#নীল_আগুনের_শহর
#পর্ব_৪
#অ্যানা_জাহান_মায়া
ঠিক তখন নীল দরজার ভেতর একটা উচ্চ শব্দ হলো।
তরলের মতো আলো তরঙ্গ তুলল। আরিশা গভীর শ্বাস নিলো। তার চোখের ভেতর হঠাৎ নীল রেখাগুলো জ্বলে উঠল। যেন আগুন উঠে এসেছে ভেতর থেকে। সে বলল,
"আমি যাচ্ছি..."
লোকটা তাকে থামালো না। ছায়াগুলোও আক্রমণ করল না। সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো। যেন তারা অপেক্ষা করছিল এই সিদ্ধান্তের জন্যই। আরিশা কাঁপা পায়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো। দরজাটা তাঁর দিকে তাকালো।
হ্যাঁ তাকালো। একবার শ্বাস নিলো। তারপর আরিশা দরজার ভেতর পা দিলো। এক সেকেন্ডের জন্য শহরটা নিস্তব্ধ। তারপর এক ভয়ংকর উজ্জ্বল দৃষ্টি সহ্য না হওয়া নীল আলো চারপাশ গ্রাস করে নিলো।
আরিশা আর শহর দুজনেই অদৃশ্য। এক সেকেন্ড আগেও যেখানে রাস্তা ছিল। দেয়াল ছিল। ছায়ারা দাঁড়িয়ে ছিল। এখন সেখানে কিছুই নেই। শুধু এক
অন্তহীন নীল শূন্যতা। আরিশার পা মাটি খুঁজে পেল না।
সে পড়ছে। কিন্তু নিচে নয়। ভিতরের দিকে। চারপাশে নীল আগুন জ্বলছে। তাপ নেই। ব্যথা নেই। তবুও তার বুক অজানা ভয়ে কাঁপছে। হঠাৎ একটা কণ্ঠ। গভীর। একসাথে অনেক মানুষের। আবার যেন করোও নয়।
"স্বাগতম, আগুনধারিণী।"
আরিশা থমকে গেল। তাঁর চোখের ভেতরের নীল রেখাগুলো আলো ছড়াতে শুরু করলো। সে ফিসফিস করে বলল,
"আমাকে...এভাবে ডেকো না। আমি শুধু আমার মাকে..."
"জানি।"
কণ্ঠটা থামিয়ে দিলো তাকে।
"তোমার মা এখানেই আছে। কিন্তু সে আর শুধু তোমার মা নয়।"
নীল আগুন সরতে লাগলো। ধীরে ধীরে একটি শহর গড়ে উঠলো। ভাসমান মিনার। আগুনে তৈরি সেতু। আকাশে ঝুলে থাকা দরজা। এটাই নীল আগুনের শহর। আর শহরের মাঝখানে এক বিশাল স্তম্ভ।
স্তম্ভের ভেতর বন্দি এক ছায়া। আরিশার শ্বাস আটকে গেল। অস্ফুট স্বরে ডেকে উঠল,
"মা..."
ছায়াটা নড়লো। কিন্তু কণ্ঠ এলো অন্য দিক থেকে। কণ্ঠটা বলল,
"যদি তাকে ফেরাতে চাও। তোমাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।"
নীল আগুন হঠাৎ তীব্র হয়ে উঠলো।
"তোমাকে যেকোনো একটা বেছে নিতে হবে। তোমার মাকে বাঁচালে, এই শহর ধ্বংস হয়ে যাবে। আর শহরকে বাঁচালে, তোমার মাকে মরতে হবে। আর তুমিও তোমার শক্তি হারাবে।"
আরিশা চোখ বন্ধ করলো। তাঁর ভেতরের আগুন এখন আর শান্ত নয়। সে এক পা এগিয়ে দিয়ে বলল,
"আমি আগুনকে ভয় পাই না। আমি আগুনই।"
নীল শিখা জ্বলে উঠল। আর শহর শ্বাস নিলো। আরিশা আবার বলল,
"আমার মাকে বাঁচালে এই শহর কেন ধ্বংস হবে? আর যদি শহরকে বাঁচায় তাহলে আমার শক্তি চলে যাবে মানে?"
সেই কণ্ঠটা বলে উঠলো,
"আরিশা, তুমি হয়তো তোমার মাকে ভালোভাবে খেয়াল করোনি। তোমার মা এখন একটা ছায়া শুধু। তোমার মায়ের সাথে এই শহরের একটা সম্পর্ক আছে হয়তো তুমি সেটা জানো না।
কণ্ঠটা থেমে আবার বলল,
"তুমি এখনও সম্পূর্ণ শক্তি পাওনি। তাই এই শহরকে বাঁচাতে গেলে, যেটুকু তোমার মধ্যে আছে সেটা ধীরে ধীরে ক্ষয় হয়ে শেষ হয়ে যাবে।"
আরিশা নির্বাক।
"আমার মায়ের সাথে এই শহরের কি সম্পর্ক? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না...
আরিশা শহরের মধ্যস্থল নীল শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে।
চারপাশে নীল আগুনের আলো ঘূর্ণায়মান। প্রতি স্পন্দনে শহরের বাতাসও নীরব হয়ে গেছে। দূরে ভাসমান মিনারের ভেতর মায়ের ছায়া স্থির। কিন্তু আভা জ্বলছে। সেই কণ্ঠটা বলল,
"ধীরে ধীরে সব জানতে পারবে। তোমাকে শুধু এখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সবকিছু এখন তোমার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।"
আরিশার বুক কাঁপছে। কিন্তু চোখে আগুন। সে জানে এই মুহূর্তে ভয় নয়। সাহসই তাঁর অস্ত্র। আরিশা গভীর শ্বাস নিলো। নীল রেখাগুলো আরও উজ্জ্বল হলো। শহরের প্রতি তার সংযোগ স্পষ্ট হলো।
নীল আগুন ছড়িয়ে পড়লো। ভাসমান সেতু, মিনার, দরজা সবই ঝলমল করে জ্বলে উঠলো। শহরের মধ্যে অদৃশ্য বাধাগুলো উঠে এলো। ভাসমান ছায়া সেনারা তাঁর চারপাশে ঘুরছে। আগুনের সেতু নড়ছে।
যেন তাঁর সাহস যাচাই করছে। সেখানে এসে হাজির হলো সেই কোট পরা লম্বা লোকটা। আরিশা কিছুটা অবাক।
"আপনি এখানেও এসেছেন?"
লোকটা একটা অদ্ভুত হাসি দিলো।
"এটাই তো আমার আসল জায়গা। আমার যা করার ছিলো সেটা তো আমি করে ফেলেছি।"
সেই অচেনা কণ্ঠটা কোট পরা লম্বা লোককে উদ্দেশ্য করে বলল,
"আদ্রিশ, তাহলে তুমি কী জেনে বুঝেই আরিশাকে এখানে নিয়ে এসেছো?
আদ্রিশ, মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
"তুমি ঠিকই বুঝতে পেরেছো এ্যালডার। আমি জেনে বুঝেই আরিশাকে এখানে এনেছি।"
আরিশা কি বলবে কিছু ভেবে পাচ্ছে না।
চলবে...