আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়তাম। আমাদের বাড়িটা ছিল গ্রামের একদম শেষ মাথায়। বাড়ির পেছনেই ছিল একটা বিশাল পুরনো পুকুর, আর পুকুরের পাশে একটা শত বছরের পুরনো তেঁতুল গাছ। গ্রামের মানুষ ঐ গাছটার নিচ দিয়ে রাতের বেলা যেতো না। সবাই বলতো, ঐ গাছে একজন আছে।
আমি ছিলাম অনেক সাহসী। ভূতে বিশ্বাস করতাম না। আমার বান্ধবীরা প্রায়ই আমাকে খ্যাপাতো,
"তুই এত সাহসী, রাতে একা পুকুরপাড়ে যেতে পারবি?"
একদিন বর্ষার রাতে কারেন্ট চলে গেল। পুরো গ্রাম অন্ধকার। আমার ফোনে চার্জও ছিল না। আম্মু বললো,
"যা তো, হারিকেনটা নিয়ে পেছনের ঘর থেকে একটা কাঁথা নিয়ে আয়।"
আমি হারিকেন হাতে পেছনের ঘরে গেলাম। পেছনের ঘরের জানালাটা ঠিক পুকুরের দিকে। হঠাৎ আমি শুনলাম, পুকুর থেকে কেউ যেন ডাকছে...
*"এই... এই মেয়ে... এই..."*
গলাটা একদম আমার আম্মুর মতো। কিন্তু আম্মু তো রান্নাঘরে!
আমার বুকটা ধক করে উঠলো। আমি ভাবলাম, হয়তো ভুল শুনেছি। কাঁথা নিয়ে ফিরে আসতে যাবো, তখনই জানালার বাইরে তাকিয়ে আমার শরীর জমে গেল।
পুকুরের পানিতে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একটা মেয়ে। লম্বা চুল পানি দিয়ে ঢাকা। কিছুই ছিলো না । মুখটা দেখা যাচ্ছে না, চুল দিয়ে ঢাকা। মেয়েটা এক হাত তুলে আমাকে ডাকছে।
আমি চিৎকার দিতে চাইলাম, কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হলো না।
তখনই হারিকেনটা নিজে নিজে নিভে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার।
আর অন্ধকারের মধ্যে আমি স্পষ্ট শুনলাম, কেউ আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে,
*"তুই আমার নাম ধরে ডাকলি কেন? আমি তো তোকে ডাকিনি।"*
আমি দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে আম্মুর কাছে গেলাম। আম্মু বললো,
"কিরে, এত ভয় পাইছিস কেন? মুখ সাদা হয়ে গেছে।"
আমি সব খুলে বললাম। আম্মু শুনে চুপ হয়ে গেল। তারপর আস্তে করে বললো,
"তোর দাদি মারা যাওয়ার আগে বলছিল, ঐ পুকুরে নাকি একটা মেয়ে ডুবে মারা গেছিল। তার নামটাও নাকি তোর নামের মতোই ছিল।"
ঐ রাতে আমি জ্বরে পড়লাম। ৭ দিন জ্বর ছিল। জ্বরের ঘোরে শুধু একটা কথাই বলতাম,
*"ও আমাকে পানিতে টানছে... ও বলছে আমার নাম ওর নাম... আমি ওর জায়গায় থাকলে ও মুক্তি পাবে..."*
৭ দিন পর জ্বর কমলো। কিন্তু এর পর থেকে আমি আর কোনোদিন রাতের বেলা পেছনের ঘরে যাইনি।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ না।
জ্বর ভালো হওয়ার ৩ দিন পরের ঘটনা। রাত তখন ২টা। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। আমি দেখলাম, আমার বিছানার পাশে পানির দাগ। কেউ যেন ভেজা পায়ে হেঁটে আমার ঘরে এসেছে। পায়ের ছাপগুলো বিছানা পর্যন্ত এসে থেমে গেছে।
আমি ভয়ে আম্মুকে ডাকতে গেলাম, দেখি আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হচ্ছে না। আমার শরীর নড়ছে না। মনে হচ্ছিল কেউ আমার বুকের উপর বসে আছে। আমি শুধু চোখ দিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে একটা মুখ। চুলগুলো পানি দিয়ে ভেজা, মুখটা সাদা, চোখ দুইটা কালো গর্তের মতো।
সে আমার কানের কাছে মুখ এনে বললো,
*"তোর জ্বরটা আমি দিয়েছিলাম। তুই মরলে আমি বাঁচবো।"*
তারপর আমি জ্ঞান হারালাম।
সকালে আম্মু এসে দেখে, আমার সারা গায়ে পুকুরের কাদা লেগে আছে। আমার চুল ভেজা। কিন্তু আমি তো রাতে ঘর থেকে বেরই হইনি!
আম্মু-আব্বু আমাকে এক হুজুরের কাছে নিয়ে গেল। হুজুর সব শুনে বললো,
"মেয়েটার সাথে ঐ জিনিসটা লেগে গেছে। ওকে পুকুরের কাছে নিয়ে যাওয়া যাবে না। আর রাতে ওকে একা ঘুমাতে দেওয়া যাবে না।"
কিন্তু একদিন সন্ধ্যায়, আম্মু একটু বাজারে গেছে। আমি একা ঘরে বসে পড়ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে পুকুরের দিক থেকে।
আমি জানতাম যাওয়া যাবে না। তাও পা দুইটা নিজে নিজে হাঁটতে শুরু করলো। যেন কেউ আমাকে টানছে। আমি চাইছিলাম না যেতে, কিন্তু শরীর আমার কথা শুনছিল না।
আমি পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়ালাম। তেঁতুল গাছের নিচে সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে। এবার তার মুখটা দেখা যাচ্ছে। মুখটা একদম আমার মতো! শুধু চোখ দুইটা নেই, সেখানে শুধু অন্ধকার।
সে হাসতে হাসতে বললো,
*"দেখ, তুই আর আমি এক। তুই পানিতে নামলেই আমি তোর শরীরে ঢুকে যাবো। তোর আম্মু-আব্বু বুঝতেও পারবে না।"*
আমি চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে আম্মুর চিৎকার শুনলাম। আম্মু এসে আমাকে টেনে ঘরে নিয়ে গেল। আম্মু বললো, আমি নাকি পুকুরে নামতে যাচ্ছিলাম, পানি আমার হাঁটু পর্যন্ত উঠে গেছিল।
ঐদিন রাতে হুজুর এসে আমাকে একটা তাবিজ দিলো আর বাড়ি বন্ধ করে দিয়ে গেল।
এরপর অনেক বছর কেটে গেছে। আমি এখন বড় হয়েছি। ঐ গ্রাম ছেড়ে চলে এসেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, এখনো বর্ষার রাতে কারেন্ট গেলে, আমি জানালার দিকে তাকাই না।
কারণ এখনো মাঝে মাঝে রাতে আমি স্বপ্নে দেখি, আমি পুকুরের পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। আর পাড়ে দাঁড়িয়ে আমার মতো দেখতে একটা মেয়ে আমাকে ডাকছে...
*"আয়... তোর জায়গাটা এখনো খালি আছে..."*
আর ঘুম ভাঙার পর দেখি, আমার পায়ে এখনো পুকুরের কাদা লেগে আছে।
তোমার কি মনে হয়, ঐ তাবিজটা সত্যিই আমাকে বাঁচিয়েছিল? নাকি ও এখনো আমার সাথেই আছে?
এটা শুনে আম্মু বললো
বাচিয়েছে তোকে ওই তাবিজটা তবে তোকে সবসময় সাবধানে থাকতে হবে।
আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলাম।
সেদিন রাতে আরো ভয়ংকর সপ্নে আমার ঘুম ভেঙে গেলো পাগলের মতো করেত লাগলাম নিজের চুল নিজে টানতে লাগলাম। তবুও এতে আমার কোনো হেলদুল নেই আমি আমার চিন্তায় বাচি না।
আম্মু আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললেন
কি সপ্ন দেখেছিস বল আম্মুকে?
আব্বু পাশে ছিলেন আমার চিৎকারে নিজের রুম থেকে চলে আসছিলো।
আমি বলতে লাগলাম
ও আমাকে বলেছে আমাকে না নেওয়া পর্যন্ত ও মুক্তি পাবে না তাই পৃথিবীতে যত দিন বেঁচে থাকবো ততদিন ও আমার পিছু ছাড়বেনা.......
( সমাপ্ত)