ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্ধকারে তুই

পর্ব 2

লেখক: সাথী আক্তার

পার্ট ২ - আরিয়ান

"আরিয়ান" নামটা দেখার সাথে সাথেই আমার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। আমি জানি না কেন, কিন্তু এই নামটা আমার খুব চেনা। অনেক পুরোনো একটা ক্ষতের মতো। আমি ডায়েরিটা বন্ধ করতে গিয়েও পারলাম না। পাতার মধ্যে আরও কিছু লেখা ভেসে উঠছে।

"তুমি সত্যি ভুলে গেছো আমাকে? গত বছরের সেই রাতটাও ভুলে গেছো?"

গত বছরের রাত? কোন রাত? আমি তো এই বাসায় আসছি মাত্র দুই মাস হলো। গত বছর তো আমি এখানেই ছিলাম না। তাহলে ও কিসের কথা বলছে?

আমি কাঁপা গলায় বললাম, "আমি আপনাকে চিনি না। আপনি কে? সামনে আসেন।"

কোনো উত্তর আসলো না। কিন্তু আমার ঘরের লাইটটা হঠাৎ দপ দপ করে জ্বলতে নিভতে শুরু করলো। আমি ভয়ে খাটের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসলাম। আমার মনে হচ্ছে আমার ঘরের বাতাস ভারী হয়ে গেছে। কেউ আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

হঠাৎ আমার টেবিলের উপর রাখা পানির গ্লাসটা নিজে নিজে পড়ে ভেঙে গেলো। আমি চিৎকার করে উঠলাম। আমার চিৎকার শুনে পাশের রুম থেকে আমার বান্ধবী নীলা দৌড়ে আসলো।

"কি হইছে? চিৎকার করলি কেন?" নীলা বললো।

আমি ওকে সব খুলে বললাম। ডায়েরির লেখা, ভেজা পায়ের ছাপ, সব। নীলা প্রথমে বিশ্বাস করলো না। ও বললো, "তুই বেশি গল্প পড়ে পড়ে এইসব কল্পনা করছিস।"

কিন্তু যখন ও নিজে ডায়েরিতে "আরিয়ান" নামটা দেখলো আর মেঝেতে ভেজা পায়ের ছাপ দেখলো, তখন ওর মুখটাও ফ্যাকাশে হয়ে গেলো। নীলা আস্তে করে বললো, "এই বাসাটা সম্পর্কে আমি একটা কথা শুনছিলাম।"

"কি কথা?" আমি জিজ্ঞেস করলাম।

"এই বাসার আগের ভাড়াটিয়া একটা মেয়ে ছিলো। তার বয়ফ্রেন্ডের নাম আরিয়ান ছিলো। ওরা এই বাসাতেই থাকতো। এক রাতে ছাদ থেকে পড়ে ছেলেটা মারা যায়। সবাই বলে ছেলেটা সুইসাইড করছে, কিন্তু মেয়েটা বলে ওকে কেউ ধাক্কা দিয়েছে।"

আমার সারা শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো। তাহলে কি আরিয়ানের আত্মা এখনো এই বাসায় আছে? কিন্তু ও আমাকে কেন বলছে আমি ওকে ভুলে গেছি?

নীলা বললো, "চল আজ রাতটা আমার রুমে থাকবি।"

আমি নীলার রুমে চলে গেলাম, কিন্তু সারারাত ঘুমাতে পারলাম না। চোখ বন্ধ করলেই মনে হচ্ছে কেউ আমার পাশে বসে আছে। কেউ আমার নাম ধরে ফিসফিস করে ডাকছে, "অবন্তি... অবন্তি..."

আমার নাম তো অবন্তি! ও আমার নাম জানলো কিভাবে?

সকালে আমি বাড়িওয়ালা আন্টির কাছে গেলাম। আন্টিকে জিজ্ঞেস করলাম, "আন্টি, এই রুমে আগে কে থাকতো?"

আন্টি প্রথমে বলতে চাইলো না। অনেক জোর করার পর বললো, "একটা মেয়ে থাকতো, নাম অবন্তি।"

আমি যেন বজ্রপাতের মতো চমকে উঠলাম। অবন্তি? আমার নামও তো অবন্তি!

আন্টি বললো, "ওই মেয়েটা দেখতে একদম তোমার মতোই ছিলো। ওই মেয়েটার জন্যই তো তোমাকে দেখে আমার এত চেনা চেনা লাগছিলো।"

আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো। আমার মতো দেখতে, আমার নামে একটা মেয়ে এই রুমে থাকতো? আর তার বয়ফ্রেন্ড ছিলো আরিয়ান? তাহলে কি...

আমি দৌড়ে আমার রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। আয়নায় নিজেকে দেখে আমার মনে হলো, আমি কি আসলেই আমি? নাকি আমি অন্য কেউ?

তখনই আয়নার মধ্যে আমি আমার পিছনে একজনকে দেখতে পেলাম। একটা ছেলে, সাদা শার্ট পরা, মুখটা আবছা, কিন্তু চোখ দুটো খুব স্পষ্ট। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। তার চোখে পানি।

আমি পিছনে ফিরে তাকালাম। কেউ নেই। আবার আয়নায় তাকালাম। ছেলেটা এখনো আছে। সে আস্তে আস্তে তার হাত বাড়িয়ে দিলো, যেন আমাকে ছুঁতে চায়।

আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম। যখন চোখ খুললাম, আয়নায় কেউ নেই। কিন্তু আয়নার গায়ে কুয়াশার মতো ভাপ জমে একটা লেখা ফুটে উঠেছে, "মনে করার চেষ্টা করো, অবন্তি। আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি। ছাদে এসো।"

ছাদ? এই বাসার ছাদে যাওয়া তো নিষেধ। বাড়িওয়ালা আন্টি বলেছে ছাদের দরজা সবসময় তালা দেওয়া থাকে।

কিন্তু আমার মন বলছে আমাকে ছাদে যেতেই হবে। আমার সব প্রশ্নের উত্তর ওই ছাদেই আছে। আমি কেন সব ভুলে গেছি? আরিয়ান কে? আর আগের অবন্তির সাথে আমার কি সম্পর্ক?

আমি জানি আজ রাতটা আমার জন্য খুব ভয়ংকর হতে যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। আমাকে জানতেই হবে সত্যিটা কি।

রাত বারোটা বাজতেই আমি আস্তে করে দরজা খুলে বের হলাম। পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ। আমি সিঁড়ি বেয়ে ছাদের দিকে উঠতে লাগলাম। প্রতিটা ধাপে আমার বুকের ধুকপুকানি বাড়ছে। ছাদের দরজার কাছে এসে দেখলাম, দরজাটা খোলা। ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে।

আর ছাদের মাঝখানে একজন দাঁড়িয়ে আছে

আর ছাদের মাঝখানে একজন দাঁড়িয়ে আছে। সাদা শার্ট পরা, লম্বা। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ওটা আরিয়ান। আমার পা কাঁপছে, তবুও আমি সামনে এগোলাম।

"আরিয়ান?" আমার গলা দিয়ে ফিসফিস করে বের হলো।

ছেলেটা আস্তে করে ঘুরে তাকালো। চাঁদের আলোয় এবার তার মুখটা স্পষ্ট দেখলাম। কি মায়াবী চোখ, কিন্তু ভেতরে অনেক কষ্ট জমে আছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো, সেই হাসিতে কান্না লুকানো।

"অবশেষে মনে পড়েছে?" সে বললো। তার গলাটা ভাঙা ভাঙা।

আমি বললাম, "আমি তোমাকে চিনি না, কিন্তু মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরে চিনি।"

সে এক পা এক পা করে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগলো। যত কাছে আসছে, আমার মাথার ভেতরে যেন পুরোনো ছবি ভেসে উঠছে। এই ছাদ, এই রাত, একটা ঝগড়া, কেউ একজন আমাকে ধাক্কা দিচ্ছে না, আমি কাউকে ধাক্কা দিচ্ছি। আমার মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো। আমি দুই হাতে মাথা চেপে ধরে নিচে বসে পড়লাম।

আরিয়ান আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। সে বললো, "তুমি আমাকে মারোনি, অবন্তি। ওটা একটা এক্সিডেন্ট ছিলো। নিজেকে আর দোষ দিও না।"

তখনই আমার সব মনে পড়ে গেলো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 2 শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন