উপন্যাস:মায়ার বাঁধন
লেখিকা : ফারহানা আক্তার
পর্ব – ০১
— আব্বু!
— হুম, বলো মা?
— আব্বু, আমি জায়ান নিষিদ্ধ মায়া?
ছোট্ট আরিশা গাল ফুলিয়ে বলল,
— আব্বু, তুমি কি বুঝতে পারছো না আমি কী বলছি? আমি জায়ান ভাইয়াকে বিয়ে করব!
আবরার খান এবার কপাল কুঁচকে রাগী চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।
— কী! তোর বয়স মাত্র সাত বছর! আর তুই বিয়ের কথা বলছিস? এসব কথা তোর মাথায় ঢুকল কীভাবে?
পাশ থেকে আরিশার মা শারমিন খান এগিয়ে এসে বললেন,
— আরে, ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলছ কেন? মা, তোমার এখনো বিয়ের বয়স হয়নি। যখন বড় হবে, তখন আমরা তোমার বিয়ে দেব।
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— না, না, না! আমি এখনই বিয়ে করব!
— মা, বোঝার চেষ্টা করো। এখন এসবের সময় হয়নি।
— তুমি যদি আমাকে জায়ান ভাইয়ার সঙ্গে বিয়ে না দাও, তাহলে আমি জায়ান ভাইয়াকে বলে দেব যে তোমরা আমাকে বিয়ে দিতে চাও না!
আবরার খান এবার কড়া গলায় বললেন,
— বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, মিস!
আরিশা মুখ ফুলিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
— দেখেছো মা! আব্বু আমাকে বিয়ে দেবে না। হুম!
ঠিক তখনই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলেন আরমান খান। তিনি জায়ানের বাবা।
নিচে এসে সাত বছরের ছোট্ট আরিশার মুখে বিয়ে নিয়ে এতসব কথা শুনে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন।
আরমান খান মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বললেন,
— ওহে মা, এসব কী বলছো তুমি? এখনো তো তোমার বিয়ের বয়স হয়নি। আর তোমার জায়ান তোমাকে বিয়ে করবে না। তুমি যদি জায়ানকে এসব কথা বলো, তাহলে সে তোমাকে অনেক বকবে। এসব বলো না, কেমন?
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল,
— না, না! আমি জায়ানকেই বিয়ে করব। আমার জায়ানকে অনেক ভালো লাগে। আমি জানি না, আমি ওকেই বিয়ে করব। তাও এখনই!
এবার আরমান খান রেগে গেলেন।
— কতবার বলেছি, এসব পাগলামি বন্ধ করো!
কিন্তু আরিশা কিছুতেই তাঁর কথা শুনতে রাজি নয়। একপর্যায়ে রাগের মাথায় আরমান খান আরিশাকে একটি চড় মারলেন।
চড় খেয়ে ছোট্ট আরিশা মেঝেতে বসে পড়ল। চোখে পানি চলে এল তার। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
কান্নার মাঝেই বলে উঠল,
— আমি জায়ানকে বিয়ে করব! আমি জানি না! তোমরা যদি আমাকে জায়ানের সঙ্গে বিয়ে না দাও, তাহলে আমি মরে যাব!
মেয়েটির মুখে এমন কথা শুনে আরমান খান কিছুটা শান্ত হলেন। তিনি দ্রুত আরিশার কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
— কী বলছো মা! এমন কথা বলতে নেই। মরে যেতে হবে না, ঠিক আছে? দেবো, দেবো, তোমার বিয়ে দেবো। কিন্তু এমন কথা আর কখনো বলবে না।
আরিশা কান্নাভেজা চোখে তাঁর দিকে তাকাল।
আরমান খান আবার বললেন,
— কিন্তু তোমার জায়ান তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। উল্টো তোমাকে বকবে, তোমার সঙ্গে কথাও বলবে না।
আরিশা চোখের পানি মুছে জেদি গলায় বলল,
— না! জায়ান আমাকে বিয়ে করবে। আমি জানি!
আরিশার কথা শুনে আরমান খান মুচকি হেসে ফেললেন। ছোট্ট মেয়েটির জেদ দেখে তিনি যেন আর কিছু বলার ভাষা খুঁজে পেলেন না।
এদিকে আবরার খান মেয়েকে কোলে তুলে নিলেন।
— আচ্ছা, আমার রাজকন্যা, এবার কান্না থামাও। এত জেদ করতে হয় না, মা।
আরিশা নাক টেনে বলল,
— তাহলে জায়ান ভাইয়াকে আমার কাছে নিয়ে আসো।
— জায়ান তো এখন বাসায় নেই, মা।
— কোথায় গেছে?
— বাইরে গেছে। ফিরে এলে দেখা হবে।
আরিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল,
— আব্বু, জায়ান ভাইয়া এলে আমাকে আগে ডাকবে কিন্তু!
শারমিন খান হেসে বললেন,
— আচ্ছা, ডাকব। এবার তুমি হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা করতে যাও।
আরিশা বাবার কোল থেকে নেমে দৌড়ে সিঁড়ির দিকে চলে গেল।
তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আরমান খান বললেন,
— ভাই, তোমার মেয়ের জেদ তো দেখছি আকাশ ছুঁয়েছে!
আবরার খান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
— কী আর বলব! ছোট থেকেই জায়ানের পেছনে লেগে আছে। ওকে ছাড়া যেন কিছুই বোঝে না।
আরমান খান হেসে বললেন,
— জায়ান শুনলে তো রেগে আগুন হয়ে যাবে!
ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একজনের কণ্ঠ ভেসে এল—
— কার কথা বলছেন আপনারা?
দুজনেই দরজার দিকে তাকালেন।
দরজায় দাঁড়িয়ে আছে জায়ান খান।
আরমান খান ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন,
— আরে, বাবা! তোর কথাই বলছিলাম।
জায়ান ভ্রু কুঁচকে বলল,
— আমার কথা? কী হয়েছে আমাকে নিয়ে?
আবরার খান হেসে বললেন,
— কিছু না বাবা, তোর এক ছোট্ট ভক্ত আছে। যে তোকে বিয়ে করতে চায়!
জায়ান অবাক হয়ে তাকাল।
— What! কে সে?
ঠিক তখনই ওপরতলা থেকে আরিশার চিৎকার শোনা গেল—
— জায়ান ভাইয়াআআ!
জায়ান ওপরের দিকে তাকাল।
আরিশা দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। তাকে দেখেই জায়ান বুঝে গেল, এই ছোট্ট ভক্ত আর কেউ নয়, আরিশা!
— জায়ান ভাইয়াআআ!
আরিশা দৌড়ে এসে জায়ানের সামনে দাঁড়াল। মুখে তার একগাল হাসি।
জায়ান নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কী হয়েছে, পিচ্চি? এত চিৎকার করছিস কেন?
আরিশা দুই হাত বাড়িয়ে বলল,
— আমাকে কোলে নাও!
জায়ান মুচকি হেসে তাকে কোলে তুলে নিল।
— তা, আমার পিচ্চি রাজকন্যার কী খবর?
— ভালো না!
— কেন? কী হয়েছে আবার?
আরিশা গাল ফুলিয়ে বলল,
— তুমি আমাকে বিয়ে করবে না কেন?
কথাটা শুনে জায়ান থমকে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আরমান খান আর আবরার খান মুখ চেপে হাসতে লাগলেন।
জায়ান অবাক হয়ে বলল,
— কী! কে বলেছে এসব?
— তুমি করবে না?
— আরে পাগলি, তোর বয়স কত?
— সাত বছর!
— আর আমার?
— জানি না!
জায়ান হেসে বলল,
— আগে বড় হ। তারপর এসব নিয়ে ভাবা যাবে।
আরিশা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
— না! আমি বড় হতে চাই না। আমি এখনই তোমাকে বিয়ে করব!
জায়ান এবার হেসে তার গাল টিপে দিল।
— এত জেদ কেন তোর?
— কারণ আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করি।
জায়ান মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
— আচ্ছা, এখন এসব বাদ। আমাকে বল, কিছু খেয়েছিস?
আরিশা মাথা নেড়ে বলল,
— না।
— তাহলে চল, আগে কিছু খেয়ে নে।
— তুমি খাওয়াবে?
— হ্যাঁ, আমিই খাওয়াব।
আরিশা খুশিতে হাততালি দিয়ে উঠল।
দূর থেকে নাওরিন খান সবকিছু দেখছিলেন। ছেলের সঙ্গে আরিশার এমন মিষ্টি কথোপকথন দেখে তাঁর মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
তিনি এগিয়ে এসে বললেন,
— জায়ান বাবা, এতক্ষণে বাড়িতে এসেছিস? আর এই যে আমাদের ছোট্ট আরিশা, কী করছো মা?
আরিশা নাওরিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— আন্টি, আপনার ছেলেকে আমাকে দিয়ে দিন!
নাওরিন হেসে বললেন,
— তাই নাকি? কিন্তু আমার ছেলেকে দিয়ে আমি কী করব?
আরিশা গম্ভীর মুখে বলল,
— আমাকে বিয়ে দেবেন!
এবার সবাই হেসে উঠল।
চলবে...