মেঠো পথ
লেখিকা : তারিন আহমেদ
পর্ব সংখ্যা : ১
মাটির গন্ধে, ভালোবাসার পরশে... এই তো আমাদের মেঠো পথ।
ভোরের আলো ফুটতেই ঘুম ভাঙল মাধবপুর গ্রামের। পূর্ব আকাশে লাল সূর্যটা ধীরে ধীরে উঁকি দিচ্ছে। গাছের ডালে ডালে পাখির কিচিরমিচির, দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসছে শালিকের ডাক। মেঠো পথের দুই পাশে শিশিরভেজা ঘাস আর সবুজ ধানক্ষেত। গ্রামের কৃষকেরা কেউ লাঙল কাঁধে, কেউবা গরু নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে।
মাধবপুর গ্রামের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল চৌধুরী বাড়ি। পুরোনো আমলের দোতলা বাড়ি। সামনে বড় উঠান, একপাশে পুকুর, আর পেছনে আম-কাঁঠালের বাগান। বাড়ির চারদিকে নানা রকম ফুলের গাছ। সকাল হলেই বাড়ির উঠানে পাখির আনাগোনা শুরু হয়।
এই বাড়ির বড় মেয়ে আনায়া চৌধুরী। বয়স আঠারো। পরিবারের সবার আদরের মেয়ে। দেখতে মিষ্টি, স্বভাবে ভীষণ চঞ্চল। তার দুষ্টুমিতে বাড়ির মানুষজনের অর্ধেক সময় হাসি আর বাকি অর্ধেক সময় রাগ করে কাটে।
সকাল সাতটা।
চৌধুরী বাড়ির রান্নাঘরে ব্যস্ততা চলছে। রোকেয়া বেগম চুলার পাশে বসে রুটি বানাচ্ছেন। আর কাজের মেয়ে রহিমা উঠান ঝাড়ু দিচ্ছে।
এমন সময় দোতলা থেকে একটা চিৎকার ভেসে এলো—
— আম্মাআআ!
রোকেয়া বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন,
— আবার কী অইল এই মাইয়ার!
কিছুক্ষণ পর আনায়া এলোমেলো চুলে রান্নাঘরে এসে হাজির হলো।
— আম্মা, আমার লাল ফিতাডা কই?
— আমি কেমনে জানমু? নিজের জিনিস নিজে রাখস না ক্যান?
— আম্মা, কাল রাইতে তো টেবিলের উপরেই রাখছিলাম!
পেছন থেকে রায়হানের হাসির শব্দ এলো।
— আপা, ফিতা খুঁইজা কী করবা? মাথায় বাঁইধা গরু চরাইতে যাইবা?
আনায়া চোখ বড় বড় করে তাকাল।
— এই রায়হান! তুই আমার ফিতা লুকাইছস, তাই না?
রায়হান নিরীহ মুখ করে বলল,
— আমি আবার তোমার ফিতা লুকামু ক্যান? আমার কি আর কাম নাই?
— দাঁড়া, তোরে আজ দেখাইতাছি!
রায়হান দৌড়ে উঠান পার হয়ে পালিয়ে গেল। আনায়াও তার পেছনে ছুটল।
রোকেয়া বেগম দুজনের কাণ্ড দেখে মাথায় হাত দিলেন।
— আল্লাহ, এই দুইডারে নিয়া আমি আর পারি না!
ঠিক তখনই বারান্দা থেকে জহির উদ্দিন চৌধুরীর গলা শোনা গেল।
— কী হইছে রোকেয়া? সকাল সকাল এত চিল্লাচিল্লি কিসের?
রোকেয়া বেগম বিরক্ত মুখে বললেন,
— তোমার আদরের পোলামাইয়া দুইজন আবার যুদ্ধ লাগাইছে!
জহির উদ্দিন হেসে বললেন,
— থাকতে দাও। বাড়িতে একটু হাসাহাসি না থাকলে ভালো লাগে নাকি?
কিছুক্ষণ পর।
বাড়ির সামনের বারান্দায় বসে নাশতা করছিলেন জহির উদ্দিন চৌধুরী। পাশে বসে আছে বাড়ির ছোট মেয়ে মায়া। মায়ার বয়স বারো। শান্ত স্বভাবের মেয়েটা সবসময় বই নিয়ে বসে থাকতে ভালোবাসে।
এমন সময় আনায়া এসে বাবার পাশে বসে পড়ল।
— আব্বা!
— কী মা?
— একটা কথা কই?
— কও।
— আইজ বিকেলে মেলায় যামু।
জহির উদ্দিন চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
— কার লগে যাইবা?
— নীলু আর পাখির লগে।
— তোমার আম্মারে কইছ?
আনায়া একটু ইতস্তত করে বলল,
— না, আগে তোমারে কইলাম। তুমি আম্মারে একটু বুঝাইয়া কইও না!
জহির উদ্দিন হেসে বললেন,
— আমারে দিয়া কী হইব? অনুমতি তো তোমার আম্মার কাছ থেইকাই নিতে হইব।
আনায়া বাবার হাত ধরে বলল,
— আব্বা, তুমি না আমার সবচেয়ে ভালো আব্বা!
জহির উদ্দিন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
— বেশি তেল দিস না। তোর আম্মার কাছে গিয়া নিজেই কইস।
পাশ থেকে মায়া হেসে বলল,
— আপা, তুমি আম্মারে রাজি করাইতে পারবা না।
আনায়া ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— তুই চুপ থাক। তোরে কিন্তু মেলা থেইকা কিছু কিনে দিমু না!
মায়া সঙ্গে সঙ্গে চুপ হয়ে গেল।
দুপুরের দিকে।
আনায়া নিজের ঘরে বসে চুল আঁচড়াচ্ছিল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে দেখা যায়, বাড়ির পেছনের পুকুরে কয়েকটা হাঁস সাঁতার কাটছে। পুকুরের পাশের গাছগুলো বাতাসে দুলছে।
এমন সময় বাইরে থেকে ডাক এলো—
— আনায়া! ও আনায়া!
সে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, তার বান্ধবী নীলু আর পাখি গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
— এই যে! দাঁড়া, আইতাছি!
আনায়া তাড়াতাড়ি চুল বেঁধে ওড়না গুছিয়ে নিচে নেমে এলো।
নীলু বলল,
— এত দেরি করস ক্যান? আমরা সেই কখন থেইকা দাঁড়াইয়া আছি!
আনায়া হেসে বলল,
— আরে, সাজতে একটু সময় লাগে না?
পাখি মজা করে বলল,
— তোর সাজতে সাজতে তো আমাগো বুড়া হইয়া যাইতে হইব!
তিনজন হেসে উঠল।
আনায়া বলল,
— চল, আগে নদীর ঘাটে যাই। তারপর মেলার কথা ভাবমু।
তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে মেঠো পথ ধরে হাঁটতে লাগল। পথের দুই পাশে সবুজ ধানক্ষেত। কোথাও কৃষকেরা জমিতে কাজ করছে, কোথাও ছোট ছেলেমেয়েরা খালি পায়ে দৌড়াদৌড়ি করছে।
পথের পাশে এক বৃদ্ধা বসে শাক বিক্রি করছিলেন।
আনায়া তাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেল।
— চাচি, শাকের দাম কত?
বৃদ্ধা মিষ্টি করে বললেন,
— দশ টাকা আঁটি মা।
আনায়া একটা আঁটি কিনে নীলুর হাতে দিয়ে বলল,
— এইডা ধর তো।
নীলু অবাক হয়ে বলল,
— তুই শাক কিনলি ক্যান?
— আম্মার লাইগা। সকালে রান্না করতে দেখে মনে হইল, এই শাকটা নিলে ভালো হইব।
পাখি হেসে বলল,
— বাহ! আমাদের আনায়া তো দেখি অনেক বড় গৃহিণী হইয়া গেছে!
আনায়া মুখ বাঁকিয়ে বলল,
— বেশি কথা কইস না। বিয়া হইলে তোরে দিয়া রান্না করামু!
তিনজন আবার হাসতে হাসতে হাঁটতে লাগল।
নদীর ঘাটে।
নদীর পানি রোদের আলোয় চিকচিক করছে। ঘাটের পাশে একটা বড় বটগাছ। তার ছায়ায় বসে তিন বান্ধবী গল্প শুরু করল।
নীলু বলল,
— আনায়া, শুনছস? আইজ মেলায় নাকি অনেক দোকান বসব।
পাখি উৎসাহ নিয়ে বলল,
— নাগরদোলাও আইব। আর মিষ্টির দোকানও বসব!
আনায়ার চোখ চকচক করে উঠল।
— তাই নাকি? তাইলে তো আইজ অনেক মজা হইব!
নীলু বলল,
— কিন্তু তোর আম্মা তো তোকে সহজে যাইতে দিব না।
আনায়া আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল,
— আমার আব্বা আছে না? আব্বারে কইছি। উনি আম্মারে বুঝাইব।
পাখি মুচকি হেসে বলল,
— তোর আব্বা তো তোর সব আবদারই রাখে।
আনায়া নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,
— আব্বা আমারে অনেক আদর করে। তবে আম্মাও কম না। শুধু একটু বেশি বকে!
কথাটা বলেই সে হেসে উঠল।
বিকেল।
তিন বান্ধবী বাড়ির দিকে ফিরল। বাড়িতে ঢুকতেই আনায়া দেখল, উঠানে রোকেয়া বেগম বসে সবজি কাটছেন।
আনায়া এগিয়ে গিয়ে মায়ের পাশে বসল।
— আম্মা, কী করো?
— দেখস না? সবজি কাটতাছি।
— আমি কাটতে দিই?
রোকেয়া বেগম অবাক হয়ে তাকালেন।
— তুই সবজি কাটবি?
— হ, সমস্যা কী?
— তোর হাতে ছুরি দিলে সবজি বাদ দিয়া আঙুল কাটবি।
আনায়া মুখ ফুলিয়ে বলল,
— আম্মা, তুমি আমারে কিছুই পারো না ভাবো!
রোকেয়া বেগম হেসে বললেন,
— আচ্ছা, আগে হাত ধুইয়া আয়। তারপর দেখি কত বড় রান্নার ওস্তাদ হইছস।
আনায়া খুশি হয়ে হাত ধুতে চলে গেল।
এদিকে জহির উদ্দিন বাড়িতে ফিরেছেন। তিনি উঠানে ঢুকতেই আনায়া দৌড়ে গিয়ে বলল,
— আব্বা! মেলার কথা আম্মারে কইছ?
জহির উদ্দিন হেসে বললেন,
— কইছি তো। তোর আম্মা বলছে, পড়াশোনার ক্ষতি না হইলে যাইতে পারবি।
আনায়া আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
— সত্যি আব্বা?
রোকেয়া বেগম পাশ থেকে বললেন,
— হ, তবে বেশি রাত করবি না। আর মায়ারে সঙ্গে নিয়া যাইবি।
মায়া দূর থেকে শুনে দৌড়ে এলো।
— আমিও যামু? সত্যি আপা?
আনায়া ছোট বোনকে জড়িয়ে ধরে বলল,
— হ রে পিচ্চি, তুইও যাইবি!
রায়হান পেছন থেকে বলে উঠল,
— আমারে কেউ জিজ্ঞাসা করল না যে আমি যামু কি না!
আনায়া হেসে বলল,
— তুই গেলে তো মেলার সব মিষ্টি একাই খাইয়া ফেলবি!
সবাই হেসে উঠল।
সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মাধবপুর গ্রামের ওপর নেমে এলো। দূরের মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। উঠানের গাছগুলোতে পাখিরা ফিরে এসেছে নিজেদের নীড়ে।
আনায়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে গ্রামের মেঠো পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ছোট্ট পৃথিবীটা কত সুন্দর! মা-বাবা, ভাই-বোন, বান্ধবী আর এই চেনা গ্রাম—সবকিছুতেই তার ভীষণ মায়া।
সে জানে না, সামনের দিনগুলোতে তার জীবনে কত নতুন ঘটনা অপেক্ষা করছে। তবে আপাতত তার মনজুড়ে শুধু আগামীকালের মেলার আনন্দ।
কারণ আনায়ার কাছে সুখ মানে খুব বেশি কিছু নয়। পরিবারের সঙ্গে একটু হাসি, বান্ধবীদের সঙ্গে একটু ঘোরাঘুরি আর মায়ের হাতে রান্না করা গরম ভাত।
এই ছোট ছোট আনন্দ নিয়েই তো তার জীবন।
চলবে...