#কৃষ্ণচূড়ার অভিশাপ
#লেখিকাঃইলমা রহমান।
#পর্ব সংখ্যাঃ১
আষাঢ় নয়, ফাল্গুনের শেষ বিকেল।
নদীর বুকজুড়ে সোনালি রোদের ঝিলিক। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা হেলে পড়েছে। নদীর দুই পাড়ে সারি সারি গাছ, মাঝেমধ্যে কৃষ্ণচূড়ার লাল ফুল বাতাসে দুলছে। দূরে কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা ভেসে বেড়াচ্ছে। মাঝিদের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গানের সুর ভেসে আসছে নদীর এপার থেকে ওপারে।
এমন বিকেল ঘরে বসে কাটানোর মতো নয়।
চৌধুরী বাড়ির বড় উঠোনে দাঁড়িয়ে বান্ধবী জুঁইয়ের জন্য অপেক্ষা করছে মীরা।
পরনে হালকা গোলাপি রঙের সালোয়ার-কামিজ। খোলা চুলগুলো পিঠ ছুঁয়ে আছে। হাতে ছোট্ট একটি কাপড়ের ব্যাগ।
ঠিক তখনই জুঁই দৌড়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
— এই মীরা! আর কতক্ষণ দাঁড় করাইয়া রাখবি? নৌকা কি তোর লাইগা সারাদিন ঘাটে বইসা থাকব?
মীরা হেসে বলল,
— তুমি দেরি করেছ, আবার আমাকেই কথা শোনাচ্ছ?
— আরে বাবা, রাস্তায় তোর খালাম্মার লগে দেখা হইছিল। দুইডা কথা কইতে গিয়াই দেরি হইছে।
— আচ্ছা, এবার চলো।
দুজনেই হাসতে হাসতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
নদীর ঘাটে পৌঁছাতেই জুঁই মাঝিকে ডাক দিল।
— ও মাঝি চাচা! নৌকা লইয়া যাইবেন নাকি?
ঘাটে বসে জাল গোছাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধ মাঝি।
— যামু না ক্যান মা! ওঠো, ওঠো। কই যাইবা?
— নদীর মাঝখান দিয়া একটু ঘুইরা আবার ফিরা আইমু।
— ঠিক আছে, সাবধানে বইসো।
মীরা নৌকায় উঠে একপাশে বসল। জুঁই তার পাশে বসে পানির দিকে তাকিয়ে আনন্দে বলে উঠল,
— আহা! কী সুন্দর বাতাস!
মীরা নদীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— সত্যিই। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এমন একটা বিকেল কাটাতে পারলে মন্দ হয় না।
— তুই আবার শহরের কথা শুরু করলি! চল, আজকে কোনো চিন্তা নাই। শুধু ঘুরমু আর আনন্দ করমু।
মীরা হেসে মাথা নাড়ল।
নৌকাটি ধীরে ধীরে ঘাট ছেড়ে নদীর গভীরে এগিয়ে চলল।
নদীর অন্য প্রান্ত থেকে আরেকটি বড় নৌকা এগিয়ে আসছিল।
নৌকাটির সামনের অংশে বসে ছিলেন একজন যুবক। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, তার ওপর কালো রঙের শাল। হাতে একটি বই। মাঝেমধ্যে বই থেকে চোখ তুলে নদীর সৌন্দর্য দেখছিলেন তিনি।
তিনি মির্জা আদনান শাহরিয়ার চৌধুরী।
চৌধুরী পরিবারের বড় নাতি। দীর্ঘদিন শহরে থাকার পর গ্রামে ফিরেছেন। আজ বিকেলে ছোট চাচাতো ভাইয়ের অনুরোধে নদী ভ্রমণে বেরিয়েছেন।
পাশে বসা চাচাতো ভাই রাফি হঠাৎ বলে উঠল,
— ভাইজান, ওই যে সামনের নৌকাডা দেখছেন? দুইডা মাইয়া ঘুরতে আইছে মনে হয়।
আদনান বই থেকে চোখ তুলে তাকালেন।
— দেখছি। নদীতে মানুষ নৌকা নিয়ে ঘুরতেই পারে, এতে অবাক হওয়ার কী আছে?
রাফি হেসে বলল,
— না ভাইজান, আপনেরে একটু নদীর বাতাস খাওয়াইতে আইছি। আপনে তো বই নিয়া বইসা আছেন!
আদনান মৃদু হেসে আবার বইয়ের দিকে মনোযোগ দিলেন।
হঠাৎ নদীর মাঝখানে বাতাসের গতি বেড়ে গেল।
দুই নৌকার মাঝখানে থাকা ছোট একটি মাছ ধরার নৌকা ঢেউয়ের ধাক্কায় একদিকে কাত হয়ে গেল। বৃদ্ধ মাঝি নৌকার ভারসাম্য রাখতে গিয়ে মীরাদের নৌকার খুব কাছে চলে এলেন।
জুঁই ভয় পেয়ে মীরার হাত আঁকড়ে ধরল।
— ও মাগো! মাঝি চাচা, নৌকাডা সামলাইয়া চালান!
মীরা তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল।
— ভয় পেয়ো না, জুঁই। কিছু হবে না।
কিন্তু পরমুহূর্তেই একটি বড় ঢেউ এসে তাদের নৌকাটিকে ধাক্কা দিল।
মীরার হাত থেকে কাপড়ের ব্যাগটি পানিতে পড়ে গেল। ব্যাগের ভেতরে থাকা কয়েকটি বইও পানিতে ভেসে উঠল।
— আমার বইগুলো!
মীরা অসতর্কভাবে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল।
ঠিক সেই মুহূর্তে পাশের বড় নৌকাটি দ্রুত এগিয়ে এল।
আদনান উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
— সাবধান! সামনে ঝুঁকবেন না!
কিন্তু ততক্ষণে মীরার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। সে নৌকার একপাশ ধরে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল।
আদনান নিজের নৌকার মাঝিকে নির্দেশ দিলেন,
— নৌকাটি একটু কাছে নিন। ওদের সাহায্য করতে হবে।
দুই নৌকা পাশাপাশি আসতেই আদনান হাত বাড়িয়ে মীরার নৌকার দড়িটি ধরে ফেললেন।
— আপনি ঠিক আছেন?
মীরা একটু বিব্রত হয়ে বলল,
— জি, আমি ঠিক আছি।
— তাহলে এভাবে অসতর্ক হয়ে ঝুঁকছিলেন কেন?
— আমার বইগুলো পানিতে পড়ে গিয়েছিল।
আদনান নদীর দিকে তাকালেন। একটি বই তখনো নৌকার কাছাকাছি ভাসছিল।
তিনি রাফিকে বললেন,
— বইটি তুলে নাও।
রাফি হাত বাড়িয়ে বইটি তুলে দিল।
আদনান বইটি মীরার দিকে এগিয়ে দিলেন।
— এই নিন। পরেরবার নিজের নিরাপত্তার আগে কোনো জিনিসকে গুরুত্ব দেবেন না।
মীরা বইটি হাতে নিয়ে একটু লজ্জিত হলো।
— ধন্যবাদ। আপনার জন্যই বইটি ফিরে পেলাম।
— ধন্যবাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। বিপদে কাউকে সাহায্য করা স্বাভাবিক ব্যাপার।
পাশ থেকে জুঁই এতক্ষণে কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
সে মীরার কানে কানে বলল,
— দোস্ত, তোর বই বাঁচাইতে গিয়া আজকে তো নিজেরই খবর আছিল না!
মীরা চোখ রাঙিয়ে বলল,
— চুপ করো তো!
আদনান কথাগুলো শুনে মৃদু হাসলেন।
কিছুক্ষণ পর নদীর ঢেউ শান্ত হয়ে এল।
আদনান মীরার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— আপনারা কি এই গ্রামেরই বাসিন্দা?
মীরা মাথা নাড়িয়ে বলল,
— হ্যাঁ। আমরা চৌধুরী বাড়িতে থাকি।
আদনান কিছুটা অবাক হলেন।
— চৌধুরী বাড়ি?
— জি। আপনি চেনেন?
— বেশ ভালোভাবেই চিনি।
মীরা কৌতূহলী চোখে তাকাল।
— কীভাবে?
আদনান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
— কারণ আমিও সেই বাড়িরই একজন।
মীরা এবার সত্যিই অবাক হলো।
— আপনি কি মির্জা আদনান শাহরিয়ার চৌধুরী?
আদনানের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
— ঠিক ধরেছেন। তবে আমার পরিচয় এত সহজে জেনে গেলেন কীভাবে?
— আপনার কথা বাড়িতে শুনেছি।
— তাহলে আপনার নামটিও জানা প্রয়োজন।
মীরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— মীরা।
— শুধু মীরা?
— মীরা চৌধুরী।
আদনান নামটি একবার মনে মনে উচ্চারণ করলেন।
— পরিচিত হয়ে ভালো লাগল, মীরা চৌধুরী।
মীরা মৃদু হেসে উত্তর দিল,
— আমারও ভালো লাগল।
সূর্য ততক্ষণে পশ্চিম আকাশের অনেকটা নিচে নেমে গেছে।
দুই নৌকা আবার ঘাটের দিকে ফিরতে শুরু করল।
জুঁই মীরার কানে ফিসফিস করে বলল,
— মীরা, তোর লগে আজব ঘটনা ঘটল রে!
মীরা হেসে বলল,
— আজব ঘটনা নয়, একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। উনি সাহায্য করেছেন, ব্যস।
— হ, বুঝছি! আমি আর কিছু কইলাম না।
মীরা কিছু বলল না। শুধু নদীর দিকে তাকিয়ে রইল।
অন্য নৌকায় বসে আদনানও একবার পেছন ফিরে তাকালেন। গোলাপি পোশাক পরা মেয়েটি তখন নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে।
সেদিনের পরিচয়টুকু হয়তো খুব সাধারণ ছিল।
কিন্তু কে জানত, এই সামান্য পরিচয়ই একদিন দুটি পরিবারের বহু বছরের চাপা পড়ে থাকা ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসবে!
নদীর ঢেউ যেমন একবার তীর ছুঁয়ে আবার ফিরে যায়, তেমনি কিছু মানুষও জীবনে এসে এমন ছাপ রেখে যায়, যা চাইলেও মুছে ফেলা যায় না।
আর কৃষ্ণচূড়ার অভিশাপ?
চলবে... 🌺