ফন্ট সাইজ:
থিম:
লুকোচুরি

পর্ব 1

লেখক: ফাহিমা

সময়টা ছিল ২০২৫ সালের ৩রা ডিসেম্বর, বুধবার। তবে ঘটনাটি ঘটেছিল তারও কয়েকদিন আগে, ২৬শে নভেম্বর। রাত তখন বারোটা। নাজিয়া একা একা বসে ভাবছিল, সে যে সামিরকে ভালোবাসে, তাকে কি মনের কথাটা বলে দেবে? কিন্তু, কীভাবে বলবে? তার তো ছেলেটার সামনে যাওয়ার বিন্দুমাত্র সাহস নেই! সামনে গেলেই হাত-পা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। কী করবে সে এখন?তখনই হুট করে তার মনে পড়ল সামিরের চাচাতো ভাই, রিমের কথা। রিম একবার বলেছিল, "আপু, আপনি যদি সরাসরি বলতে না পারেন, তাহলে আমাকে একটা চিঠি লিখে দিয়েন। আমি সেটা ভাইয়াকে দিয়ে দেব।" এই রিম তো অনেক আগে থেকেই নাজিয়াকে নিজের ভাবি বানানোর জন্য একেবারে পাগল ছিল! তাই সে খুবই খুশি মনে এই বুদ্ধি দিয়েছিল।তো আর কী, নাজিয়ার মাথার মধ্যেও এই ভূত চেপে বসল। নাজিয়া ঝটপট একটি চিঠি লিখল। কিন্তু, সেই চিঠিটা সে খালি দিল না। সাথে দিল কিশোরী মনের এক টুকরো আবেগ, কিছু চকলেট আর কিটকেট। এরপর সে ভাবছিল, কী ফুল দেওয়া যায়? তখন তার মনে পড়ল, সামির যেহেতু একটা আস্ত গাধা, তাই সে সামিরকে একটা গাঁদা ফুলই দিল! আর এসব কাণ্ড শেষ করতে করতে রাত তিনটে বেজে গেল, তারপর সে ঘুমাতে চলে গেল।পরের দিন নাজিয়া তার বোন, তাজিয়াকে দিয়ে চিঠিটা পাঠাতে চেয়েছিল। কিন্তু, পরীক্ষা থাকার কারণে তাজিয়া আর সেটা দিতে পারেনি। তারপর, দীর্ঘ ৬ দিন পর নাজিয়া নিজে চিঠিটা রিমের হাতে দিল। রিম বক্সটা দেখেই মুচকি একটা হাসি দিল, এরপর বলল, "আপু, এটাই কি ওটা? মানে, সামির ভাইয়াকে দেওয়ার ওটাই?" নাজিয়া লজ্জা পেয়ে বলল, "হ্যাঁ, কিন্তু সাবধানে নিয়ে যাও।" রিম তো অনেক খুশি হয়ে গেল! অবশেষে, অনেক ঘুরপাক খেয়ে সামিরের কাছে চিঠিটা পৌঁছাল ২৬শে ডিসেম্বর।যাইহোক, সে গেল। নাজিয়া যে সামিরকে ভালোবাসত, সামির তখন তাদের স্কুলের কাছেই নিজেদের দোকানে বসে ছিল। রিম চারপাশ খেয়াল করে, বেশ সাবধানেই বক্সটা সামিরের হাতে দিল। এরপর খুশিতে নাচতে নাচতে চলে যেতে নিলে, সামির আবার তাকে পেছন থেকে ডাক দিল। সামির জিজ্ঞেস করল, "রিম, এটা কে দিয়েছে?" তখন রিম বলল, "নাজিয়া আপু।" এই কথা বলেই সে বাড়ির দিকে রওনা দিল।এর কিছুক্ষণ পরেই, সামিরের বন্ধুরা সবাই দোকানে এলো। সামির বারবার চিঠির বক্সটা বন্ধুদের কাছ থেকে লুকাতে চাচ্ছিল। বন্ধুরা এই ব্যাপারটা ধরে ফেলল এবং বক্সটা কিসের, তা নিয়ে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল আর হাসাহাসি করতে থাকল। তখন সামির বন্ধুদের কাছে নাজিয়ার কথা বলল। কথা হলো, নাজিয়াদের বাসার একদম পাশেই ছিল সামিরের বাবার দোকান, আর এই দোকানেই তখন সামির বসে ছিল। এর কিছুক্ষণ পরেই বন্ধুরা চলে গেল, এবং সামিরও দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরল।এরপর বিকেলে নাজিয়ার বোন, তাজিয়া বাজারে গেলে, সামির তাজিয়াকে ঘুরে ঘুরে দেখছিল। কারণ, সামির জানত যে এই তাজিয়াই চিঠিটা দেওয়ার পেছনে ছিল। এদিকে তাজিয়া তো ভীষণ ভয় পেয়ে গেল! সে কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, সামির কেন তার দিকে ওভাবে তাকিয়ে আছে। তাজিয়া এতটাই ভয় পেয়েছিল যে, এক দোকানে যেতে নিয়ে ভুল করে অন্য আরেকটা দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। সে তখনো মনে মনে ভাবছিল, সামির কেন তার দিকে এমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিল?হঠাৎ সাঈদ কাকার কথায় তার হুশ ফিরল। সাঈদ কাকা ছিলেন সামিরের ছোট চাচা। উনি তাজিয়াকে জিজ্ঞেস করলেন, "কী লাগবে তোমার?" তাজিয়া ভয়ে ও হড়বড়ানিতে বুঝতে পারছিল না কী বলবে! পরে কোনোমতে বলল, "একটা ফেদার (ব্যাডমিন্টনের কর্ক) দেন।" তারপর ফেদারটা নিয়েই সে তাড়াহুড়ো করে বাড়ি চলে এলো।বাড়ি ফিরেই সে নাজিয়াকে বলল, "দুলাভাই আমার দিকে ভূতের মতো তাকিয়ে ছিলেন! আমি তো ভয়ে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পরে ভুলে কাকার দোকানে গিয়ে এই ফেদার নিয়ে আসছি। এখন চল, খেলি।" নাজিয়া হেসে বলল, "আমি গোসল করে আসি, তারপর খেলব।" তারপর, যখন সে গোসল করে...নাজিয়া যখন গোসল করে বের হলো, তখন তাজিয়া আবার বলল, "ভাইয়া বারবার ছাদের দিকে তাকাচ্ছে। মনে হয় তোমাকে খুঁজছে। চলো, গিয়ে দেখবে?"তারপর নাজিয়া আর কোনো দ্বিধা না করে তাজিয়ার পিছু পিছু ছাদে গেল। ছাদে গিয়েই নাজিয়া দেখল, সামির একটা চমৎকার কালো রঙের শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু নাজিয়া নিজে তখন পরে ছিল সাদা রঙের জামা। সামিরের সাথে পোশাকের রঙ মেলাতে সে দ্রুত নিচে নেমে গেল এবং একটা কালো রঙের জামা পরে আবার ছাদে চলে আসল। এসে দেখে, সামির তখনো আগের মতোই বারবার ছাদের দিকে তাকাচ্ছে।তখন থেকেই শুরু হলো তাদের মিষ্টি লুকোচুরি খেলা! সামির যখনই ছাদের দিকে তাকায়, নাজিয়া অমনি লজ্জায় লুকিয়ে পড়ে। তারপর আবার যখন সামির অন্য দিকে ফিরে যায়, তখন নাজিয়া পরম আবেশে সামিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। এভাবেই বেশ খানিকটা সময় চলল তাদের ভালোবাসার লুকোচুরি খেলা। একসময় মাগরিবের আজান দিয়ে দিল, তবুও যেন তাদের এই পিরিতের লুকোচুরি খেলা শেষ হতে চায় না! নাজিয়াকে বারবার তার বোন তাজিয়া নিচে চলে যাওয়ার জন্য ডাকতে লাগল, কিন্তু নাজিয়া কিছুতেই ছাদ থেকে নামল না। এরপর চারপাশে যখন একদম অন্ধকার হয়ে আসলো, তখন নাজিয়া বাধ্য হয়ে নিচে নেমে আসল।এই নতুন সম্পর্কটি নিয়ে নাজিয়া মনে মনে অনেক খুশি ছিল। আর রিমের মুখ থেকে তো খুশিতে হাসিই সরছিল না! সত্যি বলতে, এই সম্পর্কের ব্যাপারে নাজিয়া-সামিরের চেয়েও বেশি খুশি ছিল রিম, সামিরের ছেলে বন্ধুরা এবং তার চাচাতো-ফুপাতো ভাইয়েরা। তার পরের দিন যখন রিম নাজিয়াদের বাড়িতে আসল, তখন সে নাজিয়াকে দেখেই চওড়া হাসি দিয়ে একটা কথাই বলল, "নাজিয়া আপু, এখন থেকে আপনি আমার ভাবি! কী মজা!" রিম যে কতটা আনন্দিত, সেটা রিমের চেহারা দেখলেই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল।এরপর একদিন সকালের কথা। নাজিয়ার বেস্ট ফ্রেন্ড, হিমা রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। তখন সামির বারবার শুধু হিমার দিকেও ঠিক ভূতের মতোই তাকিয়ে ছিল। কারণ, সামির ভালো করেই জানত যে নাজিয়া সারাক্ষণ এই হিমার সাথেই থাকে। এরপর হিমা কিছুটা অবাক হয়ে নাজিয়ার কাছে এলো এবং বলল, "সামির ভাই কেন বারবার আমার দিকে ওমন অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে ছিল রে?" তখন নাজিয়া মুচকি হেসে সব কিছু হিমাকে বুঝিয়ে বলল। ঠিক তখনই, তাদের কথার মাঝে পাগলা রিম হুট করে এসে হিমাকে বলল, "নাজিয়া আপু এখন থেকে আমার ভাবি! তাই এখন থেকে সবাই আমাকে একটু বেশিই সম্মান দিবা, কথাটা যেন সবার মাথায় থাকে!"এরপর মজা ও দুষ্টুমি শেষে, রিম যখন বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল, তখন সে নাজিয়াকে বলল, "ভাবি, আপনার ফোন নম্বরটা দেন। ভাইয়াকে দেব। ভাইয়া, মানে আপনার হবু জামাই আপনার সাথে কথা বলবে।" নাজিয়া এতক্ষণ মনের মানুষের কথা বলাতে মনে মনে বেশ খুশিই ছিল। কিন্তু, যখনই ফোন নম্বরের কথা আসল, তখন সে হঠাৎ ভীষণ রেগে গেল। সে রেগে গিয়ে বলল, "আমার এই প্রেম-টেম একদম পছন্দ না! আমার শুধু ওকে বলার দরকার ছিল যে আমি ওকে ভালোবাসি। তার মানে এই না যে সে বিয়ের আগে আমার সাথে মোবাইলে কথা বলবে কিংবা প্রেম করবে! আর আমার এসব রিলেশন-মিলেশন মোটেও পছন্দ না। আরেকবার যেন এসব কথা আমি না শুনি!" এসব অদ্ভুত কথা যেন রিমের মাথার ওপর দিয়ে গেল! সে কিছু না বুঝতে পেরে শুধু বলল, "ভাবি, আল্লাহ হাফেজ।" এই বলেই সে চলে গেল। রিম হচ্ছে সামিরের চাচাতো ভাই, আর সে অনেক আগে থেকেই সামিরের ছোটখাটো স্পাই (Spy) বা গোয়েন্দা ছিল। রিম কোথায় কী হচ্ছে না হচ্ছে, তার সব খবর সামিরের কাছে পৌঁছে দিত। অন্যদিকে নাজিয়ার স্পাই ছিল তার নিজের বোন, তাজিয়া।অতঃপর, সব খুশি এক নিমেষেই শেষ হয়ে গেল একদিন রাতে। কারণ, দুজন মানুষ আচমকা এই সম্পর্কের বিরুদ্ধে গিয়ে দাঁড়াল। একজন সামিরের চাচাতো বোনের জামাই, আর অন্যজন সামিরের চাচির ভাই। তারা সামিরকে উস্কে দিয়ে বলল, "নাজিয়ার এত বড় সাহস কী করে হলো তোমাকে চিঠি দেওয়ার? নাজিয়াকে একটা ভালো শিক্ষা দেওয়া দরকার!" তাদেরকে অনেকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু তারা কিছুতেই বুঝল না। একপর্যায়ে পরিস্থিতি হাতাহাতির দিকে চলে গেল! এরপর অবস্থা জটিল হয়ে যাচ্ছে দেখে সামিরের মা ছুটে এলেন ঝগড়া থামাতে। তিনি বললেন, "এবারের মতো ছেড়ে দাও। দুজনেই বাচ্চা মানুষ, এইজন্য এত কিছু বোঝেনি।" কিন্তু তারা তাও মানল না। মানে, বুঝতেই চাইছিল না যে মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে! অবশ্য তাদের কথা আর অযৌক্তিক জেদ তেমন একটা কাজে আসেনি। কারণ, তারা ছিল মাত্র দুজন, আর বাকি সবাই ছিল অন্য দলে। বাকিরা সবাই বোঝাচ্ছিল যে বাচ্চা মানুষ একবার ভুল করেছে, আর কোনোদিন এমন করবে না। আর এত বড় সমস্যার মধ্যেও অর্ধ-পাগল রিম শুধু একা একা হাসছিল আর বকর বকর করছিল! যখন সামির তাকে ধমক দিয়ে বকা দিল, তখন গিয়ে তার মুখের পটর পটর বন্ধ হলো। নাজিয়া মনে মনে খুশি হলো, কারণ বেশি হাসলে এমনই হওয়া দরকার!পরের মাসের ৫ তারিখ, শনিবার সকাল তখন ১১টা বাজে। সামিরের বোন তুলি নাজিয়াদের বাড়ি এসে বলল, "তোমার এখন পড়াশোনার বয়স, তাই এসব থেকে একটু দূরে দূরে থাকো। এসব করার অনেক সময় পাবে, পরে কোরো।" নাজিয়া তখন মনে মনে বলল, 'আমিও তো ঠিক এমনটাই চাই! কিন্তু আপনার পাগলা ভাই তো সেটা বোঝে না।' এরপর নাজিয়া তুলিকে মুখে বলল, "আমি ওকে ভালোবাসি, সেটা আমি শুধু জানিয়েছি। কিন্তু এখন ওর সাথে প্রেমঘটিত কোনো কিছু আমি করতে পারব না।" তার এমন বাস্তববাদী উত্তর শুনে তুলি বেশ খুশি হলো। আসলে, কেউ নাজিয়া বেচারির মনের কষ্টটা বোঝেনি, একমাত্র তুলি ছাড়া! এরপর তুলি চলে গেল। তুলি যাওয়ার পর নাজিয়ার মা, বোন ও ভাই মিলে নাজিয়াকে অনেক বকাবকি করল। নাজিয়া অবশ্য কোনো উত্তর দিল না, কারণ সে মনে মনে বিশ্বাস করত যে এভাবে হুট করে চিঠি দেওয়াটাও এক ধরনের অন্যায় ছিল।গত ৩ তারিখ থেকে ৫ তারিখের মধ্যেই সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেল। এরপর নাজিয়া আর সামিরের মধ্যে আর কোনোদিন কোনো কথা হলো না। কিন্তু, দুজন দুজনকে কখনো ভুলেও গেল না; ঠিকই আজীবন মনে রেখেছিল।এদিকে রিম কিন্তু সরাসরি নাজিয়ার সাথে কথা বলত না। কিন্তু, যখনই নাজিয়া অন্য কারও সাথে কথা বলত, রিম কোনো কারণ ছাড়াই নাজিয়ার আশেপাশে ঘুরঘুর করত আর অযথাই মিটিমিটি হাসত। রিম তো ছিল সামিরের ছোটখাটো স্পাই (Spy), এইজন্য সে সারাক্ষণ আজাইরা সব কথাবার্তা বলে মানুষের পেট থেকে প্রয়োজনীয় কথা বের করে ফেলত! সবদিক দিয়ে রিম আজাইরা হলেও, এই একটা দিকে রিম কিন্তু অনেক কাজের ছিল। সবার পেট থেকে দরকারি ও গোপন কথা বের করাই ছিল রিমের আসল কাজ। মজার ব্যাপার হলো, রিম প্রথমে নাজিয়ারই স্পাই ছিল! সামিরের একটা বড় সমস্যা ছিল যে, নাজিয়া যাকেই নিজের স্পাই বানাত, দুইদিন পর সে সামিরের স্পাই হয়ে যেত।এর মাঝে অনেকদিন কেটে গেল। হঠাৎ করে সামিরের মামা আর সামিরের সেই বোনজামাই আবার বাড়িতে আসল। সামির নিজে কাউকে ভয় পেত না, তবে তার মনে শুধু একটাই ভয় ছিল—তারা যদি আবার নাজিয়ার কোনো ক্ষতি করে বসে! তাই সামির নিজের দিক থেকে সতর্ক থাকতে ওর চাচাতো ভাই সাকিকেও নতুন স্পাই হিসেবে দলে নিল। এই সাকি একসময় নাজিয়ার ক্লাসমেট ছিল। সাকির আবার গোয়েন্দাগিরি করা ভীষণ পছন্দের ছিল, তাই সে সামিরের প্রস্তাবে এক কথাতেই রাজি হয়ে গেল। সাকির মূল কাজ ছিল নাজিয়ার খেয়াল রাখা, যেন কেউ নাজিয়ার কোনো ক্ষতি করতে না পারে। নাজিয়া অবশ্য জানত না যে তার সুরক্ষায় দু-দুটো স্পাই দিনরাত খবরাখবর রাখছে।ধীরে ধীরে নাজিয়া আর সামির, দুজনে মিলে দুটো আলাদা দলে বিভক্ত হয়ে গেল। নাজিয়ার দলের নাম ছিল ‘Bloody Lion’ আর সামিরের দলের নাম ছিল ‘Bullet’—একেবারে আজাইরা দল যাকে বলে! নাজিয়ার দল সামিরের সব খবর নাজিয়াকে এনে দিত, আর সামিরের দল নাজিয়ার প্রতি মুহূর্তের খবর সামিরকে পৌঁছে দিত। নাজিয়া কিছুদিন পর নিজের দলে নেওয়ার জন্য আরও দুটো নতুন আজাইরা মানুষ খুঁজে বের করল। কিন্তু, কী কপাল! সামির নিজের পাণ্ডিত্য খাটিয়ে ওই দুটোকেও ফুসলিয়ে নিজের দলে নিয়ে গেল! কেমনটা লাগে বলুন তো? নাজিয়া যেই জিনিসের দিকে চোখ দেবে, সেটা সামিরের চাই-ই চাই! যদিও এটার পেছনে কোনো শত্রুতা ছিল না, পুরোটাই ছিল একটা মিষ্টি খুনসুটি।এর কিছুদিন পর, সামির সরাসরি নাজিয়াকে রিলেশনের প্রস্তাব দিল। কিন্তু নাজিয়া নিজের নীতিতে অটল থেকে পরিষ্কার মানা করে দিল। এর পর থেকেই শুরু হলো নাজিয়াকে দেখলেই সামিরের এক অদ্ভুত ও অগোছালো জীবন! নাজিয়াকে সামনে দেখলেই সে সিগারেট খাওয়া শুরু করত, আরও কত কী যে করত! এসব দেখে বন্ধুমহলের কেউ তাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে সে মুচকি হেসে বলত, "নাজিয়াকে কান্না করতে দেখলে আমার খুব ভালো লাগে, ওর রাগী রাগী ফেসটা আমার ভীষণ পছন্দের!" আর নাজিয়াও দূর থেকে তার এই পাগলামি দেখে মনে মনে রাগ দেখিয়ে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত। শুধু তা-ই নয়, কিছুদিন পর পর সামির নাজিয়াকে ফোনে এসএমএস (SMS) দিয়ে হুমকি দিয়ে বলত, "তুমি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি না হও, তাহলে আমি তোমার আব্বুকে গিয়ে বলব যে তুমি আমাকে ডিস্টার্ব করো!"আপনার ব্যাপারে একটা প্রচলিত কথা আছে না? মাঝে মাঝে নিজের নামে এমন কিছু অদ্ভুত কথা শোনা যায়, যা আমি তো দূর—আমার দুই কাঁধের ফেরেশতারাও হয়তো জানে না! তারা নিজেরাও তখন কনফিউশনে পড়ে গিয়ে একে অপরকে বলে, "কিরে, এটা তুই কখন করলি?" নাজিয়ার সাথেও ঠিক সেম কাহিনীটাই হলো। সে মনে মনে ভাবছিল, সে সামিরকে কখন, কীভাবে ডিস্টার্ব করল? তখন হঠাৎ নাজিয়ার মনে পড়ল, সে তো প্রতিদিন বিকেলবেলা ছাদ থেকে সামিরকে দেখে, হয়তো সামির সেই দেখার কথাটাই বলছে! তখন নাজিয়া আর কোনো তর্ক না করে সামিরকে শুধু 'ওকে' লিখে দিল।এরপরও সামির নাজিয়াকে আরও দু-তিনবার একই রকম বানোয়াট মেসেজ দেয়। সামির যদিও নাজিয়াকে শুধু রাগানোর জন্যই এগুলো বলছিল, কিন্তু সে যখন বুঝল যে নাজিয়া সহজে রাগবে না, তখন সামির নিজেই উল্টো বিরক্ত হয়ে নাজিয়াকে বলল, "তোমার সমস্যা কী?" নাজিয়া এবার আর কিচ্ছু না বলে, ঝটপট সামিরকে ব্লক করে দিল! যদিও সামিরের আইডি ছিল দুটো, তাই এক আইডিতে ব্লক করলে অন্যটা সবসময় অপশনাল হিসেবে খোলাই থাকত।এর পরের দিন, নাজিয়া এবার সামিরকে রাগানোর জন্য তার অন্য ওই আইডিতে একটা মেসেজ দিল। তখন সামির সুযোগ পেয়ে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কি আমাকে মিস করছ?" নাজিয়া তখন দেমাক দেখিয়ে বলল, "আমি তোমাকে একটুও মিস করি না!" সামির খুব ভালো করেই বুঝত যে নাজিয়া তাকে রাগানোর জন্যই এসব উল্টোপাল্টা কথা বলছে, তাই সে মোটেও রাগল না। নাজিয়া হাজার চেষ্টা করেও সামিরকে রাগাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হলো।উল্টো সামির মাঝখান থেকে নাজিয়াকেই এক নিমেষে রাগিয়ে দিল! কথায় আছে না, কিছু মানুষ হলো আস্ত 'মিঠা শয়তান'! এতক্ষণ নাজিয়া নিজে রাগাতে চেয়েও পারল না, আর সামির মাত্র এক মিনিটেই নাজিয়ার মাথা গরম করে দিল। সামির গম্ভীর হয়ে নাজিয়াকে বলল, "আমি এখনো অন্য এক নারীর মায়া কাটিয়ে উঠতে পারি নাই। সিগারেটের ধোঁয়ায় আমি তার মায়া একটু একটু করে কাটিয়ে উঠতে চাইছি, তাই তো আমি আজকাল এত সিগারেট খাই!" এই কথা শুনে নাজিয়া চরম রেগে গেল এবং বলল, "তুমি আর কখনো আমার সাথে কথা বলবে না!" এই বলেই সে রাগ করে সাথে সাথে অফলাইন হয়ে গেল।একদিন নাজিয়া আর তাজিয়া দুজনে মিলে ছাদে হাঁটছিল। তখন হঠাৎ করে নাজিয়া সামিরকে দেখতে পেল। আর সামিরকে দেখার সাথে সাথেই, নাজিয়ার হার্টবিট এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে গেল! শুধু সেদিনের কথাই নয়, এমনটা প্রতিদিন হয় নাজিয়ার সাথে; সামিরকে চোখের সামনে দেখলেই তার হার্টবিট কেমন যেন হু হু করে বেড়ে যায়। এভাবেই একটা একটা করে দিন পার হতে লাগল, আর তাদের ছাদের লুকোচুরি খেলাও দিন দিন আরও বেড়ে গেল। এগুলোর বাইরে যদিও প্রকাশ পেত শুধুই খুনসুটি, তবে এই অবাধ্য খুনসুটির আড়ালেই লুকিয়ে ছিল দুজনের গভীর ও সত্যিকারের ভালোবাসা।
(গল্পের এই অংশটি আপাতত সমাপ্ত)চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।

উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন