ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

পর্ব 9

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৯

আসাদুজ্জামান সব সময়ই ভোরে উঠেন। চাকরিজীবন গেছে, তবে অভ্যাস রয়ে গেছে। মানুষ অভ্যাসের দাস, সে আর বাইরে যাবে কেন? তাই আজও তার অভ্যাসের হেরফের হলো না। আযানের শব্দ ভেসে আসতেই ঘুম ভেঙে গেল। আর চোখ দুটো খুলতেই থমকে গেলেন।

তার পাশ ঘেঁষে অপূর্ব শুয়ে আছে। সারা জীবন তার চুল এক ইঞ্চি হয়েছে বলে মনে পড়ে না, আর তার ছেলের মাথা ভর্তি এলোমেলো চুল। যেই চুলে বারো মাসে চিরুনি পড়ে কি না, সন্দেহ। তবুও এই যে, কী শুভ্র সুন্দর একটা মুখ! যেই মুখের উপর এলোমেলোভাবে চুলগুলো পড়ে আছে। চুল এলোমেলো থাকলেও এই ছেলের মুখ থাকে সব সময় ক্লিন শেভ। ছেলেদের ক্লিন শেভ আর অতি ফর্সা রঙ ঠিক মানায় না, তবে তার ছেলেটাকে কেন জানি চমৎকার মানিয়ে গেছে।

এই মানিয়ে নেওয়া চমৎকার ছেলেটার ভেতরে জড়তা সংকোচ কম। কম না হলে, যেই বাবার সাথে সুখের কোনো স্মৃতি নেই, আদরমাখা দিন নেই, স্নেহের পরশের একটা মুহূর্ত নেই। সেই বাবার কাছে এত দিন পরে দৌড়ে চলে আসতে পারত না, এসে স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে ধরতে পারত না, না পারত এই যে এভাবে পাশ ঘেঁষে শুতে। নাবিল'ই পারবে না, অথচ সে বাবার কোলে হেলে খেলে, গলা জড়িয়ে বড় হয়েছে।

তাই আসাদুজ্জামানও নিজের সব অস্বস্তি, জড়তা, সংকোচ দূরে ফেলে পিতার মমতা মাখা একটা হাত মাথায় রাখলেন। রেখে এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে ছেলের কপালে আলতো একটা চুমু খেলেন। তার চোখে পানি, আফসোসের পানি। ছেলেটার শৈশব তার পাশেই গেছে, সে টেনে বুকে নিতে পারেনি। তার মতো হতভাগা পিতা বুঝি দুনিয়াতে আর আছে?

অপূর্ব তখনই চোখ খুলে তাকালো। আসাদুজ্জামান অন্য পাশে ফিরে চোখের পানি মুছলেন, মুছে হেসে বললেন, -- ঘুমাওনি?

অপূর্ব বাবার চোখের পানি দেখেছে। তবে সব চোখের পানি সবাইকে দেখতে হয় না। অপূর্বও দেখে দেখল না। সে নড়ে চড়ে উপর হয়ে শুতে শুতে বলল, -- উঁহুম।

-- কেন?

কেন, অপূর্ব নিজেও জানে না। ঘুম নিয়ে সমস্যা তার এই জীবনে নেই। যেদিন এলো, সেদিন রাতেও তো দিব্যি আরামে ঘুমালো। তবে কাল কিছু একটা বদলে গেছে। তাই আড্ডা শেষ হতেই অনেকক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করল, বারান্দায় গিয়ে বসে বসে গুনগুন করল, ল্যাপটপে অনেকক্ষণ কাজ করল। তারপর যে জিনিস জীবনে করেনি, জোর করে ঘুমাতে চেষ্টা করল। আর করতেই ঘুরে ফিরে একটা জিনিস বারবার মাথায়, চোখের সামনে এলো। সেই সন্ধ্যার ইনসিডেন্ট।

তার মনে যে এত পাপ, সে তো জানতই না। অথচ এই সব মামুলি ব্যাপর স্যাপার অনেক আগেই হজম হয়ে গেছে। যাওয়াই স্বাভাবিক, সে কোন গ্রেট ম্যান, নোবল সোল টাইপের তো না।

তো সাধারণ একটা ইন্সিডেন্ট, মাথায় এভাবে স্যাট আপ হওয়ার কারণ কি? তারমধ্যে সম্পর্কে হয় বোন। মেয়েটা স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। অবশ্য স্বাভাবিকের মাঝেও কিছুটা অস্বাভাবিক আছে। তবুও এই মেয়ের জায়গাটা অন্য কোনো মেয়ে হলে এত সহজে স্বাভাবিক হতে পারত না। আর তাকে দেখো, ঘুরে ফিরে এই মেয়ের চিন্তা'ই মাথায় আসছে। এই যে এখনো এসে গেছে। ধ্যাত! বলেই অপূর্ব বিরক্ত মুখে বালিশের নিচে মাথা ঢুকিয়ে ফেলল।

এই হাবিজাবি চিন্তা থেকে বাঁচার জন্যই ঐ রুম থেকে এই রুমে চলে এসেছে। তার নানু সব সময় বলে, একা ঘরে শয়তান বেশি কাবু করে। আর দেখো, তার শয়তান তার সাথে সাথে এই রুমেও এসে গেছে। সো, মিস নাবিলা! রূপকথার গল্পে বিউটির ছোঁয়ায় বিস্ট তার অভিশপ্ত জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছিল, ফ্রগ প্রিন্স তার মানুষরূপ ফিরে পেয়েছিল। তো আমার জীবন এমন এলোমেলো হলো কেন?

আসাদুজ্জামান তাকিয়ে তাকিয়ে ছেলের কাণ্ডকারখানা দেখলেন। দেখে বললেন, -- এখানে কি তোমার কোন সমস্যা হচ্ছে?
-- উঁহুম।
-- তাহলে?
-- নাথিং।
-- তাহলে ছটফট করছো কেন?

অপূর্ব উত্তর দিল না। আসাদুজ্জামান নিশ্চুপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বলল, -- বাবার সাথে নামাজ পড়তে যাবে, অপূর্ব?

অপূর্ব সাথে সাথেই ঝট করে উঠে বসল। বসে বলল, -- এক্সট্রা পাঞ্জাবি আছে?

আসাদুজ্জামান হাসলেন, হেসে বললেন, -- বাবাদের জিজ্ঞেস করতে হয় না, ছেলে। ডাইরেক্ট আবদার করতে হয়।

অপূর্ব হাসল! হাসলেন আসাদুজ্জামানও। হেসে উঠে আলমারি থেকে এবার ঈদের সাদা রঙের পাঞ্জাবিটা বের করে দিলেন। পরে শুধু ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন, আর গায়ে দেওয়া হয়নি। তখন কি ভেবেছিলেন, দ্বিতীয় বার এই পাঞ্জাবিটা তার ছেলের গায়েই উঠবে!

অপূর্ব তার বাবার রুমের বাথরুমেই ফ্রেশ হয়ে ওজু করে নিল। বাবার চেয়ে সে কিছুটা লম্বা, চওড়া। একটু ফিটিং আর ছোট হলেও দেখতে খারাপ লাগল না। ওজুর পানিতে ভেজা চুলগুলো পেছনে ঠেলে টুপিটা মাথায় পড়তেই আসাদুজ্জামান মনে মনে বেশ কয়েকবার ‘মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ’ বলে ফেললেন। এই ছেলে এমন সুন্দর হলো কোথা থেকে, দেখতো। তার নিজেরই না নজর লেগে যায়।

বাবা ছেলে একসাথে নামাজের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হলেন। একসাথে, এক কাতারে, কাঁধ বরাবর দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলেন। অপূর্ব ঠিক থাকলেও আসাদুজ্জামানের চোখ বারবার ভিজে এলো। তিনি কখনো কল্পনাই করেননি, তার ভাগ্যে এত সুখ জমা ছিল। তাই তো রবের দরবারে দু’হাত তুলে হাজার বার শুকরিয়া জানালেন।

নামাজের পরে দুজনের একজনও বাড়ি ফিরল না। বরং হেঁটে হেঁটে পুরো কাজীপাড়া ঘুরল। হোটেলে বসে সরভাসা দুধচা, গরম গরম পরোটা আর ডাল সবজি দিয়ে নাস্তা করল। তার সাথে কত কত কথা, হাসি, দুষ্টুমি। আর এই সব কিছুর সাক্ষী হয়ে রইল, এই যে কাজীপাড়া, তার সকালের স্নিগ্ধ কোমল আলো, মৃদু বাতাস, পিচঢালা কালো রাস্তা আর এই যে, এই বড় বড় ইট পাথরের দালান।

....

নাবিলার ঘুম ভাঙল ঠুকঠাক শব্দে। এই শব্দ এই বাড়িতে নতুন কিছু না। বরং নিত্যদিনের কাজ, অভ্যাস, বাড়ির প্রতিটা সদস্যের মতোই পরিচিত। আর এই পরিচিত শব্দে নাবিলার তেমন ভাবান্তর হলো না। ভাবান্তর হলো হিমশীতল রুমে। রাতে ছিল প্রচণ্ড গরম। এসির পাওয়ার জন্মের মতো কমিয়ে, কখন যে চোখ লেগেছে বুঝতে পারেনি। সকালের দিকে থাকে এমনিতেই আবহাওয়া ঠান্ডা, তার মধ্যে এসির এই হিমশীতল হাওয়া । কম্বল গায়ে থাকতেও কাঁপুনি অনুভব হচ্ছে।

তখনই আসমানি খালা জানালা খুলে দিলেন। তিনি কোনো কাজই নিঃশব্দে করতে পারেন না। এই কাজটাও পারলেন না। মাথার কাছে জানালা। খুটখাট করতে করতে, আরও সঙ্গে কী করলেন কে জানে, ধুপ, ধাপ’ শব্দ হতেই লাগল। আর এই শব্দে নাবিলার ঘুমের ধফারফা হয়ে গেল।

সে রাতে ঘুমায় বলতে গেলে প্রতিদিনই শেষ রাতে। কালও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ড্রয়িংরুমের আড্ডা কখন শেষ হয়েছে, তার জানা নেই। তবে সে কারেন্ট ফিরতেই চলে এসেছে। এসে যা করে, তাই করেছে। কিছুক্ষণ বারান্দায় বসেছে, বই পড়েছে, শেষ রাতে পাশের বারান্দার গুনগুন গান থেকে বাঁচার জন্য কানে ইয়ারফোন গুঁজেছে। তারপর মোবাইলের গান শুনতে শুনতে কখন চোখ লেগেছে, টেরই পায়নি।

টের পেল একেবারে এই যে আসমানি খালার বদৌলতে। তার ঘুম কম। যতটুকু ঘুমায়, সেটুকুও ছাড়া ছাড়া। তবে কাল রাতে যেটুকু ঘুমিয়েছে, একটানা। তার ঘুমের রেকর্ড হিসেবে, শান্তির ঘুম বলা যেতে পারে। তাই হয়তো শরীরটা আজ বেশ ঝরঝরে লাগছে।

তখনই আবার শব্দ হলো। না, এবার জানালা না বরং টেনে বারান্দার দরজা খোলা হচ্ছে। এই দরজা ধীরে সুস্থেও খোলা যায়। তবে ধীর, সুস্থতা আসমানি খালার রেকর্ডে নেই। যেই জিনিস নেই, সেটা আশা করা বোকামি।
নাবিলা সেই বোকামি করল না। বরং সাথে সাথে চোখ খুলে তাকালো। ঘুম ভাঙলে, চোখ আর বন্ধ করে থাকতে পারে না। তাই আজও পারল না।

আসমানি খালা নিজের মতো বারান্দায় গিয়ে পরিষ্কার করলেন। নাবিলা দেখতে দেখতে উঠে বসল। তার বড় চুল ভালো লাগে না, তাই সব সময় কাঁধ-ছোঁয়া। সেই চুল টেনে টুনে খোঁপা করল।

একটু বড় হলেই নিজের চুল নিজেই কেচাং। ফ্যাশন ট্যাশন এখন আর তার মধ্যে কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে নোভার আবার কোমর ছোঁয়া চুল। এই চুল সে বড়ই যত্ন করে। অবশ্য শুধু চুল না, তার সবকিছুকেই যত্ন করতে খুব পছন্দ করে।

নাবিলাও অবশ্য এক সময় এমন ছিল। তার চোখ থেকে কখনও কাজল মুছে যেত না, হাওয়া লাগলেই কোমর ছোঁয়া চুলগুলো বাতাসে উড়ে বেড়াতো। কপালে প্রায়ই থাকত কালো ছোট একটা টিপ। চোখে, মুখে, ঠোঁটে থাকত উপচে পড়া লাবণ্য।

নাবিলা ভাবতে ভাবতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল। তখনই সেই বন্ধ চোখের পাতায় ভেসে উঠল একটা হাসি হাসি মুখ। খুশিতে ঝিলমিল দুটো চোখ। যেই চোখ আর হাসি একমাত্র নাবিলাকে দেখেই হাসত। সেই হাসি হাসি চোখ দুটো দেখতে দেখতে নাবিলার সামনে সেইদিন অপূর্বর মনিটরে দেখা চোখদুটোর সাথে মিশে গেল। আর যেতেই ফট করে চোখ খুলে তাকাল।

আসমানি ঝাড়ু হাতেই, নাবিলার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, -- কী হইছে?

নাবিলা সাথে সাথেই দু’পাশে মাথা নাড়ল। আসমানি ফিরে আবার ঝাড়ু দিতে দিতে বলল, -- ধ্যানে পড়ে বইসো। আগে এসির পাওয়া বাড়াও। বরফ পড়া শুরু হইল বলে।

নাবিলা হালকা হাসল। আসমানি সেই হাসি দেখল। প্রাণখোলা হাসি না, তবুও হাসলে মেয়েটাকে এতো ভালো লাগে! তাই মনে মনে সাথে সাথেই বলল, -- মাশাল্লাহ! আল্লাহ, এই ভালো মেয়েটার সব দুঃখ এই হাসির মতোই ফুটাইয়া দাও। যেই মেয়েটার রাগ নাই, জেদ নাই, এই যে কাজের কামলা। কখনো সেই নজরে দেখে নাই। অসুখ বিসুখ হইলে রাত জেগে মাথার কাছে বসে থাকে। নিজের খাওয়ার, কাজের ঠিক নাই। বাকি সবার কি সুন্দর খেয়াল রাখে। আর এই ভালো মনের ভালো মেয়েটার কপালে সব সুখ ফুলের মালার মতো গলায় ঝুলাইয়া দিও।

নাবিলা হাত বাড়িয়ে এসির পাওয়া বাড়ালো। আসমানি মনে মনে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, -- সকালের নাস্তায় পাউরুটিই খাইবা নাকি?

নাবিলার দাঁতে ব্যথা নেই, তবে ডাক্তার দু’দিন একটু সাবধানে থাকতে বলেছে। তবু পাউরুটি খেতে হবে, এমন কিছু নেই। তবে কাল ভাত খেতে ইচ্ছে করেনি, তবে এখন করছে। তাই মাথা দু’পাশে নেড়ে বলল, -- ভাত খেতে ইচ্ছে করছে, খালা। পানি ভাত। ঐ যে তুমি আলুভর্তা, শুকনো মরিচ ডলে খাও, সেই রকম।

এই বাড়িতে সকালে ভাতের ঝামেলা নেই। নোভা খায় কিসের ওটস-ছাতার মাথা। বাকি সবাই পরোটা। তবে এই শহরের খাওনে তার মন ভরে না। তাই প্রায় সময়ই ফ্রিজের কড়কড়া ভাতে পানি দিয়ে চেটেপুটে খেয়ে ফেলে। এই মেয়ের এখন সেই ভাতই খেতে ইচ্ছে করছে। পাগল হলে যা হয়। তাই আগের মতোই ঝাড়ু দিতে দিতে বলল, -- খাইবার মন চাইলে খাইবা, এটা আর এমন কী? ভালো কথা, তোমার কি কিছু খোয়া গেছে নি?

নাবিলা দু’পাশে মাথা নাড়ল। আসমানি ঝাড়ু রেখে আঁচলের গিট খুলে কিছু বাড়িয়ে দিল। দিতে দিতে বলল, -- ঝাড়ু দিতে গিয়ে দরজার সামনে পাইলাম। তুমি তো কালকে সেখানেই ধপাস করে পড়ছিলা। ভাবলাম, তোমার কিছু কি না। অবশ্য দামি কোন জিনিস না, স্টিলের। তবুও দেখো।

নাবিলা হাত বাড়িয়ে নিল। নিয়ে ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতের দিকে তাকাল। চিকন একটা চেইন। না, স্বর্ণের না। একদম সাদা, চকচকে। আর যেটা বড় কথা, চেইনটা ছেঁড়া।

এমন চেইন প্রায় সময়ই রাস্তার বখাটে বা ছাপরিদের গলায় ঝুলতে দেখা যায়, নয় বাংলা ছবির ভিলেনদের। অবশ্য এই চেইনটা একটু অন্যরকম। ছাপরিদের চেইনগুলো মোটা শিকল টাইপের হয়। এটার সেই রকম না, ডিজাইনটা অন্যরকম। সচরাচর এমন ডিজাইন চোখে পড়ে না। কাছে নিয়ে খেয়াল করলে বোঝা যায়, আমরা সুই-সুতোয় ফুলের মালা যেমন একটার পর একটা গাঁথি, ঠিক সেই রকম। অজানা কোনো ফুল, ধাতুর রূপে একটার পর একটা গাঁথা হয়েছে। তবে এত সূক্ষ্মভাবে, দূর থেকে দেখলে চিকচিক করা শুধু চিকন পাতলা একটা চেইন ছাড়া কিছুই নজরে পড়ে না। কিন্তু যত কাছে নেওয়া যায়, ততই মুগ্ধ করে।

নাবিলা মুগ্ধ হলো কি না বোঝা গেল না। সে আগের মতোই ফিরিয়ে দিয়ে বলল, -- এটা আমার না, খালা।

-- তো কার?

নাবিলা উত্তর দিল না। চেইনটা কার, সে জানে। হঠাৎ ধাক্কায় পড়ার সময় সে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল। তখনই হাতে কিছু একটা লেগেছিল। হয়তো এই চেইনটাই। সে চুপচাপ উঠে বাথরুমের দিকে গেল।

নাবিলা যেতেই আসমানি নিজের মতোই বেরিয়ে এলো। বড় ভাই আইপিএস খোলার লোক এনেছে। খুলে ঠিক করাতে নিয়ে যাবে। পুরোনো হয়ে গেছে, চার্জ আর মনে হয় নিতে পারে না। সেই খোলাখুলি কিছুক্ষণ উঁকিঝুঁকি মেরে দেখল।

আসাদুজ্জামান দেখে বলল, -- অপূর্বের রুমের সামনে গিয়ে ঠুকঠাক করিস না। কিছুক্ষণ আগে ঘুমালো। নিজে থেকে না ওঠা পর্যন্ত ডেকে তোলিস না।

আসমানি মুখ বাঁকালো। তার না কত ডেকে তোলার শখ! সে মুখ বাকিয়েই বলল, -- আপনার কিছু খোয়া গেছে নি?

আসাদুজ্জামান দু’পাশে মাথা নাড়ল। এই বাড়িতে কিছু হারানোর চান্সই নেই। নাবিলা আছে, যেখানেই থাক, সময় মতো সব কিছু জায়গামতো এসে হাজির।

আসমানি আর সেখানেও দাঁড়াল না। স্বর্ণ টর্ণ হলে নিজেই মেরে দিত। এই দুই টাকার ছেঁড়া ছাতার মাথা নিয়ে চুন্নির খাতায় নাম লেখে লাভ নাই। তাই নোভার রুমের দিকে গেল। আর কারো জিনিস না হলেও, এই বান্দারই ঠিক হয়ে যাবে। এমন হাবিজাবির জিনিস একমাত্র এইজনই কেনে।

নোভা আজ ভার্সিটিতে যাবে না। অনেক রাতে ঘুমিয়েছে, তাই এখনো ঘুম কাটেনি। তবে কারণ আরেকটাও আছে, দুপুরের পর তারা ঘুরতে বেরুবে। রাতে সবাই প্ল্যান করল। অপূর্ব ভাইয়া কিছুদিন আছে, সেই কয়দিন যাবতীয় কাজ টাজে একটু নড়চড় হবে। তারা ঘুরবে ফিরবে।

সেই ঘোরার বড় ট্যুরের মাঝে কক্সবাজার আর সাজেক আছে। মাঝারিতে আছে তাদের গ্রামের বাড়ি, যেখানে আপাতত বড় চাচা খামারবাড়ি করছে। আর ছোটর মধ্যে ঢাকার আশপাশ আছে। সেই আশপাশের মধ্যেই আজকের গন্তব্য, " নিউ মার্কেট, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, আর শেষ গন্তব্য হাতিরঝিল। সেখান থেকেই ডিনার করে একেবারে ফিরবে।

নাবিল বড়, মাঝারিতে আছে। আপাতত এই থেতাবোতা মুখ নিয়ে ঘর থেকে বেরোবে না। মা আর আপা তো জীবনেও যাবে না। তবে বাবা খুব আমুদে আছে। অনেক দিন পর তিনি মুক্ত বিহঙ্গের মতো উড়ে উড়ে প্ল্যান করছে। তাই এখন বড় চাচা, বাবা, অপূর্ব আর সে। বাদবাকিটা পরে দেখা যাবে।

অপূর্ব ভাইয়ার অবশ্য অনেক কিছুই আগের দেখা। বড় চাচি শৌখিন মানুষ। ছেলেকে নিজের দেশ দেখাবে না, তা হয় নাকি! তাছাড়া বড় চাচার ডিভোর্সের পরপর তারা তো বাইরে যায়নি, গিয়েছে অনেক পরে। এসএসসি ভাইয়া বাংলাদেশেই দিয়েছে। তার নতুন বাবা বিদেশে সেটেল ছিলেন। বিয়ের পরে তাদের নিয়ে গেছেন। সেই ঘরে ভাইয়ার এক বোন আছে।

কি সুন্দর সম্পর্ক তাদের! কত ছবি, কত ভিডিও! কেউ দেখলে বলবেই না, তারা সৎ ভাইবোন। কাল অর্ধেক রাত পর্যন্ত তো এইসবই বসে বসে দেখল। সাথে অপূর্ব ভাইয়ার গল্প। কি সাবলীলভাবে মা, সৎ বাবা, বোন এদের নিয়ে গল্প বলেন! অথচ তার বাবা মা এমন কিছু করলে, সে তো মরেই যেত না হয় কাউকে মেরে ফেলত। এই যে একসাথের মার পেটের ভাই, সম্পর্কও তো চুলোচুলির মতো।

তাই ঘুম ঘুম চোখে আসমানি খালার হাত থেকে চেইনটা নিয়ে ভালো করে দেখল। দেখতেই চোখ বড় হয়ে গেল। প্লাটিনামের চেইন! আর এটা অপূর্ব ভাইয়ার। প্রথমদিন থেকেই তো গলায় দেখেছে। কাল রাতে গলায় ছিল কি না,
অন্ধকারে খেয়াল করেনি।

আসমানি শুনে কিছুক্ষণ শক খাওয়ার মতো বসে রইল। এই জীবনে এত বড় ঠক মনে হয় জীবনে খায়নি।

নোভা তার অবস্থা দেখে খিলখিল করে হাসল। হেসে লাফিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দাঁড়িয়ে ছেঁড়া জায়গাটা ধরে সুন্দর করে গলায় পড়ল। পড়তে পড়তে বলল, - যার ভাগ্যের জিনিস, তার ভাগ্যে আপনা আপনিই চলে আসে খালা। সেটা যার হাতেই পড়ুক।

চলবে......

আমার গ্রুপের লিংক আর ইবুকের লিংক কমেন্ট বক্সে
https://www.facebook.com/groups/2626455844207369/?ref=share&mibextid=NSMWBT

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 9 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন