কাজী পাড়ার তিন নাম্বার গলির একেবারে শেষ বাড়িটা নাবিলাদের। ঘিয়ে রঙের পাঁচতলা বাড়ি। দু’ইউনিটের ফ্ল্যাট। তৃতীয় ফ্লোর বাদে সবই ভাড়া দেওয়া। এই তৃতীয় ফ্লোরের বর্তমান বাসিন্দা নাবিলারা। তিন ভাই-বোন, বাবা-মা আর বড় চাচাকে নিয়ে তাদের ছোট্ট পরিবার। নিজেদের মতো শান্তি, নির্ঝঞ্ঝাট, আরাম আয়েশে বাস করছে এমন বলা যাচ্ছে না, বরং তার মায়ের রাজতন্ত্রে একেকজন মাথা চেপে বসে আছে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে।
চোখের দেখায় বাড়িটা নাবিলার বাবার, তবে কাগজে কলমে সব জায়গায় মায়ের। শুধু এই বাড়ি না, এই এলাকায় তাদের আরও দু'টো বাড়ি আছে। বাজারে বড় হার্ডওয়্যারের দোকান আছে। সেই দোকানে তার বাবা বসে কম, এখানে ওখানে ঢু মারে বেশি। কাজী পাড়ার এমন কোনো চা, বিরিয়ানির দোকান নেই, যার সাথে তার খাতির নেই। তিনি খুবই মাই ডিয়ার টাইপের লোক। বিশ মিনিটের রাস্তায় অটোতে বসলেও, খাতির জমাতে তার সময় লাগে বড়জোর দু'তিন মিনিট।
তার বাবা শহরে এসেছিলেন পড়ালেখার সুবাদে। পড়ালেখা ছাড়া সবই করেছেন। কোনোরকম লেখাপড়া শেষ করে, বাড়ি ফেরার কোন তাড়া দেখা যায়নি। চাকরি তো অনেক দূরের কথা! আজ এই ব্যবসা, কাল ওই ব্যবসা। কোনো ব্যবসায়ই তার মন বসে না। সবই তার কাছে বেহুদা, সময় নষ্ট। আর এই সময় নষ্টে কত টাকা যে জলে জলাঞ্জলি হচ্ছে, সেই দিকে তার নজর ও নেই।
দাদি এই ছন্নছাড়া ছেলে নিয়ে শেষ বয়সে পড়লেন মহা যন্ত্রণায়। যন্ত্রণা একদিকে, তার মধ্যে টাকা পয়সা দিতে দিতে বড়ই ক্লান্ত সে। তাই এই ক্লান্তি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিজের ঘাড় থেকে আরেকজনের ঘাড়ে ট্রান্সফার করার ব্যবস্থা করলেন। বড়লোক শ্বশুরবাড়ি দেখে বিয়ে করিয়ে দিলেন। মেয়ে লম্বা চওড়া, কিছুটা মোটা, আর গায়ের রং বেশ কালো। তিন ছেলের পর একমাত্র মেয়ে, আর সবচেয়ে বড় কথা টাকা পয়সার অভাব নেই। ভালো পাত্র খুঁজছিলেন।
ছন্নছাড়া ছাড়া, বাবার খারাপ তেমন রেকর্ড নেই। তাই তারা খোঁজখবর নিয়েই শুভ কাজটা অতি দ্রুত সারলেন। সেরে মেয়ের জামাইকে নগদ দশ লক্ষ টাকা দিলেন। টাকা যে উড়িয়ে দেবে, সেটা তারা নিঃসন্দেহে জানতেন। তাই মেয়ের যেন অন্তত ভাত আর ছাদের কষ্ট না হয়, এই জায়গা আর দু'তলা বাড়ি তুলে দিলেন। অবশ্যই নিজেদের মেয়ের নামে।
তবে সবাইকে তাক লাগিয়ে, বাবা বিয়ের পর পুরো বদলে গেলেন। না গিয়ে উপায় কি? মেয়ে যে শুধু কালো, মোটা তা না, দুনিয়ার ঝগড়াটে, মুখরা, বদমেজাজি। একবার নাকি এক মেয়ের সাথে ঝগড়া লেগে চুলের মুঠি ধরে এমন ঘুরনা দিয়েছিল, ঐ মেয়ের যায় যায় অবস্থা।
পুলিশের কেস পর্যন্ত হয়েছিল। পুলিশ তো এই ধরে, তো সেই। টাকা পয়সা দিয়ে সব মিটমাট করা হয়েছিল। মিটমাট হোক আর যাই হোক। বদনাম মেয়েদের কপালে সিলমহরের মতো। একবার পড়লে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর মেটানো যায় না।
তাই বিয়েও দিতে পারছিলেন না। এমন মেয়ে জেনে শুনে ভালো ঘরে নেবে কে? যাও ধরে বেঁধে ঠিক করেন, মানুষে দেয় ভেঙে। তাই তার দাদি, আর নানির বাড়ির মানুষ এক সুযোগে ব্যাটে বলে ছক্কা মেরে দিয়েছেন।
আর তার বাবা, তখন পুরো দমে ভদ্র গৃহস্থ। বউ ছাড়া তিনি কিছুই বোঝেন না। উঠতে বললে উঠেন, বসতে বললে বসেন। সেই উঠা বসার মাঝেই তিনি নাট বন্টুর ছোট্ট দোকান দিয়ে বসলেন। কাজী পাড়ার মেইন বাজারে। মা ছাড়া কেউ মাথা ঘামায়নি। কোন রকম কিছুদিন করে, এটাও যে হাল ছাড়বে সবাই ভেবেছে।
তবে এইবার সেই রকম কিছুই হলো না। তিনি ব্যবসায় থিতু হলেন। মায়ের ভয়েই হোক, আর বাবার কপালের জোরই হোক। ব্যবসা বাড়তে লাগল। মা ছিলেন পুরো হিসাবি মানুষ। বাড়ি ভাড়ার টাকা তিনি একটুও নড়চড় করতেন না। তার মধ্যে বাবার ব্যবসা থেকে ভালো টাকা আসতে লাগল। ব্যস, এই দম্পতির দিন ঘুরতে সময় লাগেনি। অবশ্য এর পেছনে নানি বাড়ির অবদানই বেশি। মেয়ে যেমনই থাকুক, একমাত্র মেয়েকে সুখে রাখতে তারা কখনও পিছ পা হয়নি।
কাজী পাড়ায় তারা মোটামুটি পরিচিত, এমন না ভালো টাকা পয়সা আছে, বা ভালো কোনো কাজ টাজ করেছে। ব্যস, এমনিই পরিচিত। অবশ্য তারমধ্যে কিছুটা অবদান তার বাবা-মায়ের আছে। আর বাকি যা, তা বোনাস পর্বের মতো চলছে।
তবে মায়ের ভয়ে মুখের উপরে টু শব্দ করবে, এমন মানুষ কাজী পাড়ায় কমই আছে। বাবার বাড়ির এলাকায় তিনি যেমন নামকরা ছিলেন, তেমনি এই কাজী পাড়ায়ও। অবশ্য এখন আগের মতো নেই বললেই চলে। তবে বিশেষ বিশেষ সময়ে তিনি বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত হন। আর আজ সেই রকমই একটা দিন।
আর এই রকম একটা দিনের কারণ,তার বিয়ে আবারও ভেঙেছে। প্রথম না, এই নিয়ে বেশ কয়েকবার। আর এই কারণটাই বর্তমানে তাদের বাড়ির সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ।
যেই কারণের ভেতর দিয়ে একসময় নানাবাড়ির মানুষ গেছেন, সেই কারণের মধ্যে দিয়ে এখন তাদের বাড়ির মানুষও যাচ্ছে। অবশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তবুও কারণ যাই থাক, যখন ভাঙে তখন তার মার মন মেজাজ সপ্তম আকাশে থাকে। আর তার ভয়েই তখন সবাই কলিজা, ফেপড়া হাতে নিয়ে চুপচাপ বসে থাকে । অবশ্য আজকাল কারো সাথে চিৎকার চেঁচামেচি কিছুই করেন না। তবে দীর্ঘ সময় দরজা লাগিয়ে বসে থাকেন।
আর যতক্ষণ থাকেন, ততক্ষণ এই বাড়িতে চলে পিনপতন নীরবতা। নাবিলার অবশ্য তাতে তেমন ভাবান্তর হয় না। সে এমনিতেই নীরব, তাছাড়া বড় মেয়ে হলেও, মায়ের সাথে তার ভাব কখনও হয়নি। তার যত ভাব ছিল, তার নানুর সাথে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই মানুষটা শুধু তার কথাই ভেবে গেছেন।
তাই আজও তেমন কিছু হয় নি। বরং সে আছে তার বিশাল যন্ত্রণা নিয়ে। সেই যন্ত্রণা হলো, তার দাঁতে সমস্যা হয়েছে। না, পোকা টোকা না। এই পঁচিশ, ছাব্বিশ বয়সে এসে আক্কেল দাঁত উঠছে। সেই ওঠাও বড় আয়োজন নিয়ে। আজ একটু উঠছে, তো আবার মাস খানেক পড়ে। আর যখন উঠে, ব্যথায় সে চোখে মুখে অন্ধকার দেখে।
তাই বাবা প্রথম দিকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধেই নিয়ে গেলেন। ডাক্তারদের সাথে তার আবার নানান ফেকরা। তবে মেয়ের ব্যথায় লাল, নীল মুখ হয়ত সহ্য করতে পারেন নি। তাই বাকি সব সাইডে রেখে নিজের ভাব নিয়েই গেলেন। তার মুখের এক কথা, "ছোট্ট মুখের ছোট্ট দাঁত, উঠতে বছর লাগবে কেন? "
তিনি তো ডাক্তারের ওপরই বিরক্ত হয়ে উঠলেন। যেন তার আক্কেল দাঁত, ডাক্তারের কথায়ই সময় অসময় একটু একটু করে উঁকি দিচ্ছে।
ডাক্তারও দুনিয়ার শেয়ানা। তিনি বিরক্ত হলেন না, বরং এক গাল হেসে নির্বিকারভাবে বললেন -- দাঁত উঠার জন্য যতটুকু জায়গা দরকার, ততটুকু জায়গা আপনার মেয়ের মাড়িতে নেই। তাই দাঁতটা একটু বাঁকিয়ে পেছন দিক গেছে। দাঁত তো আর আজকাল ছেলেদের মোটরসাইকেল না, জ্যাম দেখে অলি গলি চিপাচাপা যেটাই পাক, ফুল স্পিডে ঘুরে ফুড়ুৎ করে উড়াল দেবে। তাই নিজের মতো ধীরে ধীরে উঠছে।
তবে ব্যবস্থা চাইলে, আমি মাংস ছাড়িয়ে দিতে পারি। তাহলে বের যখনই হোক, ব্যথা খুব একটা হবে না।
নাবিলার শুনে তেমন ভাবান্তর হয়নি। তার ভেতরে ভয় ডর কম। তবে বাবা শুনে আঁতকে উঠে বললেন -- মাংস ছাড়িয়ে দেবেন মানে?
-- মানে দাঁতটা যেখানে উঠছে, সেখানটা একটু কেটে দেব। পরের বার যখন বের হওয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করবে, তখন খুব সহজেই বেরোবে। এখনের মত এত, ব্যথা করবে না।
-- সেই ব্যথা তো যেমন তেমন, এখন যে কাটবেন সেইটার কী ?
-- মাড়িতে ইনজেকশন দিয়ে নেব।
ইনজেকশন কথা শুনে বাবা আরও আঁতকে উঠলেন। সুই, সিরিঞ্জ তো বহুত পরের কথা, তিনি ডাক্তারের কাছেই যেতে ভয় পান। সবাইকে তো আগেই ঘোষনা দিয়ে রেখেছেন। অবস্থা যাই হোক, ডাক্তারের কাছে নেওয়া যাবে না। আজকাল ডাক্তার তো ডাক্তার না। কসাই, সব কসাই। মানুষের জীবন নিয়ে এদের মাথা ব্যথা নেই। সব মাথা ব্যথা, কখন এক মুরগি আসবে, হাজারগুলো সুই, টেস্ট ধরিয়ে রোগী বানাবে। এই ডাক্তারও তার কাছে আলাদা মনে হলো না। নির্ঘাৎ ঘুরে ফিরে বারবার আসতে হয়, সেই ব্যবস্থাই করছে।
তাই শুনেই বাবা ঝট করেই উঠে দাঁড়ালেন। তার বাবার অর্ধেক জীবন যাচ্ছে, নাপা আর গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ খেয়ে খেয়ে। জ্বর, ঠান্ডা, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা, বুক ব্যথা, পেট ব্যথা যাই হোক! সব সমস্যার দুই সমাধান, নাপা আর গ্যাস্ট্রিকের ঔষধ। খাবার আগে আর পরে । আর তার সামনেই ঘোল খাইয়ে, তার মেয়েকে মাংস ছাড়িয়ে দেবে, এতো সোজা! তাই দাঁড়িয়ে বললেন -- কোনো দরকার নেই! এই নাবিলা, ওঠ। আরেকটা নতুন নাপা বাজারে এসেছে, নীল রঙা প্যাকেট। রকেটের গতিতে নাকি কাজ করে। একটা খাবি, সব ব্যথা গায়েব।
নাবিলা অবশ্য নাপা খেয়ে বসে ছিল না। ডাক্তার ব্যথার ঔষধ দিয়েছেন, আর বলেছেন, -- পঁচাত্তর পার্সেন্ট উঠে গেছে, আর বেশি কষ্ট হবে না। একটু ধৈর্য ধরো মা।
ধৈর্যের ক্ষেত্রে নাবিলার তুলনা নেই। তাই সেটাই খেয়েছিল। তবে হঠাৎ করেই আজ দুপুর থেকে আবার শুরু হয়েছে। বাকি পঁচিশ মনে হয় এবারই দফারফা করবে।
তাই আজও ড্রয়ার হাতড়ে দেখতে লাগল। তবে খালি প্যাকেট পড়ে আছে, ঔষধ নেই। ব্যথা না থাকলে, ঔষধের কথা মনেও থাকে না।
নাবিলা আর মাথা ঘামাল না। না কাউকে ডেকে কিছু বলল।তার কাছে সবচেয়ে বড় অনীহার কাজ হলো কথা বলা। কথা বলতে তার দুনিয়ার বিরক্ত লাগে। তাই দরকার ছাড়া কথা টথায় সে এমনিতেও নেই। তাই চুপ করে খাটে শুয়ে পড়ল। এখন যেমন তেমন, ব্যথা যে ধীরে ধীরে আরও বাড়বে, তাতে কোনো ভুল নেই।
সেই শোয়ার মাঝেই তার ছোট বোন নোভা এসে হাজির। তাদের ছন্নছাড়া বাবার ঘরে তিনটা বিটলা শয়তান হয়েছে। তার মধ্যে প্রথমেই আছে সে, বাকি দুই শয়তান হলো, নোভা আর নাবিল। তারা দু'জন জমজ। একই চেহারা, একই হাইট, একই রং । তবে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি মানুষ। একজন ছেলে, একজন মেয়ে। স্বভাবে একজন চুপচাপ আরেকজন দুষ্ট, চঞ্চল। আর এই দু'জন মানুষের জন্যই নাবিলা ছোট্ট বয়সে বাবা, মায়ের থেকে দূরে চলে গিয়েছিল। সেই যে দূরত্ব বাড়ল, নাবিলার আর কমাতে ইচ্ছে করে নি, এখনো করে না।
আর এই দ্বিতীয় শয়তান এলো হাতে এক পানের খিলি নিয়ে। দিনরাত সে বইয়ে মুখ গুঁজে থাকে। না, একাডেমিক বই না। গল্প, উপন্যাস। এগুলো রেখে দিন দুপুরে একটু কাত চিত হলেই, তারা ধরেই নেয় দাঁতের টিমটিমানি শুরু হয়ে গেছে। কেননা সে ইনসোমনিয়ার রোগী। ইকটু আকটু না, বলতে গেলে অনেক। তাই দিনে ঘুমের ধারের কাছেও নেই। আর যদি ভুল করেও একটু চোখ বুঝে নেয়, ব্যস সাধনার শেষ রাতের ঘুমটুকুও একেবারে গায়েব।
তাই আজকে যেহেতু কাত হয়েছে, এদের আর বুঝতে বাকি নেই ঘটনা কি? তবে নাবিলা নোভার হাতে পান দেখেই ঢোক গিলল। তাদের বাড়িতে পান খায় আসমানি খালা। গরুর জবর কাটার মতো, অনবরত চিবুতেই থাকে। এই পান যে তার ডাব্বা থেকে এসেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। বাবার কাছে যেমন, নাপা গ্যাস্ট্রিক ঔষধ সব সমস্যার সমাধান। তেমনি খালার কাছে পান হলো মহাঔষধ। যার জন্ম দুনিয়াতে হলেও, গুণ আসে আসমানি খালার আসমান থেকে।
আর সেই মহাঔষধ নোভা, সোজা তার মুখে ঠেলে পুরে বলল -- দাঁত ব্যথার আসল ঔষধ হলো পান। খালার বক্তব্য না, এটা পরীক্ষিত প্রমাণ। এখন নাও, চিবাও। দাঁত ব্যথা একেবারে গায়েব।
নাবিলার একবার বলতে ইচ্ছে করল, এই পরীক্ষিত প্রমাণ কোথা থেকে প্রাপ্ত? তবে কিছুই বলল না। বলে লাভও নেই। যে যাই বলুক, এই মেয়ে একটার পর একটা ফালতু যুক্তি দিতে ওস্তাদ। আর এই যুক্তির বিপরীতে এত কথা বলার ইচ্ছা তার নেই। বরং তার চেয়ে আরামছে এই পান খাওয়া যাক।
খেলেও তাই, তবে ব্যথা কমেনি। কমার কথাও না। বরং পান সুপারি চিবুতে গিয়ে টাটানি আরও বেড়ে গেছে। অবশ্য তার মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই, কোনোদিন যায়ও না। অনেক কিছুই সে, এই নিষ্পাপ মুখের আড়ালে অনায়াসে করে। কারো বোঝার সাধ্য নেই।
তাই কিছুক্ষণ চিবানোর পরেই খেয়াল করল, দাঁত ব্যথা তো যেমন তেমন মাথাও ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে। কান দিয়ে কেমন ধোঁয়ার মতো বের হচ্ছে। শয়তানটা কতগুলো জর্দা দিয়েছে, কে জানে?
সে দাঁত খিঁচে চোখ বন্ধ করে আবার শুয়ে পড়ল। পড়তেই নোভা বলল, -- দেখছো, বলিনি? দাঁত ব্যথার আসল ঔষধ পান। আসমানি খালা তাহলে ভুল বলেনি।
নাবিলা এবারও কিছু বলল না। আগের মতোই পড়ে রইল। নোভা কিছুক্ষণ তাকিয়ে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে গেল।
আবার এলো ঘন্টাখানেক পরে। এসেই এমন ঝাঁকি দিল, নাবিলা আঁতকে উঠল। উঠতেই বিরক্ত মুখে বলল -- নাও, ঔষধের ব্যবস্থা হয়েছে। খেয়ে রোগী থেকে সুস্থ মানবী হও। তাড়াতাড়ি হও, মা আবার দরজার আটকে বসে আছে। রান্না হয়নি। বাবা আজকে ফিরবে না। মাল আনতে গিয়েছে, কোন বন্ধু নাকি পেয়েছে, আজ রাতটুকু তার কাছেই থাকবে।
এদিকে আবার এক লোক দুই বস্তা নিয়ে হাজির। নিচে বসে আছে। আসাদুজ্জামান কে চায়? হাজার বার বললাম, এটা আসাদুজ্জামানের বাড়ি না। এই লোক কানেও নিচ্ছে না।
নাবিলা কোনো কিছু নিয়েই মাথা ঘামাল না। বাবা এমন প্রায়ই করে। দুনিয়ার বন্ধু বান্ধব তার। এক দুই রাত এমন প্রায় সময়ই থাকেন।
এতে কারো কোন সমস্যা নেই। মায়ের তো আরও নেই। তবে নোভার আবার দুনিয়ার সমস্যা। তার ধারণা, বাবা বিয়ে টিয়ে করেছেন। সেই বউ সুন্দরী, নরম, কোমল। তাদের মায়ের মতো না। দুই, একটা ভাই বোন ও থাকতে পারে। দ্বিতীয় বিয়ে পুক্ত করার, আসল হাতিয়ারই তো হলো সন্তান। হয়তো এমন আজকাল কত! তাদের উচিত বাবার পেছনে স্পাই রাখা।
নোভার কথা কেউ শোনেও শুনে না। তার বাবা পাগল টাগল যাই থাক, এমন কিছু করার সাহস তার নেই। তাছাড়া, তার রাগী বদমেজাজী মাকে সে যেমন ভয় পায় তেমনি ভালোও বাসে। আর কেউ বুঝতে না পারলেও নাবিলা বুঝে।
আর রইল বাকি সমস্যা, আসমানি খালা আছে। কাজের লোক হলেও, একাই সব সামলাতে পারে। তবে মায়ের সাথে তার ভাব না হলেও, কেন জানি আজ একটু মায়া হলো। তাই গাল চেপে আস্তে করে বলল,-- নাবিল কই?
-- সেও দরজা আটকে বসে আছে। মা দরজা দেওয়ার আগে, তার গালে তবলা বাজিয়ে গিয়েছে।
নাবিলা বিস্ময় নিয়ে বলল, - কেন?
-- কেন আবার, মিশে কার সাথে? তোমার পেয়ারের খালিদের সাথে। তার জন্যই বের হচ্ছিল। মার মেজাজ তো জানোই।
নাবিলা আর কথা বাড়াল না। হাত বাড়িয়ে ঔষধ নিল। দুটো ওষুধ, একটা একটু বড়, আরেকটা ছোট। একটা হওয়ার কথা, দুটো হলো কেন কে জানে?
তাই নিয়েই পানি ছাড়া টুপ করে গিলে ফেলল। ঔষধ খেতে খেতে, ঔষধ নিয়ে তার আর কোনো আদিখ্যেতা নেই। বাবার ডাক্তার শত্রু হলেও, সে টিকেই আছে ডাক্তারদের অবদানে। তাই বাকি সব খাবারের মতো এমনিই খেতে পারে।
তবে নোভা তিন ইঞ্চির মুখ ছয় ইঞ্চি ভেঁটকিয়ে বলল, -- ইয়াক! ছি! তোমার মতো আজব প্রাণী, পৃথিবীর কোন চিরিয়াখানায় নাই।
নাবিলা এবারও কিছু বলল না। তবে উঠে বাথরুমে গেল। গিয়ে কুলি করল। পান খেয়ে মুখ কষ হয়ে আছে, দাঁত জিহ্বা টকটকে লাল। সে ভালো করে কুলি করল, চোখে মুখে পানি দিল। মাথায়ও দিল। কান তো ভালোই, এখন মনে হচ্ছে মাথা দিয়েও ধোঁয়া উড়ছে।
ততক্ষণে নোভা আবার গায়েব। নাবিলা অবশ্য অত ভাবল না। তার নিজেরই দুনিয়ার জ্বালা, পরের জ্বালা দেখবে কি? তাই আবার বালিশে মুখ গুঁজে শুয়ে পড়ল। থাকতে থাকতে কখন ঘুমিয়ে গেছে, বুঝতেই পারেনি। সেই ঘুম ভাঙল একেবারে রাতে।
ঘুম ভাঙতেই ঝট করে উঠে বসল। দাঁত ব্যথা, মাথা ঘোরা, কোনো কিছুই নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, দিন দুনিয়া ভুলে ব্যথা নিয়ে, এমন মরার ঘুম কিভাবে ঘুমালো!
তখনই দ্বিতীয় ঔষধটার কথা মনে পড়ল। ঔষধ খেতে খেতে কিছুটা আইডিয়া তো হয়েই গেছে। তখন খেয়াল না করলেও, এখন ঠিক বুঝতে পারল।
এই মেয়ে দু'টো ঔষধ কোথা থেকে আবদানি করল কে জানে? ঘুমের রোগী হলেও, সে ঘুমের ঔষধ খুব একটা খায় না। তখনই তার ঝট করে মনে পড়ল, -- আরে তার বড় চাচার পুরো নাম আসাদুজ্জামান নাসির। সবাই নাসির নাসির করে ডাকে। তাই এই নাম কালের চক্রে হারিয়ে গেছে। লোকটা কি চলে গেছে?
নাবিলা ঝট করেই তাদের ডয়িংরুমে গেল। মনিটরে তাকাতেই দেখল, তাদের নিচের ছোট্ট গ্যারেজের এক কোণে এক লোক বসে আছে। পা ছড়িয়ে, দেয়ালে হেলান দিয়ে। হাতে একটা বই। খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে আছে। বয়স কেমন হবে নাবিলা বুঝতে পারছে না। বেশিও হতে পারে তার আশপাশেও হতে পারে। কোণার সাইড করে বসা, তাই মুখটা তেমন বোঝা যাচ্ছে না। পাশেই দুটো ব্যাগ, একটা গিটার কেস।
নাবিলা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। গ্যারেজ ভর্তি ধুলা ময়লা। এর মধ্যে কি করে এমন শান্তিতে বসে আছে, আল্লাহই জানে! নিশ্চয়ই আসমানি খালার কাজ। বাড়ির সামনে বসিয়ে রাখলে লোকজন, ভাড়াটিয়ারা দেখবে, কথা উঠবে, তাই গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। তবে, তাদের চেনা পরিচিতদের মধ্যে কেউ না। অন্তত নাবিলার তো না। তাই চাচাকে ফোন করতে যেতে যেতে, কি মনে করে যেন আবার তাকাল। আর তাকাতেই চমকে উঠল। চমকে থমকে দাঁড়িয়ে গেল। ছেলেটা সোজা সিসি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো এমনিই। যতো আড়াল থেকেই কেউ তাকাক, ভেতরের কোনো অজানা টান একটু হলেও ঠিক জানিয়ে দেয়। কিন্তু নাবিলা চমকাল অন্য কারণে। আর সেই কারণেই ছেলেটা দৃষ্টি ফিরিয়ে বইয়ে নিলেও, নাবিলা পারল না। বরং শূন্য চোখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
চলবে....
#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব- ০১
নিচে আমার গ্রুপের লিংক আর আমার প্রথম ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে।
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT