ফন্ট সাইজ:
থিম:
#:তবুও_তোমার_প্রেমে_ আমি _পড়েছি

পর্ব 18

লেখক: #লেখনীতে:অধরা মিনহা

স্বামীর বুকে অন্য মেয়েকে জড়িয়ে থাকতে দেখে বাড়ির সদরদরজাতেই পা'জোড়া থমকে যায় নৌশি। মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠে। চোখের সামনে দৃশ্যটা বিশ্বাস করতে পারছে না নৌশি। রুদ্রিকের বুকে মাথা রেখে তাকে জড়িয়ে ধরে আছে আরেকটা মেয়ে! আর মেয়েটা আর কেউ না রুদ্রিকের ফুফাতো বোন আনায়া!

রুদ্রিক এখন বাসায় কেন? সে তো দুই ঘণ্টা আগেই নৌশিকে সাথে করে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। নৌশিকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে তার তো হাসপাতালে যাওয়ার কথা। তাহলে এখন আবার বাসায় ফিরে এসেছে কেন? আর আনায়াই বা কেন এভাবে রুদ্রিককে জড়িয়ে ধরে আছে? তাহলে কি রুদ্রিক তাকে মিথ্যা বলেছে? তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে হসপিটালের কথা বলে আবার বাসায় ফিরে এসেছে নিজের ফুফাতো বোনের কাছে?

একের পর এক প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে থাকে। মুহূর্তেই মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠে নৌশির। পরনে কলেজের ড্রেস। দুই ক্লাস করেই সাকসেসফুলি কলেজ বাঙ্ক দিতে পেরে খুশি মনে বাসায় চলে এসেছে। অথচ বাড়ির সদরদরজায় দাঁড়িয়ে এমন একটা দৃশ্য দেখতে হচ্ছে, যা তার সব আনন্দ পিষে বুকের ভেতরটা পুড়িয়ে দিচ্ছে।গতকাল রাতেই বাবা-মা ও এক ভাই নিয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফিরেছে আনায়া।

নৌশি এসেছে অথচ রুদ্রিক কিংবা আনায়া কেউই টের পায়নি যে সদরদরজার কাছে দাঁড়িয়ে তাদের সমস্ত কর্মকান্ড দেখছে নৌশি। এদিকে আনায়া এখনো রুদ্রিকের বুকে মাথা রেখে রুদ্রিককে জড়িয়ে ধরে আছে। রুদ্রিকের মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি আর বিরক্তি। সে বারবার আনায়াকে নিজের কাছ থেকে সরানোর চেষ্টা করতে করতে বিরক্ত গলায় বলে উঠে,
— হোয়াট দ্য ফাচ, আনু! ছাড়ো আমাকে!

কথাটা বলেই রুদ্রিক একপ্রকার ঝাড়ি মেরে আনায়াকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। রুদ্রিকের ধাক্কায় আনায়া দু-কদম পিছিয়ে যায়। রুদ্রিকের এমন আচরণে অবাক হওয়ার পাশাপাশি বেশ অপমানিতও হয়।

আনায়া বিস্মিত চোখে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— এমন রিয়েক্ট করছো কেন? কি করেছি?

রুদ্রিক নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বেশ শক্ত গলায় বলে,
— কি করেছো মানে? বাউন্ডরিজ ভুলে যাচ্ছো! জড়িয়ে ধরেছো কেন?!

আনায়া কিছুটা অপ্রস্তুত হয়। বলে,
— কত বছর পর তোমাকে সামনাসামনি দেখলাম। ইমোশনাল হয়ে জড়িয়ে ধরেছি।

— তুমি যে কালচারে বড় হয়েছো কিংবা তোমার কাছে জড়িয়ে ধরাটা নরমাল হতে পারে। বাট আমার কাছে এটা অনেক আনকমফোর্টেবল। আর কোনোদিন এমন আনকমফোর্টেবল সিচুয়েশনে আমাকে ফেলবে না।

রুদ্রিকের কথায় আনায়ার মুখটা মুহূর্তেই চুপসে যায়। প্রচন্ড কষ্টও পায়। আগে কখনো রুদ্রিক তার সাথে এভাবে কথা বলেনি। অবশ্য রুদ্রিকের সাথে তার খুব একটা কথাবার্তাও হয় না। মাঝেমধ্যে ইন্সটাতে ভালো-মন্দ খোঁজখবর নেওয়া পর্যন্তই ! এর বেশি কথা বলতে গেলেই আনায়ার বুকের ভেতর কেমন জানি কাঁপুনি শুরু হয়। আর রুদ্রিককে সামনা-সামনি দেখলেই নার্ভাস হয়ে যায়। তাই রুদ্রিকের সাথে তেমন ফ্রী না।

আজ এত বছর পর দেশে ফিরে ঘুম থেকে উঠে পুরো বাড়িটা খালি পায় আনায়া। এবং বাসায় কেবল রুদ্রিককে দেখতে পেয়ে ভেবেছে, এত দিনের নার্ভাসনেস আর জড়তা কাটিয়ে ওঠার এটাই উপযুক্ত সুযোগ। সে শুধু রুদ্রিকের সাথে একটু ফ্রি হতে চায়, সম্পর্কটা আরো সহজ করতে চায়। সেখান থেকেই আবেগের বশে জড়িয়ে ধরেছিল রুদ্রিককে। কিন্তু রুদ্রিক যে এতটা রেগে যাবে, তা বুঝতে পারেনি।

আনায়া মুখটা নিচু করে আস্তে করে বলে,
— আচ্ছা, সরি।

কিন্তু আনায়ার মুখে সরি শুনেও রুদ্রিকের চেহারার রাগ কিংবা বিরক্তির ছাপ একটুও কমে না। এই তো ঘণ্টা দুয়েক আগে বাসা থেকে বেরিয়ে নৌশিকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে হঠাৎ রুদ্রিকের মনে পড়ে একটা ইম্পর্ট্যান্ট ফাইল বাসায় ফেলে এসেছে। তাই মাঝরাস্তা থেকেই আবার বাসায় ফিরে আসে রুদ্রিক। ফাইলটা নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার জন্য নিচে নামতেই হঠাৎ আনায়া তাকে ডাক দেয়। রুদ্রিক আনায়ার ডাকে দাঁড়াতেই কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই এসে তাকে জড়িয়ে ধরে আনায়া।

আর সেই মুহূর্তটাই দূর থেকে দেখেছে নৌশি। এখনো সদরদরজার কাছেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে নৌশি। চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সবকিছু দেখেছে এবং শুনেছেও। তবু নৌশির মনের অস্থিরতা কিছুতেই কমছে না। রাগ, অভিমান আর ঈর্ষা, কোনোটাই নিয়ন্ত্রণে আসছে না।কারণ আনায়াকে রুদ্রিকের বুকে এভাবে জড়িয়ে থাকতে দেখে নৌশির কাছে মোটেও মনে হয়নি ব্যাপারটা নিছক কাজিন কিংবা ভাইয়ের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশ। তাহলে কি রুদ্রিকের সাথে আনায়ার সম্পর্ক এতটাই ঘনিষ্ঠ যে কোনো দ্বিধা ছাড়াই এভাবে তাকে জড়িয়ে ধরতে পারে? প্রশ্নটা বারবার মাথায় ঘুরছে নৌশির। মুখটা নৌশির অন্ধকার হয়ে আছে। বুকের ভেতর জমে আছে একরাশ অস্বস্তি আর চাপা ঈর্ষা।

অন্যদিকে আনায়া মুখ তুলে একবার রুদ্রিকের দিকে তাকায়। তারপর সেখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই হঠাৎ চোখে পড়ে রুদ্রিকের পেছনে বাড়ির সদরদরজার কাছে কলেজের পোশাক পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।এতক্ষণ বিষণ্নতায় ডুবে থাকা আনায়ার মনে এবার কৌতূহল জাগো। নৌশির দিকে একবার তাকিয়ে আবার রুদ্রিকের দিকে চোখ ফেরায়। তারপর কৌতূহলী কণ্ঠে প্রশ্ন করে,
— এই মেয়েটা কে?

আনায়ার প্রশ্ন শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই সদরদরজার কাছে নৌশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকে যায় রুদ্রিক। বিস্ময়ে চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। নৌশি কখন এলো? ঘন্টা খানেক আগেই তো তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে এসেছে! পরক্ষণেই নৌশির মুখের দিকে তাকিয়ে রুদ্রিক বুঝতে পারে, নৌশি বেশ কিছুক্ষণ আগেই এসেছে। আর ততক্ষণে নিশ্চয়ই সবকিছু দেখেও ফেলেছে। তাই তো মুখটা এমন থমথমে হয়ে আছে!

মুহূর্তেই রুদ্রিকের ভেতর অস্বস্তি বেড়ে যায়। সেই সাথে মনে জেঁকে বসে একরাশ দুশ্চিন্তা। নৌশি ঠিক কি দেখেছে? আর দেখার পর মনে মনে কি ভাবছে? পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রুদ্রিক নৌশির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— তুমি কখন আসলে? তোমাকে না একটু আগেই কলেজে দিয়ে আসলাম?

এতক্ষণ ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা রাগ এবার জ্বলন্ত আগুনের মতো কথার মাধ্যমে বেরিয়ে আসে নৌশির। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বলে,
— খুব অসুবিধা হয়ে গেছে আমার এখন চলে আসায়, তাই না?

রুদ্রিক সামান্য বিব্রত হয়ে বলে,
— অসুবিধা হবে কেন?

নৌশি কাঠখোট্টা গলায় উত্তর দেয়,
— দেখতেই পাচ্ছি।

বলেই সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না নৌশি। খটখট করে জুতার শব্দ তুলে সিড়ি বেয়ে সেখান থেকে চলে যায়।রুদ্রিক কেবল নৌশির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। রুদ্রিকের বুঝতে বাকি রইল না, নৌশি শুধু দেখেইনি বরং পুরো ব্যাপারটা নিয়ে মনে মনে বেশ বাজে একটা ধারণাও তৈরি করে ফেলেছে। ভাবতেই অজান্তে রুদ্রিকের সমস্ত রাগ গিয়ে পড়ে আনায়ার ওপর। একে তো মেয়েটা হুট করে তাকে জড়িয়ে ধরে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে! তার ওপর এখন নৌশির মনেও এমন একটা বাজে ধারণা কিংবা সন্দেহ তৈরি করেছে!

নৌশির এমন রাগি আচরণ দেখে আনায়াও বেশ অবাক হয়। মেয়েটা কে? এমন রাগ দেখাচ্ছে কেন? এর আগে তো কখনো মেয়েটাকে দেখেনি! আবার রুদ্রিকই বা কি বলল? সে মেয়েটাকে কলেজে পৌঁছে দিয়ে এসেছে! তার মানে মেয়েটার সাথে রুদ্রিকের সম্পর্কটা বেশ ক্লোজ। কিন্তু সম্পর্কটা কি? মনের ভেতর তৈরি হওয়া কৌতূহল আর চেপে রাখতে পারে না আনায়া। রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে আবারো প্রশ্ন করে,
— বললে না তো মেয়েটা কে?

রুদ্রিক বিরক্তি নিয়েই সোজাসাপ্টা উত্তর দেয়,
— আমার ওয়াইফ।

কথাটা আনায়ার কানে অবিশ্বাস্য কিছু মনে হলো। মনে হলো ভুল শুনেছে। তাই মুখের জোর করে হাসি টেনে আনার চেষ্টা করে বলে,
— আর ইউ কিডিং?

রুদ্রিক বেশ জোর গলায় বলে,
— এটাতে মজা করার মতো কী পেলে?

এবার রুদ্রিকের কথায় আনায়া আর অপমানিত বোধ করে না। উল্টো মনে হলো, পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। রুদ্রিকের বলা মাত্র দুটি শব্দে কয়েক বছরের অপেক্ষা,মনের মধ্যে লালন করা স্বপ্ন আর সমস্ত আশা এক নিমেষেই চুরমার হয়ে গেছে! আনায়ার চোখের কোণে অশ্রু ধীরে ধীরে জমতে শুরু করে। কাঁপা কাঁপা গলায় নিজেকে সামলে প্রশ্ন করে,
— ক...কখন বিয়ে করেছো?

এমনিতেই নৌশির এভাবে রাগ করে চলে যাওয়ায় রুদ্রিকের বুকে অশান্তি চেপে বসেছে। তার ওপর আনায়ার একের পর এক প্রশ্ন অসহ্য লাগছে। চোখেমুখে বিরক্তি আর রাগ ফুটিয়ে বলে,
— এক মাস হবে!

বলেই আর দাঁড়ায় না রুদ্রিক। পা বাড়িয়ে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত ওপরে উঠে যায়। গন্তব্য নিজের রুম আর উদ্দেশ্য নৌশি কি করছে, তা দেখা। পেছনে আনায়া একেবারে বিধ্বস্ত মানুষের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। দেখে মনে হচ্ছে, তার আশপাশের কোনো কিছুই আর হুঁশে আসছে না। অবশ্য এই মুহূর্তে তার জায়গায় অন্য কেউ থাকলেও হয়তো এমনটাই হতো। এত বছরের অপেক্ষার পর এমন একটা খবর শুনলে স্বাভাবিক থাকা কি এতই সহজ?

রুমে ঢুকেই নৌশি নিজের ব্যাগটা সজোরে বিছানার ওপর ছুড়ে ফেলে। তারপর বিছানায় বসে অস্থিরভাবে পা নাড়াতে থাকে। তার পুরো চেহারায় রাগ, অভিমান আর কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কিছুতেই মনকে বোঝাতে পারছে না। একটু আগের দেখা দৃশ্যটা বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, রুদ্রিকের সাথে অন্য মেয়ে কেন থাকবে? ব্যাপারটা কিছুতেই সহ্য হচ্ছে না নৌশির। নৌশির এই মুহূর্তে ইচ্ছে করছে রুমের সমস্ত জিনিসপত্র ভেঙেচুরে তছনছ করে দিতে।

তখনি রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে রুদ্রিক। নৌশির চোখ সাথে সাথেই সেদিকে চলে যায়। রুদ্রিককে দেখামাত্রই সে উঠে দাঁড়ায়। রুদ্রিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে নৌশির এমন ফুঁসতে থাকা অবস্থা দেখতে থাকে। নৌশি কোনো কথা না বলে কাভার্ডের কাছে গিয়ে নিজের কাপড় বের করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। রুদ্রিক মনে মনে ভাবে, মেয়েটার রাগ একেবারে লাভার মতো টগবগ করে ফুটছে। রুদ্রিক চুপচাপ বিছানায় বসে নৌশির জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে নৌশি। হাতে কলেজের ড্রেস।

বেরিয়েই কোনো কথা না বলে কাপড়গুলো রুদ্রিকের মুখের ওপর ছুড়ে মারে। তারপর অন্যদিকে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। রুদ্রিক নৌশির ছুড়ে মারা কাপড় বিছানায় রেখে সাথে সাথে নৌশির হাত ধরে আটকে ফেলে। এরপর এক টানে নৌশিকে নিজের বুকের কাছে এনে বলে,
— এমন সাপের মতো ফোঁসফোঁস করছো কেন?

নৌশি এবার রাগে ঠোঁটের কোণে একটা মেকি হাসি টেনে আনে। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে বিদ্রূপের সুরে বলে,
— আপনি জড়াজড়ি করতে পারবেন আর আমি ফোঁসফোঁস করলেই আপনার জায়গামতো লেগে যায়?

নৌশির এমন বেফাঁস কথায় বেশ বিব্রত হয় রুদ্রিক। নিজেকে সামলে শান্ত গলায় বোঝানোর চেষ্টা করে বলে,
— আনু জন্ম থেকেই লন্ডনে বড় হয়েছে। ওখানকার কালচারে জড়িয়ে ধরা নরমাল।

নৌশি ফুঁসে ওঠে,
— বাব্বাহ! আনু? আনু না ডেকে জানু ডেকে ফেলুন না।

রুদ্রিক অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে বলে,
— জন্ম থেকে ওকে সবাই আনু ডাকে।

— জন্ম থেকে আনু ডেকেছেন এখন প্রাপ্ত বয়স্ক হয়েছে জানু ডাকুন।

— ও আমার প্রেমিকা না যে জানু ডাকবো!

— প্রেমিকা না তার মধ্যেই জড়াজড়ি ধরাধরি?

— বললাম তো লন্ডনে জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। ওখানের কাল অনুযায়ী......

বাকিটুকু শেষ করার আগে নৌশি তেজী স্বরে বলে,
— কথায় কথায় নিজের বড় বংশের ফুটানি দেখান কেন? লন্ডনের আলাপ-সালাপ!

নৌশির কথায় রুদ্রিকের মেজাজ বিগড়ে যায়। বিরক্ত গলায় বলে,
— যা ইচ্ছা ভাবো। আমি কৈফিয়ত দিচ্ছি না আর দিবোও না।

বলেই নৌশিকে ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য উদ্যত হয় রুদ্রিক কিন্তু রুদ্রিক সরে যাওয়ার আগেই নৌশি রুদ্রিকের বুকের অংশের শার্টটায় খামচে ধরে আটকে ফেলে। রুদ্রিক থেমে নৌশির দিকে তাকাতেই নৌশি শক্ত মুখে বলে,
— মন থেকে উঠে গেলে দশ বেডির সাথে শুয়ে থাকলেও ফিরে তাকাবো না। তাই মন থেকে উঠে যাবেন না আমার।

কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য থমকে যায় রুদ্রিক। নৌশির কথার মধ্যে কিছু একটা ছিল যেটা সরাসরি গিয়ে রুদ্রিকের বুকে আঘাত করে। তবুও নিজের ব্যক্তিত্বের নির্লিপ্ত খোলসটা ধরে রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
— তোমার মন থেকে উঠে গেলেই বা কি? আমি পরোয়া করি নাকি? রিভেঞ্জের বিয়ে এটা। তাই তোমার মনে আমার জায়গা আছে নাকি মন থেকে মুছে যাচ্ছি, সেসবের পরোয়াই করি না।

নৌশিও দমে যাওয়ার পাত্রী না। রুদ্রিকের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— আমি মন থেকে তুলে ফেললে রুদ্রিক রওনক মির্জা, আপনি আমার চোখের দৃষ্টিতে জায়গা না পেয়ে মরবেন। বিশ্বাস করুন।

নৌশির মুখে নিজের পুরো নাম শুনে রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে ফেলে। বিরক্ত গলায় বলে,
— বড় আমি বয়সে। রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলতে বলিনি?

নৌশি বিরক্তি আর রাগ সীমানা ছাড়িয়ে যায়। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রুদ্রিকের শার্ট ছেড়ে দিয়ে রুদ্রিককে সামান্য ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে বলে,
— আপনার জন্য চাচ্চু ডাকটাই ঠিক আছে। আপনি স্বামী ডাক শোনার যোগ্য না।

রুদ্রিকও কম যায় না। তাচ্ছিল্য করে বলে,
— বিয়ের একমাসে যতবার চাচ্চু ডেকেছো এখন চাচ্চু কি আব্বা ডাকলেও কিছু যায় আসে না।

নৌশি সাথে সাথেই জবাব দেয়,
— তাহলে আব্বাই ডাকবো!

রুদ্রিকও সাথে সাথেই নির্লিপ্ত হেসে বলে,
— ডেকো! সুগার ড্যাডি হবো নে। সমস্যা কি!

বলেই রুদ্রিক চলে যায়। নৌশি ফোঁসফোঁস করতে করতে বিছানায় উঠে বসে। তারপর শরীরের ওপর কমফোর্টার টেনে শুয়ে পড়ে। মাথার ভেতর হাজারো চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। যদিও একটু আগের তুলনায় এখন মনটা কিছুটা হালকা হয়েছে, রাগও খানিকটা কমেছে। তবুও আনায়া আর রুদ্রিকের ব্যাপারটা কিছুতেই মাথা থেকে সরাতে পারছে না। মনের মধ্যে এখন একেবারে টিপিক্যাল

বউয়ের মতো হাজারো ভাবনা আর সন্দেহ দানা বাঁধছে। কিভাবে রুদ্রিককে অন্য মেয়েদের থেকে দূরে রাখা যায়, সেই চিন্তাই ঘুরছে মাথায়। এখন তো অন্য কোনো মেয়ের নাম শুনলেই অসহ্য লাগে নৌশির। সেখানে রুদ্রিকের বুকে অন্য মেয়েকে জড়িয়ে থাকতে দেখা! ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না নৌশি।

সময় গড়িয়ে রাত এগারোটা বেজে যায়। প্রতিদিনের মতো আজও ঠিক এই সময় বাসায় ফিরে রুদ্রিক। রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন চালাচ্ছে নৌশি। কোমর পর্যন্ত কমফোর্টার দিয়ে ঢাকা। রুদ্রিক ভেতরে এসে নিজের মেডিকেল ব্যাগটা যথাস্থানে রাখে। তারপর পকেট থেকে ফোন আর মানিব্যাগ বের করে সাইড টেবিলের ওপর রাখে। ঠিক তখনি নৌশি জ্বীনের মতো পেছনে হাজির হয়ে বলে,
— আপনার মোবাইলটা দিন তো?

রুদ্রিক ফিরে তাকিয়ে দেখে, নৌশি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। রুদ্রিক শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?

নৌশি বিরক্ত মুখে বলে,
— মোবাইল আমি খেয়ে ফেলবো না।

রুদ্রিক আবার সামনে ফিরে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বলে,
— খেয়ে ফেলতেও পারো। বিশ্বাস নেই তোমার ওপর।

রুদ্রিকের কথার মাঝেই নৌশির চোখ চলে যায় সাইড টেবিলের ওপর রাখা ফোনটার দিকে। সুযোগ বুঝে খপ করে ফোনটা নিয়ে নেয় নৌশি। তারপর রুদ্রিকের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়ায়, যাতে রুদ্রিক ফোনটা টান দিয়ে নিতে না পারে। নৌশির এমন কান্ডে রুদ্রিকের ভ্রু কুঁচকে যায়।

রুদ্রিকের ফোনে পাসওয়ার্ড দেখতেই নৌশি রুদ্রিকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
— পাসওয়ার্ড কী?

রুদ্রিক পড়নের শার্টটা খুলে লন্ড্রি বাস্কেটে রাখতে রাখতে নির্বিকার গলায় বলে,
— বলা যাবে না।

নৌশি কৈফিয়ত চাওয়ার সুরে জিজ্ঞেস করে,
— কেন?

রুদ্রিক এসে বিছানায় বসে। তারপর স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আমার প্রাইভেসি আছে।

নৌশি আবার রুদ্রিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। চোখেমুখে অধিকার ফলানোর ভঙ্গি নিয়ে বলে,
— বউয়ের কাছে কিসের প্রাইভেসি?

রুদ্রিক আগের মতোই উত্তর দেয়,
— রিভেঞ্জের বউয়ের কাছেই সব প্রাইভেসি, ডিয়ার।

নৌশি ফোনটা হাতে নিয়ে দৃঢ় গলায় বলে,
— রিভেঞ্জের বউ আর যাই হই! বউ তো। পাসওয়ার্ড বলুন।

— পাসওয়ার্ড বলা যাবে না।

নৌশি কাধ ঝাঁকিয়ে বলে,
— ঠিক আছে, আমি ভুলভাল পাসওয়ার্ড টাইপ করে ৭২ ঘণ্টার জন্য লক লাগিয়ে দিবো।

রুদ্রিকের চেহারায় কোনো ভাবান্তর দেখা যায় না। বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
— আচ্ছা। তারপর তোমার ফোনটা চিরকালের জন্য হারাবে।

রুদ্রিকের কথা শুনে নৌশির রাগ আরো কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
— মোবাইলে কী এমন আছে যে পাসওয়ার্ড বলা যাবে না?

রুদ্রিক আগের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
— কত জিনিসই তো আছে, সব কি সবাইকে দেখানো যায়?

— সবাইকে না, আমি দেখবো শুধু।

রুদ্রিক ঠান্ডা গলায় বলে,
— তোমাকে আমি সবার দলেই রেখেছি।

কথাটা শুনে নৌশির রাগ সীমানা ছাড়িয়ে যায়। সারাদিন ধরে রুদ্রিককে নিয়ে তার মাথায় হাজারো চিন্তা আর টেনশন ঘুরপাক খাচ্ছে। তার ওপর এখন রুদ্রিকের ফোন নিয়ে মনে নতুন করে সন্দেহ জেগেছে। ফোনে কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই তো? সেই সন্দেহ থেকেই তো ফোনটা চেক করতে চাইছে, দেখতে চাইছে কোনো মেয়ের সাথে গোপনে কথাবার্তা চলে কি না। কিন্তু রুদ্রিক যেভাবে ফোন দিতে অস্বীকার করছে, তাতে তার মনের সন্দেহ আরো তরতর করে বেড়ে যাচ্ছে।

নৌশি এবার দু'হাত কোমরে রেখে রাগী গলায় বলে উঠে,
— নির্ঘাত ফোনে গার্লফ্রেন্ডের সাথে চ্যাট আছে। তাই তো আমাকে দেখানো যাবে না। তাই না?

রুদ্রিক ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলে,
— বাহ! বুদ্ধিমতী তো।

নৌশি বুঝতে পারে, রুদ্রিক ইচ্ছে করেই তাকে রাগাচ্ছে। আর রেগে গেলে কোনো কাজ হবে না। তাই এবার অন্য কৌশল অবলম্বন করতে হবে। মুহূর্তেই নিজের রাগ সামলে শান্ত হয় নৌশি। রুদ্রিকের পাশে গিয়ে বসে বেশ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— আচ্ছা, ঠিক আছে। পাসওয়ার্ড লাগবে না।

নৌশির এমন মুহূর্তের মধ্যে পল্টি খাওয়া দেখে রুদ্রিকের বুঝতে বাকি রইল না, নৌশির মাথায় নিশ্চয়ই নতুন কোনো বুদ্ধি ঘুরপাক খাচ্ছে। তাই রুদ্রিক আর কিছু বলে না। চুপচাপ বসে রইল, নৌশি এবার কি করে তা দেখার জন্য। নৌশি এবার বেশ নরম স্বরে বলে,
— একটা কথা জিজ্ঞেস করি?

রুদ্রিক পাল্টা প্রশ্ন করে,
— না করলে কি করবে না?

— করবো।

— তাহলে আর জিজ্ঞেস করছো কেন? করেই ফেলো প্রশ্ন!

নৌশি একটু থেমে চোখে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আপনার মেয়ে ফ্রেন্ড আছে?

রুদ্রিক কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দেয়,
— হুম।

কথাটা শুনে নৌশি এমন ভান করে, যেন এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোনো গুনাহের কথা শুনে ফেলেছে। বলে উঠে,
— আস্তাগফিরুল্লাহ! আল্লাহ মাফ করুক!

রুদ্রিকের মুখের ভাব একটুও বদলায় না। সে কেবল চুপচাপ নৌশির কাজকর্ম দেখছে। নৌশি আবারো প্রশ্ন করে,
— আচ্ছা, আপনার কয়টা মেয়ে ফ্রেন্ড আর কয়টা ছেলে ফ্রেন্ড?

রুদ্রিক আগের মতোই শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
— ৪টা মেয়ে ফ্রেন্ড, ৩টা ছেলে ফ্রেন্ড!

এবার নৌশির রিয়াকশন আগের চেয়েও বিস্ময়কর। মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাপের কথা শুনে ফেলেছে। তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়িয়ে দুই গালে আস্তে আস্তে থাপ্পড় দিয়ে তওবা করার ভঙ্গিতে বলতে থাকে,
— তওবা তওবা! আস্তাগফিরুল্লাহ! লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। ইট ইজ হারাম! হারাম! হারাম! কনফার্ম জাহান্নামি!

নৌশির এমন রিয়াকশন দেখে রুদ্রিক ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে নৌশির দিকে। চেহারায় স্পষ্ট বিরক্তি। নৌশি আবারো বলতে শুরু করে,
— আমার সন্দেহই ঠিক ছিল। মেয়ে ফ্রেন্ডদের সাথে ইটিশপিটিশ করেন মোবাইলে, তাই আমাকে পাসওয়ার্ড দিচ্ছেন না।

রুদ্রিক এবার আর কোনো উত্তর দেয় না। নৌশির কথাগুলো যেন তার গায়েই লাগছে না। উঠে কাভার্ডের দিকে এগিয়ে যায়। পেছন থেকে নৌশির আবারো বলে,
— ভালোভাবে তাড়াতাড়ি পাসওয়ার্ডটা বলুন ফোনের!

রুদ্রিক পেছন ফিরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— আর না দিলে খারাপটা কী হবে?

নৌশি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নাকের পাটা ফুলিয়ে বলে,
— দিবেন না তো?

— না।

— ঠিক আছে।

বলেই বিছানার ওপর উঠে যায় নৌশি। তারপর নিজের ফোনটা হাতে তুলে নেয়। রুদ্রিক ভাবে, নৌশি হয়তো থেমে গেছে। তাই আর বিষয়টা নিয়ে মাথা ঘামায় না। টি-শার্টটা পরে বিছানায় এসে বসে। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে একটু রেস্ট নেওয়া দরকার। বিছানায় পা তুলে বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে রুদ্রিক। তারপর চোখ দুটো বন্ধ করে। কিন্তু চোখ বন্ধ করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো রুম কাঁপিয়ে জোরে হুজুরের ওয়াজ বেজে উঠে,
— যেই স্বামীর পাসওয়ার্ড স্ত্রী জানে না, ওই স্বামী চরিত্রহীন! চরিত্রহীন স্বামী! স্বামী নামে কলঙ্ক!

হঠাৎ এমন বিকট আওয়াজে রুদ্রিক চমকে উঠে চোখ খুলে। মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে বসে থাকে। তারপর দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে শব্দের উৎস খুঁজতেই চোখ পড়ে নৌশির দিকে। আর সব বুঝতে পারে। নৌশি নিজের ফোনে ফুল ভলিউমে হুজুরের ওয়াজ চালিয়ে রেখেছে। শুধু একবার না, একই ওয়াজ বারবার রিপিট হচ্ছে,
— যেই স্বামীর পাসওয়ার্ড স্ত্রী জানে না, ওই স্বামী চরিত্রহীন! চরিত্রহীন স্বামী! স্বামী নামে কলঙ্ক!

আর পাশেই নৌশি নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। রুদ্রিক এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না। রাগী কণ্ঠে বলো,
— পাগল তুমি?

নৌশি নির্বিকার গলায় বলে,
— ওয়াজ শুনলে পাগল হয় কেউ? বিধর্মী লোক!

রুদ্রিকের মাথায় ধরছে এতো জোরে ওয়াজ। তাই সহ্য করতে না পেরে বিরক্ত গলায় বলে,
— নৌশি, এটা বন্ধ করো। কানে লাগছে।

কিন্তু নৌশি নির্লিপ্ত হয়ে বসে থাকে। রুদ্রিকের কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তাকে এভাবে পাত্তা না দিতে দেখে রুদ্রিক আবারো বলে,
— বন্ধ করো এটা, নৌশি!

— ওয়াজ শোনা অধিকার। তাতে আপনি হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।

রুদ্রিক বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে একটা শ্বাস ফেলে। তারপর আবার চোখ খুলে বলে,
— তো নিজে শোনো! পুরো মহল্লাকে শোনানোর মতো সাউন্ড দিয়ে রেখেছো কেন?

নৌশি মেকি হাসি দিয়ে বলে,
— সাউন্ড দিয়ে রেখেছি, যাতে কয়েকটা পাপীর কানে যায় কথাগুলো!

রুদ্রিক চোখ রাঙিয়ে বলে,
— ফোনটা কিন্তু হারিয়ে ফেলবা, যা করছো!

নৌশি হাসি দিয়ে বলে,
— ফোন নিয়ে দেখেন! লিভিং রুমে টিভিতে ফুল সাউন্ড দিয়ে ছাড়বো।

রুদ্রিকের মাথা ধরে যাচ্ছে। ওয়াজের তীব্র শব্দ সহ্য হচ্ছে না। তার ওপর হুজুরের সেই চরিত্রহীন স্বামী নিয়ে ওয়াজ! অতিষ্ঠ হয়ে শেষমেশ বারান্দায় চলে যায় রুদ্রিক। ভাবে, অন্তত এখানে বসে একটু শান্তি পাওয়া যাবে। কিন্তু বারান্দায় এসে দোলনায় বসেও সেখানে শান্তি মিলে না। পেছন পেছন নৌশিও চলে এসেছে। হাতে ফোন আর ফোনে সেই একই ওয়াজ চলছে। রুদ্রিক কটমট দৃষ্টিতে নৌশির দিকে তাকিয়ে রইল। নৌশি অবশ্য সেদিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সুর মিলিয়ে বলে,
— যেই স্বামীর পাসওয়ার্ড স্ত্রী জানে না, ওই স্বামী চরিত্রহীন! চরিত্রহীন স্বামী! স্বামী নামে কলঙ্ক!

রুদ্রিক এবার দাঁতে দাঁত চেপে নিজের রাগটুকু সংবরণ করে। আর একটা মুহূর্তও সেখানে থাকা সম্ভব না। তাই কোনো কথা না বলে বারান্দা থেকে উঠে রুমের বাইরে চলে যায়। রুদ্রিককে রুম থেকে বের হতে দেখে নৌশিও তাড়াতাড়ি তার পেছন পেছন বেরিয়ে আসে। রুদ্রিক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে লিভিং রুমে প্রবেশ করতেই কানে আসে তার ফুপির প্রশ্ন,
— রুদ্রিককে বিয়ে কখন করালে ভাইয়া? জানালেও না?

লিভিং রুমে উপস্থিত রেজওয়ান মির্জা, ফাহমিদা আইরিন, রুদ্রিকের ফুপি রেহানা, ফুপির স্বামী আসাদ সাহেব এবং রুদ্রিকের ফুফাতো ভাই আয়ান। আসাদ সাহেব একটা কোম্পানিতে ম্যানেজার পদে কর্মরত। আর আয়ান রুদ্রিকের চেয়ে তিন বছরের ছোট। লন্ডনে তার বাবা যে কোম্পানিতে চাকরি করেন, আয়ানও সেখানেই কাজ করে। রেহানা মির্জার এমন প্রশ্নে রেজওয়ান মির্জা এবং ফাহমিদা আইরিন দুজনেই বেশ অস্বস্তিতে পড়ে যান। দুজনের চোখাচোখি হতে থাকে। কি বলবেন, কিভাবে বলবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না।

কারণ রুমাইরার পালিয়ে যাওয়া, রুদ্রিকের প্রতিশোধের বিয়ে, সবকিছুই এখনো গোপন। বাইরে কাউকে এসব জানানো হয়নি। অবশ্য বিষয়গুলো কাউকে বলার মতোও না। ব্যাপারটা যে ভীষণ লজ্জাজনক! গতকাল থেকেই রেজওয়ান মির্জা এবং ফাহমিদা আইরিন এই চিন্তায় ছিলেন, এমন কোনো প্রশ্নের মুখোমুখি হলে কি উত্তর দেবেন। রুদ্রিকের সাথেও বিষয়টা নিয়ে কথা বলার সুযোগ হয়নি ওনাদের। রেজওয়ান মির্জা অস্বস্তিতে কিছু একটা বলতে যাবেন, ঠিক তখনি রুদ্রিক এগিয়ে আসে। সোফার দিকে যেতে যেতে স্বাভাবিক গলায় বলে উঠে,
— বউ আগে থেকেই পছন্দ করা ছিল তাই হঠাৎ করেই বিয়েটা করে ফেললাম!

রুদ্রিকের উপস্থিতি আর উত্তর শুনে রেজওয়ান মির্জা এবং ফাহমিদা আইরিন দুজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন। এতক্ষণে মুখের অস্বস্তি কিছুটা কাটে। দুজনেই স্বস্তির হাসি হাসেন।

রেজওয়ান মির্জা জোর করে হেসে কথাটায় সায় দিয়ে বলেন,
— হ্যাঁ, আসলে হঠাৎ করেই রুদ্রিক পছন্দের কথা জানায়। তারপর বিয়ে করিয়ে ফেলি। কাউকেই জানানো হয়নি। ভেবেছিলাম কিছুদিন পর অনুষ্ঠান করে সবাইকে জানাবো।

ফাহমিদা আইরিন আর আসাদ সাহেব একবার একে অপরের দিকে তাকান। তারপর আসাদ সাহেব আবার রেজওয়ান মির্জার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— মেয়ের পরিবার কেমন? বাবা কি করে?

তখনি সেখানে এসে উপস্থিত হয় নৌশি। হাতে মোবাইল, আর তাতে হুজুরের ওয়াজ চলছিল। কিন্তু লিভিং রুমে এতগুলো মানুষকে দেখে মুহূর্তেই ওয়াজ বন্ধ করে দেয় নৌশি। তারপর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। রেজওয়ান মির্জা একবার নৌশির দিকে তাকান। এরপর বেশ স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেন,
— মেয়ে এতিম।

কথাটা শুনে রেহানা, আসাদ সাহেব এবং আয়ান তিনজনই বিস্মিত হয়। রেহানা অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন,
— এতিম? বাবা মা কেউ নেই?

রেজওয়ান মির্জা আগের মতোই উত্তর দেন,
— হ্যাঁ, এতিম। বাবা-মা, পরিবার কিছু নেই।

রেজওয়ান মির্জার কথায় তিনজনের বিস্ময় আরো বেড়ে যায়। রুদ্রিকের মতো ছেলের বউ কিনা এতিম! যে ছেলের কোনো কমতি নেই। সবদিক থেকে পার্ফেক্ট। অন্যদিকে পাপার মুখে কথাটা শুনে রুদ্রিকের দৃষ্টি চলে যায় নৌশির দিকে। নৌশির মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে আছে।

নৌশির বুকের ভেতরটা ধক করে উঠে। এতিম শব্দটা বড্ড ভারী, বড্ড ভয়ংকর! আর ওনি কিনা কত সহজে নৌশির নামের সাথে জুড়ে দিলো? যে মেয়ের বাবা-মা দুজনেই জীবিত, মাথার ওপর পুরো একটা পরিবার আছে, সেই মেয়েকেই কিনা সবার সামনে এতিম পরিচয় দেওয়া হচ্ছে!কথাটা নৌশির বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে বিঁধে। এত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয়টাকে মুহূর্তের জন্য বড্ড অচেনা মনে হয় নৌশির।

নৌশির মলিন ফ্যাকাসে মুখটা কেন জানি রুদ্রিকের সহ্য হলো না। নৌশির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ করেই ফট করে উঠে দাঁড়িয়ে যায় রুদ্রিক। তারপর এগিয়ে গিয়ে নৌশির কাছে গিয়ে নৌশির বাহু ধরে নিজের কাছে টেনে নেয়। এক হাতে নৌশিকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে নৌশির পেছনে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো সামনে এনে বুকের ওপর ফেলে দিতে থাকে। চুল দিয়ে নৌশির বুকের সামনের অংশটা ঢেকে দিতে দিতে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,
— নাবিহা এতিম না। বাবা-মা, পরিবার সবাই আছে। কিন্তু ওদের ছেড়ে আমার সাথে আছে।

রুদ্রিকের এমন আকস্মিক প্রতিবাদে অবাক হয়ে যায় নৌশি। মুখ তুলে তাকায় রুদ্রিকের দিকে। এমন কিছু যে রুদ্রিক করবে তা একবারের জন্যও আশা করেনি নৌশি।
রুদ্রিক কিনা সবার সামনে তার হয়ে দাঁড়িয়েছে! তাও আবার এমন একটা বিষয়ে, যেটা রুদ্রিক নিজেই একদম সহ্য করতে পারে না। নৌশির পরিবারকে তো রুদ্রিক সহ্যই করতে পারে না। তারপরও আজ সবার সামনে নৌশির সম্মানের জন্য দাঁড়াতে একটুও দ্বিধা বোধ করলো না মানুষটা?!

আবারো রুদ্রিকের উপর মুগ্ধ হয়ে যায় নৌশি। লোকটার এই ছোট ছোট—না না, ছোট ছোট না বরং বিশাল বিশাল যত্ন আর খেয়াল রাখার ব্যাপারগুলোই দিন দিন তাকে রুদ্রিকের প্রতি আরো বেশি আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে রেজওয়ান মির্জা সবার সামনে রুদ্রিকের এমন আচরণে বেশ লজ্জিত হন। একই সাথে অপমানে মুখটা থমথমে হয়ে যায় বোধ। পরিস্থিতি সামাল দিতে আসাদ সাহেব বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করেন,
— ওর বাবা-মা কি বিয়েতে রাজি না?

রুদ্রিক শান্ত গলায় উত্তর দেয়,
— না।

রেহানা অবাক হয়ে বলেন,
— আশ্চর্য! রুদ্রিকের মতো ছেলের সাথে কোন বাবা-মা বিয়ে দিতে রাজি না? এমন ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় নাকি!

নৌশি এখনো বেহায়ার মতো রুদ্রিকের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সামনে এতজন বড় মানুষ বসে আছেন, সেদিকে তার কোনো খেয়ালই নেই। সে শুধু মুগ্ধ চোখে রুদ্রিককে দেখেই চলেছে। রেহানা মির্জা বুঝতে পারেন, এই প্রসঙ্গ আর বাড়ানো ঠিক হবে না। পরিবেশটা ইতিমধ্যেই বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। তাই আশপাশে একবার চোখ বুলিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য জিজ্ঞেস করেন,
— আচ্ছা, রুমাইরা কোথায়? ওকে তো দেখলাম না?

ব্যাস! আবারো নতুন করে চিন্তা আর ভয়ের মধ্যে পড়ে গেলেন রেজওয়ান মির্জা। কি উত্তর দেবেন, কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না। অসহায়ভাবে রুদ্রিকের দিকে তাকান। নৌশিও রুমাইরার নাম শুনে প্রথমে একবার আসাদ সাহেবের দিকে তাকায় ঘাবড়ে। তারপর আবার চোখ ফেরায় রুদ্রিকের দিকে।

রুদ্রিক গম্ভীর মুখে বলে,
— হোস্টেলে।

আয়ান অবাক হয়ে প্রশ্ন কর,
— রুমাইরা আবার হোস্টেলে কখন গেলো?

— এক মাস হবে।

রেহানা এবার জিজ্ঞেস করেন,
— হোস্টেলে কেন? হোস্টেলে কি আর বাড়ির মতো ফ্যাসিলিটি পাবে?

রুদ্রিক স্বাভাবিক গলায় বলে,
— বাড়িতে পড়ালেখা হচ্ছে না বললো, তাই হোস্টেলে গেছে।

রেহানা কথাটা শুনে মাথা নাড়েন। তারপর বলেন,
— ওহ। আচ্ছা, কালকে আসতে বলো। কতদিন দেখি না।

ফাহমিদা আইরিন কথা যেন আর না বাড়ে তাই প্রসঙ্গ বদলে বলেন,
— আচ্ছা, বলবো। এখন আসো খেতে।

রেহানা সম্মতি জানিয়ে বলেন,
— হ্যাঁ, চলো।

এরপর সবাই একে একে ডাইনিং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। রুদ্রিক নৌশির হাত ধরে শান্ত গলায় বলে,
— চল।

বলেই নৌশিকে সাথে নিয়ে লিভিং রুম থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোতে থাকে। রুদ্রিককে যেতে দেখে পেছন থেকে ফাহমিদা আইরিন জিজ্ঞেস করেন,
— খাবে না তুমি?

রুদ্রিক পেছন ফিরে তাকিয়ে বলে,
— আসছি।

বলেই নৌশিকে নিয়ে সোজা রুমে চলে আসে। রুমে ঢুকে দরজাটা লাগিয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে,
— ওড়না কোথায় তোমার?

নৌশি স্বাভাবিক গলায় উত্তর দেয়,
— আলমারিতে।

— ওগুলো কাভার্ডে রাখার জন্য না।

বলেই কাভার্ডের দিকে এগিয়ে যায় রুদ্রিক। সেখান থেকে একটা ওড়না বের করে এনে নৌশির বুকের ওপর দিয়ে ঠিক করে পরিয়ে দিতে দিতে বলে,
— রুম থেকে বের হলে মাস্ট বি বুকে ওড়না থাকতে হবে।

রুদ্রিকের কথায় নৌশি কিছু বলে না। নৌশির মাথায় অন্য প্রশ্ন ঘুরছে। তাই জিজ্ঞেস করেই ফেলে,
— আপনার ফুপিকে সত্য বলেননি কেন? রুমাইরা চাচির কথাটা লুকালেন কেন?

রুদ্রিক গম্ভীর গলায় বলে,
— বাবা এবং দুই দুইটা বড় ভাই থাকা সত্ত্বেও বোনকে কন্ট্রোল করতে পারিনি। পালিয়ে গেছে একটা ছেলের হাত ধরে। এটা কতটা লজ্জার তুমি বুঝবে না। তাই বলতে হচ্ছে মিথ্যে কথা।

নৌশি কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
— শুধুই কন্ট্রোলের জন্য রুমাইরা চাচিকে চান?

রুদ্রিক নরম ক্লান্ত স্বরে বলে,
— নৌশি, মেয়েরা বাড়ির সম্মান। মেয়েরা যখন বাড়ির গন্ডি পেরিয়ে একটা ছেলের হাত ধরে চলে যায় তখন তার পায়ের নিচে সর্বপ্রথম পিষে যায় বাবা ভাইদের সম্মান।

রুদ্রিকের কথাগুলো শুনে নৌশির কেন জানি হঠাৎ খুব কান্না পায়। রুদ্রিকের কথাগুলো আজ অনেক শান্ত নিচু গলায়। এবং প্রতিটা কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকা কষ্টটা নৌশি ঠিকই অনুভব করতে পারছে। আর ইদানীং রুদ্রিককে কষ্ট পেতে দেখাটা তার একদমই সহ্য হয় না। মানুষটার কষ্ট যেন দিন দিন তার নিজের কষ্ট হয়ে উঠছে। সে চায় না, কখনো কোনো কারণে রুদ্রিকের মাথা নিচু হোক। চায় না মানুষটার সম্মান কিংবা আত্মসম্মানে সামান্যতম আঘাত লাগুক। তাই কিছুটা অবুঝের মতোই প্রশ্ন করে বসে,
— আপনার মাথা নিচু হয়ে গেছে রুমাইরা চাচি পালিয়ে যাওয়ায়?

রুদ্রিকের ঠোঁটে ফুটে উঠে শূন্য হাসি। তারপর তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
— মানুষ তো জানে না এখনো রুমাইরার পালিয়ে যাওয়াটা। যদি জানে, আমার সম্মান, আত্মসম্মান কিছু থাকবে না। মুখ দেখানোর মতো অবস্থায় আমি থাকবো না।

চলবে?

[ ৪ হাজারের বেশি শব্দের বিশাল পর্ব। এই পর্বে কাল রাত ৮টার মধ্যে ৬ হাজার লাইক করে দিবেন। ধন্যবাদ। 💜 ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 18 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন