ফন্ট সাইজ:
থিম:
শেষ রাতের অতিথি

পর্ব 1

লেখক: Akila faruki elma

শেষ রাতের অতিথি

পর্ব ১: ১৩ নম্বর তলা

বাইরে তখন অঝোর ধারায় বৃষ্টি হচ্ছে।

শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলো বৃষ্টির পানিতে প্রায় ডুবে গেছে। রাস্তার পাশের নিয়ন সাইনবোর্ডগুলো পানিতে প্রতিফলিত হয়ে অদ্ভুত এক রঙিন আলো তৈরি করেছে। সেই আলোর ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে একটি কালো মার্সিডিজ গাড়ি।

গাড়ির পেছনের সিটে বসে জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে মেহজাবিন।

বয়স ছাব্বিশ। কাঁধ ছুঁয়ে থাকা কালো চুল, গভীর বাদামি চোখ আর মুখজুড়ে একধরনের শান্ত ভাব। প্রথম দেখায় তাকে খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু তার চোখের দিকে একটু ভালো করে তাকালে বোঝা যায়, মেয়েটির ভেতরে অনেক না বলা গল্প জমে আছে।

আজ তার জীবনের একটি বিশেষ দিন। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর অবশেষে সে একটি নামকরা পাঁচ তারকা হোটেলে চাকরি পেয়েছে। Guest Relations Executive হিসেবে তার নতুন কর্মজীবন শুরু হতে যাচ্ছে।

চাকরিটা পাওয়ার জন্য কম পরিশ্রম করতে হয়নি তাকে। কয়েকটি ইন্টারভিউ, অসংখ্য প্রত্যাখ্যান আর নিজের যোগ্যতা প্রমাণের লড়াই পেরিয়ে অবশেষে এই সুযোগ।

তবু আজ তার মনটা অদ্ভুত রকমের অস্থির।

গাড়ির জানালায় কপাল ঠেকিয়ে সে সামনের দিকে তাকাল।

রাস্তার ওপাশে বিশাল একটি বিল্ডিং দাঁড়িয়ে আছে। সোনালি আলোয় আলোকিত ভবনটির প্রবেশপথে বড় বড় অক্ষরে লেখা—

THE GRAND AURELIA

শহরের অন্যতম বিলাসবহুল হোটেল। দেশ-বিদেশের বিখ্যাত ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্র তারকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা এখানে আসেন। হোটেলটির মালিক দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী পরিবারগুলোর একটি—চৌধুরী পরিবার।

গাড়ি থামতেই ড্রাইভার পেছনে ফিরে বলল,

—ম্যাম, চলে এসেছি।

মেহজাবিন হালকা হাসল।

—ধন্যবাদ।

ব্যাগটা হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই ঠান্ডা বাতাস তার চুল উড়িয়ে দিল। হোটেলের বিশাল কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কয়েক সেকেন্ড ভবনটির দিকে তাকিয়ে রইল সে।

কেন যেন জায়গাটাকে তার খুব পরিচিত মনে হচ্ছে।

অথচ জীবনে এই প্রথম সে এখানে এসেছে।

নিজের ভাবনাকে গুরুত্ব না দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল।

হোটেলের লবিতে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল বিশাল ঝাড়বাতিটার দিকে। ছাদের মাঝখানে ঝুলে থাকা ঝাড়বাতি থেকে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মার্বেলের মেঝে, দামি আসবাবপত্র, দেয়ালে ঝোলানো বিখ্যাত শিল্পীদের ছবি—সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছাপ।

লবির এক পাশে একটি গ্র্যান্ড পিয়ানো রাখা। সেখানে বসে একজন বৃদ্ধ ধীরগতিতে সুর তুলছেন।

সবকিছু এত সুন্দর যে মেহজাবিন কিছুক্ষণের জন্য নিজের অস্থিরতার কথা ভুলে গেল।

—এক্সকিউজ মি! আপনি কি মেহজাবিন?

পেছন থেকে নারীকণ্ঠ শুনে ঘুরে দাঁড়াল সে।

সামনে দাঁড়িয়ে আছেন প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী এক নারী। পরনে হালকা ধূসর রঙের ফরমাল পোশাক। মুখে পেশাদার হাসি।

—জি, আমি মেহজাবিন।

—আমি নওরিন। এই হোটেলের HR Manager। আপনাকে স্বাগতম, মিস মেহজাবিন।

—থ্যাংক ইউ।

নওরিন তাকে নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেলেন।

হাঁটতে হাঁটতে হোটেলের বিভিন্ন নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিতে লাগলেন।

—আপনার দায়িত্ব মূলত অতিথিদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা, তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা এবং কোনো অভিযোগ থাকলে সেটা সমাধানের ব্যবস্থা করা। কাজটা খুব কঠিন নয়, তবে দায়িত্বশীল হতে হবে।

—জি, আমি চেষ্টা করব।

—আর একটা বিষয়। এই হোটেলের কিছু নিয়ম আছে, যেগুলো সবাইকে মেনে চলতে হয়।

—যেমন?

নওরিন একটু থেমে বললেন,

—কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় প্রবেশ নিষেধ। অনুমতি ছাড়া কোনো প্রাইভেট ফ্লোরে যাওয়া যাবে না। আর রাতের শিফটে থাকলে নিজের দায়িত্বের বাইরে কোথাও ঘোরাঘুরি করবেন না।

মেহজাবিন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

তারা লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল।

লিফটের দরজা খুলতেই মেহজাবিন ভেতরের বোতামগুলোর দিকে তাকাল। নিচতলা থেকে বারো তলা পর্যন্ত সংখ্যাগুলো আছে। এরপর সরাসরি চৌদ্দ।

তেরো নম্বর বোতামটি নেই।

সে একটু অবাক হয়ে বলল,

—এখানে তেরো নম্বর তলা নেই?

নওরিনের মুখের হাসি মুহূর্তের জন্য মিলিয়ে গেল।

—না।

—কেন? অন্য হোটেলেও তো তেরো নম্বর তলা বাদ দেওয়া হয়, কিন্তু এখানে কি বিশেষ কোনো কারণ আছে?

নওরিন এবার তার দিকে তাকালেন।

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা বললেন না।

তারপর নিচু স্বরে বললেন,

—এই হোটেলে তেরো নম্বর তলা নিয়ে কোনো প্রশ্ন করবেন না।

মেহজাবিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

—কেন?

—কারণ আমি বলছি। কিছু প্রশ্ন না করাই ভালো।

কথাটা বলেই নওরিন লিফটের বোতাম চাপলেন।

মেহজাবিন আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। কিন্তু তার মনে প্রশ্নটা আরও গভীর হয়ে বসে গেল।

একটা তলা নেই, সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু সেই তলা নিয়ে প্রশ্ন করতে নিষেধ করার কী আছে?

সকালের পরিচিতি পর্ব শেষ হতে হতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল।

মেহজাবিনকে হোটেলের বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। নতুন সহকর্মীদের মধ্যে কয়েকজন বেশ বন্ধুসুলভ। কেউ তাকে কাজের নিয়ম বুঝিয়ে দিল, কেউ আবার হোটেলের জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টগুলোর কথা বলল।

তবে একটি বিষয় তার চোখ এড়াল না।

হোটেলের কর্মীরা যেন কিছু একটা নিয়ে সবসময় সতর্ক থাকে। বিশেষ করে লিফটের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজনের মুখে অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একজন বলল,

—মিস মেহজাবিন, আপনার সঙ্গে একজনের পরিচয় করিয়ে দিতে চাই।

সে ঘুরে দাঁড়াল।

নওরিনের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন একজন পুরুষ।

লম্বা, সুদর্শন, পরিপাটি পোশাক। কালো শার্টের ওপর গাঢ় নীল ব্লেজার। চোখে একধরনের কঠিন দৃষ্টি, যা দেখে সহজে কারও পক্ষে তার সামনে স্বাভাবিক থাকা সম্ভব নয়।

নওরিন বললেন,

—ইনি আরহান চৌধুরী। হোটেলের মালিকের ছেলে। বর্তমানে হোটেলের বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব উনিই দেখাশোনা করেন।

মেহজাবিন ভদ্রভাবে হাসল।

—হ্যালো, স্যার।

আরহান কোনো উত্তর দিল না।

সে মেহজাবিনের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

একবার চোখ, তারপর ঠোঁট, তারপর আবার চোখের দিকে।

তার দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল, যা মেহজাবিনকে অস্বস্তিতে ফেলে দিল।

—আপনার নাম কী? আরহান জিজ্ঞেস করল।

—মেহজাবিন।

নামটা শুনে আরহানের চোখের পাতা সামান্য কেঁপে উঠল।

—মেহজাবিন?

—জি।

—আপনার পুরো নাম?

—মেহজাবিন রহমান।

আরহান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর নওরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি কি ওর সব ডকুমেন্ট যাচাই করেছেন?

নওরিন একটু অবাক হলেন।

—জি, অবশ্যই। সবকিছু ঠিক আছে।

—ভালো।

আরহান এবার মেহজাবিনের দিকে তাকাল।

—এই হোটেলে কাজ করতে এসে নিশ্চয়ই অনেক কিছু দেখবেন। তবে একটা কথা মনে রাখবেন, সবকিছু জানার চেষ্টা করা ভালো নয়।

মেহজাবিন এবার আর চুপ থাকতে পারল না।

—কোনো বিশেষ কারণ আছে, স্যার?

আরহানের ঠোঁটে অদ্ভুত একটা হাসি ফুটে উঠল।

—কারণ আছে কি না, সেটা সময় হলে বুঝতে পারবেন।

সে চলে যাওয়ার আগে আরও একটি কথা বলল,

—আর একটা পরামর্শ। এই হোটেলে মানুষের মুখের চেয়ে তাদের নীরবতাকে বেশি বিশ্বাস করবেন।

কথাটা বলে আরহান চলে গেল।

মেহজাবিন কয়েক মুহূর্ত তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

নওরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

—স্যার একটু গম্ভীর প্রকৃতির। ব্যক্তিগতভাবে কিছু নেবেন না।

মেহজাবিন হালকা হাসল।

কিন্তু মনে মনে ভাবল, এই হোটেলের সবাই কি ধাঁধার ভাষায় কথা বলে?

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো।

কাজের প্রথম দিনটা মোটামুটি ভালোই কাটল। কয়েকজন অতিথিকে সাহায্য করতে হয়েছে, কিছু ফোন কল রিসিভ করতে হয়েছে, আবার কয়েকটি রুম বুকিংয়ের তথ্যও আপডেট করতে হয়েছে।

রাত আটটার দিকে নিজের ডেস্ক গুছিয়ে সে নওরিনের কাছে গেল।

—ম্যাম, আজকের জন্য কি আমার কাজ শেষ?

—হ্যাঁ। তবে আপনার থাকার ব্যবস্থা যেহেতু হোটেলেই করা হয়েছে, তাই আজ রাতে এখানেই থাকবেন। আগামীকাল সকালে আবার কাজ শুরু করবেন।

—ঠিক আছে।

নওরিন তাকে একটি কার্ড দিলেন।

—রুম নম্বর ৮০৭। কোনো সমস্যা হলে রিসেপশনে যোগাযোগ করবেন।

মেহজাবিন কার্ডটা নিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।

আটতলায় পৌঁছে করিডরে পা রাখতেই তার মনে হলো, জায়গাটা হঠাৎ খুব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

দুই পাশে সারি সারি দরজা। দেয়ালে মৃদু হলুদ আলো। কার্পেটে পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যায় না।

৮০৭ নম্বর কক্ষের সামনে এসে কার্ড সোয়াইপ করল সে।

দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখ বড় হয়ে গেল।

বড় একটি বিছানা, জানালার পাশে সোফা, ছোট্ট একটি বারান্দা, আলাদা ওয়াশরুম—সবকিছুই অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাজানো।

সে ব্যাগটা রেখে জানালার কাছে গেল।

বাইরে শহরের আলো ঝলমল করছে।

মেহজাবিন নিজের ফোন বের করে মাকে কল দিল।

—হ্যালো, মা?

ওপাশ থেকে মায়ের কণ্ঠ ভেসে এল।

—কী রে, পৌঁছেছিস?

—হ্যাঁ মা। হোটেলটা অনেক সুন্দর। রুমটাও খুব ভালো।

—খাওয়া-দাওয়া করেছিস?

—এখনো না। একটু পরে করব।

—প্রথম দিন, নিশ্চয়ই অনেক ক্লান্ত লাগছে?

—একটু। তবে কাজটা ভালোই লাগছে।

কিছুক্ষণ কথা বলার পর মেহজাবিন বলল,

—মা, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

—কী?

—তোমাদের কি কখনো মনে হয়েছে, আমি ছোটবেলার কিছু ঘটনা ভুলে গেছি?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

—হঠাৎ এসব কথা জিজ্ঞেস করছিস কেন?

—এমনিই। আজ একটা জায়গায় গিয়ে মনে হচ্ছিল আগে কোথাও এসেছি। অথচ কখনো আসিনি।

মা হালকা হেসে বললেন,

—অনেক সময় এমন হয়। এসব নিয়ে ভাবিস না। ঠিকমতো খেয়ে ঘুমিয়ে পড়।

মেহজাবিন আর কথা বাড়াল না।

কিন্তু ফোন রাখার আগে মায়ের কণ্ঠে একটা অদ্ভুত পরিবর্তন সে লক্ষ্য করেছিল।

মা যেন কিছু একটা বলতে চেয়েও বলেননি।

রাত সাড়ে এগারোটা।

মেহজাবিন গোসল করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সারাদিনের ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছিল। বিছানায় বসে ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখল।

তারপর ফোনটা পাশে রেখে শুয়ে পড়ল।

ঠিক তখনই ঘরের ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।

ট্রিং... ট্রিং...

মেহজাবিন বিরক্ত হয়ে চোখ খুলল।

এত রাতে কে ফোন করবে?

রিসিভার তুলে বলল,

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।

—হ্যালো? কে বলছেন?

কয়েক সেকেন্ড পর একজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

—তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ।

মেহজাবিনের ভ্রু কুঁচকে গেল।

—কী বলছেন? আপনি কে?

—তোমার এখানে আসার কথা ছিল না, মেহজাবিন।

তার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল।

—আপনি আমার নাম জানেন কীভাবে?

ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল।

—দশ বছর আগে তুমি কথা দিয়েছিলে, আর কখনো এই হোটেলে ফিরবে না।

মেহজাবিন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।

—দশ বছর আগে? আপনি কী বলছেন? আমি তো এই হোটেলে কখনো আসিনি!

—তাহলে তোমার বোনকে জিজ্ঞেস করো।

মেহজাবিনের হাত কেঁপে উঠল।

—আমার কোনো বোন নেই!

ওপাশের লোকটি এবার খুব ধীরে বলল,

—তোমার স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে, মেহজাবিন। কিন্তু অতীত কখনো মুছে যায় না।

তারপরই ফোন কেটে গেল।

মেহজাবিন কিছুক্ষণ রিসিভার হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

ঘরের চারপাশটা হঠাৎ অচেনা মনে হতে লাগল।

সে দ্রুত ফোনটা রেখে নিজের মোবাইল হাতে নিল।

ঠিক তখনই একটি মেসেজ এল।

অচেনা নম্বর।

একটি ছবি সংযুক্ত।

ছবিটি খুলতেই তার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল।

ছবিতে দুটি ছোট মেয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দুজনের বয়স হয়তো আট কিংবা নয় বছর।

একজনের মুখ হুবহু মেহজাবিনের মতো।

অন্য মেয়েটিও একই রকম। একই চোখ, একই নাক, একই ঠোঁট। এমনকি হাসির ভঙ্গিটাও এক।

শুধু দ্বিতীয় মেয়েটির কপালের ডান পাশে ছোট্ট একটি কাটা দাগ রয়েছে।

ছবির পেছনে দেখা যাচ্ছে The Grand Aurelia হোটেলের পুরোনো লবি।

ছবির নিচে লেখা—

“তোমার যমজ বোন মেহরিন। সে দশ বছর আগে মারা গেছে। কিন্তু আজ রাতেও সে এই হোটেলে এসেছে।”

মেহজাবিনের হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।

মেহরিন!

নামটা তার কাছে অচেনা। অথচ কেন যেন নামটা শুনে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা তৈরি হলো।

সে ছবিটা আবার বড় করে দেখল।

মেয়েটির চোখের দিকে তাকাতেই মনে হলো, সে যেন কোনো পরিচিত মানুষকে দেখছে।

তারপর হঠাৎ মাথার ভেতর একটা অস্পষ্ট দৃশ্য ভেসে উঠল।

একটি ছোট্ট মেয়ে দৌড়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরছে।

কেউ একজন হাসতে হাসতে বলছে,

—আমরা কখনো আলাদা হব না, আপু।

মুহূর্তেই দৃশ্যটা মিলিয়ে গেল।

মেহজাবিন দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরল।

কী হচ্ছে তার সঙ্গে?

পরদিন সকাল।

মেহজাবিন সারারাত ঘুমাতে পারেনি।

সকাল আটটার দিকে অফিসে পৌঁছেই সে আরহানকে খুঁজতে শুরু করল।

লবিতে না পেয়ে দ্বিতীয় তলার করিডরে তাকে দেখতে পেল।

আরহান ফোনে কথা বলছিল। মেহজাবিনকে দেখে ফোনটা রেখে দিল।

—কিছু বলবেন?

মেহজাবিন কোনো ভূমিকা না করেই ফোনটা তার সামনে ধরল।

—এই ছবির মেয়েটিকে আপনি চেনেন?

আরহান ছবির দিকে তাকাল।

এক মুহূর্তেই তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।

সে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে ছবিটা আরও ভালো করে দেখল।

—এই ছবিটা আপনি কোথায় পেলেন?

—গত রাতে আমার ফোনে এসেছে।

—কে পাঠিয়েছে?

—জানি না। কিন্তু আপনি মেয়েটিকে চেনেন। তাই না?

আরহান কোনো উত্তর দিল না।

মেহজাবিন এবার আরও জোরে বলল,

—মেয়েটির নাম মেহরিন। সে আমার যমজ বোন। আপনি কি এটা জানতেন?

আরহান ধীরে ধীরে ফোনটা তার হাতে ফিরিয়ে দিল।

—আপনি এই বিষয়টা নিয়ে আর কথা বলবেন না।

—কেন? আমার নিজের বোনের ব্যাপারে জানতে চাইছি!

—কারণ এই হোটেলে কিছু সত্য আছে, যেগুলো জানার পর মানুষ আর আগের মতো থাকতে পারে না।

—আমি ভয় পাচ্ছি না।

আরহান তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর নিচু স্বরে বলল,

—ভয় পাওয়ার সময় এখনো আসেনি, মেহজাবিন।

মেহজাবিন বিরক্ত হয়ে বলল,

—আপনি কি সবসময় এভাবে ধাঁধার মতো কথা বলেন?

আরহান সামান্য হাসল।

—আপনি চাইলে সরাসরি উত্তরও দিতে পারি।

—তাহলে দিন।

—আজ রাত বারোটার পর আপনার ঘর থেকে বের হবেন না।

মেহজাবিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

—এটা কোনো উত্তর হলো?

আরহান এবার তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।

তার চোখে চোখ রেখে বলল,

—আপনি যদি নিজের জীবন ভালোবাসেন, তাহলে আমার কথাটা মনে রাখবেন।

কথাটা বলে সে চলে গেল।

মেহজাবিন দাঁড়িয়ে রইল।

কেন যেন আরহানের কথায় ভয় পাওয়ার চেয়েও বেশি কৌতূহল তৈরি হলো তার।

লোকটা কে?

মেহরিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক কী?

আর দশ বছর আগে এই হোটেলে ঠিক কী ঘটেছিল?

সারাদিন মেহজাবিনের মন কাজে বসছিল না।

একবার ভাবছিল চাকরিটা ছেড়ে চলে যাবে। আবার মনে হচ্ছিল, এত বড় একটি রহস্যের সামনে দাঁড়িয়ে এখন ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।

সে সিদ্ধান্ত নিল, সত্যিটা না জেনে এই হোটেল ছাড়বে না।

রাত এগারোটা।

নিজের কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল সে।

আরহানের কথাটা বারবার মনে পড়ছিল।

আজ রাত বারোটার পর ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না।

কিন্তু কেন?

মোবাইলের স্ক্রিনে সময় এগিয়ে যাচ্ছে।

১১:৫৫।

১১:৫৭।

১১:৫৯।

ঠিক বারোটা বাজতেই করিডর থেকে একটা শব্দ এল।

টিং!

লিফটের দরজা খোলার শব্দ।

মেহজাবিন বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।

তার মনে হলো, কেউ যেন করিডরে হাঁটছে।

ধীরে ধীরে দরজার কাছে গিয়ে পিপহোল দিয়ে তাকাল।

কেউ নেই।

করিডর একদম ফাঁকা।

সে ফিরে আসতে যাবে, ঠিক তখনই আবার শব্দ হলো।

টিং!

এবার লিফটের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

মেহজাবিনের বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল।

সে নিজের অজান্তেই দরজার হাতলে হাত রাখল।

আরহানের সতর্কবার্তা মনে পড়ল।

কিন্তু কৌতূহল যেন ভয়কে হারিয়ে দিল।

দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল সে।

করিডর ফাঁকা। দূরে লিফটের দরজা বন্ধ।

ডিসপ্লের দিকে তাকাতেই তার শরীর জমে গেল।

সেখানে জ্বলছে একটি সংখ্যা—

১৩

মেহজাবিন চোখ কচলে আবার তাকাল।

না, ভুল দেখছে না।

ডিসপ্লেতে স্পষ্টভাবে ১৩ লেখা।

অথচ এই হোটেলে তেরো নম্বর তলা নেই!

লিফটের দরজা ধীরে ধীরে খুলতে শুরু করল।

ভেতরে অন্ধকার।

মেহজাবিন এক পা এগিয়ে গেল।

—হ্যালো?

কোনো উত্তর নেই।

তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি মেয়েলি কণ্ঠ ভেসে এল।

—আপু...

মেহজাবিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

কণ্ঠটা আবার শোনা গেল।

—আপু... তুমি অবশেষে ফিরে এসেছ?

মেহজাবিনের চোখ বড় হয়ে গেল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

—মেহরিন?

লিফটের ভেতরের আলো একবার জ্বলে উঠল।

সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।

হুবহু মেহজাবিনের মতো দেখতে।

একই মুখ। একই চোখ।

শুধু কপালের ডান পাশে সেই ছোট্ট কাটা দাগ।

মেয়েটি ধীরে ধীরে হাসল।

মেহজাবিন এক পা পিছিয়ে গেল।

—তুমি... তুমি কে?

মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না।

শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে কেউ মেহজাবিনের হাত শক্ত করে ধরে টেনে সরিয়ে নিল।

—আপনি কি পাগল হয়ে গেছেন?

আরহান!

তার কণ্ঠে প্রচণ্ড রাগ। কিন্তু চোখে রাগের চেয়েও বেশি আতঙ্ক।

মেহজাবিন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

—ওই মেয়েটা! আপনি দেখেছেন? ওখানে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল!

আরহান লিফটের দিকে তাকাল।

কিন্তু ততক্ষণে দরজা বন্ধ হয়ে গেছে।

ডিসপ্লেতে আবার ১২ জ্বলছে।

—ও কে ছিল? মেহজাবিন জিজ্ঞেস করল।

আরহান তার হাত ছেড়ে দিল।

কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলল,

—আপনার বোন।

—কিন্তু সে তো মারা গেছে!

আরহান চোখ নামিয়ে নিল।

—দশ বছর আগে মেহরিনকে শেষবার এই হোটেলের তেরো নম্বর তলায় দেখা গিয়েছিল।

—কিন্তু এই হোটেলে তো তেরো নম্বর তলা নেই!

—অফিশিয়ালি নেই।

মেহজাবিন বিস্ময়ে তার দিকে তাকাল।

—মানে?

আরহান উত্তর দিল না।

সে শুধু মেহজাবিনের দিকে তাকিয়ে বলল,

—আপনি এখন নিজের ঘরে ফিরে যান। আর আজ রাতে যা দেখেছেন, সেটা কাউকে বলবেন না।

—আপনি আমাকে সবকিছু খুলে বলছেন না কেন?

—কারণ আমি জানি না, আপনাকে কতটুকু বিশ্বাস করা যায়।

কথাটা শুনে মেহজাবিনের চোখে রাগ জমল।

—আমি এখানে চাকরি করতে এসেছি। কারও ক্ষতি করতে আসিনি।

আরহান ধীরে বলল,

—সেটা আমি জানি।

—তাহলে?

আরহান এবার তার চোখের দিকে তাকাল।

—সমস্যাটা হলো, আপনি নিজেই জানেন না আপনার অতীতে কী ঘটেছিল।

মেহজাবিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

আরহান আর কোনো কথা না বলে তাকে নিজের কক্ষে পৌঁছে দিল।

দরজার সামনে এসে থেমে বলল,

—একটা কথা মনে রাখবেন, মেহজাবিন। আপনার বোন যদি আবার আপনার সামনে আসে, তার কাছে যাবেন না।

—কেন?

আরহান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল।

তারপর বলল,

—কারণ দশ বছর আগে সে শুধু নিখোঁজ হয়নি। সেদিন রাতে এই হোটেলে একজন মানুষ মারা গিয়েছিল।

মেহজাবিনের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

—কে?

আরহান তার দিকে তাকাল।

—সেটা জানার সময় এখনো আসেনি।

সে চলে গেল।

মেহজাবিন দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়ল।

তার মাথার ভেতর অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরছে।

মেহরিন কি সত্যিই বেঁচে আছে?

দশ বছর আগে কী ঘটেছিল?

আর আরহান কেন সবকিছু জানে?

সে ফোনটা হাতে নিল।

ছবিটা আবার খুলল।

ছবির দুই মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল ছবির পেছনের দেয়ালে।

সেখানে একটি পুরোনো ঘড়ি ঝুলছে।

ঘড়ির কাঁটা থেমে আছে ৩টা ১৩ মিনিটে।

ঠিক সেই সময়টায় গত রাতেও তার ঘুম ভেঙেছিল।

মেহজাবিন ছবিটা আরও বড় করল।

ঘড়ির নিচে দেয়ালে কালো কালিতে কিছু একটা লেখা।

সে অনেকক্ষণ চেষ্টা করে লেখাটা পড়ার চেষ্টা করল।

অবশেষে অক্ষরগুলো স্পষ্ট হলো।

“একজন ফিরে আসবে। আরেকজনকে মরতে হবে।”

তার হাত থেকে ফোনটা বিছানায় পড়ে গেল।

ঠিক তখনই ঘরের ল্যান্ডফোনটা বেজে উঠল।

ট্রিং... ট্রিং...

মেহজাবিন কাঁপা হাতে রিসিভার তুলল।

—হ্যালো?

ওপাশ থেকে এবার কোনো পুরুষকণ্ঠ নয়।

একটি মেয়ের মিষ্টি কণ্ঠ ভেসে এল।

—আপু, তুমি কি আমাকে চিনতে পেরেছ?

মেহজাবিনের চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

—মেহরিন...?

মেয়েটি হেসে উঠল।

তারপর ফিসফিস করে বলল,

—কাল রাতে তুমি আমাকে দেখেছ। কিন্তু একটা কথা জানো না, আপু।

—কী কথা?

ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।

তারপর মেয়েটি বলল,

—তুমি যে আরহানকে বিশ্বাস করছ, সে-ই দশ বছর আগে আমাকে মেরেছিল।

মেহজাবিনের হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল।

ঘরের আলো নিভে গেল।

অন্ধকারের মধ্যে জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পেল সে।

কিন্তু এবার তার প্রতিবিম্ব একা নয়।

ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরেকটি মেয়ে।

মেহরিন।

মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা কাত করল।

তারপর ঠোঁট নাড়ল—

“আপু, এবার কিন্তু তোমাকে মরতে হবে।”

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন