ফন্ট সাইজ:
থিম:
তুমি আমার গোপন পাপ

পর্ব 1

লেখক: Tisha khan

🖤 তুমি আমার গোপন পাপ 🖤

### পর্ব — ০১

একজন প্রফেসর, একটি অচেনা মেয়ে আর কিছু অজানা গল্প...

সকাল ৮টা ১৫ মিনিট।

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো তখন মানুষের পদচারণায় মুখর। কেউ অফিসে যাওয়ার তাড়ায় ছুটছে, কেউ বাসের জন্য দাঁড়িয়ে আছে, আবার কেউ এক কাপ চায়ের সঙ্গে নিজের সকালটাকে উপভোগ করছে।

শহরের এই ব্যস্ততার মাঝেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অন্যতম নামকরা একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়— রয়্যাল ক্রাউন ইউনিভার্সিটি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক দিয়ে একের পর এক শিক্ষার্থী প্রবেশ করছে। কারও হাতে বই, কারও কাঁধে ব্যাগ, আবার কেউ বন্ধুদের সঙ্গে হাসি-আড্ডায় মেতে আছে।

সেই ভিড়ের মধ্যেই দৌড়াতে দৌড়াতে ঢুকল একটি মেয়ে।

— আল্লাহ! আজকেও লেট! এই লোকটার ক্লাস কি সকালেই নিতে হবে? পৃথিবীতে কি দুপুর বলে কিছু নেই?

কথাগুলো বলতে বলতে মেয়েটি নিজের কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করল। এক হাতে ফোন, অন্য হাতে কয়েকটা বই। মুখে বিরক্তি, চোখেমুখে তাড়াহুড়ো।

মেয়েটির নাম আরিশা রহমান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। দেখতে মিষ্টি, কথা বলতে ভীষণ পটু, আর দুষ্টুমিতে তার জুড়ি মেলা ভার। তবে একটা সমস্যা আছে—পড়াশোনার চেয়ে নিজের স্বাধীনতা আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোতেই তার আগ্রহ বেশি।

আর আজ তার প্রথম ক্লাস এমন একজন মানুষের, যার ব্যাপারে গত কয়েক দিন ধরে পুরো বিভাগে আলোচনা চলছে।

নতুন প্রফেসর।

শান্ত, গম্ভীর, ভীষণ মেধাবী। দেশের বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। বয়স খুব বেশি নয়, কিন্তু ব্যক্তিত্ব এমন যে তাঁর সামনে দাঁড়ালে অনেকেই অকারণে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

আরিশা অবশ্য এসব নিয়ে মোটেও চিন্তিত নয়।

তার চিন্তা একটাই—কীভাবে ক্লাসে ঢুকে এমন একটা জায়গায় বসা যায়, যেখানে প্রফেসরের চোখ পড়বে না!

### সকাল ৮টা ৩০ মিনিট

ইংরেজি বিভাগ, রুম নম্বর ৩০৭।

— এই যে ম্যাডাম! এত দেরি কেন?

ক্লাসরুমে ঢুকতেই তার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী নওরিন ফিসফিস করে বলল।

আরিশা হাঁপাতে হাঁপাতে পাশে বসে বলল,

— চুপ কর! আগে বল, প্রফেসর আসছে?

— না, তবে আসতে আর কতক্ষণ! আর শোন, লোকটা নাকি ভীষণ সিরিয়াস। ক্লাসে কোনো কথা বললে খবর আছে।

আরিশা চোখ উল্টে বলল,

— উফ্! আরেকজন মাথামোটা প্রফেসর। পড়াবে, আমরা পড়ব। এত ভাব নেওয়ার কী আছে?

নওরিন মুখ চেপে হাসল।

— তুই সামনে গিয়ে এই কথাটা বলিস। তারপর বুঝবি!

— বলবই তো! আমি কি কাউকে ভয় পাই নাকি?

কথাটা বলেই আরিশা ব্যাগ থেকে ফোন বের করল।

ঠিক তখনই পুরো ক্লাসরুম নীরব হয়ে গেল।

দরজার সামনে একজন পুরুষ এসে দাঁড়িয়েছেন।

কালো ফরমাল শার্ট, চারকোল রঙের ট্রাউজার, হাতে একটি ঘড়ি। পরিপাটি চুল, পরিষ্কার মুখ, চোখেমুখে অদ্ভুত এক স্থিরতা। তাঁর হাঁটাচলায় কোনো তাড়াহুড়ো নেই, অথচ তাঁকে দেখামাত্রই ক্লাসের প্রায় সবাই নিজেদের কথাবার্তা থামিয়ে দিল।

তিনি ক্লাসে ঢুকে টেবিলের ওপর ফাইল রাখলেন।

তারপর শান্ত গলায় বললেন,

— Good morning, everyone.

পুরো ক্লাস একসঙ্গে উত্তর দিল,

— Good morning, sir!

তিনি বোর্ডের দিকে এগিয়ে গিয়ে নিজের নাম লিখলেন।

PROFESSOR AARHAM MALIK

তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন।

— আমি আরহাম মালিক। এই সেমিস্টারে তোমাদের ইংরেজি সাহিত্য পড়াব। আমার ক্লাসে নিয়ম মেনে চলাটা বাধ্যতামূলক। তবে আমি বিশ্বাস করি, পড়াশোনা মানে শুধু বইয়ের লাইন মুখস্থ করা নয়। কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই করবে।

ক্লাসের সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।

শুধু একজন বাদে।

আরিশা তখনো নিজের ফোনের স্ক্রিনে ব্যস্ত।

আরহাম একবার পুরো ক্লাসের দিকে তাকালেন। তাঁর দৃষ্টি এসে থামল পেছনের সারিতে বসে থাকা মেয়েটির ওপর।

— You, in the last row.

আরিশা মাথা না তুলেই বলল,

— জি, স্যার?

— ক্লাসে ফোন ব্যবহার করা কি তোমার কাছে খুব জরুরি?

চারপাশের কয়েকজন মুখ টিপে হাসল।

আরিশা এবার মাথা তুলে তাকাল।

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে দেখে সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর ফোনটা ব্যাগে রেখে মিষ্টি একটা হাসি দিল।

— সরি, স্যার। আর হবে না।

আরহাম কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

— তোমার নাম?

— আরিশা রহমান।

— ঠিক আছে, মিস রহমান। আশা করি, পরের ক্লাসে তোমাকে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখব।

— অবশ্যই, স্যার।

আরিশা এমনভাবে উত্তর দিল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বাধ্য ছাত্রী।

আরহাম আর কোনো কথা না বলে পড়ানো শুরু করলেন।

কিন্তু ক্লাসের বাকি সময়টুকু আরিশার কাছে মনে হলো এক যুগের সমান।

লোকটা পড়াচ্ছেন ভালোই, কিন্তু তাঁর মুখের সেই গম্ভীর ভাব দেখে আরিশার মনে হচ্ছে, মানুষটা বোধহয় জন্মের পর থেকে একবারও মন খুলে হাসেননি!

ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা বাজতেই সবাই ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে শুরু করল।

আরিশাও উঠে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই পেছন থেকে গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—

— মিস আরিশা রহমান, একটু দাঁড়াবে?

আরিশা থেমে গেল।

মনে মনে বলল, গেছি! প্রথম দিনেই আমার কপালে শনি লেগেছে!

সে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।

— জি, স্যার?

আরহাম নিজের ফাইল বন্ধ করে বললেন,

— তোমার আগের ক্লাসগুলোর রেকর্ড দেখেছি। তোমার ফলাফল খারাপ নয়। তাহলে ক্লাসে মনোযোগের এই অভাব কেন?

আরিশা একটু অপ্রস্তুত হলো। তবে সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।

— স্যার, আজকে একটু সমস্যা ছিল।

— কী সমস্যা?

— ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়েছে।

কথাটা বলেই সে নিজেই বুঝতে পারল, উত্তরটা দেওয়া একদম উচিত হয়নি।

আরহাম ভ্রু সামান্য উঁচু করলেন।

— তাহলে আগামীকাল থেকে একটু আগে উঠবে।

— জি, স্যার।

— আর ক্লাসে ফোন বন্ধ রাখবে।

— জি, স্যার।

— You may leave now.

আরিশা দ্রুত বেরিয়ে এল।

করিডোরে এসে নওরিন তার হাত ধরে বলল,

— কী বলল? বকা দিয়েছে?

আরিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

— না, বিয়ের দাওয়াত দিয়েছে!

নওরিন হেসে কুটিকুটি।

— তুই একদিন মরবি তোর এই কথার জন্য!

— মরলে মরব। কিন্তু লোকটার হাসি পাওয়া দরকার। এত গম্ভীর মানুষ আমি জীবনে দেখিনি!

দুজন হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল।

ক্লাসরুমের ভেতরে তখনো দাঁড়িয়ে ছিলেন আরহাম মালিক।

তিনি জানালার পাশে গিয়ে নিচের ক্যাম্পাসের দিকে তাকালেন। শিক্ষার্থীরা যে যার মতো ব্যস্ত। কেউ ক্যান্টিনে যাচ্ছে, কেউ লাইব্রেরির দিকে।

সবকিছুই স্বাভাবিক।

ঠিক যেমন হওয়া উচিত।

তিনি নিজের ফোনটা হাতে নিলেন। স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর থেকে আসা মেসেজ।

মেসেজটি পড়ে তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলাল না। শুধু চোখ দুটো মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

“স্যার, আপনার জন্য একটা খবর আছে। পুরোনো ব্যাপারটা আবার সামনে আসছে।”

আরহাম কয়েক সেকেন্ড স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর মেসেজটি মুছে ফোন পকেটে রাখলেন।

বাইরে থেকে তিনি সেই একই শান্ত, ভদ্র প্রফেসর।

কিন্তু তাঁর চোখের গভীরে যেন মুহূর্তের জন্য এমন কিছু ফুটে উঠল, যার সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত পরিবেশের কোনো মিল নেই।

পরক্ষণেই তিনি নিজের ফাইল হাতে নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।

কেউ কিছু বুঝল না।

কেউ কিছু জানল না।

আর ক্যাম্পাসের অন্য প্রান্তে, ক্যান্টিনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আরিশা তখনো বান্ধবীর সঙ্গে হাসাহাসি করছে।

সে জানেও না, তার জীবনের সবচেয়ে সাধারণ বলে মনে হওয়া এই দিনটাই একদিন তার সমস্ত পরিচয়, সমস্ত বিশ্বাস আর সমস্ত হিসাব বদলে দেবে।

কারণ কিছু গল্পের শুরুটা খুব সাধারণ হয়।

এতটাই সাধারণ যে, কেউ কল্পনাও করতে পারে না—সেই গল্পের শেষ পাতায় কতটা অন্ধকার অপেক্ষা করছে।

আর কিছু মানুষকে যতটা সহজ মনে হয়, তারা আসলে ততটা সহজ নয়।

বিশেষ করে, আরহাম মালিকের মতো মানুষদের।

চলবে… 🖤🥀

লেখিকা: Tisha Khan

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন