ফন্ট সাইজ:
থিম:
চিরন্তন প্রিয়সী

পর্ব 1

লেখক: রামিম ইসলাম

চিরন্তন প্রিয়শী

প্রথম পর্ব

১৯৮০ সালের শরৎকাল।

শান্তিপুর গ্রামের সকালগুলো তখনও শহরের মতো ব্যস্ত হয়ে ওঠেনি। সূর্য ওঠার আগেই মসজিদ থেকে ফজরের আজান ভেসে আসত, তারপর ধীরে ধীরে জেগে উঠত পুরো গ্রাম। কোনো বাড়ির উঠানে গরুকে খাবার দেওয়া হতো, কোথাও চুলায় আগুন জ্বলত, আবার কোথাও কৃষকেরা দিনের কাজের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠের দিকে রওনা দিত। বর্ষার পানি তখন অনেকটাই নেমে গেছে। গ্রামের চারপাশে ধানের সবুজ ক্ষেত, রাস্তার পাশে কাশফুল আর বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে শরতের গন্ধ ছড়িয়ে থাকত।

শান্তিপুরের উত্তর দিকে ছিল একটি পুরোনো বিশাল বাড়ি। বাড়িটির উঁচু দেয়াল আর লোহার ফটক দেখলেই বোঝা যেত, একসময় এই পরিবারের কতটা প্রভাব ছিল। বহু বছর আগে জমিদারি প্রথা শেষ হয়ে গেলেও গ্রামের মানুষের মুখে বাড়িটি এখনো ‘জমিদারবাড়ি’ নামেই পরিচিত। বিশাল দালান, পুরোনো বারান্দা, বড় পুকুর, আম-কাঁঠালের বাগান আর বিস্তৃত জমিজমা নিয়ে বাড়িটি যেন গ্রামের অন্য সব বাড়ি থেকে আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।

এই বাড়ির কর্তা মজিদ সাহেব। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। কথাবার্তায় গম্ভীর, সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কঠোর এবং নিজের পরিবারের সম্মানের বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন। তার একমাত্র মেয়ে প্রিয়শী। মেয়েটিকে তিনি খুব ভালোবাসতেন, কিন্তু সেই ভালোবাসার সঙ্গে ছিল কঠোর নিয়মের বেড়াজাল। প্রিয়শী কখন কোথায় যাবে, কার সঙ্গে মিশবে, কখন বাড়ি ফিরবে—এসব বিষয়ে তার বাবার নজর ছিল সবসময়।

প্রিয়শীর বয়স তখন সতেরোর কাছাকাছি। বড় বাড়িতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও তার স্বভাবে অহংকার ছিল না। সে শান্ত স্বভাবের মেয়ে। বাড়ির কর্মচারীদের সঙ্গে সম্মান করে কথা বলত, গ্রামের পরিচিত মানুষদের দেখলে হাসিমুখে কথা বলত। তার নিজের একটা ছোট জগৎ ছিল, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ছিল তার দুই বান্ধবী—জেসমিন আর আরিয়া।

সেদিন সকালেও প্রিয়শী নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। শরতের নরম রোদ তখন উঠানের ওপর পড়েছে। বাগানের পুরোনো আমগাছের পাতাগুলো বাতাসে নড়ছিল। দূরে একজন কর্মচারী পুকুরের ঘাট পরিষ্কার করছিল। ঘরের ভেতরে একটি কাঠের আলমারি, পাশে ছোট টেবিল, তার ওপর কয়েকটি বই আর জানালার ধারে রাখা একটি ফুলদানি—সবকিছুই পরিপাটি করে সাজানো।

ঠিক তখন দরজায় টোকা পড়ল।

“প্রিয়শী, তৈরি হয়েছিস?”

জেসমিনের গলা।

প্রিয়শী জানালা থেকে সরে এসে দরজা খুলে দিল। দরজার বাইরে জেসমিনের সঙ্গে আরিয়াও দাঁড়িয়ে ছিল।

জেসমিন ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “আর কতক্ষণ লাগবে? আমরা তো অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি।”

প্রিয়শী হেসে বলল, “এতক্ষণ কোথায় অপেক্ষা করছিলি?”

“বারান্দায়।”

আরিয়া বলল, “ওকে নিয়ে বের হতে গেলে প্রতিদিনই অপেক্ষা করতে হয়। তুই খুব ধীরে ধীরে তৈরি হোস।”

প্রিয়শী আলমারির পাশে রাখা ওড়নাটা নিয়ে কাঁধে রাখল। “তোমরা দুজন একসঙ্গে থাকলে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ থাকে না।”

জেসমিন হেসে বলল, “অভিযোগ করছি না। সত্যিটা বলছি।”

“ঠিক আছে, আজ থেকে তোমরা আগে চলে যাবে।”

“না, তোকে ছাড়া যাব না।”

তিনজনের কথার মাঝে হাসির শব্দ উঠল। কিছুক্ষণ পর তারা একসঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।

জমিদারবাড়ির ফটক পেরিয়ে গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে তারা নদীর দিকে হাঁটতে লাগল। সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। রাস্তার দুপাশে ধানের ক্ষেত। দূরে কয়েকজন কৃষক জমিতে কাজ শুরু করেছে। কোথাও গরুর গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে।

জেসমিন হঠাৎ বলল, “শুনেছিস, আজ নাকি বাজারে নতুন কাপড় এসেছে?”

আরিয়া বলল, “তুই আবার কাপড়ের খবর কোথা থেকে পেলি?”

“আমার ভাই বাজার থেকে এসে বলেছে।”

“তোর ভাই তো বাজারে গেলেই সবকিছুর খবর নিয়ে আসে।”

জেসমিন হেসে বলল, “তোর কী সমস্যা?”

প্রিয়শী দুজনের কথা শুনে হাসছিল। “তোমরা দুজন সারাদিন এভাবেই ঝগড়া করতে পারো।”

“আমরা ঝগড়া করি না,” আরিয়া বলল, “আমরা আলোচনা করি।”

“হ্যাঁ, খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা,” প্রিয়শী বলল।

কথা বলতে বলতে তারা নদীর কাছে পৌঁছে গেল।

শান্তিপুরের ছোট নদীটি গ্রামের মানুষের জীবনের সঙ্গে অনেক বছর ধরে মিশে আছে। বর্ষায় নদী ফুলে উঠলে তার রূপ বদলে যায়, আবার শরতে পানি কমে গেলে দুই পাড়ের মাটি স্পষ্ট দেখা যায়। নদীর বাঁকের কাছে দাঁড়িয়ে ছিল একটি বিশাল বটগাছ। গাছটির বয়স কেউ জানত না। মোটা কাণ্ডের চারপাশে শিকড় ছড়িয়ে ছিল, আর তার নিচে সবসময় একটা শীতল ছায়া পড়ে থাকত।

সেই বটগাছের নিচেই বসে ছিল আদনান।

আদনানের বয়স উনিশের কাছাকাছি। পরনে পরিষ্কার, কিন্তু পুরোনো একটি সাদা পাঞ্জাবি। পায়ে সাধারণ স্যান্ডেল। পাশে একটি কাপড়ের ব্যাগ। সে নদীর দিকে তাকিয়ে বসেছিল।

আদনানের জীবন ছিল অন্য সবার থেকে আলাদা। ছোটবেলাতেই বাবা-মাকে হারিয়েছিল সে। প্রথমদিকে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় পেলেও বেশিদিন কারও বাড়িতে থাকা সম্ভব হয়নি। একসময় সে বুঝে গেল, নিজের জীবন নিজের মতো করেই চালাতে হবে।

গ্রামের পশ্চিম পাশে বাঁশঝাড়ের কাছে একটি ছোট মাটির ঘর ছিল তার। ঘরটি খুব বড় নয়। একটি খাট, কাঠের পুরোনো বাক্স, কয়েকটি থালা-বাসন আর রান্নার সামান্য কিছু জিনিস—এই নিয়েই তার সংসার। নিজের বলতে যতটুকু ছিল, সেটুকু নিয়েই সে সন্তুষ্ট থাকার চেষ্টা করত।

কাজের জন্য তাকে প্রতিদিনই বের হতে হতো। কখনো জমিতে কাজ, কখনো বাজারে মাল বহন, কখনো নদীর ঘাটে নৌকা থেকে মাল নামানো—যে কাজ পেত, সেটাই করত। সেদিন কোনো নির্দিষ্ট কাজ ছিল না। তাই সকালে নদীর পাড়ে এসে বসেছিল।

প্রিয়শী ও তার বান্ধবীরা বটগাছের কাছে আসতেই জেসমিন প্রথমে আদনানকে দেখতে পেল।

“ওই যে, আদনান।”

আরিয়া তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ও-ই তো।”

প্রিয়শীও তাকাল। আদনান তখন নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সে একবার মাথা তুলে তাকাল। প্রিয়শীর সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো। মুহূর্তখানেক পর সে আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল।

জেসমিন নিচু গলায় বলল, “ও নাকি একাই থাকে।”

আরিয়া বলল, “হ্যাঁ। ওর বাবা-মা কেউ নেই।”

প্রিয়শী কিছু বলল না। সে শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। আদনান সম্পর্কে সে আগে কিছু শুনেছিল, কিন্তু কাছ থেকে কখনো দেখেনি।

কিছুক্ষণ পর আদনান উঠে দাঁড়াল। কাপড়ের ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে সে নদীর পাড়ের সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। তার যাওয়ার দিকে একবার তাকিয়ে প্রিয়শী আবার বান্ধবীদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল।

তিনজন বটগাছের নিচে বসে পড়ল।

জেসমিন কিছুক্ষণ পর বলল, “প্রিয়শী, একটা কথা শুনেছি।”

“কী কথা?”

“তোর বাবা নাকি তোকে শহরে পাঠানোর কথা ভাবছেন।”

প্রিয়শীর মুখের হাসিটা একটু ম্লান হয়ে গেল। “কে বলেছে?”

“আমার মা বলেছে।”

আরিয়া বলল, “আমিও শুনেছি।”

প্রিয়শী নদীর দিকে তাকাল। “বাবা আমাকে কিছু বলেননি।”

“তুই শহরে যেতে চাস?” জেসমিন জানতে চাইল।

প্রিয়শী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “জানি না। শহর তো ঠিকমতো দেখিইনি কখনো।”

আরিয়া বলল, “তাহলে গেলে নতুন জায়গা দেখতে পারবি।”

প্রিয়শী মৃদু হাসল। “সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো হয় না।”

তার কথায় কিছুক্ষণ নীরবতা নেমে এল।

দূরে একটি নৌকা ধীরে ধীরে নদী পার হচ্ছিল। মাঝি বৈঠা টেনে নৌকাটাকে স্রোতের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। বাতাসে কাশফুল দুলছিল।

অন্যদিকে আদনান বাজারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। নদীর ঘাটের কাছাকাছি গিয়ে সে একজন বৃদ্ধকে দেখতে পেল। বৃদ্ধের পাশে একটি পুরোনো সাইকেল পড়ে ছিল।

আদনান থেমে বলল, “চাচা, কী হয়েছে?”

বৃদ্ধ বললেন, “সাইকেলের চাকা নষ্ট হয়েছে বাবা। বাজারে যাওয়ার কথা ছিল। এখন কী করি বুঝতে পারছি না।”

আদনান নিচু হয়ে চাকার দিকে তাকাল। “চাকা ফুটো হয়েছে মনে হচ্ছে।”

“আমি এসব বুঝি না।”

“বাজারে হাবিব মিস্ত্রির দোকান আছে। সেখানে নিয়ে গেলে ঠিক করে দেবে।”

বৃদ্ধ একটু ইতস্তত করে বললেন, “আমি একা নিয়ে যেতে পারছি না।”

আদনান সাইকেলটি তুলে নিল। “চলুন, আমি নিয়ে যাচ্ছি।”

বৃদ্ধ বললেন, “তোমার নিজের কাজ নেই?”

আদনান হেসে বলল, “আজ নেই।”

“তাহলে তোমার সময় নষ্ট হবে।”

“সময় তো আছেই।”

বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।

দুজন ধীরে ধীরে বাজারের দিকে হাঁটতে লাগলেন।

হাবিব মিস্ত্রির দোকানে পৌঁছে সাইকেলটি রাখা হলো। হাবিব মিস্ত্রি চাকা পরীক্ষা করে বললেন, “ফুটো হয়েছে। পেছনের ব্রেকটাও ঠিক করতে হবে।”

বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, “কত টাকা লাগবে?”

“দুই টাকা।”

বৃদ্ধ পকেট থেকে টাকা বের করতে লাগলেন।

আদনান পাশে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল।

হাবিব মিস্ত্রি হঠাৎ আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তুই কি কাল থেকে আমার দোকানে আসবি?”

আদনান অবাক হয়ে তাকাল। “কেন?”

“সাইকেলের কাজ শিখবি। হাতের কাজ শিখে রাখলে ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।”

আদনান কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। দোকানের দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো সাইকেলগুলোর দিকে তাকাল। তারপর বলল, “শিখতে পারব?”

“চেষ্টা করলে পারবি।”

“কখন আসতে হবে?”

“সকালেই। দোকান খোলার আগেই।”

আদনান মাথা নাড়ল। “ঠিক আছে। কাল আসব।”

হাবিব মিস্ত্রি হাসলেন। “দেখি কতদিন টিকিস।”

আদনানও হেসে ফেলল।

বাজারের কাজ শেষ করে সে দুপুরের দিকে নিজের বাড়ির পথে রওনা হলো। রাস্তার মাঝখানে একবার নদীর দিকে তাকাল। সকালের তুলনায় এখন রোদ অনেক বেশি। নদীর পানি ঝলমল করছে।

তার মনে হলো, জীবনে খুব বড় কিছু না থাকলেও ছোট ছোট সুযোগগুলোকে ধরে রাখতে হয়। কাল থেকে নতুন কাজ শেখা শুরু হবে। এই চিন্তাটুকুই তার মুখে সামান্য হাসি এনে দিল।

এদিকে দুপুরের পর জমিদারবাড়ির পরিবেশ অস্বাভাবিক ব্যস্ত হয়ে উঠল।

বাড়ির বড় ফটকের সামনে একটি ঘোড়ার গাড়ি এসে থামল। সঙ্গে দুজন অপরিচিত লোক। কর্মচারীরা তাদের নিয়ে ভেতরে গেল। দারোয়ান ফটক বন্ধ করে দিল।

প্রিয়শী তখন বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। অপরিচিত লোকগুলোকে দেখে সে বই বন্ধ করল।

মা সালেহা বেগম পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

প্রিয়শী জিজ্ঞেস করল, “মা, ওরা কারা?”

“জানি না।”

“বাবার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে?”

“মনে হয়।”

“কোথা থেকে এসেছে?”

সালেহা বেগম একটু থেমে বললেন, “শহর থেকে এসেছে শুনেছি।”

প্রিয়শী আর প্রশ্ন করল না। কিন্তু তার মনে কৌতূহল রয়ে গেল।

কিছুক্ষণ পর জেসমিন আর আরিয়া আবার বাড়িতে এল। তারা বারান্দায় বসতেই জেসমিন বলল, “আজ তোমাদের বাড়িতে এত লোক কেন?”

প্রিয়শী বলল, “জানি না।”

আরিয়া বলল, “বাজারে শুনলাম শহর থেকে কেউ এসেছে।”

“আমি শুধু এতটুকুই জানি।”

তিনজন কথা বলতে লাগল। কিন্তু বাড়ির ভেতরের ব্যস্ততা তাদের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল।

বিকেলের দিকে জেসমিন ও আরিয়া নিজেদের বাড়িতে ফিরে গেল।

প্রিয়শী বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে রইল। পশ্চিম আকাশে সূর্যের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে। বাগানের গাছগুলোর ছায়া উঠানের ওপর লম্বা হয়ে পড়েছে।

সালেহা বেগম এসে পাশে দাঁড়ালেন।

“আজ সারাদিন কী ভাবছিস?”

প্রিয়শী মায়ের দিকে তাকাল। “মা, বাবা কি সত্যিই আমাকে শহরে পাঠাবেন?”

সালেহা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। “আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না।”

“তুমি কি কিছু জানো?”

“তোর বাবা কিছু বিষয় নিয়ে ভাবছেন।”

“কী বিষয়?”

“সময় হলে জানতে পারবি।”

প্রিয়শী মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর কোনো প্রশ্ন করল না।

সন্ধ্যা নামার পর জমিদারবাড়ির উঠানে বাতি জ্বলে উঠল। কর্মচারীরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত। দালানের ভেতর থেকে মানুষের কথাবার্তা ভেসে আসছে।

প্রিয়শী নিজের ঘরে ফিরে জানালার পাশে দাঁড়াল।

বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে।

তার মনে পড়ল সকালের নদীর পাড়। জেসমিন আর আরিয়ার সঙ্গে কাটানো সময়। তারপর অকারণেই মনে পড়ল সেই ছেলেটির কথা—আদনান।

তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। শুধু একবার চোখে চোখ পড়েছিল।

প্রিয়শী জানত না কেন ছেলেটির কথা তার মনে পড়ল। হয়তো তার একাকী জীবনের কথা শুনে কৌতূহল হয়েছিল। হয়তো নদীর পাড়ে একা বসে থাকা মানুষটির দৃশ্যটাই মনে আটকে ছিল।

সে জানালা থেকে সরে এসে বই খুলল।

কিন্তু কিছুক্ষণ পরও তার মন বইয়ের পাতায় স্থির হলো না।

অন্যদিকে গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে আদনান নিজের ছোট ঘরে ফিরে এসেছে। সন্ধ্যার আলো নিভে যাওয়ার পর সে চুলায় ভাত বসিয়েছিল। সাধারণ খাবার—ভাত, ডাল আর সামান্য সবজি। খাওয়া শেষ করে দিনের উপার্জনের টাকা কাঠের বাক্সে রেখে দিল।

তারপর পুরোনো খাটের ওপর বসে রইল।

কাল থেকে নতুন কাজ।

সাইকেল মেরামত শেখা।

হয়তো একদিন নিজের একটা দোকান হবে। হয়তো ছোট হলেও নিজের একটা সংসার হবে। এসব নিয়ে সে কখনো বড় স্বপ্ন দেখত না। তবে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটুকু তার সবসময় ছিল।

সে জানালার বাইরে তাকাল।

দূরে গ্রামের কয়েকটি বাড়িতে আলো জ্বলছে। কারও উঠান থেকে মানুষের হাসির শব্দ আসছে। কোথাও শিশুরা খেলছে। কারও বাড়িতে রাতের খাবারের প্রস্তুতি চলছে।

আদনানের ঘরটা ছিল নীরব।

সে এই নীরবতার সঙ্গে অভ্যস্ত।

তবু সেদিন রাতে তার মনে হলো, আগামীকাল হয়তো অন্যরকম একটা দিন হবে।

শান্তিপুরের অন্য প্রান্তে প্রিয়শীও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।

দুইজনের পৃথিবী ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। একজন বড় বাড়ির নিয়মের মধ্যে বেড়ে উঠেছে, অন্যজন নিজের ছোট ঘর আর পরিশ্রমের ওপর ভর করে বেঁচে আছে। তাদের মধ্যে তখন কোনো পরিচয় ছিল না, কোনো সম্পর্কও ছিল না।

শুধু একই গ্রামের আকাশের নিচে, একই নদীর দুই পাড়ে, দুজন মানুষ নিজেদের মতো করে দিন শেষ করছিল।

শান্তিপুরের রাত আরও গভীর হলো। একে একে বাড়িগুলোর আলো নিভে গেল। নদী অন্ধকারের মধ্যে নিজের গতিতে বয়ে চলল। বটগাছটি নীরবে দাঁড়িয়ে রইল নদীর পাড়ে।

পরদিন সকাল হলে আবার গ্রামের জীবন শুরু হবে।

আদনান যাবে হাবিব মিস্ত্রির দোকানে কাজ শিখতে।

প্রিয়শী উঠবে জমিদারবাড়ির সেই বিশাল দালানে।

আর শান্তিপুরের সেই ছোট নদীটি আগের মতোই বয়ে যাবে—নীরবে, নিজের ছন্দে।

#চিরন্তন_প্রিয়সী❤️
#প্রথম_পর্ব
#লেখক_রামিম_ইসলাম

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন