ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় অক্টোবর

৫ম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তাসনিম

#প্রিয়_অক্টোবর

#সাদিয়া_তাসনিম

৫.

আমার অপ্রিয় একমাত্র বড় ভাই,

সত্যি বলতে এই চিঠিটা লিখতে আমার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কিছু করার নেই লিখতে হবে কারণ তুমি আমার ভাই, সৎ ভাই হলে না হয় লিখতাম না কিন্তু তুমি যে আমার রক্তের ভাই। আর আমার সাথে রক্তের সম্পর্কে জড়িয়ে আছে এমন কারও ক্ষতি আমি সহ্য করব না। শোনো বড় ভাই, আমার জানা মতে মিশা তোমাকে পছন্দ করে। আমি জানি এটা শুনে তুমি অবাক হচ্ছ কিন্তু মিশা আসলেই তোমাকে পছন্দ করে। তুমি বোকা বলে কখনো বোঝতেই পারনি। আমি জানি মিশার প্রতি তোমার কোনো অনুভূতি নেই। আম্মু তোমাকে ইশারা ইঙ্গিতে মেয়েটার সাথে কতবার বিয়ের কথা বোঝিয়েছে কিন্তু তুমি বোঝনি। অবশ্য না বোঝারও কারণ আছে আর কারণটা হলো লাবণ্য।

ভাইয়া একটা সত্যি কথা বলি। এই লাবণ্য নামটা উচ্চারণ করতে আমার ঘৃণা হয়। মেয়েটা মোটেও ভালো না। আমি জানি না তুমি আমাকে বিশ্বাস করবে কিনা কিন্তু সত্যিটা আজ তোমাকে জানাতেই হবে যে। লাবণ্য তোমাকে তোমার টাকার জন্য ভালোবাসে। মেয়েটার কাছে তোমার থেকে তোমার বাড়ি,গাড়ি, ক্রেডিট কার্ড, ব্যাংক ব্যালেন্স এগুলোর মূল্য বেশি। আমি ভেবেছিলাম তুমি খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যাবে মেয়েটা কেমন কিন্তু তুমি বুঝলে না। তার প্রেমের অন্ধত্ব তোমাকে তার কুৎসিত চরিত্রটা দেখতে দিল না। মেয়েটা ভালো হলে,তোমার যোগ্য হলে আমি নিজে দাঁড়িয়ে তোমাদের বিয়ে দিতাম কিন্তু মেয়েটা যে তোমার যোগ্য না। কোনো দিন তোমার থেকে ভালো কাউকে পেলে তোমাকে মুরগি বানিয়ে ছেড়ে দিতে দুবারও ভাববে না। কিছুদিন আগে আমার একটা প্রোডাক্টের শুটিং ছিলো,সেখানে লাবণ্যের সাথে দেখা হয় এবং এরপরে কই থেকে ওই মেয়ে আমার নম্বর যোগাড় করে মেসেজ দেয়।

আমি দরকারি মনে করে রিপ্লাই দিয়েছিলাম,কিন্তু পাঁচ মিনিটের মাথায় এই মেয়ে নিজের আসল চরিত্র দেখিয়ে দেয়। এরপরে অবশ্য আমি আর কোনো মেসেজের রিপ্লাই দি নি,যার জন্য ওর পাগলামি বেড়ে যায়৷ এমন পাগলামি দেখতে বিরক্ত লাগছিল যার জন্য ব্লক করে দি। দুইদিন আগে রাতে ছাদে উঠতে গিয়ে দেখি তুমি কোনো মেয়ের সাথে কথা বলছ। ভেবেছিলাম এবার হয়তো তোমার কোনো হিল্লে হবে কিন্তু আফসোস পরের দিন যখন গেম খেলার জন্য তোমার ফোনটা নি সেখানে মেয়েটার সাথে তোমার ছবি দেখে ফেলি তারপর সব পরিষ্কার হয়ে যায়। আমার মতে একটা মেয়ের ইজ্জত তার সবচেয়ে বড় সম্পদ আর সেখানে লাবণ্যের কোনো সম্মান ইজ্জতই বলতে কিছুই নেই। তোমার বান্ধবী সরি প্রেমিকা হয়েও সে আমার কাছে তার অনেক আপত্তিকর ছবি পাঠিয়েছে।

মেয়েটাকে দেখে আমি হিসাব মেলাতে পারছিলাম না তুমি এর কবলে পড়তে কী করে তাই আমি নিজ দায়িত্বে আরো কাজ করলাম, লোক লাগিয়ে জানতে পেরেছি লাবণ্য যে ফ্ল্যাটে থাকে, সেখানে আরও তিনজন মেয়ে থাকে। সবাই একই রকম। তারা ধনী ছেলেদের সাথে সম্পর্ক রাখে শুধু আর্থিক সুবিধার জন্য। এমন মেয়েরা কখনো কাউকে ভালোবাসে না ভাইয়া, এটা তাদের ব্যবসা আর শুনতে খারাপ লাগলোও সবচেয়ে বড় কথা তুমি লাবণ্যের কাছে একজন গ্রাহক মাত্র।

তুমি আমার কথা বিশ্বাস নাও করতে পারো তাই আমি সব প্রমাণ সংগ্রহ করে রেখেছি। নিচে প্রমাণগুলো দিয়ে দিলাম,দেখে নিও। এসব ছবি, স্ক্রিনশট, মেসেজ, দেখে তুমি লাবণ্যের সাথে কী করবে সেটা সম্পূর্ণ তোমার ব্যাপার ভাইয়া।

আর আমার লেখাগুলো পড়ে মোটেও মন খারাপ করবে না। আমি জানি সাফওয়ান শেখ প্রচণ্ড কঠোর একজন মানুষ। লাবণ্যের সঠিক বিচার সে করতে পারবে, ওর ব্যবস্থা তুমি না করলে আমি ফিরে এসে করব। একটা কথা আছে না আমাদের জীবন থেকে কিছু হারিয়ে গেলে সেটা নতুন রূপে, নতুন ভাবে, বহুগুণ সুন্দর হয়ে আবারও আমাদের কাছে ফিরে আসে। তোমার সাথেও সেটা হয়েছে; তুমি কয়লাকে ছেড়ে হীরা পেয়েছ এখন শুধু সঠিক মূল্যায়ন করার দরকার।

এছাড়া বাকি কথাগুলো বাসার আসার পরে বলল। এভাবে মেসেজে আর কত কথা বলা যায় তুমিই বল।

আল্লাহ হাফেজ।

তোমার প্রিয়, কিউট-মিউট তিনমাত্র ভাই,

সায়ানুনু।

সাফওয়ান নির্দিষ্ট রেস্তোরাঁর সামনে এসে পার্কিং প্লেসে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করে গাড়ির সিটে মাথা হেলিয়ে দিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ করে গভীর ভাবে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ির ভেতরটা হঠাৎ করে তার কাছে দমবন্ধ লাগতে শুরু করল। এসির ঠাণ্ডাতেও তার কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমতে লাগল। সাফওয়ান আর গাড়িতে বসে থাকতে পারলো না সে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে পা রাখতেই গুমোট গরমে আরো বিরক্ত হয়ে গেলো। রৌদ্রের তীব্র আলো তীর্যকভাবে তার চোখে এসে লাগল৷ সাফওয়ান পকেট থেকে রোদচশমাটা বের করে সেটা চোখে দিলো। গাড়ির দরজা বন্ধ করে সামনের রাস্তার দিকে তাকাল। গুলশানের এই এলাকাটা সবসময়ই ব্যস্ত থাকে আজও তাই আছে। গতকাল সন্ধ্যায় যখন আসমা শেখ মিশার সাথে তার বিয়ের কথা তুলেছিলো তখন সে সকলের সামনে একদম চুপ ছিলো, সে ভেবেছিলো পরে আলাদা করে আসমা শেখের সাথে কথা বলবে তার তথাকথিত ভালোবাসার মানুষ লাবণ্যকে নিয়ে৷

সে জানে তার আম্মু তার ভালোটা চায়। মিশা অনেক ভালো একটা মেয়ে। শিক্ষিত, ভদ্র, পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীল একটা মেয়ে মিশা কিন্তু সাফওয়ানের মনে যে লাবণ্য। কলেজ জীবনের প্রথম পছন্দ তার। মেয়েটার কথা বলার ভঙ্গি, তার আধুনিক চিন্তাভাবনা সবকিছু সাফওয়ানকে তার দিকে টানে।

আজ সকালেই সায়ান তাকে মেসেজটা দিয়েছে৷ মেসেজটা পড়ে আর সায়ানের পাঠান সসগুলো দেখে সাফওয়ান কয়েক মিনিট চুপ করে বসে ছিলো৷ তারপর যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সেটা নিয়ে নিল৷

সাফওয়ান রেস্তোরাঁর দিকে পা বাড়াল। তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই লাবণ্য সবসময়ই তার ব্যয়বহুল জিনিস চাইত। মেয়েটার কাছে ডিনার মানেই পাঁচতারা হোটেলে খাওয়া দাওয়া করা, শপিং মানেই সবচেয়ে দামি ব্র্যান্ডের জিনিসটা নেওয়া তারপর সেটার শো-আপ করা। এছাড়া সাফওয়ান যখন তাকে সময় দিতে পারত না, তখন সে অন্য কারো সাথে ব্যস্ত থাকত। সাফওয়ান এসব নিয়ে কিছু জিজ্ঞাসা করলে লাবণ্য তাদেরকে ফ্রেন্ড বলে পরিচয় দিত আর সাফওয়ানও বোকার মতো আর কোনো কথা বাড়াত না।

সাফওয়ান রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকল। চারপাশে চোখ বোলাল। সাফওয়ানের চোখ দুটো কর্ণারের একটা টেবিলের দিকে গেলো।

লাবণ্য সেখানে বসে ফোনে ব্যস্ত ছিল। লাল রঙের ড্রেস পরা। মুখে ভারী মেকআপ, মেয়েটাকে আজ নিজের কাছে আগের মতো সুন্দর লাগল না। আজ তাকে দেখে কৃত্রিম সৌন্দর্যের অধিকারী বলে মনে হচ্ছে। এখন রাগে,দুঃখে,ঘৃণায় তার লাবণ্যের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না। সাফওয়ান নিজের হাতের মুঠো শক্ত করে রাগ নিয়ন্ত্রণ করলো তারপর মেয়েটার দিকে এগিয়ে গেল।

নিজের সামনে কারোর উপস্থিতি লক্ষ্য করে লাবণ্য মাথা তুলে সামনের দিকে তাকালো। সে সাফওয়ানকে দেখে হালকা করে হাসল। মেয়েটার মুখের মিষ্টি হাসি এতদিন সাফওয়ানকে মুগ্ধ করত কিন্তু আজ আর কাজ করলো না। সে টেবিল থেকে উঠে সাফওয়ানের হাত টেনে নিজের হাতের মধ্যে রাখল।

‘এত দেরি করলে কেন, জানু? জানো আমি কতক্ষণ ধরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।’

নিজের লম্বা চুলগুলো এক হাতের সাহায্য কাঁধে ফেলে কথাটা বলল লাবণ্য । সাফওয়ান শুধু দেখলো তারপর নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে চুপচাপ চেয়ারে বসল। লাবণ্য বিষয়টা লক্ষ্য করলে৷ সাফওয়ানকে তার আজ অন্য রকম লাগলো। সে দেখলো সাফওয়ান চোয়াল শক্ত করে আছে।

‘ কী হয়েছে তোমার?’ লাবণ্য একটু চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করল। সাফওয়ান কোনো ভণিতা করলো না। সে সরাসরি লাবণ্যের চোখের দিকে তাকাল। সে গমগম আওয়াজে বলল,

‘ লাবণ্য আমার মনে হয় আমাদের কথা বলা দরকার।’

‘ হ্যাঁ, বলো না। কী বলবে। ’

লাবণ্য নিজের জায়গায় গিয়ে বসল। সাফওয়ান শান্ত শীতল কন্ঠে বলল,

‘ আমার কিছু জানার আছে লাবণ্য। ’

‘ কী?’

‘ তুমি এগুলো কেন করো?’ সাফওয়ান শান্ত, শীতল কন্ঠে বলল। লাবণ্য এক ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,

‘ কী করি আমি? ’

সাফওয়ান রাগলো। রাগে তরতর করে বলে দিল,

‘ তুমি যে কী কী করো তার সবকিছু আমি ভালো করে জানি, লাবণ্য।'

সাফওয়ানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে মুহূর্তে লাবণ্যের মুখ কালো হয়ে গেলো। তার মুখের হাসি উধাও হয়ে গেলো। সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

‘ক..কী জানো তুমি?’

সাফওয়ান রাগান্বিত দৃষ্টিতে লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল,

‘তুমি যা করে বেড়াও। ’

লাবণ্যে মুখে বিন্দু বিন্দু ঘামের দেখা মিলল।

‘কী যা-তা বলছো তুমি ?’

‘ আমি বেশিকিছু জানতে চাচ্ছি না লাবণ্য। আমাকে শুধু এটুকু বলো তুমি কোন সাহসে আমার ছোট ভাইয়ের কাছে তোমার আপত্তিকর ছবি পাঠিয়েছো? কী চেয়েছিলে তুমি?’

সাফওয়ানের কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে লাবণ্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

‘মানে? কী সব বলছো? আর কে তোমার ছোট্ট ভাই? আমি তোমার কোনো ভাইকে চিনি না।’

‘ চেনো।’

‘ ফালতু মজা করছো আমার সাথে? ’

‘ ক্রিকেটার সায়ান আমার ভাই।’

‘সায়ান! ’ লাবণ্যের মুখের কালো মেঘের দেখা মিললো।

‘ হুম।’

‘সে... সে কী বলেছে তোমাকে?’ লাবণ্য আমতা আমতা করে বলল। সাফওয়ান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখে বলল,

‘সায়ানের নাম শুনে ভয় পাচ্ছো নাকি? ’

‘ ভয় পাওয়ার কী আছে?’

‘তা তুমি ভালো করেই জানো। যাই হোক তারপরে বলো বর্তমানে আমিসহ কতজনের সাথে সম্পর্কে আছ?’

সরাসরি সাফওয়ানের এমন কথায় লাবণ্য ভড়কে গেলো। নিজের চোখে মিথ্যা পানি নিয়ে এসে বলল,

‘ কী বলছ এসব, সাফওয়ান? আমি মোটেও তেমন মেয়ে না...’

‘ মিথ্যা বলো না। আর একটা মিথ্যা বললে তোমার জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে আনবো আমি লাবণ্য। আমি সব জানি লাবণ্য বর্তমানে তুমি আমি সহ আরো চারজনের সাথে রিলেশনে আছো।’

সাফওয়ান শক্ত কণ্ঠে বলল। লাবণ্য এতো তাড়াতাড়ি ধরা খেয়ে যাবে কল্পনাও করেনি। সাফওয়ানের চোখমুখ দেখে লাবণ্য বুঝতে পারল লোকটা বেশ খেপে আছে। লাবণ্য তাকে অনেক কিছু বোঝাতে চাইলো তবে সাফওয়ান বুঝলো না। সে নিজের ভুল স্বীকার করে কেঁদে কেটে একাকার করে দিলে সাফওয়ানের সিমপ্যাথি পাওয়ার জন্য কিন্তু আজ এসবে কোনো কাজ হলো না। সাফওয়ান লাবণ্যের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

‘তোমার জন্য আমি আমার অনেক মূল্যাবান সময় নষ্ট করেছি লাবণ্য। আমাদের এই মিথ্যা সম্পর্কের পেছনে আমি অনেক শ্রম দিয়েছি, তোমাকে আগে অনেকবার ক্ষমা করেছি কিন্তু আজ আর ক্ষমা করব না। আমি এই সম্পর্কটা এখানেই শেষ করলাম।’

‘ সাফওয়ান। ’

লাবণ্য মুখ তুলে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল। সে সাফওয়ানকে বোঝাতে চাইলো,

‘ সাফওয়ান শোনো একবার...’

‘তোমার মতো মেয়ের মুখ থেকে আমি আর একটা কথাও শুনতে চাই না। ’

সাফওয়ান নিজের রাগান্বিত দৃষ্টি লাবণ্যের উপর ফেলে চোখমুখ লাল করে উঠে দাঁড়াল। সাফওয়ান সামনে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো কিন্তু কী মনে করে আবারও সে কয়েক পা পিছনে এসে লাবণ্যের দিকে তাকাল। নিজের আঙুল উঁচু করে লাবণ্যকে বলল,

‘তোমাকে শেষবারের মতো একটা কথা বলছি। এই ধরনের জীবন থেকে বের হয়ে এসো লাবণ্য ইসলাম। টাকার জন্য মানুষের সাথে এমন প্রতারণা করো না। এমন করতে থাকলে দেখে একদিন তুমি নিজেই তোমার কোনো এক প্রেমিকের হাতে শেষ হয়ে যাবে।’

সাফওয়ানের তীব্র সত্যি কথাগুলো লাবণ্যের গায়ে লাগলো। সে রাগী দৃষ্টিতে সাফওয়ানের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করল। সাফওয়ান তার ওয়ালেট থেকে কয়েকটা এক হাজার টাকার নোট বের করে টেবিলের উপর রাখল।

‘বিল।’

সাফওয়ান আর কোনো কথা বললো না ঘুরে দাঁড়িয়ে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে গেল পিছনে মুষ্টিবদ্ধ অবস্থাতে রাগান্বিত মুখভঙ্গি নিয়ে লাবণ্য বসে রইল।

......

সকালের মিষ্টি রৌদ্রর ঢাকা মেডিকেল কলেজের শুকনো ঘাসের ওপর পড়ছে। কয়েকদিনের তীব্র ঝড়-বৃষ্টির পরে আজ ভালোই রোদ উঠেছে। ফারাবী আর মিশা বর্তমানে মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তারা দুইজন দু'জনার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী। দুইটা ক্লাস করে তারা দুইজনে ক্যাফেটেরিয়াতে বসে চা খাচ্ছে আর গল্প করছে কিন্তু মিশার হাবভাব চালচলন আজ ফারাবীর কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন লাগছে। সকাল থেকেই মেয়েটার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি লেগেই আছে৷ ফারাবী ধারণা করেছে মেয়েটার কিছু একটা হয়েছে কিন্তু কী হয়েছে সেটা সে ধরতে পারছে না। ফারাবী ভেবেছিল মিশা নিজেই তাকে বলবে মেয়েটার কী হয়েছে কিন্তু সে বলল না। ফারাবীর খুব কৌতূহল জাগলো,সে মিশার দিকে তাকিয়ে চিন্তাগ্রস্ত স্বরে জিজ্ঞাসা করল, ‘ কী হয়েছে রে তোর?’

‘কী হবে?’ মিশা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সেটা টেবিলের উপর রেখে চোখ ছোট্ট করে নিল।

‘আজ এতো খুশি-খুশি লাগছে কেন? ’ ফারাবী নিজের অধর কার্নিশে মৃদু হাসি ফুটিয়ে নিলো। চোখমুখে তার বিশাল কৌতূহল।

‘ কই? ’ মিশা ক্ষীণ আওয়াজে আওড়ালো।

‘ কই মানে? তোর চোখমুখ দেখে, যে কেউ বলে দিবে মিশা আজ অনেক খুশি ।’

ফারাবীর কথা শুনে মিশা ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল,

‘ খুশি হলেও বা কী? আমার কী খুশি হওয়া নিষেধ?’

‘ খুশি হওয়া নিষেধ হবে কেন? কিন্তু এই খুশির কারণটা কী? অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্রাঙ্কল বলেছেন, মানুষের খুশি হওয়ার জন্য একটি কারণ থাকতে হয়। একবার যখন সেই কারণটি খুঁজে পাওয়া যায়, মানুষ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সুখী হয় বা হতে থাকে।’

‘কী পাগলের পাল্লায় পড়লাম আল্লাহ! এমনি এমনি কী খুশি হওয়া যায় না?’

ফারাবী কপালে গাঢ় ভাঁজের দেখা মিললো। সে রসিকতা করে বলে ফেললো,

‘ না,এমনি এমনি মানুষজন খুশি হলেও, তুই খুশি হতে পারিস না দোস্ত। ’

‘ কেন?’ মিশা গাল ফুলিয়ে জিজ্ঞাসা করল।

‘ডার্লিং আপনি মানুষের কাতারে পড়েন না। আপনি যে কী জিনিস সেটা আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না। নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে যার জন্য আপনি এতো খুশি। কাহিনি কী খুলে বলেন দেখি। ’

ফারাবী নাছোড় বান্দর মতো মিশার পিছনে লেগে আছে। মিশা সেটা দেখে ছোট্ট করে শ্বাস ফেললো।

মিশা আর ফারাবী কর্ণারে একটা টেবিলে বসে আছে। কথা বলার মাঝে তাদের অর্ডার করা সিঙ্গারা আর সমুচা চলে এলো। ফারাবী হাসি মুখে সেটা রহমান ভাইয়ের কাছ থেকে নিল। রহমানও পাল্টা হেঁসে আবারও নিজের কাজে চলে গেল। রহমান যাওয়ার পরপরই ফারাবী মিশার হাত ধরে বলল,‘বল না ভাই?’

‘আরে তেমন কোনো কাহিনি না।’ মিশা টেবিলের দিকে নিজের দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বলল। ফারাবী মিশার মাথায় গাট্টা মেরে বলল,

‘তেমন কোনো কাহিনি না হলে তোর চোখেমুখ দেখে মনে হচ্ছে কেন তুই আকাশে উড়ছিস? ’

মিশা হকচকিয়ে ফারাবীর দিকে তাকাল। ফারাবী তার দিকেই এক ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। মিশা হার মানল। সে ছোট্ট করে বলল,

‘আসলে. আজ সকালে খালামণি পাকা দেখার জন্য কবে আমাদের বাড়িতে আসবে সেটা জানতে চাচ্ছিল।’

ফারাবী চক্ষু চড়কগাছ হলো। ‘ পাকা দেখা? কার? ’

‘ কার আবার আমার।’ মিশা মুখ বাঁকিয়ে বলল।

‘বেয়াদব এই কথা আগে বলবি না? এতোক্ষণ ধরে ঢং করছিলি? ’

মিশার পিঠে কিল মেরে ফারাবী বলল। মিশা ভদ্র মেয়ের মতো চুপ থাকল। ফারাবী কপট রাগ দেখিয়ে বলল,

‘ তুই দেখি বান্ধবী নামের কলঙ্ক। তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো আর তুই আমাকে একটু বললিও না বেইমান। ’

মিশা কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল, ‘ বিয়েটিয়ে কিছু ঠিক হয়নি ভাই। শুধু কথা হচ্ছে। ’

ফারাবী বিশ্বাস করলো। প্লেট থেকে সিঙ্গারা তুলে জিজ্ঞাসা করল,

‘ দুলাভাই কী করে?’

‘ ব্যবসা।’

‘ দুলাভাইয়ের নাম কী?’

‘ সাফওয়ান। ’

পরিচিত নামটা শোনা মাত্রই ফারাবীর চোখ বড়-বড় হয়ে গেল। সে কিছু আন্দাজ করতে বসল। তারপর সবটা বুঝতে পেরে মিশার দিকে তাকালো। মিশা মিটিমিটি হাসছে।

‘ ও মাই গড মিশা, সাফওয়ান! মানে তুই যাকে পছন্দ করিস?’

‘হুম।’

কথাটা বলার সময় মিশার চোখে কোমলতা দেখা দিলো কিন্তু এবার ফারাবী গাল ফুলিয়ে নিল,

‘ বাহ্ তোর পাকা দেখা হয়ে গেছে আর তুই আমাকে জানালি না? বিয়ের আগে এতোটা পর করে দিলি? না জানি বিয়ের পরে কী করবি।’

‘ পাকা দেখা এখনো হয়নি। সায়ান ভাইয়া ফিরলেই খালানণিরা আসবে। ’

‘ও কিন্তু তুই এবার বল, এত বড় খবর এতক্ষণ আমার থেকে লুকিয়ে রেখেছিলি কেন? ’ মিশা চোখ তুলে ফারাবীর দিকে তাকাল। গলায় অভিমান নিয়ে বলল,

‘ নিজের বিয়ের কথা নিজে ঢোল পিটিয়ে বলবো নাকি? সেখানে এখনো কিছু ঠিকই হয়নি। ’

ফারাবী মিশার অভিমানী কন্ঠ শুনে এক গাল হেসে ফেললো।

‘ আচ্ছা যা ক্ষমা করলাম এবার একদম শুরু থেকে সব কিছু বল। কিছু বাদ দিবি না।’

মিশা হাসল। সে একটা সিঙ্গারার কামড় দিয়ে সবটা ফারাবীকে বলতে শুরু করল,

‘দুইদিন আগে রাতে খালামণি আম্মুর কাছে ফোন করে বিভিন্ন কথা বলছিলো, কথার মধ্য আমাকে তার বড় ছেলের বউ বানানোর জন্য; সরাসরি আম্মুর কাছে আমার হাত চেয়ে নিলো। তারপর কাল সন্ধ্যায় কল করে বললো কয়েকদিন পরে এসে আংটি পরিয়ে যাবে ।’

‘ও আচ্ছা। বিয়ের তারিখ কবে ঠিক হবে?’

‘এখনও এসব কিছু জানি না তবে আমার আম্মু ইচ্ছে এই বছরের শেষে বা পরের বছরের শুরুতে বিয়েটা দেওয়ার ।’

‘এত তাড়াতাড়ি?’

ফারাবী অবাক হয়ে চোখ ছোট-ছোট করে জিজ্ঞেস করল। ফারাবীর চোখমুখ দেখে মিশা নিজের ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। ফারাবী আবার জিজ্ঞাসা করে,

‘ওরা কেমন মানুষ মিশা? বিয়ের পর তোর পড়াশোনা চালাতে দিবে?’

মিশা ফারাবীর কথাটা শুনে নিঃসংকোচে হাসল।

‘খালামণিরা এতো পরিমাণের ভালো ফারাবী তুই তাদের সাথে না মিশলে কখনো বুঝবিই না ওরা কেমন। পাগল আমার খালামণি আবার পড়াশোনা নিয়ে খুবই সচেতন, তাই পড়াশোনো তো আমাকে চালাতেই হবে। আচ্ছা শোন ফারাবী একটা আবদার ছিলো।’

ভ্রু কুঁচকে বলল,‘আবদার মানে?’

নিচু স্বরে ফারাবীর হাতের উপর নিয়ে হাত নিয়ে মিশা জিজ্ঞাসা করল,‘আমার পাকা দেখার দিন তুই আমাদের বাড়িতে আসবি দোস্ত? ’

ফারাবী একগাল হেসে প্রত্যুত্তর করল, ‘তুই আসতে বলছিস আর আমি আসবো না এটা কী করে হয়?’

চলবে…

[ কপি করা কঠিনভাবে নিষিদ্ধ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন