানভী রাগের চোটে কি বলছে নিজেও জানে না। অধিরাজ ঠোঁট ভেজালো নিজের। তানভীর হাত ধরতে গেলে তানভী ছিটকে দুরে সরিয়ে দেয়। অধিরাজের কপাল কুচকে আসে।।জোর করে তানভীর হাত চেপে ধরে বলে,

” একদম রাগ দেখাবে না আমাকে।

” সেই ক্ষমতা আমার আছে নাকি? তুমি আর তোমার বস তো একদম তুলসি পাতা।

অধিরাজ নিম্ন আওয়াজে বলে,

” আমার বস আমার একমাত্র অভিবাভক তানভী। অধিরাজ বেঁচে আছে নিক জেভরানের দয়ায়। নয়ত আমার লাশ এতদিনে মাটির সাথে মিশে যেত। তুমি জানো একবার অনেক বড় আক্রমণ হয় আমাদের উপর। আমি, আরিশ স্যার আর বস ছিলাম যাস্ট। একজন দেহরক্ষী ছিলো না সাথে। তার উপর আরিশ স্যারের বুকে অপারেশন করানো হয়েছিলো কিছুদিন আগে। কারন তাকে একজন ঘাতক ছুঁড়িঘাত করেছিলো। কাচা ক্ষত দিয়ে রক্ত পড়ছিলো তার পর ও যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন উনি। আর এইদিকে একাই সব সামলাচ্ছিলেন গ্যাংস্টার বস। হুট করেই কেউ আমার পিঠে ছুড়ি বসাতে চেয়েছিলো। কিন্তু সেই ছুঁড়িঘাতের সামনে এসে পড়েন বস। আমাকে বাঁচাতে উনি নিজের কথা ভাবে নি। ওইদিন উনার অবস্থা এতটা সূচনীয় ছিলো যে বাঁচানো মুশকিল হয়ে গিয়েছিলো। ডাক্তার বলেছিলো উনাকে বাঁচানো সম্ভব নয়। খোলা আকাশের নিচে চিৎকার করে কেঁদেছিলাম সেদিন। আমার আকড়ে ধরার একমাত্র হাত, আমার অভিবাভক, আমার বসকে যাতে ফিরিয়ে দেয়। কি করে নি আমি বলো? আমি তো খ্রিষ্টান।

নিজের ইশ্বরের কাছে প্রান ভিক্ষে চেয়েছি। বসকে যাতে ঠিক করে দেয় সেজন্য মসজিদে পর্যন্ত গিয়েছি। মন্দিরে ও বাদ রাখে নি। দিশেহারা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। আরিশ স্যারের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিলো না। সব কিছু অতিক্রম করে বস সেদিন বেঁচে ফিরেছিলেন। আমার জন্য উনি একবার নয় বহুবার আঘাত প্রাপ্ত হয়েছেন। রাস্তা থেকে তুলে এনে আমাকে রাজ প্রাসাদে স্থান দিয়েছেন। আমি তো রাস্তার মানুষ ছিলাম। রাস্তার ছেলেদের সবাই ধিক্কার জানায়। বাবা-মা কে কিছু জানা নেই। সেই সামান্য রাস্তার ছেলেকে নিজের গৃহে এনে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। মাফিয়া সম্রাজ্যের একটা অংশ করে নিজের সব থেকে বিশ্বস্ত লোক হিসেবে বেছে নিয়েছে। এক মুঠো ভাত খাওয়ার জন্য পায় নি। ক্ষুধার জন্য কতজনের কাছে হাত পেতেছি। উপায় না পেয়ে কত রকম কষ্টের কাজ করেছি। কিন্তু সেই আমি আজ কোটি টাকার মালিক। আমাকে বছরের পর বছর আগলে রেখেছেন এই পাপিষ্ঠ পুরুষ। সবার কাছে উনি জানোয়ার, টেরোরিস্ট, মনস্টার, একজ ঠান্ডা মাথার সাইকোপ্যাথ। কিন্তু আমার জন্য উনি আমার ছায়া। তাই দুনিয়ার যে কাউকে নিয়ে তুমি খারাপ কথা বলো তানভী। তোমার কাছে অনুরোধ করছি আমার বসকে নিয়ে কিছু বলো না। সহ্য করতে পারব না। অতীতের ভয়ংকর পরিনতি ছাড়া কেউ খারাপ হয় না।

তানভী মাথা নিচু করে শুনলো সব কথা।।চোখে পানি টলমল করছে তার। অধিরাজের গালে হাত রেখে বলে,

” সরি, আর কোনোদিন বলব না।

খাবার সামনে নিয়ে এনি চুপচাপ বসে আছে। পাশেই নাজলী তাকে খাওয়ানোর জন্য বসে আছে। কিন্তু এনির একদমই খেতে ইচ্ছে করছে না। সে বারবার বলছে যে তার মাথা ঘুরাচ্ছে এবং এই খাবারগুলো তার কাছে অসহ্য লাগছে। নাজলী কোনো কথা না শুনে জোর করে তাকে খাবার দিচ্ছে। উপায় না দেখে এনি খুব অসহায়ভাবে নাজলীর দিকে তাকিয়ে আছে।

নাজলী চোখ দিয়ে ইশারা করে,

” দশ মিনিটের মধ্যে শেষ কর।

এনি নাজলীর দিকে তাকিয়ে বলে,

” তুমি উনার মত ব্যবহার করছো কেনো?

নাজলী এনির দিকে তাকিয়ে ভ্রুঁ কুচকায়,

” তর উনার মত ব্যবহার করতে হবে না আমাকে। এইসব খারাপ লোকের ব্যবহার ধারন করতে চাই না। কিন্তু তার আগে তুই আগে খাবার ফিনিশড কর।

” খেতে পারছি না আপা। সত্যি বলছি আমি। বিশ্বাস করো আমার কথা।

” কিন্তু সারাদিন ধরে তো কিছু খাস নি।

এনি মুখ ঘোমরা করে বলে,

” জানি না কেনো খেতে পারছি না। খাবার দেখলেই গা গুলাচ্ছে। কেমন অসহ্য লাগছে সব কিছু।

নাজলী তীক্ষ্ণ গলায় বলে,

” মাথা ঘুরাচ্ছে?

” হ্যা।

” কবে থেকে এমন হচ্ছে?

এনি ঠোঁট ভেজায় নিজের। মৌন হেসে বলে,

” কবে থেকে হচ্ছে সেটা ঠিকমত বলতে পারব না তোমাকে। কারন এমন গা গুলানো – মাথা ব্যাথা বহুবার হয়। কষ্ট আর যন্ত্রনা আমার শরীরে সয়ে গিয়েছে। চিন্তা করো না এইসব নিয়ে।

নাজলীর কান্না পাচ্ছে এনির মুখের দিকে তাকিয়ে। কতটা বিষন্ন করে দিয়েছে তার বোনটাকে।।তার সব রাগ গিয়ে পড়লো নিকের উপর। দাঁত কটমট করে শক্ত করে বলে,

” নিক নামক খবিশ লোকের জন্য তকে কত কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে।।ক্ষমতা থাকলে একে আমি গর্তে ডুকিয়ে রাখতাম

এনি বোনের রাগ দেখে হালকা হাসে। বিরবির করে বলে,

” উনার অর্ধেক জীবন গর্তের মধ্যে এই কেটেছে। নতুন করে আর কি গর্তে ডুকাবে?

মুখ ফুটে বলে,

” তুমি উনাকে সহ্য করতে পারো না।।তাই না আপা?

নাজলী এনির দিকে তাকায়। বিরক্ত নিয়ে বলে,

” এই লোককে দেখলে শরীরে জ্বালা ধরে আমার। যে আমার বোনকে এত অত্যাচার কষ্ট দিয়েছে তাকে সহ্য করব কিভাবে? বিয়াদব একটা!

এনি হেসে বলে,

” ইতিহাসের সব থেকে সুন্দর সতীনের জুটি হচ্ছে তুমি আর উনি। একজন আরেকজনকে কিছুতেই ছাড় দাও না। আর সামনা -সামনি হলে তো যেন ঘূর্ণিঝড় শুরু হয়ে যায়।

নাজলী চোখ ছোট ছোট করে তাকায়। রাগ দেখিয়ে বলে,

” মজা নিচ্ছিস আমার সাথে? দেখিস নি কিভাবে নির্লজ্জের মত কথা বলে? নিজের প্রাইভেট মুহূর্তের কথা কেউ বলে? অসভ্য একটা!

এনি নিজেও থমথমে খায়। মেহের যেদিন মারা গিয়েছিলো তখন দুই ঘূর্নিঝড় মুখোমুখী হয়েছিলো। সেদিন নিকের বলা কথাগুলো এখনও তার মনে আছে। আসলেই প্রচন্ড ঠোঁট কাটা লোক! এনি কি উত্তর দিবে খুঁজে পাচ্ছে না। আমতা আমতা করে বলে,

” তোমার আর আরিশ ভাইয়ের কি খবর বলোতো? তোমাদের মধ্যে কিছু-মিছু হয়েছে?

নাজলী কপাল কুচকে বলে,

” কিছু-মিছু মানে?

এনি গলা কেঁশে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,

” রোমান্টিক কিছু আপা। আই মিন ক্রিকেট ম্যাচ আরকি।

নাজলী এনির দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে। কথাটা বুঝার চেষ্টা করে।।যখন বুঝতে পারে তখন সাথে সাথে চেঁচিয়ে উঠে,

” নির্লজ্জের সাথে থেকে নিজেও নির্লজ্জ হয়ে গিয়েছিস এনি। কিসব প্রশ্ন করছি আমাকে?

এনি ভোঁতা মুখে বলে,

” এত নিরামিষ কেনো তুমি। একটু শেয়ার করলে কি হয়? আমরা আমরাইতো আপা। বলো না প্লিজ!

নাজলী আবার ও শান্ত হয়ে বসে যায়। ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,

” হয় নি কিছু।

পর মুহূর্তে রাগ ফুটিয়ে বলে,

” আর এমন হবেও না কিছু। এইটা হচ্ছে আরেক নির্লজ্জ প্রজাতি। অবশ্য একই দিলের তাই মিল থাকবে স্বাভাবিক।

এনির পেট ফেটে হাসি পাচ্ছে।।এখনও একটুও বদলায় নি। সেই রাগ আর উন্মাদনা একটু কমে নি। এই মেয়ে সংসার করবে কিভাবে এত উগ্রতা নিয়ে? এনি হালকা হেসে বলে,

” তুমি আরিশ ভাইয়াকে অনেক ভালোবাসো তাই না আপা?

নাজলী নাক -ছিটকে বলে,

” এমন ক্যাবলাকে ভালোবাসতে যাব কোন কষ্টে?

এনি চোখ দিয়ে ইশারা করে বলে,

” আসলেই ক্যাবলা? কিন্ত গলা আর ঠোঁটের দাগ তো অন্য কিছু বলছে। সে যায় হোক বদ্ধ রুমে অনেক কিছুই হবে। কিন্ত তুমি ক্যাবলা বলতে পারলে? আরিশ ভাইয়া কত সুন্দর, হ্যান্ডসাম, স্মার্ট! যেমন ছেলেকে তুমি সব সময় চাইতে ঠিক তেমন। অনেক তো আড়ালে ভালোবাসলে এইবার সময় থাকতে ভাব জমিয়ে নাও। ভালোবাসার খেলায় পিছিয়ে গেলে বাজেভাবে হেরে যাবে।

নাজলী চোখ রাঙ্গিয়ে বলে,

‘ তকে কে বললো আমি ভালোবাসি?

” তোমার চোখের লাজুকতা আপা। তোমার চোখের উন্মাদনা। মানুষ তখন এই তার দেওয়া চিহ্ন আর নাম শুনে লজ্জা পায় যখন সে তাকে ভালোবাসে। ভালো না বাসলে তো ঘৃনা আর রাগ আসে। লজ্জা আর উন্মাদনা নয়।

নাজলীর বিষন্ন মনে হাসে। এনির দিকে শান্ত তাকিয়ে বলে,

” সব ভালোবাসা পূর্ণতা পায় না বোন। কিছু ভালোবাসা দুর থেকে সুন্দর।

” পূর্ণতার জিনিস পূর্ণতা কেনো পাবে না আপা? বরং অপূর্ণতা রাখা অন্যায়।

নাজলীর ভেতরে ছটফট আরম্ভ হয়। এই জিনিসটা সে নিতে পারে না। ভালোবাসা সে প্রকাশ করতে চাই না। এমন হৃদয়হীন লোককে কাছে টেনে কি লাভ? দিন শেষে এইভাবে ছন্নছাড়া জীবন পার করতে হবে।

” এরা মরিচীকা। এদেরকে স্পর্শ করতে নেই।

এনি কিছু বলতে যাবে তার আগে নাজলী থামিয়ে দেয়। বসা থেকে উঠে আদেশ দিয়ে বলে,

” কষ্ট হলেও খাবারটা জোর করে খেয়ে নে। এইভাবে খালি পেটে থাকলে আরও অসুস্থ হয়ে পড়বি। হয়ত দুর্বলতা থেকে এমন বোধ করছিস।

কথাটা বলে নাজলী আর এক মুহূর্তে দাড়ালো না। বিয়ের ঘটনাটা একদম এড়িয়ে যায়। ঠান্ডা বাতাসে নিশ্বাস নেওয়া প্রয়োজন তার। এই মুহূর্তে দম বন্ধ হয়ে আসছে। সে কোনোদিন ও আগ বাড়িয়ে ভালোবাসা স্বীকার করবে না। যদি কোনোদিন ওই লোক তাকে ভালোবাসি বলে আগলে নেয় তবেই সে নিজের ভালোবাসা উৎস্বর্গ করবে, তার আগে নয়।

নিশুতি এক গভীর রাত। প্রগাঢ় রজনীর নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে চরাচর নিমজ্জিত। চতুর্দিকে এক অশুভ ও স্থবির নীরবতা বিরাজমান। প্রকৃতির এই শব্দহীনতা যেন কোনো আসন্ন বিপদের সংকেত বহন করছে। যার পরশে শরীরের লোমকূপ শিহরিত হয়ে ওঠে। এই জনমানবহীন নিস্তব্ধতায় প্রতিটি ক্ষণ এক অজানা আতঙ্কে পরিপূর্ণ। নৈশব্দ্যের এই সুগভীর চাদর ভেদ করে কেবল নিজের হৃদস্পন্দনের শব্দই কর্ণে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যেন কোনো এক অদৃশ্য ছায়া নিঃশব্দে ওত পেতেছে। এক অসহ্য ও গা ছমছমে পরিবেশের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে সমগ্র প্রকৃতি এক রহস্যময় বিভীষিকায় পর্যবসিত হয়েছে। নির্জন রাতে ঠান্ডা বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। সেই মনোমুগ্ধকর পরিবেশে চলছে কালো ব্যবসা চক্র। চারপাশে তখন নিঝুম রাত এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় চারদিক থমথম করছে। ঠিক সেই নির্জনতার মাঝখানে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে একটি কালো রঙের প্রাইভেট জেট। রাতের আবছা আলোয় বিমানের ধাতব শরীর থেকে এক ধরনের ঠান্ডা আভা ঠিকরে বের হচ্ছে। নিস্পন্দ ও নিঃশব্দ এই যানটি অন্ধকারের বুকে কোনো এক রহস্যময় যাত্রার অপেক্ষা করছে। চারদিকের গা ছমছমে পরিবেশের।

সেই নিস্তব্ধ রানওয়ের বুক চিরে একটি কালো লিমুজিন এসে থামল প্রাইভেট জেটের ঠিক সামনে। গাড়ির দরজা খোলার শব্দটিও এই শুনশান রাতে বজ্রপাতের মতো শোনাচ্ছে। ভারী বুটের মচমচে শব্দ তুলে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন সেই ব্যক্তি, যার নামের দাপটে আন্ডারওয়ার্ল্ডের বাঘা বাঘা মানুষও থরথর করে কাঁপে। পরনে তার দামী কালো ওভারকোট আর চোখে হিমশীতল শূন্যতা।

​তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক অঘোষিত আধিপত্য। তিনি যখন জেটের সিঁড়ির কাছে এসে দাঁড়ালেন তখন কাজ করতে থাকা লোকগুলোর হাতের গতি মুহূর্তেই শ্লথ হয়ে যায় চারদিকের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠে। নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে সবার। মাফিয়া বস তার হাতের দামি চুরুটটিতে একটি শেষ টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়লেন। সেই ধোঁয়া রাতের কুয়াশার সাথে মিশে যায়।

​নিক প্রখর দৃষ্টিতে কার্গো হোল্ডের দিকে তাকায় তারপর অত্যন্ত নিচু অথচ গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে,

​”কাজ কতদুর?

একজন এগিয়ে এসে বলে,

” আর কিছুক্ষণ সময় লাগবে বস।।হয়ে এসেছে অনেকটা।

নিক সম্মতি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তার দৃষ্টি তখন রানওয়ের শেষ সীমানার অন্ধকারের দিকে।

বিমানের কার্গো হোল্ডের খোলা দরজা দিয়ে নিঃশব্দে ভেতরে তোলা হচ্ছে মাফিয়া সাম্রাজ্যের সব অবৈধ সম্পদ। শক্তিশালী কাঠের বাক্সে সযত্নে সাজানো রয়েছে অত্যাধুনিক সব মারণাস্ত্র। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় থাকা স্নাইপার রাইফেল আর সাইলেন্সার লাগানো হ্যান্ডগান। একটি বিশেষ লকার বক্সে স্তরে স্তরে রাখা হয়েছে ভ্যাকুয়াম প্যাক করা কয়েক বিলিয়ন ইউরো এবং জাল বন্ড। ​গোপন একটি ধাতব ব্রিফকেসের ভেতরে লুকানো রয়েছে প্রচুর রক্ত-মাখা হীরা, যা আজ রাতেই ইতালির আন্ডারওয়ার্ল্ডে হাতবদল হওয়ার কথা। এছাড়া ভারী কার্গোর আড়ালে রয়েছে উচ্চমূল্যের নিষিদ্ধ সিন্থেটিক ড্রাগ আর কিছু গোপন হার্ডড্রাইভ। যাতে লুকানো আছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক নোংরা নথিপত্র। প্রতিটি বাক্স তোলার সময় মাফিয়াদের সশস্ত্র প্রহরীদের সতর্ক দৃষ্টি এদিক-ওদিক ঘুরে যাচ্ছে। নিস্তব্ধ এই রজনীর নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে কেবল ভারী বুটের শব্দ আর যান্ত্রিক ঘড়ঘড়ানি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এই বিমানটি ডানা মেললেই শুরু হবে এক নতুন ধ্বংসাত্মক অধ্যায়।

কারোর পদ শব্দে নিক পিছনে ফিরে তাকায়।।আরিশ আর অধিরাজকে এইদিকে আসতে দেখে কপাল কুচকে ফেলে। চোয়াল শক্ত করে বলে,

” শালা মাদার্ফাক! এখানে এসেছিস কেনো তরা?

নিকের রাগের তোয়াক্কা করলো না আরিশ। সামনে এগিয়ে এসে নিকের কপালে হাত ছুঁয়ায়। অবাক হয়ে বলে,

” আজ তর কি হয়েছে নিক?

নিক রাগ দেখিয়ে বলে,

” মানে?

আরিশ ইনোসেন্ট মুখ করে বলে,

” বউকে দেখার টান পড়লে যে ছেলে কোটি টাকার ডিল রেখে চলে যেতে পারে সে আজ এখানে কি করছে? মেয়েটা তকে ফোন করে ডাকলো অথচ তুই গেলি না।অনুভব করতে কষ্ট হচ্ছে।।এইটা তুই তো?

নিক দাঁত পিষে বলে,

” স্টপ ইয়োর ফা*কিং ড্রামা। ইচ্ছে হয় নি তাই যায় নি। তরা এখানে কি করছিস? কাজের এদিক-সেদিক হলে তদের দুইটাকে আমি খুন করব।

আরিশ বিরবির করে বলে,

” এমনভাবে রিয়্যাক্ট করছিস যেন অধিরাজের বিয়ের সাজ হচ্ছে না। তর বিয়ের জন্য সাজানো হচ্ছে।

মুখ ফুটে নিকের দিকে তাকিয়ে বলে,

” যাচ্ছি। বাট এদিকের কি খবর?

নিক গম্ভীরতা টেনে বলে,

” হয়ে এসেছে সবটা। সাজানো বাকি হয়ত।

আরিশ আর অধিরাজ সেদিকে তাকিয়ে চলে যায়। নিক রহস্যময় হাসি দিয়ে সিগারেটটা ফেলে দেয়। নিজের ঠোঁট বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে মুছে বাঁকা হাসে,

” অপেক্ষা করলে দুরত্ব বুঝতে পারবে বেবিগার্ল। আমি চাই ছটফট করো আমার জন্য। আমাকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠো!

নিকের ভাবনার মধ্যে একজন গার্ড বলে,

” স্যার হয়ে গিয়েছে। এখন কি ছেড়ে দিব?

নিক সেদিকে তাকিয়ে গম্ভীর অথচ ঝাঁঝালো গলায় বলে,

” চেক এভরিথিং এগেইন অ্যান্ড লেট ইট গো।

কথাটা বলে নিক জেটের কাছে যায়। জেটের পিছন দিকে যেতেই এক ভয়ানক আওয়াজে সব কিছু গর্জে উঠে।

মুহূর্তের মধ্যে সেই শান্ত ও হিমশীতল নিস্তব্ধতা ধূলিসাৎ হয়ে এক নরকীয় তাণ্ডবে রূপান্তরিত হয়। জেটের সামনে যখন বোমাটি আঘাত হানে তখন আগুনের এক বিশাল লেলিহান শিখা অন্ধকারের বুক চিরে আকাশের দিকে ধাবিত হয়। আগুনের সেই রক্তাভ আভা রানওয়ের প্রতিটি ধূলিকণাকে এক বীভৎস রূপ দান করেছে। চারদিকে শুধু জ্বলন্ত ধাতব টুকরো আর ছিঁড়ে যাওয়া যান্ত্রিক অংশের আর্তনাদ।

​বাতাসে এখন বারুদের কটু গন্ধ আর পোড়া চামড়ার এক অসহ্য ঘ্রাণ মিশে আছে। জেটের সেই আভিজাত্যপূর্ণ মস্তক এখন এক কঙ্কালসার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। আগুনের শিখার নাচনে অনেকের ছায়া রানওয়ের ওপর দীর্ঘ হয়ে দুলছে। মনে হচ্ছে কোনো এক অশুভ প্রেতাত্মা বিদ্রূপ করছে এই পতন দেখে। দূর থেকে নিক্ষিপ্ত সেই আগ্নেয়গিরির দিকে তাকিয়ে কেউ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।।

​ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে রাতের আকাশে। যার আড়ালে ঘাতক হয়তো এখনো ওত পেতে আছে। কিছুক্ষণ আগের নিস্তব্ধতা এখন গা ছমছমে হয়ে উঠেছে। চারপাশের পরিবেশ হয়ে উঠেছে এক রক্তাক্ত বিভীষিকা। ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফোঁটা ফোঁটা করে পড়ছে বিমানের জ্বালানি। কিছু অংশ আগুনের সংস্পর্শে এসে ছোট ছোট বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মৃত্যুকে আরও নিশ্চিত করছে। বোমাটি এত বেশি মারাত্নক ছিলো না।।তাই হামলাটা বেশি দুর অব্দি যায় নি। সামনের সব কিছু একদম ঝাঝড়া হয়ে গিয়েছে।

চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে সেই আতঙ্ক। আরিশ আর অধিরাজ এতটা দুর অব্দি যায় নি। তাদের ফোন মেসেজ আসে,

” দ্য আন্ডারগ্রাউন্ড মনস্টার, দ্য মোস্ট হার্টলেস টেরোরিস্ট, ইজ বার্নিং ইন ফ্লেম্‌স।দ্য ফায়ার টোর অ্যাপার্ট দ্য হ্যান্ডস দ্যাট ট্রাইড টু হোল্ড অন। ইফ ইউ ওয়ান্ট। গো অ্যান্ড লুক ফর হোয়াট লিটল অ্যাশ রিমেইন্স।

মেসেজটা দেখা মাত্রই আরিশের হাত থেকে ফোনটা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয় । কিছুক্ষণ আগের বিকট শব্দ তবে এইটা ছিলো? চোখের কোণে হুট করেই পানি চিকচিক করে উঠে। এই পানিটুকু ছিলো আগুনের লেলিহান শিখার চেয়েও তপ্ত। মেসেজের ওই “পুড়ে ছাই হওয়া”র কথাটি তার কলিজায় তীরের মতো বিঁধছে। বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠেছে । এক ধরণের ছটফটানি তাকে গ্রাস করে মুহূর্তেই। আরিশ অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে উঠে,

” গাড়ি ঘুরিয়ে জেটের কাছে চল অধিরাজ।

অধিরাজ এই অধৈর্য আরিশকে কখনো দেখে নি। কি এমন দেখেছে ফোনের মধ্যে? অধিরাজ নিজেও উত্তেজিত হয়ে উঠে,

” কি হয়েছে স্যার?

আরিশ কোনো উত্তর করলো না। অধিরাজ দ্রুত গতিতে গাড়ি ছেড়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়িটে এসে থেমে যায় গন্তব্যে। আরিশের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছিলো অসম্ভব ভাবে। কিন্তু মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোচ্ছিল না। আরিশ পাগলের মতো রানওয়ের সেই জ্বলন্ত আগুনের দিকে দৌঁড়ে যায়। অধিরাজ সামনে তাকিয়ে স্তব্দ হয়ে যায়। তার মনে হতে লাগল ওই আগুনের প্রতিটি শিখা যেন তার নিজের শরীরকে পুড়িয়ে দিচ্ছে।

​আরিশ সেই আগুনের সামনে গিয়েই ধপ করে বসে পড়ে। নিক বলে হাজারটা ডাক দেয়। কত বিপদ এইতো তারা এক সাথে লড়াই করেছে। তাহলে আজ কেনো এই ধ্বংসের সাথে লড়াই করতে পারে নি। আরিশের আত্নবিশ্বাস নিকের কিছু হয় নি। কিন্তু মন কে যত শান্তনা দিক, বাস্তবতা চোখের সামনে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। আরিশ আকাশের দিকে তাকিয়ে এক বিকট চিৎকার দিয়ে বলে,

” আল্লাহ পানি দাও আমার ভাইয়ের দেহ ছাই হয়ে যাচ্ছে। আমার ছোট থেকে বড় হওয়ার সঙ্গী। আমার একমাত্র ছায়াকে আমার আগে ছিনিয়ে নিও না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে লাভ বাই দ্যা ভিলেন পর্ব ৬০ শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন