নিষিদ্ধ অনুভূতি
লেখিকা: মাতিয়া আহমেদ তানিশা
পর্ব – ০১
সকাল ৭টা, লন্ডন।
লন্ডনের একটি বিশাল বিলাসবহুল বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে আরহান খান ইজান। বয়স ২৮ বছর। কালো শার্ট, হাতে দামি ঘড়ি আর চোখে একরাশ গম্ভীরতা।
দেশে-বিদেশে তার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য। লন্ডন, ইতালি, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে রয়েছে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
ইজান নিজের ফোনে একটি মেইল চেক করছিল। এমন সময় তার মা মাহনূর খান ঘরে প্রবেশ করলেন।
মাহনূর: ইজান, আজকে আমাদের বাংলাদেশে যেতে হবে।
ইজান: বাংলাদেশে? হঠাৎ?
মাহনূর: নওরীনের কথা মনে আছে? আমার ছোটবেলার বান্ধবী। কত বছর দেখা হয় না!
ইজান: হুম, মনে আছে।
মাহনূর: এবার কিছুদিন ওদের বাসায় থাকব। তুইও আমার সঙ্গে যাবি।
ইজান: মা, আমার কিন্তু অনেক কাজ।
মাহনূর: কাজ তো সারাজীবনই থাকবে। মায়ের জন্য কয়েকটা দিন সময় দিতে পারবি না?
ইজান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— ঠিক আছে। টিকিট বুক করো।
মাহনূর খুশি হয়ে ছেলের কপালে হাত বুলিয়ে দিলেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ।
সকাল ৯টা।
আহমেদ বাড়িতে বেশ ব্যস্ততা চলছে। বাড়ির মালিক নওরীন আহমেদ সকাল থেকেই রান্নাঘরে ব্যস্ত।
তার মেয়ে আরিবা তাজরিন ইরা সোফায় বসে ফোন চালাচ্ছে।
আরিবার বয়স ১৯ বছর। কিছুদিন আগেই HSC পরীক্ষা দিয়েছে। মেয়েটি ভীষণ চঞ্চল, দুষ্টু এবং কথা বলতে ভালোবাসে।
আরিবা: আম্মু!
নওরীন: কী?
আরিবা: আজকে কী রান্না হচ্ছে?
নওরীন: তোর খাওয়ার চিন্তা ছাড়া আর কোনো চিন্তা নেই?
আরিবা: অবশ্যই আছে। যেমন এখন আমার চিন্তা হচ্ছে, দুপুরে কী খাব!
নওরীন: আল্লাহ আমাকে এই মেয়েটা কেন দিল!
ঠিক তখনই ছোট বোন ইফরা জাহান সিঁড়ি দিয়ে নামল।
ইফরা: আপু, অতিথি আসবে না আজকে?
আরিবা: হ্যাঁ, আসবে। তুই আবার কী করবি?
ইফরা: নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হব।
আরিবা: আগে নিজের SSC রেজাল্টের চিন্তা কর।
ইফরা: আপু, তুমি চুপ করো তো!
দুজনের ঝগড়া দেখে নওরীন হেসে ফেললেন।
এমন সময় আরিবার বড় ভাই আরিশ বাড়িতে প্রবেশ করল। পেশায় ডাক্তার। হাসপাতালের ডিউটি শেষ করে এসেছে।
আরিশ: কী ব্যাপার? সকাল সকাল এত চিৎকার কেন?
আরিবা: ভাইয়া, ইফরা আমাকে অসম্মান করছে!
ইফরা: আমি কিছুই করিনি!
আরিশ: তোমাদের দুজনকে নিয়ে একটা হাসপাতাল খুলতে হবে মনে হচ্ছে!
তিনজনই হেসে উঠল।
লন্ডন বিমানবন্দর।
ইজান ও তার মা বাংলাদেশের ফ্লাইটে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মাহনূর: ইজান, নওরীন কিন্তু তোকে ছোটবেলা থেকে অনেক আদর করে।
ইজান: মা, আমি কি ছোট বাচ্চা নাকি?
মাহনূর: আমার কাছে তো তুই এখনো ছোটই।
ইজান মুচকি হেসে মায়ের হাত ধরে হাঁটতে লাগল।
বাংলাদেশ, দুপুর ২টা।
আহমেদ বাড়ির সামনে একটি কালো গাড়ি এসে থামল।
গাড়ির দরজা খুলে প্রথমে নামলেন মাহনূর খান। এরপর নামল লম্বা, সুদর্শন এক যুবক।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট, হাতে ঘড়ি। চোখে সানগ্লাস।
সে আর কেউ নয়, আরহান খান ইজান।
নওরীন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
নওরীন: মাহনূর!
মাহনূর: নওরীন!
দুই বান্ধবী একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন।
নওরীন: এত বছর পর এলি! বিশ্বাসই হচ্ছে না!
মাহনূর: আর বলিস না। এবার অনেক দিন থাকব।
নওরীন: আয়, আয়। ইজান বাবা, কেমন আছো?
ইজান: জি, ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন?
নওরীন: ভালো আছি বাবা। এসো ভেতরে।
ইজান বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল।
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নামছিল আরিবা। হাতে ফোন, মুখে গান গুনগুন করছে।
নওরীন: আরিবা! এদিকে আয় মা।
আরিবা: কী হয়েছে আম্মু?
নওরীন: দেখ, কে এসেছে। এটা আমার বান্ধবী মাহনূর। আর ওর ছেলে ইজান।
আরিবা: আসসালামু আলাইকুম।
ইজান: ওয়ালাইকুম আসসালাম।
নওরীন: আরিবা আমার ছোট মেয়ে। আর ওর বড় ভাই আরিশ ডাক্তার। ছোট বোন ইফরা।
মাহনূর: মাশাআল্লাহ! তোর মেয়েটা তো অনেক বড় হয়ে গেছে।
আরিবা মুচকি হাসল।
মাহনূর: ইজান, এটা আরিবা। তোমার ছোটবেলার বন্ধুর মেয়েকে চিনে রাখো।
ইজান: জি, মা।
আরিবা মনে মনে ভাবল,
বাহ! মানুষটা তো কথাই বলে না।
ইফরা পাশে এসে ফিসফিস করে বলল,
— আপু, ভাইয়াটা দেখতে কিন্তু বেশ সুন্দর!
আরিবা: তুই চুপ কর। সবকিছুতেই তোর এত আগ্রহ কেন?
ইজান পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। কথাগুলো তার কানে গেলেও কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর।
সবাই বসার ঘরে বসে গল্প করছে।
মাহনূর: নওরীন, আমরা কিন্তু এবার বেশ কিছুদিন থাকব।
নওরীন: থাকবি মানে? তোদের জন্য এই বাড়ির দরজা সবসময় খোলা।
মাহনূর: আর ইজানও এখানেই থাকবে।
নওরীন: অবশ্যই! ওকে তো কোথাও যেতে দেব না।
ইজান: মা, আমার অফিসের কাজ কিন্তু এখান থেকেই করতে হবে।
মাহনূর: তোর জন্য আলাদা ঘর ঠিক করা আছে।
আরিবা পাশ থেকে বলল,
— তাহলে তো আমাদের বাসায় নতুন একজন মেহমানের আগমন ঘটল!
ইজান: সমস্যা?
আরিবা: না তো! আমি আবার সমস্যা কোথায় করলাম?
ইজান: ভালো।
আরিবা মনে মনে বলল,
উফফ! কী রাগী মানুষ!
এদিকে আরিশ বাসায় ফিরে ইজানের সঙ্গে পরিচিত হলো।
আরিশ: হ্যালো, আমি আরিশ।
ইজান: আরহান খান ইজান।
আরিশ: আপনার কথা শুনেছি। আপনার ব্যবসা সম্পর্কে বেশ জানি।
ইজান: ধন্যবাদ।
দুজনের মধ্যে অল্প সময়েই ব্যবসা নিয়ে কথা শুরু হলো।
অন্যদিকে আরিবা আর ইফরা নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে নতুন অতিথি নিয়ে আলোচনা করতে ব্যস্ত।
সন্ধ্যা নামতেই বাড়ির পরিবেশ আরও জমে উঠল।
রাত ৯টা, আহমেদ বাড়ি।
ডাইনিং টেবিলে রাতের খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। নওরীন নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করছেন। মাহনূর, ইজান, আরিশ, আরিবা ও ইফরা সবাই খাবার টেবিলে বসেছে।
নওরীন: মাহনূর, তোর জন্য বিশেষ করে কয়েকটা পদ রান্না করেছি। কত বছর পর তোকে নিজের হাতে খাওয়ানোর সুযোগ পেলাম!
মাহনূর: তোর হাতের রান্না আমি এখনো ভুলিনি। লন্ডনে থেকেও এই স্বাদটা মিস করেছি।
আরিবা: আম্মু, আমার জন্যও তো বিশেষ কিছু রান্না করেছ, তাই না?
নওরীন: তোর জন্য প্রতিদিনই তো রান্না করি!
আরিবা: কিন্তু আজকে তো বিশেষ দিন। নতুন অতিথি এসেছে!
আরিশ: অতিথির নাম করে নিজের খাওয়ার ব্যবস্থা করছিস?
আরিবা: ভাইয়া, তুমি সবসময় আমার পেছনে লাগো কেন?
ইফরা: কারণ তুমি বিরক্তিকর!
আরিবা: এই ইফরা, তুই চুপ কর!
ইজান: আপনাদের বাসায় কি প্রতিদিন এমন হয়?
আরিশ: প্রতিদিন না, কোনো কোনো দিন এর চেয়েও বেশি হয়।
মাহনূর হেসে ফেললেন।
মাহনূর: ইজান, বাবা, খাবার নে। এত চুপচাপ বসে আছিস কেন?
ইজান: নিচ্ছি মা।
নওরীন: বাবা, তোমার কী পছন্দ? কোনো বিশেষ খাবার থাকলে বলো।
ইজান: আন্টি, সবই খাই। আপনি যা রান্না করেছেন, সেটাই যথেষ্ট।
আরিবা: বাহ! কী ভদ্র উত্তর!
ইজান: কেন? উত্তরটা কি ভুল হয়েছে?
আরিবা: না, একদম ঠিক। আপনি তো দেখছি কথাও বলতে পারেন!
আরিশ: আরিবা, খাবার খা।
আরিবা: ভাইয়া, আমি তো খাচ্ছিই!
ইফরা: আপু, তোমার প্লেটে তো এখনো খাবার নেই!
আরিবা: তুই আমার প্লেটের দিকে তাকাস কেন?
ইজান নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
মাহনূর: কী হলো ইজান? হাসছিস যে?
ইজান: কিছু না মা।
আরিবা মনে মনে ভাবল,
— লোকটা হাসলেও যে খারাপ লাগে না!
আরিশ: ইজান ভাই, আপনার বাংলাদেশে কত দিন থাকার পরিকল্পনা?
ইজান: আপাতত কয়েক সপ্তাহ। তবে কাজের ওপর নির্ভর করছে।
আরিশ: তাহলে তো আমাদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন সময় কাটবে।
ইজান: হ্যাঁ, আশা করি ভালোই কাটবে।
নওরীন: আরিশ, তুই ইজানকে আমাদের শহরটা ঘুরিয়ে দেখাস।
আরিশ: অবশ্যই আম্মু। কাল সময় পেলে নিয়ে যাব।
আরিবা: আমাকেও নিয়ে যেও ভাইয়া!
আরিশ: তুই গেলে তো ঘোরার চেয়ে কথা বলতেই বেশি সময় যাবে।
আরিবা: সমস্যা কী? কথা বলাও একটা প্রতিভা!
ইফরা: তাহলে আপু আমাদের পরিবারের সবচেয়ে প্রতিভাবান!
সবাই হেসে উঠল।
খাওয়া শেষে মাহনূর ও নওরীন নিজেদের পুরোনো দিনের গল্পে মেতে উঠলেন।
আরিশ ও ইজান ব্যবসা এবং নিজেদের কাজ নিয়ে কথা বলতে লাগল।
আরিবা ও ইফরা খাবার টেবিল গুছিয়ে নিজেদের ঘরের দিকে চলে গেল।
ইফরা: আপু, নতুন ভাইয়াটা কিন্তু অনেক সুন্দর!
আরিবা: আবার শুরু করলি?
ইফরা: সত্যি বলছি!
আরিবা: আচ্ছা, তোর এত আগ্রহ কেন বল তো?
ইফরা: এমন অতিথি তো প্রতিদিন আসে না!
আরিবা: যা, এবার ঘুমা।
অন্যদিকে ইজান নিজের ঘরে এসে ল্যাপটপ খুলল। কিছুক্ষণ কাজ করার পর ফোনে একটি মেইল এল।
ইজান মেইলটি পড়তে ব্যস্ত হয়ে গেল।
এভাবেই আহমেদ বাড়িতে ইজানের প্রথম দিনটি শেষ হলো।
কিন্তু এই বাড়িতে আগামী দিনগুলোতে যে কত নতুন ঘটনা ঘটতে চলেছে, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
চলবে...