ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রিয় অক্টোবর

৩৯তম পর্ব

লেখক: সাদিয়া তাসনিম

#প্রিয়_অক্টোবর

#সাদিয়া_তাসনিম

৩৯.

বারান্দার রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে সাজিদ। তার মাথার উপরে বিস্তৃত রাতের বিশাল আকাশ। রাতের আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করেছে। দীর্ঘদেহি সাজিদ সাদা রংয়ের একটা শার্ট পড়ে দাঁড়িয়ে আছে যার সবগুলো বোতাম খোলা। আজ সারাদিনের ক্লান্তি, দৌড়ঝাপে ছেলেটার মুখ শুকিয়ে আছে। মেজাজটাও খুব খিটখিটে। সাজিদের মনের ভেতরে একটা ভয়ঙ্কর দ্বন্দ্ব চলছে। একটা মানসিক যুদ্ধ বলা যায়। দুটো চিন্তা কাল থেকে তার মাথার ভেতরে ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিকে রিফাতের কাছে হেরে যাওয়ার চিন্তা। অন্যদিকে তাসনিয়াকে কীভাবে রিফাতের হাত থেকে বাঁচাবে, কীভাবে তাকে রিফাতের জাল থেকে বের করবে, সেই চিন্তা। সে গেমটা খেললেও কোনো এক কারণে মেয়েটার কোনো প্রকার ক্ষতি করার চিন্তা সে করেনি। তাসনিয়া ক্লাসে কয়েকবার লক্ষ্য করেছিলো। সে মেয়েটাকে দেখে মনে করেছিলো মেয়েটা রিফাতের সাথে দূরত্ব বজায় রাখবে। রিফাত উল্টো পাল্টা কিছু করলেও সে এসব থেকে দূরে থাকবে কিন্তু? সে ভুল ভেবেছিলো। মেয়েটাকেও ভুল চিনেছিলো। জীবনে প্রথমবারের মতো সাজিদ নিজেকে অন্য কারোর সামনে হারতে দেখছে। অদ্ভুত এক অনুভূতির মুখোমুখি হচ্ছে সে। সাজিদ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। সে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করল। সাদা রঙের প্যাকেটটা খুলে একটা দামী সিগারেট বের করল। সিগারেটটা তার আঙুলের মধ্যে ধরে ঠোঁটের মাঝে রাখল। তারপর অন্য পকেট থেকে লাইটারটা বের করে সিগারেটটা ধরালো, সেটাতে কয়েকটা টান দিল। কয়েকবার টান দেওয়ার পরে ধীরে-ধীরে ধোঁয়াগুলো মুখ থেকে ছেড়ে দিল। সাদা ধোঁয়াগুলো সাজিদের মুখ থেকে বের হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সে প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে সামনের দিকে নিজের শূন্য দৃষ্টি ছেড়ে দিলো। ঠিক সেই মুহূর্তে তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। রিং টোনের শব্দে সাজিদ সিগারেট ধোঁয়া ছেড়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকাল। স্ক্রিনের নাম্বারটা অচেনা। সে কলটা রিসিভ করল।

' হ্যালো।'

'হ্যালো কী খবর? চিনতে পেরেছিস নাকি পরিচয় দিতে হবে?'

ফোনের ওপাশ থেকে রিফাতের গলা শুনে সাজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তার দাঁতগুলো পরস্পরের সাথে লেগে গেলো, চোখ দুটো সরু হয়ে গেল। কপাল কুঁচকে গেছে। নিচের ঠোঁটে দাঁত বসিয়ে খিঁচে আছে সে। তপ্ত মেজাজ নিয়েই বলল,

'এতো হেয়ালি না করে বল কী বলবি?'

সাজিদের রিফাতের হেয়ালি পছন্দ হলো না। সে সোজাসুজি প্রশ্ন করল।

' আরে ভাই কুল, রেগে আছিস নাকি?'

ফোনের ওপাশ থেকে রিফাত নিজের ডান ভ্রুখানা সামান্য উঁচু করে ভালো মেজাজে বলল।

' কার উপর?' সাজিদ বিরক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল।

' আমার।'

রিফাত ওপাশ থেকে হেঁসে বলল।

'ফালতু লোকজনের উপর রাগ করার সময় নেই।' সাজিদ এতোটাই ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল যেন রিফাত তার জীবনে কোনো গুরুত্বই রাখে না।

'তা ভালো। আচ্ছা শোন, তোকে একটা কথা বলার আছে। আসলে, তোকে একটা খবর দিতে কল করলাম।'

রিফাত ভারি দম টেনে বলল। সাজিদ রিফাতের কথা শুনে চুপ করে রইল। সে অপেক্ষা করতে লাগল রিফাত কী বলে সেটা শোনার জন্য। তার হাতের সিগারেটটা ধীরে ধীরে জ্বলছিল। সিগারেটটা মুখে দেওয়ার আর ইচ্ছে রইলো না তার। সিগারেটে আগুন জ্বলতে-জ্বলতে সেটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। ধোঁয়াগুলো উড়ে যাচ্ছে বাতাসে।

' কাল ঠিক সময়ে ভার্সিটিতে চলে আসিস। '

সাজিদের হাতে ধরা সিগারেটটা সে ঠোঁটের কাছে নিলো। আরেকটা টান দিল। রিফাতের বলা কথাটার মানে খুঁজে পেলো না।

' তোর কথায় যাবো নাকি?'

সাজিদ মেজাজ খিঁচে উত্তর দিল।

'কাল আমি তাসনিয়াকে সবার সামনে প্রপোজ করব ভাবছি। আমি চাই সবাই সেই দেখুক, তুইও, তোর বন্ধুরাও। এই বলার ছিলো। তাড়াতাড়ি আসিস ভাই। আর হ্যাঁ, তুই আর তোর বন্ধুরা ক্যান্টিন ছেড়ে দেওয়ার জন্য রেডি থাক। কারণ কাল থেকে ক্যান্টিন আমার থাকবো। তোদের জায়গায় আমরা বসব ডিয়ার তো বি রেডি। '

সাজিদ এতোক্ষণ রিফাতের বকবক গুলো শুনে দাঁতে দাঁত পিষল। তার চোয়ালের মাংসপেশি শক্ত হয়ে গেল, সারা শরীর কাঁপতে লাগলো। ক্রোধে তার রক্ত গরম হওয়ার উপক্রম হলো। হাতের মুঠো বন্ধ হয়ে গেল,যার ফলে সিগারেটটা কুঁচকে গেছে। রিফাত কল কেটে রেখে দিয়েছে। সাজিদ ফোনটা রেখে দিলো। রাগে, ক্ষোভে, অপমানে তার শরীর কাঁপছে। এমন অপমান সে জীবনে কখনো সহ্য করেনি। রাগে সাজিদের মাথা গরম হয়ে গেল। সে সিগারেটটা জোরে ছুঁড়ে ফেলে দিল নিচে। সিগারেটটা নিচে পড়ে গিয়ে একটু পরেই নিভে গেল। রাগে সাজিদ দুই হাত দিয়ে রেলিং শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের শিরা ফুলে উঠল। তার মাথায় রক্ত উঠে যাচ্ছে। সে রাগে গড়গড় করতে লাগলো। তার মস্তিষ্ক কাজ করছে না। ঠিক তখন আবারও তার ফোনটা বেজে উঠল। সাজিদ ফোনটা তুলে নিল। এবার রাফি কল করছে। সাজিদ বিরক্তি নিয়ে কল রিসিভ করল।

' বল।'

সাজিদ সংক্ষিপ্ত গলায় বলল।

'সাজিদ, আমি আর তানভীর কনফারেন্স কলে আছি। একটা কথা আছে।'

'বল শুনছি।'

' রিফাত কল করেছিল তোকে?'

তানভীর জিজ্ঞেস করল।

' হ্যাঁ। করেছিল।'

'আমাদেরকেও করেছিলো। কী বলেছে তোকে?'

রাফি উৎসুক গলায় জিজ্ঞেস করল। সাজিদ গভীর শ্বাস নিল সবটা তাদের জানিয়ে দিল।

রাফি দাঁতে দাঁত চেপে সবটা শুনলো। সে রাগে ফেটে পড়ল।

' এই শালার দেখি,পাখা গজাইয়াছে। সাজিদ,আমাদের কিছু একটা করতে হবে। আমরা ওদের সামনে কিছুতেই হারতে পারি না। কিছু একটা কর ভাই। কিছু একটা কর। '

' কী করবো বা*?'

'যা করার দরকার তাই কর। আমরা ওদের কাছে হারলে মানসম্মান সব শেষ। আমরা তোর সাথে আছি যা বলবি তাই করব। শুধু কোনো প্ল্যানিং কর। '

' চুপ কর তো এমনিতেই মাথা গরম হয়ে আছে। তোরা আবার ঘ্যানঘ্যান করছিস।'

' ঘ্যানঘ্যান না সাজিদ আমাদের হাতে আর সময় নেই।'

রাফি চিন্তিত হয়ে নখ কামড়াতে কামড়াতে বলল।

' এক রাতের মধ্যে আমি কী করবো তোরাই বল?'

' চল একটা কাজ করি।'

তানভীর কিছু একটা ভেবে বলল।

' কী কাজ?'

' শালা রিফাতরে তুলে আনি তাহলে আর প্রপোজ করতে পারবে না।'

' পাগল তুই? প্রপোজ করা আর না করা নিয়ে আমাদের কী? আমরা গেমটা কীভাবে জিতব সেটা ভাব। '

সাজিদ বিরক্ত হয়ে চিটচিটে গলায় বলল।

ওপাশ থেকে রাফি আর তানভীর দুজনে চুপ হয়ে গেলো।

'আচ্ছা,এতো ঘ্যানঘ্যান না করে ফোনটা রাখ। এমনিতেই সারাদিন ঝামেলার মধ্যে ছিলাম। মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করতে দে। '

' মাথা ঠান্ডা করে চিন্তা কর আমরা তোর সাথে আছি। যে সিদ্ধান্তই নিস না কেন, আমরা তোকে সাপোর্ট করব।'

রাফি সাজিদকে সান্ত্বনা দিতে কথাটা বলল।

' কী হয়েছে তোর?'

তানভীর জিজ্ঞেস করল।

' কাল ভার্সিটিতে এসে বলছি। এখন ফোনটা রাখ।'

বলেই সাজিদ কলটা কেটে দিল। সাজিদ রেলিং-এ ঝুঁকে কিছু ভাবতে লাগলো । এই কয়েক মিনিটের মধ্যে তার মাথায় একটা ভয়ংকর পরিকল্পনা এলো। পরিকল্পনা এমন যে এর মাধ্যেমে অনেককিছু বদলে যাবে। যেটা তাদেরকে জিতিয়ে দিবে৷ সাজিদের ঠোঁটের কোণে এক ভয়ঙ্কর হাসি ফুটে উঠল।এখন সে জানে তাকে ঠিক কী করতে হবে।

.......

ভার্সিটিতে যাওয়ার উদ্দেশ্য তাসনিয়া বাসা থেকে বের হলো। শহরের এই বড় রাস্তায় মানুষজনের অনেক ভিড়। সবাই নিজেদের গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে। সে বড় রাস্তা থেকে উল্টো ঘুরে সামনের শুনশান গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। বাকহীন,নির্জন রাস্তা, জনমানবহীন শূন্য। এই গলিটা এই সময়ে খুবই নির্জন থাকে। রাস্তার দুপাশে পুরনো বাড়ি। বেশিরভাগ বাড়িই খালি। মানুষজন কম থাকে এখানে। তাসনিয়া এই গলি দিয়েই প্রতিদিন যায়। তাসনিয়া হাঁটছে আর তার পিছু পিছু একটা একটা সাদা ভ্যান গাড়ি আসছে। তাসনিয়া বিষয়টা খেয়াল করলো কিন্তু কোনো গুরুত্ব দিলো না,এটাই তার বড় ভুল হলো। হঠাৎ গাড়িটা তার কাছে এসে দাঁড়িয়ে দরজা খুলে ভেতর থেকে তিন-চারজন লোক নেমে আসল। সবাই কালো পোশাক পরা। মুখে মাস্কের মতো কিছু একটা। তাসনিয়া মূর্তির মতো জমে গেলো। সে বুঝতে পারল কিছু একটা ভুল হচ্ছে তবে ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। লোকগুলো তাসনিয়াকে কোনো প্রকার শব্দ করতে না দিয়ে তাকে ধরে ফেললো। একজন পেছন থেকে তার মুখ চেপে ধরল। অন্যজন তার হাত মুড়িয়ে পিছনে নিয়ে নিল। তাসনিয়া ভয়ে কাঠ হয়ে গেলো। সে হাত পা ছুঁড়তে লাগল। সে চিৎকার করার চেষ্টা করল কিন্তু পারল না। তার মুখটা যে বন্ধ। আশেপাশেও কেউ নেই যে সে সাহায্য চাইবে। সে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুই করতে পারছে না। লোকগুলো তাকে জোর করে ভ্যানের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। তাসনিয়া সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করে চলেছে। সে তার হাত ছুঁড়ছে, পা ছুঁড়ছে কিন্তু লোকগুলোর শক্তির কাছে সে হেরে গেলো। তারা তাকে জোর করে ভ্যানের ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। ভ্যানের ভেতরে আরও দুজন লোক ছিল। তারা তাসনিয়াকে ধরে ফেলল। ভ্যানের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ভ্যানটা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করল। পুরো ঘটনাটা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে গেল।তাসনিয়া এখনো বুঝতেই পারল না কী থেকে কী হয়ে গেছে। তাসনিয়া ভ্যানের ভেতরে ছটফট করতে লাগলো। সে বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। কারা এরা? কেন তাকে কিডন্যাপ করল? কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? তার মাথায় অনেক উল্টো পাল্টা চিন্তা আসল। তার মন ভয়ে গেঁথে গেলো। সে কাঁদতে চাইছে কিন্তু চোখ দিয়ে জল বেরোচ্ছে না। তার সারা শরীর ভয়ে কেঁপে-কেঁপে উঠছে। বুকের ভেতরে হৃদপিণ্ডটা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করেছে।

ভ্যানটা পুরনো একটা এলাকায় এসে থামল। সেখানে একটা পুরনো বিল্ডিং আছে। বিল্ডিংটা দেখতে বেশ পরিত্যক্ত। ভ্যানের দরজা খুলে লোকগুলো তাসনিয়াকে বের করল। তাসনিয়ার হাত বাঁধা। মুখেও টেপ লাগানো। সে চিৎকার করতে পারছে না শুধু শব্দ করার চেষ্টা করছে তাকে ধরে বিল্ডিংয়ের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। বিল্ডিংয়ের একটা ফ্ল্যাটে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ফ্ল্যাটটা বেশ পরিষ্কার কিন্তু জনমানবহীন। তাসনিয়াকে একটা চেয়ারে বসানো হলো। তার হাত চেয়ারের সাথে বাঁধা হলো। পা ও বাঁধা হলো। মেয়েটা এখন সম্পূর্ণ অসহায়। সে ছটফট করছে, নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছে কিন্তু সে পারছে না। হুট করে একটা কোলাহলপূর্ণ নগরী থেকে জনমানবহীন এলাকায় এসে সে ভয়ে গুটিয়ে গেলো। কয়েক মিনিটের মাথায় ফ্ল্যাটের দরজা খুলে একজন ভেতরে আসল। সাজিদকে ভেতরে ভেতরে ঢুকতে দেখে তাসনিয়ার চোখ বড় বড় হয়ে গেলো। সাজিদের সাথে রাফি, তানভীর এবং তাদের আরও কয়েকজন বন্ধু ছিলো। সাজিদ তাসনিয়ার সমানে এসে মেয়েটাকে দেখলো। তাসনিয়া অবিশ্বাস্য চোখে সাজিদের দিকে তাকিয়ে রয়ল। সাজিদএকটা চেয়ার টেনে তাসনিয়ার সামনে বসল। সে তার পা একটার ওপর একটা তুলে দুই হাত বুকে বাঁধলো। তার চোখ তাসনিয়ার চোখের দিকে। তাসনিয়ার চোখমুখ এখন শক্ত হয়ে গেছে। সাজিদ হাত বাড়িয়ে তাসনিয়ার মুখ থেকে টেপটা খুলে দিল। টেপ খুলে যাওয়ার সাথে সাথে তাসনিয়া ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,

'কী হচ্ছে এসব? আমাকে এখানে, এভাবে তুলে এনেছেন কেন?'

সাজিদ ভাবলেশহীন ভাবে বলল,

' কারণ ভালো করে বললে তো তুমি শুনতে না ডার্লিং। '

সাজিদের এমন রসিকতার সাথে বলা কথাটা শুনে তাসনিয়া হতভম্ব হয়ে গেলো।

' ইয়ার্কি মারছেন আমার সাথে?'

তাসনিয়া দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে জিজ্ঞাসা করল।

'শান্ত হও তাসনিয়া। শান্ত হও। প্রথমত তোমার সাথে আমার ইয়ার্কি করার মতো কোনো সম্পর্ক নেই আর দ্বিতীয়ত এখন আমার ইয়ার্কি করার মতো মুডও নেই।'

' আমাকে কিডন্যাপ করেছেন কেন? '

তাসনিয়া সাজিদের কথাগুলো কানে না নিয়েই বলল।

' অনেক বড় একটা কারণ আছে। '

সাজিদ ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল। তাসনিয়া ভ্রু কুঁচকে তার দিকে তাকিয়ে রইল। সাজিদ মেয়েটার দিকে এগিয়ে গলা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,

'তুমি যে নিজের অজান্তেই আমাদের দুজনের শিকার হয়ে গিয়েছো মেয়ে। একজনকে না একজনকে তো সেটা শিকার করতে হতো তাই শিকারটা আমিই করলাম না হয়। '

তাসনিয়া সাজিদের কথার আগামাথা কিছু বুঝতে পারলো না। সে ক্ষেপে গিয়ে বলে উঠলো,

'ছাড়েন আমাকে। ছাড়েন বলছি। একবার এখন থেকে বের হয় তখন আপনাদের সবাইকে পুলিশে দিব। সবাইকে জেলে ভাত খাওয়াব। '

সাজিদ ঠোঁট বাকিয়ে হাসল। ঠাণ্ডা, হিমশীতল কন্ঠে বলল,

'পুলিশ? তুমি আমাদের পুলিশের ভয় দেখাচ্ছ? ঠিক আছে দেখি তুমি বাহিরে গিয়ে কী কর আর তোমার পুলিশ মামুরাও আমাদের কী করতে পারে।'

তাসনিয়া এবার ভয় পেয়ে গেলো সাজিদের এই ঠাণ্ডা আচরণ তাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করে দিলো। সে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য ছটফট করতে লাগল। চেয়ারের সাথে বাঁধা দড়িতে টান দিতে লাগল কিন্তু কোনো লাভ হলো না।

'আমাকে এখানে কেন এনেছেন? কী ক্ষতি করেছি আমি। ' তাসনিয়া প্রায় কাঁদো-কাঁদো ভাবে কথাটা বলল। সাজিদ তার চোখের দিকে তাকাল।

'তোমাকে এখানে আনার একটা কারণ আছে আর কারণটা হলো তোমার ভাগ্যে লেখা ছিলো তুমি এখানে আসবে তাই তুমি এখানে এসেছো। '

তাসনিয়া রাগে ক্ষোভ তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সাজিদের দিকে দিয়ে রইল।

' হেয়ালি করছেন আমার সাথে? '

' না ভাই, কোনো হেয়ালি না৷ এবার তাহলে আসল কথাটা শোনো। '

তাসনিয়া চোখ ছোট্ট করে সাজিদের দিকে তাকিয়ে রইল। সাজিদ আড়মোড়া ভেঙে বলল,

' তুমি নাকি রিফাতকে ভালোবাসো।'

এই সময়ে সাজিদের মুখ থেকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত একটা কথা শুনে তাসনিয়া চুপ হয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো না রিফাতের কথা সাজিদ জানলো কী করে?

তাসনিয়াকে চুপ থাকতে দেখে সাজিদ নিজেই বলল,

' নিরবতায় সম্মতির লক্ষ্মণ। যায়হোক শোনো মেয়ে তোমাকে একটা কথা পরিষ্কার করে বলে দি রিফাত তোমাকে ভালোটালো বাসে না। আমরা একটা বাজি ধরেছিলাম আর সেই বাজির গুটি ছিলে তুমি। রিফাত আমাকে হারানোর জন্য তোমাকে ভালোবাসার অভিনয় করছে। '

সাজিদ কথাটা শেষ করতেই রাফি এগিয়ে এসে সাজিদের হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিল। সাজিদ একটা ভিডিও বের করে সাউন্ড বাড়িয়ে তাসনিয়ার দিকে ধরলো। এটা সেই ভিডিও সেখানে ক্যান্টিনে সাজিদরা আর রিফাতরা বাজি ধরাধরি করেছিলো। তাসনিয়া সবটা দেখে একদম হা হয়ে গেলো। তার মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না।

সাজিদ ভিডিওটা শেষ হলে সেটা অফ করে শান্ত কন্ঠে বলল,

' দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো সেদিন পাঁচ মিনিটের মাথায় গেট দিয়ে তুমি ভার্সিটিতে ঢুকেছিলে। '

তাসনিয়ার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না রিফাত এতোগুলো দিন ধরে শুধু তার সাথে অভিনয় করছে? কিন্তু সে নিজের কানে, নিজের চোখে যা দেখলো সেটা অস্বীকার করবে কী করে? সে হিমশীতল কন্ঠে জিজ্ঞাসা করল,

' এগুলো আজ আমাকে দেখানোর মানে কী?'

সাজিদ বাঁকা হাসল।

'দেখো মেয়ে আমার বা আমার বন্ধুদের মতোর ক্ষতি করার কোনো ইচ্ছে নেই তাই এতোগুলো দিন চলে যাওয়ার পরে আমরা রিফাতের মতো নিচুস্তরের কোনো কাজকে বেছে নেয়নি গেমে জেতার জন্য। আজ নাকি রিফাত পুরো ভার্সিটির সাথে তোমাকে প্রপোজ করবে তাই আগেভাগে তোমাকে সবটা বলে দিলাম। এখন দেখো তুমি কী করবে। '

.......

' তাসনিয়া, আজ আমি পুরো ভার্সিটির সামনে তোমাকে বলতে চাই আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমার সাথে আমি আমার সুখদুঃখ ভাগ করল নিতে চাই । তোমাকে সারাজীবন নিজের পাশে দেখতে চাই। তুমি কি আমার গার্লফ্রেন্ড হবে?'

তাসনিয়া ভার্সিটিতে এসে দেখলো ক্যাম্পাসে আজ স্বাভাবিক দিনের চেয়ে অনেক বেশি কোলাহল। শিক্ষার্থীদের মধ্যে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে আজ ক্যাম্পাসে কিছু একটা হবে। রিফাত নাকি কাউকে প্রপোজ করবে সেই খবরটা দাবানলের মতো একজন থেকে আরেকজন থেকে আরেকজনে ছড়িয়ে গেছে। তাসনিয়া স্তব্ধ হয়ে গেলো সবটা দেখে। সাজিদের সাথেই সে ভার্সিটিতে এসেছে। সাজিদরা তাকে নামিয়ে নিজেরাও ভেতরে ঢুকে গেছে। তাসনিয়ার নিজের কানকে এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না সে যা শুনেছে তার জন্য। সে মনে মনে দোয়া করছিলো সব যেনও মিথ্যা হয় কিন্তু এখানে এসে সে যা দেখতে সেটাতে প্রমাণ হয় সে সত্যিই রিফাতের ফাঁদে পড়ে গেছে। রিফাত আজ বেশ সেজেগুজে এসেছে। তার হাতে লাল গোলাপের বড় একটা তোড়া। তার বন্ধুরা তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সে তাসনিয়া এদিকে আসতে দেখে তাসনহয়াী সামনে দাঁড়িয়ে হুট করেই হাঁটু গেড়ে বসে তাসনিয়াকে কথাগুলো বলল। তাসনিয়া রিফাতের মুখ থেকে কথাগুলো শুনে রাগে ক্ষোভে দাঁতে দাঁত চেপে রয়ল। রিফাতদের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে সাজিদরাও সবটা দেখতে লাগল। তারা তাসনিয়ার উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল।

' সাজিদ আমরা যা ভাবছি তাই হবে তো?'

সাজিদ তানভীরের কথায় সামনের দিক থেকে চোখ জোড়া না সরিয়েই জবাব দিল,

' আমি একশো পার্সেন্ট শিয়র। মেয়েটা যখন সত্যটা জেনে গেছে, তখন সে নিজেই এসব থেকে বেরিয়ে আসবে। মেয়েটা যতটা না ভীতু তার চেয়ে বেশি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন। তখন মেয়েটার মুখ দেখে বোঝা গেলো রিফাতের কাজটা তার আত্মাসম্মানে লেগেছে। '

তাসনিয়া রিফাতের কথাগুলো শুনে নড়লো না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।তীব্র ক্রোধ নিয়ে সে রিফাতের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। তাসনিয়াকে সকলের সামনে এমন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রিফাত কিছুটা অস্বস্তি বোধ করল। তাসনিয়ার প্রতিক্রিয়া সে যেমনটা ভেবেছিল, তেমনটা হলো না। তাসনিয়া ধীরে-ধীরে একটা দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপাত্মক হাসি আনলো।

' ভালোবাসো? তুমি আমাকে ভালোবাস?'

রিফাত যেই না হ্যাঁ-তে মাথা নাড়লো তখনই জোরালো একটা থাপ্পড় রিফাতের গালে পড়ল। তাসনিয়ার এমন কাজে চারপাশের সবাই একদম নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সবাই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, কেউ বিশ্বাসই করতে পারছে না এখন এখানে তারা কী দেখল। রিফাত উঠে দাঁড়িয়ে গালে হাত রেখে তাসনিয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটার এমন কাজে তার চোখজোড়া বিস্ফারিত হয়ে গেলো । মুখ লাল হয়ে গেছে যেখানে থাপ্পড়টা পড়েছে। গোলাপের তোড়াটা কখনই তার হাত থেকে পড়ে গেছে । রিফাতের বন্ধুরাও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কিছু বুঝতে পারছে না মেয়েটা কী করলো তা।

সাজিদ ঠোঁটে একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে রাফিকে উদ্দেশ্য করে নরম গলায় বলল,

' রাফি, পপকর্ন আন তো।'

' পপকর্ন? এখন?'

'হ্যাঁ রে। খালি মুখে এই সিন দেখতে মজা লাগছে না। পপকর্ন থাকলে আরও ভালো লাগতো। '

তানভীর আর রাফি সাজিদের রসিকতা বুঝতে পারলো তারা কয়েকজনে হেসে উঠল।

সাজিদ তার দুই বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে বলল,

' খেলার জন্য বেচারা রিফাতরাও না ভুল মেয়েকে বেছে নিয়েছিল। এখন কী হবে সেটা মজা করে দেখার পালা। '

তাসনিয়া রিফাতের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে তার চোখে চোখ রেখে বলল,

' ভালোবাসা? তুমি জানো ভালোবাসা মানে কী?'

' তাসনিয়া কী হয়েছে তোমার?'

রিফাত ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞাসা করল।

' তুমি আমাকে ভালোবাসো না, রিফাত। তুমি সাজিদের সাথে একটা বাজি ধরে আমার সাথে নাটক করেছো। তোমরা দু'দল বাজি ধরেছে আর আমি ছিলাম সেই বাজির একটা গুটি। তুমি শুধু সাজিদকে হারাতে আমার অনুভূতি, আমার আবেগ, আমার ভালোবাসা নিয়ে খেলেছ। '

' তা..তাসনিয়া, আসলে.. শোনো আমি...'

'চুপ,আমি তোমার আর কোনো কথা শুনতে চাই না। যা জানার তা আমি জেনে গিয়েছি। দয়া করে তোমার মুখটা আমাকে আার দেখিও না। '

তাসনিয়া তার কথা মাঝখানে কেটে দিল। সে নিজের কথাগুলো শেষ করে মাটিতে পড়ে থাকা গোলাপের তোড়াটার উপর দিয়ে হেঁটে চলে গেল। সাজিদ সবটা দেখে নিজের আড়মোড়া ভাঙ্গল। রিফাত বুঝলো কাজটা কে করেছে তাই সে সাজিদের দিকে তাকাল। সাজিদ তাকে দেখে এক চোখ টিপ দিয়ে বাকা হেঁসে, সুন্দর করে টাটা দিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ক্যান্টিনে চলে গেলো। রিফাত নিজের ফ্যাকাসে মুখটা নিয়ে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল।

চলবে..

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন