#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
১৩.
বারোটার দিকে করিম সাহেব ফারাবীকে মিশার বাসার সামনে নামিয়ে দিলো। মাথার উপর তখন সূর্যি মামা,সূর্যের আঁচ প্রখর। ফারাবী কাঁধের ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে সামনের বাড়িটাতে পা বাড়ালো। বাড়িটা বেশ বড়-সড়,তিনতলা। একতলা ভাড়া দেওয়া। দুইতলা আর তিনতলা নিয়ে মিশাদের বসবাস। কতবার এসেছে সে এই বাড়িতে। বাড়ির ভেতরে ঢুকে ফারাবী দূর-দূরান্তে দৃষ্টি দিলো। তার প্রাণ প্রিয় বান্ধবীর একটা বিদেশি জাতের কুত্তা আছে। যাকে সে মোটেও পছন্দ করে না। কুকুরটা বেশ অসভ্য,তাকে দেখলেই ঘেউ-ঘেউ করে ডাকা শুরু করে। একটা প্রবাদ আছে না, সেখানে বাঘের ভয় সেখানে সন্ধ্যা হয় ফারাবীর সাথেই তাই ঘটে। যখনই সে এই বাড়িতে আসে তখন মনে-মনে দোয়া করে যেনও কুত্তাটা তাকে দেখতে না পায় কিন্তু সেটা হলে তো! সবসময় কুত্তার তাকে দেখে চোর ধরার মতো তেড়েফুঁড়ে আসে ।
ফারাবী কান খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে রয়ল। বাসার ভেতর থেকে কুকুরটার ডাকার আওয়াজ পেলো। তার শরীর লোমগুলো দাঁড়িয়ে গেলো। সুন্দর বাসন্তিক একটা সকাল তার মাঠে মরে গেলো। ঝকঝকে আকাশে সাদা মেঘগুলো একপাশ থেকে অন্যপাশে যাচ্ছে। শুভ্র মেঘের ভেলা দেখাদিচ্ছে আকাশে। ফারাবী নিজেকে শান্ত করে সামনের গেটটা খুলে বাড়ির ভেতরে পা রাখল। মন্থর গতিতে সামনের দিকে এগালো। সামনে সুন্দর করে ফুলের বাগান করা। আজ মিশার সাথে সাফওয়ানের আনুষ্ঠানিক আংটি বদলেন দিন।
ফারাবী আসতে চাইছিলো না কিন্তু মেয়েটার জোরাজোরি আর আন্টির বারবার কল করার জন্য সে আসতে বাধ্য হলো। ফারাবী দরজায় কাছে দাঁড়িয়ে বেল দিল। অল্প সময়ের মধ্যে দরজা খুলে গেলো। মিশার মা দরজাটা খুললো। তিনি ফারাবীকে দেখে খুশি হয়ে গেলেন। বরাবরের মতোই আবেশিত চাহনি মেয়েটার দিকে নিক্ষেপ করল। মেয়েটাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। আদুরে কন্ঠে বলল,
‘ভেতরে এসো মা, কতদিন পর এলে। আম ভেবেছিলাম তুমি আসবে না। ’
ফারাবী ধীম স্বরে বলল,
‘ আপনি এতোবার বলেছেন আমি না এসে পারি কী করে। ’
মিশার মা ফারাবীর কপালে চুমু খেয়ে বলল,‘ লক্ষী মেয়ে। এসো ভেতরে এসো।’
মিশার মা তাকে ছেড়ে দিতেই ফারাবী সামনের দিকে পা বাড়ালো। ভেতরে ঢুকে দেখল মিশাদের ড্রয়িংরুমে অনেক মানুষ। জমজমাট একটা পরিবেশ। মিশার ভাইয়া, ভাবি, তাদের দুই বাচ্চা, মিশার বাবা, আর তাদের অনেক আত্মীয়স্বজন সবাই উপস্থিত এখানে। সবাই নির্বিঘ্নে নিজেদের মতো কাজ করছে, গল্প করছে, চা খাচ্চে, আবার দুষ্টু বাচ্চাদেরও সামলাচ্ছেও।
‘ ফারাবী আন্টি কেমন আছো?’ মিশার ছোট্ট ভাগ্নি রিমা ফারাবীকে দেখে দৌড়ে এসে ফারাবীকে জড়িয়ে ধরল।
‘ ভালো আছি মামণি। তুমি কেমন আছো?’
ফারাবী রিমাকে কোলে তুলে তার গোলুমোলু গালে একটা চুমা দিল।
‘ ভালো আছি, জানো আজ আমার ফুফুমণির বিয়ে হবে।’
রিমা খুশি হয়ে অনেকটা অবুঝের মতো বলল।
‘ আজ বিয়ে না সোনা, আজ তোকে শুধু আংটি পরানো হবে। বিয়ে আরো পরে হবে।’ ফারাবী রিমাকে কুতুকুতু দিতে-দিতে বলল। রিমা ফারাবীর কোলে হেসে গড়াগড়ি দেওয়ার মতো গড়িয়ে পরল। ফারাবীর গলার আওয়াজ শুনে মিশার ভাবি জুঁই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তিনি ফারাবীকে দেখে হাসলেন। এতোক্ষণ রান্নাঘরে থাকার ফলে তার মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচলে সেটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলল,
‘ ফারাবী, এসেছ তুমি? এসে খুব ভালো করেছো। মিশা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে; ওর রুমে যাও বোন। মেয়েটা সকাল থেকে খুব নার্ভাস হয়ে আছে।রুম থেকে বের হচ্ছে না পর্যন্ত। ’
‘ জি ভাবি, যাচ্ছি।’ ফারাবী একগাল হেঁসে জুঁইয়ের সাথে আরো একটু সময় কথা বলল তবে তাদের কথা বেশিক্ষণ চললো না রান্নাঘর থেকে জুঁইয়ের ডাক পড়ল। সে ফারাবীকে মিশার রুমে যেতে বলে রান্নাঘর চলে গেলো। ফারাবী রিমাকে নামিয়ে দিয়ে মিশার রুমের দিকে গেল। সে ধীর পায়ে মিশার রুমের কাছে আসল। মিশার রুমে ঢুকে দেখল মিশা বিছানায় বসে আছে। তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের সেলোয়ার-কামিজ । এখনো মেকআপ করেনি কিন্তু তবুও মেয়েটাকে দেখতে পরীর মতো লাগছে।
‘ মেকআপ না করেই তোকে খুব সুন্দর লাগছে। এভাবেই ভাইয়ার সামনে চলে যা। ’
ফারাবী মুগ্ধ দৃষ্টিতে মিশাকে দেখে বলল। মিশা ফারাবীকে দেখে অবাক হলো তবে মেয়েটার কথাগুলো শুনে লজ্জায় কিছু বলতে পারল না। ফারাবী মিশাকে লজ্জা পেতে দেখে হাসল। সে আরো দুষ্টুমি করে বলতে লাগল,
‘ দেখিস,সাফওয়ান ভাইয়া আজ তোকে দেখে পাগল হয়ে যাবে।’
ফারাবী এসে বিছানায় বসল। মিশা ফারাবীর পিঠে কিল বসিয়ে বলল,
‘উল্টো পাল্টা কথা বলা বন্ধ কর আর বল এতো দেরি করলি কেন?’
‘দেরি করলাম কই? তাড়াতাড়ি এসেছি। আচ্ছা তুই নাকি নার্ভাস হয়ে বসে আছিস? ’
‘ নার্ভাস হব কেন? ’
‘ ভাবি বললো তুই নাকি সকাল থেকে নার্ভাস ফিল করছিস।রুম থেকেও বের হচ্ছিস না।’ ফারাবী মিশার হাত ধরে নরম গলায় শুধালো। মিশা কোনো উত্তর দিলো না। উল্টো বলল,
‘ আমাকে কিন্তু তুই শাড়ি পড়িয়ে দিবি। ’
‘জি পরিয়ে দিব। তুই এতো চিন্তা করিস না।’
ফারাবী মিশার হাতে আলতো চাপড় দিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে তুললো। মিশা ফারাবীকে জড়িয়ে ধরল। দুই বান্ধবী কিছুক্ষণ এভাবেই থাকল। তারপর মিশা ফারাবীর কাঁধ থেকে মুখ তুলে শুধালো,
‘ আরাবী আপুকে আনিস নি কেন?’
‘ আপু একটা কাজের জন্য আসতে পারেনি রে।’
বন্ধুত্ব শব্দটা শুনতে ছোট হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। বন্ধুত্বের সাথে স্বার্থের কোনো সম্পর্কে নেই। বিশেষ করে দুজন নারীর মধ্যে যখন বন্ধুত্বের সৃষ্টি হয় তখন সেটা কেবল সখ্যতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রূপ নেয় ভালোবাসায়, বিশ্বাসে,একে-অপরের সুখ কামনায় ৷ আমাদের রক্তের সম্পর্ক প্রাকৃতিকভাবেই গড়ে ওঠে, কিন্তু বন্ধুত্ব আত্মার ঐশ্বরিক পছন্দ,যা মানুষ নিজেই নিজের জন্য খুঁজে নেয়। বন্ধু জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একজব ব্যক্তি যার কাছে নিজের সবটুকু বিষণ্ণতা আর ব্যর্থতা অকপটে উজার করে দেওয়া যায়, ভেঙে পড়ার পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া তার কাঁধে মাথা রেখে একটু শান্তির নিশ্বাস নেওয়া যায়। প্রকৃত বন্ধুত্বের মধ্যে অদ্ভূত এক ইন্দ্রজালিক ক্ষমতা থাকে,তারা সহস্র মাইল দূরে থেকেও কাছে থাকে। তারা ভিন্ন জগতের, ভিন্ন চিন্তা-ধারার মানুষ হয়েও এক থাকে। মিশা আর ফারাবীর মধ্যেও তেমন বন্ধুত্ব৷ দু'জনের পছন্দ থেকে শুরু করে আচার-আচরণ আলাদা হলেও তারা একে-অপরের ঐশ্বরিক পছন্দ।
ফারাবী আর মিশার কথা বলার মাঝে দরজায় টোকা পড়ল।
‘ দরজা খোলা আছে।’ মিশা মিহি স্বরে বলল।
মিশার কথা শুনে মিশার দুই চাচাতো বোন সামিহা আর তরী ঘরে ঢুকল। তারা সোফায় গিয়ে বসে পরে বলল,
‘ চাচি বললো তোমাকে তৈরি হয়ে নিতে। পাত্রপক্ষরা দুইটার পরে চলে আসবে।’
‘ ঠিক আছে, তোমাদের আপু তৈরি হয়ে যাবে তবে আগে বলো কেমন আছো তোমরা? আমি তোমাদের আপুর বেস্ট ফ্রেন্ড ফারাবী। ’
‘ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আপু, তুমি?’
‘ভালো,ভালো, আচ্ছা বেশি বকবক না করে চলো আমরা কাজ শুরু করি। শাড়ি কোথায় ওর? ’
‘ আলমারিতে।’
‘খুলবো আমি?’
‘এতো ঢং করার প্রয়োজন নেই।’
ফারাবী হেঁসে উঠল মিশার ব্যঙ্গ করে বলা কথাটা শুনে। সে উঠে আলমারি খুলল। সেখান থেকে সুন্দর একটা রাণী-গোলাপি জামদানী শাড়ি বের করে বিছানায় মেলে ধরল। সবাইকে উদ্দেশ্য করে শুধালো, ‘এটা কেমন লাগছে?’
‘ সুন্দর লাগছে আপি। মিশা আপিকে পড়ালে আরো সুন্দর লাগবে।’ সামিহা শাড়িটা স্পর্শ করল। সে শাড়িটা দেখতে দেখতে বলল।
‘ তাহলে এটাই পড়ায় কী বলো?’ ফারাবী সামিহাদেরকে শাড়িটা খুলে দেখিয়ে আবারও শুধাল।
‘পড়াও আপু। ’ তারা দুইজনে একসাথে উত্তর দিলো।
‘ওকে তাহলে তোমরা দুইজন এখন থেকে আমার এসিস্ট্যান্ট হয়ে যাও। আমরা তিনজনে মিলে এই শাঁকচুন্নিটাকে মানুষ মানিয়ে দি কী বলো?’
‘ জি,অবশ্যই ম্যাম।’
ফারাবীর কথায় তারা দুইজনে বেশ মজা পেলো তাই হেঁসেই মজা করে উত্তরটা দিল। ফারাবীও ওদের দুষ্টুমি দেখে মজা পেলো।
ফারাবী মিশাকে প্রথমে পেটিকোট আর ব্লাউজ পরিয়ে দিল;তারপর শাড়ি পরানোর পালা এলো। সে খুব যত্ন করে শাড়ির প্যাঁচ দিতে লাগল। প্রথমে কোমরে দুবার প্যাঁচ দিয়ে;তারপর সামনের দিকে সুন্দর করে প্লিট দিল। প্রতিটা প্লিট সমান সমান করে সাজিয়ে পিনের সাহায্যে আটকে দিল। সামিহারা তাকে সাহায্য করতে লাগল। মিশা ফারাবীর শাড়ি পড়ানোর সময় এদিক-সেদিক নড়তে লাগলো। কাজের সময় এমন ত্যাড়াব্যাড়া করলে ফারাবীর রাগ লাগে,এখনো লাগলো, সে মিশা ধমকে উঠে বলল,
‘ একটু সোজা হয়ে দাঁড়া আর একবার নড়লে তোকে তৈরি করে দিব না এভাবে ভাইয়ার সামনে যাবি।’
ফারাবীর বকা খেয়ে মিশা চোখ ছোট করে নিল। সে এবার চুপচাপ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রয়ল। ফারাবী শাড়ির বাকি অংশটা মিশার পিঠের চারপাশে একবার ঘুরিয়ে সামনে নিয়ে এল, তারপর খুব সুন্দর করে আঁচল সাজাতে লাগল। সব ছোট-ছোট কাজ শেষ করে আঁচলটা কাঁধে দিয়ে সুন্দর ভাবে গুছিয়ে দিল যাতে কারুকাজ করা দিকটা স্পষ্ট দেখা যায়।
শাড়ি পড়ানো শেষ করে ফারাবী মুখে সন্তুষ্টির হাসি নিয়ে মিশাকে শুধাল,
‘ সুন্দর হয়েছে?’
মিশার ছোট্ট জবাব এলো,
‘ খুব।’
‘ এবার মেকআপ। ’
সামিহা মেকআপ বক্সটা তুলে ফারাবীর হাতে দিল। ফারাবী মিশাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসাল। আয়নায় মিশা নিজেকে দেখল। শাড়ি পরার পর তাকে অন্যরকম সুন্দর লাগছে।ফারাবী প্রথমে মিশার মুখে প্রাইমার লাগাল,তারপর ফাউন্ডেশন। খুব হালকা হাতে ব্লেন্ড করে দিল যাতে দেখতে ভালো লাগে। মিশার ত্বক এমনিতেই ফর্সা, তাই খুব বেশি মেকআপের দরকার হলো না। সামিহারা চুলের কাজ করতে লাগল। মিশার লম্বা ঘন কালো চুল। তারা চুলগুলো আঁচড়ে নিয়ে সুন্দর করে খোঁপা বাঁধতে লাগল। চুলের নিচের দিকটা আলগা রেখে উপরের অংশটা টানটান করে বাঁধল। তারপর চুলে ফুলের গজরা পরিয়ে দিল। ফারাবী এরমধ্যে মিশার চোখে কাজল লাগাল;হালকা বাদামি আইশ্যাডো দিয়ে চোখ দুটোকে আরো সুন্দর করে তুললো, তারপর কালো আইলাইনার দিয়ে সুন্দর একটা উইং তৈরি করল।
‘ আহা বাবা,একদম নড়িস না তো। নষ্ট হয়ে যাবে। ’
আইলাইনার লাগানোর সময় ফারাবী মিশার নড়াচড়া দেখে বিরক্ত হয়ে বলল।
মিশা এবারও স্থির হয়ে বসার চেষ্টা করল। ফারাবী মিশার গালে হালকা গোলাপি ব্লাশ লাগাল; তারপর হাইলাইটার দিয়ে নাকের ডগা, কপালের মাঝখানে আর চোখের নিচে হাল্কা টান দিল। শেষে দুইটা গোলাপি রঙের লিপস্টিক একসাথে সুন্দর করে মিশিয়ে মিশার ঠোঁটে লাগলো। শাড়ির সাথে ভালো ম্যাচ করছে লিপস্টিকটা। সাহিমারা এবার মিশার গহনা নিয়ে এল। সেখানে নেকলেস, কানের দুল, মাথার টিকলি সব ছিলো।ফারাবী একে একে মিশাকে সব পরিয়ে দিল। ফারাবী নিজের কাজগুলো শেষ করে মিশার কাঁধে হাত রেখে বলল।
‘ হয়ে গেছে। ’
মিশা নিজেকে আয়নায় দেখল। তার মুখে স্নিগ্ধ একটা হাসি ফুটে উঠল।
‘ এবার চুড়িগুলো পরাতে হবে।’
ফারাবী চুড়ির বাক্সটা হাতে নিয়ে খুলল। সাদা আর গোলাপি রঙের চুড়ি বের করল। কাঁচের চুড়িগুলো হাতে তোলার ফলে চুড়ির ঝনঝন শব্দের সৃষ্টি হলো। ফারাবী মিশার হাতে একটা একটা করে চুড়ি পরিয়ে দিতে লাগল। এসব করতে করতে কখন সে দু'ঘন্টার বেশি সময় কেটে গেলো তারা কেউ টেরই পেলো না।ফারাবী নিজের ব্যাগ থেকে ছোট্ট একটা পারফিউম বের করে মিশার গলায় হালকা স্প্রে করল।
‘ এইটা আমার পক্ষ থেকে তোর গিফট।’
‘ ঘ্রাণটা অনেক সুন্দর। ’
‘ সুন্দর বলেই দিলাম, ভাইয়া ইন্ডিয়া গিয়েছিল সেখান থেকেই এনেছে।’
......
ছেলেপক্ষ আসার খবর পেয়ে ফারাবীরা মিশাকে নিয়ে নিচে নামল। ড্রয়িংরুমে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। ফারাবী সামনে আগাতেই মইনুল শেখকে দেখে চমকে উঠল। তার চোখ সোফায় বসে থাকা মইনুল শেখের দিকে আটকে গেলো,সবচেয়ে বড় কথা তার পাশেই আসমা শেখ,সাদমান, সাজিদ, সাহাদ। আর অন্য সোফায় সাফওয়ান, সায়ান। প্রায় একমাস পরে সে লোকটাকে দেখলো। লোকটার মাথায় এখন আর ব্যান্ডেজ নেই। কালো শার্টের লোকটাকে খুব সুদর্শন লাগছে। ফারাবী থমকে গেল। তার পা মাটির সাথে আঠা ছাড়াই আটকে যেতে সময় নিলো না। মিশা তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। ফারাবী দ্রুত মিশার হাত ধরে ফিসফিস করে বলল, ‘ মিশা।’
‘ হুম ?’ মিশা ঘুরে তাকাল ফারাবীর দিকে।
ফারাবী হাত কচলাতে কচলাতে ভীতু গলায় বলল,
‘ সেই লোকটা।’
মিশা ফারাবীর কথা বুঝতে না পেরে পুনরায় শুধালো,
‘ সেই লোকটা মানে?’
ফারাবী চোখ ছোট্ট করে বলল,
‘ আরে যে আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল সে এখানে। ’
‘ কই?কই?’ মিশা কৌতূহল হয়ে এদিকে ওদিকে তাকাল। তাদের বাড়িতে সেই লোক কী করে আসবে? ফারাবী সায়ানের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করল। মিশা ফারাবীর দেওয়া ইশারা ধরে সামনের দিকে তাকাতেই সায়ানকে দেখো। সে চোখ বড় করে আবার ফারাবীর দিকে তাকাল। মিশার বিশ্বাসই হচ্ছে না সায়ান ভাই তার বান্ধবীকে পছন্দ করে ।
‘উনি? ’
‘ হুম। কী হয় তোর?’
‘ উনি আমার খালাতো ভাই ।’
ফারাবী হকচকিয়ে উঠল। সে চোখ ছোট-ছোট করে মিনমিন করে বলল, ‘ কী?’
‘ ভাই তুই সায়ান ভাইয়াকে চিনিস না? ভাইয়া তো একজন ক্রিকেটার। জাতীয় দলে খেলে,বলতে গেলো সেলেব্রিটি মানুষ। টিভিতে কখনো দেখিস নাই? ’
মিশা ফারাবীর চোখমুখের অবস্থা দেখে ফিসফিস করে নরম গলায় বলল। ফারাবী হতভম্ব হয়ে গেল। ক্রিকেটের প্রতি তার তেমন আগ্রহ ঠিক তবুও ভাই আর আব্বুর সাথে কয়েকবার দেখেছে, লোকটাকেও মাঠে দেখেছে কিন্তু কখনো সেভাবে লক্ষ্য করেনি তাই তো লোকটাকে দেখে তার চেনা চেনা ঠেকত। ফারাবী আঁড়চোখে সোফায় বসে থাকা হাস্যজ্জ্বল সুদর্শন, সুঠাম দেহী, লোকটার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতায় পার করলো ফারাবী। তারপর আবারও অস্থির গলায় বলল,
‘মিশা কী করব এখন? আমি মোটেও লোকটার সামনে যাবো না। লোকটা পাগল আছে,মাথার সবগুলো তার ছ্যাড়া।’ ফারাবী ঘাবড়ে গিয়ে এপাশে-অপাশে তাকাল।
মিশা ফারাবীর চোখমুখের অবস্থা দেখে ফিসফিস করে নরম গলায় বলল,
‘ কী করবি মানে? কিছুই করবি না।স্বাভাবিক থাক।’
ফারাবী ভীতু চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়ল। ফারাবী অবাক হলো যে লোকটাকে দেখে এমন ভয় পাচ্ছে কেন? কাউকে দেখে ভয়ও যে মনে এমন ভাবে বাসা বাঁধতে পারে তা ফারাবী আজ জানলো।
অস্ফুট নড়ে উঠল মিশার দু ওষ্ঠ, সে ফিসফিস করল,
‘ তুই এমন ভয় পাচ্ছিস কেন ফারাবী? সায়ান ভাইয়া কিন্তু ভালো ছেলে। আমি তাকে চিনি। তুই যদি চাস তাহলে..’
মিশা দুষ্টুমি করে বলতে গেল কিন্তু ফারাবীর চোখ পাকানি দেখে আর কিছু বললো না। কথা বলার মাঝেই হোঁচট খেলো। ফারাবীর রেষপূর্ণ চক্ষুদ্বয়ের চাহনি দেখে মিশা মিহি গলায় আওড়াল,
‘ সরি।’
মিশার নরম দৃষ্টি দেখে ফারাবী রাগ করে থাকতে পারলো না। মিনিট কয়েক কাটতেই সূক্ষ্ম নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
‘ ঠিক আছে যা, ভেরতে যা। ’
‘ আমার সাথে তুইও চল।’
মিশার কথায় ফারাবীর কর্ণকুহরে আসতেই সে না-তে মাথা নড়ল। মিশা মেয়েটার দিকে চোখ পাকালো কিন্তু কাজ হলো না ফারাবী সেখানেই দাঁড়িয়ে রয়ল। মিশা দুর্বল গলায় তাকে আসতে বলল কিন্তু কাজ হলো না। ফারাবীর মনে চাচ্ছে এখনই এখান থেকে পালিয়ে যেতে। মিশাকে তার অন্য কাজিনরা মিলে ভিতরে নিয়ে আসল।
মিশাকে সবাই মিলে নিয়ে গিয়ে সাফওয়ানের পাশের ফাঁকা যায়গায় বসিয়ে দিল। সাফওয়ান গম্ভীর, নিশ্চল ভাবে বসে আছে। চোয়াল শক্ত, ঠোঁট দুটো চেপে রাখা, চোখ দুটোও সামনের দিকে স্থির। সাফওয়ানে পাশে এভাবে বসে তার লজ্জা লাগলো৷ লজ্জায় গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে গেল। মিশা মাথা নিচু করে বসে রয়ল৷ সকালের অলক্ষ্যে আঙুল দিয়ে শাড়ির আঁচলটা পেঁচিয়ে ধরল। কানের লতি পর্যন্ত তার গরম হয়ে গেছে। চোখ দুটো নামানো, কিন্তু মাঝে মাঝে চোখের কোণ দিয়ে সাফওয়ানের দিকে একবার তাকাচ্ছে, আবার তৎক্ষণাৎ চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। লজ্জায় তার বুকটা কাঁপছে৷ আবার খুব সূক্ষ্মভাবে ভালোলাগারাও কাজ করছে। মিশার মধ্যে মিশ্র অনুভূতি কাজ করলেও সাফওয়ানের মাঝে তেমন কিছুই কাজ করলো না। সে একটুও নড়ল না পর্যন্ত।একবারও মুখ ফিরিয়ে মিশার দিকে তাকাল না। দুজনেই চুপ। দুজনেই একে অপরের খুব কাছে তবু তাদের মাঝের দূরত্বটা আকাশছোঁয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।
সাফওয়ানকে নিরলস মুখে বসে থাকতে দেখে সায়ানের মোটেও ভালো লাগলো না। সে প্রসন্ন চিত্তে সাফওয়ানের সাথে মিশে গিয়ে বউ ভাইয়ের কানের কাছে ফিসফিসে বলে দিল,
‘এভাবে মুখ করে বসে আছিস কেন? কেউ কী তোকে করলার রস খাওয়ায় দিয়েছে? মাশাআল্লাহ মিশা আর কত সুন্দর লাগছে একবার দেখতো। ’
সাফওয়ান অসন্তুষ্ট পূর্ণ চাহনি সায়ানের দিকে দিলো। সেও দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
‘আমাকে জ্ঞান না দিয়ে তুই নিজে চুপচাপ বস।’
সাফওয়ানের রেষ পূর্ণ কথা সায়ানের গায়ে লাগলো না। সে আবারও কিছু একটা ফিসফিস করে সাফওয়ানের কানে বলল। সাফওয়ান চোখ পাকিয়ে সায়ানের দিকে তাকাল।
এদিকে জুঁই ভাবি উপরে যাচ্ছিলো। তিনি ফারাবীকে আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এসে বলল,
‘ তুমি এখানে দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো, সবার সাথে গিয়ে দাঁড়াও।’
‘ না না ভাবি, তার কোনো দরকার নেই। আমি...’
ফারাবী হকচকিয়ে আরো কিছু বলতে গেল কিন্তু জুঁই তার হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে ভেতরে চলে আসল৷ সামনের দিকে আগাতেই আগাতেই বলল,
‘ এসো এসো। লজ্জা কীসের?’
ফারাবী এখন আর কিছু করতে পারল না। জুঁই তাকে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে নিয়ে আসল। সবাই তার দিকে তাকাল। জুঁই ফারাবীকে মিশার পাশে যেতে বলল। ফারাবী কোনো দিকে না তাকিয়ে সেদিকে চলে গেলো। সে গিয়ে সোফার পিছনে মিশার পাশে দাঁড়াল। আসমা শেখ এখানে ফারাবীকে দেখে অবাক হলো। তিনি বিষ্ময়কর গলাতে ভ্রুঁ কুঁচকে শুধালো,
‘ জুঁই মেয়েটাকে? ’
‘ও ফারাবী খালা, মিশার বেস্ট ফ্রেন্ড।’
আসমা শেখ চোখ তুলে ফারাবীর দিকে তাকাল। সেদিনের পরে মেয়েটার সাথে আর দেখা হয়নি তার। আজ এখানে হুট করে মেয়েটাকে দেখতে পেরে আসমা শেখের চোখগুলো চকচক করে উঠল। মইনুল শেখ সহ সকলেই চোখ তুলে ফারাবীকে দেখো। তারাও অবাক হলো তবে তার থেকে বেশি খুশি হলো। আসমা শেখ ফারাবীর দিকে তাকিয়ে নরম গলায় আওড়ালো,
‘দেখো আমাদের আবারও দেখা হয়ে গেলো।’
‘জি আন্টি।’
সবাই অবাক হয়ে ফারাবীর দিকে তাকাল। মিশার বাবা-মা, ভাইয়া, সবাই জানতে চাইল তারা ফারাবীকে কী করে চেনে। মইনুল শেখ আস্তে-আস্তে ফরাবী আর আরাবীদের সব কাহিনি খুলে বলল। মিশাও মাথা নিচু করে এক এক করে সব শুনে গেলো। আসমা শেখ ফারাবীর হাত ধরে তাকে নিজের পাশের সোফায় বসালেন।
‘ এসো মা, আমার পাশে বসো।’
ফারাবী কিছু বললো না। সে বসল। সে চোখ নিচু করে রয়ল। সে জানে সায়ান তার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু সে তার দিকে তাকাতে পারছে না, সে লোকটার দিকে তাকাতেই চাচ্ছে না। তার শরীর জুড়ে আন্দোলন শুরু হলো। সায়ান কিঞ্চিৎ ঘাড় বাঁকিয়ে পাশে চাইতেই নিষ্পলক দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়ল। সায়ান ক্ষীণ বাঁকালো নিজের অধর কার্নিশ। ফারাবী আঁড়চোখে লোকটাকে দেখতেই হকচকিয়ে গেলো। তার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেলো। এলোমেলো দৃষ্টিতে আশেপাশে চায়ল। আসমা শেখ অপলক দৃষ্টিতে ফারাবীকে দেখে জানতে চায়ল,
‘ আরাবী কেমন আছে মা?’
‘আপু ভালো আছে আন্টি। ’ ফারাবী নিচু কন্ঠে বলল।
চলবে...
[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ]