#প্রিয়_অক্টোবর
#সাদিয়া_তাসনিম
২২.
মেডিকেল কলেজের তৃতীয় তলার নিজেদের ক্লাসরুমে বসে আছে মিশারা। তাদের ক্লাস রুমটা বেশ বড় , সারি সারি বেঞ্চ সাজানো, সামনে হোয়াইট বোর্ড। প্রফেসর ড. রহমান তাদের পড়াচ্ছেন। কার্ডিওলজির ক্লাস। সকলে মনোযোগ দিয়ে তার ক্লাস শুনছে।ফারাবী আর মিশা পাশাপাশি বসে আছে। ফারাবীর সামনেই বইটা খোলা, কিন্তু তার মন অন্য কোথাও। গতকালের ঘটনাগুলো বারবার তার মাথায় উঁকি দিচ্ছে। কালের ঘটনাগুলো মনে পড়েই তার নিশ্বাসটা উত্থাল হয়ে উঠছে। কাল লোকটার সামনে তার মরে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল। সে এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না। ঘটনাটা মাথা চাঁড়া দিয়ে উঠলেই শিরায়-শিরায় ছুটছে রক্তের স্রোত। কালের পর থেকে একদম শান্তি পাচ্ছে না সে। চোখ বন্ধ করে কতবার নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করেছে কিন্তু কই কোনো লাভই হচ্ছে না। সে রাতের ঘটনা থেকে বের হতে পাচ্ছে না।
'ফারাবী।' মিশা কনুই দিয়ে তাকে খোঁচা দিল।
ফারাবী চমকে উঠল। 'কী?'
' মন কোথায় তোর? প্রফেসর তোকে ডাকছে গরু।' মিশা ফিসফিস করে সমানের দিকে তাকিয়ে বলল।
ফারাবী তাড়াতাড়ি সামনে তাকাল। প্রফেসর রহমান তার দিকে তাকিয়ে আছেন। ফারাবীকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে তিনি বললেন,
'মিস ফারাবী, আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করেছি।'
প্রফেসর রহমান গলা গম্ভীর হয়ে আসল। তিনি মেয়েটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিলেন।
ফারাবী উঠে দাঁড়াল। সে মিথ্যা বলে কোনো লাভ হবে না বলে সরাসরি বলল,
'স-স্যরি স্যার। আমি আসলে শুনতে পাইনি।'
'শুনতে পাননি? নাকি আপনার মনোযোগ এখানে নেই?'
প্রফেসর রহমান এক ভ্রু উঁচু করে বললেন। ক্লাসের সবাই মিটমিট করে হাসল। ফারাবীর মুখ লাল হয়ে গেল। সে নিজের মাথা নিচু করে নিল। তার বুকটা ঢিপঢিপ করতে লাগল। সকলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে নিজের দোষ স্বীকার করে আবারও বলল,
'স্যরি স্যার।'
ফারাবী মাথা নিচু করে নিল। এতোক্ষণ ধরে রাখা নিশ্বাসটা ছাড়ার চেষ্টা করল কিন্তু পাড়লো না।
'ঠিক আছে। বসুন। কিন্তু পরের বার মনোযোগ দেবেন।' প্রফেসর রহমান নিজেকে স্থির করে বললেন।
ফারাবী মাথা নাড়িয়ে বসে পড়ল। এতোক্ষণে ধরে রাখা নিশ্বাসটা ছেড়ে চুপচাপ বসল। মিশা তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
' কী হয়েছে তোর?'
'কিছু না, কী হবে আবার?'
' তোকে দেখে মনে হচ্ছে কিছু হয়েছে।'
' পাগল একটা কী হবে? চুপচাপ ক্লাসে মনোযোগ দে নাহলে স্যার এবার ক্লাস থেকেই বের করে দিবে।'
মিশা কপালে ভাঁজ ফেলে মেয়েটার কথা শুনলো। সে আর কথা বাড়ালো না, বাকি ক্লাসটায় ফারাবী আর সে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করল।
তাদের ক্লাস শেষ হলো। মিশা নিজের হাত ঘড়ির দিকে নজর দিলো। পরের ক্লাস শুরু হতে এখনো সময় আছে।
'চল, বাইরে যাই।'
মিশার কথা শুনে ফারাবী উঠে দাঁড়াল। দুজনে ব্যাগ নিয়ে ক্লাসরুম থেকে বের হলো। করিডর দিয়ে হাঁটতে লাগল। মিশা এবার জিজ্ঞাসা করল,
'এখন বল, কী হয়েছে তোর?'
' কী হবে ভাই?কিছু না। '
' তাহলে মুখটা এমন হয়ে আছে কেন?'
' কেমন?'
' প্রাণহীন প্রাণহীন। '
' আজ শরীরটা একটু ক্লান্ত লাগছে তাই হয়তো।'
'মিথ্যে বলিস না।'
' আরে।'
'আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড ভাই। তোর চোখ দেখেই বুঝতে পারছি কিছু একটা হয়েছে। কী হয়েছে বল আমাকে?'
ফারাবী একটু ভয়,একটু জড়তা নিয়ে মিশার দিকে তাকাল। মিশার চোখমুখে নিজের জন্য উদ্বেগ দেখে খারাপ লাগল। সে কী করবে বুঝতে পারলো না। দুদিন পরে লোকটা মিশার দেবর হবে এখন লোকটাকে নিয়ে এসব বলবে? কালও সে লোকটার কোনো প্রস্তাবে হ্যাঁ না কিছুই বলেনি। ফারাবী লোকটা কোনো উত্তর দিতে পারছে না। সরাসরি নাও বলতে পারছে না,আবার হ্যাঁ বলতে পারছে না। মিশা একবার মেয়েটার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে চুপ হয়ে গেলো। সে ফারাবীকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করবে না বলে মনস্থির করল। হয়তো এমন কিছু হয়েছে যা সে তাকেও বলতে চাচ্ছে না। সে ফারাবীকে সময় দিয়ে নম্রভাবে বলল,
'আচ্ছা শোন, তোকে একটা কথা বলার ছিল।'
'কী?'
'আজ সকালে আমার বড় খালামণি অর্থাৎ সাফওয়ানে আম্মু ফোন করেছিল। '
'তো?'
ফারাবী মিশার কথা বুঝতে পারল না।
' খালামণি তোদের বাসার ঠিকানা নিয়েছেন। আর তোর মায়ের নম্বরও।'
ফারাবীর চোখ বড় হয়ে গেল। সে বুঝলো সায়ান হয়তো তার মাকে কিছু বুঝিয়েছে।
'কেন?'
মিশা সব জানার স্বত্বেও ফারাবীকে মিথ্যা বলল,
' জানি না, হয়তো তারা তোদের বাড়িতে যাবে।'
কথাটা শুনে ফারাবী হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
' কেন ?'
' জানি না, গেলেই দেখিস।'
ফারাবী কিছু বলতে পারল না। তার মাথা ঘুরতে লাগল। লোকটা কী পাগলামো শুরু করলো?
........
তাসনিফা সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজটা পড়ে রান্নাঘরে এসে চা বানাতে লাগল। তার হাতে বাবার ওষুধের ছোট্ট একটা ব্যাগ । প্রতিদিন সকালে খালি পেটে বাবাকে ওষুধ খাওয়াতে হয়। সেই কাজটা তাসনিফাই নিয়ে নিয়েছে। এটা এখন তার রুটিন হয়ে গেছে। সে চা তৈরি করে একটা ট্রেতে চায়ের কাপ, পানির গ্লাস, আর ওষুধগুলো নিয়ে নিল। তার বাবার নাকি তার হাতের চা খেতেই ভালো লাগে, তাসনিয়া বানিয়ে দিলে খায় তবে তৃপ্তি করে শুধু তাসনিফার হাতেরটা খাই তাই তো তাসনিফা চা করে।
তাসনিয়া চায়ের কাপগুলো নিয়ে ধীরে ধীরে তার বাবার রুমের চলে আসল। তাসনিয়া সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্থ। মনিরুল ইসলাম সেই কোন ভোর থেকেই জেগে আছেন। বিছানায় হেলান দিয়ে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে। রাতে ভালো ঘুম হয়নি, এখন আর ঘুম আসে না তার।
'বাবা, জেগে গেছো?'
তাসনিফা ঘরে ঢুকে মৃদু গলায় জিজ্ঞাসা করল।
মনিরুল ইসলাম মেয়ের দিকে তাকালেন। হালকা হেঁসে বললেন,
'হ্যাঁ রে মা উঠে গিয়েছি। '
'রাতে কেমন ঘুম হয়েছে?'
তাসনিফা ট্রেটা টেবিলে রেখে বাবার কাছে বসল। বাবার হাতটা নিজের হাতের মধ্যে পুরে নিল।
' হয়েছে একটু।'
মনিরুল ইসলাম মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন।
তাসনিফা বুঝতে পারল বাবার ভালো ঘুম হয়নি। তাসনিফার মুখটা দেখে মনিরুল ইসলাম মুখ ছোট করে নিলেন। তার জন্য তার বাচ্চা গুলোর কত কষ্ট, বাবা হিসাবে সে সারাজীবন এদের শুধু কষ্টই দিয়ে এসেছে৷ বাচ্চাগুলোকে কষ্ট না দেওয়ার জন্য অল্প বাক্য খরচ করে তবুও ছেলেমেয়েরা কী করে তার কষ্ট বুঝে নেই তিনি বুঝেন না। তাসনিফা ওষুধগুলো তার হাতে তুলে দিয়ে পানির গ্লাসটাও এগিয়ে দিলো।
'আব্বু,খেয়ে খাও। তারপর চা খাবে।'
মনিরুল ইসলাম একবার ওষুধগুলো পানে তাকিয়ে সেগুলো তাসনিফার হাত থেকে নিয়ে নিল। ওষুধ গুলে খেয়ে নিলো। তাসনিফা চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলো। মনিরুল ইসলাম সেটা খেতে লাগলো। তাসনিফা একটা মলম নিয়ে সেটা তার বাবার পুরো শরীরে লাগিয়ে দিতে লাগল।
হঠাৎ করেই মনিরুল ইসলাম কাশতে শুরু করলেন।প্রথমে হালকা কাশি শুরু হলো। তারপর জোরাল৷ তার কাশিটা থামছেই না। তাসনিফা উঠে তার বাবার পিঠে হাত বোলাতে লাগলো। কাশি কমবার নাম না করে আরো বাড়তে লাগল। মনিরুল ইসলাম মুখে হাত চাপা দিয়ে কাশতে লাগলেন। তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগল।
তাসনিফা এবার ভয় পেয়ে গেল।
' আব্বু, কী হচ্ছে তোমার?'
বাবার এমন অবস্থা দেখে তাসনিফা ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে এলো। সে তাড়াতাড়ি পানির গ্লাসটা তুলে মনিরুল ইসলামের মুখের কাছে ধরল কিন্তু মনিরুল ইসলাম পানি খেতে পারছেন না। তার কাশি যে মোটেও থামছে না,প্রচণ্ড কাশছেন তিনি।
'আব্বু একটু পানি খাও।'
তাসনিফা আতঙ্কিত হয়ে বলল। মনিরুল ইসলাম পানির গ্লাস হাতে তুলে নিলেও কাজ হলো না। মনিরুল ইসলাম কাশি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেলেন। এখন তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। তাসনিফা বাবাকে এমনটা করতে দেখে ভয় পেয়ে গেলো। তাসনিফা এখানে আর দাঁড়াতে পারল না। সে দরজার দিকে দৌড়াল। প্রায় চিৎকার করে সবাইকে ডাকল,
'ভাইয়া! তাসনিয়া! আব্বুর রুমে তাড়াতাড়ি আসো।'
তার চিৎকার শুনে মুরাদ আর তাসনিয়া দুজনেই ছুটে এল। তারা তাসনিফার কণ্ঠে আতঙ্ক শুনতে পেয়েছিল।
'কী হয়েছে?' মুরাদ ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল।
'দেখো আব্বুর কী হচ্ছে,কাশি থামছেই না।' তাসনিফা কাঁদো কাঁদো গলায় বলে দিল।মুরাদ তাড়াতাড়ি বাবার রুমে ঢুকল। তাসনিয়াও পিছু পিছু এল। মনিরুল ইসলামকে দেখে তারা দুজনেই চিন্তিত হয়ে পড়ল। মনিরুল ইসলাম কাশতে কাশতে প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছেন। জোরে জোরে দম নিচ্ছে, হয়তো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মনিরুল ইসলামকে জোরে জোরে শ্বাস নিতে দেখে। মুরাদ বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
'আব্বু আস্তে আস্তে শ্বাস নেও। '
এবার তাসনিয়া পানির গ্লাস তুলে বাবার মুখের কাছে ধরল।
'আব্বু, একটু পানি খাও।'
মনিরুল ইসলাম কোনোমতে কাশি থামিয়ে একটু পানি খেলেন তবে এবার তার বুকে ব্যথা উঠেছে,তিনি বুকে হাত দিলেন। মুরাদ সেটা দেখে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল,
'বুকে ব্যথা করছে?'
মনিরুল ইসলাম মাথা নাড়লেন।
মুরাদ তাসনিয়ার দিকে তাকাল। তাদের চোখে চোখ পড়ল। তাসনিফা তার ভাই আর বোনকে
'তুমি শুয়ে পড়ো,একটু বিশ্রাম নাও।'
মুরাদ বাবাকে শুইয়ে দিতে সাহায্য করল।মনিরুল ইসলাম বিছানায় শুয়ে পড়লেন। তার শ্বাস এখনো ভারী। বুক ওঠানামা করছে।তাসনিফা বাবার পাশে বসে তার হাত ধরে রইল। তার চোখে পানি।
' আব্বু এখন কেমন লাগছে?'
'ভালো।'
মনিরুল ইসলাম কোনোমতে বললেন। মুরাদ রুম থেকে বের হয়ে তাসনিয়াকে ইশারা করল। তাসনিয়া তার সাথে বাইরে এল। তাসনিফাও আসল।
'ভাইয়া কী বুঝলে?'
তাসনিয়া ড্রয়িং রুমে আসতেই চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল। মুরাদ ছোট্ট করে শ্বাস নিয়ে বলল,
' আমি ভাবছি আজই আব্বুকে ডাক্তার দেখাব।'
'কিন্তু, খরচ?'
তাসনিফা দ্বিধা নিয়ে বলল।
মুরাদ বোনের দিকে তাকাল। আলতো করে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
'খরচের চিন্তা করিস না। আমার কাছে কিছু সেভিংস আছে। সেটা দিয়েই হবে আর যদি না হয় তাহলে ধার করব। কিন্তু এখনই আব্বুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে।'
তাসনিয়া মাথা নাড়ল। তাসনিফা ছোট্ট করে বলল,
'ঠিক আছে ভাইয়া।'
চলবে...
[ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]