#স্বর্ণকোমল
#পরিণীতা_আরা_হৃৎ
#পর্ব_১৫
[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]
🕊️
জার্মানীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি বর্গের মধ্যে আরা ফ্যামিলি অন্যতম। নিঃসন্দেহে এলিজা আরা একজন সফল ব্যবসায়ী। বাবার বিজনেস তিনিই সামলান বর্তমানে। বর্তমানে ব্যবসার কাজে সিঙ্গাপুরে গিয়েছেন তিনি।
সকল বেলা খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে কোমল। আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ঘুম থেকে উঠে চলে গেলো বাগানে। বাড়ির সামনে একপাশে রয়েছে এক ফুলের বাগান। যেখানে প্রতিদিন নিয়ম করে নানা রঙের ফুল ফোটে।
কোমল গিয়ে কিছুক্ষণ ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলো। আস্তে আস্তে ওর চোখে হিংস্রতা ফুটে উঠলো। অতপর রোজকার মতো আজকেও একটা একটা করে সমস্ত ফুল গুলো নিজের হাতের পিষ্টনে পিষে ফেলতে লাগলো। দুমড়ে মুচড়ে গেলো ফুলগুলো ওর হাতের মুঠোয়। একটা একটা করে সব গুলো ফুল পিষে ফেলতে ওর আধ ঘণ্টা মতন সময় লাগলো। এই আধাঘন্টা ওর চোখে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ মিছিল করেছে। তৃপ্তির হাসি বেরিয়েছে মুখ থেকে।
ফুল ওর পছন্দ নয়। তবে মালিকে দিয়ে রোজ ফুল গাছ গুলোকে যত্ন নেয়ায়। প্রতিদিন নতুন ফুল ফোটে আর সেটা নিজ হাতে ধ্বংস করে ও। অপছন্দের এই কারণেই রোজ নিয়ম করে ফুলগুলোকে ধ্বংস করে। তাতে যেনো অদ্ভুত তৃপ্তি পায় ও।
নিজ কার্য করে বাড়ির দিকে গেলো কোমল। মুখে ফুটে রয়েছে অনবদ্য তৃপ্তির হাসি।
ওদের বাড়িটা পুরোনো ধাঁচের তৈরি। লাল আর নীলের মিশেলে তৈরি বাড়ির ছাদ। দেয়াল গুলো অফ হোয়াইট রঙের। বাড়ির সামনে এক পাশে রয়েছে বিশাল বাগান। অন্য পাশে গোল ফাউন্টেন। মাঝখানে একটা ডলফিনের মূর্তি। তার মুখ থেকে পানির ফোয়ারা বইছে।
বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে সিঁড়ি বিয়ে। নিজ কক্ষে চলে গেলো কোমল। ফ্রেশ হয়ে ইউনিভার্সিটি যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে নিচে নামলো। ঘড়িতে তখন সময় সাড়ে নয়টা।
টেবিলে বসতেই একজন ভদ্র মহিলা টেবিলে নাস্তা দিলেন। পুরো দশজনের জন্য গড়ে ওঠা এই টেবিলে কেবল মাত্র কোমল একাই নাস্তা করছে। বাকি সব গুলো চেয়ার খালি পরে আছে। খাওয়ার মাঝে একবার পুরো টেবিলে চোখ বুলিয়ে নিলো কোমল। ওর নানা নানি সুইজারল্যান্ড গিয়েছেন ভ্রমণে। শেষ বয়সে এসে একটু ঘুরাঘুরি করে কাটাতে চান তারা। তারা থাকলেও অবশ্য কোনো লাভ নেই। তারা কোমলের সাথে খুব একটা মিশে না। মোট কথা কোমলকে তারা বেশি সহ্য করতে পারে না। তার কারণ ও অবশ্য রয়েছে।
এলিজা বাংলাদেশ থেকে ফেরত আসার পর তারা মেয়েকে নতুন ভাবে সব কিছু শুরু করতে বলেছিলেন। তবে এলিজা একমাত্র মেয়ের তৎপরতায় নাকচ করেছেন সেই কথা। তার ধারণা ছিলো পর কখনও তার মেয়েকে আপন করে নেবে না। তাই তিনি আর নিজের জীবন পুনরায় সাজায়নি। তাই সেই ক্ষোভ কোমলের উপর ঝাড়ছেন ওর নানা নানি।
খাওয়া শেষ করে কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়লো বাড়ি থেকে কোমল। বাহিরে ড্রাইভার দাড়িয়ে আছে। ও গাড়িতে উঠে বসতেই ড্রাইভার গাড়ি বের করে সোজা চলে গেলেন হাইডেল বার্গ ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে।
_
হাইডেল বার্গ ইউনিভার্সিটির দিকটায় প্রতিদিনের তুলনায় আজকে ভিড়টা একটু বেশি। ভার্সিটি থেকে কয়েক কোষ দূরে একটা গলির মাথায় কয়েকটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। তাদের থেকে কিছুটা দূরে মানুষ জনের ভিড়। আজ সকালে এক পথচারী গলিতে একটা লাশ দেখতে পেয়েছে। সেই জন্যই এই লোক সমাগম।
কিছুক্ষণ পর একটা বিএমডাব্লিউ এসে দাড়ালো সেখানে। গাড়ি থেকে নেমে এলো পেট মোটা করে একজন জার্মানী পুলিশ অফিসার।নাম জন ডাল্টন। বয়স তার পঞ্চাশের কোঠা পেরিয়েছে। চুলে পাকন ধরেছে কিছুটা।
তিনি গাড়ি থেকে নেমে হেলেদুলে এগিয়ে গেলেন লাশের দিকে। লাশের সামনে হাঁটু ভাঁজ করে বসলেন। তার পাশেই তার সহকারী লি জুন হাঁটু মুড়ে বসলো। লাশ টাকে জহুরি চোখে পরখ করে নিজেদের ভাষায় জন এর উদ্দেশ্যে বললো,
“এই নিয়ে একশো তিন নম্বর খুন এটা স্যার। খুনি সবসময় মেয়েদের চুলের এই অদ্ভুত নকশা করা কাটা ইউজ করে। যেনো সন্দেহ মেয়েদের দিকে যায়। তবে আপনিই বলুন একটা মেয়ের দ্বারা কখনও একজন তাগড়া পুরুষকে খুন করা সম্ভব। তাও এটা নিয়ে একশো তিন টা খুন হলো। একই ভাবে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো ক্লু পাওয়া গেলোনা এই খুনির।”
হতাশার শ্বাস ফেললেন লি জুন। জন ডাল্টন একটু ভাবুক হয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে বললো,
“হুম! তবে তুমি কি একটা জিনিস নোটিস করেছো? অনেক দিন ধরে কিন্তু এই খুনগুলো বন্ধ ছিলো। প্রায় দুই মাস পর আবার আমরা এমন লাশ খুঁজে পেলাম। হয়তো এই দুই মাস খুনি এখানে ছিলো না। নয়তো এমন কোনো কাজে বিজি ছিলো যে কারণে দুই মাস ও নিজ কার্য বন্ধ রেখেছিলো।”
একটু থেমে লি জুন এর দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বললেন,
“খোঁজ নিয়ে দেখো, এই দুমাস কাকে কাকে খুব কম দেখা গেছে এই স্টেটে।”
লি জুন হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ালো।
_
শহরের কোলাহল থেকে দূরে ফাঁকা একটা ব্রীজের উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে কিয়ান। গাড়ি দাঁড় করানো ব্রীজের এক পাশে। দৃষ্টি নিবদ্ধ সুদূর আকাশে।
হাসপাতাল থেকে রিলিজ সপ্তাহ পর হয়েছে । বাড়িতে থাকতে ভালো লাগছে না ওর। এখনো পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। শরীর বেশ দুর্বল এখনো। মেডিসিনের ইফেক্টে সারাদিন শুধু ঘুমিয়েই কেটে যায় ওর।
একা দাড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছে ওর। একটু মনটা হালকা লাগছে। তবুও বিষাদ ছেয়ে রয়েছে অন্তর জুড়ে। সারাদিন মস্তিষ্কে শুধু একটাই কথা ঘুরে বেরায় ওর। একটাই নাম কোমল। যাকে ভুলে যাওয়া এই জীবনে বোধহয় সম্ভব নয়।
_
কোমলের গাড়ি ওই গলির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেদিকে চোখ পড়লো ওর। মুখে কুটিল হাসি ফুটে উঠলো। চোখ দুটো চক চক করে উঠলো।
“কাকা! গাড়িটা একটু সাইডে দার করান তো।”
ড্রাইভার কাকা মিসির গাড়ি এক সাইড দার করিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“কোনো কিছু দরকার মামুনি? আমাকে বলো আমি এনে দিচ্ছি।”
“না আপনার কিছু করার দরকার নেই। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন আমি আসছি।”
মিসির সাহেব মাথা নাড়ালেন। কোমল গাড়ি থেকে নেমে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে গেলো ভিড় ভাট্টার দিকে। লোকজন কে পেরিয়ে একটু এগিয়ে গেলো লাশের দিকে।
“আআআআআআআআআ!”
মেয়েলি চিৎকারে উপস্থিত সকলে তটস্থ হলো। কোমল লুটিয়ে পড়লো মাটিতে। কিছু লোকজন আর মহিলা কনস্টেবল এগিয়ে এসে ধরলো ওকে। গাড়ি থেকে কোমল কে এভাবে লুটিয়ে পড়তে দেখে ড্রাইভার কাকা দৌড়ে গেলেন সেদিকে। কোমলকে ধরাধরি করে নিয়ে ওঠালেন গাড়িতে। চোখে মুখে পানির ছিটা দিতেই আস্তে করে চোখ মেলে তাকালো কোমল। সকলে স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লেন।
জন ডাল্টন বিরক্ত বোধ করলেন। যখনই কোনো না কোনো কেস নিয়ে গুরুত্বপুর্ন আলোচনা করেন তখনই কোথা থেকে এই মেয়ের উড়ে চলে আসে। রক্তে ফোবিয়া আছে এই মেয়ের তবুও এমন বেখেয়ালি চলাফেরা করবে।
জন ডাল্টন হলেন এলিজা আরার পরিচিত লোক। এই পেশায় নিয়োজিত হওয়ার পর থেকে ওনার সাথে ভালো সম্পর্ক এলিজার। তবে জন ডাল্টন এর লাভ অনেক হয়েছে এযাবৎকাল এলিজার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে।
গাড়িতে বসে কুটিল হাসি হাসলো কোমল। নিজ চোখে লাশ দেখে আলাদা একটা প্রশান্তি এলো নিজ মনে। ড্রাইভার কাকা একবার আড়চোখে তাকালো কোমল এর দিকে। আবার সামনে তাকিয়ে গাড়ি ড্রাইভ করতে লাগলো।
_
সময় পেরিয়েছে আরো কিছুদিন। কোমল লাইব্রেরির এক কোণে বইয়ে মুখ বুজে বসে আছে। তবে যে সে বই নয়। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ধাঁচের বই পড়ছে। যেখানে রয়েছে অত্যাধিক নৃশংসতার বর্বর নির্যাতনের বর্ণনা।
এগুলো পড়তে নাকি আবার আলাদা শান্তি। এই সব থ্রিলার বই পড়েই বিভিন্ন ভাবে খুনের বর্ণনা পেয়েছে ও। তবে ওর ভালো লেগেছে এই হেয়ার ক্লিপ ইউজ করার আইডিয়াটা। না তো কোনো প্রমাণ থাকে আর নাতো কোনো সাক্ষী।
তবে হুট করে ওর ধ্যান ভাঙ্গে অধিক আওয়াজ পেয়ে। মুখের সামনে থেকে বই নামিয়ে চারপাশে উকি দিলো। পুরো লাইব্রেরি ফাকা হয়ে রয়েছে। চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো কোমল। জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। দেখলো মাঠের একটা জাগায় একটা লোককে ঘিরে স্টুডেন্টরা দাড়িয়ে রয়েছে। লোকটার মুখ দেখা যাচ্ছে না স্পষ্ট তিন তলার উপর থেকে। তার উপর আবার যেই ভিড়। ওখানে কি হচ্ছে সেটাই বোঝা যাচ্ছে না। এভাবে একটা লোককে ঘিরে দাড়িয়ে থাকার কি আছে? কৌতূহল হলো কোমল এর। হাতের বইটা তাকের নির্দিষ্ট স্থানে রেখে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে পা বাড়ালো ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখার জন্য।
নিচে নেমে ভিড়ের দিকে কিছুটা এগিয়ে যেতেই কানে ভেসে আসলো মৃদু সুরের মূর্ছনা । সুরটা ভীষণ চেনা চেনা ঠেকলো ওর নিকট, সেই সঙ্গে চিরচেনা কণ্ঠস্বর। পায়ের গতি বৃদ্ধি পেলো আপনা আপনি। যতোই সামনে এগোচ্ছে সুর যেনো অকে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে অদ্ভুত আকর্ষণে।
*..তোমাকে ছেড়ে আমি কি নিয়ে থাকবো..*
*..ভালোবেসে যাবো ওগো যতদিন বাঁচবো..*
*..হেসোনা হেসোনা তুমি জেনে রাখো তা..*
*..বলে তো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা..*
যতো এগোচ্ছে ততো কোমলের মনে প্রশ্ন জেগে উঠছে। কে এই সুরের মালিক? যার কন্ঠস্বর ওকে এভাবে টেনে নিচ্ছে?
#চলিত
[ বলতো সুরের মালিক কে হতে পারে? ]