ফন্ট সাইজ:
থিম:
স্বর্ণ কোমল

১৮তম পর্ব

লেখক: পরিণীতা আরান হৃৎ

#স্বর্ণকোমল

#পরিণীতা_আরা_হৃৎ

#পর্ব_১৮

[ অনুমতি ব্যতিত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫 ]

🕊️

ধরনীতে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে। সেই সাথে আনা গোনা শুরু হয়েছে নিশাচর প্রাণীদের। চাঁদ তার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে পৃথিবীতে।

নাকের কাছে ভারী পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ সুড়সুড়ি দিয়ে চলেছে অনবরত। মনে হচ্ছে কেউ শরীরটাকে শক্ত করে কিছুর সথে বেধে রেখেছে। পিটপিট করে চোখ মেলে তাকালো কোমল। উপস্থিত সকল কিছু বুঝে নিতে মস্তিষ্ক দুই মিনিট সময় নিলো। সময় নিয়ে বুঝলো ও এখন কিয়ানের দুই বাহুর মধ্যে বন্দী। তবে কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না কোমল। উল্টো কিয়ান এখনো ঘুমিয়ে রয়েছে বুঝতে পেরে নাক ঘষলো কিয়ানের উন্মুক্ত বুকে। লম্বা করে শ্বাস টেনে নিলো নিজের মাঝে। হুর হুর করে নাকে এসে বারি খেলো কড়া পুরুষালী পারফিউমের ঘ্রাণ। এমন ভাবে ঘ্রাণ টেনে নিলো নিজের মাঝে যেনো পুরো কিয়ান টাকেই নিজের মধ্যে পুরে নিচ্ছে কোমল।

মাথাটা একটু উচু করে তাকালো কিয়ানের নিষ্পাপ ঘুমন্ত চেহারার দিকে। খারাপ লাগছে ওর নিজের কর্ম কান্ডের জন্য। আফসোস হয় যদি ও এমনটা না করতো তাহলে হয়তো তিয়ান বেঁচে থাকতো। রাইসাকে কষ্ট পেতে হতো না। ওদের পরিবার এর সবাই ভেঙে যেতো না। ধ্বংস হতো না এতো সুন্দর হাসিখুশি একটা পরিবার। এটা তো ওরও পরিবার। এখন সেটা বুঝছে ও। কিয়ান ওকে ভালোবাসে। তার নিজের থেকেও বেশি। এই ভাবনাটাই কিছুদিন যাবত ঘুরে চলেছে ওর মাথায়। ভেবেছে কিয়ানের কাছে ক্ষমা চাইবে। শুরু করবে সকল কিছু নিজে থেকে নিজ উদ্যোগে।

ও নিজেও কিয়ানকে শক্ত হাতে জড়িয়ে ধরলো। ওর বুকে মুখ গুঁজে বিড়বিড় করে বললো,

“আমাকে ক্ষমা করে দাও কিয়ান।”

মৃদু হেসে উঠলো কিয়ান। ও তো কোমল ঘুম ঠেকে জাগার সাথে সাথেই ঘুম থেকে ওঠে পড়েছে। শুধু ধরা দেয়নি। ও জানে কোমলও ওকে ভালোবাসে। তবে সেটা ওর পরিস্থিতি বুঝে। কোমলকে একজন ভালো সাইকোলজি ডক্টর দেখাবে ও শীঘ্রই। যেনো কোমল খুব শীঘ্রই সুস্থ জীবন ফেরত পায়। ছোটো বেলা থেকেই ও এমন ভাবে বড় হয়েছে যেই পরিবেশে ও মানিয়ে নিতে পারেনি। ওর মস্তিষ্কে সেটা খারাপ প্রভাব পড়েছে। এখন যে এত মিষ্টি সুন্দর কথা বললো হুট করেই আবার ওকে মারতে দ্বিধা বোধ করবে না কোমল। এক কথায় বর্তমানে কোমল যেই পর্যায়ে সেটাকে বলা চলে সাইকো। একজন সাইকোতে পরিনত হয়েছে কোমল। তবে এর পরিত্রাণ বা এর পিছনের এডজেক্টলি কারণ টাও ও খুব তাড়াতাড়ি জেনে যাবে। এখনও অনেক কিছু ধোঁয়াশা ওর কাছে। সব কিছুর জটলা খুলবে ও খুব শীঘ্রই। এবার শুধু কিয়ান কোমলকে জড়িয়ে ধরে নয় বরং কিয়ান আর কোমল একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমের রাজ্যে পারি জমালো।

রাত এগারোটার কাটা পেরিয়ে বারো ছুঁই ছুঁই। দূর হতে ভেসে আসছে কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক।

খুদার তাড়নায় ঘুম ছুটে গেলো কোমলের। সেই সকালে খেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিলো। আর এখনও পর্যন্ত না খাওয়া। তবে কিয়ানের হাতের বাধন এতোটাই অটুট যে সেটা ছাড়িয়ে উঠতে পারছে না। কোমলের মোরামুড়িতে ঘুম ভাঙলো কিয়ানের। নিভু নিভু চোখে কোমলের দিকে তাকিয়ে দেখলো কোমল ইনোসেন্ট ফেস বানিয়ে চেয়ে আছে ওর দিকে। কোমলের এমন গুলুমুলু

নাদুস নুদুস চেহারা দেখে হাসি পেলো কিয়ানেরঠোঁট চেপে হাসলো সামান্য। ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“কি?”

কোমল ঠোঁট উল্টিয়ে বললো,

“ক্ষুদা লেগেছে।”

একদম বাচ্চাদের মতো লাগলো কোমলকে কিয়ানের কাছে। ওর নাকটা টেনে দিয়ে বললো,

“তুমি ফ্রেশ হও। আমি খাবার কিছু তৈরি করছি।”

“তুমি খাবার বানাবে?”

“হুম!কেন?”

“তুমি পারো খাবার বানাতে?”

“হ্যাঁ।”

“কিভাবে?”

“শিখেছি।”

একটি থেমে বললো,

“আর শুনো। এই আপনি তুমি থেকে জাস্ট তুমি বলো। একবার আপনি তো একবার তুমি। এটা ব্যাড হ্যাবিট।”

“ইটস মাই উইস।”

“যথাআজ্ঞা মহারানী।”

“আমাকে এতো ভালোবাসো কেনো কিয়ান?”

“কারণ ভালোবাসি।”

কোমল আর কিছু বললো না। কিয়ানও ওর কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে উঠে গেলো বিছানা ছেড়ে।

ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে সোজা কিচেনে চলে গেলো। কিচেনে গিয়ে আগে পুরো কিচেনে চোখ বুলিয়ে নিলো।

এই ফ্ল্যাটটা ওরই। তবে এখানে কখনও আসা হয়নি। সাদমান চৌধুরী ওকে জার্মানিতে এই ফ্ল্যাটটা কিনে দিয়েছিলো। বিজনেসের কারণে আসা যাওয়া করার দরকার হতো। তবে ও কোনোদিন জার্মানী আসেইনি। জার্মানিতে এসে যত কাজ করা লাগছে সব কিছু ওর বাবাই করেছে।

ফ্ল্যাটটা দেখাশোনা করতো এক জার্মানী ভদ্রলোক। ও আসবে শুনে তিনি সব কিছু গুছিয়ে রেখে চলে গেছেন। এখন দেখার পালা কি আছে ফ্রিজে?

ফ্রিজের নরমাল খুলে সেখান থেকে আপেল, আঙুর, কলা, চেরি, বেদানা বের করে নিলো। সাথে টক দই, ক্রিম আর কনডেন্সড মিল্ক। ফলগুলো ধুয়ে ছোটো ছোটো কিউব আকৃতির করে কেটে নিলো প্রথমে। একটা বাটিতে টক দই, ক্রিম আর কনডেন্সড মিল্ক নিয়ে হ্যান্ড ব্লেন্ডার দিয়ে সেগুলো সুন্দর মতো ব্লেন্ড করে নিলো। তারপর ফল গুলো একটা চামচের মিক্সড করে নিলো।

_

বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলো কোমল। কোনো মতে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এলো ওয়াশরুম থেকে। শীতের দিন পানি যেই ঠান্ডা থাকে ! ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে আসার জন্য পা বাড়ালো।

তখনই হুট করে ও দেখলো চারপাশে অনেক ছেলেমেয়েরা ওকে টর্চার করতে লাগলো। এতিম এতিম বলে চিৎকার করতে লাগলো ওর কানের কাছে। কানের ভিতর একটাই শব্দ বার বার খালি ঘুরপাক খেতে লাগলো ‘তুমি এতিম’। কেউ ওর চুল ধরে টানতে লাগলো তো কেউ ওর পোশাক ধরে টানতে লাগলো। মুহূর্তের মধ্যেই উত্তেজিত হয়ে পড়লো কোমল। ওর শান্ত মস্তিষ্ক অশান্ত হয়ে উঠলো। সকলের উপর কড়া গলায় চেঁচামেচি শুরু করলো। কেবিনেটের উপর হতে একটা ফ্লাওয়ার ভাস নিয়ে মেরে দিলো একজনের মাথায়। সেটা দেখে কিছুক্ষণের মধ্যে সকলে স্তব্ধ হয়ে গেলো।তারপর আরেকজন। পরে আরও একজন। একজন একজন করে প্রত্যেকের মাথা ফাটিয়ে রক্তাক্ত করে ফেললো কোমল। কেউ ওকে প্রতিরোধ করতে পারলো না পর্যন্ত। তার আগেই সকলকে মেরে ফ্লোরে শুইয়ে দিতে লাগলো।

কিয়ান টেবিলে খাবার সার্ভ করছিলো। তখনই নিচ থেকে কোমলের এমন চিৎকার চেঁচামেচি শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো ও। ওর হাত থেমে গেলো কাজ থেকে। এতক্ষণ তো ঠিকই ছিলো এখন আবার কি হলো? আবার হ্যালুসিনেশন করলো না তো? কথাটা মাথায় ক্যাচ করতেই হাতের কাজ ফেলে রেখে ছুট লাগালো বেড রুমের দিকে।

রুমে প্রবেশ করে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলো কিয়ান। ঘরের সব জিনিস ফ্লোরে এদিক সেদিক ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে পড়ে আছে। হাতে একটা ফ্লাওয়ার ভাস নিয়ে সব জিনিস ভাংচুর করছে কোমল। আর চিৎকার করে বলছে,

“কিছু করতে পারবে না তোমরা আমার। সবাইকে মেরে ফেলবো আমি। সবাইকে। কিছু করতে পারবে না তোমরা। কিছু না……”

বার বার একই কথা বলে চলেছে কোমল। চোখ মুখ পুরো লাল হয়ে রয়েছে কোমলের । এমন সময় দরজার সামনে কিয়ানকে দাড়িয়ে থাকতে দেখলো কোমল। চারপাশের সকল কিছু গায়েব হয়ে গেলো ওর। হাতের ভাস টা নিয়ে তেড়ে আসলো কিয়ানকে মারার উদ্দেশ্যে। কিয়ান এখনোও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

কপালে জোরালো আঘাতে হুশ ফেরে ওর। কপাল ফেঁটে গড়গড়িয়ে রক্ত বি হচ্ছে। তবে সেদিকে ধ্যান দিলো না ছেলেটা। ঝাপটে ধরলো ডুই হতে কোমলকে। কিয়ানের শরীরের শক্তির সাথে পারে উঠলো না কোমল। ধস্তাধস্তি শুরু করে দিলো কিয়ানের সাথে।

“তোমার জন্য হয়েছে। সব তোমার জন্য হয়েছে। তোমার জন্য আমার বাবা মারা গেছে। তোমার জন্য আমাকে এতিম হয়ে হয়েছে। তোমার জন্য আমাকে এসব সহ্য করতে হয়েছে। ছাড়বো না তোমাকে আমি। মেরে ফেলবো তোমাকে। কাউকে ছাড়বো না। সবাইকে মেরে ফেলবো…..”

এসব আজেবাজে বুলি বিড়বিড় করতে করতে জ্ঞান হারালো কোমল। ওকে একহাতে জড়িয়ে অন্যহাতে নিজের কপালে হাত দিলো কিয়ান। চোখের সামনে হাত এনে দেখলো রক্ত। দ্রুত কোমলকে সহ বেডের কাছে গেলো। কোমলকে বেডে শুইয়ে দিয়ে। নিজে গায়ে একটা টি শার্ট জড়িয়ে নিলো।বেড সাইড টেবিল থেকে নিজের ফোন আর গাড়ির চাবি হাতে তুলে নিয়ে কোমলকে সমেত বেরিয়ে গেলো এপার্টমেন্ট থেকে।

_

সেই তখন থেকে অনবরত দরজা ধাক্কা দিয়ে চলেছে রাফা বেগম। কিন্তু রাইসা দরজা খোলার নামই নিচ্ছে না । না তো দরজা খুলছে আর নাতো কোনো কথার উত্তর দিচ্ছে। কি করছে টাকি মেয়েটা? যাওয়ার সময় তো তিনি বাহির থেকে দরজা লাগিয়েছিলো। তাহলে রাইসা এখন দরজা ভিতর থেকে লাগিয়ে দিয়েছে কেনো? চিন্তায় মাথা ফেঁটে যাচ্ছে তার। রাতুল কিংবা অনিল কেউ বাড়িতে নেই। এই সুযোগেই তিনি রাইসাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন এবয়েশন করাতে। এখন এই মেয়ে আবার দরজা খুলছে না।

“রাইসা? এই রাইসা? দরজা খোল বলছি। যতোই দরজা লাগিয়ে রাখ না কেনো আজকে তোকে আমার সাথে হাসপাতালে যেতেই হবে। দরজা খোল বলছি।”

এবার বেজায় বিরক্ত হলেন রাফা বেগম। গজগজ করতে করতে নিচে নেমে ডাকলেন বাড়ির মালি মোজাম্মেল কাকা আর কাজের বুয়ার স্বামীকে হাসান কাকাকে। দুজন তড়িঘড়ি করে আসলেন বাড়ির ভিতর। ওনাদের নিয়ে রাফা বেগম দোতলায় চলে গেলেন।

“মোজাম্মেল কাকা? হাসান কাকা? এই দরজাটা এক্ষুণি ভেঙে ফেলুন।”

“এটা তো রাইসা দিদিমণির ঘর বড় মা। ওনাকে বললেই তো ভিতর থেকে দরজা খুলে দেন তিনি। ভাঙার কি দরকার?”

হাসান কাকার কথায় বিরক্ত বোধ করলেন রাফা বেগম। তিরিক্ষি মেজাজে বললেন,

“ও যদি নিজে থেকে দরজা খুলতো তাহলে কি আর আপনাদেরকে বলতাম দরজা ভাঙার জন্য?”

দুজনে মাথা ঝাকিয়ে সহমত প্রকাশ করলেন। জোরে জোরে ধাক্কা, লাত্থির সাহায্যে চেষ্টা করতে লাগলেন দরজা ভাঙার। কিছুক্ষণের মধ্যেই দরজা ভাঙতে সক্ষম হলো তারা।

তবে রুমের ভিতর ঢুকিয়ে চক্ষু ছানাবড়া হওয়ার উপক্রম সকলের। বিস্ময়ে মুখ হা হয়ে গেলো। স্তব্ধ হয়ে রইলো নিজেদের জায়গায়।

#চলবে

[ তো বলোতো পাঠিকারা, রাইসার ঘরে এমন কি দেখেছে যে তিনজনই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। বলো বলো! আর রেসপন্স করতে ভুলবে না কিন্তু। আগের চেয়ে রেসপন্স অনেক কমে গিয়েছে। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন