উপন্যাস: বিষাদের শিউলি
লেখিকা: ইতি আক্তার
১ম পর্ব
সেদিন আকাশটা কেমন যেন মেঘলা ছিল। চারপাশে মানুষের ভিড়, কান্নার শব্দ আর এক অদ্ভুত নীরবতা।
ছোট্ট মেয়েটি নির্বাক হয়ে বসে আছে ঘরের এক কোণে। বারবার সবার কাছে একটা কথাই জানতে চাইছে,
— মা কোথায়? মা কখন আসবে?
কিন্তু কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। কারণ, সে তখনো বোঝেনি—তার জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষটি আর কখনো ফিরে আসবে না।
সেদিন থেকেই যেন তার জীবনের রঙগুলো হারিয়ে যেতে শুরু করল...
দৌড়ে গেলো আর বললো,মা তুমি কিছু বলছো না কেনো মা?ভাই মা কি আমার উপর রাগ করেছে?হৃদয় বললো, না বনু মা তোমাকে অনেক ভালোবাসতো, সে তোমার উপর কেনো রাগ করবে?ছোট্ট রিতু বললো,তাহলে সে আমার সাথে কথা কেনো বলছে না?তুমি বলো না মা কে আমার সাথে কথা বলতে। আরিফ সাহেব বললেন,মা এখন কথা বলবে না, মা। মাআল্লাহ তায়া’লার কাছে চলে গেছে।হৃদয় বললো,আর আল্লাহ তায়া’লার কাছে চলে যাওয়া থেকে আমার কাউকে আটকাতে পারি না,তাই না বাবা?আরিফ সাহেব বললেন হুম।রিতু বলে, না আমি যেতে দিবো না মা কে। আরিফ সাহেব কান্না করতে করতে বলে, না এভাবে বলে না, মা।আর তুমি এমন করলে তোমার মার কষ্ট হবে।ঠিক আছে যদি মা আল্লাহ তায়া’লার কাছে চলে যায় তাহলে আমিও যাবো কান্না করতে করতে বলে, ছোট্ট রিতু।আরিফ সাহেব বললেন, হৃদয় বোন কে ভিতরে নিয়ে যাও।হৃদয় রিতু কে নিয়ে চলে গেলো তখন। কেটে গেলো ১২ বছর।রিতু পেইন্টিং করছিলো।সে পেইন্টিং করতে খুব ভালোবাসে।মেয়েটার এখন ১৮ বছর বয়স দেখতে দেখতে বড়ো হয়ে গেলো,সে এখন বুঝতে পারলো তার মা আর নেই, কোমড় অবধি চুল, হালকা কোঁকড়া চুলগুলো, চোখ দুটো টানা টানা, শ্যামলা গায়ের রং, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল হয়ে গেছে, চেহারা টা গোলগাল তাও দেখতে বেশ সুন্দর,কালো একটা টু পিস পরনে, চুলগুলো খোলা,ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দেওয়া চোখে একটু কাজলও দিয়েছে। রিতু মন দিয়ে পেইন্টিং করছিলো হঠাৎ করে সালমা বেগম এলেন,ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলেন দরজার পাশে দাড়িয়ে। রিতু?সালমা বেগম এর ডাক শুনে রিতু তাকায়। সালমা বলে,কি হচ্ছে? কিছু না।রান্নাঘরে গিয়ে রান্না করো বললো সালমা।রিতু বলে,জি মাছের তরকারি চুলায়, আমি গিয়ে দেখছি।তখন সালমা ঘরে ঢুকলো তারপর দেখলো টেবিলের সামনে পেইন্টিং টা আর বললো,দুই টাকার শখ, বেয়াদব মেয়ে, যখনই দেখি অকাজ করতে থাকে,বলে সামনে থাকা তুলি ধোঁয়া পানির বাটি টা পেইন্টিং এর উপর ফেললো,আর মাথায় উরনা টা উঠিয়ে হাঁটা দিলো।রিতু?মেঘার ডাকে রিতুু তাকায়।রিতু তুমি কি করছো? তোমাকে মেসেজ দিলাম দেখো নি?না চেক করি নি, মেঘা কাজ আছে। বই হাতে নিতে নিতে বলে রিতু।কাজ কাম ছাড়ো আমাদের এবজিবিশনে যেতে হবে বলে মেঘা। রিতু বলে,আমি ওখানে গিয়ে কি করবো পেইন্টিং কেনার তো টাকা নেই। মেঘা বললো, কিনতে হবে এমন কোনো কথা আছে?আমিও তো কিনবো না চলো গিয়ে দেখে আসি ঘুরতে যাওয়াও হয়ে যাবে,পেইন্টিং দেখাও হবে।মেঘা ছোটবেলার বন্ধু। সালমা বেগম এলেন।মেঘা কে বললো,কিছু বলছিলে নাকি?মেঘা বললো আসসালামু আলাইকুম আন্টি। সালমা বলে ওয়ালাইকুম আসসালাম,রিতু অনেক কাজ আছে, গিয়ে কাজ করো।মেঘা বলে উঠলো,আসলে আন্টি আমি রিতু কে নিতে আসছি,আমাদের ঘুরতে যাওয়ার প্লান আছে।আচ্ছা? এটা কোনো সময় হলো বাহিরে যাওয়ার?বেলা ১১টা বাজে ঘরে অনেক কাজ রিতু যাবে না তুমি যাও।রিতু বললো, জি আম্মু আমিও তাই বলছিলাম এখন তো অনেক কাজ।সালমা বেগম রিতু র সৎ মা, আরিফ সাহেব এর স্ত্রী মারা যায়,তখন তার ছেলে হৃদয় এর বয়স মাএ ১০ বছর, আর রিতু র বয়স তখন ৬ বছর ছেলেমেয়ের কথা ভেবে তিনি আরও একটা বিয়ে করেন।হৃদয় এবং রিতু দুই ভাইবোন ই সালমা কে আম্মু বলে ডাকে। সালমার একটা মেয়ে আছে তার নাম বৃষ্টি। তবে বৃষ্টি কিন্তু তার মায়ের মতো না, সে নিজের সৎ বোন রিতু কে, এবং সৎ ভাই হৃদয় কে অনেক ভালোবাসে। বৃষ্টি রিতু র ৫ বছরের ছোট্ট।বৃষ্টি তাহলে এখন ১৩ বছরের কিশোরী।আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল মেঘা বললো, আরিফ সাহেব কে দেখে।আরিফ বললো,ওয়ালাইকুম আসসালাম,কেমন আছো মা?মেঘা বললো, ভালো আঙ্কেল।আরিফ বললো, রিতু কে, মা আর একটু চিনি দে চা তে। সালমা বলে উঠে, কম মিষ্টি খান অসুস্থ হলে কে দেখবে?ছেলে তো আগেই আলাদা হয়ে গেছে। হৃদয় এর বিয়ে হলো ২০ বছর বয়সে, এখন তার ২২ বছর, দুই বছর হলো বিয়ের।আঙ্কেল আমি রিতু কে নিতে আসছি, আপনি অনুমতি দিলে নিয়ে যেতাম।হ্যাঁ,হ্যাঁ যাও বলতে বলতে সালমার দিকে তাকালো আরিফ।সালমাকে বললো,আরে সালমা বাচ্চা মানুষ যাক না একটু ঘুরতে সমস্যা কি? দরকার হলে বৃষ্টি কে নিয়ে যাও।সালমা রেগেমেগে বলে, বৃষ্টি কোথাও যাবে না, এর যেখানে যাওয়ার যাক,যা খুশি করুক,বৃষ্টি যাবে না।চলে গেলো মেঘা রিতু কে নিয়ে। দুজনে ঘুরে ঘুরে পেইন্টিং দেখছিলো কতো কতো পেইন্টিং। মেঘা গেলো দোকান থেকে পানি কিনে আনতে। রিতু দাড়িয়ে দাড়িয়ে পেইন্টিং গুলো দেখছিলো।তখন এবজিবিশনে এলো নিখিল । দামি গাড়ি থেকে নেমে ভেতরে গেলো,অনেকজনের সাথে কথা বলছিলো পেইন্টিং কেনার জন্য দাড়িয়ে দেখছিলো,সে আবার এসব পছন্দ করে, ঘর সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে সবসময়।তখনই একটা মেয়ের দিকে চোখ আটকে গেলো,হেঁটে গেলো মেয়েটার দিকে। খুব সুন্দর, রিতু বললো পেইন্টিং এর দিকে তাকিয়ে। নিখিল বললো,আসলেই অনেক সুন্দর।রিতু পেইন্টিং টায় হাত দিয়ে দেখছিলো, হঠাৎ করে নিখিল রিতু র হাতের উপর হাত রাখে,রিতু সঙ্গে সঙ্গে নিজের হাত সরিয়ে তাকায় নিখিল এর দিকে, নিখিল রিতু র হাত ধরে বললো, খুব সুন্দর অতপর রিতু ঠাস্ করে থাপ্পড় মারে নিখিল এর ডান গালে। আর বলে, বেয়াদব সাহস কিভাবে হয় একটা মেয়ের হাত ধরার?কবির সামনে আসতে চাইলে নিখিল নিজের হাত দিয়ে কবির কে থামায়। কবির নিখিলের বডিগার্ড। রিতু নিখিল কে বললো, মনে হয় আপনি হুঁশে থাকেন না?নিখিল বলে আসলেই আমি হুঁশে থাকি না, আর আপনাকে দেখার পর তো তাও নেই, আপনি আপনার নাম বললেন না।এরমধ্যে মেঘা এলো, রিতু মেঘা কে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলো।নিখিল কবির কে বললো,মেয়েটার ঠিকানা জোগাড় করতে। কবির ঠিকানা জোগাড় করে দিলো। বৃষ্টি কল দিলো রিতু কে বললো,ছাঁদে আসো।রিতু ছাঁদে গেলো।রিতু বৃষ্টি কে বললো আম্মু ঘুমিয়েছে? বৃষ্টি বলে,হ্যাঁ, আচ্ছা আপু আমি না তোমাকে বুঝি না, তোমার জয়াগায় আমি হলে এমন ঘরে জীবনেও থাকতাম না যেখানে নিজের বোনের সঙ্গে চোরের মতো দেখা করতে হয়।দুইবোন গল্প করে ঘরে গেলো।কি এমন ৪ হাজার এর কাজ করেন?কবির বলে আরিফ সাহেব কে।বললো নিখিল এর কাছ থেকে ৪০ ৫০ লাখ টাকা ধার নিতে। আরিফ সাহেব অবাক হয়ে বললেন,৪০ ৫০ লাখ?এতো টাকা ধার নিলে ফেরত দিবো কিভাবে? কবির বললো,আরে আরিফ সাহেব নিখিল ভাই কে আমি বলে বেশি সময় চেয়ে নিবো।আরিফ মানলো।আরিফ কে সঙ্গে নিয়ে গেলো নিখিলের কাছে। আরিফ সাহেব নিখিলের অফিসে কাজ করেন।তারপর নিখিলের কাছ থেকে আরিফ সাহেব ৫০ লাখ টাকা ধার নিলেন। হৃদয় কে বাজার এর লিস্ট দিলো নুসরাত, নুসরাত হৃদয়ের বউ। অনেক বড়ো লিস্ট,হৃদয় বললো, সেদিন ই তো কতো জিনিস আনলাম বাজার থেকে।নুসরাত বলে,সংসারের জিনিস আপনি কি বুজবেন?এগুলো নিয়ে আসবেন সব।হৃদয় ওয়াশরুমে গেলো দেখে, নুসরাত তাড়াতাড়ি মানিব্যাগ থেকে ১ হাজার টাকা নিয়ে নিলো,কারন নুসরাত জানে হৃদয় মানিব্যাগের টাকা তেমন গুনে রাখে না। আমিনা বেগম গল্প করছিলেন তুলির সাথে, তুলি এবাড়িতে কাজ করে।হঠাৎ ই স্নেহার চিল্লানোর শব্দে দুইজনেই তাকালো। দেখলো স্নেহা নাস্তার প্লেট টা ভাঙছে। স্নেহা নিখিলের Ex wife, নিখিল সম্পত্তির লোভে একদিনের জন্য বিয়ে করে স্নেহা কে।তারপর দিন ডিভোর্স দেয়।স্নেহার বাবা মা মারা যায় স্নেহা ছোট থাকতে, এতিম মেয়েটাকে নিখিলের মা বড়ো করে।বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় স্নেহা আমিনা বেগম কেও সহ্য করতে পারেনা,নীল এর সাথেও সম্পর্ক টা তেমন ভালো না স্নেহার,নীল আমিনা বেগমের ছোট ছেলে মানে নিখিলের ছোট ভাই। স্নেহা সবসময় ঘরে থাকে, টিভি দেখে, খায়, আর ঘুমায়, কারোর সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগে না।এই যে একটু আগে প্লেট টা ভাঙলো তাও আবার নাস্তা পছন্দ হয়নি বলে। স্নেহার চেহারা টা খুব সুন্দর, ফর্সা গায়ের রং, হাটু পর্যন্ত লম্বা চুল, গোলাপি ঠোঁট।এই নেও,রিতুর কথায় তাকায় হৃদয়,রিতু একটা বক্সে সেমাই রান্না করে ভাই কে দিয়ে বলে, বাসায় নিয়ে ভাবিকে দিও।এই এটা কখন বানলে তুমি? সালমা বলে উঠে। রিতু বললো, কাল রাতে বানিয়েছিলাম। আরিফ সাহেব টাকা ধার নিয়ে নিজের কেবিনে রাখলো,পরদিন দেখলো টাকা নেই, তিনি ঘাবড়ে গেলো। আমিনা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়লেন, তারপর তুলি ফোন করল নীলকে।তারপর নীল তার মাকে হসপিটালে নিয়ে যায়। তারপর নীল তার মাকে অনেক বকাঝকা করল কারণ সে ঠিক টাইমে ওষুধ খায় না, নিজের যত্ন নেয় না।নিখিল গেলো আরিফ সাহেব এর বাসায়, সে আজ অফিসে যায় নি তাই দেখতে গেলো, আরিফ সাহেব বললেন টাকা হারিয়ে গেছে, নিখিল বলে,কিহ্,কালকেই তো টাকা টা নিলেন। আরিফ বলল, জি স্যার কি করবো বুঝতে পারছি না। নিখিল বলল, দেখুন আরিফ সাহেব আমি কাউকে টাকা ধার দিলে এতো টাইম দেই না ফেতর দেবার জন্য, আপনাকে দিলাম, ৭ দিনের মধ্যে টাকা টা চাই এসব বুঝিনা আমি।বলে উঠতে গেলো, তখনই রিতু আসে,সালমা বললেন,রিতু,নিখিল সাহেব এর জন্য চা বিস্কুট আনো।রিতু চলে গেলো আনতে।নিখিল কে সালমা বলে,নিখিল সাহেব বসেন মেহমান আপনি কিছু খেলেন না একটু বসুন।কিছুখন কথা বললো নিখিল আরিফ এর সাথে, তারপর বললো,৭দিন পর দেখা হবে। বলে রান্না ঘরের দরজার দিক থেকে হেঁটে যাচ্ছিলো,রিতুও চা এর কাপ হাতে বের হলে দুজনের ধাক্কা লাগে, আর গরম চা টা নিখিলের হাতে পড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে রিতু তাকায় নিখিলের দিকে,নিখিলের হাইট ৬ ফুট,কালো কুচকুচে চাপ দাড়ি, সিগারেট খাওয়া খয়েরী ঠোঁট, ভ্রু টা সামান্য কুঁচকানো কালো কোর্ট, কালো পান্ট পড়া,গলায় টাই ঝুলছে,এলোমেলো চুলগুলো কপালে পড়ে আছে,রিতু দেখলো ছেলেটা তার দিকেই তাকিয়ে আছে,রিতু বললো পাশে ওয়াশরুম ভেতরে গিয়ে পরিষ্কার করুন।নিখিল ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলেন পরে বলল, ফেলেছে কে?বলেই রিতু র উরনার নিচ টা দিয়ে হাত টা মুছলো।
পর্ব 1
পর্ব সম্পন্ন!
আপনি সফলভাবে পর্ব 1 শেষ করেছেন।
আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?
প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।
Google Play থেকে অ্যাপ নামান