ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 6

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৬

শৈশবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া বাবার সাথে অপূর্বর সময় কাটল চমৎকার ভাবে। সেই চমৎকার সময়কে আরেক ধাপ বাড়িয়ে ঝপ করে এক পশলা বৃষ্টি ঝমঝম করে ঝরে পড়ল। অল্প কিছু সময়, বড় বড় ফোটার। অপূর্ব মুগ্ধ চোখে সেই বৃষ্টি দেখল, গলির হকারদের ব্যস্তভাবে দৌড়াতে দেখল, দেখল এলোমেলো ভাবে কিছু চড়ুই পাখির আনাগোনা। সেই সাথে দেখল জড়তা, সংকোচ মাখা, এই যে পাশে বসা, তার বাবার ক্লান্ত চোখ মুখ।

খবর শুনে হয়তো আর দেরি করেনি, সাথে সাথে ছুটে এসেছে। সারা রাত হয়তো চোখের পাতাও এক করেনি। এই যে বসে আছে, চোখে মুখে ক্লান্তি তবে বিরক্তির ছিটেফোঁটাও নেই। বরং এতদিন পর ছেলেকে কাছে পাওয়ার অন্যরকম এক তৃপ্তি।

অপূর্ব আর রুম থেকে বের হয়নি। সকালের নাস্তা এই দুপুরের শুরুতে, এই যে রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দা। বাবার সাথে বসে এখানেই সেরে ফেলেছে। আর সাথে ছিল সেই কিছুক্ষণ পর পর বেজে ওঠা টুং টাং করে মিষ্টি একটা সুর। এই সুরটা যখনই বাজে, অপূর্বর মনে হয় অন্য কোনো রাজ্যে সে বসে আছে। যেই রাজ্যে ধুলোমাখা পথ নেই, ইট পাথরের দেয়াল নেই, নেই মানুষের কোলাহল। আছে যতদূর চোখ যায়, মন মাতানো গভীর সবুজ বন আর বন।

আর তার সাথে কত কথা, কত স্মৃতির পাতা। অপূর্ব তো তার ল্যাপটপ পর্যন্ত খুলে বসেছে। অবশ্য যা বলার বেশিভাগ সে নিজেই বলছে। সেই বলারও সূক্ষ্ম একটা কারণ আছে।

সে খামখেয়ালি হতে পারে, তবে অবুঝ না। বাবা অস্বস্তি এত সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে না। না কাটানোই স্বাভাবিক। মানুষ নিজে থেকে যখন নিজের ভুল উপলব্ধি করে, এর চেয়ে বড় অনুতাপ আর কিছু নেই, নেই কোন শাস্তি।

তার মা ভীষণ চমৎকার একজন মানুষ। বাবার কাছে অন্য পাঁচ দশটা মেয়ের মতো শাড়ি গয়না এসব কিছুই চায়নি। চেয়েছিল একটু সময়, ভরসা, যত্ন। সেই চমৎকার মানুষের কদর তিনি করতে পারেননি। তবে পারেননি বলে দশ বছর একই বন্ধনে থেকেও তাঁর মায়ের মতো চমৎকার মানুষকে ভালোবাসেনি, এটা ছোট্ট শৈশবের অপূর্ব বুঝতে না পারলেও, এখন ঠিক বুঝতে পারে।

পৃথিবীর সব মানুষ যেমন এক হয় না, তেমনি তাদের ভালোবাসার ধরনও এক হয় না। সবাই যত্নে বুকে আগলে নিতে পারে না, সবাই রং-ঢং করে রাগ অভিমান ভাঙাতে পারে না। কেউ কেউ থাকে শক্ত খোলসে আবৃত। সেই আবৃত ভালোবাসাকে বাবা নিজেই বুঝেনি, বুঝেছে সব হারিয়ে। তাই মা আর বুঝবে কি করে? তাই তো সব ভুলে এগিয়ে যেতে পেরেছে, বাবা এখনো পারেনি। তিনি এখনো সেই আগের আফসানাতে আটকে আছেন।

বাবার যেমন মায়ের প্রতি ঘৃণা নেই, মায়েরও নেই। অপূর্বরও নেই। তারা নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিয়েছে। অপূর্ব এখানে কাউকেই জাজ করবে না। বাবা, মা, ছেলে মেয়ে সবাই একই সুতোয় গাঁথা হলেও, প্রত্যেকের আলাদা সত্তা আছে। সেই সত্তাকে খুন করে মা যদি তার মুখের দিকে তাকিয়ে এই সম্পর্কে আটকে থাকত, এখন যেই ঘৃণাটা সম্পর্ক শেষ হয়েও নেই, সেটা এতদিনে ঠিক হয়ে যেত। তারা একই সম্পর্কে তো থাকত, তবে সেই সম্পর্ক তিক্ততায় ভরে যেত। একই ঘর, একই ছাদের নিচে বাবা মায়ের এই তিক্ত রূপ, কোনো সন্তানের ভালোর চেয়ে খারাপের পরিমাণটাই বেশি হয়। এক সময় দেখা যায়, তাদের তিক্ত রুপ দেখতে দেখতে তাদের উপর থেকে সন্তানের সম্মানটাই উঠে যায়৷

তাই সে মনে করে, সব সম্পর্কে ভালোবাসা যেমন দরকার, তেমনি দরকার সম্মান। আর এই দুটো জিনিসের একটার খামতি যদি মনে হয়, তবে সরে যাওয়াই ভালো। তাই যেই কয়দিন এখানে আছে, সে চাইছে সময়টা শুধু বাবার। এই যে জড়তা, সংকোচের একটা দেয়াল, সেটা যেন তাদের মাঝে আসতেই না পারে।

তার বাবা এগুতে পারবে না। সে জানে, ভালো করেই জানে। তাই ইচ্ছে করে নিজেই এগোচ্ছে। অবশ্য এক হিসেবে বলতে গেলে, তার কাছে এমনিতেও গল্পের শেষ নেই। সে অনায়াসেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে হরেক রঙের গল্প করতে পারে, মানুষকে মুগ্ধ করতে পারে।

তাই তার মতোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গল্পের আসর জমাতে সময় লাগল না। তবে এই সময়ের মাঝে তার বাবা নিজেও অল্প স্বল্প গল্প নিজের মতো করে বলল। তার চাকরি জীবনের অ্যাডভেঞ্চারের কথা বলল। সেই সাথে বলল বর্তমান জীবনের এই যে দেওয়ান বাড়ি, এই বাড়ির গল্প। সেই গল্পগুলো অপূর্ব মুগ্ধ হয়ে শুনল। আর সেই মুগ্ধ হওয়া গল্পগুলোর মাঝে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একটা নাম বারবার এলো, নাবিলা। এই নামের মানুষটা যে, তার বাবার খুব, খুব প্রিয়, তা সে অনায়াসেই বুঝল। আর সন্তান হিসেবে কোথায় যেন, একটু জেলাসও হলো।

অপূর্ব বাবার সব কিছু অনায়াসে বুঝলেও, আসাদুজ্জামান অবশ্য ওতো সতো খেয়াল করেনি। এই যে এত এত গল্প, এই গল্পের মাঝে তার সামনে বসা অতি ধুরন্ধর ছেলে, ঠিক জেনে নিয়েছে, এই যে তার রুমের বারান্দার বাঁ পাশে দেয়ালের ওপারে, সুন্দর গোছানো আরেকটা বারান্দা আছে। যেই বারান্দার কোণে তার আজকের সকালের স্বপ্নের মতো উইন্ড চাইমও আছে। আর সেখান থেকেই, এই যে কিছুক্ষণ পরপর টুং টাং মিষ্টি একটা সুর, সেটাই ভেসে আসছে।

.......

নোভা ভার্সিটি থেকে ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। ফিরে কিছুক্ষণ নিজের রুমে গড়াগড়ি করল। গোসল করে পুরো কাবাট ঘেঁটে প্রিয় রঙের জামা গায়ে জড়ালো। শ্যামলা রঙের এই এক জ্বালা, সব রঙ ফুটে ওঠে না। তবে এই যে সাদা রঙ, এটা ঠিকঠাক সব সময় মানিয়ে যায়।

তারপর কোমরছোঁয়া ভেজা চুলগুলো ছড়িয়ে একেবারে খাবারের টেবিলে এসে বসল। বসতেই আসমানি খাবার এগিয়ে দিল। আজকে খাবারের আয়োজন ভালো। আয়োজন দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মায়ের বুকের ওজন কমে গেছে। তাই ভাতের সাথে তার প্রিয় বড় সাইজের দুটো চিংড়ি পাতে তুলে নিল। নিল একটু খাসির মাংসের ঝোল। নিয়ে আয়েশ করে মুখে তুলতে তুলতে বলল, -- কাহিনী কি?

আসমানিও তার মতো বলল, -- কাহিনী তো ভালা না। পোলা আসছে ঘুরতে। ঘুরব, ফিরব, ফেরত যাইব।

নোভা হাসল! যাওয়াই কথা। এমন এক সুন্দর দেশ থেকে বুঝি কতগুলো চকপাথরের জায়গার জন্য এখানে এসে মরে পড়ে থাকবে?

আসমানি নিজের মতো অন্য পাশে চেয়ারে টেনে বসলো। পানের ডাবা এগিয়ে নিতে নিতে বলল, -- ফেরত যাওনই ভালো। চামড়া ধলা হলেই মানুষ ভালা হয় না, এক নাম্বারের গিদর। এক রাইতেই রুম ওলটায়া পালটায়া ফেলাইছে।

নোভা এবার খেতে খেতে খিলখিল করে হাসল। তখনই অপূর্ব রুম থেকে বেরোল। কোথাও যাবে হয়তো। গায়ে জিন্স, শার্ট। তবে এর বাহিরে অন্য কোনো প্রস্তুতির লক্ষণ দেখা গেল না। এই লোক মনে হয় এলোমেলো থাকতে পছন্দ করে। অবশ্য এই এলোমেলো চুল, গায়ে ফিটিং হয়ে বসে থাকা ঘিয়ে রঙের শার্ট, গোটানো শার্টের হাতের কব্জিতে বড় ডায়ালের ঘড়ি। এতেই ভীষণ ভালো লাগছে। নোভা খেতে খেতেই তাকিয়ে দেখল, দেখে বলল, -- শাস্তি তোলা আছে।

অপূর্ব চোখ ফিরিয়ে তাকালো! তার একটু টুকটাক কেনাকাটা আছে। তাছাড়া সবাইকে কিছু গিফট করতে চাইছে। বাবা শুনেই বলল, -- তুমি রেডি হয়ে নাও, আমি নিয়ে যাচ্ছি।

অপূর্ব অবশ্য এটাই চেয়েছিল। তার ছেলেবেলা কেটেছে বাবা ছাড়া। যখন কাছে ছিল তখনও, আবার যখন দূরে চলে গেছে তখনও। তাই এত এত স্মৃতি মাখা জীবনে, বাবার সাথে কিছু সুন্দর মুহূর্তে থাকবে না, তা হয়?

তাই তাকিয়ে হেসে বলল, -- হেই প্রিটি গার্ল! নাইস টু মিট ইউ এগেইন।

নোভা ঠোঁট টিপে হাসল। হেসে বলল, -- থ্যাংক ইউ বিগ ব্রাদার, তবে আমিও আপনার মতো সেইম বাক্যটা বলতে পারছি না।

-- নোভা, রাইট?
-- হুম।

অপূর্ব এগিয়ে এলো। চেয়ার টেনে স্বাভাবিক ভাবেই পাশে বসে বলল, -- কেন, আমার ওষুধে সমস্যা সমাধান হয়নি?

-- উঁহু! বরং আপনার ওষুধ খেয়ে দাঁত টাত লেগে এই যে মনিটর। এখানে ধুমছে পড়ে গেছে।

অপূর্ব বিস্ময়ে তাকালো। বিভিন্ন জায়গায় ট্রাভেল করে বলে টুকটাক সব রকমের ওষুধ তার কাছে থাকে। এটা একজ্যাক্টলি দাঁতের ব্যথার ওষুধ ছিল না, তবে সাময়িকভাবে ব্যথা কমার কথা। এমন কিছু তো হওয়ার কথা না। তাই বিস্ময় নিয়েই বলল, -- তাহলে তো অবশ্যই শাস্তি ডিজার্ভ করি। তো প্রিটি গার্ল, বলুন, কি শাস্তি দিতে চান?

নোভা আগের মতোই হেসে বলল, -- খালা, বিগ ব্রাদারকে তোমার হাতের স্পেশাল একটা পান দাও।

অপূর্বর শুনে তেমন ভাবান্তর হলো না। বরং গা ছড়িয়ে আরাম করে বসল। আসমানিও অপূর্বের মতো খুব স্বাভাবিকভাবে পান বানিয়ে এগিয়ে দিল।

অপূর্ব নিয়ে সাথে সাথেই মুখে নিল। নিতে নিতে বলল, -- আমার যদি ভুল না হয়, এটাই সেই বিখ্যাত মহাঔষধ।

-- জ্বি।
-- এটাই তোমার আপার প্রাথমিক চিকিৎসা ছিল?
-- জ্বি।
-- গুড।
-- নাবিল কোথায়?
-- আপাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে।
-- তোমার আপা এখনো ঠিক হয়নি?
-- আমার আপা সব সময়ই ঠিক। একশ তিন জ্বর নিয়েও ঠিক, মাথা ছিঁড়ে যাওয়ার মতো মাথাব্যথা নিয়েও ঠিক, ছটফটানো দাঁতের ব্যথা নিয়েও ঠিক, আবার আপনার দুই নাম্বার ওষুধ খেয়েও ঠিক।

অপূর্ব হেসে ফেলল। নোভা বিভোর হয়ে সেই হাসি দেখল। ফর্সা মুখে পান খাওয়ার কারণে ঠোঁট দুটো টুকটুকে লাল হয়ে গেছে। আসমানি খালা সবকিছু বেশি বেশি দেয়। আজও যে তাই দিয়েছে, তাতে ভুল নেই। তবে এই লোকের কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। নোভা একটু অবাক হয়েই বলল, -- আপনার খারাপ লাগছে না?

অপূর্ব আবারও হাসলো! চেয়ার ঠেলে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, -- এর চেয়ে হাজার গুণ নিকৃষ্ট জিনিসও আমি খেয়েছি, ছোট আপু। যেই সব জিনিস সম্পর্কে তোমার এখনো কোন ধারনাও নেই। তাছাড়া বিদেশ ফেরত হলেই মিনারেল ওয়াটার ছাড়া কিছু হজম হবে না, এমন ভাবার কোন কারণ নেই।

নোভা ছোট আপু শুনেই মুখ ভোঁতা করে ফেলল। আসমানি ফিক করে হেসে হেসে বলল, -- আগেই কইছি, এই মাল পুরা ছেঁড়াবেড়া।

অপূর্বর দরজার কাছে আসতেই রাতের কথা মনে পড়ল। নাবিল জুতো গুছিয়ে রাখতে বলেছিল। তার মনে নেই, থাকার কথাও না। রুমে এসে জুতোর খোঁজ তার কখনো থাকে না।

তাই আশেপাশে একবার তাকালো। তাকাতেই আসাদুজ্জামান রেডি হয়ে বেরিয়ে এলেন। এসে বলল, -- কোন সমস্যা?

-- কাল জুতোটা এখানেই রেখেছিলাম।

আসাদুজ্জামান হালকা হেসে এগিয়ে গিয়ে সু-র্যাক খুলতে খুলতে বললেন, -- এখানে দেখো, কোনটা? এই বাড়িতে কোনো এখানের জিনিস ওখানে পাবে না। ঠিক যেই জায়গার, সেখানেই পাবে।

-- অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না।
-- জানি, তবে আমাদের মেয়ের সেই রকম কিছু নেই।
-- মেয়ে?
-- হুম।
-- নোভা?
-- উঁহু, নাবিলা।

অপূর্ব আবার এই নাম শুনেই হেসে বলল, -- ভালো।

-- পরিচয় হয়নি?
-- না, অসুস্থ ছিল মেবি।

আসাদুজ্জামান অসুস্থ শব্দটা শুনেই বড় একটা শ্বাস ফেললেন। অপূর্ব সেই শ্বাস ফেলা দেখে জুতো পায়ে দিতে দিতে বলল, -- কোন সমস্যা?

-- উঁহু। তুমি কি এভাবেই যাবে?
-- কেন, কোনো সমস্যা?
-- না, কোনো সমস্যা নেই। তবে কেউ কি বলেছে, তুমি খুবই উৎশৃঙ্খল একটা ছেলে।

অপূর্ব হো হো করে হাসলো! হেসে বলল, -- তুমি ছাড়া, মা বলে। বাকি সবাই এটার উপরই ফিদা হযে মরে।

-- যাক, একদিক দিয়ে মিললো তাহলে।

-- তা মিলে গেছে। তবে ভয়ে আছি।

-- কেন?

-- এই যে অগোছালো। কিছুদিন তোমাদের মেয়ের গোছানো রাজ্যে জায়গা হবে তো?

আসাদুজ্জামান নিজেও নিজের জুতা পায়ে দিলেন। দিতে দিতে বললেন, -- আমার দেখা চমৎকার দু’জন নারীর মধ্যে আমাদের বড় মেয়ে একজন। তাই নিশ্চিতে থাকতে পারো।

অপূর্ব আবারো হাসল! হেসে সোজা দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, -- আরেকজন কে? আমার মা?

আসাদুজ্জামানও হাসলেন। ছেলের সাথে দেখা হওয়ার পর প্রথম প্রাণখোলা হাসি। হেসে আর কিছু বললেন না। সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। অপূর্বও বিনা বাক্যে বাবার পেছনে এগিয়ে গেল।

তারা যেতেই আসমানি বলল, -- দেখছো, বলছিলাম না গিদর! গেল তো গেল। পুরো ঘরকে জুতার ধুলাবালি দিয়ে গোসল করাইয়া গেল। প্লেন কইরা আইছে না, চকপাথর দিয়া দৌড়ে আইছে, আল্লাহই জানে। জুতা ঝাড়া দিলে মণ খানেক ধুলা এমনিই জমা হইয়া যাইব।

নোভার খাওয়া শেষ, ভোঁতা মুখে হাত ধুতে ধুতে বলল, -- কিছু কিছু মানুষ অগোছানোতেই সুন্দর খালা।

আসমানিও পানের ডাবা গুছিয়ে উঠে দাঁড়াল। ধুর! এখন আবার ঘর ঝাঁটা দিতে হইব। বলেই বিরক্ত মুখে এগোলো। এগোতে এগোতে বলল, -- যৌবনে কাকও সুন্দরী, শ্রাবণে নদীও কুমারী, আর পিরিতে বিষও মধুর হাঁড়ি। আর এতো কোথাকার জুতোর ধুলাবালি।

.......

নাবিলা ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হতেই আকাশের দিকে তাকালো। যখন বেরিয়েছিল, তখন রোদ ছিল না, আকাশ ছিল মেঘলা। চেম্বারের সিরিয়ালে বসে থাকতে থাকতে এক পশলা বৃষ্টি হলো। এই বৃষ্টি শহরকে ভেজাতে পারে না, না পারে শরীরকে শীতল করতে। বরং এই যে শেষ দুপুরে রোদ, বরং মেঘ কাটতেই পুরো উদ্যমে ঝিলিক মেরে আছে।

নাবিলা তার তুলোভরা ফুলে থাকা গাল নিয়েই গায়ের কালো ওড়নাটা মাথায় তুলে দিল। দিয়ে একটু সাইডে দাঁড়াল। নাবিল গেছে ওষুধ নিতে। অ্যান্টিবায়োটিক, সাথে হালকা কিছু ওষুধ দিয়েছে। ভারী খাবার আজ খেতে বারণ করেছে। খোঁচা টোঁচা লেগে আবার রক্ত বের হতে পারে। তাই আজকে কালকের দিনটা একটু সাবধানে।

তখনই এক বাচ্চা তার ওড়নার কোনা টেনে ধরল। নাবিলা কিছুটা চমকে সাইডে তাকালো। ধুলামাখা গায়ে, ছেঁড়া কাপড়ে এক ছোট্ট ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। তাকাতেই ময়লা হলুদ দাঁতে হেসে বলল, -- আফা, কিছু দেন না? সকাল থেকে না খাওয়া।

নাবিলার কাছে টাকা পয়সা নেই। তবে নিশ্চুপ তাকিয়ে রইল। বাচ্চাটা কিছুক্ষণ ওড়না ধরে ঝাঁকাঝাঁকি করে চোখে মুখে কিছুটা বিস্ময় নিয়েই সামনে হাঁটা ধরল। পাগল টাগল কিনা সে বুঝতে পারল না। তবে দেখে তো ভালোই মনে হয়।

সে নিজের মতো এগুলো, এর কাছে ওর কাছে জামা ধরে ঝাঁকাঝাঁকি করে টাকা চাইতে লাগল। নাবিলা এক পলকে সেই ছোট্ট ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঘোরের মতো ছেলেটার পেছনে এগিয়ে গেল। কতক্ষণ এগোল, নিজেও জানে না। ঘোর ছুটল শিস বাজার শব্দে।

ডাক্তারের চেম্বার তাদের এলাকা থেকে বেশি দূরে না। বিশ টাকার রিকশাভাড়া। বাইকে দু’মিনিট। নাবিলাদের পুরোনো বাসিন্দা হিসেবে অনেকেই চেনে। তাই চায়ের দোকানের আড্ডায় বসা পাশের এলাকার ছেলেদের কাছেও অচেনা না।

অবশ্য নাবিলাকে চেনে তারা অন্য উপায়ে। বর্তমান কাউন্সিলরের বিরোধী পক্ষ তারা। আর খালিদের দুশমন। কোথাকার কে উড়ে এসে তাদের এলাকায় জুড়ে বসেছে। সেই খালিদ কী করে, না করে সবই তাদের কানে আসে। এই নাবিলারটা আসবে না, তা কি করে হয়? তাই দেখেই শিস বাজালো।

এই মেয়ে বাড়ি থেকে বেরোয় না বললেই চলে। আর আজ একা, এভাবে রাস্তায় সুযোগ মিস করলে হয়?

নাবিলা শিসের শব্দ শুনেই চায়ের দোকানের দিকে তাকালো। সব অল্পবয়সী ছেলে পেলে। নাবিলের বয়সের আশপাশের। এরা তাকে দেখে শিস বাজিয়েছে, না অন্য কাউকে দেখে নাবিলা বুঝতে পারল না। তাই তাকিয়ে রইল।

সেই না বোঝার মাঝেই একজন হেসে বলল, -- আরে, এলাকার ভাবি! এই রোদ বৃষ্টি মাথায় করে একা একা কোথায় যাচ্ছেন? কোন দরকার পড়লে আমাদের বলুন, খালিদ ভাইয়ের চেয়ে আমরা কম কিসে! একবার বিশ্বাস করে দেখেন, সার্ভিস খারাপ দেব না।

নাবিলার কোনো ভাবান্তর হলো না। ভালো সার্ভিস দেওয়ার কথা শুনে বুঝদারের মতো একটু মাথা ঝাঁকালো। যেন আসলেই এরা ভালো সার্ভিস দেবে, নাবিলা জানে। তাই ঝাঁকিয়ে আশপাশে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, কোথায় আছে।

তখনই নাবিল বাইক নিয়ে সোজা তার সামনে থামল। থেমে বিস্ময়মাখা সুরে বলল, -- এখানে কী করো? আমি খুঁজে শেষ।

নাবিলা হালকা হাসল, তবে কিছু বলল না। হেসে বাইকে বসবে তখনই, আবার চায়ের দোকানের ছেলেদের মধ্যে একজন বাইকের সামনে ওষুধের প্যাকেট দেখে গলা ছেড়ে বলল, -- আরে নাবিল নাকি! বোন নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলি বুঝি? আবার কি হরো রে ? পাগলের দৌড়া আবার পড়েছিল নাকি?

নাবিল ভ্রু কুঁচকে দোকানের দিকে তাকাল। সে তাকাতেই পাশের আরেকজন বলল, -- আরে ভাই, জাতের দশ কথার এক কথা! পাগলদের পাগলামি কখনো ঠিক হয় না। দশ পার্সেন্ট হলেও থাকে। সেই দশ পার্সেন্ট যে কোনো সময় লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে।

নাবিল দাঁতে দাঁত চেপে বাইক থেকে নামল। নামতেই নাবিলা নাবিলের পিঠের শার্ট টেনে ধরল। তার ধরা দেখে ছেলেগুলো খিকখিক করে হেসে বলল, -- আরে, এলাকার ভাবি! আসতে দেন, দুলাভাইয়ের পাওয়ারের রক্ত গরম। আমরাও একটু দেখি এই গরমের তেজ।

ব্যস, কথা শেষ হতে দেরি। নাবিলার হাত ছাড়িয়ে হনহনিয়ে এগিয়ে যেতে দেরি হলো না। আর যেতেই যা হওয়ার তাই হলো। দু’পক্ষের মধ্যে পুরো হাতাহাতি লেগে গেল।

নাবিলা বাইকের পাশে দাঁড়িয়ে চুপচাপ সেই হাতাহাতি দেখল। আশপাশের মানুষ, চায়ের দোকানদার টেনে ফেরালেও নাবিলা আগের মতোই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

আর এই হাতাহাতির খবর পুরো এলাকায় বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়ল। খালিদ আর নাজিম এলাকায় ঢুকল, এই ঘটনার কিছুক্ষণ পরেই। আর ঢুকতেই সব কানে গেল। খালিদের তেমন ভাবান্তর হলো না। নিজের গায়ে যে নিজেই কলঙ্ক লাগায়, নতুন কলঙ্কে আবার তার কি বা আসে যায়।

তবে নাজিম আঁতকে উঠল। দুনিয়ার দারির চিন্তা না থাকলেও, বাবা হয়ে মেয়ের চিন্তা সব বাবার'ই থাকে। সে তো তার বাইরে না। তাই ভালো করেই বুঝল, এই ঘটনায় কারো কিছু আসবে যাবে না। তবে তার মেয়ের ললাটে ভোগান্তির ওজন আরেক ধাপ বাড়ল।

চলবে......

আমার গ্রুপের লিংক আর প্রথম ইবুক লিংক কমেন্ট বক্সে

https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 6 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন