#কোনো_এক_শ্রাবণে [দ্বিতীয় অধ্যায়]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
(২৬)[প্রথম অংশ]
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর রিমি ব্যস্ত হয়ে পড়ল খাবার দাবারের আয়োজন নিয়ে।সারাহ চারদিক দেখে ঘাম মুছতে মুছতে হাঁসফাঁস করে বলল,'কি একটা অবস্থা! এসি পর্যন্ত নেই এখানে।'
তাসনুভা তার কথা শুনেই মুখ ভেংচায়।মনে মনে বিড়বিড় করে,'ফকিন্নি একটা!'
নবনীতা বিয়ের যাবতীয় কাজ শেষ হতেই চুপচাপ উঠে নিজের ঘরে চলে গেল।চিত্রা হেঁটে গিয়ে বসল ঠিক আরহামের পাশে।আরহাম তার চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,'কেমন আছো চিত্র?'
চিত্রা হাসল।মাথা নেড়ে জানাল সে ভালো আছে।আরহাম আগ্রহী হয়ে জানতে চাইল,'তোমার এখন কেমন লাগছে চিত্র?'
চিত্র দুই হাত প্রসারিত করে উৎফুল্ল কন্ঠে বলল,'এতো বেশি ভালো।তুমি এখন থেকে সত্যি সত্যিই আমার ভাইয়া।'
আরহাম তাকে তার এক কোলের উপর বসিয়ে টুপ করে তার দুই গালে চুমু খেয়ে হাসি হাসি মুখ করে বলল,'একদম একদম।আজ থেকে আমি অফিসিয়ালি তোমার আরাম ভাই চিত্র।'
____
শাড়ির আঁচল রিমিকে ভীষণ বিরক্ত করছিল।সে অবশেষে বিক্ষিপ্ত মেজাজে আঁচলটা কোমরে গুজে নিল।বসার ঘরটা কেমন নোংরা দেখাচ্ছে।সবাই এখন টেবিলে বসে খাচ্ছে।শারমিন তাদের বেড়ে দিচ্ছে সবকিছু।এই ফাঁকে রিমি দ্রুত ঝাড়ু নিয়ে বসার ঘরটা একটু ঝেড়ে নিল।ঝাড়া শেষেই সে চোখ বুলিয়ে একনজর পুরো ঘর দেখল।দেখেই গর্ব করে বলল,'সাব্বাশ রিমি।কি চমৎকার কাজ করিস তুই!'
সে ঝাড়ু টা কাঁধের উপর রেখে পেছন ঘুরল।ওয়াজিদ খাওয়া শেষে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে কেবলই বসার ঘরে এসেছিল।রিমি এই ঘরে আছে জানলে সে কোনোদিনই আসত না।আসা মাত্র কোথা থেকে একটি ঝাড়ু শূন্যে ভেসে তার কাঁধে এসে ধাক্কা খায়।
সে ধাক্কা খেয়েই হকচকিয়ে উঠে।তবে সে চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে এই কাজ কার।সে থমথমে মুখে সামনে তাকায়।রিমি হতভম্ব হয়ে গোল গোল মুখ করে তাকেই দেখছে।সে মুখ খোলার আগেই ওয়াজিদ একটানে বলে উঠে,'সরি ভাইয়া।মিস্টেক হয়ে গেছে।নেভার মাইন্ড।'
রিমি থতমত খেয়ে মুখ বন্ধ করে নেয়।কি অদ্ভুত! সে এটাই বলতে যাচ্ছিল।অথচ ওয়াজিদই নিজ থেকে সেটা বলে দিয়েছে।তার হতবাক চাহনি কে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ওয়াজিদ সোফায় গিয়ে বসল।তাসনুভা বসার ঘরে এসেই রিমি কে দেখামাত্র বলল,'সে কি! তুমি এই শাড়ি পরেই এতো কাজ করছ?'
ওয়াজিদ একটা ম্যাগাজিন হাতে নিয়ে বসেছিল।সে তাসনুভার কথা শুনতেই ম্যাগাজিন থেকে চোখ সরায়।একবার রিমিকে দেখে।দেখতেই একবার মুখ টিপে হাসল।কোমরে আঁচল গুজে ঝাড়ু হাতে তাকে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।সে আনমনে ম্যাগাজিনের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বিড়বিড় করে বলে,'পুরাই কাজের বেটি সখিনা।'
রিমির সাথে ওয়াজিদের নেভার মাইন্ড রিলেশন তখনো চলমান।সে খাবার শেষে সবাইকে ক্ষীর দিচ্ছিল।সবাই ঠিক মতোই দেখেশুনে হাতে নিল।একমাত্র ওয়াজিদ ম্যাগাজিনে চোখ রেখে আন্দাজে বাটিটা হাতে নিল।সে ঠিক মতো ধরার আগেই রিমি বাটিটা ছেড়ে দিলো।ফলাফল-সমস্ত ক্ষীর গিয়ে পড়লো ওয়াজিদের কোলের উপর।
রিমি আঁতকে উঠল।পরক্ষণেই চেঁচিয়ে উঠে বলল,'এইবার আপনার দোষ।একটু দেখে নিবেন না?'
ওয়াজিদ একবার নিজের কোল,আর একবার রিমির মুখ দেখল।তারপরই দাঁত কিড়মিড় করে বলল,'তুমি এরপর থেকে আমার ধাঁরের কাছেও আসবে না।গর্দভ একটা!'
রিমি তেঁতেঁ উঠে কিছু বলতেই যাচ্ছিল,কিন্তু হঠাৎই কিছু মনে পড়ায় সে থেমে গেল।ওয়াজিদ তার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষক ফোরামের সদস্য।কোনো কাজ লাগলে তার কাছেই যেতে হবে।খামোখা ঝগড়া করে সম্পর্ক খারাপ করে লাভ নেই।শেষে ভোগান্তি ঐ রিমিকেই পোহাতে হবে।
***
'হচ্ছে টা কি শুভি?আধঘন্টা ধরে টানাটানি করছিস।কানা নাকি তুই?'
নবনীতার গায়ের সমস্ত গয়না শুভ্রা অতি সন্তর্পণে খুলে এনেছে।কেবল ঝাপটা টা এমন ভাবে চুলের সাথে আটকে গেছে যে শুভ্রার পক্ষে সেটা এক টানে বের করা সম্ভব হচ্ছিল না।সে মুখ কাচুমাচু করে বলল,'একটু ধৈর্য ধরো আপাই।হয়ে যাবে।'
নবনীতা চটে গিয়ে বলল,'সেটা তো সেই তখন থেকে শুনছি।হয়ে যাবে,হয়ে যাবে।আর কখন হবে?তাড়াতাড়ি কর।'
শুভ্রা হতাশ চোখে তার বোনকে দেখে।বিয়ের পর সে একছুটে নিজের ঘরে এসেছে।এসেই নিজের গয়না নিয়ে টানাটানি শুরু করেছে।কানের দুল নিয়ে এমন টান দিচ্ছিল যে শুভ্রা ছুটে না এলে সে নির্ঘাত কান ছিঁড়ে সেটা বের করে আনতো।
অবশেষে শুভ্রা সক্ষম হয়েছে ঝাপটা টা তার মাথা থেকে আলাদা করতে।নবনীতা অলংকার মুক্ত হতেই দ্রুত উঠে দাঁড়ায়।শাড়ির কুচি সামলে আলমারির দিকে এগিয়ে যায়।শুভ্রা হাতে থাকা গয়না গুলো নবনীতাকে দেখিয়ে বলল,'এগুলো কি করব আপাই?'
নবনীতা আলমারিতে কাপড় খোঁজার ফাঁকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে সেদিকে দেখে।তার থমথমে মুখ দেখেই শুভ্রা তব্দা খায়।নবনীতা বরফ শীতল গলায় উত্তর দেয়,'এগুলো সব খেয়ে ফেল।'
বলেই আবার সে নিজের কাজে মন দেয়।আলমারি ঘেটে একটা সাদামাটা জামা বের করে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়।শুভ্রা তার হাতের জামা দেখেই মুখ কুঁচকায়।বিয়ের দিন কেউ এমন জামা পরে?যাক গে,বিয়ে যে করেছে এটাই তো অনেক।জামা নিয়ে বললে আবারও একটা ত্যাড়া উত্তর দিবে।শুভ্রা গয়না গুলো বাক্সে রেখে রান্নাঘরে গেল।রিমি আপু একা একা সব করছে।সে সাহায্য করলে কাজ একটু এগিয়ে যাবে।
নবনীতা লম্বা সময় নিয়ে গোসল করে যখন বের হলো,তখন দেয়াল ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছিল বিকেল পাঁচটা পনেরো।নবনীতা খাটের উপর রাখা ওড়না টা গায়ে চাপিয়ে বসার ঘরের দিকে উঁকি দেয়।সবাই সেখানেই আছে।রিমি আবার তাদের জন্য খাবারও অর্ডার করেছে।
নবনীতা একবার যাবে ভেবেও পরে আর গেল না।তাসনুভার সাথে একটু কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।সেদিন মেয়েটা বাড়ি এলো।একটু কথা বলার জন্য কতো অনুনয় বিনয় করল।নবনীতা তো তার দিকে ফিরেও তাকায়নি।তার এখন ইচ্ছে করছে তাসনুভার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলতে।কিন্তু সেটা সম্ভব না।তার কারণ হচ্ছে তাসনুভার বড় ভাই।যে কি-না তাসনুভাকে আগলে ধরে বসে আছে।এখন অবশ্য সে তাসনুভার ভাই না কেবল,তার স্বামীও।নবনীতা তাচ্ছিল্য করে হাসল।এ নাকি স্বামী! একে দেখে মনে হচ্ছে একটু আগে এর বিয়ে হয়েছে?
নবনীতা তাড়াতাড়ি দরজা ভিড়িয়ে নিজের খাটে গিয়ে বসল।তার কি?সে নিজেও তো কোনো বিবাহিত মেয়ের মতো আচরণ করছে না।সে পাখা ছেড়ে দিয়ে বালিশে মাথা রাখে।তার সাথে একটা অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে কিছুক্ষণ যাবত।বিগত কয়েকদিন তার কেমন অশান্তি অশান্তি লাগছিল।কিন্তু বিয়ের পর থেকেই সে অশান্তি ভাবটা কেটে গেছে।খুবই অদ্ভুত! তার এখন আরো বেশি কষ্টে থাকার কথা।কিন্তু অবাক করা বিষয় তার অতোটাও খারাপ লাগছে না।উল্টো হালকা লাগছে।কবুল বলার আগেও তার মুখ দিয়ে শব্দ আসছিল না।অখচ বিয়ে হওয়ার পর মনে হচ্ছে এমন কি হয়েছে?বিয়েই তো হয়েছে।সবার হয়,তার হয়েছে।সে তো আর সংসার করছে না।
নবনীতার শান্তি অবশ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় নি।সন্ধ্যার পরই রিমির ঘর গোছানো দেখে নবনীতা কপাল কুঁচকায়।অবাক হয়ে বলে,'এতো গোছগাছ করছিস কেন?তোর বিয়ে লেগেছে?'
রিমি গোছাতে গোছাতেই নিরেট স্বরে বলল,'না আমার লাগেনি।তোর লেগেছে।'
নবনীতা হাই তুলতে তুলতে অলস ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,'সে তো শেষ ও হয়ে গেছে।'
রিমি আড়চোখে একবার তাকে দেখে।তারপরই মুচকি হেসে বলে,'বিয়ে হয়েছে।বাসর তো আর হয়নি।সেটার ব্যবস্থা করছি।'
নবনীতা এক লাফে উঠে দাঁড়ায়।চেঁচিয়ে উঠে বলে,'কি?বাসর হবে মানে?ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি?'
রিমি নির্বিকার হয়ে জবাব দেয়,'না ময়না।কোনো ইয়ার্কি হচ্ছে না।বিয়ের পর সবারই বাসর হয়।ইটস ভেরি সিম্পল ডার্লিং।'
নবনীতা দুই কদম এগিয়ে আসে।নিশ্বাস বন্ধ করে বলে,'রিমি! আমাদের এটা কোনো নরমাল বিয়ে না।বিয়ের সময় এমন কিছু বলা হয় নি।বলেছিল যে যার মতো যার যার ঘরে থাকবো।'
'সেটা তো থাকবিই।'
'তাহলে এসব বাসর টাসর কেন?'
'আরহাম ভাই আজ তোর ঘরে থাকবেন।'
নবনীতা চাপা স্বরে চেঁচিয়ে উঠে,'কিন্তু কেন?'
রিমি তার সামনে তুই হাত জোর করে মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল,'আমি জানি না রে বইন।তুই গিয়ে তোর মামাকে জিজ্ঞেস কর।তোর মামাই আমাকে বলেছে সব করতে।বিয়ের রাতে বর বউ একসাথেই থাকে।এটাই নিয়ম।'
নবনীতা কতোক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।তারপরই জেদ দেখিয়ে বলল,'করব না আমি বাসর।ঐ নেশা'খোরের সাথে এক ঘরে আমি কিছুতেই থাকবো না।'
'ভেরি গুড।এখন এই ক্যাচাল আমার কাছে না করে তোর মামার কাছে গিয়ে কর।আমাকে বলছিস কেন?'
নবনীতা অসহায় মুখে হেঁটে এসে ধপ করে খাটে বসে পড়ল।আতঙ্কিত চোখে রিমিকে দেখে বলল,'ঐ বদমাশ টা যদি কিছু করে?তখন?'
রিমি তার কথা শুনেই খিলখিল করে কতোক্ষণ হাসল।শেষটায় পেটে হাত চেপে বলল,'বিয়ে হয়েছে তোর নবনী।কিসব যা তা বলছিস।কিছু করে মানে?পা'গল নাকি তুই?'
'বার বার এক কথা বলবি না তো।আমাদের কোনো স্বাভাবিক বিয়ে হয়নি।এসব নিয়ে আমি একবারও ভাবিনি।'
'না ভাবলে এখন ভেবে ফেল।'চটপট উত্তর দেয় রিমি।
নবনীতা আশাহত হয়ে কতোক্ষণ খাটে বসে থাকল।মামাকে কিছু বলে লাভ নেই।সে মামাকে বলেছে সে সব কথা শুনবে।নবনীতা ক্লান্ত চোখে পুরো ঘরটা একবার দেখল।খাটের সাইড বক্সের দিকে চোখ পড়তেই সে থামল।সেটার উপর একটা পিতলের ফুলদানি আছে।নবনীতা সেটা নেড়ে চেড়ে দেখে।সে প্রথমে ঐ বদমাশ টা কে মুখ দিয়ে বারণ করবে।তাতেও যদি কাজ না হয় তাহলে সে সোজা এটা দিয়ে তার মাথা ফা'টিয়ে দিবে।সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে।সে এটাই করবে।এরপর যা হওয়ার হবে।
***
রাত প্রায় নয়টার দিকে আদি ঘড়ি দেখতে দেখতে উঠে দাঁড়াল।আরহাম তখন সাদেক সাহেবের ঘরের সাথে থাকা বারান্দায় কারো সাথে ফোনালাপে ব্যস্ত।বিকেলের পর থেকেই তার একটার পর একটা ফোন আসছে।সে সেগুলোর জবাব দিতে দিতে হয়রান।
আদি আরো একবার সময় দেখে বলল,'চল আমরা মিলে আরহামকে লুট করি।'
তাসনুভা চোখ তুলে অবাক হয়ে জানতে চায়,'লুট করব মানে?'
'আহা! শা'লা একটু পরে বউয়ের কাছে যাবে না?আমরা যাওয়ার আগে তার রোড ব্লক করে দিব।মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করব।টাকা না দিলে বউয়ের কাছে যেতে দিব না।'
তাসনুভা আপত্তি করে বলল,'কিন্তু ভাইয়াদের বাসর তো নরমাল বাসর না।'
আদি খ্যাক করে উঠে বলে,'এসব আবার কেমন কথা?নরমাল এব-নরমাল আবার কি জিনিস?বাসর বাসরই।ভেতরে গিয়ে এরা চুলোচুলি করুক,মারামারি করুক,একটা আরেকটা কে খু*ন করে ফেলুক।আমাদের কি?'
আরিশ তার কথা শুনে কিছুটা ভাবুক হয়ে বলল,'ভাইয়া নিজেও তো বউয়ের কাছে যেতে চায় না।সেক্ষেত্রে আমরা বাঁধা দিলে সে তো আরো খুশি হবে উল্টো।'
আদি গালে হাত রাখে।গম্ভীর হয়ে বলে,'রাইট।কথায় যুক্তি আছে।দাঁড়া অন্য কিছু ভাবি।'
আরহাম সব কাজ শেষ করে বারান্দা থেকে বেরিয়ে বসার ঘরের দিকে যেতেই আদি সহ বাকিরা তাকে ঘিরে ধরল।সারাহ বাদে সবাই সেখানে উপস্থিত ছিল।সারাহ দুপুরে কোনোরকমে খেয়েই চলে গিয়েছে।তার নাকি এখানে ভীষণ গরম লাগছে।এসি ছাড়া থাকার তার অভ্যাস নেই।
আরহাম চোখ সরু করে বলল,'কি?সমস্যা কি?'
আদি বুকে হাত বেঁধে বলল,'সমস্যা কিছু নেই।'
'তাহলে এমন ঘিরে ধরেছিস কেন মৌমাছির মতো?'
আদি কোনো ভূমিকায় গেল না।সোজা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,'টাকা দে।'
'কি?টাকা দিব মানে?কোন সুখে টাকা দিব তোকে?যা সর।'
আরহাম তাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগেই আদি দ্রুত তার দুই কাঁধ চেপে ধরল।আরিশ জেদ ধরে বলল,'না ভাইয়া,আজকে আমাদের টাকা দিতেই হবে।বাসর ঘরে যাওয়ার আগে এমন টাকা দেওয়ার নিয়ম আছে।'
আরহাম তার কথা শুনেই কুটিল হেসে বলল,'কেন কেন?না দিলে কি করবি?আমার প্রাইভেসি নষ্ট করবি?কর।আমার কোনো আপত্তি নাই।'
'জ্বী না।তোমার প্রাইভেসি নষ্ট করব না।তোমার সিকিউরিটি নিশ্চিত করব।'
আরহাম বিস্মিত হয়ে শুধায়,'আমার সিকিউরিটি আবার কি?'
আদি দায়সারাভাবে জবাব দেয়,'তোর ডন বউ যদি তোকে মে'রে ফেলে?তখন আমরা গিয়ে তোকে বাঁচাবো,বুঝলি?আর টাকা না দিলে মরে ভূত হয়ে গেলেও আমরা তোকে বাঁচাতে যাবো না।হুহ।'
আরহাম স্তব্ধ হয়ে তার কথা শুনে।গুনে গুনে তিন সেকেন্ড পরে সে শব্দ করে হেসে উঠে উপহাস করে বলে,'হোয়াট?সে আমাকে মা'রবে?আর আমি চুপ করে বসে থাকবো?'
ওয়াজিদ আশ্চর্য হয়ে বলল,'তুইও উল্টো আরো কয়েকটা দিবি নাকি?'
আরহাম পাঞ্জাবির কলার টেনে ঠিক করল।ভাব নিয়ে বলল,'শোন।আমি আরহাম।শাহরিয়ার আরহাম।বউ কেমন করে পোষ মানাতে হয় সেটা আমি জানি।'
সে থামল।গোল গোল কয়েক জোড়া চোখের দৃষ্টি তারই দিকে।আরহাম গম্ভীর হয়ে বলল,'মাত্র তো বিয়ে হয়েছে।দেখবি এমন টাইট দিব,গর্জন টর্জন ভুলে সারাদিন শুধু ম্যাও ম্যাও করবে।'
আরিশ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল,'কে?তুমি না ভাবি?'
আরহাম থতমত খায়।আদি হো হো করে হেসে উঠে বলে,'এক্সাক্টলি।সেটাই জানতে চাইছিলাম।'
আরহাম সেসব কথা গায়ে মাখল না।পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তার পকেটে থাকা মানিব্যাগের পুরোটাই তাদের হাতে তুলে দিলো।আদি দুই হাত দিয়ে সেটা বুকের সাথে চেপে ধরল।প্রশস্ত হেসে বলল,'ইশশ শান্তি! যা যা শুভ বাসর মোবারক।ম'রে গেলে জেনে রাখিস আমরা তোকে খুব ভালোবাসতাম।'
আরহাম কুটিল হাসে।এক হাতে তুড়ি মেরে তাচ্ছিল্য করে বলে,'মাত্র তো বিয়ে হয়েছে।এই তেজ এই জেদ আর ক'দিন পর থাকবে না।দেখবি আমি পাত্তা দিব না,তাও নবনীতা আরহাম আরহাম করে হেদিয়ে মরবে।দেখে নিস।'
আরহাম নবনীতার ঘরে ঢোকার আগে তিনবার দোয়া ইউনুস পাঠ করে গায়ে ফু দিলো।বলা তো যায় না।যেই মেয়ে! ঘরে ঢুকতেই দা বটি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়তে পারে।
আদি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।গম্ভীর হয়ে বলে,'ভবিষ্যৎে যে কি হবে,তার একটু আভাস এখনই পাওয়া যাচ্ছে।'
আরহাম কটমট করে বলল,'চুপ থাক।তুই বেশি বুঝিস।'
সে ধীর পায়ে এগিয়ে আস্তে করে দরজার সামনের লক ঘোরায়।আদি পেছন থেকে সতর্ক করে বলল,'সাবধান বন্ধু! বেশি চুটকি ফুটকি বাজাতে যাস না আবার।মেয়ে কিন্তু সুবিধার না।'
আরহাম নবনীতার ঘরে যেতেই আদি দ্রুত তার মানিব্যাগ খুলল।খুলতেই তার চোয়াল ঝুলে গেল।সে আঁতকে উঠে বলল,'কি রে?এটা তো খালি।'
সে পুরো ব্যাগ হাতড়ে একটা চিরকুটের মতো কিছু পেল।সেটা খুলতেই দেখল সেখানে বড়ো করে লিখা "ঘোড়ার আন্ডা"
আদি খ্যাক খ্যাক করে উঠে বলল,'শা'লা একটা জাত ছ্যাচড়া।ছ্যাচড়ামোর ও একটা সীমা থাকে।'
তাসনুভা চোখ সরু করে বলল,'কাগজের পেছনেও তো কিছু লিখা আছে।দেখো তো।'
আদি দ্রুত কাগজ টা উল্টে নেয়।মাথা নেড়ে বলে,'তাই তো'
কাগজের পেছনে গোটা গোটা অক্ষরে লিখা,'সব টাকা আমার বড় শ্যালিকা কে দিয়ে দিয়েছি।সব কাজ তো সে ই করেছে।তোদের মতো ঘোড়ার আন্ডা সার্ভিস দেওয়া পাবলিকের জন্য আমার পক্ষ থেকেও ঘোড়ার আন্ডা সালামি দিলাম।'
চিরকুটের লিখা পড়েই রিমির হাসি পেল।বিকেলেই আরহাম তাকে তার মানিব্যাগের সব টাকা বের করে দিয়ে দিয়েছে।সে সেগুলো আলমারিতে যত্ন করে রেখেছে।আদি চিরকুট পড়েই রিমির দিকে দেখে গজরাতে গজরাতে বলল,'শা'লা কতো বড়ো বাটপার! যাহ,এবার তোর বউ তোকে মে'রে ফেলুক।আমরা কেউ কিছু বলব না।তোর বড় শ্যালিকা গিয়ে তোকে বাঁচাবে।'
রিমি তার কথা শুনেই চোখ পাকিয়ে বলল,'মে'রে ফেলবে মানে?আমার দুলাভাই কি সস্তা নাকি?'
কথা বলেই সে এক আঙুল তুলে মিছেমিছি হুংকার দিয়ে বলল,'আমার দুলাভাইয়ের গায়ে যদি আজ একটা আঁচড়ও লাগে,তাহলে লা'শ পড়বে লা'শ।এ আমি বলে দিলাম।'
তার কথার ধরনে কিছু একটা ছিল।যেটা শত অস্বস্তির মাঝেও ওয়াজিদের মন ভালো করে দিলো।সে তার কথা শুনতেই হো হো করে হেসে ফেললো।বাকিরা সব চোখ ঘুরিয়ে তাকে দেখছিল।ওয়াজিদ মুখে হাত চেপে হাসি থামানোর চেষ্টা করল।রিমি অবাক হয়ে কয়েক পলক তাকে দেখে গেল।কতো সুন্দর হাস্যোজ্জ্বল একটি মুখ! অথচ এই সুন্দর প্রাণবন্ত হাসি এতোদিন গাম্ভীর্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে ছিল।এই প্রাণবন্ত ওয়াজিদ কে রিমির ভালো লাগছে,বেশ ভালো লাগছে।
চলবে-#কোনো_এক_শ্রাবণে [দ্বিতীয় অধ্যায়]
লেখনীতে #মেহরিমা_আফরিন
(২৬)[দ্বিতীয় অংশ]
[রিচেক নেই।বুঝে নিয়েন কষ্ট করে]
একেবারে পরিপাটি পরিচ্ছন্ন একটি ঘর।দেয়ালে একটা সুন্দর ওয়াল পেইন্ট ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।নবনীতার হাবিজাবি খরচার মাঝে এটাও অন্তর্ভুক্ত।সে বেতন হাতে পেয়েই এটা কিনেছে।
বাইরে খুব সুন্দর চাঁদের আলো।সেই আলোর সামান্য খানিকটা নবনীতার ঘরেও আসছিলো।কিন্তু বাল্ব জ্বালানোর কারণে সেই আলো আর বোঝা যাচ্ছিল না।নবনীতা চুপচাপ খাটের এক কোণায় বসেছিল।তার হাতে মুঠ করে রাখা ফুলদানি।আরহাম বাড়াবাড়ি করলেই সে তার মাথা ফা'টাবে।যদিও কারো মাথা ফাটানোর অভিজ্ঞতা তার নেই।যাক গে ব্যাপার না।অভিজ্ঞতা না হলে নতুন করে হবে।এটা আবার এমন কি?
দরজার লক ঘোরানোর শব্দতেই নবনীতা নড়েচড়ে বসল।ক্যাচ ক্যাচ শব্দে দরজা খুলেই আরহাম ভেতরে উঁকি দিয়ে একবার ভেতরের অবস্থা দেখল।নাহ,পরিস্থিতি ঠান্ডাই মনে হচ্ছে।সে আস্তে করে দরজা বন্ধ করল।ছিটকিনি তে হাত দিতেই নবনীতা চেঁচিয়ে ওঠল,'ঐটা লাগানোর কোনো দরকার নাই।বাইরে কোনো বাঘ সিংহ নেই যে আমাদের খেয়ে নিবে।'
আরহাম একবার তাকে দেখল।তারপরই শব্দ করে ছিটকিনি তুলে দরজা বন্ধ করল।পাশাপাশি লক ও করল।তারপর গট গট করে হেঁটে আসতে আসতে বলল,'আমার এভাবে দরজা খুলে উদাম হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস নেই।আমি দরজা বন্ধ করে উদাম হয়ে ঘুমাই।'
আরহাম খুবই সাচ্ছন্দ্য হেঁটে এসে আরাম করে খাটে বসল।মাথার বালিশটা পিঠের পেছনে রেখে হেলান দিলো।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার নবনীতাকে দেখল।নবনীতা দ্রুত চোখ নামিয়ে শক্ত করে ফুলদানি টা চেপে ধরল।অবস্থা ভালো না।পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলেই নবনীতা তার মাথা ফা'টিয়ে দু'ভাগ করবে।
আরহাম তাকে দেখেই কুটিল হেসে বলল,'হ্যালো সেনোরিটা।কেমন আছ?'
নবনীতা তীর্যক চোখে একবার তাকে দেখেই মাথা নামিয়ে নেয়।মনে মনে জবাব দেয়,'তোর সাথে বিয়ে হবার পর কেউ ভালো থাকতে পারে?'
অথচ মুখ ফুটে সে তেমন কিছুই বলল না।
আরহাম একটু কেশে কন্ঠ পরিষ্কার করে নেয়।তার কাটখোট্টা স্বরে মধু মাখিয়ে মেকি হেসে বলে,'তোমার মনে হয় না এখন আমাদের একটু সহজ হওয়া উচিত?'
নবনীতা এক শব্দে উত্তর দেয়,'না।'
আরহাম মুখ খিঁচিয়ে তাকে দেখে।একটু সময় নিয়ে উত্তর দিলেও তো পারত।এমন মুখের উপর কে উত্তর দেয়?সে তবুও ভদ্রতা দেখিয়ে বলল,'যাকগে,সেটা তোমার বিষয় তুমি কি করবে।আমারটা আমি বললাম।আমি এতো পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে পারি না।এসব ঝগড়াঝাটি মেয়েদের স্বভাব।তুমিও এখন থেকে আমার সাথে ভালো করে কথা বলবে।আমি তোমার হাসবেন্ড।বুঝেছ?'
নবনীতা ফুলদানি থেকে হাত ছেড়ে দুই হাত হাঁটুর উপর রাখল।মাথা নুয়িয়ে চাপা স্বরে বিড়বিড় করল,'নে'শাখোর একটা!'
আরহাম তার কথা শুনতেই তেঁতেঁ উঠে বলল,'এ্যাই বেয়াদব! তুমি কি বললে?'
নবনীতা অন্যদিকে চোখ সরিয়ে চুপচাপ সেদিকে দেখে।আরহামের দুই হাত নিশপিশ করছে।মন চাচ্ছে ঠাটিয়ে দু'টো চড় দিতে।কিন্তু এটা সম্ভব না।নবনীতার সাথে এসবে যেতে চায় না সে।নবনীতার কোনো ভরসা নেই।সে সিদ্ধান্ত নিল সে আর তাকে ঘাটাবে না।অনেক সৌজন্যে দেখিয়েছে।বিনিময়ে নে'শাখো'র তকমা পেয়েছে।এখন সে হাত পা ছড়িয়ে আরামের ঘুম দিবে।নবনীতার সাথে পরেও কথা বলা যাবে।বিয়ে হয়েছে তাদের।কথা বলার জন্য গোটা জীবনই পরে আছে।আপাতত ঘুমিয়ে যাওয়াই ভালো।
সে এক টানে গায়ের পাঞ্জাবি টা খুলে নিল।নবনীতা লাফ দিয়ে খাট থেকে নেমে হতবাক হয়ে বলল,'এসব কি?'
আরহাম নিজেও অবাক হলো।চোখ বড় বড় করে বলল,'কি আবার কি?গরম লাগছে আমার।'
'এজন্য সব খুলে ফেলবেন?'
'সব খুলিনি।পাঞ্জাবি খুলেছি।তুমি যেমন শাড়ি পাল্টেছ অনেকটা তেমন।'
নবনীতা চোখ পাকিয়ে বলল,'এতো শখ থাকলে বাড়ি যেতে পারলেন না?আরেকজনের বাড়িতে পড়ে আছেন কেন?'
আরহাম মহা বিরক্ত হয়ে জবাব দেয়,'সেটা তোমার মামাকে বলো না।আমাকে কেন বলছ?আমি কি তোমার সাথে থাকার জন্য হেদিয়ে মরছি?'
নবনীতা চুপচাপ আবার খাটে এসে বসল।তার পেঁচার মতো করে রাখা মুখটা একবার দেখেই আরহাম পিঠের পেছনে রাখা বালিশটা খাটে ফেলে তার উপর মাথা রাখল।খানিকটা আদেশের সুরে বলল,'ফ্যানের রেগুলেটর ঘুরিয়ে স্পিড বাড়াও তো।গরম লাগছে ভীষণ।'
নবনীতা কটমট করে বলল,'পারব না।নিজে উঠে বাড়ান।'
আরহাম চোখ বন্ধ করেই গাঢ় স্বরে বলল,'স্বামীর সাথে বোয়াদবি করতে নেই।যাও স্পিড বাড়াও।'
নবনীতা খাটের এক কোণায় রাখা ফুলদানি টা তুলে আরহামের মাথা বরাবর সেটা উঁচিয়ে ধরল।মন চাইছে এখনই এটা তার মুখ বরাবর ছেড়ে দিতে।কিন্তু সে এই কাজ করবে না।আর যাই হোক,সে পাগল না।ফুলদানি টা স্বস্থানে রেখে সে উঠে গিয়ে পাখার স্পিড বাড়ায়।আরহাম কতোক্ষণ এপাশ ওপাশ করে বিরক্ত হয়ে বলল,'এ্যাই পরী! একটা কোলবালিশ দাও তো।'
নবনীতা চোয়াল শক্ত করে জবাব দেয়,'পারব না।এতো আদর যত্ন করতে পারব না।কিছু বলছি না দেখে একটার পর একটা বলেই যাচ্ছেন।'
আরহাম চোখ খুলল।মুচকি হেসে বলল,'তাহলে কিছু বলো।এমন চুপ মেরে আছো কেন?'
নবনীতা কথা না বাড়িয়ে আলমারি থেকে কোলবালিশ বের করে আরহামকে দিলো।আরহাম সেটা পেতেই গাঢ় স্বরে বলল,'ধন্যবাদ।এমনই স্বামীর সেবা করতে থাকো।'
নবনীতা কথা বাড়ালো না।ঘরের বাতি নিভিয়ে চুপচাপ রুমের সাথে থাকা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো।আরহামা মাথা তুলে একবার সেদিকে দেখল।তার কি এখন ভালো জামাইয়ের মতো সেদিকে যাওয়া উচিত?গিয়ে সঙ্গ দেওয়া উচিত?নাকি আরামে একটা ঘুম দেওয়া উচিত?
আরহাম বেছে নিল শেষেরটা।সে হাত পা ছড়িয়ে মরার মতো ঘুম দিবে।বউদের বেশি প্যাম্পার করা উচিত না।বেশি লাই দিলে মাথায় উঠে যাবে।তখন এদের মাথা থেকে নামাতে কষ্ট হবে।বউদের বেশি ভালোবাসলে পরিণাম খুব একটা ভালো হয় না।আরহাম এর ভুক্তভোগী।সে নিজ চোখ দেখেছে।সে বারান্দায় গেল না।উল্টো নবনীতার মাথার বালিশটাও নিজের কাছে এনে সেটা তার মাথার উপর চেপে ধরল।এভাবে না ঘুমালে সে ঘুমুতে পারে না।
নবনীতা বারান্দার গ্রিলে হাত রেখে দাঁড়ায়।এখান থেকে চারদিকে দৃশ্য বেশ ভালো লাগে।আকাশটাও ভালো দেখা যায়।সে বাতি নেভানোর পরই টের পেল আজকের চাঁদটা বেশ বড়।হয়ত কাল কিংবা পরশুই পূর্ণিমা।নবনীতা বারান্দার গ্রিলে কপাল ঠেকিয়ে ক্লান্ত শ্বাস ছাড়ে।
বিয়ে নিয়ে সে বিগত ছয় বছরে একটি বারও ভাবে নি।যত সম্বন্ধ এসেছিল,সে দুই মিনিটের জন্যও কিছু না ভেবে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছে।সে কখনোই সংসার কিংবা স্বামী এই বিষয় গুলো মস্তিষ্কে ঠাই দেয় নি।এখন ঘটনা প্রবাহে সে একজনের স্ত্রী।বিয়ে হয়েছে।ক'দিন বাদে সংসারও হবে তার।হবে অবশ্যই।সে কতোদিন আর পালিয়ে বেড়াবে?কিন্তু দুঃখের বিষয় যার সাথে তার বিয়ে হয়েছে তাকে তার পছন্দ না।
অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ এক জিনিস।নতুন করে দু'জন দু'জনকে চিনবে।এই ব্যাপারটা মানানসই।কিন্তু তার তো সেই অবস্থাও নেই।নতুন করে নিজের বর কে জানার কিছু নেই।তার বর যে কি জিনিস সেটা সে বিয়ের আগেই জেনে নিয়েছে।তার পরবর্তী দিনগুলো কেমন কাটবে ভাবলেই তার কেমন অসহ্য লাগে সবকিছু।
সে আবারো আকাশ দেখে।কৈশোরে বিয়ে নিয়ে টুকটাক কিছু ইচ্ছে ছিল তার।মনে হতো কোনো এক পূর্ণিমা রাত্তিরে বিবাহের পর নিজের বর কে নিয়ে সে চন্দ্র বিলাশ করবে।জীবনের ভালো মন্দ অসংখ্য গল্প তাকে শোনাবে।অথচ তার বিয়েতে সেরকম কিছুই হয় নি।
সে আধঘন্টা পর নিজ থেকেই ভেতরে এলো।চাঁদের আবছা আলো তে মোটামুটি সবকিছুই দেখা যাচ্ছিল।নবনীতা একবার অন্যমনস্ক হয়ে খাটের দিকে তাকাতেই তার দুই চোখ স্থির হলো।আরহামের ঘুমের ধরন দেখেই তার হাসি পেল।সে দ্রুত একহাতে তার মুখ চেপে ধরল।মুখে সেই হাসি ধরেই সামনে এগিয়ে গেল।
সাইডবক্সের উপর তার ফোন রাখা ছিল।সে সেটা হাতে নিয়েই চটপট তার কয়েকটা ছবি তুলে নিল।হাসি চেপে রাখার পরেও তার হাসি বেরিয়ে যাচ্ছিল।নিজের বাচ্চামো দেখে তার নিজেরই মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে।কিন্তু কি আর করার?মন কে যতোই শক্ত খোলসে ঢেকে রাখুক না কেন,সে তো সবসময়ই সুযোগ বুঝে সেই আগের নবনীতা কে খুঁজে আনার চেষ্টা করে।যেই নবনীতা ছয় বছর আগেই বিলীন হয়ে গেছে।যেই নবনীতা ছয় বছর আগেই নিজের ভালো থাকা ছেড়ে দিয়েছে।
নবনীতা তার টেবিলের উপর থেকে পুরোনো ফটো অ্যালবাম টা হাতে নেয়।পাতা উল্টে উল্টে নিজেদের পুরোনো ছবি দেখে।এগুলো দেখলেই সে ভীষণ আবেগী হয়ে যায়।বিশেষ করে বাবার ছবি দেখলে।সে তার মা কে ভালোবাসে না বিষয়টা একদমই এমন না।কিন্তু বাবাকে সে প্রচন্ড রকমের ভালোবাসে।বাবা তাকে ছোট বেলা থেকেই সাহসী রূপে বড় করেছে।বাবা তাকে জীবনের বহু পাঠ দিয়েছে।সে বাবাকে সাংঘাতিক ভালোবাসে।আজকের এই বিশেষ দিনে যতবারই চোখ বন্ধ করছে,ততবারই তার বাবার প্রতিচ্ছবি চোখের পর্দায় ভেসে উঠছে।নবনীতা আলগোছে চোখ মুছে।বাবা সবসময় বলত নবনীতার জীবনে খুব ভালো কেউ আসবে।নবনীতার সংসার জীবন ভীষণ সুখের হবে।বাবার এই কথা মনে পড়তেই সে আরেকবার খাটের দিকে চোখ নেয়।আরহাম এখন বালিশ ছেড়ে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমুচ্ছে।নবনীতা হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে।বাবার এই সুন্দর দোয়া আল্লাহ কবুল করেনি।বাবা তার জীবনে যেই সুপুরুষের আগমন চেয়েছিল,সেই সুপুরুষ আর যেই হোক,আরহাম না।
নবনীতা চুপচাপ পাতা উল্টায়।তার ইচ্ছে ছিল বিয়ে হলে বরকে সারারাত বসে বসে তার পুরোনো অ্যালবাম দেখাবে।তার বর সেই ছবি দেখে আশ্চর্য হয়ে বলবে,'আরে! এটা তুমি?'
নবনীতা তখন একগাল হেসে মাথা নেড়ে বলবে,'হ্যাঁ।এটা আমিই।চেনা যাচ্ছে না তাই না?'
***
আকাশে চাঁদ উঠেছে।সেই সাথে আছে অগণিত তারা।শরৎ শুরু হতেই প্রকৃতির রূপ হুট করেই পাল্টে গেছে।আকাশ কিছুটা স্বচ্ছ দেখাচ্ছে।সেই আকাশ পানে দেখেই ওয়াজিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।হাতের সিগারেট টা শেষ হওয়ার পথে।সে তাদের বাড়ির ছাদে বসেছে।রেলিংয়ের দুই পাশে দুই পা ঝুলিয়ে।হঠাৎই ছাদের দরজায় কারো পায়ের আওয়াজ পেতেই সে ঘাড় ঘুরায়।তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা কে দেখামাত্রই চমকে উঠে বলে,'কি রে?তুই?এতো রাতে?'
আদি নিঃশব্দে হেঁটে তার পাশে গিয়ে বসল।ঠিক তারই মতো করে দুই দিকে দুই পা ঝুলিয়ে।ওয়াজিদ তাকে সাবধান করে বলল,'ধরে বসবি কিন্তু।পড়ে যাবি না হয়।'
আদি গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলল,'তোরা যে কি ভাবিস আমাকে বুঝি না।বিদেশে থাকি মানে এই না যে দেশের সবকিছু ভুলে গেছি।এতো আদিখ্যেতা করতে হবে না আমাকে নিয়ে।'
আদি কথা শেষ করেই ওয়াজিদের হাত দেখে।দেখেই বুক চাপড়ে বলে,'জানতাম।জানতাম তোকে এমন দেবদাস রূপেই দেখব।আমার আন্দাজ কখনো ভুল হয় না।'
ওয়াজিদ বিরক্ত হয়ে বলল,'কি যা তা বলছিস! দেবদাস কেন হতে যাবো?'
আদি মুখের হাসি মিলিয়ে নিল।গম্ভীর স্বরে ডাকল,'ওয়াজিদ!'
ওয়াজিদ ম্লান হাসল।ছোট করে বলল,'বল।'
'আই ক্যান রিড আইস ওয়াজিদ।আমি চোখের ভাষা বুঝতে পারি মানুষের।স্পেশালি তোর আর আরহামের।'
'হুম।আমি জানি।'
'তুই তবুও আমার সামনে ভণিতা করছিস।'
'কোথায় ভণিতা করেছি?তুই আমার কাছে কিছু জানতে চাস নি।চেয়েছিস কি?'
আদি শীতল কন্ঠে বলল,'জানতে চাই নি।কারণ যা বুঝার সেটা আগেই বুঝে গিয়েছি।'
ওয়াজিদ বিনিময়ে কেবল মলিন মুখে হাসল।আদি আরো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,'তুই নবনীতাকে এখনো পছন্দ করিস?'
ওয়াজিদ দায়সারাভাবে জবাব দেয়,'নাহ।একসময় করতাম।এখন করা ছেড়ে দিয়েছি।'
আদি একটা শুকনো ঢোক গিলে।নিরেট স্বরে বলে,'আরহামও মেয়েটাকে পছন্দ করে।জানিস?'
'জানি।জানি বলেই ছেড়ে দিয়েছি।নয়তো একবার হলেও বলতাম।'
ওয়াজিদ থামল।দীর্ঘসময় দুই পক্ষের মাঝে পিনপতন নিরবতা।তারপরই সব নিরবতাকে ছাপিয়ে ওয়াজিদ বলতে শুরু করল,'আই ট্রুলি বিলিভ আরহাম মেয়েটাকে পছন্দ করে।এবং আমি যতখানি ভেবেছিলাম,আরহাম তাকে তার চেয়েও বেশি পছন্দ করত।সেজন্যই নিজের পছন্দ ছেড়ে দিয়েছি।'
কথা শেষ করেই সে আদির বিষন্ন মুখটা একবার দেখে নিল।ওয়াজিদ আলগোছে হেসে বলল,'মন খারাপের কিছু নেই আদি।আমি মন থেকে বিশ্বাস করি নবনীতাই সেই মেয়ে যেই মেয়ে আরহামকে তার বদ্ধমূল ভ্রান্ত ধারণা থেকে বের করে আনতে পারবে।'
সে থামল।একটু শ্বাস নিল।জিরিয়ে নিয়ে বলল,'নবনীতাকে নিয়ে আমি আরহামের মধ্যে একটা সিগনিফিকেন্ট চেঞ্জ দেখতে পাই।আরহাম মেয়েটিকে পছন্দ করে।সিটি কলেজের সেই ঘটনার পর থেকে আমি তার মাঝে একটা অনুশোচনা,একটা অস্বস্তি,একটা মন খারাপের ভাব দেখতে পেতাম।সেই মন খারাপের পুরোটাই ছিল নবনীতাকে নিয়ে।তার সবসময় এটাই মনে হতো তার জন্য একটি মেয়ের নামে উল্টা পাল্টা কথা ছড়ানো হচ্ছে।এই বিষয়টি আমাকে অবাক করেছে আদি।আরহাম বিচলিত ছিলো একটি মেয়ের চরিত্র নিয়ে কথা তুলার বিষয়ে।যেই আরহাম কে আমি চিনতাম সেই আরহাম দিনরাত মেয়েদের গালমন্দ করত।সেই আরহামের মাঝে যখন আমি এই পরিবর্তন দেখলাম,তখন আমার মনে হলো আমার পিছিয়ে যাওয়াটাই উত্তম।তুই জানিস সে কি পরিমান পাগলামি অলরেডি করে ফেলেছে?
নবনীতার এক রিলেটিভ কে ধরে এনে থ্রেটও দিয়েছে সে যেন নবনীতার আশেপাশে না ঘুরে।ভাবা যায়?'
আদি গাঢ় স্বরে বলল,'একদম।আমারও এক ই কথা।আমি ভেবেছিলাম তোর ব্যাপারটা তাকে বলব।কিন্তু তার দিক থেকে যেই স্ট্রং ফিলিংস টা আমি উপলব্ধি করেছি,সেটার সামনে দাঁড়িয়ে আর কিছু বলতে ইচ্ছে হয়নি।আমার মনে হয়েছে সে খুব ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।'
ওয়াজিদ মাথা নেড়ে এক লাফে ছাদে নেমে এলো।রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আদিকে দেখে ফিচেল হেসে বলল,'আমি ভেবেছিলাম সে কেবল ইনফেচুয়েশনে ভুগছে।তবে আমি নিজের কথা ফিরিয়ে নিয়েছি।সে মেয়েটিকে খুব বেশি পছন্দ করে।কিন্তু তার মেল ইগোর কারণে স্বীকার করছে না।তুই তো জানিসই কি পরিমান গোয়ার আর জেদি সে! ঐ জেদ ধরেই বসে আছে।আমি জানি নবনীতার সাথে সামনের দিনগুলো তে থাকতে থাকতে সে নিজের সমস্ত জেদ আর তেজ ছেড়ে দিয়ে নিজের সত্যিকারের স্বত্তাটিকে ফিরে পাবে।আর সেই আরহাম অবশ্যই নবনীতার শূন্য খা খা জীবনে শ্রাবণের বর্ষণ নামিয়ে আনবে।সবদিক ভেবে নিজের পিছিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে হলো আদি।নবনীতা কেবল আমার ভালো লাগা।কিন্তু তুই আর আরহাম আমার জীবনের অংশ।এমন একটি ব্যাপার নিয়ে আমি আরহামের সাথে আমার এতো বছরের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে পারব না।আরহাম আর তোর সাথে কথা না হলে আমার সারাদিন কেমন মন খারাপ থাকে।নবনীতা জীবনে না থাকলেও চলবে,তবে এই জীবনে আরহামের থাকা টা জরুরি।'
আদি তার কথা শুনল মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায়।একটি ছেলে নির্দ্বিধায় নিজের অনুভূতিটুকু বিসর্জন দিয়ে দিয়েছে।কারণ সে বন্ধুত্ব নষ্ট করতে চায় না।যেই বন্ধুত্ব শুরু হয়েছিল স্কুল জীবন থেকে।তারপর একে একে বাইশটি বছর কেটে গেছে।ক্লাস টু এর বেঞ্চে লিখে রাখা তিনটি নাম এখনও একসাথে আছে।তাদের মাঝে রক্তের সম্পর্ক নেই।তবে একটি চমৎকার সম্পর্ক আছে,আত্মার সম্পর্ক,বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
আদি রেলিং থেকে নেমে শক্ত করে ওয়াজিদ কে জড়িয়ে ধরল।জড়ানো কন্ঠে বিড়বিড় করল,'তুই জীবনে খুব সুখী হবি ওয়াজিদ।আমার মনে হয় তোর জন্য আল্লাহ চমৎকার কিছু ভেবে রেখেছেন।মিলিয়ে নিস আমার কথা।'
ওয়াজিদ জবাবে কেবল এক গাল হাসল।ভবিষ্যৎ নিয়ে সে আর ইদানিং ভাবে না।সামনে কি হবে সেটা নিয়ে তার আগ্রহও কাজ করে না।মা তার জন্য মেয়ে দেখছে।মা যাকে বলবে ওয়াজিদ তাকেই বিয়ে করবে।এ বিষয়ে সে আর নতুন করে কিছু ভাবতে ইচ্ছুক না।
***
ঠিক রাত তিনটার দিকে এপাশ ওপাশ করতে গিয়ে আরহামের ঘুম ভাঙল।ঘুম ভাঙার পর আশপাশ দেখে সে বুঝতে পারল এটা তার ঘর না।একটু ধাতস্থ হতেই তার মনে পড়ল আজ তার বিয়ে হয়েছে আর এই ঘরটা নবনীতার।
মনে পড়তেই সে এক লাফে উঠে বসল।পুরো ঘর ফাঁকা।মেয়েটা গেল কোথায়?সে একবার বারান্দায় উঁকি দিলো।বারান্দা একদম ফাঁকা।আরহাম খুব বেশি মাথা ঘাটালো না।নিশ্চয়ই রিমিদের ঘরে গিয়েছে।সে আবারো ধপ করে শুয়ে পড়ল।পাশ ফিরতেই কিছু একটা দেখে সে হকচকিয়ে ওঠে।খাটের এক পাশে নবনীতার হাত দেখা যাচ্ছে।সে নিজের হাতের উপর মাথা রেখে ঘুমুচ্ছে।
আরহাম দ্রুত খাট থেকে নামল।এগিয়ে এসে দেখল মেয়েটা বসে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছে।সে বসেছে ফ্লোরে,আর মাথা রেখেছে খাটে।আরহাম এগিয়ে এসে তার ঠিক মুখোমুখি হাঁটু গেড়ে বসল।খেয়াল করল তার কোলের উপর একটা ফটো অ্যালবাম।আরহাম অতি সন্তর্পণে সেটি হাতে নিল।
ধীরে সুস্থে অ্যালবাম টা খুলতেই সে বুঝলো এটা নবনীতার ফ্যামিলি অ্যালবাম।আরহাম উঠে গিয়ে বারান্দার সামনের পর্দা গুলো দুই ধারে চাপিয়ে দিলো।তারপর আবারো হেঁটে এসে নবনীতার পাশাপাশি গিয়ে বসল।চাঁদের রূপালি আলোতে চারদিক ভালোই দেখাচ্ছে।কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নেই।
আরহাম একে একে সবগুলো ছবি দেখল।দেখতে দেখতেই সে কিছুটা আশ্চর্য হলো।নবনীতার বাবার মুখটা খুব চেনা চেনা লাগছে।কোথাও দেখেছি কি?ঠিক মতো মনে পড়ছে না।কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয় অ্যালবামের অধিকাংশ ছবিই নামি দামি রিসোর্টে তোলা,তার মধ্যে কিছু আবার দেশের বাইরে।আরহাম কেবল বিস্মিত নয়নে সেসব দেখে।ছবিতে যেই হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে এই মেয়েটিই নবনীতা?এতো সুন্দর! কতো দামি দামি পোশাক! বাবাকে জড়িয়ে ধরে সে কি হাসি!বেশভূষা চালচলন সবকিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া স্পষ্ট।এতোটা আভিজাত্যের মাঝে থাকার পর এই মেয়েটি এই কষ্টের জীবনে কেমন করে মানিয়ে নিল?তার মা বাবা কোথায়?মা বাবা না থাকুক,কোনো আত্মীয় স্বজনই কি নেই?
আরহাম অ্যালবাম দেখতে দেখতেই অবাক হয়ে বলল,'এগুলো পরীর ছবি?বিশ্বাসই হচ্ছে না।সত্যিই পরীর মতো দেখাচ্ছে।'
সে অ্যালবাম বন্ধ করে পুনরায় সেটা নবনীতার কোলের উপর রাখল।চোখ মেলে একবার গভীর দৃষ্টিতে নবনীতাকে দেখতেই সে খেয়াল করল নবনীতা আজ চুল বাঁধে নি।এলোমেলো চুল সব মুখের উপর এসে ভীড় করছে।আরহাম কাঁপা কাঁপা হাতে তার মুখের সামনে থেকে চুলগুলো সরিয়ে কানের পেছনে গুজে দিলো।
একটি চাঁদের আলোয় আলোকিত রাত।সেই আলোতেই ছিমছাম ঘরটাতে আরহাম গালের নীচে হাত রেখে গভীর মনোযোগ দিয়ে তার সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে খুটিয়ে খুটিয়ে পর্যবেক্ষণ করল।তার মুখ,তার কপাল,তার চোখ,তার ঠোঁট,তার নাক,তার গাল কোনোকিছুই বাদ গেল না।আরহাম সিদ্ধান্ত নিল বাকি রাতটুকু সে এভাবেই বসে থেকে কাটাবে।আরামে ঘুমানোর চেয়ে ফ্লোরে বসে বসে এই অপার্থিব সৌন্দর্য অবলোকন করা আরো বেশি ভালো।সে মুখে সূক্ষ্ম এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে নির্নিমেষ মেয়েটিকে দেখে গেল।তার নাম পরী।সে সত্যিই পরী।যে পরীকে আরহাম তার ঘরে আনতে চেয়েছিল।পরীটা অবশেষে তার ঘরে এসেছে।কি চমৎকার ব্যাপার!
নবনীতার চন্দ্র বিলাশের স্বপ্ন পূরণ হলো,সেটাও তার অগোচরে।সে জানলও না তার বর পুরো রাত জেগে জেগে শুধু তাকেই দেখেছে।তার তাকে অ্যালবাম দেখানোর ইচ্ছে ছিল।সেই সুপ্ত বাসনাও পূরণ হলো।কিন্তু মেয়েটা টেরও পায়নি।আরহাম আরো একবার হাত বাড়িয়ে তার চুলগুলো ঠিক করে দিলো।তার ইচ্ছে হচ্ছে নবনীতার একটি হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিতে।কিন্তু সেটা সম্ভব না।মেয়েটা জেগে যেতে পারে।সে আর মাঝরাতে কোনো ঝামেলা চায় না।সে হাসি মুখে আরো একবার তার দিকে তাকায়।অস্ফুটস্বরে বলে,'পরী! তোমাকে আমার এলোমেলো,ছন্নছাড়া আর উদ্ভ্রান্ত জীবনে স্বাগতম।'
চলবে-