#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_২
🕊️
এলিজা রেমানের কথায় বসার ঘরের সকলের মুখ থমথমে হয়ে গেলো। ভাগ্যিস এই সময়ে যারা উপস্থিত সকলেই পরিবারের লোকজন।আর সকলেই ওদের মনোমালিন্যতার ব্যাপার জানে।নাহলে বাহিরের লোকজন শুনলে আবার কানাঘুষা করতো অতীতের ব্যাপার নিয়ে।এলিজা রেমানের কথায় অনেকে অনেক কিছু বলতে চাইলেন,তবে কেউ কিছু বলতে পারলেন না। বললেও কোনো লাভ নেই তিনি যা বলেছেন তাই করবেন । দোষ তো তাদের ই। কেই বা তার তিন বছরের বাচ্চা মেয়েটাকে একটা ষোলো বছরের দামরা ছেলের কাছে বিয়ে দিতে চাইবে?
আসলে মানুষ কষ্ট পেতে পেতে একসময় পাথর হয়ে যায়। মায়ের মন মেয়ের ভালোর জন্য পরিবারের কাছে স্বার্থপর হয়েছেন। তিনি মেয়ের টাই ভেবেছেন।সবাই তখন টাকেই কটু কথা শুনিয়েছে।তাই সেও তাদের সাথে তেমন ব্যবহার করা শুরু করলেন । তখন তার নিজের কথায় সামনের মানুষটার মনে কি কষ্ট জমে সেটা নিয়েও তিনি আরও মাথা ঘামান না। অন্য কেউ কষ্ট পেলে তাতে তার কি? কই সে যখন কষ্ট ছিলো, তখন তো কেউ তাকে সান্ত্বনা দিতে আসেনি! বরং নিজের তিক্ত কথা দিয়ে ছিন্ন করেছে অন্তর। টাই তিনিও কারো কষ্ট দেখবেন না। অন্তত তাদের টা তো নাই যারা তার দুর্দিনে তাকে হেয় করেছে।এলিজার কথার কোনো নড়চড় হবে না।তাই আর কেউ কোনো কথা বাড়ালো না এখানে।সকলের বুক চিরেই বের হলো হতাশার সাথে আত্মগ্লানির নিঃশ্বাস।রেহানা বেগম একবার এলিজা রেমানের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকালেন।যেনো দৃষ্টি দিয়েই বোঝাতে চাইলেন এবার কি মাফ করা যায়না মা? এলিজাও তার দিকেই তাঁকিয়ে ছিলেন বিধায় চোখাচোখি হয়ে গেলো তাদের।রেহানা বেগম তার দিকে তাকাতেই তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন।তার পি এ কে উদ্দেশ্য করে বললেন ~
~তূর্য তোমাকে যে রিটার্ন টিকিট কাটতে বলেছিলাম কেটেছো?
~ইয়েস মেম।
কাঙ্ক্ষিত উত্তরটি পেয়ে তিনি করো সাথে আর কোনো বাক্য বিনিময় করলেন না।উঠেই নিজের লাগেজ নিয়ে হনহন করে করে চলে গেলেন নিজের রুমে।সকলে হতাশার শ্বাস ফেলে আবার নজর দিলেন কোমল এর দিকে।বুকে জমা হলো কষ্টের পাহাড়। ওর দিকে তাকাতেই সকলের থমথমে মুখ দেখে ও একটু কষ্ট পেলো।সকলের মন ভালো করতে ইয়া বড় একটা হাসি দিয়ে রেহানা চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরে বললো ~
~ওহ গ্র্যান্ডমা।মমের কথায় তুমি কিছু মনে করো না তো।এক সপ্তাহ আগে শেষ হোক।এক সপ্তাহ মানে তুমি বুঝতে পারছো? অনেক সময়।পরের টা পড়ে দেখা যাবে।তোমাদের মন খারাপ দেখলে আমারও মন খারাপ থাকবে।এই ভাবে মন খারাপ করে থাকলে বিয়ে বাড়ির মজা টাই নষ্ট হয়ে যাবে।তাই না ভাইয়া বলো?
একথা বলে তিয়ানের দিকে তাকালো ও।তিয়ান ও স্বভাব সুলভ হেঁসে উত্তর দিলো ~
~হ্যাঁ সেটাই তো।
সকলের মুখের হাসি ফুটে উঠলো।সবার তালে তালে কথা বলার সময়ই এবার কোমলের একটু খটকা লাগলো । ওর মা কোন ছেলের কথা বলে গেলো? যার জন্য ওর ক্ষতি হতে পারে। আর ছোটবেলায় এমন কি হয়েছিলো? যার জন্য এলিজা এই বাড়িতে আসতে চান না।
~ আচ্ছা গ্রান্ডমা? মা কার কথা বলে গেলো? যার জন্য আমার ক্ষতি হবে।
ড্রয়িংরুমে উপস্থিত বড়দের সকলের মুখের হাসি উড়ে গেলো। তিয়ান ও কৌতূহলী চোখে তাকালো ওর দাদীর মুখের দিকে। এবার কি বলবে রেহানা চৌধূরী? ও তো সব কিছুই জানে । তখন ওর বয়স ছিলো পনেরো। কিভাবে লুকিয়ে রাখবে এই সত্য?
~ ইয়ে... না মানে...আসলে....
~ কি আসলে নকলে করছো গ্র্যান্ডমা?
রেহানা চৌধুরীর আমতা আমতা করা নিয়ে একটু অসন্তুষ্ট হলো কোমল। রেহানা চৌধুরী মাথা নিচু করে রেখেছ। নাতনির চোখের দিকে তাকানোর সাহস করতে পারছে না।তিয়ান পরিস্থিতি বুঝে কোমলকে আশ্বস্ত করে বললো,
~ আমি বলছি শোন। সে অনেক লম্বা কাহিনী। বিয়ের আগে তোকে বলব নি আমাকে মনে করিয়ে দিস। তখন তোকে ভাঙিয়ে চুরিয়ে সব কিছু বলবো আমি। এখন এসব নিয়ে মাথা ঘামাবি না। বিয়ের মার্কেট ও তো করবি নাকি? গাড়িতে বসে বললি তো কেনাকাটা করতে হবে।
~ ওহ্, হ্যাঁ।দেখেছো ভুলেই গিয়েছিলাম একদম।
ব্যাস, শপিংয়ের কথা শুনেই মনোযোগ ঘুরে গেলো কোমলের। তিয়ান রেহানা চৌধুরীকে চোখ দিয়ে ইশারা করলেন ও সবটা সামলে নেবে।ওদেরর কথায় কেউ আর মন খারাপ করে থাকলে না ।এবার সকলের মুখে হাসি ফুটলো। রেহানা চৌধুরী তখন রাইসাকে বললেন~
~যা তো দাদুভাই।ওদের দুজনকে ওদের রুম দেখিয়ে দিয়ে আয়।
রাইসা এতক্ষণ যাবৎ তুর্যর দিকে তাকিয়ে ছিলো। ওরা এসেছে পর থেকেই ভেবলার মতো তুর্যকেই দেখে যাচ্ছিলো ও। বর্ষার দিনে মাটির কাঁচা রাস্তায় মানুষ যেমন করে পা পিছলে পড়ে ঠিক সেভাবেই যেন প্রেমে পড়লো। প্রথম দেখেই একদম চিৎপটাং হয়ে প্রেমে গেলো মেয়েটা।
অবশ্য এটা ওর কাছে নতুন কিছু নয়। সুন্দর ছেলে দেখলেই পা পিছলে ক্রাশ খায়।এতদিন কতো সুন্দর সুন্দর ছেলে দেখলো।কত ছেলে ওকে প্রেম নিবেদন করলো। কিন্তু কখনও কোনো সম্পর্কে জড়ায়নি মেয়েটা। সকল ছেলেকে নিজের পিছনে ঘুরিয়ে ঘোল খাইয়ে ছেড়েছে।প্রেম করলে তো অন্য ছেলেরা ওর পিছনে ঘুরাঘুরি বন্ধ করে দিবে। সেই কারণে কখনও প্রেম করেনি।
এই প্রথম একটা ছেলেকে দেখে মনে হলো নাহ এবার একটা প্রেম করা দরকার।আর কতকাল সিঙ্গেল থাকবে।কথা শুনে আর দেখে তো বাংলাদেশী মনে হলো। নামটাও বাংলাদেশী তূর্য সিকদার।তাহলে বাংলাদেশীই হবে ছেলেটা।আহহ কত্ত সুন্দর পোলা!পুরাই বিদেশী বিদেশী। অবশ্য বিদেশে থাকে বিদেশী তো লাগবেই।এই ছেলেটা যদি ওর বফ হয় তাহলে মন্দ হয় না।এই সব ভেবেতো মনে মনেই নাচা শুরু করে দিলো মেয়েটা।কিন্তু ওর ভাবনা বেশিদূর যেতে পারলো। রেহানা চৌধুরীর কথায় ওর হুশ ফেরে ~
~হু? হ্যাঁ চলো।
রাইসা ওদের দুজনকে নিয়ে চলে গেলে সবাই আবার সবার মত কাজে লেগে পড়লো।বিয়ে বাড়ি বলে কথা।
চৌধুরী প্যালেসটা বিশাল বড়।তিন তলা বিশিষ্ট এই বাড়িতে আর যাই হোক থাকা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিছু ঘনিষ্ঠ আত্মীয় স্বজনরা বাদে সকল আত্মীয় স্বজনের থাকার জায়গা হয়েছে গেস্ট হাউসে।বাড়ির বাহিরে বাগানের সাইডে রয়েছে বিশাল বড় গেস্ট হাউস।
বাড়িতে নিচতলায় বিশাল বড় ড্রয়িং রুম, ড্রয়িংরুমের একপাশের দেয়াল কাচের, সাথে সোফা সেট রাখা।সেখান থেকে বাহিরের বাগান দেখা যায় স্পষ্ট। বৃষ্টির দিনে এই জায়গায় বসে বৃষ্টি উপভোগ করার আনন্দই অন্যরকম। একপাশে রয়েছে বিশাল ডাইনিং সাথে লাগোয়া কিচেন,একসাথে অনেকে খাবার জন্য পারফেক্ট ডাইনিং টেবিল। ইয়া বড় পরিবার কিনা। সকলে একসাথে খাবার খাওয়ার মজাই আলাদা।
রেহানা চৌধুরী আর শমসের চৌধুরী রয়েছেন নিচতলায়। বয়স হয়েছে এখন কি আর ওতো সিঁড়ি বেয়ে চলাফেরার শক্তি আছে। নিচতলায় আর কোনো রুম নেই ।
দ্বিতীয় তলায় রয়েছে বড়দের থাকার ব্যবস্থা।রাইসার বাবা-মা, কিয়ানের মামা-মামী, কোমলের মা । তারাই আপাদত রয়েছে দ্বিতীয় তলায়। সাথে আবার বড় একটা স্টোর রুম ও আছে।
তৃতীয় তলায় রয়েছে রাতুল, রাইসা, কিয়ান, তিয়ান, কিয়ানের মামাতো ভাই বোন, ইলারা, ইরিশ, কিয়ানের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট নাওফিল আর এখন কোমল আর তূর্যর জন্যও তৃতীয় তলায় রুম বরাদ্দ করে দেয়া হয়েছে। তূর্য এলিজা রেমানের পিএ,তাই ও বাড়িতেই থাকবে।কখন কোন কাজে দরকার পরে বলা তো যায়না ।
আর চৌধুরী বাড়ির অতিথি হয়ে বাহিরে থাকলে সেটা একটু না বরং বেশিই দৃষ্টি কটু লাগে দেখতে।প্রত্যেকের জন্যই আলাদা আলাদা রুম। তবে কিয়ানের ঘরটা করিডোরের একদম শেষ প্রান্তে।
#চলবে
Inspired by > বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের কাল্পনিক - কাল্পনিক সকল কিছু।
[ আসসালামুয়ালাইকুম গায়েস। সেহরীর পরে গল্প দেয়ার কথা ছিলো। এই নাও দিয়ে দিলাম। সকলে রেসপন্স করতে ভুলবেন না কিন্তু। পরবর্তী পর্ব আসবে আগামীকাল সেহরীর পরে। ]
Happy reading 🫰