ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্ত_রেখার_আড়ালে

পর্ব 53

লেখক: আয়েশা শেখ রিন

#রক্ত_রেখার_আড়ালে অন্তিম পর্ব [শেষ অংশ]
#আয়েশা_শেখ

[ কপি করবেন না।]

বিয়ের দিন থেকে শান্ত নিজের বিছানায় ঘুমায় না। মধ্যরাতে যখন চারপাশ নিঝুম হয়ে আসে, তখন এসে ঘরের এক কোণে থাকা সোফাটায় শরীরটা এলিয়ে দেয়। আবার ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই মেহমিলের ঘুম ভাঙার আগে ওখান থেকে উঠে পড়ে। ডাবল বেডের ওই বিশাল বিছানাটায় ঘুমিয়ে থাকে কেবল দুটি প্রাণ, মেহমিল আর ছোট আরাফ।

সারাদিনের ব্যস্ততায় শান্ত আর মেহমিলের মুখোমুখি দেখা হয় না বললেই চলে। সকালের সূর্য ওঠার আগেই শান্ত নিজের বাবার অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা ছাড়ে, আর ও যখন রাতে বাড়ি ফেরে, ততক্ষণে মেহমিল আর আরাফ ঘুমের দেশে তলিয়ে যায়। এমনকি সপ্তাহের ছুটির দিনেও শান্ত আরাফকে সাথে নিয়ে সারাদিন বাহিরে কাটিয়ে দেয়। কোনো এক বিচিত্র নিয়মে তাদের মধ্যকার এই দূরত্বের সম্পর্কটা এগিয়ে চলেছে।

মেহমিল শান্তর এই উদাসীনতায় খুব একটা অবাক হয় না। ও সব জেনে-বুঝেই এই বাঁধনে জড়িয়েছে। তাই ও নিজেকে শান্তর ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে না। ও নিজেও এখন নিজের ক্যারিয়ার আর পড়াশোনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। প্রতিদিন সকাল সকাল আরাফকে নিজের হাতে খাইয়ে ও ভার্সিটির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায়। বিকেলে বাসায় ফিরে পুরোটা সময় আরাফকে নিয়ে কাটিয়ে দেয়। সন্ধ্যা থেকে আরাফকে নিয়ে খুনসুটি, ওর দেখভাল করা, এসবের মাঝেই মেহমিলের সময় কেটে যায়। তারপর রাতে আরাফকে ঘুম পারিয়ে ল্যাপটপে নিজের বোন আর তায়ানের সম্পর্কে রিসার্চ করে।

তায়ানকে সে ফুটবলার হিসেবে চিনত আগে থেকেই । সে তায়ানের অনেক বড় ফ্যানও। নিজের বোনকে নিয়ে রিসার্চ করেও সে জেনেছে তার বোন আন্তর্জাতিক পুরষ্কার প্রাপ্ত লেডি বাইকার। খুব আফসোস হয় মেহমিলের। সেদিন হসপিটালে আরাফকে রক্ত দেওয়ার জন্য যদি সে একটু সচেতন হতো তাহলে হয়তো তার বোনের দেখা পেত! কেন সৃষ্টিকর্তা ওকে এই সত্যগুলো এত দেরিতে জানালেন? এর চেয়ে তো কিছুই না জানা আগের জীবনটাই অনেক ভালো ছিল। একটা চাদরের মতো অজানা অন্ধকার ওকে ঢেকে রেখেছিল, যেখানে কোনো আফসোস ছিল না। কিন্তু এখন ও চাইলেও আর নিজের সেই চেনা, নির্ভার অতীতে ফিরে যেতে পারবে না। আর না তো আরাফকে ছাড়া থাকতে পারবে।

দীর্ঘশ্বাস নিয়ে মেহমিল ল্যাপটপটা আলতো করে বন্ধ করে, নিচে গিয়ে ফ্রিজ থেকে ডেজার্টের প্লেট নিয়ে এসে আবার ল্যাপটপ অন করল। আজকে সে এত রাতে জেগে আছে একটা বিশেষ কারণে। মাঝরাতে আর্জেন্টিনার ফুটবল খেলা আছে। সেটা দেখে ঘুমোবে।
ওয়েবসাইটে যেতে যেতেই খেলা শুরু হয়ে যায়। একপলক আরাফের ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ল্যাপটপের দিকে নজর দেয়। খেলা দেখায় মনোযোগি হওয়ার চেষ্টা করে। তারপর কী মনে করে যেন আবারও আরাফের দিকে তাকায়। কী মনে করে ও আবারও আরাফের দিকে তাকাল। এবার আর লোভ সামলাতে পারল না, ঝুঁকে গিয়ে বাচ্চাটার তুলতুলে গালে একটা গভীর চুমু খেল। তারপর আবার ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখল। প্লেট থেকে এক চামচ ডেজার্ট তুলে যেই না মুখে দিয়েছে, ঠিক তখনই খট করে রুমের দরজাটা খুলে গেল। চামচটা মুখে থাকা অবস্থাতেই চমকে দরজার দিকে তাকাল মেহমিল।

রুমে ঢুকতেই শান্তর চোখ গেল বিছানার এক কোণে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে থাকা মেহমিলের দিকে। ঘরের আবছা অন্ধকারে দুজনের দৃষ্টির মিলন হলো এক মুহূর্তের জন্য। কিন্তু কেউ কোনো কথা বলল না। রুমে তখন জিরো ওয়াটের একটা নীল রঙের ডিম লাইট জ্বলছিল। শান্ত দেয়ালের সুইচ চেপে মেইন লাইটটা জ্বালিয়ে দিল। মেহমিল ঘুমিয়ে থাকলে ও অবশ্য লাইট জ্বালাত না, সরাসরি ওয়াশরুমে গিয়ে পোশাক পরিবর্তন করে সোফায় গিয়ে শুয়ে পড়ত। কিন্তু আজ মেহমিলকে জেগে থাকতে দেখে ও লাইটটা জ্বালিয়ে আগের নিয়ম মতোই ওয়াশরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে।

খানিক বাদে পাতলা একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে শান্ত যখন বের হলো, মেহমিল আড়চোখে সেদিকে তাকাল। শান্ত ফোনে কিছু একটা স্ক্রল করতে করতে গিয়ে সোফাটায় বসে। নীরবতা ভেঙে মেহমিল হুট করেই বলে বসল,
_“আপনার আর আমার মধ্যে কী জায়গা-জমি নিয়ে কোনো ঝগড়া হয়েছে?”

শান্ত প্রচণ্ড অবাক হয়ে চোখ তুলে মেহমিলের দিকে তাকাল। প্রথমে বুঝতে পারেনি প্রশ্নটা ওকে করা হয়েছে কি না। কিন্তু মেহমিল ওর দিকেই জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে আছে। শান্ত ভ্রু কুঁচকে বলল,
_“না, কেন?”

_“তাহলে আমার সাথে কথা বলেন না কেন? বিয়ের আগে যেটুকু বলতেন, বিয়ের পর তো সেটুকুও বলেন না!”

শান্ত তক্ষুনি চোখ নামিয়ে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। মেহমিলের দিকে ও বেশি সময় তাকিয়ে থাকতে পারে না। কারণ, এই মুখটা সেই মুখের হুবহু প্রতিচ্ছবি, যাকে ভালোবেসে ও নিজের পুরো জীবনটা পার করে দিতে চেয়েছিল। এই মুখে তাকালেই ওর বুকের ভেতর সেই চেনা মেয়েটার স্মৃতি ছাড়া আর কিছুই ভেসে ওঠে না। অথচ সে জানে, এটা সেই মেয়ে না। তাহলে কেন ও এই মুখের দিকে তাকাবে? কেন নিজেকে আর কষ্ট দেবে? শান্ত ঠান্ডা গলায় বলল,
_“তোমার সাথে বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাই না আমি।”

-“কেন পান না?” মেহমিল আনমনেই ফিসফিসিয়ে বলে উঠল।

_“কী বললে?” শান্ত আবারও তাকাল ওর দিকে।

মেহমিল নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
_“কিছু না।”

_“ঘুমাওনি কেন এত রাতে?” শান্ত জানতে চাইল।

_“খেলা দেখছি,” বলতে বলতেই মেহমিল ল্যাপটপের সাউন্ডটা একটু বাড়াল।

_“কীসের খেলা?” শান্ত খুব ভালো করেই জানে, তাও জিজ্ঞেস করল।

_“পছন্দের দলের খেলা! যেখানে আমার অল-টাইম ফেবারিট ফুটবলাররা রয়েছে।”

_“যেমন?”

_“আর্জেন্টিনা আমার পছন্দের দল। আর মেসি আর টিএইচভি হলো আমার ক্রাশ!” মেহমিল একটু বানিয়েই বলল। এদের একজনও ওর কোনো কালের ক্রাশ ছিল না, ও জাস্ট শান্তর প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য বলছে।

‘টিএইচভি’ নামটা শুনতেই শান্তর পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। ও খুব আগ্রহ নিয়ে পুনরায় শুনতে চাইল,
_“কী নাম বললে তুমি?”

মেহমিল ডেজার্টের চামচটা নাড়াতে নাড়াতে বলল, “মেসি…আর টিএইচভি! মানে…তায়ান…”
_“শাট-আপ!” শান্তর গলার স্বর আচমকা ভীষণ কঠোর হয়ে উঠল, _“এই নাম তুমি ভুলেও কখনো তোমার মুখে আনবে না!”

_“ কেন?”

_“ তুমি জানো না কেন নিষেধ করছি?” শান্ত বলল।

মেহমিল আরেক চামচ ডেজার্ট মুখে নিয়ে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,
_“ না, তো! তার সাথে আপনার আবার কীসের শত্রুতা?”

বলতে কষ্ট হলো শান্তর তবু বলল,
_“ ওটাই আরাফের বাবা!”

মেহমিল যেন আকাশ থেকে পড়ল! এমন একটা ভান করে কিছুক্ষণ শান্তর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
_“মানে…ইনিই আপনার এককালের সতিন?”

_“সতিন মানে?” শান্তর চোখ দুটো এবার কোটর থেকে বেরিয়ে আসার জোগাড়।

_“মানে…মানে ওই আরকি!” আমতা আমতা করল মেহমিল। _“আচ্ছা যাই হোক…এখন তো সে বেঁচে নেই। অতীত নিয়ে ভেবে কী হবে? আসুন না, দুজনে একসাথে বসে খেলা দেখি।”

শান্ত রাজি হওয়া তো দূরের কথা, উল্টো এক ঝটকায় মেহমিলের সামনে থেকে ল্যাপটপটা কেড়ে নিল।
_“এসব ফালতু জিনিস দেখার কোনো দরকার নেই, ঘুমাও এখন।”

_“কেন দেখব না? কেন? একটা যৌক্তিক কারণ দেখান আমাকে!”

_“আমি এই জার্সির দল পছন্দ করি না।”

_“সেটা আপনি করেন না, ওটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার! আমি কেন দেখব না?”

_“তুমি দেখবে না! কেন দেখবে না…” শান্ত ক্ষণিকের জন্য একটু থমকাল। কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলল,
_“এমনিই দেখবে না। আমার পছন্দ না, তাই তুমিও দেখবে না। অন্তত আমার রুমে এই দলের কোনো খেলা দেখা চলবে না, ব্যস!”

_“আচ্ছা, বেশ! তাহলে আমি অন্য রুমে গিয়ে দেখছি।” মেহমিল ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে সত্যি সত্যিই অন্য ঘরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়াল।

শান্ত তৎক্ষণাৎ পেছন থেকে ওর হাতটা শক্ত করে টেনে ধরল। রুক্ষ গলায় বলল,
_“অন্য রুমে গিয়েও তুমি দেখতে পারবে না! আমি তোমাকে নিষেধ করেছি না? আমার বাড়িতে এই দলের খেলা তুমি কেন, কেউ দেখতে পারবে না!”

_“আচ্ছা, তাহলে আমি আমাদের বাসায় চলে যাচ্ছি। সকালে না হয় ফিরে আসব।” জেদ ধরে বলে মেহমিল সত্যি সত্যিই দরজার লকটা খুলল।

শান্ত এবার আরও শক্ত মুঠিতে ওর কবজিটা চেপে ধরল। তপ্ত চোখে তাকিয়ে প্রায় শাসানোর ভঙ্গিতে বলল,
_“যেখানেই যাও না কেন, তবু তুমি এই খেলা দেখতে পারবে না। তোমার হাজব্যান্ড এই দল পছন্দ করে না! তাই তুমিও করবে না। আজ থেকে সবসময় বলবে, আই হেইট আর্জেন্টিনা!”

মেহমিল এক অদ্ভুত মুগ্ধ চোখে শান্তর দিকে তাকিয়ে রইল। কী বলল শান্ত? ‘হাজব্যান্ড’? ও নিজের মুখে এই শব্দটা উচ্চারণ করেছে? মেহমিলের কাছে পুরো ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য ঠেকল। রাগের মাথায় হোক বা যেভাবে হোক, বিয়ের এতগুলো দিন পর এসে এই প্রথম শান্ত স্বীকার করল যে সে মেহমিলের স্বামী!

_“আবার বলুন…!” মেহমিল বিড়বিড়াল।

_“কী?”

_“কে এই দল পছন্দ করে না?”

_“আমি।”

_“আমার ‘কে’ পছন্দ করে না?” মেহমিল এবার সরাসরি শান্তর চোখের দিকে তাকাল।

শান্ত ঠোঁট নাড়াল জবাব দেওয়ার জন্য, কিন্তু শেষ মুহূর্তে নিজেকে আটকে নিল। কোনো কথা না বলে ও মেহমিলের হাতটা ছেড়ে দিল। মেহমিল নিজের হাতটা একটু উঁচু করে দেখল, ফর্সা কবজিতে শান্তর আঙুলের শক্ত চাপের কারণে লাল দাগ বসে জখম হয়ে গেছে। সেদিকে তাকিয়ে ও আনমনে একটা মুচকি হাসি হাসল। কিন্তু সেই লাল দাগটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আচমকা ওর ঠোঁটের কোণের হাসিটা মিলিয়ে গেল। শরীর কেমন যেন অবশ হয়ে আসতে লাগল ওর। চোখের সামনে কবজির লাল দাগটা ধীরে ধীরে ঘোলাটে হয়ে গেল। মাথাটা প্রচণ্ড জোরে চক্কর দিয়ে উঠল মেহমিলের। ওর মনে হলো, কে যেন ওকে শূন্যে তুলে তীব্র বেগে ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

শান্ত মেহমিলের হাত ছেড়ে মাত্রই সোফায় গিয়ে বসার জন্য ঘুরেছিল। কিন্তু কী মনে করে যেন আবার পেছনে তাকাল। আর তাকাতেই ওর চোখ দুটো আতঙ্কে বড় বড় হয়ে গেল। এক লাফে ও মেহমিলের কাছে পৌঁছাল। মেয়েটি মাটিতে আছড়ে পড়ার আগেই দু’হাতে ওর কোমর ঝাপটে ধরল।

মেহমিলের মাথাটা ততক্ষণে পেছনের দিকে সম্পূর্ণ এলিয়ে পড়েছে। শান্ত আর এক সেকেন্ড দেরি করলে সে শক্ত মেঝেতে আছাড় খেয়ে পড়ত। মাথা হেলিয়ে থাকা এই চেতনাহীন মেয়েটার মুখের দিকে শান্ত কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আতঙ্কিত চোখে। ওর মনে হলো, এভাবে কোমর ধরে রাখা ঠিক হচ্ছে না, মেহমিলের বাহু দুটো ধরা উচিত। বাহু ধরে মেয়েটাকে সোজা করতেই, মেহমিলের আলগা মাথাটা এসে সরাসরি শান্তর চওড়া বুকে আছড়ে পড়ল। নিঝুম ঘরের নীল আলোয় শান্ত মেহমিলকে বুকে জড়িয়ে ধরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল এক মুহূর্ত। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দনটা এক লাফে যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে তো চলবে না! মেয়েটা যে জ্ঞান হারিয়েছে!

সম্পর্কের এই দূরত্বের মাঝে এমন হুট করে আসা শারীরিক সান্নিধ্য শান্তকে ভীষণ ঘাবড়ে দিল। ও মেহমিলের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুটা জড়তা আর দ্বিধা মেশানো গলায় ডাকল,
_“অনামিকা? কী হয়েছে তোমার? চোখ খোলো!”

মেহমিল তবু চোখ খুলল না। শান্ত খেয়াল করল, মেয়েটার ফর্সা মুখটা কেমন যেন অতিরিক্ত পানসে আর ফ্যাকাশে মেরে গেছে।
শান্ত কিছুটা অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে ওর গালে আলতো করে হাত রাখল। দু-তিনবার মৃদু চাপ দিয়ে ডাকল,
_ “অনামিকা? শুনছো? অনামিকা!”

কোনো সাড়াশব্দ নেই। মেহমিলের শরীরটা যেন একটা তুলোর পুতুলের মতো ওর বুকে ভেঙে পড়ছে। আর দেরি করা ঠিক হবে না বুঝতে পেরে শান্ত এক ঝটকায় মেহমিলকে পাঁজাকোলা করে তুলে গাড়ির চাবিটা কোনোমতে হাত বাড়িয়ে পকেটে পুরল ও। তারপর অবশ মেয়েটাকে বুকে চেপে ধরেই দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে নিচে নেমে এল।

গ্যারেজে এসে গাড়ির লক খুলে পেছনের সিটের দরজাটা টানল শান্ত। খুব সাবধানে, আলতো করে মেহমিলকে পেছনের সিটে শুইয়ে দিয়ে নিজে হনহন করে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গ্যারেজ থেকে বের করতেই শান্তর মনে পড়ল ছোট আরাফ ঘরে একা ঘুমাচ্ছে। একহাতে স্টিয়ারিং সামলে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্পিড ডায়াল থেকে ওর মাকে কল দিল। ওপাশ থেকে ঘুম জড়ানো গলায় মা রিসিভ করতেই শান্ত হন্তদন্ত হয়ে বলল,
_“ মম, তুমি একটু জলদি আমাদের রুমে যাও তো। আরাফ একা ঘুমাচ্ছে, ওর পাশে কেউ নেই। অনামিকার শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ করেছে, আমি ওকে নিয়ে হসপিটালে যাচ্ছি।”

মায়ের ওপাশের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন শোনার আর তর সইল না শান্তর। ফোনটা ড্যাশবোর্ডে ছুড়ে ফেলে এক্সিলারেটরে চাপ দিল। গাড়িটা মাঝরাতের নিঝুম রাস্তা চিরে হসপিটালের দিকে ছুটে চলল।

——

চোখ মেলে মেহমিল যখন নিজেকে সাদা ধবধবে একটা কেবিনে আবিষ্কার করে খানিকটা চমকে উঠল। ওর বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন বাবা, আর সাথে অন্য একজন ডক্টর। মেহমিল ওনাকেও খুব ভালো করে চেনে। তার বাবার বন্ধু এবং মেহমিলের ব্যক্তিগত চিকিৎসার দায়িত্ব থাকা ডক্টর রফিক। শান্ত হসপিটালে ঢোকার আগেই ড. রামিন শিকদারকে ফোন করে মেহমিলের এই হঠাৎ অসুস্থতার কথা জানিয়ে দিয়েছিল। ড. রামিন তখন হসপিটালেই ছিলেন, খবর পেয়ে তিনি তক্ষুনি ছুটে এসেছেন।

মেহমিলের হঠাৎ জ্ঞান হারানোর কথা শুনে ডক্টর রফিক প্রথমে ওকে একটা এমার্জেন্সি স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। ওনার নার্স যখন মেহমিলের হাতটা টেনে ক্যানুলা পরাতে যাবে, ঠিক তখনই ডক্টরের নজর পড়ল ফর্সা কবজিতে বসে থাকা গাঢ় লাল দাগটার ওপর। ডক্টর রফিক ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন,
_“এখানে কী হয়েছে?”

প্রশ্নটা মেহমিলকে করা হলেও পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্তর বুকটা ধক করে উঠল। ও ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে চোখ নামিয়ে নিল। মেহমিল শান্তর ওই থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে মুচকি হেসে বলল,
_“তেমন কিছু না, আঙ্কেল…চলতে ফিরতে এমনি একটু ব্যথা পেয়েছি।”

ড. রামিন শিকদারও শান্তর এই আমতা আমতা ভাব আর মেহমিলের চোখের ভাষা দেখে তার দিকে কিছুটা সন্দিহান চোখে তাকালেন। কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে তিনি মুখে কিছু বললেন না।

ক্যানুলা পরিয়ে স্যালাইন চালু করার পর মেহমিলের ইমার্জেন্সি ব্লাড টেস্টের রিপোর্টটা হাতে এলো। রিপোর্টটা দেখেই ডক্টর রফিক বিরক্ত মুখে ড. রামিনের দিকে তাকালেন,
_“ওর শরীরে ব্লাড তো মারাত্মক লেভেলে কমে গেছে রামিন! ও কি ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছে না?”

বন্ধুর কথা শুনে ড. রামিন বেশ ক্ষুব্ধ আর চিন্তিত চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন,
_“ মামণি, আমি জানতাম তুমি এমন কোনো অবহেলাই করবে। তাই বারবার তোমাকে সাবধান করে দিয়েছিলাম।”

মেহমিল নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় ক্ষীণ গলায় বলল,
_“না বাবা, আমি তো ওষুধ নিয়মিতই খাই।”

ডক্টর রফিক রিপোর্টের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়লেন,
_“নিয়মিত খেলে তো হিমোগ্লোবিন এভাবে ড্রপ করার কথা না! অনেক বেশি কমে গেছে।”

বন্ধুর কথা শুনে ড. রামিনের হঠাৎ মনে পড়ে মাস ছয়েক আগে আরাফকে বাঁচানোর জন্য মেহমিল নিজের রক্ত দিয়েছিল। তিনি একটু অপরাধী স্বরে ডক্টর রফিককে সবকিছু বললেন।
কথাটা শোনা মাত্রই ডক্টর রফিক রেগে আগুন হয়ে গেলেন,
_ “তুই তো জানিস তোর মেয়ের শারীরিক অসুস্থতার ব্যাপারে! তাও এই মারাত্মক রিস্কটা কেন নিতে দিলি?”

ড. রামিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
_“তখন পরিস্থিতিটাই ওমন ছিল বন্ধু। এছাড়া আর কোনো পথ ছিল না।”

_“আচ্ছা, আমি ওর প্রেসক্রিপশনটা চেঞ্জ করে নতুন কিছু ওষুধ ঘুরিয়ে দিচ্ছি,” বলতে বলতে ডক্টর রফিক ফাইল টেনে নতুন ওষুধের নাম লিখতে লাগলেন, “এগুলো একদম নিয়ম মেনে খাওয়াতে হবে। এক বেলাও যেন গ্যাপ না যায়।”

পাশে দাঁড়িয়ে শান্ত এতক্ষণ পুরো কথোপকথন শুনছিল। ও কিছুই মেলাতে পারছিল না। মেহমিলের আসলে কী হয়েছে, ও কেন রক্ত দিলে এতটা রিস্ক, সবকিছু ওর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিল। ও আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে একটু ইতস্তত করে ডক্টর রফিকের দিকে তাকিয়ে মেহমিলের আসল অসুস্থতার ব্যাপারে জানতে চাইল।
ডক্টর রফিক প্রেসক্রিপশন থেকে মাথা তুলে শান্তর দিকে তাকালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন,
_“ওর মূলত ‘থ্যালাসেমিয়া মাইনর’। সহজ কথায়, ও থ্যালাসেমিয়ার একজন বাহক। এই ধরনের মানুষের শরীর সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেক কম লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করে। মেহমিলের রক্তের গ্রুপটা এমনিতেও রেয়ার। তাই আমরা প্রথম থেকেই ওকে কড়া ওষুধের মাধ্যমে কন্ট্রোলে রাখছি, যেন বাইরে থেকে কোনোদিন রক্ত নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়। কারণ ওর মতো রেয়ার গ্রুপের রোগীকে একবার রক্ত দেওয়ার মতো এমার্জেন্সি তৈরি হলে, ব্লাড ব্যাংকে সেই গ্রুপ খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব।”

শান্ত চুপচাপ শুনে গেল ডক্টরের কথা। ডক্টর রফিক প্রেসক্রিপশনটা শান্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে আরও গম্ভীর গলায় বললেন,
_“একদম খেয়াল করে নিয়ম মেনে ওকে ওষুধগুলো খাওয়াবে। এই ‘থ্যালাসেমিয়া মাইনর’ বা বাহক থাকা অবস্থায় যদি ও নিজের শরীরের যত্ন না নেয়, তবে যেকোনো বড় ধকল বা অসুস্থতায় এটা ওর জন্য খুব জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এমনিতেও থ্যালাসেমিয়া একটা মরণব্যাধি রোগ, এর সাথে হেলাফেলা করা আর নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলা একই কথা!”

শান্ত একবার প্রেসক্রিপশনটার দিকে তাকাল, তারপর নজর ফেরাল বিছানায় শুয়ে থাকা মেহমিলের ওই ফ্যাকাশে মুখটার দিকে। এত বড় একটা সত্য ও এতদিন জানতই না! ও একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস চেপে ডক্টরের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল,
_“ওকে ডক্টর, আমি এবার থেকে ওর প্রতিটা বিষয়ের খেয়াল রাখব। কোনো ভুল হবে না।”

হাসপাতালের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ডক্টর জানালেন, মেহমিলের আপাতত আর কোনো বড় রিস্ক নেই। স্যালাইনটা শেষ হতেই তাই বাড়ি ফিরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলেন। ড. রামিনেরও একটু পরেই একটা ইমার্জেন্সি ওটি ডিউটি আছে, তাই তিনি কেবিন থেকে বিদায় নিলেন। শান্ত আর মেহমিল হাসপাতালের বিল মিটিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে পড়ল।

মাঝরাতের সুনসান রাস্তা চিরে গাড়িটা ছুটে চলেছে। গাড়ির ভেতর এক থমথমে নীরবতা। গাড়ি চালাতে চালাতেই শান্ত কিছুটা ক্ষুব্ধ গলায় পাশে বসে থাকা মেহমিলকে জিজ্ঞেস করল,
_“আগে জানাওনি কেন?”

মেহমিল জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল, ও মাথা ঘুরিয়ে শান্তর দিকে চাইল। নির্লিপ্ত গলায় বলল,
_“আমাদের মধ্যে তো কখনো ওইভাবে কথাই হয়নি!”

_“হয়েছিল,” শান্তর চোখ রাস্তার দিকেই নিবদ্ধ রইল,
_“বিয়ের আগে আমাদের কথা হয়েছিল। তখন অন্তত জানাতে পারতে।”

মেহমিলের ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠল। ও একটু বাঁকা চোখে শান্তর দিকে তাকিয়ে বলল,
_“কেন? তখন জানালে বুঝি আমাকে বিয়ে করতেন না?”

শান্তর ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল, ও বিরক্ত হয়ে বলল,
_“এর সাথে এটার সম্পর্ক কী?”

_“সম্পর্ক আছে। একটা অসুস্থ রোগীকে কোন সুস্থ মানুষ সাধে বিয়ে করতে চাইবে, বলুন?”

_“আমার মানসিকতা এত নিচে নয় যে ওসব ভেবে বিয়ে ভাঙব, কিন্তু এটা একটা মেজর ইস্যু, তোমার জানানো উচিত ছিল।”

মেহমিল এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সিটে মাথাটা এলিয়ে দিল।
_“আচ্ছা, ধরে নিলাম জানানো উচিত ছিল। কিন্তু তখন জানাইনি কারণ তখন আপনি আমার কেউ ছিলেন না। এটা আমার পার্সোনাল ম্যাটার, তাই হুট করে আপনাকে জানানোর প্রশ্নই ওঠে না। আর যখন আপনি আমার আইনত কেউ হলেন, তখন তো আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিলেন! আপনিই বলুন, আমি কীভাবে জানাতাম?”

—
পরদিন মেহমিল ভার্সিটির মেইন গেট দিয়ে বাইরে বের হতেই সামনের দৃশ্যটা দেখে ও সত্যি সত্যিই আকাশ থেকে পড়ল! গেটের ঠিক উল্টো পাশে শান্তর গাড়িটা পার্ক করা। আর সেই গাড়ির বনেটে হেলান দিয়ে শান্ত নিজে দাঁড়িয়ে আছে, ওর কোলে খিলখিল করে হাসছে ছোট্ট আরাফ। মেহমিলকে চত্বর পেরিয়ে এগিয়ে আসতে দেখেই আরাফ দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, _“মা…!”

মেহমিল যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। ও দ্রুত পায়ে হেঁটে রাস্তা পার হয়ে এসে এক ঝটকায় আরাফকে নিজের কোলে নিল। ওর কপালে চুমু খেয়ে বলল,
_ “আমার পুচু সোনা! আজকে একদম মাকে সারপ্রাইজ দিয়ে নিতে চলে এসেছো তুমি?”

আরাফ মেহমিলের দুই গাল নিজের ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে চেপে ধরে ওপর-নিচ মাথা নাড়াল, যেন ও-ই এই পুরো প্ল্যানটার মাস্টারমাইন্ড! মেহমিল এবার খানিকটা আড়ষ্টতা নিয়ে শান্তর দিকে তাকাল। কিছুটা দ্বিধা মেশানো গলায় জিজ্ঞেস করল,
_ “এদিকে কোনো দরকারী কাজে এসেছিলেন বুঝি?”

শান্ত পকেটে হাত রেখে খুব স্বাভাবিক কিন্তু একটু ভাবলেশহীন গলায় জবাব দিল,
_“কাজে আসলে নিশ্চয়ই সাথে করে এই পিচ্চিটাকে নিয়ে আসতাম না।”

_“তাহলে?” মেহমিলের চোখ দুটো কৌতুহলে বড় বড় হয়ে গেল।

_“তোমাকে নিতে এসেছি, গাড়িতে ওঠো,” বলেই শান্ত আর উত্তরের অপেক্ষা না করে ড্রাইভিং সিটের দরজা খুলে ভেতরে গিয়ে বসল।

মেহমিল গাড়িতে ওঠা তো দূরের কথা, কয়েক সেকেন্ডের জন্য নিজের জায়গায় একদম জমে গেল। শান্ত ওকে ভার্সিটি থেকে পিক করতে এসেছে? কোনো ড্রাইভার পাঠায়নি, নিজে এসেছে! সে কোলে থাকা আরাফের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, _“আরাফ, তুমি আর তোমার পাপা কি আসলেই আজকে আমাকে নিতে এসেছ?”

আরাফ সেই কথার কী বুঝল কে জানে, তবে ঠিকই মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। এদিকে মেহমিলকে ওভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শান্ত অধৈর্য হয়ে গাড়ির হর্ন বাজাল। সেই তীব্র শব্দে মেহমিলের ঘোর কাটে। তারপর মুখে চওড়া হাসি লুকিয়ে দ্রুত পা চালিয়ে গিয়ে পেছনের সিটের দরজা খুলে ধপ করে বসে পড়ল।

সেদিন থেকে মেহমিল শান্তর কর্মকান্ডে বরাবরই অবাক হতে থাকে। ডক্টরের কথা অনুযায়ী মেহমিলের খেয়াল রাখা। বিয়ের পর থেকে যে শান্ত সকালের সূর্য ওঠার আগেই বাবার অফিসের উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ত, সে এখন মেহমিলের ঘুম ভাঙার আগে ঘর থেকে বের হয় না। সকাল সকাল রান্নাঘরের টেবিলে মেহমিলের ওষুধের ফাইলগুলো সাজিয়ে রাখা এখন শান্তর রোজকার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ডক্টরের কথা গুলো শান্তর মাথায় সারাক্ষণ অ্যালার্ম ঘড়ির মতো বাজতে থাকে।

মেহমিল প্রথম প্রথম বেশ অবাক হয়েছিল। সকালে ডাইনিং টেবিলে এসে যখন ও দেখত, শান্ত নিজে দাঁড়িয়ে থেকে ওর জন্য পুষ্টিকর ব্রেকফাস্ট আর কুসুম গরম দুধ রেডি রাখছে, ও ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারত না। ওষুধ খেতে একটু দেরি করলেই শান্তর গম্ভীর গলার কড়া শাসনে ঘরের দেয়ালও কেপে ওঠে।

শান্তর এই যত্নশীলতা অবশ্য শুধু ওষুধের মাঝেই সীমাবদ্ধ না।
আগে ছুটির দিনে আরাফকে নিয়ে একা ঘুরতে বের হতো। এখন সঙ্গে মেহমিলকে নিয়ে তিনজন মিলে ঘুরতে বের হয়। সারাদিন অফিসে থাকলেও শান্তর একটা ফোন মেহমিলের স্ক্রিনে নিয়ম করে ভেসে ওঠে। খুব সংক্ষিপ্ত কথা, তবু সেখানে লুকিয়ে থাকে তার নিরব দায়িত্ববোধ।

মেহমিল একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, হঠাৎ তার এই পরিবর্তনের কারণ কী? উত্তরে শান্ত বলেছিল,
‘ ছেলে আবারও মা হারাক, এটা আমি চাই না।’

এখন শুধু তাদের মাঝে বিছানা আর সোফার দূরত্বটা বাদে বাকি সব দূরত্ব কমে যাচ্ছে। এভাবে কবে শান্তর সাথে তার পথচলার দু’বছর হয়ে গেল বুঝতেও পারেনি।
-
ওরা তিনজন পার্কের পাশ দিয়ে হাটছে। মাঝখানে আরাফ। ওর বয়স এখন চার বছরের মতো। বাচ্চাটার এক হাত মেহমিলের মুঠোয় আরেক হাত শান্তর মুঠোয়। বরাবরের মতো আজকেও ছুটির দিনে তিনজন ঘুরতে বের হয়েছে। মেহমিলের অন্য হাতে একটা ক্যান্ডি। আরাফ বায়না করে কিনেছিল, কিন্তু দুই কামড় দিয়েই মায়ের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে, অগত্যা মেহমিলই এখন ওটা মুখে দিয়ে হাঁটছে।

নীরবতা ভেঙে মেহমিল শান্তর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে হালকা সুরে বলল,
_ “জেরিনকে বিয়ে করলেও তো পারতেন। বেচারি! আপনাকে না পেয়ে শেষমেশ আপনার ভাই ইজানকেই বিয়ে করে নিল।”

শান্ত সোজা তাকিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই ঠান্ডা গলায় পাল্টা প্রশ্ন করল, _“এখন তোমার খুব আফসোস হচ্ছে ইজানের বিয়ে হয়ে যাওয়ায়?”

_“হ্যাঁ, আফসোস তো হচ্ছেই। তবে ইজানের জন্য নয়, জেরিনের জন্য।”

_“কেন?” শান্ত ওর দিকে তাকাল।

_“আপনার ভাই ইজান একটা খারাপ ছেলে। আমি তো সেদিনও ওকে অন্য একটা মেয়ের সাথে খুব আপত্তিকর অবস্থায় কিস করতে দেখেছি।”

শান্ত একদমই অবাক হলো না, বরং খুব সংক্ষিপ্ত করে বলল, _“আফসোস করো না। জেরিন নিজেও এমন।”

শান্ত কথা শেষ করে জেরিন সম্পর্কে আরও কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই মাঝখান থেকে আরাফ মেহমিলের মুঠো থেকে নিজের হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিল। তারপর পার্কের রেলিংয়ের ওপাশে রাস্তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বেশ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল,
_ “মা! লুক অ্যাট দিস, হি লুক লাইক মাই বাবা!”

মেহমিল আর শান্ত দুজনেই থমকে দাঁড়িয়ে আরাফের আঙুলের নিশানা বরাবর তাকাল। দেখল, ওপাশে একটা মাস্ক আর ক্যাপ পরা অপরিচিত যুবক নিজের গাড়ি থেকে কিছু একটা বের করতে ব্যস্ত। লোকটার অবয়ব বা দাঁড়ানোর ভঙ্গিটা হয়তো দূর থেকে চেনা মনে হয়েছে ওর। মেহমিল ছেলের মনের অবস্থাটা বুঝে মাথা নেড়ে সায় জানাল।

কিন্তু শান্তর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ও ওখান থেকে চোখ ফিরিয়ে বেশ গম্ভীর আর বিরক্ত চোখে মেহমিলের দিকে তাকাল,
_“তুমি ওকে এসব শেখানো এবার বন্ধ করবে?”

শান্তর বিরক্ত হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। সেদিনও ওদের বাসায় লাইনের কাজ করার জন্য একজন ইলেকট্রিশিয়ান এসেছিল। লোকটা কাজ শেষে আরাফকে কাছে টেনে আদর করে নাম জিজ্ঞেস করতেই, আরাফ একদম স্পষ্ট গলায় বলে উঠেছিল
‘তাহলিজ হালিচ আলাপ তাছবান খান মাহিল!’

লোকটা চলে যাওয়ার পর শান্ত যখন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, এই অদ্ভুত বড় নাম ওকে কে শিখিয়েছে? আরাফ তক্ষুনি মায়ের দিকে আঙুল তুলে দিয়েছিল। আর আজ আবার একজন সম্পূর্ণ অচেনা, মাস্ক পরা লোককে দেখে ও নিজের বাবার মতো দেখতে বলছে!

মেহমিল মুখে থাকা ক্যান্ডিটা একপাশে সরিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
_“কী শেখাচ্ছি আমি?”

_“কী আবার! একটা চার বছরের বাচ্চাকে ওইসব অতীত আর এতো বড় নাম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 53 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন