#রক্ত_রেখার_আড়ালে পর্ব—১৪ (১ম অংশ)
#আয়েশা_শেখ ❌[ কপি করবেন না।]❌
_“আপনার ওয়াইফ তো প্রেগন্যান্ট!”
ডক্টর রিপোর্ট পেপার দেখতে দেখতে বললেন।ডক্টরের কথাটা শান্তর কানে বজ্রাঘাতের মতো এসে লাগল।তবু অপ্রস্তত হাসল।অনুভার দিকে তাকাল একবার,যে এখন হসপিটালের বেডে শুয়ে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে আছে।একটু আগেই ডক্টর এসে ওর চেক-আপ করে গেছেন।শরীর অতিরিক্ত দুর্বল থাকার দরুন স্যালাইন লাগিয়ে দিয়েছেন।
অনুভা কিছুক্ষণ থমকে থেকে হুড়মুড়িয়ে উঠে বসল।তবে মুখে কিছু বলার আগেই শান্ত ডক্টর কে বলল,
_“প্রেগন্যান্ট… আপনি নিশ্চিত, ডক্টর?মানে… আমরা বাবা–মা হতে যাচ্ছি?”
ডক্টর হাসি মুখে কথাটা বললেও ধীরে ধীরে তার হাসি মিলিয়ে গিয়েছে।ভুল জায়গায় ভুল কিছু বলে ফেললেন কিনা ভাবছিলেন।তবে এখন শান্তর কথায় হেঁসে উঠলেন।মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,
_“ইয়েস ইয়াং ম্যান।ইউ আর গোয়িং টু বি আ ড্যাড।”
শান্ত অনুভার দিকে তাকিয়ে প্রশান্তিময় হাসল।অনুভা ডক্টর আর শান্তর কথোপকথনে স্তব্ধ খেয়ে বসে আছে।ডক্টর এবার স্পষ্টতই কড়া কন্ঠে বললেন,
_“বাট আপনার নিজের ওয়াইফের প্রতি আরও সচেতন হওয়া উচিত।হার ব্লাড প্রেসার ইজ ক্রিটিক্যালি লো।আপনি কি যত্ন নিচ্ছেন না?”
_“এখন থেকে নেব,ডক্টর।এখন থেকে নেব।” শান্ত বলল।শান্তর কথায় নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালেন ডক্টর।বললেন,
_“ আজ রাত এখানেই থেকে যান।স্যালাইন শেষ হোক।আর কিছু ঔষধ লিখে দিচ্ছি নিয়ম করে খাওয়াবেন।” এই বলে ডক্টর চলে গেলেন।
ডক্টর চলে যেতেই অনুভা শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি না,শান্ত।”
_“মাহভিন!তুমি প্রেগন্যান্ট…” শান্তর বাক্য শেষ হতে না হতেই অনুভা শক্ত গলায় বলল,
_“আমি এই বাচ্চা রাখব না।”
শান্ত ভ্রু কুঞ্চিত করে বলল,
_“মানে?”
_“ঠিক শুনেছেন।আসবে না সে।”
শান্ত অনুভাকে এত স্বাভাবিক দেখে বলল,
_“তুমি আগেই জানতে?”
_“কিছুটা বুঝতে পেরেছিলাম। তবে আজ নিশ্চিত হলাম।আর আপনার ডক্টরের সামনে এমন নাটক করার প্রয়োজন ছিল না।”
শান্ত না বোঝার মতো করে বলল,
_“ কোনটার কথা বলছ?”
_“নিজের বাচ্চা হিসেবে পরিচয় দেওয়া।”
_“ তাহলে কী করতাম? বলতাম ওর বাবা নেই? ওর বাবা ওর মা'কে ফেলে চলে গেছে?” শান্ত একটু জেদ দেখিয়ে বলল।
অনুভা থেমে গেল।শান্তকে এই কথার পরিবর্তে কী বলা যায় খুঁজে পেল না।কথা ঘুরিয়ে বলল,
_“যাইহোক,আমি ওকে পৃথিবীতে আনতে চাই না।”
_“কেন?”
_“আমি চাই না আমার এই সন্তান পৃথিবীতে আসুক।কারণ সে কেবল আমার নয়,আর যার সে একজন অমানুষ।” অনুভা দৃঢ় গলায় বলল।
_“কিন্তু যে আসবে সে তো মানুষ!তাকে কেন এই শাস্তি দেবে?একটা নিষ্পাপ প্রান কে তুমি মে'রে ফেলতে চাইছো,মাহভিন?”
অনুভা পূর্ণ দৃষ্টিতে শান্তর দিকে তাকাল।
_“কার পরিচয়ে আসবে? কোন পরিচয়ে বড় হবে?”
শান্ত অনুভার কাছে এগিয়ে এলো।
_“ যদি বলি আমার পরিচয়ে বড় হবে।”
_“ আমি কারও দয়া নিতে চাই না।আর এটা অসম্ভব।” অনুভা সঙ্গে সঙ্গে বলল।
_“ দয়া নয়, মাহভিন! এটা দায়িত্ব। তোমার ওপর নয়,ওর ওপর।”
অনুভার কন্ঠ ভেঙে এলো।চোখের কোণে থাকা জল লুকাতে চাইল,
_“ না,আমি আপনার জীবনটা ভারী করতে চাই না।যে ভুল আমার, তার বোঝা আমি আপনার কাঁধে দিতে পারি না।”
শান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
_“তুমি বোঝা চাপাতে চাইছ না, আমি নিজেই তুলে নিতে চাইছি। এই পার্থক্যটা বুঝতে চেষ্টা করো।আর কীসের ভুলের কথা বলছ তুমি? ও কোনো অবৈধ সন্তান না।”
_“ আমি ভয় পাই শান্ত।আমার জন্য না…ওর জন্য।আমি এত বড় দায়িত্ব নিতে পারব না।কখনোই না।” অনুভা দু'দিকে মাথা নাড়িয়ে অস্থির গলায় বলল।
_“ দায়িত্বের ভার আমার ওপর ছেড়ে দাও।শুধু এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিও না যার হিসেব তোমাকে পরকালে দিতে হয়।”
_“ আপনার রাগ হচ্ছে না,শান্ত?” অনুভা মাথা তুলে বলল।
_“ রাগ? রাগ কেন?” শান্ত জানতে চাইল।
_“ কেন আমার জন্য এত কিছু করছেন?আপনি জানেন, আমি আপনাকে কখনও ভালোবাসতে পারব না। তবুও কেন?”অনুভা কণ্ঠটা শক্ত রাখতে চেয়েও,শেষের দিকে ভেঙে পড়ল।
শান্তর মুখে ম্লান হাসি। অনুভার গালে আলত হাত রেখে বলল,
_“ এই কেনোর উত্তর তুমি জানো।ভালোবেসো না আমায়।প্রয়োজন নেই তার।শুধু তোমার পাশে থাকতে দাও।”
_“ এতে যে আপনি আরও শেষ হয়ে যাবেন।”
শান্ত ঠোঁটে আবারও মৃদু হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সে তো সেদিনই শেষ হয়ে গেছে যে দিন নিজের ভার্সিটির স্কুল শাখায় পড়ুয়া মাহভিনকে দেখেছিল।সে দিন অজান্তেই মেয়েটা তার হৃদয় ছিঁড়েছিল। সেই দিন থেকেই তার পৃথিবী ভাঙতে শুরু করেছে।ভেঙে ভেঙে আজ এই অবধি।একেবারে হারিয়ে ফেলার চেয়ে সামনে থেকে চোখের দেখা অন্তত ভালো। পরে কী হবে তা না হয় সময়ই বলে দেবে।
শান্ত অনুভাকে আর কিছু বলল না। অনুভাকে অপেক্ষা করতে বলে চলে এলো খাবার কিনতে।রাত দের’টা বাজে এখন।হসপিটালের ক্যান্টিনেই গেল খাবারের জন্য।যাওয়ার পথে কয়েকজন খেলায় করল ছেলেটা বার-বার চোখের জল মোছার চেষ্টা করছে।হসপিটালের মানুষ গুলো ভাবল হয়তো ছেলেটার আপন কেউ খুব বেশি অসুস্থ।কিন্তু শান্ত কি সে-রকম ছেলে? যে মুহূর্তে কোনো কিছুতে ভেঙে পড়বে, কিংবা কোনো ঘটনায় অবাক হবে? না। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে শান্ত।বড্ড আদরেই বড় হয়েছে সে।অতি আদরে বিগড়েও গিয়েছিল। তার চোখে কখনো কারও অসুস্থতা জল আনতে পারেনি, হৃদয়েও দাগ কাটতে পারেনি। আর আজ হসপিটালের লোকগুলো তার চোখে জল দেখে কতকিছু ভেবে ফেলেছে।
শান্ত নিজেও জানে না চোখে বার-বার জমে ওঠা জলের কারণ।হয়ত যাকে সে এত গভীরভাবে ভালোবাসে, তার গর্ভে অন্য কারও অস্তিত্ব।এই ব্যথা ভেতরে চেপে রাখা ছাড়া কোনো সমাধান নেই।
—
পরদিন সকালে শান্ত অনুভাকে নিয়ে ফ্লাটে ফিরে আসে।অনুভাকে ফ্লাটে রেখে তার জন্য নতুন কিছু কাপড় কিনে আনে।এছাড়াও অনুভার সুস্থতার জন্য ঔষধ ও বিভিন্ন হেলদি ফল-ফুড নিয়ে আসে।অনুভা এসব দেখে নাক সিটকায়।তার এখন খাবার দেখলেও বিরক্ত লাগে।
_“ এমন করে লাভ নেই। ডক্টর কী বলেছেন শুনোনি?” শান্ত বলল।
_“কী করব খেলেই সব বেড়িয়ে আসে।তখন শরীর আরও দূর্বল লাগে।”
_“তবু খেতে হবে।”
অনুভা শান্তর হাত থেকে ঔষধ আর রিপোর্ট পেপার নিলো।ড্রইং রুমের টেবিলে এখনও ডিভোর্স পেপার পড়ে আছে।অনুভা এখনও সাইন করেনি।অনুভা দু'টো পেপার একত্রে করে বলল,
_“দেখেন আমার কী ভাগ্য! যেদিন আমার ডিভোর্স পেপার এলো, সেদিনই জানলাম তার সন্তান আমার গর্ভে। নিজের ভাগ্যের তারিফ করতে হয়!”
_“ সাইন করছ না কেন?” শান্ত এগিয়ে গিয়ে বলল।
_“ কাল রাতে অনেক ভেবেছি।”
_“ কী নিয়ে?”
অনুভা ডিভোর্স পেপার ইশারা করে বলল,
_“ আমি এখানে এটা কারও জানার কথা না।কীভাবে এই ঠিকানায় পৌঁছাল তা নিয়ে আমার দ্বিধা আছে।”
শান্ত উপর নিচ মাথা নাড়াল।
_“ থাকা স্বাভাবিক।তোমার ইচ্ছা।”
দু’দিন পর রাতে শান্ত তার মা'কে কল করে।ফ্রান্সে তখন আনুমানিক বিকেল চারটা বোধহয়।শাহানা বেগম কল ধরতেই শান্ত বলে,
_“ মম!তোমাকে একটা কথা জানাতে চাই।”
_“ কী এমন কথা? শুনি বল।” ওপাশ থেকে শাহানা বেগম বললেন।
শান্ত এক মুহুর্ত চুপ থেকে গমগম আওয়াজে বলল,
_“ মম,আমি বিয়ে করেছি।আর আমার ওয়াইফ প্রেগন্যান্ট।আশা করি এতে তোমাদের কোনো সমস্যা নেই।আর আমি ওকে নিয়েই ফ্রান্সে যাব।”শান্ত এক দমে বলল।
ওপাশে থাকা শান্তর মায়ের মাথায় বোধহয় আকাশ ভেঙে পড়ল ছেলের এমন কথায়।
_“ মম! শুনতে পাচ্ছ?” শান্ত আবারও বলল।
_“ সব বিষয় নিয়ে মজা ভালো লাগে না শান্ত!” শান্তর মা মেজাজ দেখিয়ে বললেন।
শান্তও দৃঢ় গলায় বলল,
_“ আমি যা বলছি সত্যি বলছি।চাইলে তুমি ভিডিও কল দিয়ে নিজের বউ মা কে দেখে নিতে পারো।”
_“ কাকে বিয়ে করেছিস? কোন মেয়ে?”
_“ যার জন্য এতবছর এখানে রয়েছি।” শান্ত দায়সারা জবাব দিল।তারপর বলল,
_“যাইহোক,পাপাকে বলে দিও আমরা শীঘ্রই আসছি।”
শান্তর মা জানাল সে শান্তর বাবাকে কিছু বলতে পারবেন না।
_“ নিজে এসেই বলিস,আমার সাহস নেই।”
_“ মম!”
_“ আমি পারব না।নিজে ঝামেলা করেছিস,নিজেই এসে মিটা।তোর বাবা তোর উপর এমনিতেই রেগে আছেন।জানিনা এটা শুনলে সে কীভাবে রিয়্যাক্ট করবেন।”
শান্ত আর কিছু বলার আগেই শাহানা বেগম বললেন,
_“ সামনা সামনি দেখেই সিদ্ধান্ত নেব। আগে আয়।”
শান্ত বিরক্ত ভঙ্গিতে ফোন বিছানায় ছুরে মারল।
—-
ফ্রান্সের মার্সেই এয়ারপোর্টে পাশাপাশি হেঁটে আসছে অনুভা আর শান্ত।একটু আগেই তাদের বিমান ল্যান্ড করেছে।প্রায় ১৮ ঘন্টার জার্নি ছিল।এর মধ্যে দুবাইতে একবার ট্রানজিট ছিল।শান্তর দু’হাতে দু'টো লাগেজ।কাঁধে অনুভার আরেকটি ব্যাগ।অনুভাকে কিছুই বহন করতে দিচ্ছে না।অনুভা একটা ট্রলি এনে শান্তকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
_“ এটার মধ্যে রাখুন।”
শান্ত অনুভার কথা মতো ট্রলিতে ব্যাগ গুলো উঠিয়ে নিলো।তারপর আবার হাটা ধরল।শান্তর পড়নে শার্টের উপর নেভি ব্লু রঙের জ্যাকেট। অনুভার পড়নে বাদামী একটা লেডিস্ ওভারকোট।
অনুভা চারপাশ ভালোভাবে পরখ করছিল।তার কোনো দিন কল্পনাও ছিল না সময় তাকে এখানে নিয়ে আসবে।যেদিকেই তাকাচ্ছে সব অচেনা লোকজন। যারা ব্যস্ত পায়ে এদিক-ওদিক ছুটছে।কিংবা নিজেদের ব্যাগ সামলাচ্ছে।অনুভার চোখে পড়ল একদম দূরে মার্সেই শহরের পাহাড় আর সমুদ্রের রেখা।যা এয়ারপোর্ট থেকেই দেখা যাচ্ছিল।শহর পরিচিতি না থাকা সত্ত্বেও, সেই দৃশ্য বুকের ভেতর প্রশান্তি বয়ে আনল। তার মনে একটা অদ্ভুত উদ্দীপনা জাগলো,যেন এই অচেনা জায়গার মধ্যে কোনো নতুন গল্প শুরু হতে যাচ্ছে।
ভাবতে ভাবতেই নিজের হাতে কারও স্পর্শ অনুভব করল।পাশে তাকিয়ে দেখল শান্ত তার হাত মুঠোয় নিয়েছে।অনুভাকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখে শান্ত হাটা অবস্থায়ই বলল,
_“ বার-বার পিছিয়ে পড়ছো।কখন না যেন আবার হারিয়ে যাও।”
_“ আমি পিছিয়ে যাচ্ছি না।আপনি দ্রুত হাটছেন।আমার আপনার মতো এতো এনার্জি নেই।”
শান্ত দাঁড়িয়ে পড়ল।অনুভাকে নিয়ে অন্য রাস্তায় হাটা ধরল।
_“ ওদিকে কোথায় যাচ্ছি?” অনুভা বলল।
_“ভুলেই গিয়েছিলাম প্লেইনের খাবার খেতে পারোনি।ক্যান্টিন থেকে কিছু খেয়ে নাও।”
_“খিদে নেই আমার।খাবো না এখন।”
শান্ত জানে অনুভা এগুলোই বলবে।এতোদিন তাই করে এসেছে।তাই এসব কানে নিলো না।ক্যান্টিনে গিয়ে অনুভাকে খাইয়ে তবেই এয়ারপোর্ট থেকে বের হলো।
বাহিরে এসে তাদের গাড়ির অপেক্ষা করছে।যেটা শান্তর মা ড্রাইভার সহ পাঠিয়ে দেওয়ার কথা।গাড়ি এখনও না আসায় শান্তর মনে মনে রাগ হলো।পাশে থাকা অনুভার দিকে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা গম্ভীর হয়ে আছে।শান্ত আরেকটু পাশ ঘেঁষে বলল,
_“ এভাবে থেকো না,তাহলে সবাই ভাববে তোমাকে কি’ডনাপ করে এনেছি।”
_“ আপনি সব কিছু নিয়ে জোর করেন।” অনুভা অন্য দিকে তাকিয়ে বলল।
অনুভার কথায় শান্ত হতাশ ভঙ্গিতে শ্বাস ফেলে বলল,
_“তবুও তো কথা শোনো না।”
অনুভা কিছু বলবে তখনই শান্ত অনুভার হাত চে'পে ধরে আবারও হাটা ধরল।একটা সাদা রঙের গাড়ির কাছে গিয়ে ড্রাইভার কে অসন্তোষ গলায় বলল,
_“You’re so late… I’m frustrated with you.”
_“I’m sorry Sir . আমি ভাবিনি এত আগেই চলে আসবেন।”
অনুভা পেছনে বসল।শান্ত ড্রাইভারের পাশে বসল।ড্রাইভার একটু অবাক হয়ে বলল,
_“স্যার,আপনি ম্যামের পাশে বসলেই পারতেন।”
শান্ত চোখ রাঙিয়ে তাকে গাড়ি চালাতে বলল।ড্রাইভার আর কিছু বলল না। গাড়ি চালাতে লাগল মার্সেইয়ের সরু রাস্তা দিয়ে।অনুভা জানালার ফাঁক গলিয়ে বাহিরের দিকে তাকিয়ে আছে।সেখানে দূরে ভূমধ্যসাগরের নীল রঙ, ছোট ছোট পাহাড় চোখে ভেসে আসছে। তা দেখে তার ঠোঁটে অজান্তেই প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠছে।অনুভা নিজের পাশের জানালা একদম খুলে দিলো।হুড়মুড় করে বাতাস এসে তার চুল এলোমেলো করে দেয়।সে জানালার ধারে থুতনি রেখে বাহিরের প্রকৃতি উপভোগ করতে থাকে।
আর এই সব কিছু সামনে বসে থাকা শান্ত রিয়ার ভিউ মিররের মাধ্যমে দেখছিল। অনুভার জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাসে ভেসে আসা নীল সমুদ্র, পাহাড়, এবং তার প্রশান্তির হাসি। সে গাড়িতে নিজের পছন্দের মিউজিক চালিয়ে দিল আর সিটে গা এলিয়ে দিলো।
__“হতে পারি বদনাম,
হতে পারি ডাকনাম।
হতে পারি সত্যি,
তোমারি জন্যে…
হতে পারি গল্প,তুমি কাছে টানলে।
হতে পারি জানলা..এ হাওয়া,ও তোমার কারণে..
শুধু তুমি চাও যদি,সাজাবো আবার নদী।
এসেছি হাজার বারোনে..
শুধু তোমারি জন্যে..”__
শান্ত চুপচাপ বসে মিররের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকল, মনে মনে অনুভার আনন্দ উপভোগ করছিল। সে কতদিন পর তার মাহভিনের মুখে এইটুকু হাসি দেখল মনে নেই।অনুভা একবার রিয়ার মিররের দিকে তাকাল।শান্তর চোখে কালো চশমা থাকায় বুঝলো না সে ঘুমিয়ে আছে নাকি তাকিয়ে আছে।গাড়িতে চালানো মিউজিকটা তারও ভালো লাগছে, শুনতে শুনতে এক সময় চোখ বুঁজে এলো।
#রক্ত_রেখার_আড়ালে পর্ব—১৪(শেষাংশ)
#আয়েশা_শেখ ❌[ কপি করবেন না।]❌
সাদা রঙের বিলাসবহুল এক ভিলার সামনে শান্তদের গাড়িটা থামল।শান্ত চোখ থেকে চশমা খুলে গাড়ি থেকে নেমে এলো।এয়ারপোর্ট থেকে টানা দু'ঘন্টা সময় লেগেছে।শান্ত এর আগেও কয়েকবার তার বাবার সঙ্গে এখানে এসেছে।শেষবার এসেছিল পাঁচ বছর আগে।কিন্তু তখন বাবার নেওয়া সিদ্ধান্ত শুনে সে আর ফ্রান্সে পা রাখেনি।পূর্বে তবু এদেশে এসে ফ্রান্সের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে আবার বাংলাদেশে ফিরে যেতো। কিন্তু এই পাঁচ বছরে সে ঘুরতেও আসেনি।শান্ত তার বাবার এত বড় ভিলা দেখে মৃদু হাসল।আগের চেয়ে ভালোই উন্নতি করেছে সে।
অনুভার পাশের দরজা খুলতেই দেখল ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা।ড্রাইভারের হাতে সব লাগেজ দিয়ে ভিলার ভেতর পাঠিয়ে দিল শান্ত।তারপর অনুভাকে ডেকে তুলল,
_“চলে এসেছি।”
অনুভা একটু নিরব থেকে বলল,
_“ আমার ভয় লাগছে।আমাকে অন্য কোথাও রেখে আসুন।”
_“ভয়ের কী আছে? আমি আছি তো।” হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
_“নেমে আসো।”
অনুভা তবু বসে থেকে শঙ্কিত স্বরে,
_“ তারা যদি সত্যিটা জেনে যায়?”
_“জানলে আমার কিছু যায় আসে না।” বলেই শান্ত অনুভার হাত চে'পে ধরে গাড়ি থেকে নামাল।
অনুভা শান্তর পাশাপাশি হেঁটে গেল।শান্তর হাত থেকে একবার হাত ছাড়াতে চেয়েও ছাড়াতে পারল না।শান্ত অনুভার হাত চেপে ধরে নির্বিকারভাবে এগিয়ে যাচ্ছিল।হাঁটতে হাঁটতেই চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল অনুভা।এত সুন্দর ভিলা দেখে সে স্বাভাবিকভাবেই অবাক হলো। ভিলার এক পাশ জুড়ে বড় কাচের দেয়াল, ভেতরের আলো স্পষ্ট দেখা যায়। সামনে প্রশস্ত ড্রাইভওয়ে, তার চারপাশে ঠিকঠাকভাবে রাখা সবুজ ঘাস, পরিপাটি আর পরিচ্ছন্ন।
ভিলার সামনেই মাঝারি আকারের একটি সুইমিংপুল।একটু দূরে আলাদা করে রাখা সবজি আর ফুলের বাগান।গোছানো, যত্নে রাখা। শহরের ভেতরে অবস্থান হলেও ভিলাটার চারপাশ নিরিবিলি।অনুভা নিজের বিস্ময় লুকাতে না পেরে বলল,
_“ আপনি এগুলো রেখে একা একটা ফ্লাটে পড়ে থাকতেন?”
শান্ত দাঁড়িয়ে পড়ল।পাশ ঘুরে অনুভার দিকে তাকিয়ে বলল,
_“ যেখানে তুমি নেই সেখানে এসে কী করতাম?”
অনুভা অপ্রস্তত হয়ে পড়ল।এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,
_“আচ্ছা চলুন এখন।”
সদর দরজায় এসে পা রাখতেই কাঁচের এক ফুলদানি বিকট শব্দ তুলে তাদের পায়ের কাছে ছিটকে এসে পড়ল।আকস্মিক শব্দে অনুভা এবার নিজেই চমকে উঠে শান্তর হাত শক্ত করে চে'পে ধরল।শান্ত এক পলক অনুভার ভয়ার্ত মুখের দিকে তাকাল। কপালের ভাঁজ গাঢ় করে সে আর দেরি না করে ভেতরের দিকে এগিয়ে গেল।
ড্রয়িংরুমের মাঝখানে শান্তর বাবা ইয়াসির খান হাতে আরেকটি শো-পিস তুলে ছুড়ে মারতে উদ্যত ছিলেন।কিন্তু সেই সময় ছেলেকে দেখে তাঁর হাত থেমে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাহানা বেগম আতঙ্কে প্রায় জুবুথুবু হয়ে আছেন।
একটু আগেই তিনি সব জানিয়ে দিয়েছেন।ছেলের বিয়ের কথা। জানিয়েছেন, সেই বউ এখন অন্তঃসত্ত্বা।এটাও জানিয়েছেন, তারা মার্সেইতে চলে আসছে,আর এই মুহূর্তে ড্রাইভার এয়ারপোর্টে গেছে তাদের নিতে। শাহানা বেগম ভেবেছিলেন, হঠাৎ ছেলের আগমনের খবর শুনে হয়তো লোকটা খুশিই হবেন। কিন্তু কথাগুলো শেষ হতে না হতেই ইয়াসির খানের মাথায় রক্ত চড়ে বসে।
একটা মাত্র ছেলে তার, এত বড় ছেলে থাকতেও একা হাতে নিজের বিজনেস সামলাতে হয়েছে। আর সেই ছেলে কিনা না জানিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে! একমাত্র ছেলে নিয়ে তার কোনো স্বপ্ন নেই নাকি?
_“ তোমার ছেলে যেন এ বাড়িতে পা না রাখে।” ইয়াসির খান শাহানা বেগমের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বললেন।
শাহানা বেগম আঁতকে উঠলেন। কণ্ঠটা নরম করে বললেন,
_“এভাবে বলো না। অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছে। আগে ঠান্ডা মাথায় বসে কথা বলো।”
ইয়াসির খানের ঠোঁটে তিক্ত এক হাসি ফুটে উঠল। গলা আরও কঠিন হয়ে এলো।
_“কী বলব? আমার নিজের ছেলের ওপর কি আমার কোনো অধিকার নেই? যা মন চায় তাই করে বেড়াবে?”
এক মুহূর্ত থেমে তিনি আবার বললেন,
_“সারাজীবন আমাদের কথার বাইরে চলেছে। আর এখন..বিয়ে পর্যন্ত করে নিয়েছে! এমন অবাধ্য ছেলেকে আমি আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না।” ভারী কন্ঠে কথাগুলো ছুরে দিলেন।
_“তুমি যতই রাগ কর, যতই ক্ষোভ দেখাও,ও আমাদেরই ছেলে।ওর বিয়ে, ওর জীবন আমরা বাধা দিতে পারি না। সব কিছু একটু সহজ ভাবে নাও।” শাহানা বেগম বললেন।
_“ কেমন ছেলে সে আমার? এত বড় ছেলে থাকতেও একা হাতে নিজের বিশাল ব্যবসার ভার টানতে হচ্ছে।এই বসয়ে এসেও নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারি না। এমন ছেলে থাকার চেয়ে না থাকা ভালো।চলে যেতে বলো।”
শান্ত এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনলেও এখন ধূর্ত হাসল,কণ্ঠে অল্প বিদ্রুপের আভাস নিয়ে বলল,
_“ আমি তোমার বিজনেসে হাত লাগাইনি এটাই কী তোমার রাগের কারণ, বাবা? নাকি,তোমার বন্ধুর মেয়ে রেখে নিজ ইচ্ছায় বিয়ে করেছি বলে এমন করছ?”
ইয়াসির খান চোখ গরম করে শান্তর দিকে তাকালেন।
_“ সব জেনেও কেন বিয়ে করেছ? তোমাকে আমি জানাইনি আমার সিদ্ধান্তের কথা?”
_“ আমিও তোমাকে বলেছিলাম একটা বাহিরের কালচারের মেয়েকে আমি বিয়ে করব না।”
শান্তর মা তাদের কথোপকথন কিছু বুঝে উঠতে পারল না। তার চোখ পড়ল শান্তর পেছনে, সদর দরজার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা রমণীর দিকে।মুহূর্তের জন্য তিনি স্থবির হয়ে গেলেন।মেয়েটি বাদামী রঙের অভারকোটে মোড়ানো, শান্ত অঙ্গভঙ্গি আর পরিমিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।দৃষ্টি মেঝের দিকে।চুলগুলো সুনিপুণভাবে মাথার পেছনে খোঁপা করা।মেয়েটার ওমন মায়া ভরা, চোখধাঁধানো সৌন্দর্য থেকে শাহানা বেগম চোখ সরাতে ভুলে গেলেন।তার ছেলের বউ বুঝি এটা? শাহানা বেগম নিঃশব্দে হাসলেন।মেয়েটাকে এক দেখাতেই কেন যেন মনে হলো তার ছেলে ভুল করেনি।
শান্ত আর তার স্বামীর কথোপকথন এড়িয়েই সে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।
_“ কী নাম তোর মা?”
অনুভা ধীরে চোখ তুলল। তার ঘন পাপড়ি, কালো কুচকুচে চোখের মনি, কোমলভাবে বাঁকা ঘন ভ্রু, সবকিছুর দিকে মনোযোগ দিয়ে শাহানা বেগমের চেহারায় আরও মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল।
_“ মাহভিন অনুভা।” অনুভা মিহি স্বরে বলল।
শাহানা বেগম অনুভার গালে হাত রেখে বলল,
_“ এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? ভেতরে আয়।”
অনুভা শান্তর দিকে তাকাল।শান্তকেই তো ঢুকতে দিচ্ছে না আবার সে কীভাবে যাবে? অনুভা ভাবল।
শাহানা বেগম অনুভার হাত ধরে ভেতরে নিয়ে আসার জন্য উদ্যত হলেন।তা দেখে ইয়াসির সাহেব হুংকার তুললেন,
_“ যেখানে ছেলেকেই মেনে নিচ্ছি না,সেখানে ছেলের বউ আসছে কোত্থেকে?চুপচাপ এখান থেকে বের হও।” শেষের কথা শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল।
অনুভার বোধহয় এবার আত্মসম্মানে লাগল।সে শাহানা বেগমের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বের হয়ে এলো বাড়ি থেকে।শান্ত এক মুহুর্ত দেরি না করে অনুভার পেছন পেছন গেল।দ্রুত পায়ে গিয়ে অনুভার হাত টেনে ধরে বলল,
_“ দাড়াও।কোথায় যাচ্ছ?”
অনুভা দাঁড়াল না।পা চালাতে চালাতে বলল,
_“ আমি আগেই বলেছিলাম আমাকে অন্য কোথাও রেখে আসুন।”
শান্ত অনুভার হাত শক্ত করে চে'পে ধরল।নিজের দিকে টেনে এনে বলল,
_“ কথা শোনো না কেন? দাঁড়াও আগে।”
অনুভা কিছু বলল না।নিঃশব্দে হাত ছাড়িয়ে একটু দুরে সরে দাঁড়াল।শান্ত তপ্ত শ্বাস ফেলে বলল,
_“আমিও যাবো, দাঁড়াও এখানে।ব্যাগ নিয়ে আসছি।”
_“ আপনি কোথাও যাবেন না। আমাকে এবার একা ছেড়ে দিন। এতটুকু পাশে ছিলেন এটাই অনেক।”
_“তারপর?” শান্ত বলল।
অনুভা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল।শান্ত আবারও বলল,
_“ কী হলো বলো? তারপর কী?”
_“ হেয়ালি করবেন না।”
শান্ত অনুভার দু বাহু চে'পে ধরে বলল,
_“ আমি করছি না, তুমি করছো।জানো আমি তোমাকে একা ছাড়ব না, তবু এই কথা বার-বার বলতে থাকো।”
অনুভা কন্ঠে রাগ ঢেলে বলল,
_“ কেন ছাড়বেন না? অনেক হয়েছে।আমি চাই না আমার জন্য আপনার পরিবারে অশান্তি হোক। গিয়ে বলুন আপনার বাবাকে, আপনি কোনো বিয়ে করেন নি।”
_“ এ সিদ্ধান্ত তোমাকে নিতে হবে না।এখানে চুপচাপ দাঁড়াও। আমি আসছি।” এই বলে শান্ত আবারও ভেতরে গিয়ে নিজেদের ব্যাগ গুলো নিয়ে আসল।শান্তর মা কান্না-কাটি করলেও ইয়াসির সাহেব কিছুই বললেন না।
–
শান্ত আর অনুভা সেদিন সেখান থেকে চলে আসে। মার্সেই ছেড়ে ক্যাসিস শহরে চলে যায়।সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট নিয়ে থাকতে শুরু করে তারা।এতদিন শান্ত নিজের বাবার টাকা খরচ করলেও সেদিনের পর থেকে আর কোনো টাকা নেয়নি। ক্যাসিসে নতুন জব নেয় সে।অ্যাপার্টমেন্টের কিছু খরচ অনুভাও দেয়।শান্ত নিতে না চাইলেও সেদিন অনুভার দেওয়া শর্ত মনে করে নেয়।
প্রতি মাসে দু’বার করে অনুভাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়।সে যেতে না চাইলেও শান্তর পিড়াপিড়িতে যেতে হয়। প্রতিদিন সকালে সে অনুভার জন্য গরম দুধ নিয়ে হাজির হয়,যেটাতে অনুভা সবচেয়ে বেশি বিরক্ত হয়।খাবারের সময় পুষ্টিকর কিছু বানাতে সাহায্য করে, কখনো কখনো নিজে রান্না করে। অনুভা যেন ক্লান্ত না হয় সে জন্য সারাদিন অফিস শেষে রাতে বাসায় এসে সেই কাজ গুলো নিজেই করে শান্ত।ঔষধ বা প্রেগন্যান্সি সংক্রান্ত পরামর্শ অনুভার থেকে শান্তই বেশি মনে রাখে।
ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে সাথে যাওয়া।ডক্টরের পরামর্শ অনুযায়ী প্রতিদিন সকালে সমুদ্রের তীরে হাঁটতে বের হওয়া।এছাড়াও অনুভাকে মানসিক ভাবে ভালো রাখার জন্য ছোট ছোট সারপ্রাইজ দেওয়া।এভাবেই কেটে যায় নয় মাসের বেশি।
ডক্তরের দেওয়া তারিখ অনুযায়ী আজকে নবজাতককে পৃথিবীর আলো দেখানোর দিন।শান্ত কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি,তাই একদিন আগেই অনুভাকে হসপিটালে ভর্তি করিয়েছিল।
এখন হসপিটালের করিডোরে দাড়িয়ে হাঁসফাঁস করছে শান্ত। এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে আর অনুভাকে নিয়ে যাওয়া ওটি রুমের দরজার দিকে অস্থির চোখে তাকাচ্ছে বার-বার।হাড়কাঁপানো শীতের মধ্যেও শান্তর কপাল ঘেমে উঠছে।শান্তর পাশে শান্তর অফিসের সহকর্মী।সে একটু পর পর শান্তকে স্থির থাকতে বলছে,কিন্তু শান্তর পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি মুহূর্ত তার কাছে দীর্ঘ, অসহনীয় এক অপেক্ষা হয়ে উঠছে।
বারবার মনে হচ্ছে,আজ মাহভিনকে অসীম কষ্টের ভেতর দিয়ে যেতে হবে, অনেক বেশি কষ্ট। যদিও ডাক্তার আশ্বস্ত করেছে সি-সেকশনের প্রয়োজন পড়বে না, তবু শান্তর মন কোনোভাবেই সায় দিচ্ছে না।
কয়েক মুহুর্ত পড়েই ওটি রুমের দরজা ঠেলে দুজন নার্স দৌড়ে এলো।রাত ১২:২২ বাজে তখন।তাদের এক জনের হাতে সাদা টাওয়ালে মোড়ানো সদ্য জন্ম নেওয়া একটুখানি জীবন।শান্তর সহকর্মীর নজর সেদিকে যেতেই সে চুপচাপ শান্তর কাঁধে হাত রাখে, হালকা এক ইশারায় জানিয়ে দেয় অপেক্ষার অবসান।
শান্ত সেদিকে তাকাতেই তার হৃদয় থমকে যায়।বুকের ভেতর এতক্ষণ ধরে জমে থাকা টানটা ঢিলে হয়ে এলো,শ্বাসটা ফিরে পেল সে। চোখের সামনে সাদা টাওয়ালে মোড়ানো ছোট্ট শরীরটা দেখে মাথার ভেতর সব শব্দ থেমে যায়।
_“Congratulations,You have a baby boy and your wife is completely fine.” ব্যস, নার্সের বলা এতটুকু বাক্যেই শান্তর হৃদয়ের ধুকপুকানি থেমে বসন্তের ফুল ফুটে ওঠে।কাঁপা কাঁপা হাতে সে শিশুটাকে তুলে নেয়।চোখে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি।অপলক তাকিয়ে থাকে ছোট্ট প্রানের দিকে।ধীরে ধীরে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে নেয়।নবকণিকার মুখে নাক ঘষে লম্বা শ্বাস টেনে বিরবির করে আওড়াল,
_“ আমার আরাফ! আরাফ খান মাহির!”
একটু পর ডক্টরের অনুমতি পেয়ে শান্ত অনুভার কেভিনে যায়।তার কোলে তার কোলে নবজ্যোতি ঘুমে মগ্ন।অনুভা আধশোয়া হয়ে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছে।চোখ ভিজে আছে তার।শান্তর উপস্থিতি টের পেয়ে সে দৃঢ় গলায় বলল,
_“ ওকে আমার কাছে নিয়ে আসবেন না,অন্তত এখন না।”
—---
_“ দিন পাল্টায়, রঙ বদলায়,
অস্থির মন..
হাতের মুঠোয়, ফেরারি সময়,
শুধু শিহরণ..
ছায়াপথ ধরে,হাতছানি কার
সেই পিছুটান…
তার কথা মনে পড়ে…
তার কথা মনে পড়ে।_”
আর্জেন্টিনাতে রাত ৯:৪০ মিনিট।সন্ধা থেকেই বড্ড অস্থির অস্থির লাগছে তায়ানের।অন্ধকার লাউঞ্জের এক কোণে সে পুরো শরীরের ভার ছেড়ে বসে আছে, মুখে ললিপপ চেপে ধরে।এই ড্রাগ মিশ্রিত ললিপপ আজ-কাল তার অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী। দিনে কতগুলো খায়, তার হিসেব নেই।পুরোপুরি না হলেও খানিকটা স্বস্তি দেয়।কোত্থেকে যেন অদ্ভুত এই গান ভেসে আসছে,যেটা তার মনকে আরও অস্থির করে তুলছে।সে সোজা হয়ে বসে ঘন ঘন শ্বাস ফেলে মাথা চে'পে ধরল। এই অস্থিরতা শুধু আজ না,কয়েক মাস ধরেই। কোনো কাজেই মন বসে না তার। এ নিয়ে এলেনার বাবাও তায়ানের উপর ক্ষিপ্ত।
অন্ধকার রুমের দরজা ঠেলে রিকো প্রবেশ করল।রুমের লাইট জ্বালিয়ে তায়ানের রুম, আর তায়ানের এমন বিদ্ধস্ত অবস্থা দেখে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। এই অবস্থা নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেও কোনো উত্তর মিলে না।যদিও রিকো অনেকটা আন্দাজ করতে পারে।
রিকো কে দেখে তায়ান চোখ মেলে বলল,
_“টিকেট বুক করো,রিকো। আমি আবারও বাংলাদেশে যাব।”
ফেডেরিকো অবাক হলো না।শুধু বলল,
_“এই কয়েক মাসে এই নিয়ে আটবার যাওয়া হবে।”
_“উফফ! যা বলেছি করো।” তায়ান বিরক্ত স্বরে বলল।
_“ সামনে ম্যাচ আছে তায়ান!”
_“ জাহান্নামে যাক।”
রিকো আবারও দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।
চলবে…
আই'ম সো সরি।স্পয়লারে আমি এক বছর সময় দিয়েছিলাম,সেটা এখন আরও বাড়িয়ে দেব।দিতেই হবে। আর আজকের পর্ব কেমন লাগল জানাবেন।অনেকেই গল্প পড়ে লাইক কমেন্ট করেন না।
যাইহোক,দ্রুত পর্ব দিয়েছি এবার আমি চুমু চাই।