✨ The Fairy’s Promise ✨
Written by Samia Moon
🌙 Part 1 — অচেনা সেই মেয়েটি
রাদিব মসজিদের পুকুরপাড়ের বড় নিমগাছে উঠে দাঁত মাজার জন্য একটি সরু ডাল ভেঙে নিল। তারপর ডালটি দাতনের আকার করে গাছ থেকে নেমে এল।
পুকুরঘাটে তখন তিন-চারজন মুরুব্বি বসে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন রাদিবের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললেন,
— “কী সাংঘাতিক ছেলে রে বাবা! বড়রা যে গাছে উঠতে পারে না, সেই গাছে এই বাচ্চা ছেলে এত সহজে উঠে ডাল ভেঙে নেমে এল!”
অন্য একজন হেসে বললেন,
— “ছেলে নয়, যেন পিলে!”
রাদিব তখন নিমের ডালটা চিবাতে চিবাতে ঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। একজন মুরুব্বি তাকে উদ্দেশ্য করে ডাকলেন,
— “এই ছেলে, কে তুমি?”
রাদিব মুখ থেকে দাতনের শিকটা থু করে ফেলে দিয়ে বলল,
— “আমি রাদিব। সাফওয়ান আমার দুলাভাই।”
তৃতীয়জন বললেন,
— “তাই নাকি? তোমাদের বাড়ি ফরিদপুরে?”
রাদিব মাথা নেড়ে বলল,
— “জি।”
লোকটি অবাক হয়ে আবার বললেন,
— “তোমার তো সাহস কম না! এত মোটা গাছে উঠলে? পা ফসকে পড়ে গেলে কী হতো?”
রাদিব একটুও ভয় না পেয়ে বলল,
— “পড়ব কেন? আর পড়লেও কী হয়েছে? এমন কতবার কত গাছ থেকে পড়েছি! আমি ওসব কেয়ার করি না। যখন দেখব পড়ে যাচ্ছি, তখন লাফ দিয়ে ডিগবাজি খেয়ে নেমে পড়ি।”
রাদিবের কথা শুনে মুরুব্বিরা একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— “খুব দুরন্ত ছেলে!”
কিন্তু তাঁদের কথায় রাদিবের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। দাতন করতে করতে সে মাঠের দিকে হাঁটতে লাগল।
মসজিদ থেকে কিছুটা দূরে মক্তবের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার চোখে পড়ল অনেক ছেলেমেয়ে দুলে দুলে কায়দা পড়ছে। কেউ কেউ আবার কোরআনের সবক দিচ্ছে।
হঠাৎ রাদিবের দৃষ্টি আটকে গেল একটি ছোট্ট মেয়ের দিকে।
মেয়েটি কালো বোরকা পরে মাওলভি সাহেবের পাশে বসে পড়ছিল। অন্য ছেলেমেয়েরা দূরে দূরে আলাদা হয়ে বসেছে, অথচ মেয়েটি একেবারে মাওলভির পাশে।
মেয়েটিকে বেশ ছোট মনে হলো রাদিবের। কিন্তু বোরকাটি এমনভাবে পরা যে শুধু তার দুটো চোখ দেখা যাচ্ছে।
রাদিব অবাক হয়ে কিছুক্ষণ মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে ভাবল,
“এত ছোট মেয়ে বোরকা পরে কেন? বড় মেয়েরা তো বোরকা পরে… তাহলে কি এই মেয়েটার বিয়ে হয়ে গেছে?”
দাতন করতে করতে কিছুক্ষণ অচেনা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকল সে। তারপর আর দাঁড়াল না।
পুকুরঘাট থেকে মুখ ধুয়ে আপাদের ঘরে এল।ফরিদপুরের এই গ্রামেই রয়েছে শাহ সুফি ওয়াজেদ আলী ওয়াজেদ আল্লাহর দরবার শরীফ। তিনি ছিলেন এই গ্রামেরই সন্তান। অবিভক্ত ভারতের সময়কার একজন প্রভাবশালী পীর। তাঁর ওয়াজ ও নসিহতের ফলে বাংলা, বিহার ও আসামের অসংখ্য মুসলমান গোমরাহির পথ থেকে ফিরে হেদায়েতের পথে এসেছিলেন। তাঁর ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ মানুষ হেদায়েতপ্রাপ্ত হয়েছিল। ফরিদপুরে তিনি রাজলাউতলা নামেই বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।
এই গ্রামেরই একজন সাধারণ গৃহস্থ ছিলেন রোহিমউদ্দিন খান। জমিজমা বলতে যা ছিল, তা চাষাবাদ করে টেনেটুনে কোনো রকমে সংসার চালাতেন তিনি। অভাব-অনটন থাকলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করানোর খুব ইচ্ছে ছিল তাঁর। তাই শত অভাবের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
রোহিমউদ্দিন খানের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েটি সবার বড়—নাম সাদিয়া। দুই ছেলের মধ্যে বড় জারিফ আর ছোট রাদিফ।
সাদিয়া যখন নবম শ্রেণিতে পড়ত, তখন ভালো সম্বন্ধ পেয়ে তার বিয়ে দিয়ে দেন রোহিমউদ্দিন। কিন্তু মেয়ের বিয়ের মাত্র এক বছর পরই তিনি মারা যান। তখন জারিফ অষ্টম শ্রেণিতে আর রাদিফ পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
বাবার মৃত্যুর পর সংসারের অভাব-অনটনের কারণে জারিফের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। নবম শ্রেণিতে উঠেই তাকে সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়।
রোহিমউদ্দিনের স্ত্রী দিলারা বেগম ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক ও কর্মঠ একজন নারী। স্বামী মারা যাওয়ার পর জারিফের সাহায্যে তিনি সংসার চালিয়ে যেতে থাকেন। এর দুই বছর পর একবার দিলারা বেগম কঠিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। অনেকদিন বিছানায় থাকতে হয় তাঁকে।
সুস্থ হওয়ার পর নিজের ভাইয়ের সাহায্যে তাঁর ভাইয়ের শালার মেয়েকে জারিফের বউ করে ঘরে আনেন। সংসারের কাজকর্ম ও নিজের দেখাশোনায় যেন একজন সাহায্যকারী থাকে, সেই কারণেই তিনি এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
জারিফ পরিবারের চাপে পড়াশোনা বন্ধ করে দিলেও ছোট ভাই রাদিফের পড়াশোনার দিকে সবসময় খেয়াল রাখত। তার একটাই ইচ্ছে ছিল—রাদিফ যেন লেখাপড়া করে অনেক বড় হয়।
অন্যদিকে রোহিমউদ্দিন নিজে যেমন ধর্মকর্ম মেনে চলতেন, তেমনি স্ত্রী ও ছেলেমেয়েকেও সেভাবেই চালাতে চাইতেন। সাদিয়া ও জারিফ বাবার শিক্ষা মেনে চললেও রাদিফ সেসব তেমন মেনে চলত না।
কারণ রাদিফ ছিল একটু ডানপিটে স্বভাবের। ছোটবেলা থেকেই গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার ঝগড়া-মারামারি লেগেই থাকত। দুরন্তপনা যেন তার স্বভাবেরই একটা অংশ হয়ে গিয়েছিল।রোহিমউদ্দিন ছোট ছেলে রাদিফকে খুব শাসন করতেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হতো না। দিন যত গড়িয়েছে, রাদিফের দুষ্টুমি আরও বেড়ে যেত। গ্রামের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে তার ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকত। রোহিমউদ্দিনকে একাধিক সময় গ্রামের সালিশ-বিচারে অপমানিতও হতে হয়েছে। তবুও তিনি কখনো আশা ছাড়েননি। বারবার ছেলেকে সঠিক পথে ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু রোহিমউদ্দিন মারা যাওয়ার পর রাদিফ যেন আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সমবয়সী ছেলেদের মধ্যে স ই- স- তারই যেন নেতৃত্ব। তাকে গ্রামের প্রায় সবাই ভয় পেত। ভয়-ডর ছিল না বললেই চলে। লোকজন প্রায়ই বলাবলি করত, 'রোহিমউদ্দিন কত ভালো মানুষ ছিলেন! কিন্তু ছোট ছেলে যদি এমনই চলতে থাকে, একদিন বাবার নামটাই ডুবাবে।' জারিফ ছোট ভাইয়ের স্বভাব নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকত। অন্যদিকে দিলারা খানমও বহুবার রাদিফকে বুঝিয়েছেন। ভালোবেসে উপদেশ দিয়েছেন, কখনো কখনো কঠোর হয়েও বলেছেন। কিন্তু কোনো কিছুতেই তার স্বভাবের তেমন পরিবর্তন হয়নি। সে যেন নিজের ইচ্ছামতোই চলতে বেশ পছন্দ করত। তবে রাদিফের একটি বড় গুণ ছিল—যতই দুষ্টু হোক না কেন, পড়াশোনায় সে ছিল ভীষণ মেধাবী। প্রতি বছরই ভালো রেজাল্ট করে ক্লাসে স্ট্যান্ড করত। তখন সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। তার এই মেধাই পরিবারের সবার মনে নতুন করে আশা জাগিয়ে রাখত। বড় বোন সাদিয়া রাদিফকে খুব স্নেহ করত। আর রাদিফও তার বোনকে খুবই সম্মান ও শ্রদ্ধা করত। পরিবারের সবার মধ্যে একমাত্র সাদিয়ার কথাই রাদিফ মন দিয়ে শুনত। তাই সুযোগ পেলেই মাসে অন্তত দুবার বোনের বাড়িতে বেড়াতে যেত। একদিন বিকেলে সে সোমেশপুর গ্রামের সাদিয়াদের বাড়িতে বেড়াতে আসে। সাদিয়ার স্বামী সাফওয়ান রাদিফকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতোই ভালোবাসে। রাদিফের পড়াশোনার ব্যাপারে সে সবসময় উৎসাহ দেয় এবং বিভিন্ন ভাবে সাহায্যও করে। এর আগেও রাদিফ অনেকবার এই বাড়িতে এসেছে। কিন্তু ছোট হওয়ার কারণে এই গ্রামে তাকে খুব একটা ভালো করে চেনে না। চিনবেই বা কী করে! সে সাধারণত একদিনের বেশি থাকে না। যেদিন আসে, তার পরদিনই আবার নিজের গ্রামে ফিরে যায়। রাদিফের দুলাভাই সাফওয়ানের বাবা ইয়াসির মিয়া গ্রামের একজন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি। তার অনেক জমিজমা আছে, পাকা বাড়িঘর আছে। এসব কারণে সবাই তাকে গ্রামের অন্যতম ধনী মানুষ হিসেবে চেনে। তিনি ধর্মকর্ম কিছুটা মেনে চলেন, তবে স্বভাবে তিনি বেশ কৃপণ। কিন্তু বাবার স্বভাব সাফওয়ানের মধ্যে ছিল না। সাফওয়ান ছিল উদার, দয়ালু ও মানবিক। গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর সহানুভূতি। তার স্ত্রী আইমান বিবিও ছিলেন অত্যন্ত দয়াবতী একজন নারী। স্বামীর অগোচরে তিনি দরিদ্র প্রতিবেশীদের সাধ্য অনুযায়ী সাহায্য করতেনগ্রামের মানুষ প্রায়ই বলাবলি করত, ইয়াসির মিয়া কৃপণ হলে কি হবে, তার ছেলে সাফওয়ান আর তার স্ত্রী আইমান দুজনই খুব দিলদার। তাদের ভালো কাজের জন্যই আজ তাদের সংসারে এত সুখ ও সমৃদ্ধি।