My Dark Prince of Dreams
লেখিকা: সামিয়া মুন
পর্ব — ১ : নতুন এক শুরু
সকালটা অন্য সব সকালের মতোই শুরু হয়েছিল। চারপাশে তখনও সকালের নরম আলো, রাস্তার ব্যস্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে। অথচ মুন জানত না, এই সাধারণ সকালটাই তার জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠা হয়ে থাকবে।
ঘুমের রাজ্যে তখনও ডুবে ছিল মুন। ঘুমটা তার এমনিতেই বেশ গভীর। এলার্ম না বাজলে তাকে বিছানা থেকে ওঠানো যেন অসম্ভব একটা ব্যাপার।
হঠাৎ—
ট্রিং... ট্রিং... ট্রিং...
এলার্মের শব্দে মুন চোখ মেলে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড সে বুঝতেই পারল না কোথায় আছে। তারপর বিরক্ত হয়ে মোবাইলটা হাতে নিয়ে এলার্ম বন্ধ করল।
—উফফ! এত সকাল!
ঘুমজড়ানো চোখে সময়টা দেখতেই মুনের চোখ বড় হয়ে গেল।
—ইশ! আজ তো প্রথম দিন!
এক মুহূর্তেই তার ঘুম উধাও হয়ে গেল।
আজ তার কলেজের প্রথম দিন।
ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার।
নতুন কলেজ, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ—সবকিছুই নতুন।
মুন দ্রুত বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। তাড়াহুড়ো করে গোসল করে তৈরি হতে লাগল। মাঝে মাঝেই ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল সে।
আজ কী পরবে, সেটাও আগের রাত থেকেই ভেবে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত কালো রঙের একটি কুর্তি আর প্যান্ট বেছে নিল। চুল ঠিক করতে করতে আয়নার সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
তার চোখে ছিল উত্তেজনা, আবার অজানা একটা দুশ্চিন্তাও।
মুন আস্তে করে বলল,
—আশা করি দিনটা ভালোই যাবে।
এরপর ব্যাগটা গুছিয়ে নিল সে। খাতা, কলম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র—সব ঠিক আছে কি না আরেকবার দেখে নিল।
মা ইতিমধ্যে নাশতা তৈরি করে রেখেছিলেন।
—মুন, নাশতা করে নে। খালি পেটে বের হবি না।
—হ্যাঁ মা, করছি।
তাড়াহুড়ো করে অল্প একটু নাশতা করল মুন। তারপর ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে দরজার কাছে এসে দাঁড়াল।
বের হওয়ার আগে মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
—মা, দোয়া করো। আজ আমার কলেজের প্রথম দিন।
মা মুনের মাথায় হাত রেখে মিষ্টি করে হাসলেন।
—আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক মা। মন দিয়ে পড়াশোনা করো। ভালো মানুষের সঙ্গে থেকো। আর কোনো সমস্যায় পড়লে আমাকে জানাবে।
মুন মায়ের হাত ছুঁয়ে বলল,
—আমিন।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে তার মনটা একটু শান্ত হয়ে গেল।
তারপর সে রিকশায় উঠে রওনা দিল।
রিকশা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল। পরিচিত রাস্তা, পরিচিত দোকান, পরিচিত মানুষ—সবকিছুই যেন আজ অন্যরকম লাগছিল।
মুন রিকশার পাশে তাকিয়ে রইল।
আজ থেকে তার জীবনে অনেক কিছুই বদলে যেতে পারে।
কিছুক্ষণ পর তাকে বাসে উঠতে হলো। বাসে উঠে জানালার পাশের একটা সিট পেয়ে গেল সে।
সিটে বসে ব্যাগটা কোলে রাখল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।
রাস্তার দৃশ্যগুলো দ্রুত পেছনে চলে যাচ্ছিল।
মুনের মনে তখন একের পর এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল।
“আমার কলেজ জীবনটা যেন ভালো হয়।”
“নতুন নতুন বন্ধু হোক।”
“এমন বন্ধু হোক, যাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলা যাবে।”
“যাদের কাছে নিজের কথা বলতে ভয় লাগবে না।”
“আমার জীবনটা যেন একটু সুন্দর হয়ে ওঠে।”
ভাবতে ভাবতে মুন নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
সে চাঁদপুরের মতলবের একটি স্কুল থেকে পড়াশোনা শেষ করে এবার কুমিল্লার কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছে।
চাঁদপুর থেকে কুমিল্লা—তার জন্য এটা ছিল নতুন একটা যাত্রা।
নতুন শহর।
নতুন কলেজ।
নতুন মানুষ।
আর হয়তো...
নতুন কোনো গল্পও।
মুন তখনও জানত না, তার জীবনের এই নতুন গল্পটা কতটা অদ্ভুত হতে চলেছে।
অবশেষে বাস থামল।
মুন দ্রুত ব্যাগটা ঠিক করে বাস থেকে নামল।
সামনে বিশাল কলেজের গেট।
কিছুক্ষণ সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
চারপাশে অসংখ্য শিক্ষার্থী। কেউ দল বেঁধে হাঁটছে, কেউ নতুন বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলছে, কেউ আবার ক্লাসরুম খুঁজে বেড়াচ্ছে।
মুন গভীর একটা শ্বাস নিল।
তারপর মনে মনে বলল,
—চলো মুন... নতুন জীবন শুরু করা যাক।
সে গেট পেরিয়ে কলেজের ভেতরে ঢুকে পড়ল।
ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের কোলাহল তার কানে এলো। নতুন পরিবেশ দেখে কিছুটা নার্ভাস লাগছিল তার।
নিজের ক্লাসরুম খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে সে সেখানে পৌঁছে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে একবার চারপাশে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে একটা বেঞ্চে গিয়ে বসল।
ব্যাগটা পাশে রেখে চুপচাপ সামনে তাকিয়ে রইল।
মনের মধ্যে তখনও হাজারটা প্রশ্ন।
“আমি কি বন্ধু পাব?”
“সবাই কি আমার সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলবে?”
“আমি কি এই নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব?”
ঠিক তখনই ক্লাসরুমের দরজার কাছে দুটো মেয়ে এসে দাঁড়াল।
তারা দুজনেই চারপাশে তাকাচ্ছিল, যেন তারাও কাউকে খুঁজছে।
একজন মুনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে এল।
মেয়েটা মিষ্টি হেসে বলল,
—তুমি কি নতুন?
মুন একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল,
—হ্যাঁ... আমিও নতুন।
মেয়েটা হাসল।
—আমিও! আমি আমেনা।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—আর আমি নুসরাত।
মুনের মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
—আমি মুন।
আমেনা জিজ্ঞেস করল,
—তুমি কোথা থেকে এসেছ?
মুন একটু গুছিয়ে বসে বলল,
—আমি চাঁদপুর থেকে এসেছি। মতলবের একটা স্কুলে পড়তাম। সেখান থেকেই এবার এখানে ভর্তি হয়েছি।
নুসরাত খুশি হয়ে বলল,
—সত্যি? আমরা তো কুমিল্লাতেই থাকি। কুমিল্লার স্কুল থেকেই পড়েছি।
আমেনা হেসে বলল,
—তাহলে তো আমরা তিনজনই একেবারে নতুন করে শুরু করছি!
মুনও হেসে ফেলল।
কথা বলতে বলতে কখন যে তাদের মধ্যকার অস্বস্তিটা কেটে গেল, তারা নিজেরাও বুঝতে পারল না।
কিছুক্ষণ পর আমেনা বলল,
—চলো, একসঙ্গে বসি।
মুন মাথা নাড়ল।
—হুম।
তিনজন পাশাপাশি বসে পড়ল।
কিছুক্ষণ পর প্রথম ক্লাস শুরু হলো।
শিক্ষক পড়াচ্ছিলেন। আমেনা আর নুসরাত মাঝে মাঝে ফিসফিস করে কথা বলছিল। মুনও তাদের কথায় মাঝে মাঝে হেসে ফেলছিল।
প্রথম দিনেই মুনের ভেতরের অস্বস্তিটা ধীরে ধীরে কমতে লাগল।
তার মনে হলো, হয়তো নতুন জায়গাটা এতটা খারাপ হবে না।
হয়তো সত্যিই সে ভালো বন্ধু পেতে চলেছে।
ক্লাস শেষ হওয়ার পর নুসরাত হঠাৎ বলল,
—চলো, কলেজটা একটু ঘুরে দেখি!
মুন বলল,
—চলো!
তিনজন একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল।
তারা কলেজের করিডোর দিয়ে হাঁটল। মাঠের পাশে গেল। চারপাশের গাছপালা দেখল। নতুন জায়গার ছোট ছোট বিষয় নিয়েও তারা গল্প করতে লাগল।
কখনো হাসি, কখনো মজা, কখনো একে অন্যকে নিয়ে ছোটখাটো ঠাট্টা—প্রথম দিনেই তাদের মধ্যে বেশ ভালো একটা বন্ধুত্ব তৈরি হয়ে গেল।
একসময় তারা মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে গল্প করতে করতে হাসছিল।
মুন কিছুক্ষণ চুপ করে তাদের দিকে তাকাল।
তারপর মনে মনে ভাবল,
“হয়তো আমার চাওয়াটা সত্যিই পূরণ হতে যাচ্ছে...”
“হয়তো আমি সত্যিই ভালো বন্ধু পেয়ে গেছি।”
কিন্তু...
মুন জানত না, সেই মুহূর্তে কলেজের অন্য এক পাশে কেউ একজন তার দিকে তাকিয়ে ছিল।
একজন সম্পূর্ণ অচেনা মানুষ।
মুন তাকে চিনত না।
তার নাম জানত না।
এমনকি সে যে তাকে দেখছে, সেটাও মুনের কোনো ধারণা ছিল না।
ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লোকটি কিছুক্ষণ মুনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে সেখান থেকে চলে গেল।
মুন তখনও কিছুই টের পায়নি।
সে আমেনা আর নুসরাতের সঙ্গে হাসতে হাসতে নিজের নতুন দিনের আনন্দ উপভোগ করছিল।
তার কাছে দিনটা ছিল খুবই সাধারণ।
কিন্তু সত্যিই কি দিনটা এতটা সাধারণ ছিল?
সেই অচেনা মানুষটি কে?
কেন সে মুনের দিকে তাকিয়ে ছিল?
মুনের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী?
আর কেন যেন মনে হচ্ছিল, এই অচেনা মানুষটির উপস্থিতি ভবিষ্যতে মুনের জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
মুন কি জানত, তার এই সাধারণ-looking নতুন দিনের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন এক গল্প—
যার শুরুটা হবে স্বপ্ন থেকে...
আর যার সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাবে এক রহস্যময় নাম—
প্রিন্স।
মুনের নতুন জীবন সেদিন মাত্র শুরু হয়েছিল।
কিন্তু সে জানত না...
এই শুরুই একদিন তাকে এমন এক রহস্যের সামনে দাঁড় করাবে, যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে তাকে নিজের পরিচিত পৃথিবীকেও নতুন করে চিনতে হবে।
চলবে...