অভিমান পর্ব : ১😊
শ্বশুড় বাড়ির কথা মনে হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার বুক চিরে। মাত্র তিনমাস বয়স আমার বিয়ের।
ট্রেন ছুটে চলেছে একের পর এক ষ্টেশন, শহর, গ্রাম, জঙ্গল, পথ, প্রান্তর পিছনে ফেলে। সেই সাথে আমিও পিছনে ফেলে এসেছি আমার ভুলে ভরা কিছু স্মৃতি, অপরিপক্ক ছেলে মানুষী ভাবনা থেকে করে ফেলা কিছু ভুল। সত্যিই কি বোকামি টাইনা করেছি আমি। দাদীর বলা প্রতিটি কথাই আজ আমার কাছে অমোঘ বানী বলে মনে হচ্ছে। এতটাই অবুঝ ও বোকা ছিলাম? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ট্রেনের কামরায় নজর বুলালাম। দুই সিটে একাই বসেছি। কারন আমার বড় ভাই রায়হান দুটো সিটই বুক করে দিয়েছে। অপর পাশের সিটে একজোড়া মধ্য বয়সী দম্পতি বসেছে।
উনারা নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। এরমাঝে ছোট একটা ঘুমও দিয়েছেন উনারা। বয়স হয়েছেতো। কি সুন্দর রসায়ন দুজনের। ট্রেনে উঠার পর থেকেই লক্ষ্য করছি দুজনেরই দুজনের প্রতি চমৎকার যত্নশীল আচরণ। আবারও মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। এতো লম্বা জার্নি করতে আমার সাধারণত ভালো লাগেনা। কিন্তু হুট করেই ঢাকায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি বলে প্লেনের টিকেট পাইনি। আর তাছাড়া এয়ারপোের্ট থেকে মালিবাগ অনেকটাই দুরে। সেই তুলনায় কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে বরঞ্চ কাছে। যেহেতু আমি কাউকে না জানিয়ে ঢাকায় আসছি তাই কমলাপুর স্টেশন থেকে একাই বাসা অব্দি যেতে হবে। স্টেশন থেকে একা আসাটা অনেকটা সহজ মনে হয়েছে আমার কাছে। অবশ্য আমার মামার আমাকে নিতে আসার কথা। মামা উনার পরিবার নিয়ে বনশ্রীতে থাকেন। তিনি বলেছেন স্টেশনে আমাকে নিতে আসবেন। তারপর আমার শশুর বাড়ি অব্দি পৌঁছে দিবেন। শশুর বাড়ির কথা মনে হতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো আমার বুক চিরে। মাত্র তিনমাস বয়স আমার বিয়ের। কিন্তু হাতে গুনে মাত্র পাঁচদিন থাকা হয়েছে শশুর বাড়িতে। এই সময়টুকুতে কেবল মাত্র তিক্ত অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে আমার কোমল মন জুড়ে। যদিও মানবিক দিক থেকে দেখলে সম্পূর্ণ পরিস্থিতিটাই ছিল আমাদের সবারই প্রতিকূলে। চাইলেও স্বাভাবিক ভাবে কোন কিছু আমাদের হাতে ছিলনা। কিন্তু তারপরও আমার মনে প্রশ্ন জাগে আসলেই কি আমি নিষ্ঠুরতম ও স্বার্থপরের মতো আচরণ করেছি? আমার মনের কোনে এখনও দ্বিধাদ্বন্দে জেরবার হয়ে আছে। নিজের দাদির দীর্ঘ জীবন থেকে অভিজ্ঞতা লব্ধ কিছু কথা আমাকে বাধ্য করেছে হুট করেই শশুর বাড়ির পথে রওনা দিতে। বলতে গেলে অনেকটা জেদের বসেই একাই রওনা দিয়েছি সবার মতে আমার বর্তমান জীবনের আসল ঠিকানার উদ্দেশ্যে। আমার আব্বা রাইসুল রহমান। আমার সাথে আসতে চেয়েছিলেন, নিজে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন। এমনকি রায়হান ভাইয়াও চাইছিল আসতে। কিন্তু জেদি আমি কাউকে সাথে আসতে দেইনি। আমার এককথা, যদি আমি সত্যি কোন ভুল করেই থাকি তাহলে সেটা আমায় একাই শুধরাতে হবে। আমার জন্য নিজের বাবা ও ভাইকে কোনভাবেই ছোট করতে চাইনা আমি। তাছাড়া আমার শশুর বাড়ি থেকে শাশুড়ি আম্মা ফোন করে আমাকে জরুরি তলব করে যেতে বলেছেন। অথচ কেউ এসেও আমাকে নিয়ে যেতে পারতো। কিন্তু না। কেউ আসেনি। এমনকি আমার স্বামী মহাশয়, সেওনা। তারা কেউ এখনো পর্যন্ত আমার বাবার বাড়িতে আসেইনি। তাই আমার আব্বা যখন আমার সাথে আসতে চেয়েছিলেন সেটা আমার আত্মসম্মানে লাগে বিধায় আমি তখনি নাকচ করে দিয়েছিলাম। ট্রেন ছুটে চলেছে। ঘন্টা দুই পেরিয়েছে মাত্র। এখনও অনেক লম্বা পথ যাওয়ার বাকি। এরমধ্যে বাসা থেকে ফোন এলে কথা বললাম। কিন্তু ট্রেনের ভিতরে নেটওয়ার্কের বাজে অবস্থা।
তাই সেটা ব্যাগে রেখে দিয়ে গল্প বই পড়তে চেষ্টা করলাম। কিন্তু, মনটা কেমন অস্থির, বিচলিত হয়ে আছে। বইয়েও কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছিনা। অবশেষে আনমনে বাইরের প্রকৃতির দিকে দৃষ্টি রাখলাম। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে নিজের ভাবনার জগতে ডুবে যাচ্ছি।
আমার সামনে ভেসে উঠলো তিনমাস আগের সেই দিনগুলো। যেদিন গুলোয় হঠাৎই আমার রোজ কার স্বাভাবিক দিনলিপিতে বেশ বড়সড় ছন্দপতন ঘটেছিল। আচমকাই জীবনের মোড় ঘুরে সম্পূর্ণ নতুন অচেনা জায়গায় অজানা অচেনা একটা পরিবারের মাঝখানে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল আমাকে। আর আমি দিগ্বিদিক, হতবিহ্বল ও কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা নিয়ে কেবলমাত্র অজানা স্রোতে ভেসে যাচ্ছিলাম।
সেদিন মাত্র ভার্সিটি থেকে ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরে এসেছিলাম। শীত সেদিন রাজশাহী শহরে জাকিয়ে বসেছিল। শৈত্য প্রবাহের কারনে আকাশ সেদিন মুখ গোমরা করে রেখেছিল। প্রকৃতি ধোয়ার মতো কুয়াশায় নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল। কে জানত একটা খবরের মাধ্যমে হঠাৎ করেই শৈত্য প্রবাহের কুয়াশার মতো আমার জীবনটাকেও চেখের পলকেই কুয়াশায় আবৃত করে ফেলবে? অথচ তাই হয়েছিল। এবং এটাই আমার বর্তমান জীবনের চরম একমাত্র অমোঘ সত্যি।
সেদিন বাসায় এসে দেখি আমার আম্মু, দাদি কোথাও যাওয়ার জন্য ব্যাগ গোছগাছ করতে ব্যাস্ত। আমি অবাক হয়ে এগিয়ে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবো তার আগেই দাদি আমাকে দেখে বললেন
" আসছো বুবু, এবার জলদি করে কাপড় চোপড় গুছাইয়া নে। হাতে একদম সময় নাই। রাতেই রওনা দেব। "
আমি বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, " কি বল দাদি? হঠাৎ কোথায় যাব? আর কেন? "
আম্মু ওয়ারড্রব থেকে আমার কিছু কাপড় বের করে বিছানায় রাখতে রাখতে বললেন, " ঢাকায় যেতে হবে আর্জেন্ট। পরে শুনিস। এখন যা কাপড় চোপড় বদলে নিয়ে কিছু খেয়ে নে আগে।"
" কিন্তু আগে বলবাতো হঠাৎ ঢাকায় কেন যেতে হবে? সামনে আমার পরীক্ষা ভুলে গেছ? আম্মু বললেন, " বেশিদিন থাকতে হবেনা। এই কয়দিনে তোর পড়াশোনায় এমন কিছু ক্ষতি হবেনা। "
এবার আমি অধৈর্য্য হয়ে পরলাম। বুঝতে পারছিনা কারনটা বললে এমন কি ক্ষতি হয়ে যাবে। আমিও নাছোরবান্দার মতো আবারও শুধালাম,
" কারও কিছু হইছে? মামা মামি সবাই ঠিক আছে তো?"
"আমাকে হাল ছাড়তে না দেখে বোধহয় দাদি হার মেনে নিয়ে অবশেষে বললেন, " তোর দাদার বন্ধু তৈয়ব ঢাকায় থাকে জানিসতো? তৈয়ব ভাইয়ের অবস্থা ভালো না.....চলবে ইনশাআল্লাহ।
লেখিকা : আসমা আক্তার।
কপি করা নিষেধ 🙅🏻♀️