ফন্ট সাইজ:
থিম:
সুখের নেশায়

পর্ব 14

লেখক: আসরিফা সুলতানা জেবা

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
পর্ব___১৯_২০

মন্থরগতিতে পা ফেলে মায়ের রুমে ঢুকল চৈত্রিকা। ক্ষীণ শব্দ কর্ণধারে পৌঁছাতেই ফাহমিদা চোখ তুলে তাকালেন। চৈত্রিকার রোগা,ফ্যাকাসে চেহারাটা অবলোকন করে তৎক্ষনাৎ মনে ব্যাথাতুর যন্ত্রণা ছড়িয়ে পড়ে। সুস্থির দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কয়েক পল চেয়ে থাকলেন মেয়ের রক্তশূণ্য মুখশ্রী পানে। তিনি জানেন, আহমেদ সাহেবের চিরতরে চলে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি আহত হয়েছে চৈত্রিকা। মা হয়ে শত আদরে মেয়েকে ভরিয়ে দিলেও বাবার আদর তো তিনি দিতে পারবেন না। চৈত্রিকার জীবনের এই অভাবটুকু পূর্ণ করার সাধ্য যে কারো নেই। হয়ত তাহাফের মাধ্যমে চৈত্রিকার বিষাক্ত জীবনে সুখ আসবে। তা ভেবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। চৈত্রিকা মায়ের দিকে চেয়ে আনতস্বরে বলে উঠল,

" ডেকেছিলে আম্মু?"

ফাহমিদা এগিয়ে এসে চৈত্রিকার মাথায় হাত রাখলেন। বিয়ের বিষয় নিয়ে বলতে গিয়ে বললেন না। সবকিছুর একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। এবং তা স্থান,কাল বুঝে বলা উচিত। এই বিষয়টা দমিয়ে আদুরে কন্ঠে বলে উঠলেন,

" আমরা কিন্তু একটু পর বেরিয়ে যাবো। ট্রেনের টিকিট তো কাটা হলো না। "

চৈত্রিকা একটু ইতস্তত বোধ করে বললো,

" সাফারাতের গাড়ি করে যাবো আমরা। "

ফাহমিদা চমৎকৃত নয়নে চেয়ে রইলেন চৈত্রিকার দিকে নির্নিমেষ। মস্তিষ্কে পুরোনো একটা কথা হানা দিতেই বলে উঠলেন,

" সাফারাতই কি সেই ছেলেটা যার কথা তুই কলেজে থাকতে বলেছিলি?"

" হুম আম্মু। "

ফাহমিদা বেশ অবাক হলেন। চৈত্রিকা মায়ের সাথে প্রায় অনেক কথা শেয়ার করে ছোট থেকেই। তেমনি কলেজ জীবনে সাফারাতের সাথে বন্ধুত্বের বিষয়টা শেয়ার করে। চৈত্রিকা সর্বদা মায়ের নিকট সাফারাতের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে থাকত। সাফারাত কে ফাহমিদা দিহানের প্রস্তাব নিয়ে আসার আগে কখনো দেখেন নি। ফাহমিদা একটু চুপ থেকে বললেন,

" ঠিক আছে রেডি হয়ে নে। "

চৈত্রিকা মায়ের রুম থেকে বেরিয়ে মিম কে বলল রেডি হয়ে নিতে। নিজে রেডি হয়ে ছোট্ট বাটন ফোনটা বের করে জানালার কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল। সাফারাতের নাম্বারে ডায়াল করতেই রিসিভ হয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে। ওপাশ থেকে ভেসে এলো মোহনীয় কন্ঠস্বর। শ্রবণগ্রন্থিতে মাদকতাময় গাম্ভীর্য সেই স্বর প্রবেশ করতেই চৈত্রিকার বুকে তোলপাড় করা মিহি সুরের ঘন্টা বেজে উঠল। যা বলতে ফোন দিয়েছিল তা গুলিয়ে ফেলছে। আজকাল সাফারাতের সান্নিধ্য,সন্নিকটে, কন্ঠস্বর চৈত্রিকাকে গভীর নেশায় ডুবিয়ে দেয়। এই এক সপ্তাহ সাফারাত নিজের কথা ভুলে দিন-রাত যেভাবে পাশে থেকেছে তাতে সাফারাতের প্রতি চৈত্রিকার সম্মান, ভালোবাসা বেড়ে গিয়েছে। চৈত্রিকার এখন মনে হয় সে নয়,তার চেয়েও বেশি ভালোবাসে সাফারাত তাকে। কিন্তু! এই ভালোবাসার সূচনা কবে থেকে?চৈত্রিকার কোনো রেসপন্স না পেয়ে সাফারাত গলা খাঁকারি দিয়ে ডেকে উঠল,

" চৈত্র কথা বলবেন না?"

আমতাআমতা করল চৈত্রিকা। ধরা গলায় বললো,

" যাওয়ার আগে বাবার কবরটা আরেকবার দেখে যেতে চাই। নিয়ে যাবেন?"

" রাস্তার ধারে আছি। চলে আসুন। "

চৈত্রিকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে মাথায় ঘোমটা টেনে নিল ওড়না সমেত। উঠান পেরিয়ে রাস্তার ধারে এলো। সাফারাত উল্টো ঘুরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে নিষ্পলক। পড়নে তার একটা কালো পাঞ্জাবি। এই প্রথম তাকে পাঞ্জাবি তে দেখল চৈত্রিকা। হৃদপিণ্ডের নিয়ন্ত্রণ গতিহারা। অস্বাভাবিক হৃদযন্ত্রের স্পন্দন। ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। চৈত্রিকা বুকের দুরুদুরু নিয়ে নিঃশব্দে কিছুটা দূরত্ব রেখে দাঁড়াল। সাথে সাথে সাফারাত দৃষ্টি সরিয়ে এনে পাশে রাখে। চেহারায় মলিনতা। চোখ দুটো ডেবে গেছে চৈত্রিকার। ঠোঁট কামড়ে ধরে সূক্ষ্ম একটা নিঃশ্বাস ফেলে সাফারাত। মৌনতা বজায় রেখে দু'জনে পাশাপাশি হেঁটে কবরস্থানের কাছে এলো। চৈত্রিকা দূর থেকে নতুন কবরটায় তাকিয়ে থাকে। বাবা কতটা নিরবে, শান্তিতে শুয়ে আছে এখানে। চৈত্রিকা পাথরের মতো স্তব্ধ, স্থবির। কয়েক মুহুর্ত কেটে যেতেই নিষ্প্রাণ স্বরে বললো,

" আপনার কি বাবার কথা মনে পড়ে সাফারাত? আপনার বাবা-মা'র ব্যাপারে কিছু বললেন না। "

প্রশ্নটা কর্ণপাত হওয়া মাত্র সাফারাতের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে এলো। চোয়াল শক্ত। চৈত্রিকা পাশ ফিরে সাফারাতের এহেন রূপে বিস্মিত,হতভম্ব। ঘাবড়ে গিয়ে বললো,

" কি হয়েছে? "

সাফারাত নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রাখল। গাম্ভীর্যের সহিত বলে উঠল,

" আমি নিজ থেকে কিছু না বললে কখনও আমার ব্যাপারে কিছু জানার জন্য ফোর্স করবেন না চৈত্র। এটা আমার আদেশ,রাগ যা-ই মনে করেন করতে পারেন। বাট ডোন্ট ফোর্স মি। আই হেট দিস। "

চৈত্রিকার মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেল নিমেষে। বিমূঢ়তায় নির্বাকহারা ও। সাফারাতের রাগান্বিত স্বরে অন্তস্থল কেঁপে উঠেছে। অভিমানে ভার হয়ে এলো মন। তবুও তা চেপে রাখল। দেখাবে না সাফারাত কে। ভালোবাসার মানুষের অতীত সম্পর্কে, বর্তমান অবস্থা জানার অধিকার নিশ্চয়ই আছে। সাফারাত কেন তাকে বঞ্চিত করছে অধিকার থেকে। চৈত্রিকা নিজেকে সংযত করে নেয়। হতে পারে সাফারাত সময় হলে নিজ থেকেই বলবে।

উল্টো ঘুরে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটতে শুরু করে দু'জনে। চৈত্রিকা সাফারাতের কাছ থেকে শুনেছিল সাফারাতের দাদি ও চাচাতো বোন এখানে। অত্যন্ত নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে,

" আপনার দাদি, বোন চলে গিয়েছে? "
" হুম। গতকাল। "
"ওহ্। "

অতঃপর দু'জনের মাঝে নিরবতা। আকস্মিক হাত ধরে আঁটকে দিল সাফারাত। চৈত্রিকা থমকালো। অবিন্যস্ত,শঙ্কিত দৃষ্টি ফেলল চারপাশে। এইদিকে মানুষের চলাচল খুব বেশি নয়। অধিক প্রয়োজন ব্যতীত এই পথ ধরে হাঁটে না কেউ। চৈত্রিকার দৃষ্টি প্রশ্নসূচক,জিজ্ঞাসু। সাফারাত দূরত্ব ঘুচিয়ে সামান্য ঘনিষ্ঠ হলো। মুহুর্তেই হৃদযন্ত্রের স্পন্দন থমকে গেল চৈত্রিকার। কিছু বলবে তার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। বক্ষে রণঢাক বাজছে। ভালোবাসার পরম সুখ এঁকে দিল সাফারাত কপালে। ছুঁয়ে দিল নরম, আর্দ্র ওষ্ঠদ্বয়। চৈত্রিকার নত চিবুকে আঙুল রেখে উপরে উঠিয়ে তাকিয়ে রইল লুব্ধনেত্রে। গভীর স্বরে আওড়ালো,

" খুব শীগ্রই আমরা এক হবো চৈত্র। "

শরীর কাটা দিয়ে উঠল চৈত্রিকার। দেহের প্রত্যেক ভাঁজে ভাঁজে কম্পন। সাফারাত নিজের মাঝে আগলে নেয় চৈত্রিকাকে। চৈত্রিকা লজ্জা পেল। অনুভব করল নিজের গালদুটোর তাপমাত্রা। কত নিঃসংকোচে নির্লজ্জ একটা বাক্য উচ্চারণ করল সাফারাত! চৈত্রিকা ঠাহর করতে পারছে সাফারাতের সঙ্গ তাকে কাঁপিয়ে মারবে। সিলেটের ছোট্ট একটা গ্রামে দাঁড়িয়ে মাউন্ট এভারেস্টের হিম শীতল হাড় কাঁপানো ঠান্ডার মতো সাফারাতের স্পর্শ কাঁপাচ্ছে তাকে প্রকটভাবে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাগিয়ে তুলছে অদ্ভুত এক শিহরণ।
__________________

বৃষ্টিতে ভিজে চৈত্রিকার অবস্থা বেগতিক। দু'দিন আগেই তো জ্বর সাড়ল এখন আবার বৃষ্টিতে ভিজে জুবুথুবু অবস্থা। দ্রুত বেগে সিঁড়ি বেয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কলিং বেল চেপে অপেক্ষা করছে দরজা খোলার। গতকাল ঢাকা ফিরে এসেছে ওরা। আজ টিউশনিতে যাবার মতোন মন মানসিকতা ছিল না। তবুও যেতে হয়েছে। স্টুডেন্টের এক্সাম। আজ অভিভাবক ফোন দিয়ে বলেছে আজকে পড়াতে না গেলে যেন আর পড়াতে না যায়। অথচ তারা বুঝতে চায় নি সদ্য পিতৃহারা চৈত্রিকার মনের অনুভূতি। কথাটা মনে হতেই চৈত্রিকার ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠে।

মিম দরজা মেলে সামনে তাকিয়ে হতবাক। তড়িঘড়ি করে উচ্চআওয়াজে বলে উঠল,

" এমন কাকভেজা হয়ে ফিরলে কেন আপু?দু'দিন আগেই তো সুস্থ হলে। সাফারাত ভাই জানলে আবার পাগলামো করবে। "

মিমের শেষ কথাটায় উপহাসের রেশ স্পষ্ট। চোখ রাঙাল চৈত্রিকা। মিম কে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। পা টিপে টিপে নিজের রুমে এসে মোবাইলটা খুঁজতে লাগল। কোথাও পেল না। টিউশনিতে যাবার সময় ভুলবশত মোবাইলটা বাসায় রেখে চলে গিয়েছিল। এখন দুপুর দু'টো বাজে। নিশ্চয়ই সাফারাত কল দিয়েছে। সকালে বলেছিল দুপুরে কল দিবে। মিটিংয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে আর কল দেওয়া সম্ভব হবে না। চৈত্রিকা মিমের রুমে ছুটে এলো। বড় বড় শ্বাস ফেলে বললো,

" আমার মোবাইল টা দেখেছিস?"

" হু। টেবিলের উপর। ভাইয়া অনেকবার কল দিয়েছিল। প্রায় ঊনত্রিশ বার। ত্রিশ বার পূর্ণ হতে দেই নি আমি। তার আগেই টুপ করে রিসিভ করে ফেলেছি। "

মিমের কথা শুনে চৈত্রিকা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারছে না। তবে সাফারাত যে আজ তাকে রাগে ভস্ম করে দিবে দিব্যি কল্পনা করতে পারছে। মোবাইলটা হাতে নিতে নিতে শঙ্কাভরা গলায় প্রশ্ন ছুঁড়ে মিমের দিক।

" কি বলেছেন?"
" আমাকে কেমন আছি এটাই জিজ্ঞেস করল। আর,,!"
" আর?"
ভ্রুঁ কুঞ্চিত করে তাকালো চৈত্রিকা। কপালে চিন্তার ভাঁজ। মিম মুখে সিরিয়াস ভাব এনে বললো,

" আর উনি আসছেন আমাদের বাসায়। "

চৈত্রিকার আঁখিদ্বয়ে আতঙ্ক দেখা দিল মুহুর্তেই। মিমের হাত ঝাঁকিয়ে রাগ প্রকাশ করে মৃদু স্বরে আওড়ালো,

" তুই কি সাফারাতকে সব বলে দিয়েছিস মিমু?"

" হ্যাঁ। "

চৈত্রিকার হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে আসল। ভীত কন্ঠে বলে উঠল,

" কি করলি এটা?আমি তো মা'কে বুঝাতাম। "

" কখন?কখন বুঝাতে তুমি আপু?একটু পরে তোমার আকদ তাহাফ ভাইয়ার সাথে। আর কখন বুঝাতে তুমি?তাহাফ ভাইয়ার নিকৃষ্ট চেহারাটা পর্যন্ত উন্মোচন করলে না আম্মুর সামনে। উল্টোদিকে আম্মু তোমার সুখ নিয়ে ভাবছে। বাবার মানসম্মান নিয়ে ভাবছে। কেবল আমিই জানি তোমার আসল সুখ সাফারাত ভাইয়ার মধ্যে নিহিত। সাফারাত ভাইয়া পারবে আম্মুকে ম্যানেজ করতে। তোমার মতো লুকিয়ে রাখা সম্ভব না আমার দ্বারা। "

চৈত্রিকা চিন্তায় পড়ে গেল। আজ সকালেই ফাহমিদা অকস্মাৎ জানিয়েছেন তার ও তাহাফের আকদের কথা। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে চৈত্রিকা। স্বামী হারিয়ে ফাহমিদার অবস্থাও শোচনীয় নয়। তার মধ্যে তাহাফের ব্যাপারটা কিভাবে খুলে বলবে,বিয়েতে নাকচ করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। সাফারাতকে জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েও পারল না জানাতে। মাত্র কয়েকদিনই তো গড়িয়েছে প্রণয়ের। সাফারাতকে বিয়ের কথা বলা বা বিয়ে নামক ভেজাল চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তাই সিদ্ধান্ত নেয় নিজ থেকে সবটুকু সমাধান করার এবং তাহাফকে উচিত শিক্ষা দেবার৷ কিন্তু এখন তো সাফারাত সব জেনে গেল। না জানি তার আগমনে কেমন ঝড়ের সৃষ্টি হবে!

#চলবে,,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

সুখের_নেশায়
লেখিকাঃআসরিফা_সুলতানা_জেবা
পর্ব___২০

চুপচাপ,গুমরে মুখো হয়ে সোফায় বসে আছে চৈত্রিকা। মাথা নত তার। চোখে মুখে ভয় ভয় ভাব স্পষ্ট। সাফারাত নিরবতা ভেঙে কন্ঠে গম্ভীরতা এঁটে বলে উঠল,

' তাহলে আপনি বিয়ে করবেন না বলছেন?'

চৈত্রিকা মাথা নাড়ালো। নিজের সিদ্ধান্তে অটল,অনঢ় মেয়েটা। সাফারাতের হাত মুঠো হয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে। রাগ উঠলে এই এক অভ্যেস তার। নয়ত রাগ কন্ট্রোল করা কষ্টকর হয়ে পড়ে। আর একবার রাগ কে প্রশ্রয় দিলে সামনে কে আছে, কাকে আঘাত করছে তার কোনো পরোয়া করবে না সাফারাত। ফাহমিদা কিড়মিড়িয়ে বলে উঠলেন,

' কি সমস্যা তোর চৈত্র? সারাজীবন একা থাকবি?লাগবে না তোর আমাদের দেখার। নিজের কথা ভাব। মা হয়ে আর তোদের কষ্ট সহ্য করতে পারব না আমি। এবার আমায় একটু তোদের সুখ দেখে শান্তিতে ম*রতে দে। '

মায়ের কথায় চৈত্রিকার চক্ষু ছলছল করে উঠল। অশ্রুসিক্ত নয়ন জোড়া নিক্ষেপ করল ফাহমিদার মুখের দিকে। বাহিরে ঝড় বইছে। আকাশ ভেঙে বৃষ্টির ফোঁটা ছুঁয়ে দিচ্ছে ধরণীর মাটি,মৃত্তিকা। বাতাসের ঝাপটায় বা দিকের খোলা জানালাটা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। মৃদু চমকে উঠে চৈত্রিকা, মিম, ফাহমিদা। মিম উঠে গিয়ে জানালাটা লাগিয়ে এলো। সাফারাত বদ্ধ সেই জানালার দিক হতে দৃষ্টি ফিরিয়ে ফাহমিদার উদ্দশ্যে অতিশয় নম্র কন্ঠে শুধালো,

' আমি একটু একা কথা বলতে চাই চৈত্রর সঙ্গে। যদি আপনি অনুমতি দেন! '

ফাহমিদা কিছুক্ষণ ভাবলেন। প্রতুত্তরে জানালেন,

' ঠিক আছে। '

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে উদভ্রান্তের ন্যায় প্রায় আধা ঘণ্টা আগে চৈত্রিকাদের বাসায় পৌঁছায় সাফারাত। আচমকা তাকে দেখে ফাহমিদা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন। কিন্তু সেই রেশ বেশিক্ষণ টিকতে দেয় নি সাফারাত। ফাহমিদা কে সালাম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে। ছেলেটার অমায়িক সৌন্দর্যে ভরপুর চেহারা,মাদকতাময় কন্ঠ শুনে ফাহমিদার সকল অবাকতা,বিস্ময় যেন নিমিষে দূর হয়ে গেল। সাফারাত কে উনার অসম্ভব ভালো লাগে। এই কয়েকটা দিনে,কয়েক মুহুর্তে উনার মনের অনেকখানি জায়গা কেঁড়ে নিয়েছে সাফারাত। যেকোনো মা -বাবা নিজের মেয়ের জন্য কেয়ারিং ছেলেকে মেয়ের জামাই হিসেবে চান। সাফারাত যেন চৈত্রিকার জীবনে সেই ব্যক্তি। তবে!তাহাফের পরিবারের তাড়াহুড়ায় উনার সাফারাতকে মেয়ের জামাই হিসেবে কল্পনা করা থেমে যায়। চৈত্রিকার বিয়ের কথা তো তাহাফের সাথে পাকা হয়ে আছে। তাছাড়া উনি ভেবেছিলেন সাফারাত ও চৈত্রিকার মাঝে কিছু আছে। বন্ধুত্বের চেয়েও বেশি। কিন্তু চৈত্রিকা যখন আজ বিয়ের কথা শুনে কোনো প্রকার রিয়েক্ট অথবা নাকচ করেন নি তখন সাফারাতের ব্যাপারে সকল চিন্তা ভাবনা ভেঙে যায় তাসের ঘরের ন্যায়।

চৈত্রিকা ও মিম দু'জনেই রুমে ছিল। ফাহমিদার ডাকে বেরিয়ে আসে। চোখের সামনে সাফারাতের ভেজা চুল, উশখুশ ,অস্থিরতা,রক্তবর্ণ চক্ষুদ্বয় দেখে চৈত্রিকার অভ্যন্তর বেসামাল হয়ে পড়ে। হার্টবিট বেড়ে যায় অস্বাভাবিকভাবে। মিমের দিকে ক্ষিপ্রদৃষ্টিতে তাকায় চৈত্রিকা। মিম কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাফারাতকে দেখেই দিব্যি বুঝা যাচ্ছে উম্মাদের মতোন ছুটে এসেছে এখানে ঝড়,বৃষ্টি অবজ্ঞা করে। চৈত্রিকা উল্টো ঘুরে রুমে চলে এলো শব্দহীন। হাতে তোয়ালে তুলে নিয়ে পুনরায় বেরিয়ে আসে। লাজলজ্জা জলাঞ্জলি দিয়ে সাফারাতের দিকে তোয়ালেটা বাড়িয়ে দেয়। বলিষ্ঠ হাতে তোয়ালে টা আঁকড়ে ধরে নিয়ে মাথা মুছে সাফারাত। তৎপরে ফাহমিদার সামনে এসে দাঁড়ায়।

' আপনি বোধহয় অবাক হচ্ছেন আন্টি এই বৃষ্টিময় অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনে আমি কেন আপনাদের বাসায় এভাবে ছুটে এলাম? '

ফাহমিদা অবাক হলেও মুখে হাসি এনে বললেন,

' কিছুটা হয়েছি বটে। '

সাফারাত ফাহমিদার হাসিতে যেন তৃপ্তি খুঁজে পেল। কতকাল মায়ের হাসিটা দেখা হয় না। সেই সুন্দর নারীর মুগ্ধ হাসির দেখা মিলে না বছরের পর বছর। বহুকাল। সাবলীল কন্ঠে বললো,

' আমি চৈত্রকে বিয়ে করতে চাই আন্টি এবং তা এখুনি। '

নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল পুরো কক্ষ। বাহিরে ঝড়ের তান্ডব চলছে। বিস্তর নীল গগণ বুঝি চৈত্রিকার মাথায় ভেঙে পড়ল। হাসি ফুটে উঠল কেবল মিমের অধর কোণে। বিস্ময়ের চেয়ে লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে পড়ে চৈত্রিকা। বিনা সংকোচে কাঠ কাঠ কথা বলা সাফারাতের চরিত্রের সাথে, ব্যক্তিত্বের সাথে মানানসই হলেও চৈত্রিকার যে লজ্জা অনুভূত হয়। তীব্র লজ্জা। মেয়ের দিকে তাকিয়ে এবং সাফারাতের নির্লজ্জ, নির্লিপ্তভাবে চৈত্রিকার হাত চাওয়া প্রমাণ করে দেয় ওদের মাঝের গভীরতা, ভালোবাসা। তবে সাফারাতকে একটু বেশরম, রগচটা, গম্ভীর মনে হয়েছে ফাহমিদার। বিয়ের প্রস্তাব দিল না-কি আদেশ করল তা বুঝা মুশকিল।

' কিন্তু একটু পরেই তো তাহাফের সাথে চৈত্রর আকদ। '

' ক্যান্সেল করে দিন। '

থতমত খেয়ে গেলেন ফাহমিদা। সাফারাতের কি নিরলস ভঙ্গিমা!বললেই কি ক্যান্সেল করা যায়?এই ছেলের কি একটু লজ্জা,জড়তাও নেই? ফাহমিদা আগেই ঠিক করে রেখেছিলেন চৈত্রিকার যদি সাফারাতকে পছন্দ হয় তাহলে তিনি মেয়ের সুখটাই দেখবেন। মুখে বললেন,

' একটু পরেই উনারা চলে আসবেন। আমি কি বলব সাফারাত? '

সাফারাত চৈত্রিকার দিকে এক পলক চাইল। তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সরিয়ে নিল চৈত্রিকা। সাফারাত সূক্ষ্ম একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বলে উঠল,

' বলবেন আপনার মেয়ের জামাই আমি। আমার বউ জোর করে কেঁড়ে নেওয়ার সাধ্য কি কারো আছে? '

চৈত্রিকার মাথা ঘুরছে রীতিমতো। মিম মুখে হাত চেপে হাসছে মিটিমিটি। সাফারাতের মতো দুলাভাই তো চেয়েছিল ও। স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পথে। চৈত্রিকা আজ সাফারাত কে নতুন করে আবিষ্কার করল। চিনল। রহস্যময়, গম্ভীর মানুষের ঠোঁট কাটা স্বভাবও আছে!এই নব্য রূপ বিস্ময়ের পাহাড় গড়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু চৈত্রিকা যে মনে মনে অন্য এক সিদ্ধান্ত স্থির করে নিয়েছে। লাজ উচ্ছনে দিয়ে শক্ত গলায় বললো,

' আমি এখন বিয়ের বিষয়ে ভাবতে চাই না। তাহাফকেও বিয়ে করতে চাই না আম্মু। আমি তোমাদের এভাবে ফেলে কোথাও যেতে পারব না। '

দায়িত্ব!হ্যাঁ এই দায়িত্ব নামক শব্দটাই চৈত্রিকার মনের মানুষের সাথে এক হওয়ার পথে বাঁধা, অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। চাইলেও চৈত্রিকা এড়িয়ে যেতে পারবে না। পারবে না কয়েকদিন আগে স্বামী হারানো ফাহিমদা,পিতৃহারা মিমকে ফেলে অন্যের ঘর আলোকিত করতে। সংসার নামক বেড়াজালে বন্দী হতে। তাহাফের পরিবারকেও ফিরিয়ে দিত আজ। যেমন করে ফিরিয়ে দিচ্ছে সাফারাতকে। তবে আজীবনের জন্য না। কিছু টা সময়ের প্রয়োজন দু'জন সদস্যের পরিবারটা সামলাতে, বাবার দায়িত্ব টা পালন করার নিমিত্তে। সাফারাতকে প্রাণপণে চায়। কিন্তু এখন না। কথাগুলো মনে না রেখে সকলের সম্মুখে ব্যক্ত করে চৈত্রিকা। ফাহমিদা মেয়ের কথা শুনে অন্তরে শীতল স্রোত অনুভব করলেন। মুহুর্তেই শৈশব হতে প্রতিনিয়ত ধুকে ধুকে বড় হওয়া চৈত্রিকার সুখের কথা ভেবে কঠোর হলেন তিনি। সাফারাত একবারও দৃষ্টি মেলে নি চৈত্রিকার পানে। উল্টো ঘুরে সোফায় গিয়ে বসে।
____________

চৈত্রিকার সারা রুমে চোখ বুলিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসল সাফারাত। টব থেকে শুকনো জারবেরার পাপড়ি হাতে নিয়ে মুঠো পুড়ে নিল। চৈত্রিকা আশ্চর্যান্বিত হলো ব্যাপক। মাথায় ধরে না সবাই তার রুমে এসে কেন এই ফুলগুলোর দিকেই নজর ফেলে!সাফারাত প্রগাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ করে রেখেছে চৈত্রিকার দিকে। চেয়ার ছেড়ে দূরত্বে জানালার ধার ঘেঁষে থাকা চৈত্রিকার কাছাকাছি এলো। চৈত্রিকা ভড়কালো। এক পা এক পা করে মিশে গেল দেয়ালের সাথে। সাফারাত সবটুকু দূরত্ব নিঃশেষ করে খুব কাছাকাছি এলো। অতিশয় নিকট। অল্প অল্প কম্পনরত গোলাপি ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে চোখ রেখে ক্রুদ্ধ কন্ঠে বলে উঠল,

' বিয়ে আপনাকে বসতেই হবে চৈত্র। আজকেই। '

' আপনি তো অবুঝ না। আমার পরিবারকে বিপদে রেখে, এই পরিস্থিতিতে ফেলে আমি নিজের চিন্তা করতে পারব না। '

চৈত্রিকার কন্ঠনালি কাঁপছে। সাফারাত দেয়ালের একপাশে হাত রেখে সামান্য ঝুঁকে পড়ল। তপ্ত নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ছে চৈত্রিকার সারা মুখশ্রীতে। চৈত্রিকার ইচ্ছে করছে সাফারাতের জ্যাকেট আঁকড়ে ধরে আরো কাছে টেনে নিতে। কি এক অসভ্য,বেহায়া ইচ্ছে জাগল!বাঁধ ভাঙা লাগামহীন স্পৃহা।

' তো আপনি কবে বিয়ের কথা ভাবছেন?আমি বুড়ো হয়ে যাবার পর?'

সাফারাত কি ঠেস মেরে কথা বললো?মাথা দু'দিকে নাড়াল চৈত্রিকা। মুখে আওড়ালো,

' আমার একটা জব হোক তারপর,,'

কথাটা কটাক্ষ করে সাফারাত বিরক্ত গলায় বলে উঠল,

' আপনি কাল সকালেই আমার অফিসে যাবেন চাকরির ইন্টারভিউ দিতে। আপনার ফ্যামিলি মানে আমার আপনজন। আমি তাদের দায়িত্ব নিতে পারি অনায়াসে। আপনি হয়ত এটা পছন্দ করছেন না। নো প্রবলেম। আপনি জব করবেন। তবে বিয়েটা আজই হবে। '

' আপনি কি আমার উপর করুণা করতে চাইছেন?'

দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল সাফারাতের ভেতর। এক টানে চৈত্রিকার কোমর জরিয়ে কাছে টেনে নিল। রোষপূর্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে লহু স্বরে বললো,

' ফারদার এমন কথা মুখ দিয়েও আনবেন না চৈত্র। আপনার যোগ্যতা ছাড়া কোনো জব দেওয়া হবে না। ইন্টারভিউতে সিলেক্ট হলেই জব পাবেন। এক মাস সময় দিলাম আমি আপনাকে। জবের চেষ্টা করবেন,পরিবারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবেন। আর এই এক মাসের মাঝে যদি কোনোভাবেই দু'জন কাছাকাছি চলে আসি তাহলে আই সোয়ের একদম উঠিয়ে নিয়ে যাব আপনাকে। '

চৈত্রিকা মৃদু কেঁপে উঠল। আঁখিপল্লব নেড়ে চক্ষু মেলে তাকালো সাফারাতের রাগান্বিত চেহারায়। আর একটা শব্দও উচ্চারণের সাহস জোগাতে ব্যর্থ হলো। সাফারাত মুখ এগিয়ে নরম,কোমল কপোলে গাল ঘষে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে নেয়। কোমরের বাঁধন ঢিলে করে আদেশের সুরে বলে,

' ঘোমটা টেনে বাহিরে আসুন। দিহান কাজী নিয়ে আসছে। '

#চলবে,,!
(ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 14 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন