একই ছাদের নিচে
লেখিকা: সামিয়া মুন
পর্ব–১: অচেনা দরজা
শহরের ব্যস্ততা তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। দশতলা ভবনের চারপাশে সকালের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে। ভবনটির নাম নীলচূড়া আবাসন। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ হলেও ভেতরে থাকা মানুষগুলোর সম্পর্ক ছিল বেশ জটিল। কেউ আত্মীয়, কেউ বহু বছরের বন্ধু, আবার কেউ এমনভাবে একে অপরের জীবনে জড়িয়ে ছিল যে আলাদা করে তাদের গল্প বলা কঠিন।
পঞ্চম তলার বড় ফ্ল্যাটের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসছিল চায়ের গন্ধ। রাশেদা বেগম চুলার পাশে দাঁড়িয়ে ব্যস্ত হাতে নাশতা তৈরি করছিলেন। তার মেয়ে মেহরিন এখনো ঘুমিয়ে। অন্যদিকে বসার ঘরে তার স্বামী কামাল সাহেব খবরের কাগজ খুলে বসেছেন।
হঠাৎ দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল রায়ান।
কাঁধে ব্যাগ, হাতে কয়েকটি বই, চোখেমুখে ক্লান্তি। গত তিন মাস ঢাকার বাইরে ছিল সে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রকল্পের কাজে যাওয়ার কারণে বাড়িতে আসা হয়নি।
রাশেদা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, “এই তো আমার ছেলে! এতদিন পর মনে পড়ল বাড়ির কথা?”
রায়ান হেসে মায়ের হাত ধরল। “মা, এমন করে বলো না। কাজ ছিল।”
“কাজ তো সবারই থাকে। কিন্তু মায়ের জন্য সময় থাকে না, তাই?”
“আচ্ছা, আজ সারাদিন তোমার সঙ্গেই থাকব।”
কামাল সাহেব চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। “আজ সারাদিন থাকা হবে না। বিকেলে তোমার জন্য একজন আসবে।”
রায়ান ভ্রু কুঁচকাল। “আমার জন্য?”
“হ্যাঁ। তুমি তো জানো, তানভীর ভাইয়ের পরিবার কিছুদিনের জন্য এখানে উঠছে।”
রায়ান থমকে গেল। “তানভীর চাচা?”
“হ্যাঁ। ওদের গ্রামের বাড়িতে কিছু সমস্যা হয়েছে। নতুন ফ্ল্যাট প্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তৃতীয় তলার খালি ফ্ল্যাটে থাকবে।”
রায়ান মাথা নাড়ল। তানভীর চাচা তার বাবার ছোটবেলার বন্ধু। পরিবার দুটির সম্পর্ক বহু পুরোনো। কিন্তু তাদের মেয়ে নীরা সম্পর্কে রায়ানের তেমন কোনো স্মৃতি নেই। ছোটবেলায় একবার দেখেছিল, তারপর বহু বছর দেখা হয়নি।
ঠিক তখনই ঘরের দরজা খুলে মেহরিন বেরিয়ে এল। চুল এলোমেলো, হাতে বালিশ।
“ভাইয়া, তুমি এসেছ?”
রায়ান হেসে বলল, “তুই এখনো মানুষ হসনি?”
“সকাল সকাল বিরক্ত করো না।”
“তোর ঘুম দেখে মনে হচ্ছে দুপুর হয়ে গেছে।”
মেহরিন মুখ বাঁকিয়ে সোফায় বসে পড়ল। “তুমি বদলে গেছ।”
“তুইও।”
“আমি তো একই আছি।”
“সেটাই তো সমস্যা।”
দুজনের হাসিতে ঘরটা হালকা হয়ে উঠল।
তৃতীয় তলার ফ্ল্যাটে তখন অন্যরকম ব্যস্ততা। নীরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার মা সাবিহা বেগম বাক্স খুলে কাপড় গুছাচ্ছিলেন।
“নীরা, ওই বইগুলো আলমারিতে রাখ তো।”
“মা, আমি একটু পরে রাখছি।”
“তুই একটু পরে বললেই কাজটা কাল হয়ে যায়।”
নীরা হেসে ফেলল। “ঠিক আছে, এখনই রাখছি।”
তার বাবা তানভীর সাহেব বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলেন। ফোন রেখে তিনি মেয়ের দিকে তাকালেন।
“নীরা, আজ বিকেলে রাশেদা আপার বাসায় যাবে। অনেকদিন পর সবাইকে দেখবি।”
নীরা একটু থেমে বলল, “ওদের ছেলে এসেছে?”
“রায়ান? হ্যাঁ, আজ সকালেই এসেছে।”
নীরার মুখে কৌতূহলের ছাপ ফুটে উঠল। “আমি কি ওকে চিনি?”
তানভীর সাহেব হেসে বললেন, “ছোটবেলায় চিনতিস। তবে এখন হয়তো চিনবি না।”
“তাহলে নতুন করে পরিচয় হবে।”
কথাটা বলেই নীরা জানালার বাইরে তাকাল। ঠিক সেই মুহূর্তে নিচের গেট দিয়ে রায়ান বের হচ্ছিল। নীরার চোখ তার ওপর পড়ল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে তাকিয়ে রইল। মানুষটাকে সে চিনতে পারল না, কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হলো, এই মুখটা কোথাও দেখেছে।
সন্ধ্যার দিকে নীরা পঞ্চম তলায় গেল। দরজা খুলতেই মেহরিন তাকে জড়িয়ে ধরল।
“নীরা! এত বড় হয়ে গেছিস!”
“তুইও তো!”
দুজনের হাসির মধ্যে রায়ান পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। নীরা থেমে গেল। রায়ানও এক মুহূর্ত চুপ করে রইল।
মেহরিন বলল, “ওকে চিনিস?”
নীরা মাথা নাড়ল। “মনে হচ্ছে চিনি, কিন্তু ঠিক মনে পড়ছে না।”
রায়ান মৃদু হেসে বলল, “আমি রায়ান।”
“আমি নীরা।”
“জানি।”
নীরা অবাক হয়ে তাকাল। “জানো?”
“চাচা তোমার কথা বলেছে।”
“শুধু আমার কথা?”
রায়ান উত্তর দেওয়ার আগেই মেহরিন হেসে উঠল। “তোমরা প্রথম দিনেই জেরা শুরু করেছ?”
নীরা হাসল। “না, ওর কথাবার্তা একটু রহস্যময়।”
রায়ান ভ্রু তুলল। “রহস্যময়?”
“হুম।”
“তাহলে সাবধানে থেকো।”
নীরা কিছু বলল না। শুধু মৃদু হেসে অন্যদিকে তাকাল।
রাতের খাবারে দুই পরিবার একসঙ্গে বসেছিল। গল্প, হাসি আর পুরোনো স্মৃতিতে সময় কেটে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ তানভীর সাহেবের ফোনে একটি অচেনা নম্বর থেকে কল এল। তিনি ফোন ধরেই চুপ হয়ে গেলেন।
কামাল সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে?”
তানভীর সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন, “কিছু না। ভুল নম্বর।”
কিন্তু তার মুখের চিন্তার রেখা কেউ এড়াতে পারল না।
রায়ান লক্ষ্য করল, নীরা বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেও প্রশ্ন।
খাওয়া শেষে নীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। শহরের আলো নিচে ঝিলমিল করছিল। কিছুক্ষণ পর রায়ানও সেখানে এল।
“আজকের ফোনটা নিয়ে ভাবছ?” রায়ান জিজ্ঞেস করল।
নীরা চমকে তাকাল। “তুমিও লক্ষ্য করেছ?”
“হ্যাঁ।”
“বাবা কিছু লুকাচ্ছে।”
“হয়তো।”
“তুমি কি কিছু জানো?”
রায়ান মাথা নাড়ল। “না। তবে যদি কোনো সমস্যা থাকে, আমরা জানতে পারব।”
নীরা ধীরে বলল, “আমরা?”
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “এই ভবনে এখন সবাই একসঙ্গে থাকছি। তাই একা কেউ থাকব না।”
নীরার মুখে অদ্ভুত এক হাসি ফুটে উঠল। “তুমি বেশ অদ্ভুত।”
“আর তুমি বেশ প্রশ্ন করো।”
“তাহলে সমান সমান।”
দুজনেই হেসে ফেলল।
দূরে আকাশে মেঘ জমছিল। হঠাৎ নীরার ফোনে একটি বার্তা এল। অচেনা নম্বর।
বার্তায় শুধু লেখা, “তোমাদের এই বাড়িতে আসা উচিত হয়নি।”
নীরার মুখের হাসি মুহূর্তে মিলিয়ে গেল। সে বার্তাটি রায়ানকে দেখাল।
রায়ান কিছু না বলে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখের দৃষ্টি বদলে গেল।
“এটা কাউকে এখনই বলবে না,” সে ধীরে বলল।
“কেন?”
“কারণ যে পাঠিয়েছে, সে চাইছে আমরা ভয় পাই।”
“আর তুমি?”
রায়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, “আমি ভয় পেলে তোমাকে বলব।”
নীরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। একই ছাদের নিচে তাদের নতুন পরিচয় মাত্র শুরু হয়েছে, অথচ অদৃশ্য কোনো রহস্য যেন ইতিমধ্যেই তাদের দুজনকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলেছে।
রায়ান ফোনটি নিজের হাতে নিয়ে নম্বরটি আবার দেখল। কল করার কথা ভাবলেও শেষ পর্যন্ত থেমে গেল। অচেনা মানুষটির উদ্দেশ্য না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। নীরা ধীরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি সত্যিই মনে করো এটা শুধু ভয় দেখানোর চেষ্টা?”
রায়ান বলল, “জানি না। কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার, তোমার বাবা আজকের ফোনে অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন।”
নীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “ছোটবেলা থেকেই বাবা আমাকে অনেক কিছু বলেন না।”
“হয়তো তোমাকে চিন্তামুক্ত রাখতে চান।”
“কিন্তু সত্যি লুকিয়ে রাখলে কি মানুষ নিরাপদ থাকে?”
রায়ান উত্তর দিল না। কয়েক মুহূর্ত পর বলল, “কাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে তোমার প্রথম দিন, তাই না?”
নীরা অবাক হয়ে হাসল। “এই মুহূর্তে সেটাই মনে পড়ল?”
“হ্যাঁ। জীবন শুধু রহস্য নিয়ে চলে না।”
“তাহলে?”
“পড়াশোনা, পরিবার, বন্ধু—সবকিছুর জন্য জায়গা রাখতে হয়।”
নীরা মৃদু হেসে বলল, “তুমি কি সবসময় এত জ্ঞান দাও?”
“না। শুধু আজ।”
“তাহলে আজকের জন্য মাফ করে দিলাম।”
বারান্দায় আবার নীরবতা নেমে এল। নিচে শহরের আলো জ্বলছিল, আর ওপরে অন্ধকার আকাশ যেন কোনো অজানা ঘটনার অপেক্ষায় ছিল। নতুন গল্পের শুরুতে।