ফন্ট সাইজ:
থিম:
কোনো এক শ্রাবনে

পর্ব 21

লেখক: মেহরিমা আফরিন

#কোনো_এক_শ্রাবণে
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

(২১)[প্রথম অংশ]

নবনীতা গোমড়া মুখ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্য তাকে দেখে।দেখা শেষ হতেই চোখ সরু করে বলে,'সত্যি করে বলুন তো,আপনি মনে মনে আবার কি ছক কষছেন?'

আরহাম তার কথা শুনতেই হো হো করে হেসে ফেলল।তার হাসি দেখে নবনীতার শরীর ছ্যানছ্যান করে উঠে।সে কি কোনো উপহাস করেছে?এমন করে হাসছে কেন ঐ লোক?আরহাম এক হাত পেটে চেপে হাসি থামাতে থামাতে বলল,'মাই গড! তুমি এখানেও ছক ফক নিয়ে পড়ে আছ?তোমার কাজই আমাকে সন্দেহ করা।যাও তো তুমি।সামনে থাকলেই উল্টা পাল্টা বকে যাও তুমি।'

নবনীতা কিছুক্ষণ চুপ থাকে।পরক্ষণেই থমথমে মুখে বলে,'ইফাজ আমার আত্মীয় হয়।আপনি পরবর্তী তে এসবে নাক গলাবেন না বলে দিলাম।আমার টা আমাকে দেখে নিতে দিন।'

'ইফাজ তোমার কি এমন আত্মীয় হয় একটু শুনি?তোমার মামির ভাইয়ের ছেলে।অনেক দূরের আত্মীয়।' কিছুটা তাচ্ছিল্য করে বলল আরহাম।

নবনীতা জোর গলায় জবাব দেয়,'আমি যেহেতু আমার মামা মামির সাথে থাকি,তাই এটাও আমাকে মানিয়ে চলতে হয়।কাছে দূরে বিষয় না।আপনি এখন থেকে দূরে থাকবেন এসব থেকে।'
সে থামে।হঠাৎই চোখ সরু করে বলে,'শুধু ইফাজ না।আপনি আমার চিত্র থেকেও দূরে থাকবেন।বুঝেছেন?'

আরহাম চোখ তুলে তাকে দেখল।দেখতেই শব্দ করে হেসে ফেলল।মুখে সে হাসি ধরে রেখেই বলল,'আর ইউ জেলাস?'

'কোন দুঃখে জেলাস হবো আমি?'

'এই যে চিত্র আমাকে এতো ভালোবাসে সেজন্য।তুমি তো আবার চিত্র'র ভালোবাসা কে তোমার ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করো।'

নবনীতা থতমত খেয়ে চুপ হয়ে গেল।আড়চোখে একবার আরহাম কে দেখে চাপা স্বরে বলল,'সে যাই হোক।আপনি নিজেকে নিয়ে ভাবুন।নির্বাচন নিয়ে ভাবুন।নিজের চ্যালাপেলা দের কন্ট্রোল করুন।আমার সিকিউরিটি আমি নিজেই এনশিউর করতে পারি।'

কথা শেষে সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না।যেরকম হনহনিয়ে এসেছিল,ঠিক সেরকম করেই বেরিয়ে গেল।সে যেতেই ওয়াজিদ অবাক হয়ে বলল,'ইফাজ তাহলে নবনীতার পরিচিত?'

আরহাম দায়সারা ভাবে জবাব দেয়,'হু।'

'সে নবনীতার হাত ধরেছিল রাস্তায়?'

অন্য দিক থেকে আগের মতোই জবাব আসে,'হু'

ওয়াজিদ চোখ মেলে সামনে দেখে।বুকের বা পাশটায় চিনচিন ব্যথা করছে তার।কেন করছে?আরহামের দিকে সে নির্নিমেষ কয়েক পল তাকিয়ে থাকে।সে কিছু একটা অনুধাবন করতে পারছে।যা সে অনুধাবন করছে সেটা তার জন্য সুখকর না।তার সামনে বসে থাকা যুবকটিকে সে চেনে।খুব ভালো মতো জানে সে যখন কোনো কিছু নিয়ে উঠে পড়ে লাগে,তখন সে সেটা হাসিল করেই ছাড়ে।সে ছোট থেকেই লাগাম'হীন,বে'পরোয়া আর নিজের খেয়ালখুশির মালিক।

ওয়াজিদ কাউচ ছেড়ে উঠে ঠিক তার মুখোমুখি চেয়ারে বসল।নিচু আওয়াজে ডাকল,'আরহাম!'

আরহাম তাকে দেখেই ভ্রু কুঁচকায়।জিজ্ঞাসু হয়ে বলে,'কিরে?কিছু বলবি?'

ওয়াজিদ একটা শ্বাস ছেড়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে,'হু,বলব।'

'কি?'

'তুই কি নবনীতাকে পছন্দ করিস আরহাম?' কোনো ভনিতা না করে ওয়াজিদের সোজাসাপটা প্রশ্ন।

আরহাম তার কথা শুনতেই এক গাল হাসে।কপালে আঙুল ঠেকিয়ে গাঢ় স্বরে বলে,'নাথিং লাইক দ্যাট।জাস্ট ইনফেচুয়েশন।'

ওয়াজিদ অধৈর্য হয়ে বলল,'নো ম্যান।দ্যাট কান্ট বি ইনফেচুয়েশন।কেবল ইনফেচুয়েশন থেকে কেউ এতোটা বাড়াবাড়ি করে না।তুই কতোটা বাড়াবাড়ি শুরু করেছিস তুই জানিস?'

আরহাম মুচকি হাসে।ওয়াজিদের চোখে চোখ রেখে শুধায়,'তাহলে তুই বল এটা কি?শুনি আমি।'

ওয়াজিদ কয়েক সেকেন্ড শান্ত হয়ে বসে থাকে।একটু ধাতস্থ হতেই বরফ শীতল কন্ঠে জবাব দেয়,'এটা অনুভূতি।ইউ ফিল ফর হার।তোর চোখ বলছে তুই তাকে পছন্দ করিস।তুই কি কিছুই বুঝিস না?'

আরহাম আলগোছে হেসে বলল,'না আমি বুঝি না।তুই আর আদি আছিস না সবকিছু বুঝার জন্য?আমি অতো বুঝতে চাই না।অনুভূতি অর ইনফেচুয়েশন,হোয়াটএভার ইট ইজ,আমি নবনীতার আশেপাশে ঐ ইফাজ টিফাজকে সহ্য করতে পারি না।এখন তুই প্লিজ জ্ঞান ঝাড়িস না যে আমি প্রেমে পড়েছি হ্যান ত্যান।এমন কিছু না ভাই।প্রেম টেমের কোনো ফাংশন নেই আমার।এসব অনুভূতি ইনফেচুয়েশন সময়ের সাথে কেটে যাবে।'

সে থামে।হঠাৎ কিছু একটা ভেবে তিরিক্ষি স্বরে বলে,'শা'লা ঐ সময়টাই তো পাচ্ছি না।রোজ রোজ কোনো না কোনো ভাবে দেখা হয়ে যাচ্ছে।মাইন্ড ডাইভার্ট করার সময়টুকুও পাচ্ছি না বা'ল।'

ওয়াজিদ তার কথা শুনেই নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়।আরহাম চোখ পাকিয়ে বলল,'কিরে?কোথায় যাচ্ছিস তুই?'

ওয়াজিদ চুপচাপ সামনে পা বাড়ায়।নিরাসক্ত কন্ঠে বিড়বিড় করে,'শরীর খারাপ লাগছে আমার।বাড়ি গিয়ে একটু রেস্ট করব আমি।তুই থাক,আমি একটু আসি।'
.
.
.
.
সিটি কলেজের সামনে রোজই আড্ডাবাজ বেকার ছেলেপুলে গুলো ভীড় জমায়।আজও তার ব্যাতিক্রম হয়নি।শুভ্রা কলেজ শেষে বাইরে আসতেই এদের দেখা পেল।

এদের মাঝে একজনের নাম বিনয়।নাম নাকি মানুষের ব্যক্তিত্বের উপর প্রভাব ফেলে।এই কথা শুভ্রা সেদিন থেকে অবিশ্বাস করা শুরু করেছে যেদিন থেকে সে বিনয় কে দেখেছে।এর মতো বদ'মাইশ আর উচ্ছৃ'ঙ্খল সে তার জীবনেও দু'টো দেখেনি।এর নাম নাকি বিনয়! বিনয়ের ব টাও নেই তার মাঝে।

শুভ্রানী খুব বেশি মেধাবী না।কিন্তু সে খুব পরিশ্রমী।নিজেদের অ'সহায়ত্ব তাকে পরিশ্রমী করে তুলেছে।বাবা মায়ের মৃ'ত্যুর পর সে যখন দেখত আপাই নামের মানুষটি সবে মাত্র কলেজ জীবন শেষ করে একহাতে বই আর অন্য হাতে চিত্রা কে আগলে নিচ্ছে,তখন থেকেই শুভ্রা প্রতিজ্ঞা করেছে সে খুব পড়াশোনা করবে,সে আপাইয়ের দুঃখ দূর করবে।শুভ্রার বই খাতা কিনতে আপাই কখনো কার্পন্য করে না।শুভ্রা বেঁচে থাকতে কোনোদিনও তার ঋণ শোধ করতে পারবে না।কিন্তু সে এর কিছুটা ফিরিয়ে দিতে চায়।আপাই আর কতো ধুকে ধুকে ম'রবে?এখন তো শুভ্রা বড় হচ্ছে।সে নিজেই এখন আপার ঢাল হবে।

শুভ্রা খুব মন দিয়ে পড়ে।ছিমছাম গড়নের যে অসম্ভব ভালো মেয়ে মানুষটি নিঃস্বার্থভাবে তাকে আর চিত্রকে আগলে রেখেছে,ঐ মেয়েটিকে শুভ্রা গর্ববোধ করাতে চায়।সে খুব বেশি পড়তে চায়।পড়াশোনার পাশাপাশি সে বিতর্ক ক্লাবেও নাম লিখিয়েছিল।সেই থেকেই কলেজে তার টুকটাক পরিচিতি।তখন থেকেই সে টিটু,মিরন আর বিনয়ের চোখে পড়েছে।টিটু আর মিরন যদিও আপাইয়ের পি'টুনি খেয়ে তার দিকে নজর দেওয়া বন্ধ করেছে,কিন্তু বিনয় সেই আগের মতোই আছে।সে তাকে দেখলেই অ'শালীন অঙ্গভঙ্গি করে,শিশ বাজায়,অসভ্য আচরণ করে।

আজকেও সে বেরিয়ে আসতেই বিনয় তাকে দেখে শিশ বাজালো।সে আটসাট হয়ে আরেকটু সামনে যেতেই বিনয় তার মুখোমুখি এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়ায়।শুভ্রা দ্রুত তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলে সে দুই হাত প্রসারিত করে তার যাওয়ার পথ বন্ধ করে।জিভ দিয়ে দুই ঠোঁ'ট ভিজিয়ে কুৎ'সিত ইশারা করে বলে,'আহা ময়না যাচ্ছো কোথায়?একটু কথা তো বলো।'

শুভ্রা একটা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা কন্ঠে বলল,'প্লিজ রাস্তা ছাড়ুন।'

বিনয় লোলুপ দৃষ্টিতে একবার উপর নিচ তাকে দেখে।সেই দৃষ্টি দেখলেই শুভ্রার বুক ফে'টে কান্না আসে।সে তড়িঘড়ি করে অন্যদিক দিয়ে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয়।সে অন্য পথে যেতেই বিনয় দ্রুত পায়ে তার পিছু নেয়।

শুভ্রা শ্বাস বন্ধ করে ছুটে যায় এক প্রকার।বিনয় নিজেও তার পেছনে ছুটে আসে।তাকে থামানোর উদ্দেশ্যে যেই না সে তার হাত ধরার জন্য নিজের হাতটা এগিয়ে নিল ,ঠিক তখনই কোথা থেকে ছুটে এসে একটা শক্ত হাত বিনয়ের কুৎসিত হাতটাকে খপ করে ধরে ফেলল।

বিনয় থামল।শুভ্রা নিজেও থামল।পেছন ঘুরে বড় বড় চোখ করে তাকে বিনয়ের নোং'রা স্পর্শ থেকে বাঁচানো লোকটিকে দেখল।বিনয় নিজেও চোখ তুলে সামনে তাকায়।সামনে দাঁড়ানো ছেলেটিকে দেখা মাত্রই সে তব্দা খেয়ে বলল,'আরিশ ভাই।আপনি?'

আরিশ শান্ত চোখে একবার তাকে আর একবার শুভ্রাকে দেখে।গম্ভীর গলায় জানতে চায়,'এদিকে কি করছিস?শুভ্রার পিছু নিয়েছিস কেন?'

বিনয় ভড়কে গেল।মেয়েটি কি আরিশ ভাইয়ের পরিচিত?সে তো তাদের পরিচিত মেয়ে বলতে সারাহ আর তাসনুভা কেই চিনে।সে আমতা আমতা করে বলে,'না মানে,ইয়ে ভাই,আসলে ইয়ে হইছে,,,'

আরিশ তাকে কথার মাঝেই থামিয়ে দিলো।একহাত তুলে কিছুটা শা'সিয়ে বলল,'আর কখনো এমন শুভ্রার পিছু নিবি না।বুঝেছিস?'

বিনয় দ্রুত মাথা নাড়ে।আরিশ কাঠকাঠ স্বরে বলে,'এখন যা এদিক থেকে।'

বিনয় যাওয়ার আগে আরো একবার তাকে সালাম দিলো।যেতে যেতেই বলল,'আরহাম ভাইকে আমার সালাম দিবেন ভাই।'

সে চলে যেতেই আরিশ সোজাসুজি শুভ্রার দিকে দেখে বলল,'ঠিক আছ শুভ্রা?'

শুভ্রা উপরনিচ মাথা নাড়ে।কৃতজ্ঞ ভরা কন্ঠে বিড়বিড় করে,'ঠিক আছি আমি।'

'কোথায় যাচ্ছ?বাসায়?'

'জ্বী?'

'আমি ড্রপ করে দেই?' খুবই নম্র হয়ে প্রশ্ন করে আরিশ।

তার কথা শুনতেই শুভ্রা কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল।তার এলোমেলো দৃষ্টি দেখতেই আরিশ অমায়িক হেসে বলল,'আনইজি ফিল করার কিছু নেই।আমরা তো এখন অল্প সল্প চিনি নিজেদের তাই না?'

শুভ্রা কেবল আস্তে করে মাথা নাড়ে।আরিশ পুনরায় জিজ্ঞেস করে,'ড্রপ করে দিব শুভ্রা?'

কলেজ ইউনিফর্মের পেটের দিকটা খাঁ'মচে ধরে শুভ্রা মিনমিন করে জবাব দেয়,'জ্বী,ঠিক আছে।'

গাড়িতে বসেই আরিশ সবার প্রথমে এসি অন করল।তারপর গাড়িতে থাকা পানির বোতল টা শুভ্রার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,'নাও পানি খাও।একটু ঠান্ডা হও।'

শুভ্রা বাধ্য মেয়ের মতো বোতল হাতে নেয়।আরিশ সিট বেল্ট লাগাতে লাগাতে বলে,'ঐ ব'খাটে গুলো কি রোজই এমন করে?'

কয়েক ঢোক পানি খেয়ে শুভ্রা মলিন মুখে জবাব দেয়,'জ্বী দেখতে পেলেই এমন করে।'

আরিশ স্মিত হেসে বলল,'আর করবে না।নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।'

শুভ্রা মিষ্টি করে হাসল।একটু পরে কিছু একটা মনে পড়তেই বলল,'আপনি যেন কোন ইউনিভার্সিটি তে পড়েন?'

'ব্র্যাক।'স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে জবাব দেয় আরিশ।

'আপনাদের ক্যাম্পাস বাড্ডাতে না?'

'হু।কেন বলো তো?'

শুভ্রা বোকা বোকা হেসে বলল,'না মানে আপনি হঠাৎ এই রাস্তায় এলেন তো তাই।'

আরিশ গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে গাঢ় স্বরে বলল,'এদিকে এসেছি কাজে।ভাইয়া পাঠিয়েছিল।তোমাদের কলেজের অফিসে একটা কাজ ছিল।তাই।'

শুভ্রা ছোট করে জবাব দিলো,'ওহহ বুঝেছি।'

প্রতিউত্তরে আরিশ কেবল একগাল হাসল।কুচকুচে কালো টয়োটার গাড়িটা নির্দিষ্ট গন্তব্য নিয়ে চলতে শুরু করে।সেই সাথে চলতে শুরু হয় দু'জন মানব মানবীর পথ চলা।তারা কি জানে তাদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায় গিয়ে থামবে?

_____________________________________________

শান্তিনগর বাজারের বিপরীত দিকের রাস্তায় কর্ণফুলী শপিং মলের সামনে প্রায় রোজই অস্থায়ী ভাবে কম বয়সী ছেলেরা তাদের জিনিসপত্র সাজিয়ে বেচাকেনার উদ্দেশ্যে বসে।

নবনীতা সেদিকে আসতেই হঠাৎ একটা ছেলেকে দেখে তার কদম শ্লথ হয়।সে এগিয়ে যায় তার দিকে।শ্যাম বর্ণের রোগা পাতলা ছেলেটিকে দেখতে খুবই অল্প বয়সের মনে হচ্ছে।তার পরনের সাদা গেঞ্জিটা ধুলো ময়লা জমে আর সাদা নেই,সেটা রীতিমতো ছাইরঙা হয়ে গেছে।তার মুখটা কতো মলিন! দায়িত্বের ভারে ঝুকে যাওয়া কাঁধটা নবনীতার কোমল হৃদয়ে আ'ঘাত করে।

সে এগিয়ে এসে বলে,'নাম কি তোমার বাচ্চা?'

ছেলেটি অবাক হয়ে তাকে দেখে।দেখেই গোল গোল চোখ করে বলে,'শাহাদাত।'

নবনীতা মিষ্টি করে হেসে বলে,'বাহ! খুব সুন্দর নাম তো।তোমার বয়স কতো শাহাদাত?'

শাহাদাত নামের ছেলেটি দায়সারাভাবে উত্তর দেয়,'এগারো।'

নবনীতার বুকটা ধ্বক করে উঠে।সে একহাত শাহাদাতের থুতনিতে রেখে মলিন মুখে জানতে চায়,'বাড়িতে আর কেউ নেই সোনা?তুমি এতো ছোট বয়সেই এসব করছ কেন?তোমার বাড়িতে কেউ নেই?'

শাহাদাত দুই দিকে মাথা নাড়ে।স্বাভাবিক গলায় বলে,'না আপা।আমার বাপ অনেক আগেই মই'রা গেছে।মা আমারে আর আমার বইনরে থুইয়া আরেক খানে গেছে গা।'

'তোমার বোনও আছে?' অবাক হয়ে প্রশ্ন করে নবনীতা।

শাহাদাত উত্তর দেয়,'হ আছে।তিন বছর বয়স।'

নবনীতা আঁতকে উঠে বলল,'তাকে কোথায় রেখে এসেছ তুমি?'

শাহাদাত তার তর্জনী তুলে মার্কেটের প্রবেশ পথের একটু ডানদিকে একজন মাঝবয়েসী মহিলার কোলে থাকা একটা ফুটফুটে মেয়ে বাচ্চাকে দেখিয়ে বলে,'ঐ যে বাচ্চাটা,এটাই আমার বইন।নাম বিভা।'

'আর এই মহিলাটা কে?'

'ফরিদা খালা।আমগোর লগেই থাকে বস্তিতে।'

নবনীতা ম্লান মুখে জবাব দেয়,'ওহহ আচ্ছা।'
তারপরই সে শাহাদাতের হাতে থাকা বইগুলো দেখে।ছোট বাচ্চাদের পড়ার বই।গত মাসেই সে চিত্রার জন্য এমন কয়েকটা বই কিনেছিল।সে ঠিক করেছে সে আজও কয়েকটা বই কিনবে।

সে দুইটা বই হাতে নিয়ে বলল,'কত রাখবে এই দু'টো?'

শাহাদাত জানায়,'একশো টাকা।'

নবনীতা তার পার্স থেকে দু'শো টাকা বের করে।টাকাটা শাহাদাতের হাতে গুজে দিয়ে বলে,'এই নাও দু'শো টাকা।একশো টাকা বইয়ের,আর বাকি একশো তোমার আর বিভার জন্য আমার ভালোবাসা।আপুর হাত খালি ভাই।নয়তো একটু বেশিই দিতাম।তুমি এই টাকায় বিভাকে কিছু কিনে খাওয়াবে কেমন?সাথে নিজেও খাবে,বুঝলে?'

এই সামান্য ভালোবাসা আর স্নেহের বাণীতে শাহাদাত নামের অনাথ ছেলেটির দুই চোখ কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠে।এতোক্ষণ নির্লিপ্ত আর নির্বিকার থাকা ছেলেটা আচমকাই ভীষণ আবেগী হয়ে নবনীতার হাতটা তার মাথায় রাখল।অনুভূতি জড়ানো গলায় বলল,'আপা আপনি একটু আমার জন্য দোয়া কইরা দেন।আপনে আসমানের হুর।আপনার দোয়া আল্লাহ কবুল করব।'

নবনীতা তার কথা শুনেই শব্দ করে হেসে ফেলল।হাসতে হাসতে বলল,'কেন?তোমার কেন আমাকে হুর মনে হচ্ছে?'

'ফরিদা খালা কইছে হুর রা হুদাও মাইনষেরে ভালোবাসে।আপনেও আমারে হুদাই এতো ভালোবাসা দিতাছেন।'

নবনীতা আরো কিছুক্ষণ খিলখিলিয়ে হাসল।তারপর শাহাদাতের মাথায় হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বলল,'অনেক বড়ো হও শাহাদাত।তোমার সাফল্যে যেন মানুষ ভীষণ আশ্চর্য হয়।খুব নাম করো সোনা।'

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই দূর থেকে কোথাও গো'লাগু'লির শব্দে আশপাশ চঞ্চল হয়ে উঠল।ঘটনার আকস্মিকতায় নবনীতা নিজেও কেঁপে উঠে।ঘটনা কি সেটা ঠাহর করতেই তার কয়েক মিনিট লেগে যায়।একটু সময় যেতেই সে বুঝল যে এটা গু'লি চালানোর শব্দ।আরো এক দফা সমস্ত শরীর অ'বশ হয়ে আসে তার।সে চোখ মেলে দেখে লোকজন সব ছুটে শপিং মলের ভেতর গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে।

গো'লাগু'লির শব্দ ধীরে ধীরে তীব্র হচ্ছে।ব্যস্ত রাস্তাটা হঠাৎই কেমন স্তব্ধ হয়ে গেছে।চারিদিকে লোকজনের চিৎ'কার শোনা যায় শুধু।নবনীতা একটু ধাতস্থ হয়েই শাহাদাতের একহাত ধরে বলল,'চলো শাহাদাত,আমরা ভেতরে গিয়ে একটু অপেক্ষা করি সবকিছু ঠিক হওয়ার।'

শাহাদাত তার হাতে থাকা বইগুলো বাদেও আরো অনেক বই ফুটপাতে বিছিয়ে রেখেছিল।সে সেগুলো দেখতে দেখতে তাড়াহুড়ো করে বলল,'আপনে যান।আমি এডি গুছায়া আসতাছি।'

কাছেই কোথাও এবার আবারো গু'লি চালানোর শব্দ হয়।নবনীতা একহাত নিজের মাথায় চে'পে ধরে।সে যদি আর এক মুহূর্তও এদিকে থাকে তাহলে নির্ঘাত সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।এই শব্দ গুলোতে তার অস্বস্তি হয়।সে কোনোরকমে মার্কেটের দিকে ছুটে যায়।নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নেয়।

আশপাশ থেকে উড়ো খবর কানে আসে আজ নাকি রাকিবের সমাবেশ ছিল রাজারবাগের দিকে।সে সমাবেশ কে ঘিরেই নাকি এই গো'লাগু'লির সূত্রপাত।কেউ কেউ বলছে শাহরিয়ার আরহাম প্রতি'শোধ পরায়ন হয়ে এই কাজ করেছে।কেউ আবার বলছে এটা নতুন কোনো ষড়'যন্ত্র।

দূর থেকে পুলিশের গাড়ির সাইরেন বাজানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে।সময়ের সাথেই শব্দ গুলো স্পষ্ট হতে থাকে।নবনীতা টের পায় দুর্বৃ'ত্তরা খুব কাছাকাছি কোথাও চলে এসেছে।

হঠাৎই তার চোখ যায় সড়কের অন্যপাশে।মুখে কাপড় বাঁধা একটা যুবক সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।তার হাতে উন্নত মডেলের একটা পি'স্তল।তার এক আঙুল ট্রিগারে রাখা।সে গু'লি করছে এলোপাতাড়ি।কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নেই।কেবল গু'লি করেই যাচ্ছে।রাস্তায় থাকা একটা কুকুরের গায়ে সে গুলি লাগতেই সেটা ছি'টকে মাটিতে গিয়ে পড়ল।তার র'ক্তে সড়কের বেশ খানিকটা অংশ র'ঞ্জিত হলো।নবনীতা পরনের ওড়না টা মুখে চাপে।তার বমি পাচ্ছে ভীষণ।

শাহাদাত তখনো তার বেচার জন্য কেনা বইগুলো গোছাতে ব্যস্ত।নবনীতা তাকে দেখেই চিৎ'কার করে বলল,'আর বই গোছাতে হবে না শাহাদাত।তুমি এদিকে আসো।এক্ষুনি আসো।'

শাহাদাত কেবলই তার কন্ঠ শুনে পেছন ফিরেছিল,তক্ষুনি এলোপাতাড়ি ছুড়'তে থাকা গু'লি গুলোর একটি তার পেটের কাছ দিয়ে ফুটো করে বেরিয়ে গেল।এগারো বছরের ছোট্ট ছেলেটা তার স্বপ্নেও এমনকিছু কল্পনা করেনি।সে ফ্যালফ্যাল চোখে নিজের পেটের দিকে দেখে।মুহূর্তেই তার ছোট্ট শরীরটা মাটিতে ঢলে পড়ে।নবনীতা গগন কাঁপিয়ে চিৎ'কার দেয়,'শাহাদাত!!!'

লোকজন কেউ কেউ ছুটে যায় শাহাদাতের দিকে।চেপে ধরে তার গু'লিবি'দ্ধ স্থান।আর নবনীতা?সে কি করল?

প্রচন্ড ঘৃ'ণা আর বুক ভর্তি সাহস নিয়ে তরুণীটি ক্ষি'প্র গতিতে ছুটে যায় সড়কের অন্যদিকে।ইতোমধ্যে পুলিশ পৌঁছে গেছে সেখানে।দুর্বৃ'ত্তরা যে যেখানে পালানো শুরু করেছে।ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া,টিয়ার'শেলের ধোঁয়া আর রাবার বু'লেটের শব্দে চারদিক কেমন গমগমে হয়ে ছিল।এরই মাঝে তরুণী টি সব ভয় ভীতি কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ছুটে যায় অবৈধ অ'স্ত্র হাতে দাঁড়ানো যুবকটির দিকে,যার ছোঁ'ড়া গু'লিতে শাহাদাতের ছোট্ট শরীরটা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে।সে গিয়েই এক থা'বায় তার মুখের সামনে থেকে কাপড় সরায়।

তার অকস্মাৎ আক্র'মনের জন্য যুবকটি প্রস্তুত ছিল না।মুখের উপর কেউ থা'বা দিতেই সে হকচকিয়ে ওঠে।নবনীতা একনজর তার মুখটা দেখেই গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে তার গালে একটা চ'ড় দেয়।চেঁ'চিয়ে উঠে বলে,'জানো'য়ার কোথাকার! তোর মতো জানো'য়ারের কাছে আরহাম কিচ্ছু না।'

ফাহাদ গালে হাত দিয়ে স্তব্ধ হয়ে কতোক্ষণ তাকে দেখল।মেয়েটা তাকে মে'রেছে?সে কি ধ'রা পড়ে গেছে?এটা কি করে সম্ভব?এই মেয়ের কি জানের ভয় নেই?পেছন থেকে পুলিশের একটি টিম ছুটে আসছিল তাদের দিকে।অবস্থা বেগতিক দেখে ফাহাদ এক ধা'ক্কায় নবনীতা কে মাটিতে ছু'ড়ে ফেলল।তারপরই তীব্র বেগে সামনের দিকে দৌঁড়ে পালায়।

মাটিতে পড়েও নবনীতা হাল ছাড়ল না।সে অস্থির হয়ে এদিক সেদিক খুঁজে একটা বড়ো সড়ো ইটের টুক'রো দেখতে পেল।সঙ্গে সঙ্গে সেটা হাতে তুলে সে ছু'ড়ে মারে ফাহাদের দিকে।

অব্যর্থ নিশানা।ইট টা গিয়ে পড়ে ফাহাদের ঘাড় বরাবর।সঙ্গে সঙ্গে তাল হারিয়ে সে মাটিতে গিয়ে পড়ে।আর উঠার সময়টুকুও পায়নি ফাহাদ।ব্যথা সহ্য করে উঠে বসতেই সে দেখল পুলিশের টিম টি তাকে ঘিরে ফেলেছে।এর মধ্যে একজন তার দিকে ব'ন্দুক তাক করে বলল,'নড়বে না একদম।ইউ আর আন্ডার এরেস্ট।'

নবনীতা নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়ায়।পুলিশদের পেছনে সব সাংবাদিকরা এসেছিল নিউজ কভার করতে।তাদের কেউ কেউ নবনীতাকে দেখেই ক্যামেরা আর মাইক্রোফোন হাতে ছুটে যায় তার দিকে।জানতে চায়,'এখানে কি হচ্ছিল খুলে বলুন ম্যাম।আপনি ঠিক আছেন তো?'

নবনীতা টেনে টেনে কয়েকবার শ্বাস নেয়।শেষে জড়ানো গলায় বলে,'আমি ভালো আছি।কিন্তু শাহাদাত ভালো নেই।'

চলবে-

[সুন্দর সুন্দর কমেন্ট করে মন ভালো করে দিন তো।মন ভালো থাকলে অতিরিক্ত অংশ দিলেও দিতে পারি রাতে🥱]#কোনো_এক_শ্রাবণে
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন

(২১)[দ্বিতীয় অংশ]

'নাচ না জানলে উঠান বাঁকা
যে বলে বলুক রে।
তাল বেতালে হেলেদুলে
কোমর টা দুলুক রে।'

সাউন্ড বক্সে এইটুকু অংশ বাজার পর আরহাম,আদি আর আরিশ সমস্বরে চেঁচিয়ে ওঠল,
'লে চান্স রে
লে চান্স রে
লে চান্স চান্স চান্স
লে পাগলু ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স ডান্স।'

তাদের চিল্লাফাল্লায় অ'তিষ্ঠ হয়ে তাসনুভা দুই হাত কান চেপে ধরে।এরা সেই তখন থেকে বেরস গলায় চেঁ'চিয়ে চেঁ'চিয়ে গান গাইছে আর উড়াধুরা নাচ দিচ্ছে।কোনো স্টেপ নাই,কোনো ছন্দ নাই।কেবল ইচ্ছে মতো লাফালাফি।তাসনুভা বিরক্ত হয়ে বলল,'থামবে তোমরা?তোমাদের চিৎ'কারে মাথা ধরে যাচ্ছে আমার।'

আরিশ লাফাতে লাফাতেই বলল,'না থামব না।আজকে নাচার দিন।থামবো কেন?'

আদি শ্বাস টানতে টানতে বলল,'ভাইরে পা ব্যথা হচ্ছে আমার।তবুও শুধু নাচতে ইচ্ছে হচ্ছে।ফাহাদ কট,ফাহাদ কট।ইয়েসসস ইয়েসসস।শা'লা একদম জায়গা মতো ধরা খেয়েছে।

আরহাম চি'ৎকার করতে করতে আর লাফালাফি করতে করতে রীতিমতো হাঁ'পিয়ে উঠেছে।তার গায়ে এখন শুধুমাত্র ফকফকে সাদা এক্সারসাইজ গেঞ্জি।পাঞ্জাবি সে সেই কখনোই খুলে ফেলেছে খুশির ঠেলায় তার কোনো ইয়াত্তা নেই।

সে ক্লান্ত পায়ে হেঁটে সোফার কাছে গেল,ঠিক ওয়াজিদের পাশটায় গিয়ে বসল।ওয়াজিদ তার দিকে ফিরে কিছুটা চোখ গরম করে বলল,'বাচ্চা হয়ে যাস তুই মাঝে মাঝে?হাতের ঘা শুকায়নি এখনো,আর তুই এই হাত নিয়ে নাচাকুদা করছিস?

আরহাম কতোক্ষণ জিরিয়ে নেয়।তারপরই উৎফুল্ল হয়ে বলে,'কি করব ভাই?আমার তো মারাত্মক আনন্দ হচ্ছে রে।'

আজ আরহামের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে অন্যরকম একটি দিন।বলা যায় যেদিন মনোনয়ন পত্র হাতে পেয়েছিল,তারপর থেকে এই দিনটিই তার সবচেয়ে ভালো দিন।

সে জানতো রাকিব আর ফাহাদ মিলে কোনো না কোনো ফন্দি আটছে।কিন্তু সেটা কি সে ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারছিল না।সে গু'লি খাওয়ার পর থেকে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল জনগণের মনে।এছাড়া রাকিবও তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছিল।তাই তারা পরিকল্পনা করে নিজেরাই নিজেদের সম্মেলনে হা'মলা করেছে,যেন জনগণ ভাবে এই কাজ আরহাম করেছে প্রতি'শোধ নেওয়ার জন্য।মোদ্দা কথা আরহামকে টেনে নিচে নামানোর জন্য আর নিজে নতুন করে সিম্পেথি পাওয়ার জন্য রাকিব এই কাজ করেছে।নিজের লোক দিয়ে নিজের সমাবেশে ঝামেলা বাধিয়েছে,যেন সব দোষ আরহামের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারে।

কিন্তু হলো টা কি?তার দলের ছেলেরাই পুলিশের কাছে ধরা খেয়ে স্বীকার করে নিল যে রাকিবই তাদের নির্দেশ দিয়েছিল নিজের সমাবেশে হা'মলা করে চারদিকে গন্ড'গোল বাধানোর জন্য।

আরহাম ফিচেল হাসে।লিভিং রুমের বড়ো টেলিভিশনের স্ত্রিনে প্রচার হওয়া সংবাদগুলো দেখে।আজকের পুরো ঘটনার খন্ড চিত্র গুলো টেলিভিশনে প্রচার করা হচ্ছে।রাজারবাগ থেকে শুরু করে শান্তিনগর।পুরো রাস্তার কিছু কিছু জায়গায় ভিডিও ফুটেজ কালেক্ট করা হয়েছে।দেখা যাচ্ছে রাকিবের দলের ছেলেরাই চোখ মুখ বেঁধে দু'র্বৃত্ত সেজে এই কাজ করছে।আরহাম হঠাৎই শান্ত হয়।স্থির দৃষ্টিতে টেলিভিশনের দিকে চোখ নেয়।অপেক্ষা করে কর্ণফুলী শপিং মলের সামনের ফুটেজটি সামনে আসার।

সেই ফুটেজ সামনে আসতেই সে প্রশস্ত হাসে।এ নিয়ে কয়বার সে এটা দেখেছে সে নিজেও জানে না।চারদিকে গু'লি আর সাউন্ড গ্রে'নেডের শব্দ।এদিকে সেদিকে পুলিশ।মুখ পেঁচিয়ে রাখা দুর্বৃ'ত্তরা এলোপাতাড়ি গু'লি ছু'ড়ছে।এরই মাঝে কোথা থেকে উল্কা বেগে একটি মেয়ে ছুটে এলো তার দিকে।এসেই এক থা'বায় তার মুখের সামনে থাকা কাপড়টি সরিয়ে নেয়।সজোরে একটা চ'ড় বসায় তার গালে।এই দৃশ্য আরহামের বুকের মাঝে এক পশলা বৃষ্টি নামায়।ইশশ কি শান্তি! ফাহাদকে এমন একটা দাবাং চট'কনা খাওয়ানোর কতো শখ ছিল তার।কিন্তু তার মনে রাখা উচিত ছিল দাবাং নবনীতা ছাড়া এই শখ পূরণ হওয়া সম্ভব না।

ফাহাদ আপাতত হাজতে আছে।হয়তো ছাড়া পাবে,নয়তো দুই একদিন থাকতে হবে।সেটা বড় বিষয় না।বড় বিষয় হচ্ছে ফাহাদ নিজেই প্রতি'হিংসার বশবর্তী হয়ে নিজের দলের ক্ষতি করেছে।আরহামকে ডিফেম করার জন্য সে অন্য দলের সাথে হাত মিলিয়ে।এই খবর জানাজানি হতেই কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে তাকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়েছে।উফফ! এতো আনন্দ আরহাম একদিনে কি করে সইবে?

সে উঠে দাঁড়িয়ে টেলিভিশনের সামনে যায়।বার বার শুধু এই মেয়েটিকেই দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তার।এতো সাহস এই মেয়ের! তোফায়েল ঠিকই নাম দিয়েছে তার।আরহাম একপেশে হাসে।হাসতে হাসতেই বলে,'পুরাই একটা লেডি ডন!'

আদি ক্লান্ত শ্বাস ছেড়ে বলল,'আমি শিউর নবনীতা কোনো ছদ্মবেশী বাঘ।সে মানুষ হতেই পারে না।'

তাসনুভা নাক ছিটকে বলল,'ছদ্মবেশী সাপ হয় শুনেছি,বাঘও হয় নাকি?'

'হু হয়।নবনীতাই সেটা।বাপরে! পুরোটাই কলিজা।কোনো হা'ড্ডি মাং'স নাই এই মেয়ের।একেবারে গ্যাংস্টার।'

আরিশ চঞ্চল হয়ে বলল,'সেই সেই।নবনীতা আপু আমার দেখা সবচেয়ে স্ট্রংগেস্ট গার্ল।কি সাহস তার! চোখে মুখে কি তেজ! আপুর একটা বায়োপিক বানানো যাবে।'

আরহাম তার কথা শুনেই একগাল হাসে।আদি ঠিকই বলেছে।সে সত্যিই বাঘ।একে আরহাম কেমন করে নিজের মনের কথা বলবে?তার পরিনতিও কি ফাহাদের মতো হবে?আনমনেই সে একহাত তার গালে ছোঁ'য়ায়।কিছু একটা কল্পনা করতেই নড়েচড়ে উঠে।নাহ ভাই,লেডি ডন দূর থেকেই সুন্দর।কাছে গেলেই বিপদ।আরহাম আবারো কিছু মনে করে হাসল।বিড়বিড় করে বলল,'আই অ্যাম সো প্রাউড অফ ইউ পরী।তোমার তুলনা শুধু তুমিই।তোমায় কি করে বোঝাই তোমায় আমি কতোখানি পছন্দ করি! তুমি তো সেই কথা শুনলেই তেড়ে আসবে আমাকে মা'রার জন্য।তোমার কোনো ভরসা নেই।'

কয়েক মিনিট পরেই আরহামের মোবাইল ফোনটি শব্দ করে বেজে উঠে।আরহাম ফোন রিসিভ করতেই অন্যপাশ থেকে তোফায়েল চিন্তিত গলায় বলল,'ভাই আজকে রাকিবের দলের লোকদের গু'লিতে যে কয়জন আহত হয়েছে তার মধ্যে একটা এগারো বছরের বাচ্চাও আছে,শাহাদাত নাম।তার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ।পেটে গু'লি খেয়েছে বেচারা।'

আরহাম আঁতকে উঠে বলল,'বলিস কি?ঐ শা'লা বাচ্চাকেও ছাড়ে নাই।যাকগে,অবস্থা কি বেশি খারাপ?'

'জ্বী ভাই একটু খারাপই।আমি এতোক্ষণ সেখানেই ছিলাম।ঐ নবনীতা নূরও এখানে আছে ভাই।'

আরহাম বিস্মিত হয়।চমকে উঠে বলে,'নবনীতা হসপিটালে আছে।'

'জ্বী ভাই।'

আরহাম গাঢ় স্বরে জবাব দেয়,'আচ্ছা তুই থাক।আমি আর ওয়াজিদ এখনি আসছি।'
.
.
.
.
স্ট্রেচারের কটকটে শব্দে নবনীতার মাথা ধরে যাচ্ছিল।তবুও সে চুপচাপ হাসপাতালের করিডোরে ফালানো বেঞ্চিতে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা।বাড়ির বাটন ফোনে ফোন দিয়ে সে জানিয়েছে তার ফিরতে দেরি হবে।

সে নিজের মুখটা দুই হাতে ঢেকে একটা ক্লান্তির নিশ্বাস ছাড়ে।তার চোখ একটু পর পর আর্দ্র হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু সে মানুষের সামনে কাঁদতে পারে না।সে কান্নাটুকু গিলে নেয়।তারপর পাশ ফিরে তার পাশের চেয়ারে বসে থাকা তিন বছর বয়সী ফুটফুটে কন্যা শিশুটিকে দেখে।তার নাম বিভা।যার পৃথিবীতে ভাই বাদে কেউ নেই।সেই ভাইটিও হাসপাতালে।হয়তো বাঁচবে,নয়তো চিরতরে পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে।তারপর?তারপর কি হবে?বিভার কি হবে?

সে হাত বাড়িয়ে তাকে নিজের কোলে নেয়।তার চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলে,'কিছু খাবে সোনা?খিদে পেয়েছে?'

বিভা কিছু বলল না।কেবল বড় বড় চোখ করে তাকে দেখল।নবনীতা তার কপালে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল,'কোনো ভয় নেই পাখি।তোমার শাহাদাত ভাইয়ার কিচ্ছু হবে না।সে বলেছিল আমার দোয়া কবুল হবে।আমি দোয়া করেছি সে খুব বড় হবে।সেই দোয়া পূরণ করা অব্দি তার কিচ্ছু হবে না বিভু।'

সে শক্ত করে বিভাকে নিজের সাথে চেপে ধরে।বিভা আজ থেকে তার ছোট্ট বাচ্চা।সে বিভাকে এই নোংরা পৃথিবীতে একা ছাড়বে না।এখন থেকে বিভাও তাদের সাথে থাকবে।কোথায় রাখবে,কি খাওয়াবে সে জানে না।কিন্তু নবনীতার ভেতরের মাতৃসত্ত্বাটি বিভাকে এভাবে ফেলে দিতে পারবে না।

আরো আধঘন্টা অতিক্রম হওয়ার পর হাসপাতালের স্টাফদের মাঝে একটু হম্বিতম্বি দেখা গেল।নবনীতা কয়েকজনের কথা শুনে বুঝল শাহরিয়ার আরহাম এসেছেন হাসপাতালে গু'লিবি'দ্ধ রোগীদের দেখতে।সবাইকে দেখার পর সবশেষে সে এলো শাহাদাতের ওয়ার্ডের সামনে।

শাহাদাতের তখন হুশ নেই।তার পাকস্থলীর তেমন ক্ষতি হয়নি,তবে কিডনিতে আঘাত লেগেছে।সেখানে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে।আরহাম তার ওয়ার্ডের সামনে আসতেই ত্যাছড়া নজরে একবার নবনীতাকে দেখল।তারপরই আবার চোখ সরিয়ে ডিউটিরত নার্স কে বলল এই ওয়ার্ডের ডাক্তার কে ডেকে পাঠাতে।

সরকারি হাসপাতাল।ওয়ার্ডে শাহাদাত বাদেও আরো অনেকে ছিল।ডাক্তার হাফিজ ঘর্মাক্ত শরীরে কেবিন থেকে বেরিয়ে এলেন।আরহাম কে দেখতেই করমর্দন করলেন।আরহাম জানতে চাইল শাহাদাতের অবস্থা কেমন।জনাব হাফিজ কিছুটা মলিন মুখে বললেন খুব একটা ভালো না।প্রচুর র'ক্তক্ষ'রণ হচ্ছে।

'মা বাবা আসেনি এখনো?'

'মা বাবা নেই তার।'
ডাক্তার হাফিজ চোখ দিয়ে নবনীতার দিকে ইশারা করে বললেন,'এই মেয়েটাই তাকে নিয়ে এসেছে।'

আরহাম কোনো উত্তর না দিয়ে কেবল মাথা নেড়ে এগিয়ে যায় তার দিকে।কোমল গলায় বলে,'এটা কে নবনী?'

নবনীতা উদাস মুখে জবাব দেয়,'বিভা।শাহাদাতের বোন।'

আরহাম ছোট করে কেবল বলল,'ওহহ আচ্ছা।'
কথা শেষ করেই সে চটপট কিছুক্ষণ নবনীতাকে দেখে নেয়।কি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে তাকে! তার কোলের বাচ্চাটি তার কেউ না,অথচ সে এমন করে তাকে বুকে চেপে রেখেছে যেন এটা তার সন্তান।আরহামের ইচ্ছে হচ্ছে তাকে শক্ত করে জাপটে ধরে বলতে,'তুমি এতো ভালো কেন পরী?তুমি কি সত্যিই কোনো পরী?'

অথচ সে তেমন কিছুই বলল না।কেবল গম্ভীর স্বরে বলল,'চিন্তা করো না তুমি।আমি শাহাদাতের চিকিৎসা করাবো।আমি সমস্ত খরচ বহন করব।এখানে না,প্রয়োজনে স্কয়ার কিংবা বার্ডেমে ট্রান্সফার করব।'

নবনীতা চোখ তুলে।একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঠান্ডা গলায় বলে,'জ্বী করতে পারেন।এতে আপনার জনপ্রিয়তা বাড়বে।'

আরহাম থমথমে মুখে শুধু তাকে দেখে।হাসপাতাল মন ভরে ঝগড়া করার জন্য উপযুক্ত না।তাই সে আর কথা বাড়ায় না।সমস্যা কি?ঝগড়া করার জন্য তো পুরো জীবনই পড়ে আছে।পরে না হয় কোনো একদিন তাকে বলা যাবে,'শুনো নবনীতা।তুমি যে সবসময় সবকিছুতে ভাবো আমি শুধু রাজনৈতিক স্বার্থে সবকিছু করি,এটা একদমই ঠিক না।আমি মাঝে মাঝে মন থেকেও মানুষের জন্য করি।এই যে বিগত কিছুদিন ধরে আমি তোমার বিরহে বদ্ধ উ'ন্মাদ হয়ে যাচ্ছি,এটাতে কি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ আছে বলো?পরীকে না দেখলে যে আমার বুকে ঝ'ড় উঠে সেটার পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ আছে বলো তো?'

সে অবশ্য সবটাই মনের ভেতর চেপে গেল।কেবল বিভার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,'দেখি আমাকে একটু দাও তো।'

নবনীতা চুপচাপ উঠে দাঁড়ায়।হাত বাড়িয়ে বিভাকে আরহামের কাছে দেয়।আরহামের বাম হাতটা হঠাৎ ছুটে যাওয়ার নবনীতা দ্রুত তার হাতটা বিভার পিঠের সাথে চেপে ধরল।আরহামের শক্ত খড়খড়ে হাতটি স্থান পেল নবনীতার রুগ্ন আর কোমল হাতের নিচে।ঘটনার আকস্মিকতায় দু'জনই চমকে উঠে দু'জনের দিকে তাকায়।দু'জনের দৃষ্টি বিনিময় হতেই নবনীতা চোখ সরিয়ে নেয়।কিন্তু আরহাম সাথে সাথেই চোখ সরায় না।সে আরেকটু মন ভরে দেখে,দেখতেই থাকে।সে অনুভব করতে পারছে কোনো এক গভীর মহাসমুদ্রে সে রোজ একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে।সে হেরে গেছে।তার পক্ষে আর এই মোহ থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব না।কিছুতেই সম্ভব না।

ওয়াজিদ তাদের দেখতেই দুই কদম পিছিয়ে গেল।বাস্তব কিংবা কল্পনা,সবকিছু থেকেই পিছিয়ে গেল।তার হাত কাঁপছে।গলার কাছে কিছু একটা এসে কাঁ'টার মতো বিঁ'ধেছে।সে ঢোক গিলে।আরো দু'কদম পিছায়।পেছাতেই থাকে।

চলবে-

[কোনো রিচেক নাই।অনেক টাইপিং মিস্টেক হয়েছে]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 21 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন