#নিষিদ্ধ_প্রণয়
#পর্বঃ০৬
#সোনালিকা_বিনতে_আইজা
মেঘে আচ্ছান্ন ভোরের আকাশ। গগন জুড়ে রাশি রাশি মেঘপুঞ্জ দলবেঁধে ভেসে বেড়াচ্ছে। মেঘের বুক চিরে সূর্যের খণ্ডাংশ অল্প স্বল্প উঁকি দিচ্ছে। সময় এখন ভোর পাঁচটা। সারা রাত আবহাওয়া স্বাভাবিক থাকলেও আচমকা ভোরের দিকে চারিদিক থেকে মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। কৌশিক গাড়ি চালাতে চালাতেই একবার আকাশে নজর বুলালো। হোটেলে পৌঁছাতে আর সর্বোচ্চ মিনিট পাঁচেক সময় লাগবে। কিন্তু আকাশের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে যে কোনো সময় ঢাক ঢোল পিটিয়ে বৃষ্টি শুরু হয়ে যাবে। চিন্তায় কৌশিকের কপালে তিন চারটে ভাজ পড়লো। সাত পাঁচ না ভেবে গাড়ির গতি বাড়ালো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব গন্তব্যে পৌঁছানো প্রয়োজন।
দ্রুতগতির গাড়ির ঝাঁকুনিতে একে একে ঘুম ভেঙে গেলো সকলের। চোখ মেলে চারিদিক গুমোট অন্ধকার দেখে চিন্তায় পড়ে গেলো সবাই। চিন্তিত রাইমা কৌশিকের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো তুবা কৌশিকের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে। গাড়িতে উপস্থিত সকলে জেগে উঠলেও তুবা এখনও ঘুম। যেনো নরম বিছানার আরামদায়ক বালিশে ঘুমাচ্ছে। তুবার মাথা কৌশিকের কাঁধে দেখে মনে মনে হিংসা হলো রাইমার। কিন্তু ভদ্রতার খাতিরে কিছু বলতে পারলো না। চিকন মেয়েলী কন্ঠে বলল,
"আর কতক্ষণ লাগবে কৌশিক ভাই?"
"এসে পড়েছি।"
বলতে বলতে গাড়ি ব্রেক কষলো কৌশিক। গাড়িটা থেমেছে বিশাল বড় আলিশান হোটেলের সামনে। এই পর্যায়ে তুবার ঘুমও ভেঙে গেলো। গাড়ি থামতেই সবাই যার যার মতো তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে পড়লো। বৃষ্টি আসার আগেই সবাই ছুটলো হোটেলের দিকে। গাড়ি জায়গা মতো পার্ক করে কৌশিকও ছুটলো হোটেলের দিকে।
রাতুল সব মিলিয়ে রুম বুক করেছে মোট পাঁচটা। চারটে রুম পর্যায়ক্রমে কৌশিক, নীরব, তুবা আর রিয়ার জন্য। অন্যটা তার নিজের আর মৌমিতার জন্য। মাঝখান থেকে ঝামেলা হয়ে গেলো রাইমাকে নিয়ে। রাইমার আসার কথা আগে থেকে জানা ছিলো না। এজন্য বাড়তি রুম বুক করা হয়নি। এখানে এসেও আর কোনো রুম ম্যানেজ করা যায়নি। শেষে উপায় না পেয়ে রাইমাকে রিয়া নিজের সাথে নিয়ে গেলো। কারণ ও জানে, তুবা অন্তত ওকে নিজের কাছে রাখবে না। লম্বা জার্নি শেষে সবাই ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা করে বিশ্রাম করতে চলে গেলো। আবহাওয়া ভালো থাকলে বিকেলে সবাই ঘুরতে বের হবে।
-
-
সময়টা দুপুরের মাঝামাঝি। হোটেলে এসে সবাই লম্বা একটা ঘুম দিয়েছে। সবার শরীর এখন বেশ চাঙ্গা। মৌমিতার রুমে সবার জন্য খাবার আনা হয়েছে। সবাই মিলে এখানেই খাবে।
সারা রাত জেগে ড্রাইভ করায় কৌশিক এখনও ঘুমিয়ে আছে। খাবার নিয়ে সবাই বসে অপেক্ষা করছে কৌশিকের জন্য। তুবা ছটফট করতে করতে উঠে দাঁড়ালো। ভোরে পৌছানোর পর হালকা নাস্তা করে ঘুমিয়েছিল। এখন দুপুর দুইটা পেরিয়ে গেছে। খুধার জ্বালায় পেটের ভেতর মোচড়াচ্ছে তুবার। থাকতে না পেরে তুবা উঠে দাঁড়ালো। মৌমিতাকে উদ্দেশ্য করে বললো,
"আপু, তোমরা না হয় খেয়ে নাও। আমি কৌশিক ভাইকে ডেকে নিয়ে আসি।"
তুবাকে বাঁধা দিয়ে রাইমা উঠে দাঁড়ালো। চিকন সুরে বললো,
"তুবা, তুমি থাকো। আমি ওনাকে ডাকতে যাচ্ছি।"
বলেই রাইমা উঠে দাঁড়ালো। রাইমাকে উঠতে দেখে তুবার বুকের ভেতর ছ্যাত করে উঠলো। এই মেয়েটা খালি কৌশিকের কাছে যাওয়ার বাহানা খোঁজে। এখন তো তার কৌশিক ভাই ঘুমিয়ে আছে। রাইমা কি ঘুমন্ত কৌশিক ভাইকে দেখতে চাইছে? মনে মনে রাগ হলো তুবার। কৌশিক তুবার স্বামী। তার স্বামীকে অন্য মেয়ে দেখবে কেনো? তুবা রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগেই মৌমিতা রাইমার হাত টেনে ধরে বললো,
"ধুর! তুই আবার কোথায় যাস? তুই আমার কাছে বোস। এই তুবা, ভাইকে ডেকে নিয়ে আয় তো।"
তুবা আর দাঁড়ালো না। ছটফটে পায়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো।
-
-
কোমর পর্যন্ত পাতলা চাঁদর টেনে সটান হয়ে ঘুমিয়ে আছে কৌশিক। সারা রাত টানা ড্রাইভ করায় শরীরটা বেশ ক্লান্ত। এজন্য ঘুমটা বেজায় গাঢ় হয়েছে।
তুবা ধীরে ধীরে পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকলো। আস্তে করে দড়জা আটকে দিয়ে চলে গেলো কৌশিকের কাছে। বিছানার কাছাকাছি গিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখলো কৌশিককে। লম্বা সিল্কি চুলগুলো পুরো কপাল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বাতাসের দাপটে কপাল জুড়ে ওড়াউড়ি করছে। কৌশিকের চুলগুলো তুবার ভিষণ পছন্দের। তুলোর মতো নরম আর সিল্কের মতো মসৃণ। তুবা সুযোগ পেলেই কৌশিকের চুলে হাত চালিয়ে দেয়।
দেখতে দেখতে তুবার নজর স্থির করলো কৌশিকের ঘুমন্ত মুখে। তীরের মতো লম্বা নাকটা শ্বাস প্রশ্বাসে ব্যাস্ত। নিঃশ্বাসের দাপটে প্রসস্ত বুক ক্রমাগত ওঠানামা করছে। তুবা ফ্লোরের উপর হাঁটু মুড়ে বসলো। এক হাতের ওপর শরীরের ভর রেখে সামান্য ঝুঁকে গেলো কৌশিকের দিকে। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে ছুঁয়ে দিলো কৌশিকের উঁচু নাম। আঙ্গুল ঘোরাতে ঘোরাতে নিয়ে গেলো পুরু ঠোঁটে। খুবই সাবধানে ছুঁয়ে দিলো ঠোঁটের নিচের অংশ। ছুঁয়ে দিয়ে নিজেই কেঁপে উঠলো তুবা। তড়িঘড়ি করে সরতে লাগলো।
আচমকা কৌশিক দুই হাতে তুবাকে পেঁচিয়ে ধরে এক উল্টোনে নিচে ফেলে দিলো। তুবার ওপর ঝুঁকে গিয়ে ঘুম ঘুম চোখে চাইলো। মুখটা সামান্য নামিয়ে ফিসফিস করে বললো,
"কি? ঘুমের ফায়দা ওঠাতে এসেছিস জান?"
তুবা থতমত খেয়ে গেলো। চোখ পাকিয়ে বললো,
"তার মানে আপনি ঘুমে ছিলেন না? ঘুমের নাটক করছিলেন?"
"একদম! তুই দড়জা খুলতেই তোর আগমনের আভাস পেয়ে গেছিলাম। তোর গায়ের মিষ্টি গন্ধটা আমার বড্ড পরিচিত। তোকে অনুভব করতে আমার জ্ঞান থাকার প্রয়োজন নেই। সজ্ঞানে অজ্ঞানে দুইভাবেই তোকে অনুভব করতে পারি।"
তুবা নজর লুকাতে মরিয়া হয়ে উঠলো। এলোমেলো ভাবে এদিক সেদিক তাকালো। কৌশিক ফের প্রশ্ন করলো,
"আদর পেতে ইচ্ছে করছে জান? আমাকে আর ভার্জিন থাকতে দিবি না!"
তুবা ডানে বামে মাথা নেড়ে না বুঝালো। কৌশিক ভ্রু কুচকে প্রশ্ন করলো,
"তাহলে? ঘুমের মাঝে জায়গা ছেড়ে অজায়গায় ছুয়ে দিচ্ছিলি কেনো?"
"ধুর! ডাকতে এসেছিলাম আপনাকে। দুপুর পেরিয়ে গেছে। খাবেন না?"
"আমার সবচেয়ে প্রিয় খাবার তো তুই। তোকে খাই?"
"এটাতে পেট ভরবে না।"
"উহুম! ভরবে। পেট মন সবই ভরবে।"
"বাজে বকা বন্ধ করুন তো। খাবেন চলুন।"
কৌশিক জবাব দিলো না। ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে রইলো তুবার দিকে। চোখে মুখে দুষ্টুমির আভাস। মুহুর্তেই তুবার গলায় মুখ ডুবিয়ে দিলো। বিছানার চাদর খামচে ধরে হাসফাস করে উঠলো তুবা। আচমকা তুবার পেটের ভেতর বিকট শব্দে গড়গড় আওয়াজ করে উঠলো। এই আওয়াজের একটাই মানে। তুবার অনেক বেশি খুধা লেগেছে। গড়গড়ে আওয়াজটা কানে পৌঁছাতেই কৌশিক হেঁসে ফেললো। গলা থেকে মুখ উঠিয়ে বললো,
"আচ্ছা বেশ! খাবি চল।"
-
-
ঘন্টাখানিক সময় পর মৌমিতার ঘরে হাজির হলো তুবা আর কৌশিক। ওদের আসতে দেরি দেখে সবাই নিজেদের মতো খেয়ে নিয়েছে। খাওয়ার সময় তুবা আরেক বায়না ধরে বসলো। সে এখনই সমুদ্র পাড়ে হাঁটতে যাবে। কারোর বারন শুনবে না। যদিও ভোরের দিকে আকাশে প্রচন্ড মেঘ ছিলো। কিন্তু বৃষ্টি এখনও আসেনি। তবে মেঘ কিছুটা কেটে গেলেও পুরোপুরি নয়। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাইরে যাওয়ার পক্ষে কৌশিক ছিলো না। রাতুলও দ্বিমত করছিল। পেশায় একজন ডক্টর হওয়ায় সে স্বাস্থ্যের বিষয়ে বেশ সচেতন। সে বেশ কয়েকবার বারন করলো আজ বাইরে যেতে। বৃষ্টি চলে আসলে সবার জ্বর ঠান্ডা বাঁধবে। কিন্তু তুবার জেদের কাছে শেষ মেষ কৌশিককে হার মানতে হলো।
খাওয়া দাওয়া শেষে বিকাল চারটার দিকে সবাই ঘুরতে বের হলো। ওদের হোটেলটা সমুদ্রের কাছেই। হোটেল থেকে সমুদ্র সৈকিত দুই মিনিটের রাস্তা। মৌমিতা আর রাতুল আলাদা ভাবে ঘুরছে। নতুন কাপল। ওদের সবচেয়ে বেশি প্রাইভেসির প্রয়োজন। তাই আর কেউ ওদের বিরক্ত করতে সঙ্গে যায়নি। বাকিরা হাঁটু সমান সমুদ্রের পানিতে হৈচৈ হট্টগোল করছে। নীরব সমুদ্রের পানিতে গোসল করতে নেমে গেছে। রিয়া আর তুবা একে অপরের গায়ে পানি ছোড়াছুড়ি করছে। ওদের থেকে চার পাঁচ হাত দূরে দাড়িয়ে আছে কৌশিক। হাতে একটা সফট ড্রিঙ্কের বোতল। তাতে একটু একটু করে চুমুক দিচ্ছে আর ফিরে ফিরে তুবার হাস্যজ্জল মুখের দিকে চাইছে।
কৌশিককে একা দেখে গুটিগুটি পায়ে ওর কাছে এসে দাঁড়ালো রাইমা। লজ্জায় মাথা নিচু করে রেখেছে। লাজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে ডাকলো,
"শুনছেন?"
বোতলে চুমুক দিতে দিতে ঘুরে তাকালো কৌশিক। ছোট্ট করে জবাব দিলো,
"হুম। কিছু লাগবে?"
"আসলে, আমি রাইডে চড়তে চাই। আমাকে নিয়ে একটু সমুদ্র ঘুরিয়ে দেখাবেন?"
"সমুদ্রে পানি ছাড়া আর কিছুই নেই। এখানে যা দেখছো, মাঝ সমুদ্রেও তাই দেখবে। কোনো পার্থক্য পাবে না।"
"তবুও। আমার খুব শখ আপনার সাথে ঘোরার।"
"শখকে বাক্সে তালা বন্দি করে সমুদ্রেই ছুঁড়ে ফেলে দাও। কারণ তোমাকে নিয়ে রাইডে চড়া সম্ভব নয়। আকাশে মেঘ আছে। বৃষ্টি আসতে পারে।"
সরাসরি প্রত্যাখানে বেশ অপমান বোধ করলো রাইমা। মন খারাপ করে মাথা নিচু করে রইলো। এমন সময় হঠাৎ কৌশিকের ফোন বেজে উঠলো। অফিস থেকে ফোন এসেছে। কৌশিক ব্যাতিব্যাস্ত হয়ে ফোনটা কানে চেপে দূরে চলে গেলো। রাইমার নজর পড়লো হাসিখুশি মুখে পানি নিয়ে খেলতে থাকা তুবার দিকে।। সে তাড়াহুড়ো পায়ে তুবার নিকট পা বাড়ালো।
-
-
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আচমকা আবারও চারিদিক থেকে মেঘ ঘনিয়ে এলো। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেলো এলোমেলো বাতাস। ইতিমধ্যে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। সমুদ্র সৈকতে ঘুরতে আসা সকল টুরিস্ট যার যার মতো ছুট লাগালো নিজেদের হোটেলে। রাতুল সকলের উদ্দেশ্যে চেচিয়ে বললো,
"হোটেলে ফিরে চলো সবাই। ঝড় আসবে মনে হয়।"
বলতে বলতে সবাই ছুটলো হোটেলের দিকে। হোটেলে ফিরে সবাই যার যার রুমে চলে গেছে চেঞ্জ করতে। ইতিমধ্যে সবাই বৃষ্টির পানিতে অর্ধেক ভিজেও গেছে। চেঞ্জ না করলে ঠান্ডা জ্বর আসতে পারে।
কৌশিক ফিরেছে সবার ফেরার মিনিট দুইয়েক পরে। তখন কথা বলতে বলতে অনেকটা দূরে চলে গেছিলো। এজন্য ফিরতে একটু বেশি সময় লেগেছে।
কৌশিক যখন নিজের রুমের গিয়ে চেঞ্জ করছিল ঠিক তখনই ওর দড়জায় টোকা পড়ে। শার্ট পাল্টাতে পাল্টাতেই কৌশিক জবাব দিলো,
"তুবা আয়।"
"আমি রিয়া ভাইয়া।"
তুবার পরিবর্তে রিয়ার কন্ঠ শুনে ভ্রু কুঁচকে গেলো কৌশিকের। ব্যাস্ত হাতে শার্টের বোতাম লাগিয়ে নিজেই দড়জা খুলে দিলো। রিয়া হাত কচলাতে কচলাতে ভেতরে ঢুকলো। চেহারায় তার একগুচ্ছ চিন্তার ভাজ। ভয় ভয় মনে বললো,
"তুবা হোটেলে ফেরেনি ভাইয়া। ওকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।"
আচমকা রিয়ার কথা শুনে বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠলো কৌশিকের। তুবাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না কথাটা সোজা কৌশিকের মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করলো। বাইরে এখন এলোমেলো ঝড় বইছে। সেই সাথে মুশলধারায় বৃষ্টি। এই ঝড়বৃষ্টির মধ্যে কোথায় গেছে তুবা? কোনো বিপদে পড়েনি তো? ভয় আতঙ্কে শরীর ঠান্ডা হয়ে এলো কৌশিকের। দিক বেদিক ভুলে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো হোটেল থেকে।
চলবে?