#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
১১. প্রথমাংশ
মিরপুরের পুরোনো একটা বহুতল ভবনের তৃতীয় তলার ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে তাসনিয়াদের বসবাস। ফ্ল্যাটটাতে মোটে দুইটা রুম। দুই রুমের ছোট্ট এই ফ্ল্যাটের এক রুমে তার অসুস্থ বাবা আর ভাই থাকে,অন্যরুমে তাসনিয়া আর তার জমজ বোন তাসনিফা থাকে,এগুলোর সাথে ছোট্ট একটা রান্নাঘর আর ব্যালকনিও আছে। ছোট্ট এই জায়গাটাই তাদের আশ্রয়ের, তাদের বসবাসের ঠিকানা। ফ্ল্যাটটা বেশ পুরনো,দেয়ালের জায়গায় জায়গায় রং উঠে গেছে, শীর্ণ জীর্ণ একটা ফ্ল্যাট তবে ফ্ল্যাটটার সবকিছু অনেক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে গোছানো। তাসনিয়া আর তাসনিফা মিলে ফ্ল্যাটটা সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখে। বাড়িতে মানুষ বলতে তারা চারজন।
এখন সবে সকাল সাতটা। তাসনিয়া দ্রুত পায়ে রান্নাঘরের এল। রান্নাঘরের এসে জানালাগুলো দেওয়া দেখে সেটা খুলে দিলো। এখানে জানালা বেশিক্ষণ খুলে রাখলে ভেতর থেকে জিনিস গায়েব হতে সময় লাগে না, সন্ধ্যার পরে জানালা খুলে রাখা মানে রান্নাঘর থেকে কিছু না কিছু গায়েব হওয়া। কী এক অবস্থা! তাসনিয়া রান্নাঘরে এসে জানালাটা খুলে দিল,সাথে-সাথে হালকা রোদ্দুর এসে তাসনিয়ার গায়ে পড়ল। ততক্ষণে তাসনিফাও রান্নাঘরে চলে আসল। দুইবোন মিলে সকালের নাশতা তৈরি করলো। ভার্সিটি যাওয়ার আগে সকালের রান্না করে যায় তারা। তারপর ভার্সিটি থেকে যে আগে আসে সে দুপুরের রান্না বসায়। তাসনিয়া রান্নাঘরে এসে রাইসকুকারে চাল আর আলু ধুয়ে বসিয়ে দিলো। আজ আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি করবে তাসনিয়া৷
তাসনিয়া আর তাসনিফাও জমজ, তাদের চেহারাটা সম্পূর্ণ একই। দুইজন পাশাপাশি দাঁড়ালে তাদের চেনা বড়ই মুশকিল। তাসনিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে,আর তাসনিফা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। দুজনেই মেধাবী, দুজনেই স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছে তা না হলে তাদের অসুস্থ বাবার পক্ষে তাদের পড়ানো সম্ভব হতো না।
‘ আপু পেঁয়াজটা একটু ছোট কুচি কুচি কর। পেঁয়াজ বড় থাকলে আব্বু খেতে পারে না।’
তাসনিফা তাসনিয়াকে পেঁয়াজ বড় বড় করে কু়টতে দেখে বলল। তাসনিয়া একবার পেঁয়াজের দিকে তাকাল। পেঁয়াজগুলো সত্যি সে অনেক মোটা-মোটা করে কেটে ফেলেছে সে। তাসনিফার কথায় সে হাতের ছুরিটা দ্রুত চালিয়ে পেঁয়াজগুলো কুচি-কুচি করতে লাগল। এই দুই দিন সাজিদের সেই কথাগুলো তাকে মানসিকভাবে খুব বিরক্ত করেছে। সে চেয়েছে সব ভুলে থাকতে কিন্তু পারেনি। সাজিদের মতো ব্রিলিয়ান্ট মানুষের এমন ঘৃণ্য মানসিকতা দেখেও সে অবাক হয়েছে। তাসনিফা আজ দুই দিন ধরে বোনের মন-মেজাজ কেমন উগ্র উগ্র দেখছে।
‘ কী হয়েছে তোর বলত? এই কয়দিন ধরে তোর মনে সবসময় কী ঘুরপাক খায়?কোনো কিছুতে মন বসে না।’
তাসনিফা তার বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
'কিছু না।'
তাসনিয়া সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল কিন্তু তার চেহারার ভাবভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে বিরক্ত তা। তাসনিফা বোনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। সে তার বোনকে ভালো করেই চেনে। সে বুঝল কিছু একটা হয়েছে তবে এখন সে বলতে চাইছে না দেখে সে বোনকে বিরক্ত করলো না।
তাসনিফা বোনকে আর বিরক্ত না করে নিজের কাজে মন দিলো।
‘ পরে বলছি, আগে রান্নাটা শেষ করি।’
তাসনিয়া ফ্রিজ থেকে ডিমগুলো বের করতে করতে হুট করে নিজের মনেই বলল। তাসনিফা আঁড়চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে শুধু মাথা নাড়ল।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর তাদের রান্না শেষ হলো। তাসমিয়া তাদের সবার জন্য গরম গরম ভাত বাড়ল। তাসনিফা আলু ভর্তা মাখিয়ে সকলের প্লেটে-প্লেটে দিল। দুইটা ডিম ভাজি চারজনের ভাগ করে নিল।
‘ভাইয়া, আব্বু, আসো খেয়ে নাও।’
তাসনিয়া রান্নাঘর থেকে ভাই আর বাবাকে জোরেই ডাক দিল। তাসনিফা আর তাসনিয়াও হাতমুখ ধুয়ে নিলো।কিছুক্ষণ পরে মুরাদ একেবারে ফ্রেশ হয়ে আসল। ছেলেটা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। এখন একটা ছোট্ট-খাটো চাকরি করছে, তার যে আয় তা দিয়েই কোনোমতে তাদের চারজনের সংসারটা চলে। দুই বোনের পড়াশোনার খরচ, বাসা ভাড়া, বাবার চিকিৎসা সব মিলিয়ে অনেক কষ্ট করতে হয় তাকে তবু ছেলেটার মুখ থেকে কখনো টু শব্দটুকুও বের হয় না। সে বিসিএস দেওয়ার চেষ্টা করছে, আল্লাহ তায়ালা সহায় হলে দুইবছরের মধ্যে ভালো কিছু হবে। একসময় চকবাজারে তাদের কী বিশাল দোকান ছিলো! আল্লাহ রহমতে খেয়ে, পরে হাতে মোটা অংকের টাকা থাকত। বাবার পাশাপাশি মাও দোকানের হাল ধরেছিলো। তারা কতই না সুখী ছিলো কিন্তু এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড তাদের সবকিছু কেড়ে নিলো। সেই অগ্নিকাণ্ডে তারা তাদের মাকে হারালো। বাবা বেঁচে রইলো তবে অসুস্থ হয়ে। লোকটার শরীরের প্রায় সব অংশই পোড়া।
‘আব্বু এখনো ঘুমিয়ে আছে,ভোরের দিকে ঘুমালো। কাল সারারাত শরীরের জ্বালাযন্ত্রণায় ঘুমাতে পারেনি। আব্বুর জন্য আলাদা করে রেখে দিও। উঠলে খাবে।’
মুরাদ নিচে বেছানো পাটিতে বসতে-বসতে বলল।
‘ ঠিক আছে ভাইয়া।’
তাসনিফা ছোটো করে উত্তর দিয়ে, বাবার জন্য আলাদা একটা প্লেটে খাবার বেড়ে রাখল।
তারা তিনজনই নিচে বসে খেতে শুরু করল। গরম ভাতের সাথে তেল-মরিচ দিয়ে মাখা আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি তাদের তিনজনের কাছেই খুব প্রিয়। পেটের সাথে মনটাও ভরে তাদের।
‘তাসনিয়া, তোর ক্লাস কেমন যাচ্ছে? এই কয়টা দিন মুখটা এমন করে রেখেছিস কেন? অনেক চাপ যাচ্ছে নাকি? ‘
মুরাদ খেতে-খেতে হুট করেই তাসনিয়ার শুকনো মুখ দেখে জিজ্ঞেস করল।
‘ ক্লাস তো ঠিকই যাচ্ছে ভাইয়া। ‘
‘ তাহলে তোর মুখটা এমন কেন?’
মুরাদ বোনের বিরক্তিমাখা মুখটা দেখে আগ্রহ নিয়ে কী হয়েছে সেটা জানার জন্য জিজ্ঞেস করল।
তাসনিয়া ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
‘ এমনি, তেমন কিছু না।’
‘তেমন কিছু না সত্যি? তোর মুখটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তুই অস্বস্তিতে আছিস। কী লুকাচ্ছিস বোন? কিছু না লুকিয়ে সরাসরি বলে ফেল দেখি৷ কথা চেপে রাখলে মনটা ভারী হয়ে যায়।তোদেরকে চিন্তায় দেখলে আমার অন্তরটা যে জ্বালা করে। ’
মুরাদের কথায় তাসনিয়া নিজের মাথা নিচু করে নিল। সে কোনো কথা বলতে পারল না। মা মারা যাওয়ার পর থেকে বাবার ভালোবাসা পেলো কই? এই এক ভাই তাদের দুইজনকে নিজের বুকে করে রেখেছে। কখনো কষ্ট বুঝতে দেয়নি, সামর্থ্য অনুসারে সবকিছু করেছে।
‘এতো চিন্তা না করে কী হয়েছে বলে ফেল ।’
মুরাদ আলু ভর্তা ভাতে মাখতে লাগল।
' তেমন কিছুই না ভাইয়া, কিছুদিন আগে ভার্সিটির ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে বসেছিলাম তখন হুট করেই কয়েকটা ধনীর দুলালদের কথা শুনে মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো।’
‘কেন?কী এমন বললো সে আমার বোনটার মেজাজ আজও খারাপ হয়ে আছে?’
‘গরিব আর মধ্যবিত্তদের নিয়ে যতসব উল্টো পাল্টা কথা।’
‘কী বলেছে?’
‘ কী আর বলবে? বলছিল যে এই দেশের সব সমস্যার মূল হলো গরিব আর মধ্যবিত্তরা, এরা রিজিকের জন্য যা ইচ্ছে সেটা করে। এরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে তাই দেশের এই অবস্থা। এদের কারণেই দেশে অপরাধ বাড়ছে, অর্থনীতি খারাপ হচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। ওদের মধ্যে সবচেয়ে বড় অভদ্রটা কী বললো জানো?’
বোনের চোখমুখ শক্ত হয়ে যেতে দেখে মুরাদ হাসল। বোনের এমন খিটমিটে রূপ দেখে তাসনিফাও হাসল। মুরাদ একটু সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞাসা করল,‘ কী?’
তাসনিয়া উত্তর দেওয়া আগে তাসনিফাও আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল,
‘ বল কী বলেছে?’
‘ বলল সরকারের উচিত একটা আইন করা। আইনটা এমন হবে যে, নির্দিষ্ট আয়ের নিচে যারা, তারা দুইটার বেশি বাচ্চা নিতে পারবে না। যদি নেয় তবে তাদের জরিমানা করা হবে বা জেলে দিয়ে দেওয়া হবে। তারপর সে সবটা খুলে বলতে লাগল। ছেলেগুলো কী চোখে গরিবদের দেখে সেটাও উল্লেখ করল।’
কথাগুলো বলার সময় তাসনিয়ার গলার স্বর ক্রমশ উঁচু হচ্ছিল। তাসনিফা তার বোনের রাগটা বুঝতে পারছিল। সে নিজেও রাগ অনুভব করলো ছেলেগুলোর উপর কিন্তু তাসমিয়ার মতো প্রকাশ করল না। মুরাদের ভ্রু কুঁচকে গেলো। পানির গ্লাস তুলে সেটার অর্ধেক পানি শেষ করে দিলো, তারপর নরম হয়ে গেলো।
‘দেখ বোন এসব লোক সব জায়গায় আছে তাই বলে তুই এমন নিম্ন মস্তিষ্কের মানুষের কথায় মেজাজ গরম করবি পাগল?’
‘রাগ করব না তো কী করব ভাইয়া? বলে কিনা গরিবরা দায়িত্বহীন, এদের কোনো নৈতিক শিক্ষা নেই, এরা টিকে থাকার জন্য যা খুশি তাই করে। গরিবদের বাচ্চারা নাকি বড় হয়ে রিকশা চালায় বা কারখানায় শ্রমিক হয়, আর তারপর আবার পাঁচ-সাতটা বাচ্চা নেয়। এভাবে দারিদ্র্যের চক্র চলতে থাকে। আর ধনীরা তো সব ধোঁয়া তুলিস পাতা?তারা যেনও দেশে কোনো অপরাধই করে না। বড় বড় সব দুর্নীতির মাথায় তো এরা। ’
তাসনিয়া এবার একটু চিৎকার করেই কথাটা বলে ফেললো। সে নিজের রাখটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলো না। তাসনিফা তাকে শান্ত হতে ইশারা করল।
‘আপু, আস্তে বল। বাবা ঘুমাচ্ছেন।’
তাসনিয়া নিজেকে একটু সংযত করল কিন্তু তার রাগটা কমল না।
‘শুনেছি ছেলেটা নাকি খুব বড়লোক, একসাথেই পড়ি, দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখ খুললেই মুখ থেকে বিষ বের হয়। ওর কথাগুলো শুনে আমার মনে হলো আমাদের মতো মানুষদের এই সমাজে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই, ভাইয়া। আমরা শুধু এই সমাজের জন্য বোঝা, সমস্যা। এই সমাজে আমাদের অস্তিত্বটাই অপরাধের।'
তাসনিফা তার বোনের কাছে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখল। মুরাদ বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
‘দেখ বোন, আমরা কোনো বোঝা নই, আমরা কোনো সমস্যাও নই, এসব কথা মাথা থেকে বের করে দে। আমরা মেধাবী, আমরা দেশের সম্পদ, আমরা পরিশ্রম করছি, আমরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াচ্ছি,নিজেরা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছি। যে আমাদের মতো গরিরদের নিয়ে এসব বলছে, সে তার বাপের টাকায় আরামের জীবন কাটাচ্ছে।তার জীবনে কোনোদিন কষ্ট, দুঃখ আসেনি, তাই সে বোঝে না গরিব মানুষদের জীবন কতটা কঠিন,এরাও চেষ্টা করে তবে ভাগ্যের কাছে হেরে যায়। আমাদের সমাজে এমন মানুষ অনেক আছে যারা মনে করে টাকা থাকলেই সব হয়। এরা সারাজীবন বাপদাদার সম্পদ খেয়ে, বড় বড় কথা বলে বিদেশ চলে যায়, এরা মনে করে গরিবরা পরিশ্রম করে না, তারা দায়িত্বহীন। কিন্তু এরা দেখে না যে একজন রিকশাচালকও সারাদিন কতটা পরিশ্রম করে নিজের পেট ভরার জন্য,সংসারের আপন মানুষগুলোর জন্য। একজন কাজের মেয়ে দিনে কয়টা বাসায় কাজ করে, শুধু নিজের পরিবারকে ভালো রাখতে। একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা তার সন্তানদের পড়ানোর জন্য কতটা কষ্ট করে।এরা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায় তাই স্টিলের চামচ অর্জন করতে একটা মধ্যবিত্ত ঘরের লোকের কী পরিমাণ কষ্ট হয় তারা বোঝে না।'
তাসনিয়া ভাইয়ের কথাগুলো শুনে, মুরাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘শোন বোন, এসব বাদ দে আর তুই এদের থেকে দূরে থাকবি। এদের নিয়ে বেশি কিছু ভাববি না। নিজের পড়ালেখায় মনোযোগ দি। তাসনিফা, তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?'
মুরাদ কথা ঘোরাতে ভাত খেতে-খেতে তাসনিফার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
'ভালো ভাইয়া। এবার আমি একটা প্রজেক্টে অংশ নিয়েছি। যদি ভালো হয়, তাহলে আমার সিভিতে ভালো দেখাবে।'
'সে তো খুব ভালো। আর পরীক্ষা কবে?'
'আগামী মাসে ভাইয়া। ‘
তাসনিয়া ভাইয়ের কথাগুলো শুনে নিজের আধ খাওয়া প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল।
' কী হলো খাচ্ছিস না কেন?'
তাসনিফার কথায় তাসনিয়া হকচকিয়ে উঠল,
' খাচ্ছি।'
#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
১১. শেষাংশ
ফারাবী দ্রুত পায়ে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে বেরিয়ে আসছে। তার হৃদপিণ্ড এখনো দ্রুত গতিতে ধুকপুক করছে,মাথার ভেতরে একটু আগে সায়ানের বলা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে "আমাকে বিয়ে করবেন ফারাবী?" লোকটার স্পষ্ট উচ্চারিত কথাগুলো তার কানে ভেতর বাজছে। ফারাবী তাড়াতাড়ি লিফটে ঢুকে নিচে নামার বাটন চাপল। লিফটটা নিচে নামতে শুরু করল আর ফারাবীর মনে আরও অস্থিরতা বাড়তে লাগল। কথাগুলোও তার কানে বাজতে লাগল।
‘ পাগল, একদম পাগল,ছাগল,গরু, গাধা একটা লোক।’ফারাবী নিজের মনে বিড়বিড় করল। ’জানাশোনা নেই, কোনো চেনাপরিচয় নেই, হুট করে এমন কথা বলে দেয় কেউ? নিশ্চয়ই মাথায় গভীর আঘাত লাগায় পাগল হয়ে গেছে;যার দরুন এইসব কথা বলছে। ’
ফারাবী লিফট থেকে নেমে দ্রুত গাড়ির কাছে এলো। করিম চাচা গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। গাড়ির সামনে এসে মিহি স্বরে বলল,
‘ চাচা তাড়াতাড়ি কলেজে চলেন। হাতে সময় নেই। ’
ফারাবী কথাটা শেষ করে গাড়িতে উঠে বসল। করিম সাহেবও গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিলেন। গাড়ি হাসপাতাল থেকে বের হয়ে মূল রাস্তায় উঠল। ফারাবী জানালার পাশে মাথা হেলিয়ে বসে রইল। তার চোখ বাহিরের দিকে আছে কিন্তু তার মনটা অন্য জায়গায়। সে অন্যমনস্ক হয়ে বসে রইল। প্রায় আধা ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে তাদের গাড়িটা মেডিকেল কলেজের গেটের সামনে এসে থামল। ফারাবী গাড়ি থেকে নামল।
‘ চাচা, আপনি বাসায় চলে যান। ভাইয়া নিতে আসবে। ’
‘ ঠিক আছে আম্মা।’
ফারাবী যখন কলেজে আসল তখন ক্লাস শুরু হতে প্রায় আধা ঘণ্টা বাকি। ক্যাম্পাসে মানুষজন হাঁটাহাঁটি করছে। কেউ কেউ নিজেদের বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। আকাশে সাদা মেঘমালাগুলো উড়ে যাচ্ছে, শীতল বাতাস হচ্ছে। ফারাবী সোজা ক্যাম্পাসের পেছনের দিকে হাঁটা ধরল। সেখানে একটা বিশাল বটগাছ আছে। সেই বটগাছের নিচে একটা বেঞ্চ পাতানো। এটা তার আর মিশার প্রিয় জায়গা। তারা প্রায়ই ক্লাসের ফাঁকে এখানে এসে বসে গল্প করে, সময় কাটায়। সে বেঞ্চে এসে বসল। ফোনটা বের করে মিশাকে এখানে আসতে বলে ছোট্ট একটা টেক্সট দিলো। বটগাছের ছায়ায় বসে সে চারপাশটা দেখতে লাগল,সাথে নিজেকে শান্ত করতে লাগলো। তার সামনেই একটা ছোট বাগান, যেখানে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। বাগানের পাশ দিয়ে একটা পাকা পথ চলে গেছে লাল বিল্ডিংয়ের দিকে। দূরে কিছু বহিরাগত ছেলেমেয়ে দল বেঁধে ক্রিকেট খেলছে।
‘কখন এলি?’ হঠাৎ পেছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই ফারাবী উঠে সেদিকে তাকাল। মিশা তার পেছনে দাঁড়িয়ে হাসছে।
‘তুই কখন এলি?’ ফারাবী মিশার প্রশ্নের উত্তরটা না দিয়ে বরং নিজেই জিজ্ঞেস করল।
‘ এই তো একটু আগে তোর টেক্সট দেখে সোজা এখানে এলাম কিন্তু তুই এত মনমরা হয়ে বসে আছিস কেন? কী হয়েছে?’ মিশা ফারাবীর পাশে বসতে বসতে ব্যগ্র কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
ফারাবী চোখ ছোট-ছোট করে মিশার দিকে তাকাল। লোকটার কাজে সে এখনো কিছুটা ক্ষিপ্ত। এই কথাটা বলতেও তার শরম করছে তবুও শরমকে দূরে ঠেলে নিজের চোখমুখ কুঁচকে বলল,
‘ জানিস আজ কী হয়েছে?’
‘ কী হয়েছে?’ মিশা নিজের এক ভ্রু কুঁচকে নিল।মিশা নিজের চোখে অনেক কিছু জানার আগ্রহ নিয়ে ফারাবীর দিকে তাকিয়ে রইল। ফারাবী রাগান্বিত গলায় বলল,‘বিরক্তিকর একটা জিনিস।’
‘ কাহিনি কী খুলে বল।’
মিশা প্রশ্নসূচক চাউনি দিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল। ফারাবী মুখটা ছোট্ট করে নিল। সকালের মিষ্টি রৌদ্র ফারাবীর মুখের উপর এসে পড়ছে, মেয়েটার চোখ দু'টো চিকচিক করছে।
‘ মনে আছে তোকে সেদিন বলছিলাম না আমি আর আপু একটা লোকটাকে রাস্তায় এক্সিডেন্ট করা অবস্থায় পেয়েছিলাম? পরে হসপিটালের নিয়ে গিয়েছিলাম?’
‘ হ্যাঁ, মনে আছে। কী হয়েছে তার? সব ঠিক আছে?’
‘ আরে চিন্তার কিছুই না ফালতু লোকটা ঠিকই আছে কিন্তু মাথা নষ্ট হয়ে গেছে বেড্যার।’ ফারাবী তপ্ত শ্বাস ফেললো।
‘ মানে? মাথা নষ্ট হয়ে গেছে মানে? স্মৃতিশক্তি চলে গেছে?’
‘ না রে বাবা।’
‘ তাহলে?’ মিশা চোখ ছোট্ট করে নিলো।
‘ আজ সকালে আমি লোকটাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ’
ফারাবী নিজের দৃষ্টি লুকিয়ে আনত স্বরে বলল।
‘ তো?’ মিশা স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো।
‘ লোকটাকে আমি কতকিছু জিজ্ঞাসা করলাম কিন্তু সে কোনো কিছুই উত্তর দিলো না।’
‘বোবা হয়তো।’
মিশার এক নিঃশ্বাসে উত্তর এল।
‘ ধূর না, কথা বলতে পারে। আমাকে হুট করেই কী বলেছে জানিস?’
কথাটা বলা সময় ফারাবীর গালটা হালকা লাল হয়ে গেল।
‘ কী বলেছে? তাড়াতাড়ি বল ভাই আর তুই এমন লাল হচ্ছিস কেন?’বান্ধবীর মুখ এমন আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো পাল্টে যেতে দেখে মিশা উৎসুক জিজ্ঞাসা করল।
‘লোকটা হুট করে বলল আমাকে বিয়ে করবে ফারাবী। মানে এর কোনো মানে হয়? লোকটার মাথা গেছে না বল।’
ফারাবী হালকা রাগে ফুঁসতে-ফুঁসতে বলল। মিশা প্রথমে একদম স্তব্ধ হয়ে ফারাবীর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ করে হাসতে শুরু করল। মিশা প্রথমে ধীরে ধীরে হাসতে লাগলো তারপর জোরে-জোরে। মেয়েটার হাসতে-হাসতে প্রায় বেঞ্চ থেকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা।
‘ পাগলের মতো হাসছিস কেন? হাসার কী আছে?’ ফারাবী বিরক্ত হয়ে বলল। মিশা বন্ধ করলো না। ফারাবী দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘হাসি বন্ধ কর বেয়াদব আমার বিরক্ত লাগছে। ’
ফারাবী কথা শুনে মিশা হাসি বন্ধ করার চেষ্টা করলো কিন্তু মিশা হাসি থামাতে পারছে না। মিশা এবার পেট চেপে হাসতে লাগল।
‘ মিশা, থাম বলছি বেয়াদব, এত হাসছিস কেন? হাসার মতো কী বললাম আমি?’ ফারাবী রাগত স্বরে বলল।মিশা কোনোমতে হাসি সামলে বলল,
‘ আচ্ছা ঠিক আছে, থামলাম। এখন পুরো ঘটনাটা খুলে বল। কীভাবে বলল? তুই কী বললি? সব বল, এ টু জেড ’
ফারাবী সামনের দিকে তাকিয়ে পুরো ঘটনা খুলে বলতে শুরু করল। কীভাবে সে হাসপাতালে গেল, কীভাবে রুমে ঢুকল, কীভাবে সায়ান প্রথমে তাকে সাহাদ ভেবেছিল, তারপর কীভাবে সে তার প্রশ্নের কোনো উত্তর দেয়নি, শুধু তার দিকে তাকিয়ে ছিল, আর শেষে যখন সে রুম থেকে বের হয়ে যাচ্ছিল তখন কীভাবে হঠাৎ করে সায়ান তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিল। মিশা মনোযোগ দিয়ে সব শুনল। তারপর বলল,
‘লোকটা কী প্রথম দেখায় তোকে পছন্দ-টছন্দ করে ফেললো নাকি?’
ফারাবী কিছু বললো না। মিশা আবারও শুধালো,
‘ বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার সময় লোকটা কী সিরিয়াস ছিল?’
‘ উফফ। মিশা আমি এতো কিছু খেয়াল করিনি।আর উল্টো পাল্টা প্রশ্ন করা বন্ধ কর ভাই। ’ ফারাবী মিশার দিকে বিমূঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল।
‘ আচ্ছা সরি,সরি। ’
‘ আমার মনে হয় ওনার মাথায় গণ্ডগোল হয়েছে।’
‘মানে তুই বলতে চাইছিস মাথায় আঘাত লেগে কিছু হয়ে গেছে। ’
‘ হুম, আমারও সেটাই মনে হচ্ছে কিন্তু আবার..’
‘ আবার কী?’
‘লোকটা হুট করে নিজেই বলল যে তার মাথা ঠিক আছে, সে সম্পূর্ণ সুস্থ। আর তুই যদি লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখতিস, তাহলে বুঝতিস যে সে খুবই সিরিয়াস ছিল কথাগুলো বলার সময়।’ ফারাবী আমতা আমতা করে বলে দিল।
‘হুম বুঝলাম।’ ছোট্ট করে মিশা বাক্য ছুড়ল। মিশা কিছু একটা ভাবতে-ভাবতে আবারও বলল,
‘ যায়হোক,ব্যাপারটা কিন্তু বেশ ইন্টারেস্টিং; মানে একটা লোক তোকে প্রথম দেখাতেই বিয়ে করতে চাইছে। আর তুই পালিয়ে বেড়াচ্ছিস।ঘটনায় একটা সিনেমা সিনেমা ভাইব আছে। ’
‘মিশা।’ ফারাবী বিরক্ত হয়ে বলল। ফারাবী একটু থেমে আবারও বলল, ‘ ছাতার মাথা এটা কোনো ইন্টারেস্টিং ব্যাপার না, উল্টো আমি রীতিমতো অপমানিত বোধ করছি। একটা অপরিচিত লোক, যাকে আমি দুইবার মাত্র দেখেছি, সে কী করে এমন কথা বলতে পারে? আমাকে দেখে কী কোনো ফালতু মেয়ে মনে হয়? ’
‘আহা রাগ করিস না।’ মিশা ফারাবীর হাত ধরে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল৷ মেয়েটা যে রেগে গেছে সেটা মিশা বুঝতে পারল। সে ফারাবীকে বোঝাতে নরম গলায় বলল,
‘আমার মনে হয় প্রথম দেখাই লোকটার তোকে ভালো লেগে গেছে।’
‘এতো সহজ? দুইবার দেখেই কাউকে ভালো লেগে গেল?’ফারাবী অবিশ্বাসের স্বরে বলল।
‘আল্লাহ হয় না কেন কখনো কখনো প্রথম দেখাতেই মানুষ একজনের গভীর প্রেমে পড়ে যায়। এটাকে বলে 'লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট'। আমিও পড়েছিলাম, সাফওয়ানের প্রেমে।’
মিশা জড়তা-সংকোচ ভেঙে বলে দিল।
‘ ছি! এসব বাজে কথা বলিস না মেয়ে। নিজের সাথে আমাকেও অশ্লীল বানিয়ে দিলি। ’ ফারাবীর কথায় মিশা ঠোঁট চেপে হেসে দিল। ফারাবী আঁড়চোখে মিশার দিকে তাকাল। মিশা পাত্তা দিলো না উল্টো উত্তেজিত স্বরে শুধালো,
‘আচ্ছা বাদ দে, আগে বল তুই লোকটার প্রশ্ন কী উত্তর দিলি?’
ফারাবী ঠোঁট ছড়িয়ে বলল,
‘ কিছুই না। ’
‘ হুম?’
ফারাবী নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে,
‘ পাগল নাকি আমি, যে উত্তর দেব? আমি সেখান থেকে সোজা এখানে পালিয়ে এসেছি।’
' পালিয়ে এসেছিস?'
ফারাবীর পালিয়ে এসেছি কথাটা শুনে মিশা আবার হাসতে শুরু করল। মিশাকে বিবশ স্বরে রসাত্মক ভাবে হাসতে দেখে ফারাবীর ভ্রু যুগল কুঁচকে গেলো। ফারাবী রাগান্বিত কণ্ঠে আওড়ালো,
‘ গাধার মতো হাসছিস কেন? আমার কিন্তু রাগ লাগছে।’
‘ ঠিক আছে রাগ করিস না আর হাসি না।’ মিশা ফারাবীকে রাগতে দেখে নিজের হাসি থামিয়ে বলল। পরক্ষণেই আবার ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,
‘একটা কথা বলি ফারাবী?’
‘ চুপ আছিস নাকি? সেই থেকেই তো বকবক করছিস।’
ফারাবী আঁড়চোখে মেয়েটাকে দেখল।আনমনে ফারাবী কপাল কুঁচকে এল। মিশা বলল,
‘সত্যি বলতে,তোর সাথে যে ঘটনাটা ঘটেছে সেটা কিন্তু খুব ইউনিক একটা ঘটনা।’
কথাটা বলেই মিশা খুব কষ্টে নিজের হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলো কিন্তু সে ব্যর্থ হলো। নিমিষেই মিশা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল৷ ফারাবী আঁড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল।
‘ হ্যাঁ,খুব ইউনিক। এতোটাই ইউনিক যে আমি এখনো শকের মধ্যে আছি।’
মিশা আবারও হাসতে-হাসতে বলল,
‘ আমার জীবনে এমন কিছু ঘটলে আমি ততক্ষণ হ্যাঁ বলে দিতাম।’
‘যা,আমার বদলে তুই হ্যাঁ করে আয়।’
মিশার দুই অধর নড়েচড়ে উঠল,
‘সাফওয়ান ভাইকে পছন্দ না করলে তাই করতাম। আচ্ছা বাদ দে এখন বল তুই কী ওই লোকটাকে আর দেখতে যাবি?’
ফারাবী অস্থির মাখা কণ্ঠে বলে,
‘ পাগল নাকি? ন্যাড়া একবারই বেল তলায় যায়। আমি আর কখনোই যাইতাম না ওদিকে। ওই হাসপাতালের ধারে-কাছেও যাব না বাবা। ’
খোলা আকাশের মেঘপুঞ্জের নিম্নতলে মিশা আর ফারাবী বসে আছে। রোদ কম থাকায় চারপাশ ঠান্ডা। স্নিগ্ধ শীতল হাওয়া দিচ্ছে। মিশা ফারাবীর কথা শুনে কৌতূহল নিয়ে শুধাল,
‘আচ্ছা লোকটা দেখতে কেমন?’
প্রশ্নটা করে মিশা দুষ্টু হাসি হাসতে লাগল। ফারাবী চোখ তুলে মিশার দিকে তাকাল। মিশা ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে নিজের ভ্রুঁ জোড়া নাচাচ্ছে।
‘ লোকটাকে দেখিসনি নাকি?’
মিশার কথায় ফারাবী মুখটা গম্ভীর হয়ে গেলো। আসলেই তো, সে এই দুইদিনে লোকটাকে ভালোভাবে দেখতে পারেনি। আগের দিন মুখটা রক্তেমাখা ছিলো আর আজ কেনও যেনও লোকটাকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে সে ঠিক মতো লোকটাকে দেখতে পারেনি।
‘ কী ভাবছিস এতো? লোকটা হ্যান্ডসাম না নাকি?’ মিশা খোঁচা মারল।
‘ জানি না,খেয়াল করিনি আর জানতেও চায় না।’ফারাবী মুখ ফিরিয়ে বলল। লোকটার মুখ কল্পনা করতেই তার মন জুড়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। ফারাবী ঠান্ডা গলায় বলল,
‘ এসব উল্টো পাল্টা প্রশ্ন আর করিস না ভাই।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে কিন্তু আমি লোকটাকে একবার দেখতে চাই। ’ মৃদুস্বরে কথাটা বলে মিশা ফারাবীর মুখ পানে চেয়ে রইল। ফারাবী কড়া গলায় শুধালো,
‘ কেন?’
মিশার ভাবলেশহীন জবাব, ‘ এমনি। ’
ফারাবী নিষ্প্রভ স্বরে জিজ্ঞাসা করল,‘ এমনি এমনি তো না, দেখে কী করবি সেটা আগে বল?’
মিশা নির্লিপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে বলল,
‘ যে লোক আমার বেস্ট ফ্রেন্ড নামক শাঁকচুন্নিকে প্রথম দেখাতেই বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে, তাকে একবার দেখা উচিত না আল্লাহ!’
ফারাবী হতবাক,স্তব্ধ। ফারাবী বুঝলো সে ক্ষেপে যাচ্ছে বলে মিশা আরো মজা নিচ্ছে। ফারাবী ব্যগ্র, অস্থির কণ্ঠে বলল,
‘ মিশা।’
মিশার নিরলস জবাব এলো,‘ জি।’
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে ফারাবী বলল, ‘ বাদ দে এসব ভাই।’
মিশা আঁড়চোখে ফারাবীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ ওকে দিলাম বাদ না।’
ফারাবী খুব ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘ মিশা। ’
‘ আচ্ছা দোস্ত, তুই কী লোকটা চিনিস? লোকটা কী তোকে আগে থেকেই চিনত,তা না হলে এমন একটা কথা প্রথম দেখাতেই কেউ বলে নাকি?’ মিশা এবার একটু গম্ভীর হয়ে কিছু ভাবার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল।
ফারাবী কিছু না ভেবেই সরাসরি উত্তর দিলো,
‘ আমিও সেটাই ভাবছি। আমি আগে কখনো ওনাকে দেখিনি।’ ফারাবী কথাটা বলতে বলতে নিজের হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। শান্ত কন্ঠে বলল,
‘ চল, উঠি। নাহলে ক্লাসে যেতে লেট হয়ে যাব।’
ফারাবী উঠল। তার সাথে মিশাও উঠে দাঁড়াল। তারা দুজনে বটগাছের শান্ত পরিবেশ ছেড়ে মূল বিল্ডিংয়ের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তাদের জুতার নিম্ন তলে পিষে যেতে লাগলো মাঠের সবুজ ঘাসগুলো।
‘আচ্ছা ফারাবী, একটা কথা বলি?’ মিশা হাঁটতে হাঁটতে রাশভারি গলায় শুধাল।
‘ হুম বল, তবে উল্টো পাল্টা কথা বাদে সব কিছু বলতে পারিস।’
‘সিরিয়াস কথা ভাই। ’ মিশা গাল ফুলিয়ে বলল। ফারাবী আনন্দপূর্ণ মেজাজে জিজ্ঞাসা করল,
‘ আচ্ছা বল বাবা।’
‘ তুই যদি এসব নিয়ে ভেবে বিরক্ত হতে থাকিস, তাহলে আর এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবিস না দোস্ত। লোকটা হয়তো তোর সাথে মজা করেছে। লোকটা ফ্ল্যাটবাজও হতে পারে, তুই তোর পড়াশোনায় মনোযোগ দে,এসব নিয়ে বেশি ভাবিস না। ঠিক আছে?’
ফারাবী মিশার দিকে তাকাল। সত্যিই তো, সে কেন এসব উল্টো পাল্টা জিনিস নিয়ে এত ভাবছে?লোকটার যা ইচ্ছা বলুক তাতে তার কী?
‘ আচ্ছা সব ভুলে গেলাম, শান্তি এবার?’
ফারাবী সামনের দিকে পা বাড়িয়ে মিহি স্বরে বলল।
‘ দ্যাটস লাইক মাই গার্ল।’ মিশা খুশি হয়ে ফারাবীর কাঁধে হাত রেখে সামনের দিকে হাঁটতে লাগল। তারা দুজনে একসাথে ক্লাসরুমে ঢুকল। ক্লাসে ঢোকার সময় আবারও ফারাবী পিছু থেকে শুনতে পেলো "আমাকে বিয়ে করবেন ফারাবী?" ফারাবী পিছু ঘুরে তাকাল কিন্তু সেখানে কেউ ছিলো না। থাকার কথাও না। ফারাবী নিজের কপালে নিজেই বাড়ি মারলো। মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘ ভুলে যা ফারাবী,ভুলে যা লোকটাকে।’
চলবে...
[কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ]