#প্রেমের আড়ালে রহস্য
🙌লেখিকা:-রোদেলা রেমান পাখি
পর্ব :-০১
সকাল ৮টা ২০ মিনিট।
চৌধুরী ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বিশাল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রোদেলা রেমান পাখি একবার নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল, আরেকবার সামনের বিশাল ভবনটার দিকে।
তারপর বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— ও আল্লাহ! এই ইউনিভার্সিটি বানাইছে, নাকি পুরো ঢাকা শহর এক জায়গায় এনে রাখছে? একটা ক্লাসরুম খুঁজতে গিয়ে আমার তো মনে হচ্ছে অনার্স শেষ হয়ে যাবে!
পাশে দাঁড়ানো মেহরিন ইসলাম চোখ সরু করে তাকাল।
— তুই মাত্র পাঁচ মিনিট ধরে ক্যাম্পাসে আছিস।
— তো?
— এর মধ্যে তিনবার রাস্তা ভুল করেছিস।
— ভুল করিনি। নতুন রাস্তা আবিষ্কার করেছি।
মেহরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— তোর সঙ্গে তর্ক করার চেয়ে বিয়ে করে সংসার করা সহজ হবে।
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত চেপে ধরল।
— কী বললি? বিয়ে? কার বিয়ে? আমার? পাত্র কোথায়? দেখতে কেমন? বাড়ি-গাড়ি আছে? 😭
— চুপ কর!
— আচ্ছা, রাগ করিস কেন? আমি তো শুধু ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করছি।
মেহরিন এবার সত্যিই হাঁটা শুরু করল।
— তুই আমার সঙ্গে কথা বলবি না। আমি তোকে চিনিই না।
রোদেলা পেছন পেছন যেতে যেতে বলল,
— এই মেহরিন! বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে চিনিস না বললেই হলো? আমাদের বন্ধুত্বের সাত বছরের ইতিহাস আছে!
— সেই ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটা ছিল তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব করা।
— তবু ছাড়তে পারিস না। ভালোবাসিস আমাকে! 🥹💗
— আল্লাহ আমাকে ধৈর্য দাও!
দূর থেকে ইশরাত জাহান আর নুসরাত জাহান নীরা তাদের দেখে এগিয়ে এল। কিছুটা দূরে রাফসান মাহতাব, সাফওয়ান আহমেদ আর আদনান রায়হান দাঁড়িয়ে ছিল।
রাফসান কাছে এসেই বলল,
— কী ব্যাপার? প্রথম দিনেই বেস্ট ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিচ্ছেদ হয়ে গেল নাকি?
রোদেলা গম্ভীর মুখে বলল,
— হ্যাঁ। সাত বছরের সম্পর্ক শেষ।
আদনান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কেন?
— ও আমার বিয়ের পাত্রের খোঁজ নিতে দিচ্ছে না!
কয়েক মুহূর্ত সবাই চুপ করে রইল।
তারপর সাফওয়ান হেসে বলল,
— এই মেয়ের চিকিৎসা দরকার।
রোদেলা চোখ পাকিয়ে বলল,
— চিকিৎসা লাগবে না। শুধু একজন ভালো ডাক্তার লাগবে।
রাফসান সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— জায়ান মির্জা?
নামটা শুনে রোদেলা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
— আমার কাজিনকে এখানে টানছিস কেন?
— ডাক্তার তো, তাই ভাবলাম—
— আর একটা কথা বললে তোর এমন চিকিৎসার ব্যবস্থা করব, হাসপাতালে গিয়েও বুঝবি না কী হয়েছে!
সবাই হেসে উঠল।
মেহরিন রোদেলার হাত ধরে বলল,
— চল, এবার ক্লাসে যাই। প্রথম দিনেই দেরি করে শিক্ষকদের সামনে বদনাম করতে চাই না।
রোদেলা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা নাড়ল।
— একদম ঠিক। আমি খুব ভদ্র একটা মেয়ে।
ইশরাত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— এই কথাটা তুই নিজে বিশ্বাস করিস?
— অবশ্যই!
নীরা মিষ্টি হেসে বলল,
— তাহলে তোর মা তোকে প্রতিদিন বকেন কেন?
রোদেলা দুই হাত তুলে বলল,
— তোরা সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিস! আমি বুঝতে পেরেছি!
কথা বলতে বলতে সে দ্রুত পেছনের দিকে ঘুরল।
আর ঠিক তখনই—
ধাক্কা!
তার কাঁধে কারও শক্ত শরীরের সঙ্গে ধাক্কা লাগল। হাতের ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল, আর লোকটির হাতে থাকা ফাইল থেকে কয়েকটি কাগজ মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল।
রোদেলা ভারসাম্য সামলে প্রথমে নিজের ফোনটা দেখল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলে সামনে তাকাল।
একজন লম্বা যুবক তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কালো শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, এক হাতে ঘড়ি, অন্য হাতে ফাইলের বাকি কাগজগুলো। মুখে বিরক্তির ছাপ, চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। তার চেহারায় এমন একটা গম্ভীর ভাব, যেন পৃথিবীর সব সমস্যার জন্য সে একাই দায়ী মানুষ খুঁজছে।
লোকটি নিচু হয়ে কাগজগুলো তুলতে তুলতে বলল,
— রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় সামনে তাকাতে হয়, জানেন না?
রোদেলা প্রথমে কথাটা শুনে থমকে গেল।
তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,
— জি, জানি। কিন্তু রাস্তায় হাঁটতে গেলে অন্য মানুষকেও সামনে তাকাতে হয়, সেটাও জানেন তো?
লোকটি এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
— কী বললেন?
— কানে শুনতে সমস্যা হয়? আমি তো পরিষ্কার করেই বললাম!
পেছনে দাঁড়িয়ে মেহরিন ফিসফিস করে বলল,
— আল্লাহ! শুরু হয়ে গেছে!
লোকটি রোদেলার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে বলল,
— নিজের ভুল স্বীকার করতে শিখুন।
রোদেলা এবার সত্যিই রেগে গেল।
— আমার ভুল? আপনি কি চোখ বন্ধ করে হাঁটছিলেন? ধাক্কা দুজনের লেগেছে, কিন্তু কথা শুনতে হচ্ছে শুধু আমাকে!
— আপনার কথাবার্তা দেখে মনে হচ্ছে, ভদ্রতা শেখার প্রয়োজন আছে।
রোদেলা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
— আর আপনার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, সকালে হাসলে আপনার ব্যক্তিত্ব কমে যাবে!
পেছনে দাঁড়ানো রাফসান মুখ ঘুরিয়ে হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। সাফওয়ান ইতিমধ্যে আদনানের কাঁধে মুখ লুকিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু লোকটির মুখে হাসির কোনো চিহ্ন দেখা গেল না।
সে শান্ত গলায় বলল,
— আপনি সব সময় এভাবেই কথা বলেন?
রোদেলা এক মুহূর্তও দেরি না করে উত্তর দিল,
— না। যাদের ব্যবহার ভালো, তাদের সঙ্গে ভালোভাবেই কথা বলি।
— অর্থাৎ আমার ব্যবহার খারাপ?
— বাহ! এতক্ষণে বুঝতে পেরেছেন?
এবার মেহরিন এগিয়ে এসে রোদেলার হাত টেনে ধরল।
— পাখি, চল। প্লিজ, আর কিছু বলিস না।
রোদেলা হাত ছাড়িয়ে বলল,
— না, মেহরিন। উনাকে বুঝিয়ে বলা দরকার যে পৃথিবীটা ওনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি না।
লোকটির চোয়াল শক্ত হয়ে এল।
— আপনার সাহস তো কম নয়!
রোদেলা হাসল।
— ধন্যবাদ! আমার আম্মুও এই কথাই বলেন।
লোকটি কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের ফাইল গুছিয়ে নিয়ে বলল,
— আশা করি, আপনার এই সাহস ক্লাসরুমেও থাকবে।
রোদেলা ভ্রু তুলে বলল,
— কেন? ক্লাসরুমে ঢুকলে সাহস জমা দিয়ে ঢুকতে হয় নাকি?
লোকটি আর কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক ভবনের দিকে চলে গেল।
রোদেলা পেছন থেকে বিড়বিড় করল,
— অসভ্য লোক একটা! প্রথম দিনেই মেজাজ নষ্ট করে দিল।
মেহরিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই লোকটাকে চিনিস?
— চিনব কেন? আমার আত্মীয় লাগে নাকি?
— যদি কোনো শিক্ষক হয়?
রোদেলা হেসে ফেলল।
— ওই লোক শিক্ষক হলে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি!
কথাটা শুনে রাফসান আর সাফওয়ান একসঙ্গে বলে উঠল,
— আল্লাহ, আমাদের বাঁচাও!
কেউ জানত না, রোদেলার এই কথাটাই কিছুক্ষণের মধ্যে তার নিজের সামনে ফিরে আসবে।
---
কয়েক মিনিট পর
ক্লাসরুমের সামনে পৌঁছে রোদেলা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
— যাক বাবা! অবশেষে ক্লাসরুম পাওয়া গেছে।
মেহরিন দরজার পাশে লাগানো নোটিশের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আমাদের প্রথম ক্লাস ইংরেজি সাহিত্য। নতুন প্রফেসর নেবেন।
রোদেলা ব্যাগ ঠিক করতে করতে বলল,
— নতুন প্রফেসর হলে ভালোই। পুরোনো প্রফেসররা নাকি খুব কড়া হয়।
রাফসান হেসে বলল,
— তোর মতো শিক্ষার্থীর জন্য নতুন-পুরোনো সব প্রফেসরই কড়া হবে।
— তুই আমার শত্রু, বুঝেছি।
— বন্ধুত্বের খাতিরে সত্য বলছি।
রোদেলা আর কিছু বলার আগেই ক্লাসরুমের ভেতর থেকে কয়েকজন শিক্ষার্থী বেরিয়ে এল। সবাই নিজেদের জায়গায় বসতে শুরু করল।
রোদেলা জানালার পাশের একটা বেঞ্চে বসে ব্যাগ থেকে খাতা বের করল। তারপর মেহরিনের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
— আচ্ছা, নতুন প্রফেসর দেখতে কেমন হবে বল তো?
— জানি না।
— আমার মনে হয় খুব বুড়ো হবেন। চশমা থাকবে, হাতে বই থাকবে, আর কথা বলবেন এমনভাবে যেন আমরা সবাই তাঁর নাতি-নাতনি।
মেহরিন মুখ চেপে হাসল।
— তুই একটু চুপ করবি?
— কেন? প্রফেসর কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছেন?
ঠিক তখনই দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
কথাবার্তা থেমে গেল একে একে।
একজন মানুষ ক্লাসরুমে প্রবেশ করলেন।
কালো শার্ট।
গম্ভীর মুখ।
তীক্ষ্ণ চোখ।
রোদেলার হাতের কলমটা মেঝেতে পড়ে গেল।
তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
এই তো সেই লোক!
সকালের সেই অসভ্য, রাগী, বিরক্তিকর মানুষটা!
লোকটি ধীর পায়ে শিক্ষকের টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ফাইলটা টেবিলে রেখে পুরো ক্লাসের দিকে তাকালেন।
তারপর গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
— গুড মর্নিং, এভরিওয়ান। আমি আবরার চৌধুরী। এই সেমিস্টারে আপনাদের ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাস আমি নেব।
রোদেলার মনে হলো, তার চারপাশের সব শব্দ হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেছে।
মেহরিন ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
রাফসান মুখ নিচু করে কাঁধ কাঁপাচ্ছে।
সাফওয়ান খাতার আড়ালে হাসি লুকাচ্ছে।
আর রোদেলা?
সে মনে মনে শুধু একটা কথাই বলল—
হে আল্লাহ! সকালে যেই লোকটাকে এত কথা শুনিয়েছি, সেই লোকটাই আমার প্রফেসর!
আবরার শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি খাতা খুললেন।
— আশা করি, এই সেমিস্টারে সবাই নিয়ম মেনে চলবেন। আমার ক্লাসে অযথা কথা বলা কিংবা অন্যকে বিরক্ত করা পছন্দ করি না।
তার দৃষ্টি একবার পুরো ক্লাস ঘুরে এসে থামল জানালার পাশের বেঞ্চে।
রোদেলা সঙ্গে সঙ্গে খাতার দিকে মুখ নামিয়ে ফেলল।
আবরার তাকে চিনতে পেরেছেন।
এবং তাঁর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে একটুখানি রহস্যময় হাসি।
— বিশেষ করে, যারা প্রথম দিনেই নিজেদের পরিচয় খুব ভালোভাবে দিয়ে ফেলেছেন, তাদের জন্য কথাটা আরও বেশি প্রযোজ্য।
ক্লাসের কয়েকজন শিক্ষার্থী একে অপরের দিকে তাকাল।
রোদেলা বুঝতে পারল, কথাটা কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে।
মেহরিন তার কানে ফিসফিস করে বলল,
— ভিসি ম্যাডাম, এবার কী হবে?
রোদেলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
— বাসায় গিয়ে তোকে দেখে নেব!
— আগে নিজের জীবনটা বাঁচা!
ঠিক তখনই আবরারের কণ্ঠ শোনা গেল,
— মিস রোদেলা রেমান পাখি, দাঁড়ান।
রোদেলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— জি... স্যার?
আবরার তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
— সকালে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, মনে আছে তো?
রোদেলা মনে মনে বলল, মনে থাকবে না কেন? এই স্মৃতি তো এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ!
কিন্তু মুখে হাসি এনে বলল,
— জি, স্যার। অবশ্যই মনে আছে।
— খুব ভালো। তাহলে আশা করি, আজকের পর থেকে আপনি আপনার কথাবার্তায় একটু সংযত হবেন।
রোদেলা মাথা নাড়ল।
— জি, স্যার।
আবরার আবার প্রশ্ন করলেন,
— কিছু বলবেন?
রোদেলা মাথা নিচু করে বলল,
— জি না, স্যার।
একটু থেমে আস্তে করে যোগ করল,
— শুধু ভাবছিলাম, পৃথিবীটা কত ছোট!
আবরার শুনেও না শোনার ভান করলেন।
— বসুন।
রোদেলা বসে পড়তেই পেছন থেকে সাফওয়ান ফিসফিস করে বলল,
— ভিসি ম্যাডাম, পদত্যাগপত্র লিখে রাখবেন?
রোদেলা খাতার আড়ালে তার পায়ে আলতো করে লাথি দিল।
— চুপ কর!
সেই মুহূর্তে ক্লাসরুমের মধ্যে হাসির ছোট্ট একটা ঢেউ বয়ে গেল।
আবরার বোর্ডের দিকে ফিরে লিখতে শুরু করলেন।
রোদেলা মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই মানুষটার সঙ্গে আর কখনো ঝামেলায় জড়াবে না।
কিন্তু তার প্রতিজ্ঞা কতক্ষণ টিকবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।
কারণ আবরার চৌধুরীও জানতেন না, এই চঞ্চল মেয়েটি তাঁর নিয়মে বাঁধা জীবনটাকে কতখানি বদলে দিতে চলেছে।
আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ব্যস্ত সকালের আড়ালে, বহুদিনের পুরোনো একটি রহস্য আবার নীরবে মাথা তুলছিল।
একটি বন্ধ খাম পৌঁছেছে প্রশাসনিক ভবনের একটি নির্দিষ্ট কক্ষে।
খামের ওপরে লেখা মাত্র দুটি শব্দ—
“সে ফিরে এসেছে।”
আর সেই খামের ভেতরে কী ছিল, তা তখনো কেউ জানত না।
সকাল ৯টা ১০ মিনিট।
চৌধুরী ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুমে তখন পিনপতন নীরবতা।
বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে আবরার চৌধুরী পড়াচ্ছেন। তাঁর কণ্ঠে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, কথাগুলো স্পষ্ট, আর চোখের দৃষ্টি এতটাই তীক্ষ্ণ যে সামনের সারির শিক্ষার্থীরাও মাঝেমধ্যে সোজা হয়ে বসছে।
শুধু একজনের মনোযোগ পড়াশোনায় নেই।
সে হলো রোদেলা রেমান পাখি।
ডাকনাম—পাখি।
নামটা যেমন সুন্দর, মেয়েটাও তেমনই চঞ্চল। তবে তার মুখের ওপর কথা বলার অভ্যাসটা যে কবে যাবে, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানেন!
পাখি খাতার এক কোণে লিখল—
“আবরার চৌধুরী—পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রফেসর। দেখতে মানুষ, আচরণে বাঘ। আল্লাহ আমাকে রক্ষা করো।”
লেখাটা শেষ করে সে নিজেই মুচকি হাসল।
পাশে বসা মেহরিন ইসলাম, যার ডাকনাম মেহু, আড়চোখে খাতার দিকে তাকাল।
তারপর পাখির কানে ফিসফিস করে বলল,
— এই পাখি, তুই পড়াশোনা করতে এসেছিস, নাকি প্রফেসরের জীবনী লিখতে?
পাখি মুখ বাঁকিয়ে উত্তর দিল,
— দুটোই। মানুষ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হতে পারে না?
— তোর প্রতিভা দেখে আমার ভয় করে।
— হিংসা করিস না, মেহু। তুইও একদিন আমার মতো বিখ্যাত হবি।
— কীসের জন্য?
— প্রফেসরের কাছে বকা খাওয়ার জন্য!
মেহু মুখ চেপে হাসল।
ঠিক তখনই বোর্ডের সামনে থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল,
— মিস রোদেলা!
পাখির হাসি সঙ্গে সঙ্গে উধাও।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
— জি, স্যার?
আবরার চশমাটা ঠিক করে বললেন,
— আমি কী পড়াচ্ছি?
পাখি একবার বোর্ডের দিকে তাকাল। বোর্ডে বেশ কয়েকটি ইংরেজি বাক্য লেখা। সে সেগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন বাক্যগুলো তার পূর্বপরিচিত শত্রু।
— স্যার, আপনি...
— হ্যাঁ, আমি?
— পড়াচ্ছেন।
পেছনের সারি থেকে চাপা হাসির শব্দ উঠল।
আবরার কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন।
— অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা আপনার।
পাখি মনে মনে বলল, ধন্যবাদ স্যার। আপনার রাগ করার ক্ষমতাও অসাধারণ।
কিন্তু মুখে বলল,
— থ্যাংক ইউ, স্যার।
এবার ক্লাসের কয়েকজন আর হাসি ধরে রাখতে পারল না।
আবরার বোর্ডের মার্কারটা টেবিলে রাখলেন।
— যেহেতু আপনার কথা বলার আগ্রহ অনেক, তাই এবার আপনি বোর্ডের প্রশ্নটার উত্তর দেবেন।
পাখির মুখটা মুহূর্তেই শুকিয়ে গেল।
সে মেহুর দিকে তাকাল। মেহু এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন জীবনে কোনো দিন এই মেয়েকে দেখেইনি।
বিশ্বাসঘাতক! পাখি মনে মনে বলল।
আবরার প্রশ্ন করলেন,
— Tell me, what is the main idea of this passage?
পাখি প্রশ্নটা বুঝল। কিন্তু উত্তরটা ঠিকমতো সাজাতে গিয়ে তার মাথায় হঠাৎ শূন্যতা নেমে এল।
সে আমতা আমতা করে উত্তর দিল।
আবরার মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন,
— উত্তরটা পুরোপুরি ভুল নয়। তবে আরও ভালোভাবে বলতে পারতেন। বসুন, আর পরেরবার খাতায় আমার জীবনী লেখার পরিবর্তে লেকচারে মনোযোগ দেবেন।
পাখি থমকে গেল।
হায় আল্লাহ! উনি কি আমার খাতা পড়েছেন?
সে দ্রুত নিজের খাতাটা বন্ধ করে বসে পড়ল।
মেহু কানে কানে বলল,
— অভিনন্দন, পাখি। প্রথম দিনেই প্রফেসরের নজরে পড়েছিস!
পাখি দাঁত চেপে বলল,
— আর একবার বললে তোর নাম বদলে ‘মহাবিপদ’ রেখে দেব।
মেহু মিষ্টি করে হাসল।
— তোর অনুমতি লাগবে না, বেস্টি!
---
ক্লাস শেষে
বেল বাজতেই শিক্ষার্থীরা একে একে বেরিয়ে যেতে লাগল।
পাখি ব্যাগ কাঁধে তুলে দরজার দিকে ছুটল। তার একটাই লক্ষ্য—যত দ্রুত সম্ভব এই ক্লাসরুম থেকে পালানো।
কিন্তু দরজার কাছে পৌঁছাতেই পেছন থেকে সেই পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
— মিস রোদেলা, এক মিনিট।
পাখি চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল,
আল্লাহ, আমি জীবনে অনেক পাপ করেছি জানি। কিন্তু তাই বলে প্রথম দিনেই এই শাস্তি?
সে ঘুরে দাঁড়াল।
— জি, স্যার?
আবরার টেবিলের ওপর রাখা একটি কাগজ তার দিকে এগিয়ে দিলেন।
— আজকের লেকচারের নোট সম্পূর্ণ করে কাল জমা দেবেন।
পাখি কাগজটার দিকে তাকিয়ে বলল,
— কিন্তু স্যার, আমি তো নোট নিয়েছি!
— ভালো কথা। তাহলে সম্পূর্ণ করতে সমস্যা কোথায়?
— না, মানে... কোনো সমস্যা নেই।
— আর একটা কথা।
পাখি এবার সতর্ক হয়ে গেল।
— জি?
— ক্লাসে মনোযোগ দেবেন। আমি চাই না, আপনার প্রথম সেমিস্টার অপ্রয়োজনীয় ঝামেলায় কাটুক।
কথাটা শুনে পাখি কিছুটা চুপ হয়ে গেল। আবরারের কণ্ঠে এবার শুধু কঠোরতা ছিল না, দায়িত্ববোধও ছিল।
সে মাথা নেড়ে বলল,
— জি, স্যার। চেষ্টা করব।
আবরার সংক্ষিপ্তভাবে মাথা নাড়লেন।
— যেতে পারেন।
পাখি দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল।
— স্যার?
— আবার কী?
— আপনি কি সব সময় এত রাগী থাকেন?
প্রশ্নটা শুনে আবরার কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর শান্তভাবে বললেন,
— আর আপনি কি সব সময় এত বেশি কথা বলেন?
পাখি ঠোঁট চেপে হাসল।
— জি, স্যার। এটা আমার জন্মগত প্রতিভা।
কথাটা বলেই সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
আবরার মাথা নাড়লেন।
— অদ্ভুত মেয়ে!
কিন্তু তাঁর ঠোঁটের কোণে যে ক্ষীণ হাসিটা ফুটে উঠেছিল, সেটা দেখার মতো কেউ সেখানে ছিল না।
---
করিডোরে মহাসম্মেলন
ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল পাখির পুরো দল।
মেহু, ইশরাত জাহান, নুসরাত জাহান নীরা, রাফসান মাহতাব, সাফওয়ান আহমেদ আর আদনান রায়হান।
তাদের সবারই ছোট ছোট ডাকনাম আছে।
ইশরাতকে সবাই ইশু বলে ডাকে। নীরার নাম নীড়া। রাফসান হলো রাফি, সাফওয়ান সাফু, আর আদনান আদি।
আর এই দলের সবচেয়ে বড় সমস্যার নাম—পাখি!
রাফি দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করে বলল,
— তো, কেমন লাগল নতুন প্রফেসরকে?
পাখি গম্ভীর মুখে বলল,
— খুব ভালো।
সাফু অবাক হয়ে বলল,
— কী বললি? তুই নিজে এই কথা বলছিস?
— হ্যাঁ। উনি আমাকে একটা বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন।
নীড়া আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী দায়িত্ব?
পাখি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
— আমার নিজের নোট সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব!
আদি হেসে বলল,
— বাহ! এমন সম্মান তো সবাই পায় না!
পাখি তার দিকে আঙুল তুলে বলল,
— তুই হাস। হাসতে থাক। একদিন তোকে এমন বিপদে ফেলব, তখন বুঝবি।
ইশু এবার পাখির হাত ধরে বলল,
— আচ্ছা, বাদ দে। চল ক্যান্টিনে যাই। আমার প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে।
মেহু মাথা নাড়ল।
— চল। তবে পাখি, একটা কথা বলি?
— বল।
— তুই প্রফেসরের সামনে একটু কম কথা বলবি।
পাখি এমনভাবে তাকাল, যেন মেহু তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে অসম্ভব কাজটা করতে বলেছে।
— মেহু, তুই আমাকে চিনিস না?
— দুর্ভাগ্যবশত চিনি।
— তাহলে এই পরামর্শ দিলি কীভাবে?
সবাই আবার হেসে উঠল।
তারা যখন ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন পাখির ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে মেসেজ এল।
“প্রথম দিনটা কেমন কাটল, রোদেলা রেমান পাখি?”
পাখির হাসি থেমে গেল।
সে নম্বরটা চিনতে পারল না।
আরও একটি মেসেজ এল।
“সব মানুষকে বিশ্বাস করতে নেই। বিশেষ করে, যারা খুব ভালো মানুষ সেজে থাকে।”
পাখি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর মেহুকে ফোনটা দেখাল।
মেহুর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
— কে পাঠিয়েছে?
— জানি না।
রাফি নম্বরটা দেখার জন্য এগিয়ে এল।
— রিপ্লাই দিস না। আগে নম্বরটা সেভ করে দেখি কি না।
সাফু বলল,
— হতে পারে কেউ মজা করছে।
কিন্তু পাখির মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
কারণ মেসেজে তার পুরো নাম লেখা ছিল।
আর এই নম্বরটা তার কাছে কখনো আসেনি।
সে ফোনটা লক করে ব্যাগে রেখে দিল।
— বাদ দে। কেউ ফাজলামি করছে হয়তো।
কথাটা বললেও তার নিজের মনই যেন কথাটা বিশ্বাস করল না।
---
অন্যদিকে—আবরার চৌধুরীর কেবিন
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের তৃতীয় তলায় একটি কেবিন।
দরজার বাইরে ছোট্ট একটি নামফলক—
আবরার চৌধুরী।
আবরার নিজের ডেস্কে বসে কিছু কাগজপত্র দেখছিলেন। ঠিক তখনই দরজা না ঠুকেই একজন ভেতরে ঢুকল।
— কী রে, আব্রু! প্রথম দিনেই ছাত্রছাত্রীদের ভয় দেখিয়ে অর্ধেক মানুষকে অসুস্থ করে ফেলেছিস নাকি?
আবরার বিরক্ত চোখে তাকালেন।
— আরশ, তোর কোনো কাজ নেই?
আরশ খান, আবরারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আবরার তাকে সাধারণত আরু বলে ডাকেন, যদিও রাগের সময় সেই ডাকনামটা ব্যবহার করার সুযোগ থাকে না।
আরশ চেয়ারে বসে পা দোলাতে দোলাতে বলল,
— কাজ আছে। কিন্তু তোর মুখ দেখার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ পৃথিবীতে কমই আছে।
— বেরিয়ে যা।
— এত ভালোবাসা সহ্য করতে পারিস না কেন, বন্ধু?
আবরার ফাইলটা বন্ধ করলেন।
— আরশ!
— আচ্ছা, আচ্ছা! রাগ করিস না। শুনলাম, আজ নাকি একটা মেয়ের সঙ্গে তোর বেশ ভালো পরিচয় হয়েছে?
আবরারের চোখ সরু হয়ে এল।
— কে বলেছে?
আরশ হেসে বলল,
— তোর মুখই বলে দিচ্ছে!
— বাজে কথা বন্ধ কর।
— নাম কী মেয়েটার?
— রোদেলা রেমান পাখি।
আরশ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
তারপর হেসে বলল,
— নামটা তো বেশ সুন্দর! মেয়েটাও নিশ্চয়ই—
— প্রচণ্ড বাচাল।
— ওহ! তাহলে তোদের বেশ মিল আছে।
আবরার এমনভাবে তাকালেন যে আরশের হাসি থেমে গেল।
— ঠিক আছে, আর বলব না। এবার কাজের কথা বল।
আবরার ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটি খাম বের করলেন।
খামটা দেখে আরশের মুখের ভাব বদলে গেল।
— এটা কোথায় পেলি?
— আজ সকালে আমার কেবিনের বাইরে ছিল।
আবরার খামটা খুলে ভেতর থেকে একটি ছবি বের করলেন।
ছবিটা বেশ পুরোনো। তাতে একটি বাড়ির সামনে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। ছবির এক পাশ খানিকটা ছেঁড়া।
ছবির পেছনে কালো কালিতে লেখা—
“যে সত্য চাপা পড়ে আছে, সেটাই একদিন সবকিছু বদলে দেবে।”
আরশ ছবিটার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
— তুই কি মনে করিস, এটা সেই ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত?
আবরার উত্তর দিলেন না।
তিনি শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কয়েক সেকেন্ড পর বললেন,
— কেউ চায় না, আমি অতীতটা ভুলে যাই।
— তাহলে এখন কী করবি?
আবরার ছবিটা আবার খামের মধ্যে রেখে দিলেন।
— খুঁজে বের করব, কে এসব পাঠাচ্ছে।
আরশ এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
— সাবধানে থাকিস, আব্রু। সবাইকে বন্ধু ভাবার ভুল করিস না।
আবরার জানালার বাইরে তাকালেন।
— আমি কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করি না, আরু।
তারপর টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে নিলেন।
স্ক্রিনে একটি নতুন মেসেজ জ্বলজ্বল করছে।
“আপনার চারপাশের মানুষদের মধ্যে একজন আপনাকে ধ্বংস করতে চায়।”
আবরারের চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়ে গেল।
মেসেজের নিচে আরও একটি লাইন—
“আর আপনি তাকে প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে দেখছেন।”
কেবিনের ভেতর নেমে এল নীরবতা।
বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোরে তখনও হাসি, গল্প আর ব্যস্ততার শব্দ।
কেউ জানত না, সেই হাসিখুশি ক্যাম্পাসের আড়ালে এমন এক খেলা শুরু হয়ে গেছে, যার নিয়ম কেউ জানে না।
আর এই খেলার সঙ্গে কখন, কীভাবে জড়িয়ে পড়বে রোদেলা রেমান পাখি—
সেটাই হয়তো সবচেয়ে বড় রহস্য।
চলবে… 🖤
(শব্দ ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)